Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৭

শিউলি ফুল পর্ব ৭

শিউলি ফুল পর্ব ৭
তাজরীন ফাতিহা

ভোরে ঘুম থেকে উঠে শিউলি প্রথমে মেয়ের গায়ের কাঁথা, কাপড় ভিজেছে কিনা সেটা দেখে। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট্ট পা দুটো উপরে তুলে হাতিয়ে দেখল মেয়ে তার আরামে ঘুমাচ্ছে হাগু মুতু না করেই। ব্যাপারটা শিউলিকে আশ্চর্যান্বিত করেছে ভীষণ। বাচ্চাটা তো রাতে কাঁদেওনি। হামিদকে বুকে দুই হাত ভাঁজ করে মেয়ের দিকে পিঠ করে ঘুমাতে দেখে একটা লম্বা দম ফেলে খাট থেকে নামল শিউলি। কাঠের খিলটা সরিয়ে দোর টেনে খুলল। ক্যাচ ক্যাচ ছন্দ তুলে কাঠের দোরটা তা জানান দিল। শিউলি দেখল আসমান আলো আঁধারের মিশেলে ডুবে আছে। এর অর্থ দাঁড়ায় সূর্য এখনও উদিত হয়নি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে ওযু করতে কলপাড়ে গেল। হালিমা আগেই উঠেছে। কল চেপে ওযু করছে। ভাবিকে দেখে হাসল। শিউলি ফিরতি হাসি দিয়ে পাশে রাখা বদনায় পানি ভর্তি করে ল্যাট্রিনে গেল। ল্যাট্রিন থেকে বেরিয়ে ছাই দিয়ে দাঁত মেজে কুলিকুচি করে ওযু করল। হেলেনা পারভীন উঠেছে কিনা দেখতে তার ঘরে গেল। তিনি ইতোমধ্যেই উঠে গেছেন। বসে বসে নামাজ আদায় করছেন।

শিউলি নামাজ শেষে কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে রইল। তসবিহ গুনছে। পাঞ্জেগানা অজিফা থেকে দোয়া দুরূদ পড়ে তার শাশুড়ি। শিউলি আজ সেটা নিয়ে এসেছে। দোয়া, দুরূদ পাঠ করল কিছুসময়। জায়নামাজ উঠিয়ে বোলে চাইতেই দেখল মেয়ের একগাদা কাঁথা, কাপড় জড়ো হয়েছে। সেগুলো মেয়ে ঘুম থেকে ওঠার আগে আগেই ধুতে হবে। তার মেয়েটাকে ধরার মতো কেউ তো নেই। কখন যে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল টের পেলো না শিউলি।
শিউলি মেয়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়নি। সে গেছে পুকুরে কাঁথা, কাপড় ধুতে। কল চেপে কাপড় ধুতে শিউলির কষ্ট হয়। কাটা পেটে টান লাগে।

তাই এখন পুকুরেই ধোয়। পুকুরটা বাড়ি থেকে খানিক দূরেই। এখান থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যাওয়ার কথা না। হালিমাকে অবশ্য বলে এসেছিল মেয়েটা কাঁদলে তাকে ডেকে দিতে। হালিমা ইচ্ছে করেই দেয়নি। তার ভাইজান মেয়ের কান্নায় কী প্রতিক্রিয়া দেখায় সে দেখতে চায়। সবসময় মায়েরাই কেন সন্তানকে ধরবে? বাবা শুধু চুমু খাওয়ার জন্য জন্ম দিয়েছে? মা নয় দশমাস গর্ভে ধারণ করবে, জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বাচ্চা জন্ম দেবে, জন্মের পরে বাচ্চার দেখভাল করবে, বাচ্চার কাঁথা কাপড় ধোবে আর বাপ ফিটফাট পেলেই দুচারটে আদর দিয়ে খালাস? এত নাইনসাফি মানা যায়না। যদিও তার ভাইজান মেয়েকে ধরেই না আজ ধরিয়ে ছাড়বে হালিমা। মেয়েকে বাপ ধরবে না তো পাশের বাড়ির কদম আলী ধরবে?
হামিদা ঘর থেকে খ্যাকিয়ে উঠল। শিউলির সাড়াশব্দ না পেয়ে না চাইতেও মেয়েকে প্রকাশ্যে এই প্রথম কোলে নিল। মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে গলা বসিয়ে ফেলেছে। বাবার কোল পেয়ে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে শুরু করল। ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে বাচ্চাটা। হামিদ মেয়ের ভেজা কাঁথা কাপড় খুলে ফেলল। এখন সম্পূর্ণ উদোম বাচ্চাটা। ভেজা কাপড় সরে যেতেই হামিদা চুপ হয়ে গেল। হামিদ খেয়াল করল মেয়ের ছোট্ট পেটটা তার বুকের উপর ফোঁপানোর কারণে হেঁচকির মতো ওঠানামা করছে। বাবার উদোম বুকে মুখ ফেলে নিশ্চিন্তে আবারও ঘুমাতে গেলে তার বোধহয় মনে হলো ক্ষিদে পেয়েছে। আবারও চেঁচিয়ে উঠে তার স্বরে কেঁদে উঠল। হামিদ মেয়েকে কান্না থামানোর জন্য নানা কথা বলছে।

“কান্দিস না, কোলে নিছি না? আবার কান্দোস ক্যান?” দোলাতে দোলাতে।
মেয়েকে তবুও নিজের কান ধরে কাঁদতে দেখে হামিদ এবার অপারগ হলো। রাতে তো এমন জ্বালায়নি এখন এমন করছে কেন হামিদ বুঝতে পারছে না। শিউলিকে দেখেছিল মেয়ে কাদলে কি কি বলে যেন কান্না থামিয়ে ফেলতে। হামিদও সেভাবে চেষ্টা করল কিন্তু মেয়ে কান্না থামানোর বদলে আরও চেঁচিয়ে উঠল। হামিদ না চাইতেও বিড়বিড়াল,
“এই পোলাহানের কান্দন থামায় ক্যামনে? কিছু কইলে দেহি আরও কান্দে। কই ওর মার সময় তো এমন করেনা। বাপের লগে পেডের ভিত্রেও যুদ্ধ করছে এহনও করতাছে।”
মেয়ের কান্নারত মুখের দিকে চেয়ে হামিদ অভিমানী গলায় বলে চলেছে নানা কথা। মেয়ের যে ক্ষুধা পেয়েছে হামিদ সেটা বুঝতে পারছে না। পেলেও বা তার কী করার? মেয়ের ক্ষুধা নিবারণের জিনিস তো তার কাছে নেই। হামিদের ভাবনার মাঝেই নিজের বুকের উপর কান্নারত মেয়েকে দাঁতহীন কোমল মাড়িটি বসাতে দেখে আঁতকে উঠল পিতৃদেহ। ঘুম টুম বিসর্জন দিয়ে আঁতকে উঠে ধুপধাপ খাট থেকে নেমে শিউলিকে হাঁক ছেড়ে ডাকতে লাগল।

“শিউলি, ওই শিউলি? কই গেলি?”
শিউলি সবেই সব কাপড় ধুয়ে উঠোনে পা রেখেছে। স্বামীর ডাক শুনে বোল রেখে চটপট ঘরে ছুটল। দুজনই দরজার অভিমুখে একসাথে বাড়ি খেল। মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো হামিদের আতঙ্কিত চেহারা দেখে শিউলি অবাক বিস্ময়ে চাইল। দৃশ্যটা এত মনোমুগ্ধকর!! বাপ, মেয়েকে এই প্রথম একসাথে দেখে কখন মুখ দিয়ে মাশাআল্লাহ্ বেরিয়ে গেছে শিউলি খেয়াল করেনি। দৃশ্যটা মন ভরে উপভোগ করার আগেই হামিদ চটজলদি মেয়েকে শিউলির কোলে হস্তান্তর করে রাগ দেখিয়ে উঠল।

“কই মরছিলি তুই? ওয় হেই কহনতে কানতাছে তোর হদিশ পাওন যায়না। কহনতে ডাকতাছি, ওয় কানে তালা দিয়া থুইছে। মা হইছে বাচ্ছা কহন খায়, কহন ঘুমায় হেইডাও বুঝে না। আলগা মা হইছে সে।” আলনা থেকে গামছা নিতে নিতে।
শিউলি মেয়েকে নিয়ে বিছানায় বসেছে ইতোমধ্যে। মায়ের চেনা গন্ধ পেতেই হামিদা মাকে খাবলে ধরল। শিউলির কেন যেন হামিদের কথা শুনে রাগ উঠল। মেয়েকে তো সেই দেখে। এই বাড়ির একটা মানুষ বাচ্চাটার দেখভাল করে? তারপরেও তার মাতৃত্ব নিয়ে লোকটা কীভাবে প্রশ্ন তুলল?
“আপনে এত বুঝেন, কয়দিন মাইয়ারে রাখছেন? ওর খিদা পাইছে যহন আপনে খাওয়ায়লেন না ক্যান? খালি মুহেই কওয়া যায়, কাজের বেলায় নাই।”
“কী কইলি?” হামিদের বিস্মিত কণ্ঠ।
“যা হুনছেন হেডাই কইছি।”

শিউলি ইতোমধ্যে মেয়েকে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে খাওয়াচ্ছে। ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখা। মুখ হামিদের থেকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে করে রেখেছে। হামিদ খিটমিট করে বলল,
“বাচ্ছাডা খিদায় আমার বুক খাবলাইছে, কানতে কানতে গলা বসায় ফালাইছে তাই তোরে ডাকছি আর তুই আমার লগে গলা চড়াইতাছস? ছ্যাঁছা পড়তাছে না মেলাদিন তাইনা?”
“আমার গায়ে হাত দিয়া দেহেন।” শিউলিরও পাল্টা জেদ।
হামিদ এগিয়ে এসে শিউলির মুখ যেইনা ধরতে যাবে অমনি ছড়ছড় করে মেয়ে প্রস্রাব করে দিল। সেসব ছিটকে হামিদের মুখে, বুকে এসে লাগল। বাচ্চাটা শুয়ে শুয়ে কাজ সেরে ফেলেছে। শিউলির কাপড় ভিজে একাকার। হামিদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শিউলি প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেয়ে হামিদের দিকে চেয়ে আঁতকে উঠেছিল। এই বুঝি লোকটা মেয়েকে কোল থেকে নিয়ে আছাড় দেয়। কিন্তু হামিদকে ক্যাবলার মতো চেয়ে থাকতে দেখে শিউলির এত হাসি পেল। মনে মনে বেশ হয়েছে, উচিত হয়েছে বলে হেসে কুটিকুটি হলো। বাচ্চাটা মায়ের ওড়নার কোণা ধরে বাবার দিকে পিটপিটিয়ে চাচ্ছে। যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ নয় বাবা, আল্লাহ আমাকে মায়ের সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।হামিদ সেই চাহনি দেখে কেন যেন রাগ দেখাতে পারল না। মাথা গরম নিয়েই হনহনিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যেতে যেতে শিউলির হাসির শব্দ কানে এসে বিঁধল। মেয়েকে প্রস্রাব করার জন্য বাহবা দিচ্ছে শিউলি। হামিদ একবার একা পাক শিউলির এই উপহাসের শাস্তি যদি তাকে না দেয় তার নামও হামিদ সর্দার না।
হামিদ বেরিয়ে যেতেই হালিমা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল। শিউলি মেয়েকে পরিষ্কার করিয়ে কাপড় পরাচ্ছিল। হালিমাকে হাসতে দেখে বলল,

“হাসো ক্যান?”
“কী হইছে হুনবা না ভাবি? তুমি তো আছিলা না। ভাইজান হের মাইয়ার কান্দন থামে না দেইখা কী কয় জানো?”
“কী কয়?” শিউলির উৎসুক চাহনি।
“কয়, তোর মায়ে কইলে তো লগে লগে থাইমা যাস, আমার লগে তোর কিয়ের শত্রুতা? মায়ের ন্যাওটা পোলাহান আমি এইলিগাই দেখতারি না। ভাইজানের কতা শ্যাষ না হইতেই হামিদার আবার চিক্কুর দিয়া কান্দা শুরু। ভাইজানের কি অভিমান!”

হালিমা হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছে। শিউলিরও কেন যেন হাসি পেল খুব। বুড়ো লোকটার অভিমানী চেহারাটা কল্পনা করতে চাইল। শিউলি কল্পনায় মেয়ের পাশে গাল ফুলিয়ে রাখা এক বয়স্ক বাচ্চাকে দেখল। মুখ টিপে হাসল। মেয়ের দিকে চাইতেই দেখল বাচ্চাটা মায়া মায়া দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। শিউলি মেয়েকে আগলে নিয়ে গালের সঙ্গে গাল মিশিয়ে রাখল।
“আমার টুনটুন পাখি একখান। মায়ের ভদ্দর মাইয়া। তোর বাপরে নাকানিচুবানি খাওয়াইছস?
বাচ্চাটা কি বুঝল জানা নেই, ঠোঁট দুটো ছড়িয়ে ‘আ..আ.. এ’ গার্গল করতে লাগল। হালিমা ভাতিজির গাল টিপে টপাটপ কয়েকটা চুমু বসিয়ে দিয়েছে। সোবহান ঘুম থেকে উঠে মাকে না দেখে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। বহু কসরত করে বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে রোয়াকের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল।

“আম্মা, আম্মা..”
হালিমা ছেলের কান্না শুনে বেরিয়ে এল। মাকে দেখতে পেতেই বাচ্চাটা দৌড়ে এসে পা আঁকড়ে ধরল। হালিমা মাথায় হাত বুলিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। কলপাড় খালি, হালিমা বুঝল ভাইজান গরুকে খাবার দিয়ে পুকুরে ডুব দিয়ে আসবে। ভাবি বলেছে প্রতিদিন এমনই করে। ছেলের মুখ ধুইয়ে দিয়ে হালিমা ওড়না দিয়ে মুখ মুছে দিল। শিউলি মেয়েকে হালিমার কাছে দিয়ে নাশতা বানাতে উনুনে আগুন ধরাল। আজকের নাশতায় থাকবে ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল। মানুষজন বেশি। এত মানুষের রুটি শিউলি একা বেলতে পারবে না এই কাঁচা ঘা নিয়ে। তাই হালিমাই বলেছে চাল ধুয়ে চড়িয়ে দিতে। আর চালের সঙ্গে কয়েকটা আলু দিয়ে দিতে। পেঁয়াজ, মরিচ পুড়িয়ে ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে অমৃত লাগে।
হালিমা সোবহানের গায়ের জামা খুলে পাতলা গেঞ্জি পরিয়ে দিল। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে স্নো বের করে ছেলের মুখে ডলল। মাথার চুল আঁচড়ে পরিপাটি করে দিল। হামিদাকে শিউলি খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে গেছে। সোবহান আঙুল তাক করে বলল,

“ওটা কে?”
“তোর ছোডো বইন হয়। যা বইনরে আদর কইরা দে। ঘুম ভাঙ্গাইস না আবার। আস্তে ধরিস।”
সোবহান মায়ের কথা শুনে ঘাড় নাড়িয়ে হামিদার পাশে বসে নিজের ছোট্ট আঙুল দিয়ে তাকে খোঁচা দিল। খোঁচা দিতেই মোলায়েম শরীরটা ডেবে গেল। সোবহানের এটা ভালো লাগল। আবারও আঙুল দিয়ে চাপ দিল। বাচ্চাটা ঘুমের মধ্যেই কেঁপে কেঁপে উঠছে। হালিমা ছেলেকে বোনকে দেখে রাখতে বলে ভাবির কাছে গেল সাহায্যের উদ্দেশ্যে। কিছু কেটে কুটে দিলে ভাবির সাহয্য হয় যদি। মা, ছেলে তো উঠেছে ভাবির সংসারে।

সোবহান বোনের পাশে গড়াগড়ি করল কিছুক্ষণ। কিন্তু বাচ্চাটাকে নড়তে চড়তে না দেখে চুপচাপ বিছানায় পড়ে রইল। তারপর নতুন উদ্যমে মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে বিছানায় বসল। সব ঢেলে ফেলে লিপস্টিক, স্নো, পাউডার, কাজল খুলে খুলে বোনের উপরে আনাড়ি হাতে প্রয়োগ করতে লাগল। মাকে দেখেছে কোথাও গেলে কিংবা কখনো কখনো ঘরেই সেজে বসে থাকতে। তার আব্বা এসে আম্মাকে জিজ্ঞেস করতো, এমন সঙ সেজে বসে থাকার কারণ? যদিও সব কথা সোবহানের বোধগম্য হতো না। কেবল দুই একটা কথা তার মাথায় ঢুকতো। আব্বার কথা শুনে তখন আম্মা এত রাগ করত যে সবকিছু ওড়না দিয়ে ঘষে ঘষে উঠিয়ে ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে যেতো। আব্বার আবার নিজের হাতে আম্মাকে সাজিয়ে দিয়ে সেই রাগ ভাঙানো লাগতো। সোবহান প্রায়ই ঘুমের ঘোরে তার আব্বাকে এমন করতে দেখেছে। তাই তার ছোট্ট মস্তিষ্কে সেটা ভালোভাবেই গেঁথে আছে। এগুলো দিয়ে সাজে। তাই বোনকে সাজিয়ে আনন্দ পাচ্ছে বাচ্চাটা।
হালিমা ভাবিকে কেটে কুটে দিয়ে এসে ঘরে ঢুকতেই চোখে কপালে তুলে ফেলল। সোবহান মাকে দেখতে পেতেই মায়াবী হাসি দিল।

“আম্মা, বুনকে সাজাইচি আব্বার মুতুন। চুন্দো চুন্দো।” বলেই হাততালি দিতে লাগল।
হালিমা দেখল হামিদার পুরো মুখে কাজল দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। কপালে লিপস্টিক দিয়ে প্রলেপ এঁকে দিয়েছে। হালিমা রাগে কথা বলতেই ভুলে গেল। পুরো বাপের মতো অজাত কীভাবে হলো এই ছেলে? শিউলি এসেছিল ভাতের মাড় গেলে মেয়েকে দেখতে। মেয়ের এমন হালত দেখে আঁতকে উঠতে গিয়েও কেন যেন সোবহানের হাসি দেখে চুপ মেরে গেল। বাচ্চাটা হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে আর বলছে,
“বুনকে সাজাইচি আব্বার মুতুন।”
ভাবির সামনে এমন কথা বলায় হালিমা ছেলেকে কয়েকটা দিল ধুমধাম করে। কতবড় বেলাজ এই ছেলে! বাপটার মতো হয়েছে। সবার সামনে তাকে খারাপ বানিয়ে ওই লোক এমন মুখ বানিয়ে চলে যেন কিছুই করেনি অথচ করে দুনিয়া এপাশ ওপাশ করে ফেলেছে। তাকে ডাকে পাগল, কুমড়োপটাশ, ছ্যানছ্যানানী। মা, বোনের সামনে ভিজে বেড়াল হয়ে চলে। আর সব কটু কথা শুনতে হয় হালিমাকে।
এদিকে সোবহান মার খেয়ে কেঁদে যাচ্ছে। শিউলি কোলে নিল সোবহানকে। সোবহান মামীর কোলে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হালিমা ফুঁসতে ফুঁসতে সবকিছু ব্যাগে ভরে হামিদাকে কোলে নিল। বাচ্চাটা এত চিৎকার, চেঁচামেচিতে উঠে গেছে। হালিমা ওড়না দিয়ে বাচ্চাটার পুরো মুখ মুছিয়ে দিয়ে বুকে আগলে রাখল।

হামিদ সন্ধ্যার দিকে বাজারের ওদিকে গিয়েছিল। ভাগ্নের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে। বাচ্চাটা কতদিন পরে এসেছে। যদিও হাতে টাকার টান আছে। তবে একয়দিন বেচাকেনা যা হয়েছে তা দিয়েই ভাবল সস্তার ভেতরে কিছু কিনে নেয়া যাক। হামিদ একটা শার্ট, একটা প্যান্ট আর একটা জুতো কিনল। দাম কম হলেও কাপড়ের মান খারাপ না। শত হলেও সোবহান অবস্থাসম্পন্ন ঘরের সন্তান। খারাপ কিছু দিলে খারাপ দেখায়। সোবহানের জন্য কেনাকাটা করার সময় বাচ্চা মেয়েদের কয়েকটা ছোট ছোট ফ্রক দেখল। মেয়েকে এখনো কিছুই দেয়া হয়নি তার। সে কম দামের ভেতর কয়েকটা পাতলা সুতির স্যান্ডো গেঞ্জি, ফ্রক, হাফপ্যান্ট নিল। বাচ্চাটাকে শুধু তার লুঙ্গি পেঁচিয়ে রাখে এতে হামিদের বেশ খারাপ লাগে। যেহেতু বাজারে এসেছেই দুজনের জন্যই কেনা হলো। বাচ্চাদের জন্য কিনতে গিয়ে সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এই টাকাগুলো কিস্তির লোকদের জন্য জমিয়েছিল। এখন কিস্তির লোকদের কি দেবে ভেবে পাচ্ছেনা হামিদ। সেসব চিন্তা বাদ দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য হাঁটা দিল। বাচ্চা দুটোর জন্য কিনতে পেরে ভালো লাগছে। বিশেষ করে মেয়ের জন্য এই প্রথম কিছু কিনল সে। কিস্তির চিন্তা করে এই সাময়িক সুখ বিসর্জন দিতে নেই।

বাজার থেকে এসে হালিমাকে ব্যাগ দুখানা দিল। হালিমা অবাক হয়ে ব্যাগ খুলে দেখে বুঝল একটায় সোবহানের জামা আরেকটায় হামিদার। শিউলি তখন পিঠা বানাচ্ছিল। হেলেনা পারভীন নিজেই মেয়ের জন্য পিঠা বানাতে বসেছেন আজ। মেয়েটা মায়ের হাতের পিঠা খাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে গেছে। পুরো বাচ্চাদের মতো লাফাচ্ছিল পিঠা খাওয়ার জন্য। হেলেনা পারভীন মেয়ের আবদার আর ফেলতে পারেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েই বসে গেছেন পিঠা বানাতে। শিউলি শুধু সাহায্য করছে। হালিমা দৌড়ে এসে পাকঘরে ঢুকল,

“ভাবি দেইখা যাও। ভাইজান কী আনছে তাত্তারি দেইখা যাও।”
হেলেনা পারভীন কপাল কুঁচকে বললেন,
“কাম করতাছে দেহস না? কী আনছে যে এমন চিক্কুর পাইড়া তোর পুরা পাড়া জানানি লাগব?”
“তোমারে কওন যাইতো না। তুমি হুনলে গোসসা করবা।”
“কী কইলি? আমি গোসসা করুম ক্যান?”
“কারণ ভাবি আর ভাবির মাইয়ারে তুমি দেখতারো না। খালি কূডনামি করো পিছে পিছে।”
শিউলি এবার কথা বলে উঠল,
“হালিমা আম্মার লগে এমনে কতা কও ক্যান?”

“থাক তোর আর ডং করন লাগতো না। মাইয়াডার মাতাডা তো পুরাই খাইছস। যাইয়া দেখ তোর সোয়ামী কী আইন্না উল্টায় ফালাইছে। আমি তো আবার কূডনামি করি।”
শাশুড়ির কথায় শিউলির বেশ খারাপ লাগল। এখানে তার দোষ কোথায়? সবকিছুতে আম্মা তার দোষ খুঁজে পায়। হালিমা তাকে তাগাদা দিয়ে ঘরে পাঠাল। শিউলি বেজার মুখে ঘরে ঢুকতেই দেখল হামিদ মেয়েকে জামা পরানোর চেষ্টা করছে। বাচ্চাটা ঘুম থেকে উঠে গেছে ইতোমধ্যে। শিউলি অবাক হয়েছে এই দৃশ্য দেখে। জামা কি লোকটা মেয়ের জন্য এনেছে? শিউলির চোখ ছলছল করছে। এত সুন্দর দৃশ্য! আজকে দুই দুইবার এমন সুন্দর দৃশ্যের মুখোমুখি সে হয়েছে। এইতো মেয়েকে এভাবে আগলে নিলেই তো শিউলি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।

এদিকে হামিদ মেয়েকে বহু কসরত করে জামা পরাতেই দেখল জামাটা মেয়ের পা বেয়ে নিচে চলে গেছে। সবগুলো জামাই মেয়ের বড়। হামিদ হতাশ হলো। দোকানি বলেছিল সবগুলোর ছোট সাইজ আছে, হামিদই পাকনামি করে বড় সাইজ নিয়ে এসেছে। এখন গায়ে লাগছে না একটাও। সব ঢিলে আর বড়। মুখটা বেজার করে জামা খুলে প্যাকেটে ঢুকিয়ে রাখল। মেয়েকে শুইয়ে দিয়ে গামছা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই শিউলি ঘরে ঢুকল। শিউলি স্বামীর মন খারাপের কারণ বুঝল। সে সবগুলো জামা বের করে দেখল খুব সুন্দর সুতির জামা। মেয়ের আরামের জন্যই এনেছে বুঝেছে সে। শিউলি ঝটপট মেয়েকে পরিয়ে দিয়ে আদর করতে লাগল। মেয়ে খুশি, মেয়ের মাও খুশি। বাবার দেয়া প্রথম তোফা, একটু বেশিই বিশেষ শিউলি আর তার মেয়ের কাছে।

মেয়েকে পরিপাটি করে শিউলি হামিদ আসার আগেই বেরিয়ে গেল। বেড়ার ফাঁকে লুকিয়ে থাকল। সে দেখতে চাইছে একজন বাবার প্রতিক্রিয়া। শিউলি জানে সে সামনে থাকলে হামিদ জীবনেও মেয়েকে আহ্লাদ করবে না। তাই তো এই পদ্ধতি অনুসরণ। হামিদ মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল। খাটের উপর মেয়েকে তার কিনে আনা জামা পরে পুতুলের মতো হাত, পা ছুড়তে দেখে হামিদের এত ভালো লাগল। বুকটা প্রশান্তিতে ভরে উঠল যেন। শিউলি কীভাবে যেন পরিয়েছে এখন ঢিলে লাগছে না। এত কম দামি জামায়ও বুঝি কাউকে এমন রাজকন্যার মতো লাগতে পারে! হামিদ এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসল। বাচ্চাটা লিপস্টিকের মুখ নিয়ে খেলছে।

শিউলি ফুল পর্ব ৬

হামিদ মন ভরে মেয়েকে দেখতে লাগল। একটু পরে হামিদা হুট করেই দুইহাত আর এক পা নাচিয়ে হেসে উঠল। হামিদ নুয়ে মেয়ের গালে আলতো করে চুমু দিল। বাচ্চাটা ঠাস করে বাবার গালে হাত বসিয়ে নানারকম শব্দ করতে লাগল। হামিদ মেয়ের নমনীয় গালের সঙ্গে নিজের গাল ঠেকিয়ে রাখল।

শিউলি ফুল পর্ব ৮