Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৮

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৮

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৮
লিজা মনি

আফ্রিকার চিকিৎসা ব্যবস্থার শীর্ষবিন্দু হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ‘নেটকেয়ার মিলপার্ক হসপিটাল’ (Netcare Milpark Hospital) কিংবা কায়রোর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণ্য করা হয়। আফ্রিকা মহাদেশের চিকিৎসা-স্থাপত্যের এক অনন্য বিমূর্ত প্রতীক হলো এই চিকিৎসালয়টি। এটি কেবল একটি নিরাময় কেন্দ্র নয়, বরং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এক জীবন্ত নিদর্শন। এর অবকাঠামোগত পারিপাট্য এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাস রোগীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তি নিশ্চিতে এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে।এই হসপিটালের ‘লেভেল-১’ ট্রমা সেন্টারটি মহাদেশের মধ্যে অগ্রগণ্য। যেকোনো আকস্মিক মহাবিপদ বা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় এদের তাৎক্ষণিক সাড়াদান পদ্ধতি অত্যন্ত ক্ষিপ্র ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিপ্রসূত। উন্নত এয়ার-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা দুর্গম এলাকা থেকেও মুমূর্ষু রোগীকে অতি দ্রুত জীবন রক্ষাকারী ছত্রছায়ায় নিয়ে আসতে সক্ষম।

এনির কণ্ঠনিঃসৃত প্রতিটি গগনবিদারী চিৎকার সেই নিশ্ছিদ্র কেবিনের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ে চারদিকে নরকীয় প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করছে। প্রসব-বেদনার সেই তীব্র কশাঘাতে তাঁর শরীর ধনুষ্টঙ্কারের ন্যায় ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। শ্বেতশুভ্র শয্যার চাদরটি তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রবল টানে ছিন্নভিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘর্মাক্ত ললাট আর রক্তিম নেত্রপল্লব সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তাঁর অস্তিত্বের প্রতিটি তন্তু আজ এক অবর্ণনীয় দহনজ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে। এনি যন্ত্রনায় চিৎকার দিতে থাকে। মনে হচ্ছে সেই দুর্ভেদ্য কক্ষের নিরেট ভিত্তিটিও বুঝি আজ এই প্রবল আর্তনাদে ধসে পড়বে। তাঁর এই চিৎকার যেন এক নিরবচ্ছিন্ন হাহাকার। হসপিটালের প্রতিটি করিডোরে এক অশরীরী আতঙ্কের ন্যায় ভেসে বেড়াচ্ছে। বেদনার তীব্রতায় তাঁর ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরার ফলে যে রক্তবিন্দু চিবুক বেয়ে নেমে আসছে। সেকেন্ড যেন একেকটি যুগান্তরের সমান।প্রতিটি পলক এনিকে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু আর জীবনের সেই অতি সূক্ষ্ম সীমারেখায়।

যেখানে যন্ত্রণাই একমাত্র ধ্রুব সত্য। সাউন্ড প্রুফ কেবিন হওয়ার কারনে চিৎকারের শব্দ বাহিরে বের হচ্ছে না। নিক অশান্ত আর অধৈর্য হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। ডাক্তারদের সাথে অনেক বিশ্রি আচরন করেছে। সে এনির কাছে যেতে চাইলো কিন্তু মিসেস মোনালিসা টেকনিক করে আটকে দিলেন। উনি খুব ভালো করেই জানেন এই লোক ভেতরে যাওয়া মানে অনেক কিছু। দেখা গেলো নিজের বউ কষ্ট পাচ্ছে দেখে রাগের কারনে ভেতরের সব ডাক্তার কু*পিয়ে মেরে ফেললো। বলা যায় না! করলেও করে দিতে পারেন। এইসব সাইকোদের নিয়ে বিশ্বাস নেই।
করিডোরে নিকের পায়চারি এক শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ছটফটানি। তার ললাটের শিরাসমূহ তপ্ত লাভার মতো স্ফীত হয়ে উঠেছে। ধূসর চোখের মণি দুটিতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক অশুভ ও রক্তিম আভা। সে নিজের কেশগুচ্ছ অমানুষিক শক্তিতে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। চোয়ালের হাড়গুলো প্রতি মুহূর্তে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। যা গ্যাংস্টার বসের ভেতরের সেই দুর্ভেদ্য ক্রোধ ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য উন্মাদনারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। নিকের দিকে তাকাতেই আরিশ আৎকে উঠে। নিকের নাক দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছে প্রচুর। আরিশ অধৈর্য হয়ে এগিয়ে আসে,
” এতটা বেপোরোয়া কেনো হয়ে উঠলি? এনি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে। ফিরে আসবে তর বুকে। প্লিজ স্টপ নিক! মস্তিষ্ককে শান্তনা দে। নিজেকে শান্ত কর, তর নাক দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছে।
নিক অবহেলায় মুছে নিলো সেই রক্ত। রক্তের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

” এই মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার থেকে আমার মৃত্যুও ভালো ছিলো। অশান্ত মনকে শান্ত করার মত ধৈর্য নেই আমার। গ্যাংস্টার বস আজ নিয়মের উর্ধ্বে। ওর কিছু হলে কিভাবে বাঁচব আমি? নিজেকে নিজে শুট করে মরে যাব তবুও এই নারীকে একা ছাড়ব না। পরকালে গিয়েও গলা টিপে ধরব। ফাকিং অ্যাডিকশন, ফাকিং হ্যাবিট, ফাকিং পুল, দিস ফাকিং লাভ!
এক মুহূর্ত ও দাড়ালেন না গ্যাংস্টার বস। চিন্তিত আরিশ আর নাজলীকে একা রেখে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যায়। আরিশ গম্ভীর নিশ্বাস ছেড়ে কাঁদতে থাকা নাজলীর দিকে তাকিয়ে বলে,
” অনুভব করতে পারো নাজলী, মানুষ ঠিক কতটা মানসিক তীব্র যন্ত্রনায় থাকলে তার নাক দিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়। তোমার বোন খুব ভাগ্যবান।

ভেতরে এনির অবস্থা দেখে ডাক্তার তারা ভয়ে আর চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে। মায়ের রক্তশূন্যতার অভাব দেখা দেয়। একসাথে তিনটা বাচ্চা জন্ম দেওয়া জন্ম মৃত্যুর লড়াই। সব থেকে বড় ডাক্তার মিসেস মোনালিসার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলে,
” এক্ষনি মি, নিক জেভরানকে বার্তা পাঠান।
” কোন বার্তা পাঠাব ম্যাম?
” বলুন উনার ওয়াইফের শরীরের কন্ডিশন খুব একটা ভালো না। তিনটা বাচ্চা জন্ম দেওয়া অনেক রিস্ক।
ড, মোনালিসার মুখে ভয়ে নীল হয়ে উঠে যেন। দুই কদম পিছিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” প্রয়োজনে পেশা ছেড়ে দিব এরপরও ওই ব্যাক্তির সামনে এই কথা বলার সাহস নেই আমার। একদম গলা টিপে মেরে ফেলবে আমার। আপনি চিনেন না উনাকে ভালোভাবে। সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দিন। আমাদের এনি অনেক সাহসী।
ডাক্তার মোনালিসা এনির কপালের ঘাম মুছে দিয়ে বলে,

” মিসেস নিক জেভরান, ক্যান ইউ হিয়ার মি?”
এনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে উত্তর দেয়,
” ইয়েস, আই ক্যান হিয়ার ইউ।”
মিসেস মোনালিসা সামান্য হেসে বলে,
” তিনটা বেবির মা হবেন আপনি। সিজার করাতে নিলে প্রচুর রিস্ক। নরমাল করতে হবে সব কিছু। আপনি কি আমাদের পাশে থাকবেন? শক্তি দিতে পারবেন? আপনি চান না তিন জন সুস্থ ভাবে দুনিয়াতে আসুক। আপনার হার্টল্যাস স্বামীর ভেতরে পাথর সরিয়ে ফুল ফুটিয়ে তুলুক?
এনি কেঁদে উঠে। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,
” চাই। আমি উনাকে স্বাভাবিক জীবন দিতে চাই। উনার হৃদয়ে ভালোবাসার বীজ বপন করতে চাই।
মিসেস মোনালিসা হালকা হাসেন। পায়ের কাছে এসে চোখ তুলে তাকিয়ে বলেন,
” শক্তি হয়ে থাকুন আমাদের সাথে। নিজের সবটা দিয়ে চেষ্টা করুন। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার উপরে ছেড়ে দিন।

হাসপাতালের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে কয়েক কদম দূরেই অবস্থিত সেই পবিত্র মসজিদের সুউচ্চ মিনারের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন শহরের আন্ডারগ্রাউন্ড মনস্টার। সেই দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার বস। তাঁর চোখের মণি দুটি আজ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের ন্যায় অসম্ভব রক্তিম দীর্ঘ সময়ের নির্ঘুম উৎকণ্ঠা এবং অবদমিত মানসিক চাপের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। তাঁর যে হৃদপিণ্ড কখনো শত্রুর বুলেটের সামনে কাঁপেনি। আজ তা এক অজানা ভয়ে এবং অপরাধবোধে অবিরাম স্পন্দিত হচ্ছে।

দীর্ঘ চব্বিশটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অথচ এই পবিত্র চৌকাঠ মাড়ানোর সাহস তাঁর হয়নি। কখনো মসজিদের ভেতরে পা রাখে নি। কোনোদিন সৃষ্টিকর্তার দরবারে সিজদায় পড়ে নি। আজ দীর্ঘ দুই যুগ পর নিক মসজিদের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মস্তিষ্ক এক বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো চিন্তার আবর্তে নিমজ্জিত। স্মৃতির পাতায় ধুলো জমা এক পুরনো দৃশ্য আজ তাঁর মানসপটে ভেসে উঠছে। এর আগেও একবার তসে এখানে এসেছিলো। কিন্তু ভেতরে প্রবেশের ধৃষ্টতা বা পবিত্রতা তাঁর ছিল না। অদ্ভুত সমান্তরাল এক বাস্তবতা তখনও তাঁর এই অস্থির আগমনের কারন ও ছিলেন এই নারী। আর আজও সেই নারীরই জীবন-মৃত্যুর জীবন ভিক্ষে চাইতে দাঁড়িয়ে তিনি। নিকের চোখের পাতা কাঁপছে।।বিধ্বস্ত গ্যাংস্টার বস ওযু করার জন্য গেলে থমকে যায়। শরীরে খোদায় করা ট্যাটুর কথা মনে হতেই চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। শরীরে রক্তমাখা শার্টটা খুলে এক পাশে রাখে। এই রক্ত গুলোতে আছে এনির নারী সত্তা। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের অবাধ্যতা আর অহমিকা বিসর্জন দিয়ে নিক ওযু সম্পন্ন করলেন। জানে ওযু হবে না এরপরও সবটা সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিলেন। এরপর জায়নামাজে দাঁড়িয়ে একে একে পঞ্চাশ রাকাত নফল নামাজ আদায় করে। প্রতিটি সিজদায় কপাল যখন জমিন স্পর্শ করছে, তখন পৃথিবীর সেই অপরাজেয় গ্যাংস্টার বস এক পরম সত্তার সামনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণায় পরিণত হচ্ছেন।
নিকের চোখ দুইটা দিয়ে তপ্ত ফুটন্ত পানি গড়িয়ে পড়ছে। নাক দিয়ে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। নিক সিজদায় গিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। তার শেষ আশ্রয়স্থলের কাছে ভিক্ষে চায়,

” এক জীবনে বাপ হারালাম, মা হারালাম। উহুম মা হারায় নি। নিজে খুন করেছি। এতটা যুদ্ধ করে বেঁচেছি যে এর থেকে নরকের আগুনও হয়ত প্রশান্তি অনুভব হত। কখনো কারোর কাছে মাথা নত করি নি। কারোর জন্য জীবনে এক ফুটা চোখের পানি খরচ করি নি।এমনকি নিজের জন্য ও না । কত -শত দিন শত্রুর আঘাতে শরীর থেকে তাজা রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ত। অনুভব করে নি সেই যন্ত্রনা, সেই ব্যাথা। গাঁ হয়ে যেত এরপরও মেডিসিন খায় নি। এতটা পাথর আর হৃদয়ীন বানিয়েছো আমাকে। যন্ত্রনা আমাকে কঠোর করে তুলেছে। অথচ আজ চোখের পানি কমাতে পারছি না। যন্ত্রনায় বুক ভেঙ্গে আসছে কিন্তু চিৎকার করতে পারছি না। দিনশেষে আমিও তো মানুষ। পুরো দুনিয়া আমাকে মনস্টার হিসেবে অনুভব করে। জানোয়ার, নিরপিশাচ বলে চিনে। কিন্তু আমার শরীর ও তো রক্তে মাংসে গড়া। আর কত সহ্য করব এইসব যন্ত্রনা? জীবনে কিছু চাই নি তোমার দরবারে। কেনো আমাকে এতিম করে দিলে তার অভিযোগ ও করিনি। কেনো আমাকে এমন নরকের জীবন দিলে সেটা নিয়েও অভিযোগ করিনি।
কিন্তু আজ গ্যাংস্টার বস অসহায়। তার অসহায়ত্ব তুমি ছাড়া কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। যখন নেওয়ার এই হত তবে আমার জীবনে পাঠালে কেনো? কেনো এত আসক্ত করলে? আমি তো এই পাপী আর নরক জীবনে কাউকে জড়াতে চাই নি। এমন ভাবে এক নারী দেহ আমার সাথে জড়িয়ে দিলে যে দুইটা আত্নাকে একত্রিত করে ফেললে? একজনের মৃত্যু হলে আরেকজনের মৃত্যুও নিশ্চিত।

প্লিজ ওকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিও না। কেড়ে নিলেও আফসোস নেই। আমি নিজেও বাঁচব না।।হয়ত ট্রিগার চেপে নিজেও মরে যাব। কিন্ত আমি তার সাথে একটা জীবন বাঁচতে চাই। আমার মত পাপী তো জান্নাতের গন্ধ পর্যন্ত পাবে না। জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে আমার শরীর। ওই নারীর দেখা আমি আর কখনো পাব না। কোনোদিন তার চোখে চোখ রেখে আর ছন্নছাড়া -বেপোরোয়া হতে পারব না।একটা জীবন কি তার সাথে পেতে পারি না আমি? তোমার সৃষ্টিতে তো কোনো কিছুর অভাব নেই। একটা জীবন তোমার কাছে ভিক্ষে চাচ্ছে। আমার পাপ আমাকে ধ্বংস করে দিলেও আমার সন্তান আর স্ত্রীর শরীকে যাতে স্পর্শ করতে না পারে। তুমি আমার ক্ষমতা, টাকা-পয়সা সব কেড়ে নাও। তবুও তাদেরকে আমার জীবন থেকে কেড়ে নিও না।
নিক এইভাবেই ঠিক কতক্ষণ সিজদায় পড়ে ছিলো জানা নেই। চব্বিশ বছর পর খোদার দরবারে সিজদায় পড়লেন গ্যাংস্টার বস। নিকের মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছে একটা লাইন,
” ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যূম, বিরাহমাতিকা আসতাগীছু”

দীর্ঘ অনেক্ষণ হয়ে গেলো কিছুর খবর নেই। চারদিকে অসংখ্য গার্ড হসপিটাল পাহারা দিচ্ছে। অধিরসজ দাঁড়িয়ে সবাইকে সামলে নিচ্ছে। এইদিকে আরিশের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। নিকের কোনো সন্ধান নেই। অন্যদিকে এনির ও কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।।
নাজলী মুখ চেপে ধরে কেঁদে উঠে,
” আমার বোনটা ঠিক আছে তো আরিশ? কেউ কোনো খবর দিচ্ছে না কেনো? কেনো কোনো ডাক্তার বের হচ্ছে না এখনও? প্লিজ কিছু করো।
আরিশ নিজেও অস্থির। রাগ আর জেদ তার মাথায় চেপে বসে। সব থেকে বেশি অবাক হয় নিককে দেখতে না পেয়ে। কোথায় গিয়েছে আরিশ নিজেও জানে না। অসহ্য হয়ে সে কেবিনের ভেতরে ডুকতে যাবে তার আগেই কেবিনের দরজা খুলে যায়।
সাদা টাওয়ালে মুড়ানো তিনটা ছোট্ট প্রানকে মিসেস মোনালিসা বাহিরে নিয়ে আসেন। তার মুখের হাসি দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি ঠিক কতটা উত্তেজিত। ড, মোনালিসা-কে বেরিয়ে আসতে দেখে নাজলীর কান্না থেমে যায়। মাথা তুলে দ্রুত এগিয়ে যায় উনার দিকে। চোখ যায় তিন -তিনটা অস্তিত্বের দিকে। কোনো রকম অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

” আমার বোন কেমন আছেন? ওর শরীরের কন্ডিশন কেমন। দোহায় লাগে খারাপ খবর দিবেন না। সহ্য করতে পারব না এক মুহূর্তের জন্য।
মিসেস মোনালিসা মৃদু হেসে নাজলীর দিকে তাকায়। মেয়েটার চুল একদম লাল। দেখতে বেশ সুন্দরী একদম চোখে লাগার মত। আরিশ শক্ত করে ধরে রেখেছে নাজলীকে। আরিশ নিজেও আতঙ্কের মধ্যে আছে। এনির কিছু হয়ে গেলে নিক পাগল প্রায় হয়ে যায়। গ্যাংস্টার বসের ধ্বংস নিশ্চিত। কিন্তু চারপাশে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই রক্তমাখা শরীর নিয়ে কোথায় গিয়েছে আরিশ বুঝতে পারছে না। কার কাছে গেলো? খোদার দরবারে? আরিশের ভাবনার মধ্যে মিসেস মোনালিসা বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
” চিন্তা করবেন না মিসেস নাজলী। আপনার বোন ঠিক না হলেও আপাতত বিপদ মুক্ত। সামান্য খিঁচুনি উঠেছিলো। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সবাই। কারন ডেলিভারির পর এই খিঁচুনিটা মারাত্নক। এখন সম্পূর্ণ বিপদ মুক্ত।
নাজলী স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বাচ্চাদের দিকে তাকায়। আশ্চর্য হয়ে বলে,

” ত..তিন জন?
মিসেস মোনালিসা নিজেও হাসেন। নাজলীর দিকে বাচ্চাদের এগিয়ে দিতে দিতে বলে,
” ইয়েস। বাই দ্যা ওয়ে, নিক জেভরান কোথায় ?
নাজলী কোলে নিয়ে মুচকি হেসে কিছু বলতে যাচ্ছিলো। তার আগেই কোথা থেকে যেন ঘূর্ণিঝড়ের মত ছুঁটে আসে গ্যাংস্টার বস। সাদা টাওয়েলে মুড়ানো তিনটা প্রানকে উপেক্ষা করে সোজা কেবিনের ভেতরে ডুকে পড়ে। একদম ছন্নছাড়া আর অগুছালো অবস্থা। কারোর দিকে তাকানোর সময় নেই তার। ড. মোনালিসা সহ বাকি সব ডাক্তার হতভম্ভ। আরিশ বিরবির করে উঠে,
” শালা বউ পাগল ক্রিমিনাল।
নাজলী প্রথমে কপাল কুচকালেও ফিক করে হেসে দেয়।মিসেস মোনালিসা আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” একটু বেশিই পাগল।

নিক নিথর হয়ে পড়ে থাকা এনির দেহটার পাশে সজোরে বসে পড়ে। আটকে রাখা শ্বাস এতক্ষনে ত্যাগ করেন। নিকের চোখ দুইটা আগুনের মত লাল হয়ে আছে। চোখের পাপড়ি গুলোও হয়ত ভেজা। আচ্ছা গ্যাংস্টার বস কি কেঁদেছেন? হ্যা কেঁদেছে তো। এমন হার্টল্যাস যান্ত্রিক মানব কি করে কারোর জন্য কাঁদতে পারে?
এনির অবিন্যস্ত সোনালী অলকগুচ্ছ তার মুখশ্রীতে লেপ্টে আছে।দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর বিধ্বস্ততা যেন মেয়েটিকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। তার শুষ্ক অধরযুগল আর ফ্যাকাশে মুখাবয়ব যেন এক অদ্ভুত বিষাদময় সৌন্দর্যের অবতারণা করেছে। নিক এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরলয়ে এনির সেই শুষ্ক ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলায় সেখানে কামনার চেয়ে হাহাকারই ছিল স্পষ্ট। নিক ঠোঁট ছেড়ে পুরো মুখে উন্মাদের মত চুমু খেতে থাকে। এনি সজাগ থাকলে হয়ত নিককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে -পড়ে লাগত। কিন্তু নিথর এনি জানতে এই পারলো না গ্যাংস্টার বসের পাগলামি। নিক প্রায় এক হাজারের ও বেশি চুম্বন খায় এনির মুখে। এনির পুরো মুখ ভিজে উঠেছে একদম। নিক ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে এনির কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকায়। এনিকে এখনও চোখ বন্ধ করে রাখতে দেখে নিকের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আসে। চোয়াল পিষে বলে,

” শালী ধান্দাবাজ! এত উন্মাদ করেও শান্তি হয় নি। আমার স্পর্শ পাওয়া সত্তেও কিভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। জানের ভয় নেই ভেতরে।
গ্যাংস্টা বস থামে কিছুক্ষণের জন্য। এলোমেলো কন্ঠে ডাকে,
” ব্লাডরোজ চোখ খুলো। আর কত পুড়িয়ে মারবি। গ্যাংস্টার বসের ধৈর্য অনেকরে জান। নিজের জন্মদাত্রীকে নিজ হাতে মেরেও একবারের জন্য চোখের পানি ফেলিনি। গ্যাংস্টার বস ভুল করেও কোনোদিন কারোর জন্য চোখের পানি ফেলিনি। আর তুমি আমাকে চিৎকার করিয়ে কাঁদালে। হাউ ডিড ইউ বিকাম সো অ্যাডিক্টেড?
আরিশ আর নাজলী দরজার এখানে দাড়িয়ে আছে। সাহস পাচ্ছে না ভেতরে ডুকার। মিসেস মোনালিসা আর অপেক্ষা করে নি। কেবিনের ভেতরে ডুকে নিকের দিকে এগিয়ে যায়। নাজলী আর আরিশ মিসেস মোনালিসার পিছন পিছন যায়। মিসেস মোনালিসা হেসে বলে,
” মি, নিক জেভরান বউয়ের জন্য শুধু উন্মাদ হলে হবে? বাচ্চাদের তো দেখতে হবে।
নিক শান্ত দৃষ্টি দিয়ে তাকায় তিনটা ছোট্ট দেহের দিকে। আচ্ছা, গ্যাংস্টার বসের যান্ত্রিক হৃদয়ে ধ্বাক্কা লেগেছে কি একবারের জন্য? নিক ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,

” তিনজন?
নিকের আশ্চর্য আর গম্ভীর মুখ দেখে মিসেস মোনালিসা হালকা হেসে বলেন,
” আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই মি, নিক জেভরান। বউ অজ্ঞান করে যখন আশ্চর্য হন নি তখন তিন জন দেখে আশ্চর্য হচ্ছেন কেনো? অজ্ঞান করার ফল কম হলে সেটা ভালো দেখায় না। তাই একদম তিন জন পৃথিবীতে ল্যান্ড করেছে।
নিকের ভাবমূর্তি বুঝা গেলো না। প্রসঙ্গ এড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” আমার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরবে কখন?
ড, মোনালিসা আহত গলায় বলে,
” কিছুক্ষণ পর ফিরে আসবে। কড়া ডোজের ঘুমের মেডিসিন খাওয়ানো হয়েছে।
আরিশ হতাশ সুরে বলে,

” তর বউ একদম ঠিক আছে ভাই। আগে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে দেখ।
নিকের দৃষ্টি কেঁপে উঠে। ড, মোনালিসা খুব যত্ন করে বাচ্চাদের এগিয়ে দেয় নিকের সন্নিকটে। চোখের পলকে গ্যাংস্টার বস আগলে নেন তিনটা প্রানকে। তার তিনটা অস্তিত্ব, তিনটা পৃথিবী। যাদের স্পর্শে ভয়ানক মাববটার সত্তা কেঁপে উঠছে। কপাল দিয়ে ঘাম ছুঁটছে। কি সাঙ্গাতিক তোমাদের স্পর্শ! একজন আন্ডারগ্রাউন্ড টেররিস্ট কাঁপছে তোমাদের স্পর্শে। নিকের গম্ভীর আর শক্ত মুখ দেখে বুঝা দায় তার ভেতরে কি চলছে। সামান্য ঠোঁট নাড়িয়ে চুমু খায় তার দুই রাজকন্য আর এক রাজপুত্রের কপালে। তিন জন এই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। নিক একজন মেয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়ায়,
” তোমার চোখ দুটি ঠিক আমার মত। আর তোমার চোখ দুইটা তোমার মাম্মামের মত। যার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আহত হয় আমি। আর তুমি তো আমাদের দুইজনের মিশ্রণ।
পর পর ছেলের দিকে তাকিয়ে হালকা সুরে বলে,

” মায়ের ফটোকপি! তোমরা আমাকে পাপা ডাকবে তো? কি আশ্চর্য নারীদের ঘৃনা করা ব্যাক্তিটার জীবনের সাথে তিন জন নারী একদম বাজেভাবে জড়িয়ে গেলো।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে হেসে বলে,
” একজন তর হুহবু কপি। আরেকজন এনির কপি। আরেকজন তদের দুইজন থেকে মিশ্র। এই ভাই, তুই কি খেয়েছিলি বলতো? একসাথে তিন জন কিভাবে হলো ? যেখানে একজনের বাপ হতে পারে না দেখে হারবাল খায়। সেখানে তুই সুস্থ ভাবে একসাথে তিন জনের বাপ কিভাবে হলি? ড্রাগস নিতি?
আরিশের লাগামহীন কথায় নাজলী অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই ব্যক্তি কখনো ঠিক হবে না। নিক এনির দিকে তাকিয়ে বলে,

” আমার নারী’ই আমার জন্য ব্যক্তিগত ড্রাগস।
আরিশ ঠোঁট বাঁকায় সামান্য। নিকের এই জীবন পাওয়া ছিলো সপ্নের মত। কেউ কোনোদিন কল্পনাও করে নি এই ভয়ানক মানবটা কারোর প্রতি এতটা আসক্ত হবে। তার ও একটা পরিবার হবে। কিভাবে বিশ্বাস করবে এই সত্য! কতটা নির্দয় হলে নিজের মা-কে হত্যা করে তার দেহ টুকরো টুকরো করে।আর সেই পাষাণ হৃদয়ের ব্যাক্তিটা আজ এতটা নরম, এতটা শান্ত? কিভাবে আরিশ? কিভাবে সম্ভব! আরিশ ঘন নিশ্বাস ছেড়ে কিছু বলবে তার আগেই এনি নাড়াচাড়া করে উঠে। সময়ের ব্যবধানে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। মাথা ব্যাথায় নাক -মুখ খিঁচে ফেলে। বাম হাতের সাহায্যে কপালে চেপে ধরে নিকের দিকে তাকায়। নিকের কোলে বাচ্চাদের দেখে এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। নিক এনির কপালে মখে আবার ও চুমু খেয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ে। এলোমেলো গলায় বলে,

” আই অ্যাম ভেরি সরি , ব্লাডরোজ। ইউ হ্যাভ এনডিউর্ড সো মাচ পেইন টু ব্রিং দিজ থ্রি ইনটু দিস ওয়ার্ল্ড। হাউ ক্যান আই এভার অনার ইয়োর স্যাক্রিফাইস? ডোন্ট বি শেকেন অ্যাট অল হোয়াইল ডিলিং উইথ দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্টস, গার্ল। ব্যাথা হচ্ছে? কষ্ট অনুভব করছো? কি করব জান! কি করলে তর কষ্ট কমবে?
সবার সামনে নিকের এমন উন্মাদ পাগলামোতে এনি অস্বস্থিতে পড়ে যায়। বিরবির করে বলে,
“নির্লজ্জ লোক! সবাই দেখছে। একটু শান্ত রাখুন নিজেকে।
নিকের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠে। সবার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলে,
” এভরিওয়ান লিভ ইমিডিয়েটলি—ফাইভ সেকেন্ডস।
ডাক্তার তারা ভয়ে বের হয়ে গেলেও আরিশ আর নাজলী থেকে যায়। আরিশ ঠোঁট চেপে হেসে সিরিয়াস মুডে বলে,
” ওমা কেনো? নিজের ছেলের বউ না দেখে চলে যাব?
নিক চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,

” আমার মেয়েকে তর ছেলের কাছে দিব না। তাই দেখতে হবে না কাউকে। আপাতত বের হ রুম থেকে রাবিশ!
আরিশ মাথায় ডুকালো না সেই ধমকানো। সিনা টান -টান করে দাঁড়িয়ে বলে,
” যাব না আমি। তুই বললেই যেতে হবে আমাকে? ভাতিজি-ভাতিজা দেখব নিজের। তাছাড়া বের হতে যাব কেনো?
নিক দাঁত পিষে বলে,
” কারন বাচ্চার মা প্রাইভেসি চাচ্ছে। আর এক মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে গলা টিপে ধরব আমি।
এনির চোখ বড় বড় হয়ে উঠে। কি নির্লজ্জ কথা বলছে এইসব? সে কখন প্রাইভেসি চাইলো? এনি অধৈর্য হয়ে বলে,
” না, ভাইয়া……
” চুপ!
এনি কথাটা বলতে ও পারলো না। নিকের ধমকে ছলছল করে তাকায়। চোখ দিয়ে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে চাইলো। আরিশ নাজলীর হাত ধরে হাসতে হাসতে বের হয়ে যায় কেবিন থেকে। দরজার লাগানোর সময় শব্দ করে বলে,

” নিজেকে সংযত করে রাখিস। অনেক দিনের ক্ষুধার্ত জানি। কিছু একটা খুঁচাখুঁচি করছে। তাই বলে খুঁচাখুঁচি বন্ধ করার কাজে লেগে পড়িস না। বাচ্চারা পাশে আছে মনে রাখিস। তারা দেখে ফেলবে সব!
নিক চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাতেই আরিশ শব্দ করে দরজা বন্ধ করে ফেলে। লজ্জায় এনির কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। কিসব নির্লজ্জ কথাবার্তা! সে-তো আরিশকে অন্তত ভালো ভেবেছিলো। কিন্তু সব এক ঘোয়ালের গরু! এনির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কারোর শরীরের কড়া পারফিউমের গন্ধে। তার খুব নিকটে গ্যাংস্টার বস। এনির শরীর কাঁপছে অসম্ভব ভাবে। নিক কামড় খায় এনির কানের লতিতে। এনির শুকনো ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে এমন সময় চিকন দুইটা গলা ভেসে উঠে। কান্নার শব্দে হুশ আসে গ্যাংস্টার বসের। দ্রুত এনির থেকে সরে এসে বাচ্চাদের আগলে নেয়। এনি ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে। নিক চিন্তিত হয়ে বলে,

” ওয়েট করো। ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসছি আমি।
” কেনো?
” ওরা কাঁদছে। কি সমস্যা দেখে যেতে।
এনি হালকা হেসে বলে,
” খিদে পেয়েছে ওদের। খাবে বলে কাঁদছে।
এনির কপালের ভাঁজ শিথিল হয়। ঠান্ডা গলায় বলে,
“ওরা কি কি খাবে যাস্ট বলে দাও। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিয়ে আসছি।
এনি আহাম্মকের মত তাকায় নিকের দিকে। পর মুহূর্তে দাঁত পিষে বলে,
” তারা বাহিরের খাবার খাবে? এদেরকে কি আপনার বয়সের মনে হয়? সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের বলছেন বাহিরের খাবার খেতে? দেখেছেন কোথাও এমন? ওদেরকে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে হবে।
নিক কপাল কুচকে তাকায় বিছানায় শুয়ে থাকা তিনটা প্রানের দিকে। দেখতে সাইজ ছোট একদম। এনিকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে তার পাশে বসে। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

” কি?
” সাহায্য করছি আমি।
এনি সামান্য ইতস্ততা বোধ করে। মিনমিন গলায় বলে,
” ডাক্তারকে ডেকে দিন। আপনাকে করতে হবে না।
এনি ইতস্ততা বোধ করছে ভাবতেই নিকের মস্তিষ্কে আগুন ধরে যায়। টগবগিয়ে ফুটতে থাকে তার ধূসর চোখ দুইটা। রাগে এনির ধনুকের মত বাঁকানো কোমরটা ধরে তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে চোয়াল পিষে বলে,
” নাটক করছো আমার সাথে? তোমার এমন কোন জিনিস আছে যেটা আমার হাত আর ঠোঁট স্পর্শ করে নি।আমার চোখ দেখেনি। চলো সেটা আজ উন্মুক্ত করি। কি চাচ্ছো এই মুহূর্তে বাজে কিছু করে বসি?
এনি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। এই রাগকে প্রচুর ভয় পায় সে। নিকের শার্ট খামছে ধরে বলে,
” রেগে যাবেন না। প্রথম- প্রথম তাই লজ্জা পাচ্ছিলাম।
নিকের মন টললো না,

” প্রথম- প্রথম? প্রথম- প্রথম হলে এরা তিন একসাথে কোথা থেকে উদয় হয়েছে? গাছের সাথে ধ্বাক্কা খেয়ে প্র‍্যেগনেন্ট হয়ে যাও নি নিশ্চই?
এনি ভোঁতা মুখে তাকায় নিকের দিকে। এতক্ষনে খেয়াল করে নিকের এলোমেলো অবস্থা। শার্টে ল্যাপ্টে আছে এখনও এনির নারী সত্তা। এলোমেলো ঘাড় পর্যন্ত চুল। সেই তীক্ষ্ণ ও সুঠাম ফর্সা মুখমণ্ডল আজ এক ধূসর পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করেছে। চব্বিশ ঘণ্টার নির্ঘুম আর অস্থিরতা চোখ-মুখে ফুটে উঠেছে।
নিকের এই বিধ্বস্ত রূপটি দেখে মনে হচ্ছে, কোনো এক মহাপরাক্রমশালী ঘূর্ণিঝড় কেবল তাঁর ওপর দিয়েই বয়ে গেছে। এনি নিকের গালে হাত রেখে বলে,
” কি অবস্থা করেছেন নিজের? এইটুকু সহ্য করতে পারেন নি? অথচ ভাবেন তো পাঁচ মাস আমি কিভাবে সহ্য করেছি? আমি তো মানসিক রোগী হয়েছি। আপনি তো দেখছি স্ট্রোক করে মরতেন।
নিকের রাগ কমে আসে। এনির মেরুন জামায় হাত রেখে পুরোটা সাহায্য করে। এনি কিছুটা সংকোচ আর লজ্জা বোধ করলে ও প্রকাশ করে না। ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলে,

” কি নাম রাখব বলুন তো তিন জনের?
” নিভ্রা, নিরাশা।
নিকের একদম শান্ত কন্ঠস্বর। এনি অবাক হয়ে তাকায় নিকের গম্ভীর মুখে। মুচকি হেসে বলে,
” নাম আগে এই ঠিক করে রেখেছিলেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। এনির ঘাড়ে হাত রেখে মুখটা নিজের কাছে নিয়ে এসে বলে,
” পছন্দ হয় নি?
এনি অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে বলে,
” আপনার নামের সাথে মিলে গেলো। আমার নামের সাথে তো মিলে নি।
নিকের কঠিন কন্ঠস্বর,
” মিলার প্রয়োজন নেই।
এনি চোখ ছোট ছোট করে বলে,

” আশ্চর্য পেটে রাখলাম আমি , জন্ম দিয়েছি আমি আর আমাকে বাদ দিয়ে দিচ্ছেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে হাসলো। ছেলেকে এনির বুকের সাথে মিশিয়ে দিয়ে বলে,
” আমি রাখতে দিয়েছি বলে রাখতে পেরেছো। নাম পছন্দ হয় নি?
নিকের কথায় থতমত খেয়ে যায় এনি। তার উপর সাহায্য করতে গিয়ে এনিকে নাস্তানাবুদ বানিয়ে দিচ্ছে। নিকের হাতের স্পর্শে এনি চোখ খিঁচে নেয় বার বার। চোখে চোখ রেখে বলে,
” একটু বেশি পছন্দ হয়েছে। কিভাবে জানলেন দুইজন মেয়ে হবে?
” দরকার ছিলো আমার জীবনে দুইটা মেয়ের। অনুমান করেছি আর হয়ে গিয়েছে।
” আপনি তো নারী জাতিকে ঘৃনা করেন। তবে চাইলেন কেনো মেয়ে?
” একজন আমার মায়ের অভাব পুরন করতে পারত না। খুব তৃষ্ণার্ত আমি জান। তাই দুইজনকে চেয়েছি। নারী জাতিকে ঘৃনা করি অথচ আজ তিন জন নারী আমার জীবনের সাথে বাজেভাবে জড়িয়ে গেলো।
এনি ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” দুইজন ব্যাতীত আরেকজন কে?
নিকের শান্ত আর দূঢ় গলা,

” তুমি।
লজ্জাবতী পাতার মত লজ্জায় নুইয়ে যায় রমণীর মুখ। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
” ছেলের নাম কি রাখবেন?
নিক শান্ত গলায় বলে,
” তুমি রেখে দাও।
” এরিক! আমার সাথে মিলিয়ে রাখলাম। একজন তো থাকুক আমার দলের। একটা জিনিস চাই দিবেন আমাকে?
” আমাকে ছেড়ে যাওয়া ছাড়া যা চাইবে তাই দিব।
এনি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন চুপ থাকে। বন্ধ করে রাখা নিশ্বাসটা ছেড়ে বলে,
” সংসার চাই আমার। আর পাঁচজন সাধারন নারীর মত একটা পরিবার চাই। যেখানে যুদ্ধ, রক্তের লড়াই থাকবে না। থাকবে না জন্ম মৃত্যুর যুদ্ধ। যেখানে চার দেয়ালের ভেতরে সারাজীবন বন্ধী থাকতে হবে না। একটা সংসার দিবেন আমাকে? সংসার করবেন?
নিক কোনো উত্তর করলো না। একদম গম্ভীর হয়ে উঠে তার মুখ। নিকের চেহারা দেখে এনি হতাশার নিশ্বাস ফেলে। অনেক কিছু জানার বাকি তার। অনেক কিছু!

নিক শক্তভাবে কামড়ে ধরে নিজের ঠোঁট। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। নাক দিয়ে অতিরিক্ত ব্লিডিং এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে আসছে তার। চোখ-মুখ ঝাপসা হয়ে আসছে। নিক দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখন জ্ঞান হারিয়ে ফেললে যে কোনো সময় হসপিটালের উপর আ্যটাক চলে আসবে। নিককে এমন এলোমেলো শ্বাস ফেলতে দেখে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” আর ইউ অলরাইট মি, নিক?
নিক মাথা নাড়িয় হ্যা জানালো। এনি চিন্তিত হয়ে তাকায়। নিকের -চোখ-মুখ একদম ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

মাফিয়া সাম্রাজ্যের প্রতিটি অলিগলিতে এখন দাবানলের মতো এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে—নিক আজ পিতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন। এই সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় পুরো আন্ডারগ্রাউন্ড জগৎ যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
​একদিকে অনুগত অনুসারীরা তাদের নেতার এই নতুন উত্তরসূরির আগমনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উৎসবে মেতেছে; তাদের চোখে এটি এক নতুন আধিপত্যের সূচনা। অন্যদিকে, নিকের অগণিত শত্রু এই সংবাদে ঈর্ষায় নীল হয়ে উঠেছে—নিকের এই পরম সুখ আর পূর্ণতা যেন তাদের বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে, যা তারা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। আরিশ আর অধিরাজ পুরো সম্রাজ্যকে মিষ্টি মুখ করায়। আরিশ ইচ্ছে করে কায়াতের কাছে যায়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
” শুনলাম তোমার ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক হয়েছে?
কায়াত রক্তলাল চোখে তাকায়। দাঁত পিষে বলে,
” নাটক করছিস আমার সাথে? কায়াত এত বোকা? নিক ছাড়া এই কাজ কেউ করতে পারবে না। ওই শুয়রের বাচ্চা করেছে সব।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হেসে কায়াতের কলার ঠিক করে দিয়ে বলে,

” শত্রুতা করার আগে শত্রু সম্পর্কে জেনে আসবি। নিজের থেকে শক্তিশালী কারোর সাথে লাগতে আসলে এর ফল একটু বেশিই খারাপ হয়। তকে একবারে কেনো মারছে না বল তো? কারন তকে তিলে তিলে মারা হবে। একদম নিস্ব আর ক্ষমতাহীন করে।
কায়াত চোয়াল পিষে রাগটাকে সংযত করে। আরিশ খুঁচা মেরে বলে,
” আশ্চর্য কায়াত! তুই এমন সাপের মত ফুঁসফুঁস করছিস কেনো? মনে হচ্ছে খুব হার্নি হয়ে আছিস? দুষ্টু ছেলে! যেখানে -সেখানে হার্নি হয়ে যায়। এত উত্তেজিত হয়ে পড়িস। এরপরও একটা ফসল ফলাতে পারলি না। একটা ছেলে মনে হয় আছে তর। আর নিকের দিকে তাকিয়ে দেখ। শালা একবারেই ছক্কা মেরে দিয়েছে। বুঝতে পারছিস একবারে তিনটা বাচ্চার বাবা হয়েছে। আরে মিষ্টি খা বেশি বেশি করে। আজ বাপ তর শত্রু কাল ছেলে তর বন্ধু ও হতে পারে।
আরিশের ঠাট্টায় কায়াতের শরীর জ্বলে উঠছে। ফোনের মেসেজ পেয়ে বাঁকা হেসে এখান থেকে প্রস্থান করে। কায়াতের হাসি দেখে আরিশ কপাল কুচকায়।
সুইমিংপুলের টলটলে নীল জলের কিনারে একাকী দণ্ডায়মান কায়াত। তাঁর চারপাশে পাথরের মূর্তির মতো অতন্দ্র পাহারায় নিয়োজিত অসংখ্য সশস্ত্র দেহরক্ষী। এটি তাঁর নিজস্ব অভয়ারণ্য, এক দুর্ভেদ্য আস্তানা। যেখানে বাতাসের গুঞ্জনও তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না।

​জলের শান্ত স্বভাবের বিপরীতে কায়াতের চোখ-মুখ কঠিন। এই নিস্তব্ধতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল সাম্রাজ্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।
বার বার মনে হচ্ছে নিক বাবা হয়েছে। কায়াতের চোখ- মুখে হিংসা আর হিংস্রতা ফুটে উঠে। তার লোক একজনকে ধরে আনে। হাত- পা বাঁধা তার। কায়াত বাঁকা হেসে তার সামনে বসে। নিষ্ঠুর চোখের চাহনি তার। একটা মেয়ে গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে দিকে কায়াত সেটা পান করে গলা ভিজিয়ে নেয়। রহস্যময় হেসে বলে,
” তর এই অপেক্ষা করছিলাম।
ভোক্তভোগী ভয়ে কাঁপছে। ফর্সা চোখ-মুখ একদম রক্তিম হয়ে আছে আতঙ্কে। কায়াতের পায়ের কাছে এসে আছড়ে পড়ে,
” কি অপরাধ করেছি আমি? আমার মা ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ নেই। আমার বৃদ্ধ মা-কে ছেড়ে দাও। প্লিজ প্রান ভিক্ষে দাও আমার মায়ের।
কায়াত ঠোঁট চেপে ধরলে নিজের। ছেলেটার মাথার চুল চেপে ধরে মুখটা উচু করে জিজ্ঞাসা বলে,

” মাকে সুস্থ চাই?
ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
” আমার মাকে একদম সুস্থ চাই।
কায়াত বিকৃতভাবে হেসে বলে ,
” কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয় ইয়াং ম্যান। আমার বাড়িতে কেউ প্রবেশ করলে সহজে বেঁচে ফিরে না। কিন্তু এই প্রথম নিয়ম ভেঙ্গে তর মাকে জীবিত পাঠাব তার বাসভবনে। কিন্তু…
কায়াতের কন্ঠ থেমে যায়। ছেলেটা অধৈর্য হয়ে বলে,
” কিন্তু কি স্যার?
কায়াত ওয়াইনের গ্লাস নাড়িয়ে বলে,
” আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। তবে এই তর মাকে সুস্থ পাবি। নয়ত….
আৎকে উঠে সন্তানের মন। আকুতি ভরা গলায় বলে,
” সব করব। যা বলবে তাই করব। শুধু বলো আমাকে কি করতে হবে?
কায়াত রহস্যময়ভাবে হেসে বলে,

” গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের তিন সন্তানকে কিডন্যাপ করতে হবে। তিন জনকে না পারলে একজনকে অন্তত করতে হবে। ওই কুত্তার বাচ্চার একটা প্রানকে আমার নিকটে নিয়ে আসতে হবে। আমি তাদের ধ্বংস দেখতে চাই।
ছেলেটা পাগলের মত তাকায়। এইটা কাজ নাকি জ্বলন্ত আগুনের ভেতরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা বলছে? যেখানে গ্যাংস্টার বসের চোখে তাকিয়ে কেউ কথা বলতে পারে না সেখানে তার সন্তানের দিকে হাত বাড়াব কিভাবে? যদি ভুলেও অনুমান করতে পারে তবে সেই নরক যন্ত্রনার ভয়াভহ মৃত্যু নিশ্চিত। একটা জিনিস ভেবে তাচ্ছিল্য ভাব প্রকাশ করে। যেখানে নিক জেভরানের স্ত্রীর শরীরে কেউ ফুলের টুকা দিতে পারে নি আজ পর্যন্ত সেখানে তার সন্তানের কাছে পৌঁছানোর কথা ভাবছে। কি সাঙ্ঘাতিক চিন্তা- ধারা তাদের। ছেলেটার গলা শুকিয়ে আসে। আতঙ্কে শরীর শিরশির করে উঠে। সহ্য করতে পারছে না এই অসহ্যনীয় বাস্তবতা। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে কায়াতের পায়ের কাছে।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৭

কায়াত রাগে কয়েকটা অশালীন বিশ্রি গালি দেয়। দুইজন লোক ছুটে আসে ছেলেটাকে মেরে ফেলার জন্য। কায়াত হাত দিয়ে হাটকে দিয়ে রহস্যময় হেসে বলে,
” মারিস না কেউ। এই ছেলে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। একমাত্র সে-ই পারবে আমার সপ্ন পূরন করতে। আর ওই কুত্তার বাচ্চার সন্তানদের ও বাহিরে বের করতে সাহায্য করবে।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৯