লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৬
লিজা মনি
চারিদিকে কেমন নিশ্ছিদ্র ও শুনশান নীরবতা। সেই বিশাল হাসপাতাল ভবনের প্রবেশদ্বারের সম্মুখে এসে আকস্মিক ব্রেক কষে গাড়িটি থেমে যায়৷ চালকের আসনে উপবিষ্ট নাজলী৷ দুই হাত দিয়ে স্টিয়ারিং হুইলটিকে তীব্র আক্রোশে ও শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরে আছে। আপাত শান্ত অবয়বের নিচে বুকের গহীনে বয়ে চলেছে এক অশান্ত, প্রলয়ঙ্করী ঝড়। চারপাশের চেনা পৃথিবীটাকে আজ বড্ড বিষাক্ত আর অসহনীয় মনে হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরে পা রাখার ন্যূনতম সাহসটুকুও নিজের ভেতর সঞ্চয় করতে পারছে না। ফুসফুস চিরে আসা তীব্র দীর্ঘশ্বাসটি ঠোঁট গোল করে, ফুঁশ করে বাতাস বের করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রশমিত করার বৃথা চেষ্টা করে।
রিদ্ধিমার রিদ্ধিমা ছলছল চোখে তাকায় ভবনের দিকে৷ অন্তরে প্রবহমান ঝড়ের তীব্রতা ছিল পরিমাপহীন, মাত্রাতীত। এই মানসিক রক্তক্ষরণ অনুধাবন করার ক্ষমতা জগতের কারো নেই। নাজলীকে ওভাবে জড়সড় ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে রিদ্ধিমা অত্যন্ত অস্ফুট স্বরে শুধাল—
”আপু, যাবে না?”
নাজলী শূন্য দৃষ্টিতে রিদ্ধিমার দিকে তাকায়। শুকিয়ে আসা ঠোঁটদুটো জিব দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
”সাহস পাচ্ছি না রিদ্ধিমা। ওই ধ্বংসাত্মক, ক্ষয়ে যাওয়া শরীরটা দেখার মতো মানসিক শক্তি আজ আমার নেই। আমার আজন্মলালিত সব সাহসিকতা আজ কোথায় যেন বিলীন হয়ে গিয়েছে। মানুষটা যে আমার বড্ড কাছের, বড্ড প্রিয় একজন ছিল!”
রিদ্ধিমা আকস্মিক মুখে হাত দিয়ে হু – হু করে কেঁদে উঠে। কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। নাজলী নিষ্পলক চোখে তাকায় রমণীর দিকে। ভাগ্যের হিসেব মেলাতে পারছে না সে৷ ভালোবাসার খেলায় চারটা জীবন চার দিকে! মেহের, রিদ্ধিমা, নাভিদ, এনি এই চারটা জীবন এমন হলো কেনো? ভাগ্যটা তো অন্যরকম হলেও হত৷ নাভিদ আর রিদ্ধিমার মিলন কি প্রকৃতির বাহিরে? রিদ্ধিমা কাঁদার জন্য নিশ্বাসটা পর্যন্ত নিতে পারছে না৷ নাজলী পানি এগিয়ে দিয়ে বলে,
” তুমি কিছু খেয়ে আসো নি রিদ্ধিমা?
রিদ্ধিমা পানিটা কোনোরকম গিলে বলে,
” খাবারটা যে গলা দিয়ে নামতে চাই না আপু৷
নাজলী চোখের পানি মুছে গাড়ি থেকে নেমে যায়।
রিদ্ধিমা নেমে ভাঙ্গা গলায় বলে,
” উনি ঠিক হয়ে যাবে তো আপু? আমি আজীবন ভালোবাসাতে মুড়িয়ে রাখব। আমি হয়ত এনি নয় কিন্তু রিদ্ধিমা হয়ে ভালোবাসার খাঁদ রাখব না। তুমি তাকে বলে দিও শুধু একবারের জন্য যাতে আমার হাতটা ধরে৷ কথা দিচ্ছি কোনোদিন নিরাশ করব না।
নাজলী এই মুহূর্তে উত্তর দিতে পারলো না। ইথানের
ফোন পেয়ে রিদ্ধিমার হাত ধরে গন্তব্যে এগিয়ে যেতে থাকে৷ যত এগিয়ে যাচ্ছে তত বুকে ধুকধুকানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রনা যেন বুকটাকে ছিঁড়ে ফেলছে। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে উঠে রিদ্ধিমার৷ নাজলীর হাত চেপে ধরে আওড়ায়,
” আপু আমি মনে হয় হার্ট ছিদ্র হয়ে মারা যাব৷ ভেতরে এই কেমন ঘূর্নিঝড় চলছে৷ কিভাবে দেখব তাকে? সাহস পাচ্ছি না, আমাকে সাহস দাও আপু।
” মনকে শান্ত করো তুমি। প্রতিটা যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামার আগে মনের ভেতরে পাথরের প্রলেপ লাগাতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্র কখনো দুর্বলদের জন্য নয়।
রিদ্ধিমা কিছু বলার শব্দ খুঁজে পেলো না। সাত তালার মধ্যে একটা বড় সাইজের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। নাজলী গম্ভীর শ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়।
” ইথান!
পরিচিত রমণীর সমুধুর কন্ঠস্বর শুনে ঘুরে তাকায়। লাল চুলগুলো সুন্দর করে ছেড়ে রেখেছে। দবদবে ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে আছে। চোখ দুইটা কেমন ফোলা – ফোলা হয়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেকক্ষন কেঁদে চোখ-মুখের এই হাল করেছে। অনেকদিন পর নাজলীর এই মুখশ্রী দেখে ইথানের ইচ্ছে করলো দৃষ্টি না সরাতে৷ কেমন ঘোরে চলে যাচ্ছে সে। চোখ বন্ধ করে এক দম নিশ্বাস টানে। সামান্য হেসে বলে,
” কেমন আছো তুমি?
” ভালো! তুমি ?
ইথান প্রতিবারের মত হেসে উত্তর দেয়,
” তুমি খুশি থাকলে আমিও খুশি।
ইথানের দিকে কিছুক্ষণ ছোট – ছোট চোখ করে তাকিয়ে ফিঁক করে হেসে দেয়৷ নাজলীর হাসিতে ইথান ও হাসে৷ যখন স্কুলে পড়ত তখন অনেক কারনে নাজলী ডিস্ট্রাব হত৷ তখন ইথান এসে গল্প জুড়ে দিয়ে হাসাত। অবশেষে নাজলী ও হেসে অস্থির হয়ে পড়ত৷ ইথান সেই হাসিমাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে বলত,
” তুমি খুশি?
নাজলী হাসতে – হাসতে উত্তর দিত,
” অনেক খুশি। আর তুমি?
ইথান ও সমানে তাল মিলিয়ে বলত,
” তুমি খুশি থাকলে আমিও খুশি।
অতীতের স্মৃতি মনে হতেই নাজলীর মনটা বিষিয়ে উঠে৷ যুদ্ধ করে চললেও হাসি – ঠাট্টাতে জীবন পার করে দিত। আর এখন! এখন শুধু জন্ম – মৃত্যুর লড়াই, রক্ত, প্রতিহিংসা আরও কত কি!
পিলগ্রিম সাইকিয়াট্রিক সেন্টারের রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে নাভিদ এক জীবন্ত উপাখ্যান৷ যার প্রতিটি প্রহর কাটে চরম উন্মত্ততা আর অতলান্তিক হাহাকারের যুগলবন্দীতে।
দীর্ঘ সুপ্তির অবসান ঘটিয়ে যখনই তার নেত্রপল্লব জাগ্রত হয় তখনই কেমন অবাধ্য উন্মাদনায় সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করে নেয়। পরক্ষণেই সেই উন্মত্ততা রূপ নেয় এক বিজাতীয় অট্টহাসিতে৷ এতে কক্ষের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনি হতে থাকে।কিন্তু সেই হাসির স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী।পলক ফেলতেই তা রূপান্তরিত হয় বুকফাটা আর্তনাদে। অশ্রুধারার তীব্রতায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। অদৃশ্য এক মহাজাগতিক যন্ত্রণার পাষাণভার তার বক্ষপিঞ্জরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। সুখ আর শোকের এই আকস্মিক ও দ্রুতিময় বৈপরীত্য উপস্থিত চিকিৎসকদেরও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলছে। এতটা উন্মাদ রোগীকে সামলাতে তারাও হিমশিম খাচ্ছে।
এই রুক্ষ আর বিষাদময় বাস্তবতার মাঝেও নাভিদের অস্তিত্বের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে একটি মাঝারি আকৃতির ইস্পাত-নির্মিত বক্স। দেখতে সোনালি রং! একদা যা দীপ্তিময় সুবর্ণ আভায় উজ্জ্বল থাকলেও কালের করাল গ্রাসে আজ তা বিবর্ণ ও মলিন। এই বক্সটি কেবল নাভিদের কাছে কোনো জড় বস্তু নয় বরং এটি তার অবচেতনের একমাত্র অবশিষ্টাংশ। যার দিকে কেউ অগ্রসর হলে নাভিদের ভেতরের আদিম শ্বাপদটি জেগে ওঠে । তার দৃষ্টিতে তীব্র হিংস্রতা ও আত্মরক্ষার চরম আকুলতা ফুটে ওঠে। ফলে কাউকে সে এই রহস্যময় আধার স্পর্শ করতে দেয় না।
এমনকি যখন সে গভীর সুপ্তিতে আচ্ছন্ন থাকে। তখনও সেই দুর্ভেদ্য সিন্দুকটি উন্মোচন করা অসম্ভব। বক্সের পাসওয়ার্ড কারোর জানা নেই।
নাজলী আর রিদ্ধিমা যখন অত্যন্ত সন্তর্পণে সেই রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে পদার্পণ করে। শয্যার ওপর শায়িত সেই নিস্তেজ, নিশ্চল অবয়বটি দেখা মাত্রই উভয়ের সমগ্ৰ দেহে তীব্র বৈদ্যুতিক অভিঘাত হয়৷ দৃশ্যটির আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে রিদ্ধিমা আপন করপল্লবে মুখাবয়ব আবৃত করে বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। অবচেতনেই মন চিৎকার করে উঠল—এ তো সেই নাভিদ নয়, যাকে সে প্রথম দর্শনে চিনেছিল!
কোথায় হারিয়ে গেল সেই অমিত তেজস্বী, বলিষ্ঠ গড়নের গৌরবর্ণ পুরুষ, যার আননে সর্বদা এক গম্ভীর ও রাজকীয় গাম্ভীর্য বিরাজ করত? তার পরিবর্তে আজ শয্যাশায়ী এই কঙ্কালসার, শীর্ণকায় ব্যক্তিটি আসলে কে? যার অবয়বে আজ আর কোনো গাম্ভীর্যের লেশমাত্র নেই, বরং সেখানে কেবলই উথলে উঠছে এক অতলান্তিক বিষাদ আর অসহ্য যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। তার সর্বাঙ্গে নিষ্ঠুর প্রহারের অসংখ্য কৃষ্ণবর্ণ ক্ষতচিহ্ন; অযত্নে বর্ধিত দাড়িগুলো মুখমণ্ডলকে গ্রাস করেছে। অবিন্যস্ত, রুক্ষ কেশগুচ্ছ মস্তকজুড়ে এক বীভৎস বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। সমগ্র জীর্ণ শরীরকে লৌহ-শিকলের নির্মম বন্ধনে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়েছে।
হৃদয়ের এই চূর্ণ-বিচূর্ণ রূপ দেখে রিদ্ধিমা আর কোনো নিয়মের বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে পারল না। সমস্ত জড়তা আর যৌক্তিকতা বিসর্জন দিয়ে সে আছড়ে পড়ল নাভিদের সেই ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত বক্ষপঞ্জরের ওপর। খামছে ধরে নাভিদের পেটের অংশ। নাভিদ গভীর ঘুমের অতলে। রিদ্ধিমার এক – একটা চিৎকার বুক চীঁরে আসছে। রিদ্ধিমাকে এমন কাঁদতে দেখে ইথান অবাক হয় অনেক। নাজলীর দিকে তাকিয়ে বলে,
” ও কে?
নাজলী চোখের পানি সাবধানে মুছে বলে,
” বোন হয়।
” তোমার বোন?
” হু।
” নাভিদকে চিনে কিভাবে?
” ভালোবাসে।
ইথান হতভম্ভ হয়ে যায়,
” হুয়াট! কিন্তু আমরা তো এনির কথা জানি৷ আমরা জানি এনি পরিস্থিতির স্বীকারে আজ অন্যের দখলে। কিন্তু ওর চাপ্টার কোনটা?
নাজলী ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” ওর নাম রিদ্ধিমা। আর সে গ্যাংস্টার বসের একমাত্র বোন ইথান। তার রক্ত! এই মেয়েটা নাভিদকে ভালোবাসে। আর নাভিদ ভালোবাসে এনিকে। হিসেব মেলাতে পারছো?
ইথান ছোট – ছোট চোখ করে তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। কাঁদতে – কাঁদতে মেয়েটা নাভিদের পেটের উপর ল্যাপ্টে আছে। ইথান নখ কামড়ে বলে,
” ইটস সো ইন্টারেস্টিং! টুডে, হিজ লাভ ফর হিজ সিস্টার-ইন-ল ইজ অন দ্য ভার্জ অব আল্টিমেট ডেসট্রাকশন।”
নাজলী কৃত্রিম হাসলো। নাভিদের দিকে এগিয়ে যেতে- যেতে বলে,
” জ্ঞান ফিরবে কখন?
” পাগলামি দেখতে চাও? জ্ঞান ফিরলে বিশ্রি অবস্থা হয়ে যায়।
” বেশি উন্মাদনা করে?
” প্রচুর উন্মাদের মত আচরন করে৷ একমাত্র আমাকে ভয় পায়। যদি বলি তার বুকে তার পাখিকে এনে দিব তখন একদম শান্ত। জানো এইতো এনিকে পাখি ডাকত!
নাজলী ফুঁশ করে শ্বাস টেনে নাভিদের ঘুমন্ত মুখে হাত বুলায়। চোখ থেকে টপ-টপ করে পানি পড়ছে।
” তার অট্টালিকা আর বানিজ্য কে সামলাচ্ছে?
” তার সেই পালিত পিতা৷ মেহমেদ আজওয়ার! পালিত ছেলে তবুও ছেলের চিন্তায় বেচারা মরতে বসেছে। এসে তোমার খুঁজ করেছিলো অনেক৷ কিন্তু তোমার খোঁজ আমি নিজেই পায় নি তাকে কি দিব? তুমি হুটহাট কোথায় উধাও হয়ে যাও?
” নিজের গন্তব্যেই তো আছি৷ তুমি কখনো জানতে চাও নি আমার ঠিকানা তাই আমিও বলিনি।
ইথান মাথা চুলকে বলে,
” নাভিদকে নিয়ে চিন্তাই ছিলাম তাই জানার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আজ যাওয়ার সময় নাম্বারটা দিয়ে যেও।
নাজলী সম্মতি জানিয়ে পাশে তাকায়। সোনালি চাকচিক্য বক্সটা দেখে অবাক হয় প্রচুর। এই বক্স এখানে কি করছে? নাজলী চট করে তাকায় ইথানের দিকে,
” এই বক্স এখানে কেনো?
ইথান কাঁধ নাড়িয়ে বলে,
” সে নিজেই নিয়ে এসেছে। কাউকে স্পর্শ করতে দেয় না। তুমি চিনো এই বক্সটাকে?
নজলী শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” এখানে লক্ষ খানা চিঠি আছে৷ আর প্রতিটা পাতার মধ্যে আছে এনির নাম। এনির প্রতি ভালোবাসার প্রতিটা লাইন, প্রতিটা অনুভুতি! আমাকেও কখনো ধরতে দেয় না বা জানায় নি৷ একদিন নেশার ঘোরে বলেছিলো। সেই থেকে চেনা এইটাকে?
ইথান ক্ষোভে দাঁত কটমট করতে থাকে। অস্থির গলায় বলে,
” আই সয়ার নাজলী, তোমার বোনকে হাতের কছে পেলে খুন করতাম। আই অ্যাম সরি ফর সেয়িং দিস বাট এমন স্বার্থপর মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। নিজের অতীত কিভাবে ভুলে গেলো তোমার বোন? যখন তার পাশে কেউ ছিলো না, দুনিয়াটা অন্ধকার ছিলো তখন এই ব্যক্তিটা তাকে ছায়ার মত আগলে রেখেছিলো। মিথ্যে বলবে না নাজলী, নাভিদের ভালোবাসার কথা এনি নিজেও জানত৷ আরে ভাই, মানুষ এতটা স্বার্থপর কিভাবে হতে পারে? নাভিদের সেই ভয়ানক অতীতটাকে পায়ে পিঁষে এসেছিলো শুধুমাত্র তাকে পাওয়ার আশায়। কি করে নি মেয়েটার জন্য? আর আজ যার হাতে কিডন্যাপ হয়েছে, দুনিয়ার সামনে রক্ষিতা হয়েছে তার সন্তানের মা হতে বিবেকে বাঁধে নি? এইটা নাটক বা সিনেমা নয় যে কেউ আমাকে অত্যাচার করলো আর তাকে ভালোবেসে ফেললাম। এইটা বাস্তব জীবন নাজলী। এত কষ্ট দিলো, যন্ত্রনা দিলো, অপবাদ ল্যাপ্টে দিয়েছিলো সেই নিকের শোকে সে কিভাবে ম্যান্টালি সিক হতে পারে নাজলী? কিভাবে একটা সাইকোপ্যাথকে ভালোবাসার মত ভুল করলো? সরি নাজলী বাট বলতে বাধ্য হচ্ছি এনি নিজেও মেন্টালি সিক! নয়ত কোনো সুস্থ মেয়ে নিককে ভালোবাসার মত ভুল করবে না।
নাজলীর রাগ আর কষ্ট দুটোই হচ্ছে৷ একদিকে কথা গুলো সত্য মনে হচ্ছে আবার অন্যদিকে সব মিথ্যে লাগছে। ইথানের দিকে তাকিয়ে বলে,
” ও স্বার্থপর নয় ইথান। আমার কাছে সব সময় নাভিদের কথা জানতে আসে। নিক এনির জীবনে আসার আগে নভিদ সম্পর্কে এনি কিচ্ছু জানত না৷ নাভিদ কোনোদিন এনিকে বলেনি সে ভালোবাসে৷ এমনকি এনি যখন নিককে তীব্র ঘৃন করত তখন কেনো বলে দিলো না সব? নিক ব্লেকমেইল করেছে, যদি নাভিদ এনির জন্য পাগলামো করে তবে এনিকে সব জানিয়ে দিবে৷ অতীত জেনে এনি ঘৃনা করবে সেই ভয়ে আর নিকের সামনেই যায় নি৷ আর এই সময়টাতেই নিক এনির কাছে এসেছে৷ নাভিদের সম্পর্কে আমি নিজেও জানতাম না এতসব রহস্য! তার থেকে ও বড় কথা নাভিদের একমাত্র ভাই জেডকে এনি নিজ হাতে মেরেছে। এইটাও নাভিদ জানে না। তবে এনি ম্যান্টালি সিক অস্বীকার করব না।ইউ মাইট বি সারপ্রাইজড টু হিয়ার দিস, বাট… এনি চার বছর ধরে বাহিরের জগতে যায় না৷ একটা আইল্যান্ড, সেখানে থাকা লাল – কালোতে ঘেরা এক রক্তাক্ত গ্লাস মিনার, বিশাল আকৃতির একটা রুম! আর সেখানেই তার বসবাস। চার বছর ধরে এই একটা রুমেই জীবন পার করছে৷ দুই – একবার বের হয়েছিলো তাও প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য। চারিদিন বা চার মাস নয়। চারটা বছর ধরে রুম বন্ধী জীবন পার করছে যা অন্যের জন্য নরকের মত।
ইথানের মুখ থেকে রক্ত সরে যায়। অবাক হয়ে বলে,
” ক.. কেনো?
রিদ্ধিমা ঠোঁট কামড়ে হাসলো,
” নিক! নিক কখনো বের হতে দেয় নি। সবসময় আটকে রেখেছে। প্রকৃতি, মানুষ, সব থেকে দুরে রেখেছে। এনি বলে জেলাসি, হাহহ! একই স্বভাবে পরিনত হয়েছে কি- না। আমি বলি বিকৃত চিন্তাধারা! প্রকৃতিকে হিংসে করা কোনো মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কের হতে পারে না। এখন যদি কিছুটা স্বাভাবিক হয়৷
ইথান কপাল চেপে ধরে শক্ত ভাবে। জীবনে কত সাইকোলজিক্যাল মুভি দেখেছে, সাইকোপ্যাথ নিয়ে গবেষণা করেছে। বর্তমানে দাঁড়িয়ে স্ব – চোখে দেখতে পাবে কে জানত! মাথা যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে তার। কপাল চেপে ধরে একটা চেয়ারে বসে৷ রিদ্ধিমা জগতের সব কিছু ভুলে নাভিদের বুকেই চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। একটু পর পর ফুঁপানো শব্দ গুলো দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। নাভিদ নড়ে – চড়ে উঠে সামান্য। শিকলের ঝনঝন শব্দ হতে থাকে৷ রিদ্ধিমা বুক থেকে মাথা তুলে তাকায় সুদর্শন পুরুষের দিকে। যার চেহারা আজ চেনা মুশকিল! নাজলী ভয়ে ডাক দেয়,
” নাভিদ শুনতে পাচ্ছো? নাভিদ, ক্যান ইউ হিয়ার মি?
নাভিদের চোখের পাপড়ি নড়ে-চড়ে উঠে৷ রিদ্ধিমা গালে হাত দিয়ে কাঁদতে -কাঁদতে বলে,
” নাভিদ উঠো না প্লিজ? সেই ঝড়ের রাতে যেভাবে তোমাকে বাঁচিয়েছিলাম৷ আজও এই ঝড়ে তোমাকে বাঁচিয়ে তুলব। প্লিজ স্পিক আপ অ্যান্ড রেসপন্ড, গেট টু নো মি আ বিট।
রিদ্ধিমার চোখের পানিতে নাভিদের মুখ ভিজে যাচ্ছে। চট করে নাভিদ চোখ খুলে তাকায়। চোখের সামনে কোনো মেয়েকে দেখে গর্জে উঠে। রিদ্ধিমা ভয়ে পিছিয়ে যায় খানিকটা। নাভিদের এমন আক্রমনাত্মক রুপ দেখে শুকনো ঢোক গিলে। নাভিদ চারপাশে থাকিয়ে কেমন বেঁফাশ শব্দ করতে থাকে। নাজলী ভয় পায় না নাভিদের এই আচরনে । খুব শান্তভাবে গিয়ে বসে নাভিদের সামনে। হেসে বলে,
” তোমার পাখিকে তোমার বুকে ফিরিয়ে দিব৷ শান্ত হও!
নাভিদ ছলছল চোখে তাকায় নাজলীর দিকে। মুখ থেকে বের করা গর্জন বন্ধ করে দেয়৷ এই চোখটাতে কত ব্যাথা, কত হাহাকার মিশে আছে৷ নাজলীর বুকটা ছটফট করে উঠে। নাজলী ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” তোমার পাখিটা কে নাভিদ? সে কি আকাশে উড়ে?
নাভিদ বাচ্চাদের মত হাসলো কিছুটা। মাথা নাড়িয়ে বলে,
” সে সমুদ্রে থাকে। সমুদ্রের পানির মত তার নীল চোখ৷ সোনালী কেশ আর…. আর…..
নাভিদ থেমে যায়। অবুঝের মত তাকিয়ে বলে,
” তার আর কি আছে? আর কি আছে বলো?
নাজলী এইবার কেঁদেই দেয়। ডুকরে কেঁদে উঠে খানিকটা।
” সে কি সমুদ্রে থাকে?
” আমার মনে থাকে সে৷ বুকে অনেক যন্ত্রনা আমার৷ আমার যন্ত্রনায় পাখিটার কষ্ট হবে। তাই ওই খানে রেখে দিয়েছি আপাতত !
চোখ দিয়ে ইশারা করে দেখায় সোনালি বক্সটার দিকে। নাজলী সহ বাকি সবাই তাকায় সেদিকে৷ নাজলী ঠোঁট চেপে কান্না আটকিয়ে বলে,
” আমাকে চিনতে পারছো? আমাকে মনে পড়ে?
নাভিদ অবুঝের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ইথানের দিকে তাকিয়ে নাজলীর উদ্দেশ্যে বলে,
” এ কে?
নাজলী থমকে যায়। তাকে চিনতে পারছে না! শুকনো ঢোক গিলে ইথানের দিকে তাকায়। ইথান ভাষা বুঝতে পেরে বলে,
” ওর মস্তিষ্ক পুরোটা কন্ট্রোলের বাহিরে। কাউকেই চিনতে পারছে না৷ শরীরের আঘাত গুলো দেখো। নিজেকে নিজেই এত আঘাত করেছে। তাই না পেরে শেকলে বাঁধতে হয়েছে। মেডিসিনের প্রভাব শরীরে এখনও আছে। তাই অস্বাভাবিকের মধ্যেও স্বাভাবিক আচরন করছে। আবার ঘুমিয়ে পড়বে মিনিটের মধ্যে।
ইথানের কথাটা এই সত্যি হলো। নাভিদের চোখ ধীরে – ধীরে বুঝে আসছে৷ রিদ্ধিমা উঠে অধৈর্য হয়ে সেদিকে যায়,
” একটা বার আমার সাথে কথা বলুন প্লিজ! একটা বার কথা বলুন না৷ এত ধেমাক কেনো দেখাচ্ছেন আমকে? ভালোবাসি বলে এত অবহেলা করছেন? আপনি তো বুঝেন নাভিদ ভালোবাসার মানুষটা মুখ ফিরিয়ে নিলে কতটা কষ্ট লাগে। সব জেনেও কেনো আমাকে এইভাবে কষ্ট দিচ্ছেন? যন্ত্রনা হয় তো অনেক৷ বুঝেন না কেনো?
একটু ভালোবাসা ভিক্ষে দেন না!
নাভিদের চোখ বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। রিদ্ধিমার কান্না থামছে না কিছুতেই৷ নাজলী বুকে আগলে নিয়ে বলে,
” শান্ত হও! একটু আগে কি বুঝিয়েছি? দুর্বলরা কখনো যুদ্ধে জিততে পারে না।
নিক, অধিরাজ আর আরিশ মিনারে পৌঁছেছে প্রায় রাত দশটার দিকে। তিনজন এই ডিভানে এসে শরীর এলিয়ে দেয়। অধিরাজের হাতে ছুঁরিঘাত লেগেছে। শত্রুকে ধরতে গিয়েই আচমকা কেউ চলন্ত গাড়ির মধ্যে ছুঁরি দিয়ে আঘাত করে বসে। কিন্তু মেইন কালপ্রিট ইতালি গিয়ে বসে আছে। একে ধরতে এখন আবার ইতালি যেতে হবে। আরিশ অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাড়ি যাবি আজ?
অধিরাজ গম্ভীর গলায় বলে,
” এখন বাড়িরে গেলে তানভী কারন ছাড়াই কাঁদবে। রক্ত পড়া বন্ধ হোক। এখন যাওয়া সম্ভব নয়।
আরিশ শ্বাস টেনে উপরের দিকে তাকায়। রুমে যাওয়া প্রয়োজন তার। শেষ রাতে আবার ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে৷ নিককে বসে থাকতে দেখে আড়চোখে তাকিয়ে বলে,
” যে ছেলে মিনারে এসে এক সেকেন্ড অপেক্ষা করে না রুমে যাওয়াতে৷ সে আজ এখানে বসে আছে ব্যাপার কি?
নিক গম্ভীর হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনে এনির ত্রিশটা মিসডকল! অথচ সে একটাও রিসিভ করতে পারে নি৷ ফোন সাইলেন্ট ছিলো আওয়াজ কানে আসে নি । নিক শরীরের অভার কোর্টটা খুলে অন্য পাশে ছুঁরে মারে।কপালে সূঁক্ষ্ণ ভাঁজ দেখা দিচ্ছে!
আরিশ ঠাট্টা করে বলে,
” বস কি কোনোভাবে কিছু নিয়ে ভয় পাচ্ছেন?
নিক চোখ- মুখ শক্ত করে ধমক দেয়,
” যাস্ট সেট আপ ইডিয়েট! ভয় পেতে যাব কেনো আমি? আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট কখনো ভয় পায় না।
আরিশ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে,
” তো রুমে যা। এখানে বসে আছিস কেনো?
নিক ভ্রুঁ নাচালো,
” তরা নিজেরাও তো বসে আছিস?
” আমরা প্রায় সময় এই বসে থাকি। কিন্ত বস আপনি বিয়ে করার পর একদিনের জন্য ও এখানে বসেন নি।
নিক দাঁত কটমট করে তাকালো আরিশের দিকে৷ আরিশ হেসে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। নিক গম্ভীর হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজাতে পাসওয়ার্ড প্রয়োগ করে। কিন্ত পাসওয়ার্ড ভুল দেখাচ্ছে। পাসওয়ার্ড চেইঞ্জ করার সাহস দেখালো কে? এনি!
নিক কপাল ঘেঁষে দরজায় অনেকবার ধাক্কা দেয়। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। নিক রাগে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। চিন্তায় মাথার রগ ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিক শব্দ করে কয়েকটা ডাক দিলো। কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই৷ রাগটাকে সামলাতে না পেরে দরজায় লাথি বসায় ৷ লাথিটা দেওয়ার সাথে সাথে ওপাশ থেকে এনির গলা ভেসে আসে,
” লাথিটা দরজার মধ্যে দিয়েছেন নাকি আমার শরীরের উপর?
এনির গলা শুনে শান্তির নিশ্বাস ফেলে। শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” আমি ফোনের রিংটন শুনতে পাই নি৷ গিভ মি আ চ্যান্স টু এক্সপ্লেইন। প্লিজ ওপেন দ্য ডোর, ব্লাডরোজ।
” আমি কে? আমার ফোন ধরার সময় পাবেন কিভাবে? এতটাও গুরুত্বপূর্ণ নয় আমি।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে,
” মাইর খাবে তুমি ব্লাডরোজ! দরজা খুলো।
এনিও শক্ত গলায় উত্তর দেয়,
” পারব না দরজা খুলতে৷ অন্য রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। এত বড় অট্টালিকাতে তো আর একটা রুম না।
এনির এমন আচরনে নিক কি বলবে বুঝে আসে না। ছোট করে বলে,
” এরিক আর নীরকে দেখব। দরজা খুলো। আমি আমার বাচ্চাদের দেখব৷
এনি বাঘিনীর মত ক্ষেঁপে যায়,
” ওরা কে যে আপনাকে দেখতে হবে? সারাদিন তো বাচ্চাদের কথা মনে ছিলো না। নাকি ভুলে যান, বাচ্চার বাবা হয়েছেন।
নিক কপাল কুচকে বলে,
” তুমি হুট করে ঝগড়া করছো কেনো আমার সাথে? আর তোমার আওয়াজ এমন শুনাচ্ছে কেনো?
এনি চুপ হয়ে যায়। নিক কপালে হাত দিয়ে পিছনে তাকাতেই কপাল কুচকে ফেলে। আরিশ আর অধিরাজ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অধিরাজ ভয়ে না হাসলেও আরিশ হুট করেই হেসে উঠে,
” ভাই তুই বউয়ের সামনে বিড়াল জানতাম কিন্ত এতটা দুর্বল বিড়াল সেটা জানতাম না। তর বউ তকে রুমে ডুকতে দিচ্ছে না। আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট, যে আফ্রিকা, আমেরিকার মত দুই- দুইটা দেশে রাজত্ব করে তাকে ফোন রিসিভ না করার অপরাধে বউ রুমে জায়গা দিচ্ছে না। এর থেকে মারাত্নক সংবাদ আর কি হতে পারে?
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে আরুশের কলার চেপে ধরে। দাঁতে – দাঁত পিষে বলে,
” এই দরজা ভেঙে ভেতরে ডুকতে আমার বা হাতের কাজ। বেপোরোয়া আর হিংস্র রুপটা ওর সামনে আনতে চাচ্ছি না৷ মেয়েটা সহ্য করতে পারে না। নয়ত গ্যাংস্টার বস কাউকে ভয় পায় না স্টুপিড!
আরিশ আড়ালে হাসলো। কুয়োর ভেতরে ডুকে যাবে এরপর ও স্বীকার করবে না। নিক কলার ছেড়ে দিলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়৷ অধিরাজ দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
” বস দরজা ভাঙ্গার ব্যবস্থা করব?
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” নাহহ! বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে৷ এখন ওদের ঘুমানোর সময়। ভয় পাবে শব্দে!
অধিরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। ভেসে উঠে অতীতের কিছু মর্মান্তিক দৃশ্য। এই ব্যক্তিটা একদিন পাষানের মত কত – শত বাচ্চাকে পাচার করেছিলো৷ কত বাচ্চা কেঁদে আরজি জানিয়েছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু পৈশাচিক মনে তিল পরিমান গলে নি৷ নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রাইভেট জেট দিয়ে পাঠিয়ে দিত দেশ – বিদেশে। সেই হিংস্র পুরুষ ও যে কোনো বাচ্চাকে এতটা ভালোবাসবে একদিন কল্পনার ও বাহিরে ছিলো৷ এনিকে বিয়ে করার পর অবশ্য সব ধরনের মানব পাচার ছেড়ে দিয়েছে। এরপর থেকে আর নারী- শিশু কাউকেই পাচার করে নি৷ এমন পিশাচের ঘরেও সৃষ্টিকর্তা তিনিটা সন্তান দিয়েছে! একজনকে সমস্ত পাপের ধ্বংস হিসেবে তার কাছে কেড়ে নিয়েছে। বুঝিয়েছে সন্তান হারানোর বেদনা কাকে বলে? কেমন অনুভব হয় বুক থেকে সন্তানকে কেড়ে নিলে! অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে। সেও প্রতিটা পাপের অংশীদার। নিজেও হাত কব্জি পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখেছে পাপে। তাকেও কি এইভাবে অনুভব করাবে? বুক থেকে সন্তান কেড়ে নিবে?
অধিরাজ মাথা চেপে ধরে। এইসব ফালতু কল্পনা থেকে বাহির হয়ে আসতে চাচ্ছে। আরিশ, নিককে এমন শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,
” বউকে আদর করে ডাক দে। তাহলেই তো দরজা খুলে দেয়।
” আদরে – আদরে এমনিতেই বাদর বানিয়েছি৷ এখন আমার ঘাড়ে উঠে নাচছে৷ রুমে জায়গা দিচ্ছে না! আশ্চর্য হব নাকি রাগ করব নিজেই বুঝতে পারছি না।
নিক কথাগুলো ফিশফিশ করে বলে। মুখ ফুটে বলে,
” একটু পর দেখবি এমনিতেই দরজা খুলবে। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। ডকুমেন্টস গুলো রেডি কর৷ শেষ রাতের দিকে যেতে হবে।
আরিশ চোখ টিপে রুমের দিকে চলে যায়। অধিরাজ ও আর দাঁড়ায় না। যাওয়ার আগে বলে যায়,
” বস, বউ রুমে জায়গা না দিলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই৷ বিবাহিত পুরুষদের সাথে এমন ঘটনা অহরহ হয়। আমার সাথেও হয়েছে অনেকবার। অল দ্যা বেস্ট বস!
নিক ভ্রুঁ ভাঁজ করে নিশ্বাস ছাড়ে। লজ্জা পেয়েছে কে? রেলিং এ হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁযে দিয়ে শব্দহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাংস্টার বস। একটা শব্দ ও হচ্ছে না তার দিক থেকে। সে খুব ভালোভাবেই জানে এই মুহূর্তে এনি দরজা খুলবে। সেটাই হলো! পাঁচ মিনিটের ভেতরে এনি দরজাটা খুলে বাহিরে উঁকি দেয়। বাহিরের দৃশ্য দেখার আর সময় হয় নি তার। তার আগেই কেউ ঝড়ের গতিতে তাকে শূণ্যে ভাসিয়ে নিয়ে রুমে ডুকে পড়ে। এনি হকচকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে। নিক দরজা লাগাতে -লাগাতে হুঁশিয়ারি দেয়,
” তোমার চেঁচানোতে যদি আমার বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে তবে সোজা গলাটা চেপে ধরে মেরে ফেলব।
এনি রাগী গলায় বলে,
” রুমে ডুকেছেন কেনো? বের হন রুম থেকে!
নিকের ধ্যান অন্যদিকে। মনে হচ্ছিলো এনির শরীরের উষ্ণতায় তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। কোলে থাকা অবস্থায় নিক বিছানায় বসে পড়ে। ছটফট করতে থাকা এনিকে নিজের উড়ুর উপর বসিয়ে দিয়ে। গলায়- কপালে হাত ছুঁয়ে দেয়। অধৈর্য আর চিন্তিত হয়ে বলে,
” পুরো শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
” পুড়ুক। মনটা যেখানে পুড়ে যাচ্ছে তখন আর শরীর পুড়ে কি হবে?
এনির চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। এমনিতেই অতিরিক্ত ফর্সা হওয়ার ফলে সামান্য ঠান্ডা লাগলেই নাক ফুলে লাল হয়ে যায়। এখন তো তীব্র জ্বর! মনে হচ্ছে কেউ এসে কামড়ে দিয়েছে। নিক এনির নাকে চুমু খেয়ে বলে,
” মেডিসিন নিয়েছো?
এনি কোল থেকে নামার চেষ্টা করে বলে,
” প্রয়োজন নেই।
নিক গ্রিবাদেশ শক্ত করে ধমকায়,
” ত্যারামি করছো কেনো এইভাবে? জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে আর তুমি হেয়ালি করছো আমার সাথে? সাহস কিভাবে হয় ব্লাডরোজ আমার আমানত জিনিসকে কষ্ট দেওয়ার?
এনি ক্ষোভে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শক্ত গলায় রাগ দেখিয়ে বলে,
” আমি কারোর আমানত নই।
নিক শ্বাস টানলো ছোট করে। শীতল গলায় বলে,
” আমি ফোনের রিংটন শুনতে পাই নি। অধিরাজের মোবাইলে একটা ফোন দিতে পারতে৷
এনি ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে,
” সারাদিনে একবার ফোনের রিংটন শুনতে পান নি? সারাদিন মারামারি আর রক্ত ঝড়ার নেশাতে ডুবে থাকলে বাড়ির বউয়ের কথা মনে থাকবে কিভাবে? আমি ও ফোনে কথা বলার জন্য মরে যাচ্ছিলাম না। আপনার কারনেই তো জ্বর এসেছে। আর একবার শুধু আসুন কাছে একদম মেরে ফেলব। যতবার কাছে আসে ততবার রোগী বানিয়ে ফেলে আমাকে৷ নির্লজ্জ, বিয়াদব লোক!.
নিক কেমন যেন পরাজিত সৈনিকের মত সব ঝাঁড়ি শুনে যাচ্ছে। এনির শেষ কথাতে ঠোঁট কামড়ে হাসে। এনির দিকে ঝুঁকে বলে,
” তবে এই অসুস্থতা আমার জন্য?
এনি চোখে চোখ রেখে রাগী ভাব নিয়ে বলে,
” নতুন নয় আজ৷ নেকড়ে একটা!
নিক মেডিসিন খুলে এনিকে খাইয়ে দিতে- দিতে বলে,
” আমার স্পর্শ মানেই পেইন বেবিগার্ল। মানতে শিখো! অনুভব করতে শিখো।
এনি বিরবির করে বলে,
” হ্যা, মরতে -মরতে একদিন টপকে যাবে।
নিকের চোখ-মুখের রিয়্যাকশন বদলে যায়। শক্ত হয়ে উঠে তার হস্ত৷ খামছে ধরে এনির পেট। চাপা গর্জন করে উঠে,
” কি বললি? আবার বল!
এনি ব্যাথায় নাক -মুখ খিঁচে ফেলে। নিকের হাত সরিয়ে দিতে – দিতে বলে,
” সবসময় এত ধমকান! বউয়ের জন্য মায়া হয় না আপনার?
এনি জ্বরে বেঘোরে বকবক করে যাচ্ছে। এনির কন্ঠ শুনে বুঝতে পারে রমণী এই জগতে নেই৷ নিক এনির মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে। মাথা টিপে দিতে থাকে। এনি চোখ বন্ধ করে বিরবির করে,
” আপনি অপরাধ করেছেন এরিকের পাপা। কতগুলো ফোন দিয়েছি আপনাকে৷ ফোন না ধরাতে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আপনার তো শত্রুর অভাব নেই। আপনার এই অপরাধ আমি কখনো ক্ষমা করব না
” ক্ষমা পাওয়ার জন্য কি করতে হবে?
” কান ধরে উঠবস করেন।
নিক চট করে তাকায় এনির দিকে৷ শব্দহীন হেসে বলে,
” তুমি গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানকে কানে ধরে উঠবস করার কথা বলছো? এত ক্ষমতা তোমার? কে দিয়েছে এই ক্ষমতা?
এনি নিকের বুকে মাথা ঠিকভাবে রেখে বলে,
” আপনি দিয়েছেন এই ক্ষমতা। পুরো সম্রাজ্য আপনি শাসন করলেও আপনাকে শাসন করি আমি। আর সেই শাসন করার অধিকার আপনি আমাকে দিয়েছেন। দাম্ভিকতা ছেড়ে সাধারন পুরুষ হয়ে অনুভব করেন। বুঝে যাবেন!
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। অতীতে বলা কায়াতের একটা কথা।যেটা কায়াত সবসময় বলত,
” পুরো সম্রাজ্য তুমি শাসন করলেও তোমাকে শাসন করছে একটা নারী।
এনির গরম নিশ্বাস নিকের পৌরষে আঘাত করছে।ছটফট করে উঠে গ্যাংস্টার বস। শার্টে খুলে ফেলে দেয়। দাঁত চেপে বলে,
” শালার জিন্দেগীহ! এখন ঠিকভাবে বউ সেবাও করতে পারব না। কাছে আসলেই কন্ট্রোলল্যাস হয়ে পড়ি।
নিক নিজের কপাল নিজে ঘেঁষে এনিকে বিছানায় শুয়ে দেয়। ঘুমন্ত ছেলে – মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে আবার ও আগলে নেয় প্রেয়সীকে৷ এনি আচমকা নিকের বুকে শক্ত করে কামড় বসিয়ে দেয়৷ নিক নাক-মুখ খিঁচে ফেলে,
” কামড়াচ্ছো কেনো ইডিয়েট? এমনিতেই বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রনে আছি।
এনি জ্বরের ঘোরের মধ্যেই বলে,
” আপনি এত কিপ্টে কেনো?
নিক চোখ ছোট করে বলে,
” একজন ট্রিলিয়নারকে তোমার কিপ্টে মনে হয়,? কি প্রয়োজন তোমার?
” বিয়ে!
নিক ছিটকে যায় কিছুটা। দাঁত পিষে এনির গ্রিবাদেশ শক্ত করে চেপে ধরে,
” বান্দির বাচ্চা! মেরে ফেলে দিব একদম। আমাকে রেখে কার কথা মাথায় আসছে। সাহস কত বড় তোমার? স্বামীর সামনে আরেক বিয়ের আবদার করছো?
এনি বিরক্ত হয়ে নিকের হাত ছাড়ায়। রাগ দেখিয়ে
বলে,
” ধুর বাল! আপনাকে বিয়ের কথা বলেছি। তিন বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছি। কে করবে আর বিয়ে আপনি ছাড়া?
নিক শান্ত হয়ে আসে। কপালে কুচকে বলে,
” আমাদের তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
” ওইটা ছিলো অভিশপ্ত একটা বিয়ে। যাকে আমি তীব্র ঘৃনা করতাম। আমি সেই ঘৃনা যুক্ত বিয়ে নিয়ে আজীবন কাটাতে চাই না। আমি চাই আনুষ্ঠানিক বিয়ে। আর পাঁচ-জন কাপল যেভাবে বিয়ে করে ঠিক সেভাবে।
নিক এনির দিকে তাকায়,
” আমি কোলাহলে যায় না ব্লাডরোজ?
” কেনো?
” অস্বস্তি আকড়ে ধরে৷ মানুষ আমাকে ভয় পায়।
এনি ভাবুক হয়ে পড়ে কিছুটা। নিক তো হুডি ছাড়া কখনো জন সম্মুখে যায় নি। মুচকি হেসে বলে,
” সেদিন ভয় পাবে না। বরদের দেখে কেউ ভয় পায় না। বিয়ে করব আপনাকে। বাচ্চাদের সাথে নিয়ে এক ঐতিহাসিক বিয়ে।
নিক শ্বাস ফেলে বলে,
” ওকে৷
” বিয়েটা আমি ইরান করতে চাই। আমার মাতৃভূমিতে। একবার আপনার মাতৃভূমিতে হয়েছে। এইবার আমার মাতৃভূমিতে হবে।
” ওকে।
” কাবিন হিসেবে একটা সাদা ঘোড়া দেবেন আমাকে। ঘোড়াটা যাতে সুন্দর হয়। আমি ঘোড়া চড়াতে পারি৷ ইরানে ঘোড়ার প্রচলন এখনও আছে। আপনি বাচ্চাদের ধরে সুন্দরভাবে আমার পিছনে বসবেন। আমি আপনাকে পুরো ইরান ঘুরে দেখাব।
” আচ্ছা।
” নিভ্রিতার নামে আফ্রিকার মাটিতে একটা ইয়াতিম খানা বানাবেন। অনেক বড় একটা ইয়াতিম খানা। যাতে হাজার – হাজার এতিম বাচ্চা নিজের মৌলিক চাহিদা পূরন করতে পারে।
জ্বরে এনি বকবক করেই যাচ্ছে। নিক এনিকে বুকে নিয়ে মাথা টিপে দিচ্ছে আর ধৈর্য নিয়ে সব শুনে যাচ্ছে। প্রথমবারের মত গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান শত্রুকে মারার জন্য পরের দিন বেছে নিলেন। ভুলে যায় মুহূর্তের মধ্যে শেষ রাতে ইতালির ফ্লাইট!
রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি হয়ে এসেছে। আরিশ বের হয়েছিলো বাহিরে। আবার ও ফিরে আসে মিনারে। নাজলী হসপিটাল সামলাতে গিয়ে কখন যে এত রাত হয়ে পড়েছে খেয়াল করে নি। ভেতরে বসে থেকে বাহিরের কিছু টের পাওয়া যায় না। দুইটা মেয়েকে ইথান একা ছেড়ে দেয় নি। নিজে ড্রাইভিং- করে মিনারের কাছে পৌঁছে দেয়। নাজলী ভয়ে কাঁপছে আপাতত। ফোনটাও রুমে ফেলে এসেছে ভুলে। ইথান মিনারের দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি এনির সাথেই থাকো?
নাজলী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বলে,
” হ্যা!
গাড়ি থেকে নামতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠে আবার ও। পুরো শরীর গুলিয়ে আসছে। নাজলীকে মাথাতে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদ্ধিমা জিজ্ঞাসা করে,
” আপু শরীর খারাপ লাগছে? বমি পাচ্ছে আবার ও?
নাজলী মাথা দিয়ে না জানায়। ইথান অধৈর্য হয়ে বলে,
” নাজলী তুমি অসুস্থ?
রিদ্ধিমা নাজলীর ব্যাগটা নিজে নিয়ে বলে,
” প্রেগন্যান্সি অবস্থায় এমন হয় ভাইয়া। চিন্তার কারন নেই।
ইথানের মাথায় যেন পাহাড় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। বুক ধক করে উঠে। অস্ফুটস্বরে বলে,
” প্রেগন্যান্ট!.
” ওমা! আপনি জানেন না? আপুর প্রেগন্যান্সির তিন মাস চলছে।
ইথান কিছুটা পিছিয়ে যায়। খামছে ধরে নিজের বুকের অংশ। অবিশ্বাস্য গলায় বলে,
” নাজলী তুমি বিয়ে করেছো?
” নাজলী দু – দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
” অনেক কাহিনী ইথান। তাই বলিনি এই নিয়ে কিছু৷ ভেবেছি সময় পেলে সব বলব!
ইথান শুকনো ঢোক গিলে। অন্ধকার লাগছে পুরো দুনিয়া। ঝাপসা চোখে হাসে কিছুটা।
” হজবেন্ড কি করে?
নাজলীর ইচ্ছে করছিলো বাংলার সেই বিখ্যাত গানের ডায়লগ দিতে,
” গুলিস্তানের মোড়ে বসে বন্ধু বেঁচে পান, ক্যাসেট বাজাইয়া শুনে মমতাজের গান!
কিন্ত এই মুহূর্তে সে অনেক দুর্বল। ডায়লগ মারার এনার্জিতে নেই৷ দ্রুত যেতে – যেতে বলে,
” ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম।
ইথান ছন্নছাড়া চোখে তাকিয়ে থাকে। আরিশকে তো পুরো বিশ্ব এই চিনে। ক্রিমিনাল গ্রুপের লিডারকে কে না চিনে! নিকের এইতো ডান হাত! আকাশের পানে তাকিয়ে ভেঙে আসা কন্ঠে বলে,
” আমিও কি তবে নাভিদের মত ভালোবাসার খেলায় হেরে গেলাম খোদা!
নাজলী ভেতরে এসেছে ঠিকই। কিন্তু উপরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। সব কিছু ঠিক মানে ঝড়ের পূর্বাভাস! রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে,
” আমি উপরে যাব না। তোমার সাথে ঘুমাই?
” কেনো আপু?
” তোমার ভাই আজ আমাকে মেরে ফেলবে রিদ্ধিমা৷ একা বের হয়েছি তার উপর রাত হয়ে গিয়েছে৷ ফোনটাও রেখে গিয়েছি। উনার রাগ ভয়ানক!
রিদ্ধিমা নিজেও ভয় পাচ্ছে নাজলীর জন্য। এই সময়টা মিসক্যারেজের সম্ভাবনা থাকে অধিক। তাই আরিশ আপাতত বাহিরে বের হতে নিষেধ করেছে। কিন্ত আচমকা এমন খবরে কে বসে থাকে? নাজলীও পারে নি। রিদ্ধিমা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” তুমি ভয় পাচ্ছো?
” না পেয়ে উপায় আছে? দেখো না সব কিছু কেমন শান্ত!
” আরেহ চিল! গিয়ে উড়াধুরা চুমু খেয়ে নিবে।
নাজলীর বর্তমানে লজ্জা আসছে না। মন খারাপ করে বলে,
” উনি রেগে গেলে চুমুতেও কাজ হয় না। ঘাড়ত্যারা অনেক। আজ তোমার সাথে ঘুমাব আমি।
রিদ্ধিমা বড়দের মত ভাব নিয়ে বলে,
” শুনো নাজলী মাইলাহ! তুমি অপরাধ করেছো আজ মিথ্যে নয়। আজ আমার সাথে ঘুমিয়ে পড়বে কিন্ত সকালে কি হবে ভেবে দেখেছো? এরপরের দিন কি হবে? বা এর পরের দিন? আরিশ ভাইয়া আর ও রেগে থাকবে। তার থেকে ভালো গরম – গরম রাগ ভঙ্গানো। যাও গিয়ে কয়েকটা চুমু খেয়ে নাও। আরে ভাই পুরুষ মানুষ বউয়ের সান্নিধ্য পেলে এমনিতেই গলে যায়।
নাজলী নখ কামড়ে বলে,
” সান্নিধ্য কিভাবে পাবে? আমি তো প্রেগন্যান্ট! মিসক্যারেজ হতে পারে।
রিদ্ধিমা থতমত খেয়ে বলে,
” আমি ওই সান্নিধ্যের কথা বলিনি৷ উপরে -উপরে যে সান্নিধ্য ওইটা আরকি।
নাজলী মাথা নাড়িয়ে বুকে থুঁ থুঁ ফেলে উপরে যায়।
রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
” যাচ্ছি কিন্তু ? মরে গেলে লাশটা দামী কাপড় দিয়ে দাফন করিও।
রিদ্ধিমা মুখ চেপে হেসে দেয়। নাজলী ধীর পায়ে এগিয়ে যায় জমরাজের কাছে৷ দরজা হালকা ধ্বাক্কা দিতেই খুলে যায়৷ শুকনো ঢোক গিলে মেঝের দিকে তাকাতেই আৎকে উঠে। পুরো মেঝে কাচ দিয়ে ছঁড়াছঁড়ি। সোফার সামনে রাখা কাচের টেবিলটাও ছাড় পায় নি। সব কিছু ভেঙ্গে তছনছ করে ফেলেছে৷ নাজলীর চোখে পানি চলে আসে আচমকা। আরিশ দুই হাটুতে হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে আছে৷ খাটের মধ্যে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসা আরিশকে দেখে আৎকে উঠে। আরিশ রক্তলাল চোখে তাকিয়ে আছে নাজলীর দিকে। তার হাত দিয়ে তরল রক্ত পড়ছে। নাজলী ভয়ে কাচের উপর দিয়েই হেটে যায়। হিল পড়ে থাকার জন্য এতটা আঘাত করতে পারে নি নরম চামড়াতে৷ আরিশ মেঝেতে দৃষ্টি রেখেই শক্ত গলায় চাপা গর্জন করে উঠে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৫
” তুমি জাহান্নামে যাও আই ডোন্ট কেয়ার। যদি আমার বাচ্চার তিল পরিমান ক্ষতি হয় তবে এই ঘরের প্রতিটা আসবাব পত্র যেভাবে ভেঙেছি৷ তোমাকে ও ঠিক এইভাবে শেষ করব। তোমাকে কোনো ছেলে ড্রাইভ করে দিয়ে যাচ্ছে। সেটাও আমার কিছু যায় আসে না। আমার অস্তিত্বের উপর কিছুর আচর লাগলে তোমাকে মারতেও আমার হাত কাঁপবে না। আমার নরম আচরন দেখে আগের আরিশকে ভুলে গেলে তো বোকামি !
