লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭
লিজা মনি
কথায় আছে কারোর পৌষমাস আবার কারোর সর্বনাশ। চারপাশে খুশির আমেজ। চারটা জীবন পূর্ণতা পেয়ে যেন প্রকৃতি ও তাদের সাথে হাসছে। খাওয়া – দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে অনেকে নিজের গন্তব্যে এগিয়ে যাচ্ছে। নাচ – গানে চারদিকে মুখরিত। বল নাচ চলছে পুরো স্থান জুড়ে। অথচ কেউ একজন তীব্র যন্ত্রনা নিয়ে তাকিয়ে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। তার দৃষ্টির নাজলীর দিকে। যে বর্তমানে মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করছে। সে নিজেও জানে না তার মাতৃত্বের এই রুপ দেখে একজনের হৃদয় ঝলসে যাচ্ছে। চোখ ভিজে উঠলে আবার টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলছে সেটুকু অশ্রু। ব্যক্তিটা ধপ করে বসে পড়ে পাহাড়ার চুড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত মেলে চিৎকার দিয়ে উঠে। আকাশ ফেঁটে নামতে থাকে অবিরাম বৃষ্টির ফোঁটা। ভিজে যায় শক্ত দেহখানা । আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে – কাঁদতে বলে,
” আমরা তাকেই বেছে নেই যাকে তুমি কোনোদিন জীবনে রাখো নি। নাভিদকে এমন এক মেয়ের ভালোবাসার কাঙ্গাল বানালে যে শেষ পর্যন্ত মানসিক রোগীতে পরিনত করেছে। চেতনাহীনভাবে ছটফট করছে একটা শুভ্র বেডে। যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত।ভালোবাসার মত এমন অস্ত্র ব্যবহার না করলেও তো পারতে। নাভিদকে শান্তনা দিতে ইরান থেকে আমেরিকা এসেছি। অথচ এসে দেখি আমার পাখি খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে অন্যের খাঁচায় বন্ধী হয়ে পড়েছে। সে হয়ত জানবেও না তাকে কেউ একজন পাগলের মত ভালোবাসত। যার গর্ভে আমার সন্তান থাকার কথা ছিলো সেই গর্ভে অন্য পুরুষের সন্তান। এমন দৃশ্য দেখার আগে আমার মৃত্যু কেনো দিলে না খোদা ? যদি ভাগ্যেই না থাকে তবে তার প্রতি দুর্বল কেনো করেছিলে?
থেমে যায় ইথান। নোংরা কাঁদার মধ্যেই বসে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে। দুনিয়া ভেঙে আসছে তার। এই যন্ত্রনা সে কিভাবে লুকাবে? নাজলীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসে,
” কবুল শব্দটা তোমার মুখে উচ্চারিত হয়েছে আনন্দের সুর হয়ে কিন্তু তুমি কি জানো আমার কানে এসে বেজেছে ভালোবাসার এক শেষ মৃত্যুঘণ্টা হিসেবে। কি ভয়ংকর যন্ত্রনাদায়ক ছিলো তিনটা শব্দ। যখন তুমি অন্যের নামে তিন কবুল উচ্চারন করছিলে তখন মনে হচ্ছিলো কোনো ঘাতক জীবন্ত আমিটার হৃৎপিন্ড ধরে টানছে। আরিশের ভাগ্যকে খুব হিংসে হচ্ছে নাজলী। সে ভাগ্যবান কারন তোমাকে পেয়েছে। আর আমি বিধ্বস্ত হতভাগা, কারন তোমাকে পাই নি। তাদের জীবন এই সুন্দর যারা না চাইতেও পেয়ে যায়। তবে বরবাদ হয়ে তাদের জীবন যারা প্রথম থেকে চেয়েও পায় না।
ইথান বিরবির করে দুই হাটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে। বাস্তবতা এমন ভয়ানক জানলে সে অন্তত ভালোবাসার মত অপরাধ করত না। অনেক সময় অপেক্ষা জিনিসটা দুর্যোগ বয়ে আনে। নাভিদ অপেক্ষা করেছিলো সঠিক সময়ের। কিন্তু সময় হওয়ার আগেই নিক নিয়ে নিয়েছে। সেও সেই ভুল করেছে। অপেক্ষা! সময় ফুরানোর পূর্বেই অন্যের হয়ে গিয়েছে।
তোমাকে জানিয়ে রাখি আমার না হওয়া ভালোবাসার মানুষ, আমার ভালোবাসায় কোনো খামতি ছিল না, কিন্তু ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে আজ আমায় দাঁড়িয়ে দেখতে হচ্ছে নিজেরই শেষকৃত্য। সুখী হও অনেক। আমার সবটুকু সুখ ও তোমার নামে উৎসর্গ করে দিলাম।
নাজলী আনন্দে ব্যস্ত। রমণী অনুভব করতেই পারলো না তাকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রনায় কেউ অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। আরিশের দিকে তাকিয়ে ফের সামনে তাকায়। স্বামীর হাত ধরে আহ্লাদী কন্ঠে আবদার করে,
” চলুন না আরিশ আমরাও ডান্স করি।
নাজলীর মুখ থেকে উচ্চারিত বাক্যটা আরিশের কর্ণে প্রবেশ করা মাত্রই কপাল কুচকে তাকায়,
” নাচবে?
” হুম।
” কমনসেন্স কোথায় তোমার? ঠিকভাবে হাটতে পর্যন্ত পারো না। পা ব্যাথা করব।
নাজলীর পছন্দ হলো না কথাটা। নিজের জামা উপরে তুলে পা দুইটা এগিয়ে দেয় আরিশের দিকে। চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে,
” বসে থাকার কারনে পা দুইটা ফুলে গিয়েছে দেখুন। এখন না চাইলেও হাটতে হবে। তার থেকে ভালো একটু ডান্স করি। এতে আমার হালকা ব্যায়াম হবে। চলুন যাই!
আরিশ পায়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠে। যদিও জানে এইটা অতিরিক্ত কিছু না। তবুও মন আর মানছে না । পায়ে হাত দিয়ে নরম কন্ঠে শুধায়,
” খারাপ লাগছে?
” উহুম, নাচব।
আরিশ ফুঁস করে শ্বাস টানে। এই তাঁরছিড়া বউ নিয়ে আজীবন সংসার কিভাবে করবে সে? ঠিক ভাবে দাড়াতে পারে না সে নাচের আবদার করছে। লাইক সিরিয়াসলি! আরিশ পাত্তা না দিয়ে বলে,
” বিয়ে শেষ। এখন চলো রুমে যাই। তোমার রেস্টের প্রয়োজন ওয়াইফি। কারন পুরো রাত তোমার জাগতে হবে। স্বামী থেকে সারপ্রাইজ নিবে না?
নাজলীর শরীর শিরশির করে উঠে। আড়চোখে তাকিয়ে বলে,
” আপনি সারপ্রাইজ ও দিতে জানেন?
” বাচ্চা যখন দিতে পেরেছি তখন এমন হাজারটা সারপ্রাইজ ও দিতে পারব। আই হ্যাভ সো মাচ টু গিভ ইউ, সুইটহার্ট। জাস্ট বি পেশেন্ট।
নাজলী কটমট চোখে তাকায়,
” নির্লজ্জ! চলুন ডান্স করি। সারপ্রাইজ রাতে বাট এখন নাচা প্রয়োজন।
” আমি নাচতে জানি না।
” শিখিয়ে দিব আমি।
আরিশ শান্ত চোখে তাকায়। হতাশার শ্বাস ফেলে বলে,
” তুমি কি দুনিয়াতে আর কোনো আবদার পাও নি। ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম নাচ করবে? এর থেকে হাস্যকর আর কি হতে পারে! আমি জীবনে কোনোদিন নাচিনি।
নাজলী হালকা হেসে বলে,
” যে বাচ্চা দিতে পারে সে বউয়ের আবদারে নাচতেও পারবে।
আরিশ নাজলীর কোমর চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
‘ আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছো?
” পরিস্থিতির স্বীকার।
কথাটা বলে নাজলী নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। আরিশ কিছু বলার আগেই তার হাত ধরে টেনে বলে,
” প্লিজ জান! চলো সামান্য নাচ করি। নিজের বিয়েতে যদি নাচতে না পারি তবে আজীবন আফসোস থাকবে। আর তো কখনো বিয়ে করব না। বউয়ের এতটুকু আবদার রাখবে না বলো?
নাজলীর মুখ থেকে পর- পর এইসব বাক্যে আরিশ হতভম্ভ হয়ে যায়। কানের মাঝে বাজতে থাকে ‘জান’ ও ‘তুমি’ শব্দ দুইটা।শুকনো ঢোক গিলে মনের অজান্তেই উঠে দাঁড়ায়। নাজলী নিয়ে যায় আরিশকে বল ডান্সের জন্য।
ঝাড়বাতির উষ্ণ আলোয় দ্যুতিময় পুরো বলরুম। হালকা বেহালার সুরে সুর মেলানো হচ্ছে। স্পন্দনে দুলছে চারপাশের নানা জোড়া কাপল। কারো হাত কারো কোমরে, কারো নজর কারো চোখে আবদ্ধ। অলংকারের ঝিলিক, গাউনের ভাঁজ আর তাল মেলানো পায়ের ছন্দে মেলাচ্ছে নিজেদের সঙ্গীর সাথে।
ভিড় ঠেলে একবারে হলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলো নাজলী আর আরিশ। চারপাশের সব কোলাহল আর আলো হঠাৎ করেই যেন তাদের জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে যায়।
নাজলীর পরনে টকটকে লাল গাউন—যেটার অবাধ্য ঝুলন্ত অংশ মেঝেস্পর্শ করে মৃদু দোলায় দুলছে। প্রতিটি পদক্ষেপে লাল রঙের সেই বিস্তার রক্ত জবার মতো ফুটে উঠছে। আরিশ—ঘন কালো স্যুট-প্যান্টে একদম নিখুঁত, আভিজাত্যে ঘেরা। কলারের বাঁধন থেকে শুরু করে কাঁধের রেখা পর্যন্ত—সবকিছুতেই দাম্ভিকতা। আরিশ কেমন যেন ভ্রমের মধ্যেই নাজলীর সাথে উপস্থিত হয়।
ওপরের স্পটলাইটটি চারপাশের অন্যান্য আলো থেকে আলাদা হয়ে এসে পড়ল সোজা তাদের ওপর। আলো আর ছায়ার এক অপূর্ব বৃত্ত তৈরি হয় দুজনের চারপাশে। দুজন দুজনের মুখোমুখি।
নাজলীর ব্যাকুল চোখের চাউনি আছড়ে পড়ছে আরিশের সেই গাঢ়, গভীর দৃষ্টিতে। পুরো বলরুম জুড়ে মানুষ ঘুরছে, গান বাজছে, উৎসব চলছে। কিন্তু আলোয় ঘেরা ওই নির্দিষ্ট বৃত্তটায় দাঁড়িয়ে আছে দুই পৃথিবীর দুই মানুষ। একজন ছটফটে, সাহসী। আরেকজন হিংস্র, ভয়ানক! যে কোনোদিন আনন্দ কি কখনো অনুভব করে নি। কিন্তু আজ এক নারীর সামান্য দুইটা লাইনে বশ হয়ে নাচের আসর পর্যন্ত চলে এসেছে।
নাজলী আরিশের কাধে হাত রেখে বলে,
” আপনি যখন আছেন তখন আমার বিন্দু মাত্র ভয় নেই আরিশ। আমি জানি, সামান্য আর্তনাদ করার আগেই আপনি দুই হাত দিয়ে সব সামলে নিবেন। যদি বলেন নাচতে গিয়ে আমার কষ্টের কথা। তবে বলে রাখি আপনার পায়ের উপর পা রেখে আমি পুরো দুনিয়া হাটতে পারব। তিন পরিমান কষ্ট কখনো অনুভব করব না।আপনি শুধু আমার সাথে থাকুন আরিশ একটুও কষ্ট হবে না।
আরিশের ধ্যান ভাঙ্গে। ছটফটিয়ে তাকায় চারপাশে। চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে নাজলীর জন্য। ততক্ষণ লাইট এসে পড়ে ওদের উপর। বক্সে বাজতে থাকে,
“I’m so lonely, broken angel
I’m so lonely, listen to my heart”
আরিশ শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” মৃত্যুর আগে ফাদার ঠিকই বলেছিলো, কখনো কোনো নারীর প্রেমে পড়িস না। ওরা বিষধর! সাপের থেকেও ভয়ানক। ওদের চাহনি, ওদের কথা ধাঁরালো অস্ত্রের মত। এরা এক অনন্য জাদুকর! যদি কোনো নারীর প্রেমে পড়িস তবে ভেবে নে তুই দুর্বল হয়ে পড়েছিস। দুনিয়ার কোনো অস্ত্র যদি তকে মারতে না পারে তবে নারী নামক অস্ত্রে তুই মরবি সিউর!
ফাদার বেঁচে থাকলে উত্তর দিতাম “আমি এক নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি ফাদার। তবে কি আমার ধ্বংস লেখা হয়ে গিয়েছে?
নাজলী আরিশের পায়ের উপর পা তুলে মুচকি হেসে বলে,
” ফাদারের পরিবর্তে উত্তরটা আমি দিয়ে দেই?
” হুমম.. হুমমম.. বলো জান!
” ধ্বংস হবেন না। আমি কোনো ধ্বংসকারী নই। আমি আপনার জীবনের সব কিছু নতুন করে তৈরি করব। সৃজন হবে সব কিছু। পাল্টাবে আপনার স্বভাব। এইবার আপনিই বলুন না আমি কি?
আরিশ ছোট্ট করে বলে,
” আমার দুনিয়া।
দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের লুত মরুভূমি। অনন্ত বালুকা রাশি আর খাঁ খাঁ করা রুক্ষতার মাঝে নির্জন স্থান। ধূসর মরুভূমির কোল ঘেষেই হঠাৎ দৃশ্যমান এক বিশাল পরিত্যক্ত প্রান্তর। ধূ-ধূ প্রান্তর জুড়ে জাদুমন্ত্রে দাঁড়িয়ে আছে শত শত ঘোড়া। তাদের কেশর বাতাসের দোলায় উড়ছে, কিন্তু অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারপাশে। সূর্য অস্তগামী, বালুর বুকে নেমে আসা লালচে-সোনালী আলো।
এই অদ্ভুত সুন্দর আর পরিত্যক্ত জগতের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এনি। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। চোখ দুটো ছড়িয়ে পড়েছে সীমাহীন আশ্চর্যে।
পায়ের নিচে নরম বালু আর সামনে অনন্ত সৌন্দর্য, কিন্তু এনির মন জুড়ে কেবলই এক ঘোরলাগা প্রশ্ন—গ্যাংস্টার বস ? এই রুক্ষ, নির্মম ‘মনস্টার’ -ই কি সত্যি সত্যি তাকে এমন এক স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে এলো? নাকি এটি তার তীব্র কোনো বিভ্রম?
যে দুই – দিন অব্দি হিংসার পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যেত সামান্য পোকার স্পর্শ শরীরে লাগলে। সেখানে বাহিরে জগতে এনে এইভাবে ছেড়ে দেওয়া সপ্ন নয় কি? এনির চোখ ভিজে আসে সামান্য। মন বলছে যদি সপ্ন হয়ে থাকে তবে এই সপ্ন না ভাঙ্গুক। ঘুমের মধ্যে থাকা যদি কোনো সপ্ন হয়ে থাকে তবে এই ঘুম আজীবন থাকুক। সে বের হতে চায় না এমন মুহূর্ত থেকে। মিশে যেতে চাই ভালোবাসা নামক স্বাধীনতার চাঁদরে। এনিকে এমন ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিক ভ্রুঁ কুচকায়,
” কোন দেশে হারিয়ে গেলেন আপনি মিসেস জেভরান?
এনির শরীর সামান্য কাঁপে। ঠোঁট নড়ছে অনবরত। এক বুক সাহস নিয়ে নিকের দিকে তাকায়। চোখ লাল হয়ে আছে কান্না আটকে রাখার ফলে। জামা খামছে ধরে বলে,
” এইটা সত্যি আপনি নিক?
” অনুভব করো।
” আপনার শরীরের গন্ধ, আপনার চোখ, আপনার স্পর্শ, আপনার হৃদয় সবই তো আপনি। আমার ব্যক্তিগত পুরুষ। তবে আপনার স্বভাব কেনো অন্যের মনে হচ্ছে? এই আপনিটাকে আমি চিনতে পারছি না। এতটা পরিবর্তন কিভাবে হয়ে গেলেন?
নিক ফিচেল হাসলো। এনির চোখের পানি বালিতে পড়ার আগেই মুছে দেয়। কপালে- কপাল ঠেঁকিয়ে উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আওড়ায়,
” অপরাধ তুমি করে এখন আমাকে অপরাধী বানাচ্ছো ব্লাডরোজ? আমার গোটা স্বভাবকে পরিবর্তন করে এই না জেনে থাকার অভিনয়টা খুবই বাজে দেখাচ্ছে। আমাকে তো আমার জন্মদাত্রী মা-ই চিনতে পারে নি। আমি প্রচন্ড খারাপ বেইবি। এতটা খারাপ যে মাঝে- মাঝে ভাবি আমার মত এমন পাপী দুনিয়াতে এত সুখ পাচ্ছে কিভাবে? তার তো কোনো অধিকার ছিলো না সন্তান সুখ লাভ করার। তার কোনো অধিকার ছিলো না স্ত্রী সুখ লাভ করার। পরিশেষে তার কোনো অধিকার এই ছিলো না একটা সংসার পাওয়ার। সব অধিকার পেতে সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছে। এত কিছু দিয়েছো আমি তোমার দুইটা আবদার পূরণ করতে পারব না?
এনির ভেতরটা খাঁ – খাঁ করে উঠে। কান্নার শব্দগুলো গলায় দলা পাঁকিয়ে আসে। নিজেকে আটকে না পেরে শব্দ করে কেঁদে উঠে রমণী। মাথাটা রাখে নিজের প্রিয় মানুষটার বুকে। ব্লেজার শক্তভাবে ধরে বলে,
” আমার জীবনে কিছুর প্রয়োজন নেই। আপনি আর বাচ্চারা পাশে থাকলেই আমি পরিপূর্ণ। আমি চাই এমন একটা জীবন যেখানে কোনো ভয় থাকবে না। আপনাকে আমি যাতে কখনো আর ভয় না পাই। আপনার থেকে স্বাভাবিক ব্যাবহার চাই ঠিক আজকের দিনটার মত। আমার বিরাট স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। এই মুহূর্তের মত সামান্য স্বাধীনতা দিলেই আমার চলবে। হুট করে আপনার সাথে বাহিরে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছেটা যাতে পূরণ হয় সেটুকু জীবন চাই। আর যাতে চার দেয়ালের ভেতরের কারাদন্ড আসামীর মত জীবন পার করতে না হয়। এত বছর তো কম কষ্ট করি নি। আজ থেকে আপনি আমাদের একটা সুষ্ঠ জীবন দিবেন। বলুন না নিক?বলুন! আমাদের দিবেন না আর পাঁচ- জন সাধারন মানুষের মত সুষ্ঠ জীবন? পারবেন না আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হুট করে একদিন ঘুরতে যেতে? তার আবদার পূরণে বৃষ্টিবিলাস করতে?
নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। এনির আকুতি ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই বলে উঠে,
” প.. পারব!
এনি কান্নার মধ্যেই হেসে আবারও মাথা রাখে স্বামীর বুকে। নিক এনিকে আর জড়িয়ে ধরে নি। শুকনো ঢোক গিলে চারপাশে তাকায়। ছন্নছাড়া লাগছে নিজেকে অনেক। ঘোড়ার ডাকে এনি চট করে মাথা তুলে তাকায় পাশে। একটা সাদা ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন মাঝ বয়সী বৃদ্ধ। ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে এনির চোখ বড় হয়ে যায়। সাদা ঘোড়াটা সুন্দরভাবে সাজিয়ে আনা হয়েছে। এনিকে এমন তাকিয়ে থাকতে দেখে নিক গ্রিবাদেশ নাড়ায়,
” ইরানী বালিকা আপনার ঘোড়া!
এনি গোল – গোল চোখে তাকায় নিকের দিকে। এক হচ্ছে ঘোড়া তার উপর আবার এনিকে বালিকা সম্মোধন! দুই আশ্চর্য নিয়ে প্রশ্ন করে,
” আমার ঘোড়া? আমি বালিকা?
লোকটার হাত থেকে রশিটা নিক নিজের হাতে নেয়। ঘোড়ার কানে হাত রেখে প্রতিউত্তর করে,
” যখন এক রমণীকে সমুদ্রের পাড়ে দেখেছিলাম তখন সে ষোল বছরের নাবালিকা ছিলো। যখন তাকে ছলে – বলে নিজের ঘরে এনেছিলাম তখন সে আঠারো বছরের যুবতী ছিলো। একদিন সে সত্তর বছরের বৃদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমার চোখে সে প্রথম দেখার অপূর্ব রুপসী নাবালিকা এই থাকবে। চামড়া যখন কুচকে যাবে তখন ও। পৃথিবীর সৌন্দর্য কমে গেলেও নিক জেভরানের চোখে তার ব্লাডরোজের সৌন্দর্য কখনোই কমবে না, কবর অব্দি না।
” কিন্তু আমি এর উল্টোটা করব।
” মানে?
এনি কিছুটা ভাব নিয়ে বলে,
” এখন আপনি সুন্দর, মারাত্নক সুদর্শন। তাই সহজে আপনার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু যখন বুড়ো হয়ে যাবেন তখন তো এত সুন্দর থাকবেন না। তাই আমি ভেবে রেখেছি যখন আপনি বুড়ো হয়ে যাবেন তখন অন্য রুমে সিফট হয়ে যাব অথবা মেয়ের শশুর বাড়ি চলে যাব।
নিক ক্ষ্যাঁপা ষাঁড়ের মত তাকায় এনির দিকে। নিক এগিয়ে আসতে নিবে তার আগেই
এনি খিলখিল করে হেসে উঠে। হেসে উঠে তার নীলচে চোখ দুইটা। থেমে যায় গ্যাংস্টার বস। আটকে যায় তার চোখ দুইটার মধ্যে। এক ভুবনমোহিনী সুন্দরীর দিকে। এনিকে এমন মন খুলে হাসতে দেখে নিক নিশ্বাস নিতেও যেন ভুলে যায়। মনে পড়ে তাদের সম্পর্কের তিক্ত অতীতের পাতা খুললে সেখানে এনির হাসি নেই। নিক কখনো এনিকে এইভাবে হাসতে দেখে নি। এই প্রথম দেখেছে এই রমণীর ধ্বংসাত্বক হাসি। এনি হাসতে – হাসতে হাঁপিয়ে উঠে। অতিরিক্ত হাসির জন্য চোখ দিয়ে পানি এসে পড়েছে।
” তোমার হাসিতে ড্রাগসের নেশা থেকেও তীব্র নেশা রয়েছে। তুমি আর এইভাবে হাসবে না,সামলাতে পারি না নিজেকে।
এনির হাসি থেমে যায় নিকের কথায়। লজ্জায় গাল রক্তিম হয়ে উঠে খানিকটা। পূর্বের কথা নিয়ে নিজেকে সংযত করে বলে,
” আমার কথা আপনি সব কিছু সিরিয়াস নিয়ে নেন কেনো এরিকের পাপা? আমি মজা করছিলাম আপনার সাথে।
নিক এনির হাত ধরে নিয়ে যায় ঘোড়ার কাছে। গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বলে,
” আমি আগেই বলেছি বেবিগার্ল প্রচন্ড অসভ্য আর খারাপ একজন পুরুষ আমি। তোমার ক্ষেত্রে আমাকে চাবুক দিয়ে মেরে ফেললেও হেসে উড়িয়ে দেব। কিন্তু এই জবান দিয়ে যদি মজার ছলেও ছেড়ে যাওয়ার কথা আসে তবে তোমার দুনিয়া জ্বালিয়ে দিব। আই রিপিট প্রচন্ড খারাপ আমি। আমি স্বামী হিসেবে নিক জিভরান হলেও মুদ্রার ওপিঠে কিন্তু একজন আন্ডারগ্রাউন্ড মনস্টার। ভুলে যেও না!
এনি নিকের হিংসুটে মুখটা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো। সাদা গাউনটা নিক চেপে ধরে। এনি আগের কৌশল অবলম্বন করে লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে উঠে যায়। ঘোড়া শব্দ করে লাফিয়ে উঠে অনেকটা। নিক অদ্ভুতভাবে এক পলক তাকায় ঘোড়াটার দিকে। ফের এনির দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি চড়াতে পারো?
এনি তাকিয়ে বলে,
” বহু চড়িয়েছি আগে। আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো? আমি ভুল-ভাল কিছু করব না।
নিক এক মুহূর্তে কিছু একটা ভেবে বলে,
” তুমি পিছনে বসো আমি চড়াচ্ছি।
এনি শক্তভাবে বসে বলে,
” আপনি ঘোড়া ও চড়াতে পারেন?
এনির আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া দেখে নিক নিশ্বাস ফেলে। এক লাফে এনির পিছনে বসে কানের কাছে কামড় দিয়ে বলে,
” হিংস্র বাঘ আর কুকুর আছে আমার। মিনারে বহু নেকড়ে আছে। সব আমার পোষা জিনিস। আর সামান্য ঘোড়া চড়াতে পারব না?
বাঘের কথা মনে হতে হুট করে হান্টারের কথা স্মরণ হয় এনির। আবেগে প্রশ্ন করে বসে,
” আপনি তাকে খুব ভালোবাসতেন নিক?
এনির প্রশ্ন বুঝে নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” আমার নিস্বঙ্গতার সঙ্গী ছিলো। যে সময় আমার জীবনে কেউ ছিলো না তখন তারা ছিলো আমার পরিবার, পাহাদার!
নিক চোখ বন্ধ করে ফেলে। এনি পালটা প্রশ্ন করতে যাবে নিক সেই সুযোগ দেয় নি।
দুই গোড়ালি দিয়ে ঘোড়ার পেটে আলতো চাপ দিয়ে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করে —”গেটিআপ!”। ঘোড়াটি ধীর-স্থির পদক্ষেপে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করে আচমকা। এনি খেঁই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে নিক শক্ত ভাবে চেপে ধরে ধনুকের মত বাঁকানো কোমড়টা। নিকের উত্তপ্ত গরম নিশ্বাস এনির ফর্সা ত্বকে আছড়ে পড়ছে। পুরুষাণালি শরীরের তীব্র পারফিউমের গন্ধ তাকে মাতাল করে তুলছে অর্ধেক। এনি লাগামটা শক্তভাবে ধরে। সেই হাতের উপরে হাত রাখে গ্যাংস্টার বস। অন্য হাত এনির পেট গলিয়ে শক্তভাবে ধরে রেখছে। ঘোড়া ছুঁটে চলছে নিজের মত করে। মরুভূমিতে ঘোড়া চালানো সাধারণ মাটির চেয়ে অনেক ভিন্ন। অতিরিক্ত ওজন এবং নরম বালুর কারণে দ্রুত দৌড়ালে ঘোড়ার পা মচকে যেতে পারে। তাই ধীরে – ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। মরুভূমির তপ্ত রোদে এনির কপালে জমে উঠেছে ঘামের বিন্দু, কিন্তু দু’হাতে ধরে রাখা লাগামের কোনো শিথিলতা নেই। এনি হালকা হেসে বলে,
” আপনি কিভাবে ঘোড়া চালানো শিখলেন?
” প্রয়োজনে।
” মানে?
” আরব, ইরানি বহুবার শত্রুদের সাথে সংঘর্ষ লেগেছে। দুইবার বুলেট লেগেছে হাতে। ওরা আমাদের গাড়িকে টক্কর দিয়ে ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে যেত সহজে। প্রয়োজনের তাগিদে আরও সাত বছর আগে শিখেছিলাম। কিন্তু জানতাম না বউ নিয়ে লং ড্রাইভে যাব!
এনি শব্দ করে হেসে বলে,
” এইটা লং ড্রাইভ? গাড়ি বা বাইক দিয়ে যায়, ঘোড়া দিয়ে নয়।
নিক এনির উন্মুক্ত পিঠে শক্তভাবে চুমু খায়। কেঁপে উঠে এনি। লাগাম ছেড়ে দিতে নিলে নিক শক্তভাবে আটকে রাখে। এনির পিঠে নাক ঘেঁষে বলে,
” এই ভুবনে গ্যাংস্টার বস এক পিছ এই আছেন। তার স্বভাবের কেউ নেই। অন্যরা গাড়ি- বাইক নিয়ে যায় আর আমি ঘোড়া নিয়ে আসলাম। ক্ষতি কি? রাত হলে ক্রিকেট ম্যাচ ও খেলা শুরু করতে পারি নিশ্চইতা নেই৷
নিকের লাগামহীন কথা আর অবাধ্য নাক – ঠোঁটের ঘর্ষণে এনি নিশ্বাস নিচ্ছে ঘন- ঘন। কপাট রাগ দেখিয়ে থেমে – থেমে বলে,
” অসভ্য লোক! ঘোড়ার লাগাম না টেনে আগে আপনার লাগান টানতে ইচ্ছে করছে। নেকড়ে ও আপনার থেকে কম উত্তেজিত। ঠিকভসবে বসুন।নিজের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছি।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৬ (৪)
” বউ কাছে থাকলে আমি সর্বক্ষণ এই উত্তেজিত থাকি এইটা নতুন নয়। আমার পরবর্তী মিশন বউয়ের আবদার পূরণ করতে পুরো দুনিয়া ঘুরা অর্থাৎ ১৯৩ বা ১৯৫ টি দেশ ভ্রমণ করা। আর প্রতিটা দেশের মাটিতে বাসর করার রেকর্ড করে আসা। যাতে বৃদ্ধ কালে বলতে পারি প্রতিটা দেশেই নতুন করে বাসর করেছি আমি।
