Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২২

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২২

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২২
আয়েশা শেখ

সেদিনের মতো আজও ইরানের বাবা মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়েছিল। ​তবে আজ তাকে প্রথম দেখতে পায় পুলিশ অফিসার ইমন। ইমন যখন তাকে পুলিশ স্টেশনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মেহরাজ তা দেখতে পায়। নিজের পরিচিতির লোকের কথা বলে ইমনের হাত থেকে মাতাল লোকটাকে ছাড়িয়ে নিজের গাড়িতে তোলে সে।

ইরানদের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে মেহরাজ কলিং বেল বাজায়। টানা দশ মিনিট পর অলস ভঙ্গিতে দরজা খোলে ইরান। মেহরাজ ওর দিকে তাকিয়ে বিরক্তি মাখানো গলায় রাগ দেখিয়ে বলে,
— দরজা খুলতে এত সময় লাগে নাকি?
​ইরান স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেয়,
— রাতের খাবার খাচ্ছিলাম, ভাইয়া।
​— যাকগে, এই নাও ধরো তোমার মাতাল বাবাকে।
​ইরান একনজর বাবার দিকে তাকিয়ে সোজা মুখে বলে,
— ‘না, আমি উনাকে ঘরে তুলব না। প্রতিদিনের এই মাতলামো আর সহ্য হয় না আমার! যেখানে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সেখানেই ফেলে রেখে আসুন।’
​মেহরাজ কপাল কুঁচকে চোখ গরম করে বলল,
— ‘ঘরে তুলবে না মানে? উনি সোজা পুলিশ স্টেশনে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় পেয়েছি বলেই বেঁচে গেলে, বুঝলে?’

​পুলিশের নাম শুনতেই ইরানের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে বাবাকে ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে সোফায় শুইয়ে দিল সে। মেহরাজও পিছু পিছু ভেতরে এসে বসল। ইরান খানিকটা অপ্রস্তুত হলো, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ পেতে দিল না। ​মেহরাজকে সোফায় বসিয়ে রেখে দ্রুত রান্নাঘর থেকে কফি বানিয়ে নিয়ে এল সে। কফির কাপটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
— ‘আপনার গার্লফ্রেন্ড কেমন আছে?’
​মেহরাজ কফিতে চুমুক দিতে দিতে অবাক হয়ে বলল,
— আমার আবার গার্লফ্রেন্ড আসবে কোত্থেকে?
​— কেন? সেদিন না নিজেই বললেন?
​— বলেছিলাম? ওহ হ্যাঁ! ভালো আছে সে।
​ইরান মুচকি হাসল। সে খুব ভালো করেই জানে মেহরাজ মিথ্যে বলছে। ঝিলমিলের কাছ থেকে খবর নিয়েছে সে। কোনো গার্লফ্রেন্ডই নেই তার।

মেহরাজ কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ইরানের ঘরের চার দেয়ালে চোখ বুলাল। তারপর হঠাৎই প্রশ্ন করে বসল,
— তোমার বাবা তো সারাদিন নেশা করেই কুল পায় না। তা তোমাদের সংসার আর পড়াশোনার খরচ চালায় কে?
ইরানের মুখের চঞ্চল হাসিটা এক নিমিষে মিলিয়ে গেল। গমগমে গলায় বলল,
— চালায় কেউ একজন…
​— কে সে?
​— আপনি চিনবেন না, ভাইয়া।
— বান্ধবির চাচাকে কথায় কথায় ভাইয়া বলো, লজ্জা লাগে না? চাচ্চু ডাকবে কতবার বলব?
— আপনি কী আমার দাদার গোপন সন্তান?
— হোয়াট?
— না মানে, আমার চাচারা সবগুলোই মা’’রা গিয়েছে। তাই কোনো চাচ্চু নেই। আপনি যদি আমার দাদার গোপন সন্তান হন তাহলে বলুন, চাচাই ডাকব।
— অসভ্য মেয়ে!
​কথা বাড়াল না আর মেহরাজ। ফাঁকা কফির কাপটা টেবলে রেখে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু ঘর থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত, করুণ শব্দ! যেন ছোট্ট কোনো বাচ্চার কান্না থেমে থেমে গুমরে উঠছে চার দেয়ালের আড়ালে। ​মেহরাজ থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

— তোমার কোনো ছোট ভাই-বোন আছে নাকি এখানে?
— কেন?
​— বাচ্চার কান্নার শব্দ পেলাম যে!
​— ভুল শুনেছেন ভাইয়া। এই ফ্ল্যাটে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
​— কিন্তু আমি তো একদম স্পষ্ট শুনলাম!
​— কই? আমি তো কিছুই শুনলাম না!
​মেহরাজ আর কোনো তর্ক করল না। সোফায় শুয়ে শুয়ে ইরানের মাতাল বাবা তখনো তার মৃ”ত স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গুনগুন করে যাচ্ছে। সেদিকে একবার শেষ নজর বুলিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল মেহরাজ।
​তবে ইরানের আজকের এই অদ্ভুত আচরণটা মেহরাজের মাথায় খটকা বাঁধাল। মেয়েটা যেন মেহরাজকে ঘরে দেখে ভীষণ অস্বস্তি আর এক অদৃশ্য আতঙ্কে ছটফট করছে। অথচ এই মেয়েই তো রাস্তাঘাটে তাকে দেখলে কথা বলে বলে একদম পাগল করে দেয়!
​মেহরাজ ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতেই, ইরান মাতাল বাবাকে সোফায় ওই অবস্থায় ফেলে রেখেই নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল!

টুম্পা আর পারুল রান্নাঘরের এক কোণে একদম জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই চোখ-মুখ গোল গোল করে যেন কোনো অলৌকিক দৃশ্য দেখছে! ​কিন্তু তার চেয়ে কোনো অংশে কম কীসে? চঞ্চল শেহরিয়ারের দ্বিতীয় সন্তান আজ কিচেনে ঢুকে রাতের খাবার বানাচ্ছে!
পরনে তার কালা রঙা স্লিভলেস টি-শার্ট আর ট্রাউজার। চওড়া বাইসেপ আর চওড়া কাঁধের ভাঁজগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কনুই উল্টে খন্তি নাড়ার প্রতিটা ভঙ্গিতে যেন কোনো দক্ষ শেফের পারদর্শিতা! চুলার ডিসপ্লেতে লাল রঙের টাইমার ফুটছে, আর বারিশ প্যানে মশলা আর চিকেন উল্টেপাল্টে দিচ্ছে।
​টুম্পা আর পারুলকে এভাবে হা করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বারিশ চুলার পাওয়ার লেভেল একটু কমাতে কমাতে ভারী, গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

— এখানে কি আমি কোনো বায়োস্কোপ খেলা দেখাচ্ছি যে নিজেদের কাজ রেখে এভাবে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছো?
​বারিশের ঠান্ডা ধমক শোনামাত্রই টুুম্পা আর পারুল ঝটপট সেখান থেকে কেটে পড়ল। ​রান্না শেষ করে বারিশ একটা ট্রে-তে সুন্দর করে গরম গরম ফ্রাইড রাইস আর চিকেন সাজিয়ে নিল। তারপর ট্রে-টা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে এল ওপরতলার ঘরের দিকে। আজকের দুপুরের খাবার বাহিরে থেকেই আনা হয়েছিল।
​দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, বিছানার এক কোণে কাঁথা গায়ে পেঁচিয়ে চুপচাপ বসে আছে ঝিলমিল। পেইনকিলারের সৌজন্যে পেটের কামড়টা এখন কিছুটা কম হলেও মুখটা এখনো একদম ফ্যাকাশে তার।
​বারিশ ট্রে-টা পাশের টেবিলের ওপর রেখে বলল,

— ওঠো। খেয়ে নাও।
ঝিলমিল খাবারের ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু ঘ্রাণ নাকে পেতেই মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। খাবারের প্লেট নিজের দিকে নিল। বারিশও খেতে বসল। চুপচাপ খাচ্ছে একদম। খেতে খেতে ঝিলমিল একবার তাকাল। আজ তো ঠিকই বাড়িতে হওয়া রান্না খাচ্ছে। অথচ এতদিন
লোকটা অযথা তাকে দিয়ে হাবিজাবি রান্না করিয়ে খাটাত।
​খাবারের স্বাদটা সত্যিই চমৎকার! সে খেতে খেতেই নিজের মনেই বলে উঠল,
— খাবারটা সত্যিই খুব মজা হয়েছে! টুম্পা আন্টির রান্না বরাবরই খুব সুন্দর হয়। কতদিন পর এমন মজার খাবার খেলাম!
​নিজের হাতের রান্না ঝিলমিলের নিজেরই একদম ভালো লাগে না। কিন্তু এই লোকটার ভয়ে বাধ্য হয়ে এতদিন রাঁধতে হয়েছে।
​বারিশ অবশ্য ওর কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শান্ত মুখে নিজের প্লেটের খাবার শেষ করে প্লেট গুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য টুম্পাকে ডেকে শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমে চলে গেল।
​টুম্পা এসে দ্রুত প্লেটগুলো ট্রে-তে তুলে নেয়। ঝিলমিলের মুখ দেখেই বুঝল মেয়েটার শরীর ভালো নেই। সে ঝিলমিলের একটু কাছে এসে মুখ টিপে হেসে আস্তে করে শুধাল,

— খাওন কেমন হইসে?
​ঝিলমিল শান্ত মুখে বলল,
— খুব মজা! অনেকদিন পর তোমার হাতের রান্না খেলাম আন্টি।
— আমি তো রাধিনি!
​ঝিলমিল অবাক হয়ে তাকাল—
— তাহলে? কে রাধল?
​— কে আবার! তোমার সওয়ামি!
চোখ বড় বড় করে ফেলল ঝিলমিল।
— দেখো, একদম ফাজিলমো করবা না আন্টি! উনি কীভাবে রান্না করবেন?
​— আরে খোদার কসম, সত্য কইতাছি! ছোট ভাই-ই রানছে। এখন বুঝলাম, তুমি অসুস্থ দেইখা তোমার লাইগা রান্নাঘরে ঢুকছে। বাহ, কী মহাব্বত!

টুম্পা চলে গেল। কিন্তু পেছনে রেখে গেল এক অচেনায় জমে যাওয়া ঝিলমিলকে! ​অবাক আর বিস্ময়ে ঝিলমিলের শরীর যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য অসাড় হয়ে রইল। লোকটা সত্যি সত্যি নিজের হাতে ওর জন্য রান্না করেছে?
ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এল বারিশ। ​শরীরের ওপরের অংশে এক সুতো কাপড়ও নেই তার। শুধু কোমরে প্যাঁচানো ধবধবে সাদা একটা তোয়ালে। রুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল Tom Ford Ombré Leather বডি ওয়াশের কড়া পুরুষালী, রয়্যাল লেদারি সুবাস।
ঝিলমিল বারিশের সুঠাম চওড়া ফিগারের দিকে তাকাল। সুগঠিত বুক, চওড়া কাঁধ আর পেটজুড়ে ভাসমান সিক্স প্যাক অ্যাবসের খাঁজ। না চাইতেও চোখ তার সেদিকে আটকে রইল। তারপর চোখ দুটো বুজে সেই রাজকীয় মাতাল করা স্মেলটা বুক ভরে অনুভব করল সে।
​পর মুহূর্তেই মনের ভেতরে জন্ম নেওয়া এই অদ্ভুত অনুভূতিটা ঝেড়ে ফেলে ঝটপট চোখ খুলে একদম মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— খাবারটা তেমন মজা হয়নি!
​বারিশ আলমারি থেকে শুধু একটা প্যান্ট আর টি-শার্ট বের করতে করতে বলল,
— গিললে তো ঠিকই।
​— এখন কি আমি না খেয়ে মরে থাকব নাকি?
কিছু বলল না বারিশ।​​ঝিলমিল এবার খেয়াল করল বারিশের মাথার চুলগুলো এখনো বেশ ভেজা। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে তার খালি পিঠ আর বুক বেয়ে।
— মাথার চুলটাও তো ঠিকঠাক মুছতে পারেন না, আপনি আবার রান্না করলেন কীভাবে?
​বারিশ আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে শান্ত গলায় বলল,
— আমার জীবনে এমন অনেক দিন গেছে, যখন আমাকে নিজের হাতে রান্না করেই খেতে হয়েছে।
​— কেন? বিদেশে যখন ছিলেন তখন?
​— বিদেশে, দেশে… সব জায়গাতেই।
​— কেন? দেশে নিজের বাড়িতে কেন রান্না করতে যাবেন?
​— জানি না।
​সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে বারিশ আলমারি থেকে আরেকটা ছোট তোয়ালে নিয়ে সোজা ঝিলমিলের দিকে হেঁটে এল। একদম কাছে এসে খানিকটা ঝুঁকে তোয়ালেটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

— নাও, চুলটা মুছে দাও।
​— আ-আমি?!
​ঝিলমিল তোতলাতে তোতলাতে বারিশের অনাবৃত, হালকা ভেজা চওড়া বুকের দিকে তাকাল। লোকটা একদম শরীর ঘেঁষে আসায় বুকটা কেমন ধক করে উঠল ওর, না চাইতেও একটা শুকনো ঢোক গিলল ঝিলমিল। বডিওয়াশের মাতাল করা গন্ধটা এবার আরও গাঢ় হয়ে ওর নাকে এসে ধাক্কা দিল।
​ঝিলমিল কাঁপাকাঁপা হাতে তোয়ালেটা নিয়ে বারিশের ভেজা চুলে হাত রাখল। তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল মোছাতে গিয়ে ওর হাত জোড়া স্পষ্ট থরথর করে কাঁপছে। বারিশ ওর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে খুব নিচু, গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— কাঁপছো কেন?
​ঝিলমিল তোয়ালে দিয়ে চুল মোছার গতি বাড়িয়ে দিয়ে না শোনার ভান করে তোতলা গলায় বলল,
— ক-কই? কোথায় কাঁপছি আমি!
জবাব এলোনা বারিশের থেকে। ঝিলমিল তো এখনও বারিশের কাণ্ডে মুগ্ধ। কত সুন্দর করে রান্না করে খাওয়াল! সে চুল মুছতে মুছতেই মুচকি হেসে বলল,
— আপনার সব রূপই দেখা শেষ! রাগ, অ্যাটিটিউড, জেদ, বেপরোয়া ভাব, আবার ভালোমানুষি… শুধু একটা জিনিস এখনো দেখিনি।
​বারিশ চোখের পলক না ফেলে শান্তভাবে শুধাল

— কী?
​— আপনাকে আমি কখনো হাসতে দেখিনি। হাসেন না কেন?
​কথাটা শুনেই বারিশের দৃষ্টি গভীর হলো। চোখ দুটো সামান্য ছোট করে সে ঝিলমিলের আরও কাছাকাছি ঝুঁকে এল। নিজের দু’হাত ঝিলমিলের দু’পাশে বিছানায় রেখে ওকে একদম বন্দি করে ফেলল। তারপর ঘোর লাগা হাস্কিস্বরে বলল,
— তুমি আমার আরও অনেক কিছুই দেখোনি। দেখতে চাও?
​মুহূর্তেই ঝিলমিলের হাত স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটার গলার টোন আর চোখের চাউনি কেমন বদলে গেছে! খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে লোকটা? ঠিক কী দেখার কথা বলছে? ​বারিশের তপ্ত নিঃশ্বাস এখন ঝিলমিলের গালে এসে লাগছে, নাকটা প্রায় ঝিলমিলের নাক ছুঁই-ছুঁই। আরও একবার শুকনো ঢোক গিলল কিশোরী। শক্ত হয়ে উত্তর দিল
— না! দেখতে চাই না!
​বারিশের ঠোঁটের এক কোণ বাঁকা হয়ে হাসি ফুটে উঠল। সে একই ভঙ্গিতে ঝুঁকে থেকেই নিচু কণ্ঠে বলল,
— আমিও তোমার একটা জিনিস ছাড়া বাকি সব দেখে নিয়েছি।
​ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে শুধাল,
— কী দেখেনি?
​বারিশ জবাব দিল না। তার গভীর, তীক্ষ্ণ নজর ঝিলমিলের ওপর থেকে নিচে সর্বাঙ্গে গভীরভাবে পরখ করে নিল। তারপর নীরবতা বজায় রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

দীঘি ইদানীং অফিসে আসা ছেড়েই দিয়েছে। আর যেদিন বাধ্য হয়ে আসে, এমন সব কাণ্ড ঘটিয়ে বসে যে তাহসিনের কাজের একদম বারোটা বেজে যায়। ​চেয়ারওম্যানের রুমে নূরজাহান চৌধুরী তাঁর চেয়ারে বসে আছেন। সামনে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে কাজ সামলাচ্ছে তাহসিন। নূরজাহান চৌধুরী হঠাৎই বলে উঠলেন,
— তাহলে তোমার ওয়াইফ কী মা’’রা গিয়েছে নাকি কোনো ভাবে ডিভোর্স হয়েছে?
— না।
— তাহলে?
— ওয়াইফ নেই আমার।
কপাল কুঁচকে গেল নূরজাহান চৌধুরীর।
— তাহলে বাচ্চা এলো কোত্থেকে?
তার দিকে তাকাল তাহসিন।
— সত্য বললে ঘৃণা করবেন না তো আমায়?
— কেন? ঘৃণা করব কেন?
— কারণ সে আমার জা’’রজ সন্তান।
নূরজাহান চৌধুরীর ভেতরের শ্বাস ভেতরে, আর বাহিরের শ্বাস বাহিরেই আটকে রইল। শ্বাস নিতে পারছে না সে। এসির মধ্যেও শরীর কেমন ঘামছে তার।

​— কী হলো আপনার?
​— কিছু না। তুমি একদিন তোমার বাচ্চাকে নিয়ে এসো।
​— ও যেখানে আছে খুব ভালো আছে।
​— কী যেন নাম বলেছিলে তার?
​তাহসিন কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একদম নিচু গলায় বলল,
— দিগন্ত। আপনি চাইলে নূর বলেও ডাকতে পারেন।
​নূরজাহান চৌধুরীও কেমন যেন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কয়েক সেকেন্ড পর বললেন,
— ছবি নেই ছেলেটার? দেখাও দেখি কেমন দেখতে!
​— ছিল। তবে এখানে আসার পর ফোন থেকে সব ডিলিট হয়ে গেছে।
​নূরজাহান চৌধুরী ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আর কথা না বাড়িয়ে কয়েকটা ফাইল বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— ঠিক আছে। এই ফাইলগুলো নিচের ফ্লোরে দিয়ে এসো।
​ফাইল জমা দিয়ে আসার সময় লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল তাহসিন। লিফটের স্টিলের দরজাটা খুলতেই ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে থমকে গেল সে। ভেতরে দীঘি দাঁড়িয়ে। তাহসিনকে দেখেই সে ঝট করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল মেয়েটা।
​তাহসিন ভেতরে ঢুকে আড়চোখে একনজর দীঘির দিকে তাকাল। দীঘির পড়নে ওয়েস্টার্ন অফ-শোল্ডার টপস আর শর্ট স্কার্ট। ​তাহসিন গম্ভীর গলায় বলল,

— আপনাকে হয়তো বলেছিলাম, এসব জামাকাপড় পরে অফিসে আসবেন না।
— তুমি সামান্য একজন পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট! আমার শরীরে তোমার নজর যায় কোন সাহসে?
​— আমার নজর অন্তত তাদের চেয়ে অনেক ভালো, যাদের সাথে আপনি আজকাল ঘুরে বেড়ান।
​দীঘি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
— এসব উপদেশ আমি তোমার মুখে শুনতে চাই না। দূরে থাকবে আমার থেকে!
​— আমার একটা বাচ্চা আছে শুনেই আপনি এমন রঙ বদলে ফেলবেন—জানলে প্রথম দিনই বলে দিতাম।
​— এটাই তো তোমার ভুল ! তোমাকে ভালোবেসেছিলাম ভেবে এখন আমার নিজেকেই সবচেয়ে বড় গাধা মনে হয়!
​— উহু! ওটাকে অন্তত ভালোবাসা বলে না।
​তাহসিনের এই ঠান্ডা গলার কথাটা শুনতেই দীঘির মাথার রগ জ্বলে উঠল। রাগের মাথায় একহাতে শক্ত করে চেপে ধরল তাহসিনের চোয়াল! দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

— বলে! এটাকে ভালোবাসা বলে! খবরদার আমার ভালোবাসাকে ছোট করবে না তুমি! ভালোবাসি আমি এখনো তোমাকে! কিন্তু যে অন্য কোনো নারীকে ছুঁয়ে বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, সে আমাকে স্পর্শ করার অধিকার রাখে না!
​তাহসিন কোনো প্রতিবাদ করল না, উল্টো তার চোখে কেমন নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল। ​দীঘি সেই হাসির মানে বুঝল না। তার নিজের চোখ দুটো তখন নোনা জলে টলমল করছে। এটা রাগ নাকি বুকের ভেতরের কান্না? দুজন মানুষের মধ্যে কতটা গভীর সম্পর্ক থাকলে একটা বাচ্চা হয়? যে তাহসিনের জন্য বারিশের মতো একটা ছেলেকে পায়ে ঠেলে পরিবার ছেড়ে পালিয়েছিল, সেই তাহসিন এত বড় সত্য তার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল! ​দীঘি চোখের পানি সামলে চ বলল,
— তুমি যদি আরেকবার আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে কথা বলো, মেরে ফেলব আমি তোমাকে!
​লিফটের দরজা খুলে গেল। ​সামনে দাঁড়িয়ে নূরজাহান চৌধুরী। তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য নামছিলেন। ​মা-কে দেখেই ঝট করে তাহসিনের চোয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিল দীঘি। তড়িঘড়ি করে চোখের জল মুছে চরম জেদ নিয়ে বলল,
— আমার জন্য ছেলে দেখো মা। আমি বিয়ে করব!
​লিফটের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তাহসিনের দু’হাত মুহূর্তেই শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল, হাতের রগ ভেসে উঠল তার।

নূরজাহান চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন,
— সত্যি বলছিস? আমি আজ থেকেই দেখা শুরু করব।
অসুস্থতা কেটে যাওয়ার পর ঝিলমিলের জীবন আবার আগের রুটিনেই ফিরে এসেছে। ​আজ জারিফের জন্মদিনের পার্টি। বাসাতেই বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। বারিশ চেয়েছিল ঝিলমিলকে নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসতে, কিন্তু ঝিলমিল রাজি হয়নি। জেদ ধরেই পার্টিতে এসেছে।
​জারিফের জন্মদিন উপলক্ষে চৌধুরী বাড়ির সবাইকেই নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঘরের মানুষ তো বটেই, সাথে আত্মীয়-স্বজন আর জারিফের একঝাঁক বন্ধুবান্ধবে পুরো অনুষ্ঠান মুখরিত। ​আজকের জন্য ঝিলমিল সেজেছে নীল রঙের একটা শর্ট কুর্তি আর হালকা কাজের প্লাজোয়। বারিশকেও জোর করে নেভি ব্লু কোট পরিয়েছে।

অনেকদিন পর নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে পেয়ে বেশ গল্পে মেতে উঠেছে ঝিলমিল। অন্যদিকে বারিশ আর মেহরাজ দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে, ড্রয়িংরুমের এক কোণে। বারিশের চোখ বারবার গিয়ে আটকে যাচ্ছে ঝিলমিলের হাসিখুশি মুখের ওপর। ভেতরটা রাগে রি রি করলেও এখানে রাগ দেখানোর সুযোগ নেই তার। চঞ্চল শেহরিয়ার আগেই স্পষ্ট করে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে দিয়েছেন। অনুষ্ঠানের মাঝে যেন কোনো প্রকার গোলমাল না হয়।
​— হাই! কী অবস্থা?
​ঝিলমিলের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে পাশ ফিরতেই বারিশ দেখল পরিণীতা দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনেও নীল রঙের হালকা এক ফিনফিনে শাড়ি। ​বারিশ সামান্য ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

— তুমি এখানে?
​— নিজের স্টুডেন্টের বার্থডে পার্টি, আর আমি আসব না? কেমন কথা!
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরাজ কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল,
— আপনি জারিফের ম্যাম? তা কী বিষয়ের ক্লাস নেন আপনি?
​পরিণীতা মৃদু হেসে জবাব দিল,
— ওদের ক্লাস নেই না। আমি কলেজের ম্যাথ টিচার।
​মেহরাজের মনে মনে বেশ হাসি পেল। ক্লাস নেই, অথচ স্টুডেন্টের জন্মদিনের পার্টিতে একেবারে সেজেগুজে হাজির!
​ওদিকে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়ে গেছে। জারিফ স্টেজে দাঁড়িয়ে এক এক করে নিজের পুরো পরিবারের সাথে উপস্থিত অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবেই সে নিজের চাচ্চু বারিশ আর তার স্ত্রীর কথা এড়িয়ে গেল।
ঝিলমিল চট করে সোফা থেকে উঠে সোজা স্টেজে চলে গেল। কারো কিছু বুঝে ওঠার আগেই জারিফের হাত থেকে কর্ডলেস মাইকটা একপ্রকার টেনে নিয়ে চড়া ও স্পষ্ট গলায় বলল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২১

— Hello everyone! I’m Jahanara Chowdhury Jhilmil. Zarif’s one and only Aunt! Wife of Faizan Barish Shehriyar!
কথাটা বলেই ঝিলমিল মিষ্টি করে হেসে একহাত সামনে বাড়িয়ে নিচের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশকে ইঙ্গিত করল। ​বারিশ স্টেজের দিকে তাকাল। ঝিলমিলের সংবর্ধনা শুনে পুরো হলে একসাথে করতালির ঝড় উঠল। আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফ নিজের চোখ দুটো রাগে লাল করে ঝিলমিলের দিকে র”ক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে। পরিণীতাও কেমন তীক্ষ্ণ চোখে তাকানো ঝিলমিলের দিকে।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৩