Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৮

শিউলি ফুল পর্ব ৮

শিউলি ফুল পর্ব ৮
তাজরীন ফাতিহা

বেলা বাড়ার লগ্নেই সূর্যি মামা তার তেজস্বী কিরণ ছড়াচ্ছে মুহুর্মুহু। কি তার নিদারুণ দীপ্তি! অদূরে দাঁড়ানো তালগাছ দুটো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। চেরা পাতার ফাঁক গলে সূর্য রশ্মি উঁকি দিচ্ছে। হালিমা পাকঘরের দাওয়ায় বসে টমেটো, বড়ই, চালতা, তেঁতুল, কাঁঠালের মুচি দিয়ে বানানি বানাচ্ছে। পাশের বাড়ির মেয়ে, বউরাও হাজির। সকলেই কিছু না কিছু দিয়েছে। হালিমা এলেই পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে। অন্যথায় বাড়িটা একদম শান্ত হয়ে থাকে। হেলেনা পারভীন শিউলিকে অন্যদের বাড়ি যেতে দেননা, মিশতেও দেননা। তাই শিউলির তেমন সখ্যতা নেই কারো সাথে যেমনটা হালিমার আছে। হেলেনা পারভীনও মেয়েকে কিছু বলেন না, কারণ মেয়ে তার এতই ত্যাড়া যে তার কথা গ্রাহ্যই করেনা। সেই ছোট্ট হালিমা হয়েই পুরো বাড়ি মাতিয়ে তোলে। তপ্ত দুপুরে টক, ঝাল খেতে ভারী মজা লাগে। সোবহান একটু পরপর মায়ের কাছে বাটি নিয়ে আসছে। ওদিকে যে তার প্যান্ট কোমর বেয়ে নেমে পড়ছে সেদিকে বিশেষ একটা খেয়াল নেই তার। তার একমাত্র আকর্ষণ বানানীর দিকে। বানানী বানিয়ে সবাইকে ভাগ করে দিয়ে শিউলি আর হালিমা এক গামলায় খাচ্ছে। সোবহানও মায়ের পাশে বসে হাত ঢুকিয়ে টুকটুক করে খাচ্ছে। মুখটা ঝাল, টকে বেঁকে গেলেও মায়ের মতো বেশ ঝাল খেতে পারে বাচ্চাটা। পাশেই অনাদরে তার সেই স্টিলের বাটিটা গড়াগড়ি খাচ্ছে।

“হালিমা, পোলারে এমুন ঝাল খাওয়াও?” ঝালে নাক কান দিয়ে আগুন বের হচ্ছে শিউলির।
“আমি খাওয়াই? সেকান্দারের বাচ্ছাডায় জিলভা বাইর কইরা খাড়ায় থাহে। মনে কয় এমন দেয়া দেই। হারাদিন আমার পিছ পিছ ওর ঘুরন লাগব। যেদিকে যাই হেইদিকেই এইডা। ঝাল খাইয়া হুইত্তা থাহুক, ঝালের মজা পিছন দিয়া বাইর হইব।” হাত চেটে।
“ওর ঝাল খাওন দেইখা আমারই ঝাল লাগতাছে। এইটুক পোলা এমুন ঝাল খাওয়া শিখছে কই থেইকা? ওর বাপে ঝাল কেমন খায়?”
“ওর বাপে হইলো ফটকা বাবা। ফটকা বাবা বোঝো? ঘোড়ার আন্ডাও পারেনা। খাওন বাছা মানুষ। ঝাল, টক এক্কেরেই পছন করেনা। সোবহান পেডে থাকতে একবার তেঁতুল দিছিলাম খাইতে, ওমা হেয় কী কয় হুনবা না? কয়, কী খাওয়াইছোস আন্ধার আন্ধার লাগে ক্যান? তেঁতুল খাইয়া বলে হের আন্ধার আন্ধার লাগে? কও এই বেডারে কী করতে মুঞ্চায়?
শিউলি হাত গুটিয়ে নিয়ে বলল,

“তোমার ভাইজানেও এসব খাইতারে না। কয় হের সামনে এগুলা না আনতে। যেই মেজাজ!”
“সব বেডা গুলাই নিরামিষ। টক ঝাল না খাইলে জীবনডাই তো পাইনসা।”
শেষের ঝোল খেতে গিয়ে শিউলি আর হালিমার কাড়াকাড়ি লেগে গেল। হালিমা গামলা নিয়ে দ্রুত দৌড়ে উঠোনে চলে গেল। ঝোল মুখে নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসল। শিউলি কতদিন পরে ননদের সাথে প্রাণখুলে আনন্দ উপভোগ করল। তার চোখে পানি এসে গেছে সেই মুহূর্তে। মা বেঁচে থাকতে সেও এককালে এমন মজা করেছে।
বানানী খেতে গিয়ে সোবহান গেঞ্জিতে ভরিয়ে ফেলেছে। হালিমা ছেলেকে ডলে ডলে গোসল করাচ্ছে। সোবহান স্থির থাকছে না। পানি গায়ে লাগলেই লাফিয়ে উঠছে। হালিমাকে ভিজিয়ে ফেলেছে। ছেলেকে কয়েকবার ধমক দিলেও লাভ হয়নি। বাচ্চাটা আরও বেশি ত্যাড়ামো করছে। হালিমার রাগ তরতর করে বাড়ছে। এখন মারলে হেলেনা পারভীন এসে হাজির হয়ে যাবেন অথচ এইযে জ্বালানোটা জ্বালায় সেসব কেউ দেখতে আসবে না। সোবহানকে গোসল করিয়ে মাথা মুছিয়ে উঠোনে রোদের মাঝে দাড় করিয়ে রেখে হালিমা গেছে গোসলে। গোসল শেষে বের হতেই দেখল সোবহান বসে বসে মাটি খাবলাচ্ছে। একটু আগে যে হালিমা কষ্ট করে গোসল করালো সব নিমিষেই পণ্ড করে মাটিতে আঁকিবুকি করছে। রাগে সারা শরীর চিরচির করে উঠল হালিমার।

ছেলেকে মাটি থেকে টান দিয়ে উঠিয়ে পরপর কয়েক ঘা লাগাল। মার খেয়ে কতক্ষণ চুপ হয়ে তাকিয়েছিল হালিমার পানে। যখনই ব্যথা অনুভূত হয়ে মস্তিষ্ক সংকেত দিল তখনই কেঁদে উঠল কুঁই কুঁই সুর তুলে। হালিমা আরও কয়েক ঘা দেয়ার মুহূর্তে সেকান্দার বাড়িতে ঢুকল। হাতে মিষ্টি সম্ভবত। স্বামীকে দেখে হালিমা মাথায় ঘোমটা টেনে হাত থেকে মিষ্টি নিয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকল। এখনই লোকটাকে আসতে হলো? বলবে তো তার ছেলেকে মেরে শুইয়ে ফেলেছে সে। ছেলেকে ফিটফাট করে রাখলে আসেনা, আসে গুতা দেয়ার সময়।

হালিমা ঘর থেকে বেরিয়ে হেলেনা পারভীনের ঘরে উঁকি মেরে দেখল নামাজে দাঁড়িয়েছেন তিনি। আর শিউলি মেয়েকে খাওয়াচ্ছে। ভাবি তো তার স্বামীর সামনে এমনিতেও আসবে না। তাই হালিমাই নিজ উদ্যোগে উঠোনে একটা চেয়ার বের করে দিল। সেকান্দার গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসল।
এদিকে বাপকে দেখে সোবহানের আনন্দের অন্ত রইল না। হাততালি দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে নিজের খুশি জানান দিচ্ছে বাচ্চাটা। মা তাকে কীভাবে কীভাবে, কোথায় কোথায় মেরেছে সব জানাল একে একে। খুব গুছিয়ে, সময় নিয়ে আব্বার কাছে নালিশ করেছে সে। মুখটা অন্তত দুঃখী বানিয়ে বোঝাল এতদিন আব্বা না থাকায় কীভাবে আম্মা টাস টাস মেরেছে তাকে। সেকান্দার মনোযোগ দিয়ে তা শুনল। মুখে রা করল না কোনো। নিজের বাচ্চার গায়ে হাত ওঠানো সে মারাত্মক অপছন্দ করে, হালিমা সেটা জেনেও কীভাবে ছেলের গায়ে হাত ওঠাল? এক পল অদূরে দাঁড়ানো হালিমার পানে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সোবহান কোত্থেকে যেন একটা কাঠের সরু লাকড়ি জোগাড় করে বাবার হাতে দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,

“আব্বা,, আম্মা সুদু মায়ে। কুনু দুত্তামি কলি নাই, তাও মালছে। পিথে, ওগায় (পশ্চাৎ দেখিয়ে) থাস থাস মালি নাল বানায় ফেলছে। চিকেন্দারের বাচ্ছা ডাকছে। বুনকে আপনেল মুতুন কলি চুন্দো চুন্দো সাজাইচি। তকনও মালি পুলায় ফেনছে। একুন আম্মালে নাল বানান আব্বা।”
হালিমা সেসব দেখে আঁতকে উঠেছে। সর্বনাশ, তার পেট চিরে দেখি কালসাপ বেরিয়েছে। বাছুর সাইজের কালসাপ। হালিমা হাতের কাছে পেলে পাড়া দিয়ে সেকান্দারের বাছুরটাকে শায়েস্তা করবে বলে ঠিক করল। সবকিছুতে ‘আব্বা আব্বা’ করা ছুটাবে সে। কতবড় কলিজা! জন্মদাত্রীকে মারতে বাপকে উস্কে দিচ্ছে, বদের ঘরের বদ! পাকঘরে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। লোকটা যেভাবে শীতল চোখে চাইছে সত্যি সত্যি মেরে টেরে বসবে না তো? হালিমা রাগী রাগী চেহারায় উঠোনে নেমে পানি এগিয়ে দিল। সেকান্দার নিল। হালিমা এই ফাঁকে ছেলেকে চোখ রাঙাচ্ছে। মেরে আজকে ফুলিয়ে ফেলবে এই বাছুরকে। পানি ঢকঢক করে পান করে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিল সেকান্দার। হালিমা গ্লাস নিয়ে যেই ঘুরতে যাবে অমনি গমগমে স্বরটা কানে বোলতার মতো ফুটল।

“পোলারে ঠিক কইরা মারতে পারতেছিলি না দেইখা তোর বাড়িতে আইছোস? সাহস বাইড়া গেছে?”
“হ অনেক বাড়ছে। আপনেরে কেডা আইতে কইছে? আমার পোলা আমি মারমু। আপনের কী? ও আপনেরও তো পোলা। তাইলে আপনে চুম্মান, আমি তো পিডামুই। বড় হইয়া যেন বউয়ের হইয়া কয়ডা কতা কইতে পারে। আমি আর যাইহোক জালিম হাউড়ি হমু না। পোলার বউরে মাথাত কইরা রাহুম।”
“মাথায় না কোথায় রাখবি এহনই হেইডা দেখতে পারতেছি। এহন তো হুদা পোলারে পিডাস, পোলার বউ আনলে বউরে সুদ্ধা পিডাবি। ছ্যানছ্যানানী কোনহানের।”
হালিমা ফুঁসতে লাগল। এত বড় কথা এই লোক কীভাবে বলল? সে তার ছেলের বউকে পিটাবে? ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। সেকান্দার আরও একটু আগুনে ঘি ঢালল।

“কানের কাছে সাপের লাহান ফোঁস ফোঁস করিস না। দূরে গিয়া খাড়া, দেইখা তো মনে হইতাছে ছোবল মারবি। তোরে এক আনারও বিশ্বাস নাই। দেহা গেল ফোঁস ফোঁস করতে করতে সত্যিকারের সাপ হইয়া গেছস। এমনিতেও সাপের থেইকা কোনদিক দিয়া কম না। খালি খোলসডা পালডাইলেই হইব।”
“কী কইলেন!!” হালিমা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সেকান্দারের এদিকে মনোযোগ নেই। বউকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে সে নিশ্চিন্তে হাওয়া খাচ্ছে। সোবহান বাবার ঠ্যাং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে নড়লে মা তাকে বেলুন বানাবে। সে অত বোকা না, বাবাই তার একমাত্র আশ্রয়। হালিমা ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল। লোকটা এমন কথা বলতে পারল! সে নাহয় একটু রাগ দেখায় তাই বলে সাপের সাথে তুলনা করবে তাকে? সে আর কোনো কথাই বলবে না এই লোকের সঙ্গে। ওই সেকান্দারের বাছুরকেও আশপাশ ঘেঁষতে দেবে না।

সেকান্দার আসার উপলক্ষে বাড়িতে পোলাও, গোশত রান্না করা হয়েছে। সাথে ছোট মাছের চচ্চড়ি, পটল ভাজা, মুগ ডালের ঘণ্ট। হেলেনা পারভীন পারেন না জামাইকে মাথায় তুলে রাখেন। এত আয়োজন করেও যেন কিছুই করেননি এমন হায় হুতাশ করছেন তিনি। তালপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে আফসোস করছেন,
“তোমার ভাইজানের আয় রোজগার একেবারেই নাই, নইলে আরও কিছু জোগাড় করতাম বাবা। কিছু মনে কইরো না, পেড ভইরা খাও।”
বলে গোশত তুলে দিলেন পাতে। সেকান্দার দিতে নিষেধ করল। পুরো থালা ভর্তি খাবার। তারপরেও হেলেনা পারভীন তরকারি দিচ্ছেন একটু পরপর। হামিদ এসেছে দুপুরের খাবার খেতে। দুজনে পাশাপাশি বসে খাচ্ছে। সেকান্দার নিজ থেকেই সমুন্ধির পাতে খাবার তুলে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সে বেশ ভালোই আদব লেহাজ সম্পন্ন। হামিদ খেতে খেতেই শুধাল,

“সেকান্দার ব্যবসা কেমন চলে?”
“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালাই ভাইজান।”
“হালিমা কইলো ব্যস্ত থাহো বলে, মাঝেসাঝে ওরে লইয়া ঘুইরা যাইতে পারো না কয়দিনের লাইগা?”
সেকান্দার এক পলক হালিমার পানে চাইল। ছেলেকে খাওয়াচ্ছে। বাচ্চাটা মুখের ভেতর খাবার নিয়ে বসে আছে। কেউ না থাকলে এতক্ষণ বোধহয় হালিমা কয়েক ঘা বসিয়ে দিত। বাচ্চা মারার ক্ষেত্রে হালিমার জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে সেকান্দারের বাচ্চা। সেকান্দার আর সেকান্দারের মায়ের রাগ ওঠায় ছেলেটাকে মেরে। লম্বা একটা শ্বাস ফেলল,

“কাজ থাহে ভাইজান। হালিমা তো আসেই।”
“তবুও তুমিও লগে আইবা। ওর ভালা লাগব।”
হেলেনা পারভীনও ছেলের সঙ্গে একমত জানালেন।
“হালিমা সেকান্দাররে আরেক টুকরা গোশত দে।” হামিদের হুকুম।
হালিমা বাম হাত দিয়ে উঠিয়ে দিল। হেলেনা পারভীন মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে ঠোঁসা দিলেন। হালিমা সেদিকে চাইতেই হেলেনা পারভীন ফিসফিস করে বললেন,
“ডাইন হাত দিয়ে দিতে হয় জনোস না? কী শিখাইছি তোরে?”
“আমি পোলারে খাওয়াই চোহে আন্ধা তুমি?”
“চামচ বাম হাত দিয়া ধরছস ভালা কতা, ডান হাতের উল্ডা পিড ছোঁয়াইয়া দেয়া লাগে। এগুলান ভদ্রতা। কুনু কামের না, ছেড়িডা।”
“কত যে রং ঢং তোমাগো। ওই মুহের খাওন গিলোস না ক্যান? মুখ চাইপা গিলামু কইলাম। হাতখান অবশ হইয়া গেছে। তোর বাপের কাছে ভাত রাইখা যামু, বড় বড় কতা বাইরাইয়া যাইব।” মুখ মুচড়ে।
সেকান্দারকে স্পষ্ট খোঁচা দিল। হেলেনা পারভীন চোখ রাঙাচ্ছে মেয়েকে। হালিমা চুপ করে গেল।

হামিদ খেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। হামিদকে দেখে শিউলি হাসল একটু। হামিদ দেখল শিউলি ভাত খাচ্ছে পটল ভাজি, আর চচ্চড়ি দিয়ে। পাশেই মেয়ে ঘুমাচ্ছে। হামিদ শার্ট পরতে পরতে শুধাল,
” পোলাও, গোশত নিলি না?”
“পোলাও অল্প আছিল। আম্মায় সেকান্দার ভাইয়ের লাইগা রানতে কইছে।”
“হুদা সেকান্দারের লাইগা রানলে আমি খাইলাম, হালিমা খাইল কেমনে?”
“আমার পোলাও ভাল্লাগেনা।” শিউলি পাশ কাটিয়ে গেল।
হামিদ আর কিছুই বলল না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে হেলেনা পারভীনের ঘরে ঢুকল। তিনিও ভাত, মাছ খাচ্ছে। হামিদকে দেখে বললেন,
“আয় ব। কিছু কবি?”
“আইচ্ছা আম্মা, বাড়ির বউগো কী পোলাও, গোশত খাওয়া বারণ?”
“বারণ হইব ক্যান?”
“তয় আপনেরে যে সবসময় দেখছি ভালা মন্দ রান্ধা হইলে খাননা? মেহমান ঘরে আইলেই তো শুধু ঘরে পোলাও গোশত রান্ধা হয়। সবসময় দেখছি আপনে ভাত, রুটি খাইয়া কাডায়াইয়া দিছেন, এহনও এমন করেন। ক্যান আম্মা? আপনেগো কী ভালা খাইবার মন চায়না?”
হেলেনা পারভীন মুখের খাবার গিলে বললেন,
“এহন মুহে আগের মতো রুচি নাই। পোলাও, গোশতের চাইয়া আমার এগুলাই ভালা।”
“হুনো আম্মা, আমগো থাল ঠাইসা পোলাও, গোশত না দিয়া আপনেরা বাড়ির বউ, ঝিরাও একটু খাইয়েন। রুচি আল্লাহয় খালি বেডাগোই দেয়নাই। আপনেগোও দিছে। রূহরে এতডা যন্ত্রণা দেয়াও ভালা না। আর কতকাল আপনেরা নিজেরা মন্দডা খাইয়া আমগো ভালাডা খাওয়াইবা? এরতে সবাই মিইল্লা অল্প কইরা ভালাডা খাওন ভালা না আম্মা?”

“তোর এত ভারী কতা বুঝি না বাপু।”
“বুঝেন না, নাকি বুঝতে চাননা। আপনের শরীর এমনিতেই খারাপ থাহে, হের উপ্রে খাওন লইয়া এমন রং ডং করেন।”
“ঘটনা কীরে? আগে তো খাওন লইয়া এত ভাবতে দেহি নাই। তোর বউ কিছু কইছে নাকি?” হেলেনা পারভীনের সন্ধিহান গলা।
হামিদ আর কথা বাড়াল না। সে কিছু বললে আম্মা এখন শিউলিকে নানা কথা শোনাবে। অথচ সে বাড়ির বউদের খাবার নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। কারো প্রতি মহব্বত দেখাতে না।

হামিদাকে পাউডার ঘষে কপালে কাজল দিয়ে দিল। বাচ্চাটা মায়ের ওড়না হাতের মুঠোয় ধরে আছে। শিউলি মেয়েকে আদর করছে আর নানা কথা বলছে। শিউলি কথা বললেই হামিদা ঠোঁট দুটো ছড়িয়ে ফেলে। শিউলির মাঝে মাঝে মনে হয় আল্লাহ তার মাকে নিয়ে তার মেয়েকে পাঠিয়েছেন।
“আমার আম্মা কই?” মেয়ের পেটে নাক দাবিয়ে।
হামিদা নানা শব্দ করে মায়ের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। যেন বুঝাচ্ছে এইতো। শিউলি মেয়ের সঙ্গে নানা আজগুবি কথা বলছে।
“আমার টিয়া পাখি কই?”
“আ.. আ..” গার্গল করছে।
“আম্মা টুনটুন পাখিরে খাওন দিব এহন?”

হামিদা দুপাশের ঠোঁট ছড়িয়ে ফেলল। শিউলি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় সেই নিষ্পাপ হাসি দেখল। আল্লাহ তার মেয়ের চেহারায় এত মায়া দিয়েছেন। মনে চায় সারাদিন চেয়ে থাকতে। মাশাআল্লাহ্! শিউলি নজর যেন না লাগে সেজন্য কাজল আরেকটু গাঢ় করে দিল।
“তোরে আম্মায় মেলা ভালা পাই। তোর বাপে আমগো পছন করেনা ক্যান কতো দেহি?”
হামিদা হাত, পা নাড়াতে লাগল। মায়ের প্রতিটা কথার বিপরীতে সে এভাবেই হাত পা নাড়িয়ে অথবা গার্গল করে জবাব দেয়। শিউলি মন ভরে দেখে তা। মেয়েকে উথাল পাথাল হয়ে আদর করে, তাও মন ভরে না তার। হামিদ বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছে সব। আসলেই কী সে শিউলি আর তার মেয়েকে দেখতে পারেনা? শিউলি আবারও মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে,

শিউলি ফুল পর্ব ৭

“তোর বাপে তোরে ভালা পায়, বুঝলি? দেখলি না তোর লাইগা জামা লইয়া আইছে। আমারে একটুও ভালা পায়না। একটু কালা তো হেইলিগা বোধহয়। আমি কি খুব খারাপ কতো? তোর আম্মার চেহারা ভালা না হামিদা?” নিভু নিভু করুণ কণ্ঠ।
হামিদা কি বুঝল জানা নেই কেঁদে উঠল তার স্বরে। শিউলি মেয়েকে বুকে আগলে চুপচাপ বসে রইল। তার চোখে পানির অস্তিত্ব টের পাচ্ছে হামিদ।

শিউলি ফুল পর্ব ৯