Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৭

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৭

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৭
নূরজাহান আক্তার আলো

ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক ঝড়ঝাপটা সামলাতে গিয়ে শীতলের পড়াশোনার নাজেহাল অবস্থা। আগে পড়াশোনায় মোটামুটি যেমন ছিল বর্তমানে আরও শোচনীয় অবস্থা। তার ওপরে এখন কলেজে আসতেও ইচ্ছে করে না। এলে একাকীত্ব যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। প্রিয় বান্ধবীকে পায় না। মনে জমে থাকা কথাগুলো বলতে পারে না। দুষ্টুমির ছলে কিয়ারাকে হুমকি দিয়ে ক্লাস ফাঁকি দিতে পারে না। তাদের ক্লাসের
অন্য বন্ধুরা যখন দল বেঁধে হাসাহাসিতে মেতে ওঠে, সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে। এক সময় তো ওরাও এভাবেই মেতে থাকত! ক্লাসে কথা বলার অপরাধে কতবার শাস্তি পেয়েছে তার হিসেব নেই। বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে কিয়ারা তার জন্য নিয়ে আসত। সেই খাবার সে স্যারের চোখ এড়িয়ে ক্লাসে শেষ করত। তার কান্ডে কিয়ারা হেসে খুন হতো। দু’জন মিলে চুরি করে এখানে ওখানে চলে যেত। বাজি ধরে তার পছন্দের ভেলপুরি খেতো। যেই হারতো কাঁচের চুড়ি কিনে দিতে হতো।

কিয়ারা কাঁচের চুড়ি খুব পছন্দ করত। তার নাকি কাঁচের চুড়ির রিনঝিন শব্দে মন ভালো হয়ে যেতো। যেদিন থেকে একথা জেনেছে মাঝেমধ্যেই ইচ্ছে করে হারত সে। হারার অজুহাতে অনেক চুড়ি কিনে দিয়েছে তাকে।
শুদ্ধর আনা কত জিনিস দিয়েছে। একই রকমের ড্রেসও আছে তাদের। ভেবেছিল ইদের মধ্যে পার্লারে গিয়ে একইরকমভাবে চুল কাটবে। কিন্তু হঠাৎ সব এলোমেলো হয়ে গেল। প্রতিটা মুহূর্তের কথা তার মনে আছে।
মনে আছে তাদের ফ্রেন্ডশীপের প্রথমদিনের কথা। শুধু স্মৃতি রেখে আস্ত মানুষটা হারিয়ে গেছে। তার কথা ভাবতে গেলেই দুচোখ ছাপিয়ে অঝরে জল গড়াতে থাকে। বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় হাহাকার করে ওঠে। ইচ্ছে করে গালাগাল করে পরক্ষণেই ওকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে কাঁদতে। কিন্তু কোথায় পাবে ওকে? কোথায় হারিয়ে গেল মেয়েটা? সে যতটুকু জানত, কিয়ারা মনে মনে রুবাবকে পছন্দ করত। আকার ইঙ্গিতে বার বার জিজ্ঞেস করত রুবাব কবে আসবে। এলে কতদিন থাকবে। বুঝত প্রিয় বান্ধবীর মনের কথা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তারও খুব ইচ্ছে ছিল রুবাবের সঙ্গে কিয়ারার কিছু একটা হোক। কিন্তু ঐশ্বর্যের কথা জানার পরে সে আর এগোয়নি। রুবাব অন্য কারও সাথে জড়িয়ে আছে জানলে কিয়ারা কষ্ট পাবে ভেবে আগ বাড়িয়ে কিছু বলেনি। এমনকি এ কারণে কিয়ারাকে বাড়িতে ডাকা কমিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল সুযোগ বুঝে সব বুঝিয়ে বলবে, কিন্তু সেই সুযোগ আসার আগে মেয়েটা নিঁখোজ হয়ে গেল। সে এমনভাবে হারাল জানিয়েও গেল না, কোথায় গেল, কেন গেল। তবে সে মন থেকে দোয়া করে একবারের জন্য হলেও যেন কিয়ারার দেখা পায়; কারণ তার কাছে অনেক কিছু জানার বাকি আছে।

​ব্যথিত মনে এসব ভাবতে ভাবতে শীতল ক্লাস শেষ করল। নিজের হাতে নোট লিখতে গিয়ে আবারও তার কিয়ারার কথা মনে পড়ল; ও থাকলে অনায়াসেই সব লেখা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যেত। একটাবার দেখা হোক এই সব খাটুনির শোধ অবশ্যই নেবে। কিয়ারাকে বকতে বকতে সে
কিছু নোট লিখল আর কিছু নোট ফটোকপি করা দরকার। বেশিরভাগই চিত্র যেটা হাতে আঁকা আপাতত সম্ভব নয়। তাই সাথী নামের মেয়েটিকে নিয়ে রাস্তার ওপাশে গেল শীতল। ফটোকপির দোকানের সামনে অনেক ভিড় দেখে সাথী জানাল, আজকে থাকুক কালকে দিলেই হবে। সে বাসে যাতায়াত করে। বাসে গিয়ে ফেরিতে করে নদীর পার হয়ে তারপর বাড়ি। বাস মিস হলে মুশকিল হয়ে যাবে। একথা বলে সে চলে গেলেও শীতল ভিড় কমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। পাশের দোকান থেকে আইসক্রিম কিনল। আইসক্রিম খেতে খেতে ছাউনির নিচে এসে দাঁড়াতেই ব্যাগের ভেতর ফোনটা ভাইব্রেট হয়ে উঠল। ফোন বের করে স্ক্রিনে ‘শুদ্ধ’ নামটা দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। কল রিসিভ করে গলার স্বর বদলে বলল,

​-‘মিসেস শোয়াইব স্পিকিং, হু আর ইউ?’
​শীতলের কথা শুনে ওপাশে শুদ্ধ মুচকি হাসল। সেও কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য মিশিয়ে পালটা জবাব দিল,
-‘মুডি সাইটেশ স্পিকিং।’
-‘ওহ, তা কাকে চাই আপনার?’
-‘আপাতত আমার বউটাকে চাচ্ছিলাম। ক্লাস শেষ হয়েছে?’
-‘হুম। কলেজের সামনে ফটোকপির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’
শুদ্ধর কণ্ঠ এবার কিছুটা সতর্ক শোনাল,
-‘ওখানে কেন? পাশের চায়ের দোকানে তো বখাটে ছেলেপেলেদের আড্ডা থাকে। ওখান থেকে সরে দাঁড়া, আমি নিতে আসছি।’

শুদ্ধ আসছে শুনে শীতল ভীষণ খুশি হলো। মিটিমিটি হেসে বলল,
-‘থাকলে থাক। আমাকে কিছু বলার সাহস কারোর আছে নাকি? আমি হলাম শাহরিয়ার সায়ন মানে হবু মেয়রের বোন! আমাকে কিছু বললে আমার ভাই জান খেয়ে নেবে, হুম।’
একথা শুনে শুদ্ধ হেসে ফেলল। গায়ে থেকে এ্যাপ্রোণ খুলতে খুুলতে বলল,
-‘তা তো খাবেই! ডাকাত ভাইয়ের ডাকাত বোন বলে কথা। সাইডে দাঁড়া, এক্ষুণি আসছি।’
-‘হুম, আসুন।’

​ফোনটা কেটে দিয়ে শীতল গলে যাওয়া আইসক্রিমে একটা বড় কামড় বসাল। দোকানের দিকে তাকিয়ে দেখল ভিড় এখনো কমেনি। আজই কেন সবার ফটোকপি করার ধুম পড়ল, কে জানে! তবে এখন আর তার তাড়া নেই, শুদ্ধ তো আসছেই। একথা ভেবে ডানে ঘুরতেই নিজের নাম শুনে বামে ঘুরে তাকাল শীতল। পাশে দাঁড়ানো পুরুষটার স্থির দৃষ্টি ঠিক তার দিকেই। তবে উনি আর কি বলেছে শুনতে পায় নি সে। শুনতে পায় নি বুঝে লোকটি পুনরায় বলল,
​-‘ বললাম আরে, শীতল রাণী যে! এত রোদের মধ্যে এখানে কেন? বাড়ি যাবে না?’

লোকটি কথাটা বলে তার আপাদমস্তক দেখে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সূক্ষ্ম নজরে পরখ করল ফুটফুটে ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটাকে। রোদের তাপে ফর্সা গাল দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। ঠোঁট জোড়া যেন রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। পরনে কলেজ ড্রেস। মাথায় হিজাব। কাঁধে কলেজ ব্যাগ আর হাতে ধরা আধখাওয়া আইসক্রিম। এ মেয়েটার জন্য ইয়াসিরের মতো পাষাণ পুরুষটার মন ফেঁসেছে। বেচারা দেবদাস হয়ে বর্তমানে কোন গর্তে মুখ লুকিয়েছে কে জানে। যে আগে দাপট দেখিয়ে বেড়াত সেই মাফিয়া কিং বর্তমানে নাকি ভেজা বিড়াল।
ভালোবাসা মানুষকে কতটা বদলে ফেলে, ভাবা যায়! এদিকে ​শীতলও
তার পাশে দাঁড়ানো লোকটাকে চিনতে পারল। অনেক আগে সে সায়ন ভাইয়ার সঙ্গে একে দেখেছিল। সম্ভবত ভাইয়ার রাজনৈতিক দলের কেউ হবে। কিন্তু নামটা যেন কী? কনক নাকি রনক? এই দুই ‘নক’-এর কোনো একটা হবে তা নিশ্চিত। নামটা পুরোপুরি মনে না পড়লেও সেটা বুঝতে দিল না। এত বড় মানুষকে নাম জিজ্ঞাসা করা অভদ্র হয়ে যাবে কী না।

তাছাড়া এ লোক কেন এসেছে তাও তো জানে না, তাই চুপ করে রইল।
পরে আবার ভাবল কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেওয়া একপ্রকার সৌজন্যবোধ। তাই সে সুন্দর করে জবাব দিল,
​-‘এই তো ভাইয়া, নোটগুলো ফটোকপি করেই চলে যাব।’
শীতলকে একা পেয়ে কনক এবার কিছু ভাবল। কথার ছলে বলে বসল,
​-‘ওহ। আচ্ছা শীতল, তোমার ফ্রেন্ড কিয়ারা না কী যেন নাম ও কই? ওকে তো আর দেখি না। কোনো খোঁজ জানো ওর?’
​কিয়ারার নাম শুনতেই শীতলের মুখের হাসিটুকু নিমিষেই মিলিয়ে গেল। ছোট করে উত্তর দিল,
-‘না।’
-‘বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?’
-‘তাও জানি না।’
-‘যোগাযোগ হয় না?’
-‘না।’

​শীতলের বিবর্ণ মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে নিল কনক। মনে মনে একটা কুটিল হাসি হেসে সায়নকে এক চোট গালি দিয়ে এবার নিজের মোক্ষম টোপটা ফেলল। সর্তক দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখে নিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বলল,
​-‘আমি জানি ও কোথায়। তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে একটু আড়ালে এসো। সব কথা তো আর রাস্তার মাঝখানে বলা যায় না। তাছাড়া আমি যা বলব এগুলো বেশ গোপনীয় ব্যাপার। আশা করি, কথাগুলো তোমার আর আমার মধ্যে থাকবে।’

একথা শুনে শীতল বিস্ময় নিয়ে তাকাল। কৌতূহলী হয়ে কনকের পিছু পিছু কিছুটা আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। কনক শুরু থেকে কিয়ারা কিভাবে কিডন্যাপ হয়েছিল তারপর সুইসাইড করে মৃত্যুর ঘটনা সব খুলে বলল।
বাদ গেল না বুরাকের করা শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কথা। তবে যা সত্য তার সঙ্গে আর একটু ঝাল মশলা যোগ করতেও ভুলল না সে। সব শুনে শীতলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! বাকহারা হয়ে তাকিয়ে রইল। থরথর করে কাঁপতে লাগল। পরমুহূর্তেই ওর মনে হলো এই লোক মিথ্যা বলতেও পারে? তাকে বোকা বানাতে অন্য চাল হতে পারে। একথা ভেবে সে রাস্তার দিকে তাকাল, মনে পড়ে গেল এর আগে সে কিডন্যাপ হয়েছিল। কিন্তু এখন রাস্তায় অনেক মানুষ। আর যাই হোক এ লোকটা কিডন্যাপ করতে পারবে না। তবে যা যা শুনল জবাবে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। তার পাশে একটা হিজল ফুলের গাছ। গাছটা ধরে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাকে চুপ থাকতে দেখে কনক বুঝল তীরটা জায়গা মতো লেগেছে।

তাই আর একটু খোঁচাতে পুনরায় জানাল, কিয়ারার এই পরিণতির কথা শুদ্ধ আর সায়ন আগে থেকেই জানত। কিন্তু তারা ইচ্ছে করে তাকে জানায়নি। এটা তারা অন্যায় করেছে। অন্তত মৃত মুখ দেখার সুযোগ করে দিতো, তাও করে নি। এখন দেওয়ালে কপাল ঠুকলেও লাভ হবে না। শীতল মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। তখন কনক
গলা খাঁকারি দিয়ে জোর দিয়ে বলল, সে একটুও মিথ্যা বলছে না, তার কথা বিশ্বাস না হলে যেন বাড়ি গিয়ে সরাসরি সায়নকে জিজ্ঞাসা করে।

সায়ন নিশ্চয়ই তাকে মিথ্যা বলবে না। ​একথা শুনে শীতল যেন বাকহারা হয়ে গেল। যদি এটা সত্যি হয়, তবে ইয়াসির নামক লোকটাকে সে আগে যতটুকু ঘৃণা করত, এখন তার চেয়েও দশগুণ বেশি ঘৃণা করবে। বড় মা
বলেন, কারো মৃত্যু কামনা করতে নেই; খারাপ কামনা করতে নেই। কিন্তু এ লোকটার জন্য সে আল্লাহর কাছে দিন-রাত মৃত্যু প্রার্থনা করবে। তবে তার আগে সায়নের থেকে সব সত্য জানা প্রয়োজন। সে জানে পৃথিবী উল্টে যাবে তবুও তার সায়ন ভাই তাকে মিথ্যা বলবে না। বাইরের লোক যা বলার বলুন সে সব শুনবে তার ভাইয়ের থেকে। কনক হয়তো আরো কিছু বলত কিন্তু ​শীতল আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হাতের আধখাওয়া আইসক্রিমটা ছুঁড়ে ফেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কনকের কথার তালে ভুলে গেল শুদ্ধ তাকে নিতে আসছে। সে ঝাপসা চোখে রাস্তা পার হয়ে কোনোমতে রিকশা ডেকে উঠে বসল। এতক্ষণ ধরে চোখের পানি আটকে রাখলেও নিজেকে আর সামলাতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলল। প্রিয় বান্ধবীর মুখ আর জমানো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিয়ারার করুণ দশা সে মানবে কীভাবে?

এই কঠিন সত্য আজীবন তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকবে। কাঁদতে কাঁদতে সে দোয়া করতে লাগল এসব যেন মিথ্যা হয়, ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়। কিয়ারার সঙ্গে দেখা না হোক, তবুও যেন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকে, ভালো থাকে।
এদিকে তাকে এভাবে কাঁদতে দেখে মধ্যবয়সী ​রিকশাওয়ালা আড়চোখে তাকাচ্ছেন। প্রেমিকের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে ভেবে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। তবে মুখ কুঁচকে ফেললেন। এই কাজে থেকে প্রতিদিন কত কিছুরই না সাক্ষী হন! হুড তুলে কেউ কেউ এমন কাজ করে যে ইচ্ছে করে লাথি মেরে রিকশা থেকে ফেলে দিতে। কিন্তু চাইলে কি তা সম্ভব হয়? তাছাড়া বড়লোকদের সন্তানরা যা করে সব ঠিক! এসব ভেবে উনি ধীর গতিতে রিকশা টানছিলেন। ​হঠাৎ একটা কালো বাইক হাতের ইশারায় উনাকে থামাতে বলল। রিকশা থেমে যাওয়ায় শীতল দেখল শুদ্ধ বাইকে বসা।
তাকে দেখে দ্রুত চোখ মুছে নিল শীতল। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না।
ততক্ষণে ফর্সা মুখটা লালবর্ণ ধারণ করেছে। শুদ্ধ রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে শীতলের দিকে তাকাল। বলল,

-‘নেমে আয়।’
​বিনা বাক্যে শীতল নামল। কিছু বলার আগেই বাইকের পেছনে বসল।
কাঁধে হাত রেখে পিঠে কপাল ঠেঁকিয়ে চুপ করে বসে রইল। মাথাব্যথা করছে নাকি জিজ্ঞাসা করলে না বোধক মাথা নাড়াল। শুদ্ধ বাইক স্টার্ট করে বাড়ির পথে না গিয়ে উল্টো পথ ধরল। এখন বাড়ি গেলে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। আর শুদ্ধ নিজেও ওর কান্নার কারণ না জানা পর্যন্ত শান্তি পাবে না। কিছুক্ষণ আগেও কথা হলো এরমধ্যেই কি এমন হলো যে কাঁদতে হবে? এমনিতে বাড়িতে চঞ্চল, যত রকম দুষ্টু বুদ্ধি সব তার ওপরই প্রয়োগ করে। অহেতুক হলেও তাকেই বেশি জ্বালায় তাকেই বকায়। যদিও আগের তুলনায় তার দুষ্টুমি অনেক কমেছে। এখন আগের
মতো ধাপে ধাপে দুষ্টুমি না করলেও সুযোগ পেলে ছাড়ে না। কিন্তু বাড়ির বাইরে সাধারণত এমন আচরণ করে না। অযথা কান্নাকাটি করার মেয়ে সে না। তাহলে এইটুকু সময়ের মধ্যে কি এমন হলো? এখন তো সরাসরি কিছু জিজ্ঞাসা করলেও বলবে না। ওর পেট থেকে কথা বের করতে হলে অহেতুক ঝগড়া করতে হবে, এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়েই নিজে সব উগরে দেবে। ​কিন্তু ঝগড়া শুরু করার আগেই শুদ্ধ অনুভব করল তার পিঠের শার্ট ভিজে যাচ্ছে। এবার তার সত্যিই খটকা লাগল। কণ্ঠস্বর নরম করে বলল,

-‘কষ্টের পরিমাণ কি অনেক বেশি? আমাকে একটু ভাগ দেওয়া যাবে?’
শীতল কোনো জবাব দিল না। শুদ্ধ আবার বলল,
-‘কেউ চাইলে তার সবটুকু কষ্ট আমার কাছে আমানত রাখতে পারে। কবুল বলার সময় তো কষ্টের ভাগ নেওয়ার ওয়াদাও করেছিলাম।’
এবারও নিস্তব্ধতা। তবে পিঠের শার্ট আঁকড়ে ধরেছে দেখে শুদ্ধ বলল,
-‘চোখের জলের সাথে নাকের জল মিশিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে আমার শার্টটা নষ্ট না করলেই কি নয়? বেচারা শার্ট তো কারো ক্ষতি করেনি!’

​এবারও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শুদ্ধ বাইকের আয়নায় তাকাল। দেখল শীতল পিঠে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কাঁদছে সে, অথচ
অদ্ভুত কারণে বুক পুড়ছে তার। এত যত্নে আগলে রেখে অন্যের কথায় কাঁদলে সহ্য হয়? কান্নার কারণও তো অজানা। তাই আবারও বলল,
-‘বাইক থামাব? থামাই? পিঠের বদলে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদলে হয়তো শান্তি পাবি। লোকে বলে, স্বামীর বুকে শান্তি থাকে। সেই শান্তি স্ত্রী-র সব কষ্ট ভোলার মহৌষধ হয়ে কাজ করে। বিশ্বাস না হলে নিজেই পরীক্ষা করে দেখ।’

​শীতল ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বুকের মধ্যে একদলা কষ্ট চাপ ধরে আছে। সে এটাও বুঝল তার কান্না শুদ্ধর পছন্দ হচ্ছে না। তাই কান্নজড়িত কণ্ঠে অস্পষ্ট সুরে মুখ খুলল,
-‘জেনেবুঝে কখনো কারো খারাপ চাইনি। নিজের অবাধ্যতা, চঞ্চলতা শুধু আপনজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি যাতে অন্যরা বিরক্ত না হয়। আমি আমার কাছের মানুষগুলোকে বড্ড ভালোবাসি শুদ্ধ ভাই! তাদের সামান্য কষ্টও আমাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। অথচ আজ জানলাম, আমারই অজান্তে, আমারই কারণে, আমারই প্রিয় কেউ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। এই অপরাধবোধ আমি কীভাবে সইব? নিজেকে কীভাবে ক্ষমা করব আমি?’
একথা শুনে শুদ্ধ হঠাৎ ব্রেক কষল। বাইক থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল শীতলের দিকে। ওর কান্নার ধরণ আর কথা শুনে বুঝতে বাকি রইল না যে শীতল সব জেনে গেছে। তবে এ মুহূর্তে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বাড়ানো যুক্তিযুক্ত মনে হলো না তার কাছে। যা বলার সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে হবে। একথা ভেবে সে পুনরায় বাইক স্টার্ট দিয়ে সোজা চলে গেল একটা শপিংমলে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা সেরে শীতলকে নিয়ে গেল এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে।

তবে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার মতো মানসিকতা শীতলের নেই। তাই ঢুকতে না চাইলে শুদ্ধই এক প্রকার জোর করে নিয়ে গেল। ওয়াশরুম দেখিয়ে বলল চোখ-মুখে ভালো করে পানি দিতে, সেই সাথে হাতে ধরিয়ে দিল মাত্রই কেনা নতুন ড্রেসটা। শীতল শুদ্ধর মুখপানে তাকিয়ে কী ভাবল কে জানে, তবে বাধ্য মেয়ের মতো ড্রেস বদলে মুখ ধুয়ে এসে টেবিলে বসল। তখনই খাবার চলে এলো। শুদ্ধ ওর প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে খেতে ইশারা করে নিজেও খাবার তুলে নিল। শীতল মুখে এক লোকমা খাবার দিলেও নির্লিপ্তভাবে বসে রইল। ওর নিশ্চুপ ভাব দেখে শুদ্ধ ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,

​-‘আমরা মানুষরা রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ হলেও সবার জীবনের গল্প আলাদা। আমরা কেউই নিজের জীবন বা নিয়তিকে মনের মতো করে সাজাতে পারি না। যদি নিয়তি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকত, তবে বিশ্বাস কর পৃথিবীর কেউই ‘দুঃখ’ নামক শব্দটা নিজের ঝুলিতে রাখত না। কিয়ারার সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা ওর নিয়তি। আমরা কেউই কারও ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি না; সেই ইখতিয়ারও আমাদের নেই।
​আমি তোকে একবারও বলব না যে, তুই ওর জন্য কষ্ট পাস না। তোর কষ্ট হচ্ছে, তুই প্রাণভরে কাঁদ। কিন্তু কাঁদতে কাঁদতেই ওর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কর। এটা হয়তো ওর কাজে লাগবে। বিচার যে চাইবি, সেই
অপরাধীও বর্তমানে কবরের বাসিন্দা। বুরাক মানতে পারে নি কিয়ারার
চলে যাওয়া। তাই বলছি, খবরদার! নিজেকে দোষারোপ করিস না। যা হয়েছে তাতে আমাদের কারও কোনো হাত ছিল না। এমনটা না আমরা সব জেনে-বুঝে ইচ্ছে করে চুপ ছিলাম। যদি জানতামও অবশ্যই কিছু না কিছু করতাম।’

-‘আসলে..!’
-‘আসলে নকলে বুঝি না। তবে ভাইয়াকে এসব বলার দরকার নেই। এত সহজে ভেঙ্গে পড়লেও চলবে না। এই জীবনে কত ঝড় আসবে-যাবে।
শক্ত থেকে সব সামাল দেওয়া শিখতে হবে। যত আবেগ, যত কষ্ট, সব নিজের মধ্যে চেপে রাখতে হবে। মানুষ কষ্ট দেবেই, এটা মানুষের স্বভাব, তবে নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখানো যাবে না। মানুষকে যত দুর্বলতা বোঝাবি মানুষ ততই মজা লুটবে। আমি চাই, আমার সহধর্মিণী আমার মতো শক্ত হোক। যাতে কেউ আঙুল তোলার আগেও হাজারবার ভাবে।’

-‘ তাহলে এখন কি করব?’
-‘ মন খারাপ করে কান্নাকাটি করা যাবে না। যারা দুর্বল, নিজেদের প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই, তারা সহজে কান্নাকাটি করে। অল্পতে ভেঙ্গে পড়ে।’
শীতল খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। ভাবল। তারপর নিজেকে সামলে সময় নিয়ে খাবারটুকু শেষ করল। কথাগুলো কাজে দিয়েছে দেখে শুদ্ধ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বাপরে, এতক্ষণ কাঁদতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন করছিল। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে দু’জন ইচ্ছেমতো ঘুরল। শশ্মান ঘাটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় না চাইতেও হেসে ফেলল। মনে পড়ল
বিপদের চৌরাস্তার ঘটনা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাগরিবের আজান হয়ে গেল। দুজনে ফ্রেশ হয়ে নিলো। শীতল মায়ের কাছে গিয়ে বসলে সিমিন এলোমেলো চুল দেখে বকতে শুরু করলেন। তাকে বকতে দেখে সিতারা উনাকে সন্ধ্যার নাস্তা রেডি করতে বলে তেল এনে শীতলকে চুলে দিতে লাগলেন। একটুপরে শুদ্ধও এসে বসল। শীতলের লম্বা চুলে দুটো বিনুনি দেখে বলল,

-‘আর কত পুতুল বানিয়ে রাখবে? এখন বাড়ির বউ হয়েছে। মেরে ধরে কাজ শিখাতে হবে।’
ছেলের কথা শুনে সিতারা ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন,
-‘কেন ভয় হচ্ছে নাকি?’
-‘কিসের ভয়?’
-‘নতুন করে যদি আবার বিয়ের প্রস্তাব আসে সেই ভয়।’
একথা বলে সিতারা পুনরায় বললেন,
-‘আমি চাই না ও বড় হোক। সে ছোট্ট শীতল হয়ে চোখের সামনে থাকুক। দুপাশে দুটো বিনুনি করে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াক। খিলখিল করা হাসিতে চৌধুরী বাড়ি মাতিয়ে রাখুক। সবাই বড় হয়ে গেলে, কেউ দুষ্টুমি করবে না। বাচ্চারা দুষ্টুমি না করলে, ভুল না করলে,আমরা বকব কাকে? কি নিয়ে সময়ে অসময়ে হাসাহাসি করব বল দেখি?’
নিজের কথা শেষ করে সিতারা স্বর্ণকে ডেকে তার চুলও বেঁধে দিলেন।
সায়ন তখন ফুচকা নিয়ে বাড়ি ফিরল। শার্টের বোতাম খুলে আরাম করে বসল। হাঁক ছেড়ে পানি চাইল। তারপর শীতলের দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘ কিরে বোনু চোখ মুখ শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ? নাকি কে কী বলেছে?’
-‘ চুলে তেল দিলাম তাই।’
-‘ওহ।’
-‘ফুচকা এনেছি, খেয়ে দেখ কেমন, ভালো নাহলে ওই শালাকে উদোম কেলাব। আগেই বলেছি ভালো হলে যেন দেয়।’
শীতল হাসল না। জবাবে কিছু বললও না। ড্রয়িংরুমে তখন চারজনই আছে। শীতল রান্নাঘরে মা-চাচীদের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ফেরাল সায়নের দিকে। স্বর্ণ পানি এনে সায়নের হাতে ধরিয়ে পাশে বসল। তখন শীতল বলল,
-‘ভাইয়া তুমি আমার ভাই কম দুলাভাই বেশি? নাকি দুলাভাই কম ভাই বেশি?’
-‘দুলাভাই কম ভাই বেশি।’
-‘ওহ। তাহলে বড় ভাই হয়ে একটা দায়িত্ব পালন করো। আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে চলো। তবে যাওয়ার কথাটা একজনকে বলা যাবে না।’
শীতলের কথা শুনে সায়ন পাশে বসা শুদ্ধর দিকে তাকাল। তারপর সেও
ফিসফিস করে বলল,

-‘ আচ্ছা শুদ্ধকে বলব না। কিন্তু কোথায় যাবি রে?’
শীতল থমথমে মুখে জবাব দিলো,
-‘ স্বর্ণ আপুর জন্য পাত্র দেখতে। তুমি বিয়ে করে ট্রিট দাও নি তাই তুমি বয়কট।’
শীতলের বলতে দেরি তবে স্বর্ণের হাত বগলদাবা করতে দেরি হলো না সায়নের। ছটফটে সুরে বলল,
-‘কিডনি হারালে কিডনি পাওয়া যাবে কিন্তু বউ হারালে বউ পাওয়া যাবে না। অনেক কষ্টের বউ আমার রিক্স নেওয়া যাবে না।’
একথা শুনে মা-চাচীরাও হেসে ফেলল। উনাদের হাসির শব্দে সায়ন হাত ছেড়ে দিলো। মাথা চুলকাল। তখন শীতল শুদ্ধকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
-‘আজ একটা কেয়ারিং বর নেই বলে।’

মাস দেড়েক পরের ঘটনা,
চৌধুরী নিবাসে সকাল যেভাবে শুরু হয় আজও সেভাবেই শুরু হয়েছে।শারাফাত চৌধুরী নাস্তা সেরে যাওয়ার সময় শীতলকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে গেছে। ক্লাস শেষে সায়ান কিংবা শুদ্ধ গিয়ে আনবে। নির্বাচন যত
এগিয়ে আসছে প্রতিটি অলিগলিতে নতুন প্রাণচঞ্চলতা দেখা দিয়েছে।
​রাস্তার ওপর দড়ি টাঙিয়ে সাদা-কালো পোস্টারের সারি। দেয়ালগুলো ছেয়ে গেছে প্রার্থীদের রঙিন লিফলেটে। মাইকের আওয়াজে কান পাতা দায়। প্রার্থীর গুণগান আর প্রতিশ্রুতির রেকর্ড করা গান বা ভাষণ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজতেই থাকে। বয়স্ক থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে একটাই: শাহরিয়ার সায়ন ভাই। সায়নের নামের প্রচারও চলছে পুরো দমে। তার নামের মিছিলে ছেলেপুলের মুখে একটাই স্লোগান,

‘আমার ভাই, তোমার ভাই,
শাহরিয়ার ভাই! শাহরিয়ার ভাই!
শাহরিয়ার ভাইয়ের মার্কা কি?
‘পায়রা’ ছাড়া আবার কি!
শাহরিয়ার ভাইয়ের ‘পায়রা’ আনবে সুখের বন্যা।’
অলিগলি রাজপথ
‘পায়রা’ মার্কার জয়লাভ।
আসিতেছে শুভ দিন
পায়রা মার্কায় ভোট দিন।’
চারদিকে এত হইহট্টগোলের মাঝে এক ধরণের টেনশনও কাজ করছে।
বিরোধী দলগুলো বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে মানুষের আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। প্রশাসন তখন শক্ত হাতে সব সামাল দিচ্ছে। কখনো কখনো দুই পক্ষের সংঘর্ষে
পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এজন্যই বাড়ির কাউকে অকারণে বের হতে দিচ্ছে না শুদ্ধ, সায়ন। গতকাল রাতে পার্টি অফিসে ছিল শুদ্ধ।

মিছিল, সমাবেশে না গেলেও তাকে পার্টি অফিসে দেখা যাচ্ছে। সায়নও ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে নানান ব্যাপারে আলোচনা করে গুঁটি গুঁটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে লক্ষ্যের দিকে। সব ঠিকঠাক থাকলে মেয়র পদে সায়নই জিতবে। শুদ্ধ সারারাত জেগে পরেরদিন সকাল থেকে ল্যাবে ছিল, বেশ
কয়েকঘন্টা কাজ করে বাড়ি ফিরে দেখে শীতল এখনো ফিরে নি। সায়ন জানিয়েছে সময়মতো সেই আনবে শীতলকে। বার বার কল করে বাড়ি ফেরার তাড়াও দিলো। তারপর ফ্রেশ হয়ে খেয়ে শুতেই চোখজোড়া ঘুমে বুজে এলো। কতটুকু ঘুমিয়েছে জানা নেই তবে আচমকা শরীরে ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ খুলে তাকাল শুদ্ধ। সিতারা বেগম হাউমাউ করে কাঁদছে। থরথর করে কাঁপছে উনার শরীর। হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে ঘুম ভাঙায় কিছুই বুঝল না শুদ্ধ।

তবে সিরিয়াস কিছু আন্দাজ করে উঠে বসতেই সিতারা বললেন দ্রুত তার ফোন দেখতে। শুদ্ধ ফোন সাইলেন্ট করে চার্জে দিয়ে ঘুমিয়েছিল। মায়ের কথায় ফোন চেক করে দেখল অসংখ্য ফোনকল। আজমের কল বেশি দেখে কল ব্যাক করে যা শুনল তাতে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। অতঃপর কোনোদিকে না তাকিয়ে একদৌড়ে নিচে নামল। তারপর বাইক নিয়ে পৌঁছাল এক নির্জন জায়গায়। তখন মাগরিবের আজানের আগ মুহূর্ত। স্তিমিত আঁধার নেমেছে ধরণীর বুকে। সেই মুহূর্তে ভিড় করেছে অসংখ্য মানুষ। হইচই চারদিকে। সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই দৃষ্টি আটকাল কলেজে ড্রেস পরা অল্প বয়সী এক মেয়ের দিকে।

তাতেই শুদ্ধর হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল। দেখল, কলেজের ড্রেস পরা শীতল বসে আছে মাটিতে, তার কোলে রক্তে ভেজা সায়নের মাথা। দুজনের পোশাক রক্তে রাঙা। পাশে বসে আজম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ডাকছে অবচেতন সায়নকে। হতভম্ব শুদ্ধ এগিয়ে যেতেই শীতলও চোখ তুলে তাকাল। তাকে দেখে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেও ভেতরের সবটুকু আক্রোশ আর হাহাকার মিশিয়ে কিছু শব্দ গোছাল। তারপর ভাঙা গলায়, থেমে থেমে বলল,

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৬

__’কোনো বোন কি চোখের সামনে ভাইয়ের নিথর দেহ দেখতে পারে? পারে না, আমিও পারি নি। ওরা আমার ভাইকে মারতে এসেছিল আমি ওদের মেরে দিয়েছি।’
শীতলের কথাগুলো যখন শুদ্ধর কানে পৌঁছাল তখন শুদ্ধও বাকহারা।
যে মেয়েটি পিঁপড়ে মারতেও ভয় পেত তার এমন দুঃসাহসিক কথায় ও কাজে শুদ্ধর চেনা জগৎটা মুহূর্তেই যেন উল্টেপাল্টে গেল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৮

5 COMMENTS

Comments are closed.