শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাতটা যেন আজ অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করেছে । জানালার বাইরে নরম চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। দূরের আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা। ফেয়ারি লাইটের মিটমিটে আলো আর সুগন্ধি মোমবাতির মিষ্টি ঘ্রাণে পুরো ঘরটা যেন কোনো স্বপ্নপুরীর অংশ হয়ে উঠেছে। হালকা বাতাসে সাদা পর্দাগুলো দুলে উঠছে, আর সেই পরিবেশে অপেক্ষা করছে একজন প্রেমিক পুরুষ … তার নীলাঞ্জনার জন্য।কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
নীল শাড়ি পরে ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো পিয়াসা।মুহূর্তের জন্য রেদোয়ান স্থির হয়ে গেল।
গাঢ় নীল শাড়ি, হাতে নীল কাঁচের চুড়ি, খোলা চুলের ফাঁকে লাজুক মুখটা যেন রাতের আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো নীল পরী।
রেদোয়ানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।আর পিয়াসা সে তো লজ্জায় মাটির নিচে মিশে যেতে চাইছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, একবারও রেদোয়ানের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না কারণ তার শাড়িটা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে রেদোয়ান ধীরে ধীরে উঠে তার সামনে এসে দাঁড়াল।মৃদু হেসে বলল কী হলো, পিহু? শাড়ি পরতে পারিস না নাকি?
পিয়াসা লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে ছোট্ট গলায় বলল না… পারি না। তুমি তো জানো রেদোয়ান মুখ গম্ভীর করে বলল,আমিও তো পারি না। এখন কী হবে, আমার নীলাঞ্জনা?
পিয়াসা অবাক হয়ে মাথা তুলল।তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, শাড়ির আঁচলটা সে কচলাতে কচলাতে প্রায় এলোমেলো করে ফেলেছে।
পরের মুহূর্তেই রেদোয়ান তার কাছ থেকে শাড়ির আঁচলটা নিয়ে নিল।পিয়াসা লজ্জায় আর ভয়ে চিৎকার করে উঠল,এই! কী করছো?রেদোয়ান মজা করে বলল,খুলতেই তো হবে। এভাবে তো আর থাকবে না। এত যত্ন করে পরার দরকার নেই।কথাটা শুনেই পিয়াসার বুক ধক করে উঠল।সে বড় বড় চোখ করে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার ভাবভঙ্গি দেখে রেদোয়ানের হাসি পেয়ে গেল।
সে আলতো করে বলল,আরে বোকা মেয়ে, তোর শাড়িটা ঠিক করে দিচ্ছি।
পিয়াসা এবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
খুব যত্ন করে রেদোয়ান একে একে শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে আঁচলটা সুন্দর করে গুছিয়ে তার কাঁধে তুলে দিল।
মাঝেমধ্যে তার আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছিল পিয়াসার পুরো শরীর । আর তাতেই পিয়াসার বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে যাচ্ছিল।শেষবার আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে রেদোয়ান এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল।
তার চোখে তখন শুধু মুগ্ধতা।সত্যিই… তার নীলাঞ্জনাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
এরপর সে টেবিল থেকে নীল কাঁচের চুড়িগুলো নিয়ে এল যেগুলো সে শাড়ি পরানোর আগে খুলে রেখেছিল খুব সাবধানে, , একে একে পিয়াসার হাতে পরিয়ে দিতে লাগল।
টুংটাং শব্দে চুড়িগুলো বেজে উঠতেই পিয়াসা মুগ্ধ হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর সে অবাক হয়ে বলল তুমি… তুমি শাড়ি পরাতে পারো? এত সুন্দর করে? আগে কাকে পরিয়ে ছিলে সত্য কথা বলো?
রেদোয়ান মুচকি হেসে তার কাছে এগিয়ে এলো।
তারপর খুব আলতো করে পিয়াসার ঠোঁটে নিজের ঠোঁয়াটা ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, শান্ত হও, নীলাঞ্জনা। ছোটবেলায় তোমাকে আর বনুকে কতবার শাড়ি পরিয়ে দিয়েছি, মনে আছে? তখনই শিখেছিলাম।
পিয়াসা কিছুক্ষণ ভাবার ভান করল।তারপর হঠাৎ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
— উফ… বেঁচে গেলেকথাটা শুনে রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, বেঁচে গেলে মানে?
পিয়াসা ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেসে বলল আমি তো ভাবছিলাম, আমার আগে অন্য কাউকে শাড়ি পরিয়ে অভ্যাস করেছো কথাটা শুনে রেদোয়ান হেসে উঠল।তারপর নিজের নীলাঞ্জনাকে আলতো করে বুকে টেনে নিল।
তারপর খুব আলতো করে পিয়াসার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, এতদিনের অপেক্ষার পর আজ তুমি সত্যিই আমার হলে, নীলাঞ্জনা।পিয়াসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। লজ্জায় সে মাথা নিচু করে ফেলল।রেদোয়ান মৃদু হেসে তার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা একটু উঁচু করল আমার দিকে একবার তাকাবে না?পিয়াসা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাতেই দুজনের চোখ এক হয়ে গেল। সেই চোখে ছিল লাজ, ভালোবাসা আর বহু বছরের অপেক্ষা পূরণের শান্তি।রেদোয়ান আলতো করে তার কপালে একটি চুমু এঁকে দিল। আজ থেকে তোমার সব হাসি, কান্না, অভিমান… সবকিছুর দায়িত্ব আমার।
পিয়াসা মুখে হাসি নিয়ে আস্তে করে তার বুকে মাথা রাখল।রেদোয়ান তাকে খুব যত্ন করে নিজের কাছে টেনে নিল।বাইরে তখন চাঁদের আলো জানালা পেরিয়ে ঘরে ঢুকছে, আর ভেতরে দুটি মানুষ নতুন এক জীবনের প্রথম রাতের নরম, মায়াময় মুহূর্তগুলো নিঃশব্দে অনুভব করে চলেছে
রেদোয়ান খুব আলতো করে তার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা একটু উঁচু করল।এত লজ্জা কিসের, নীলাঞ্জনা?পিয়াসা কিছু বলল না। শুধু তার বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল। জানি না আজ এমন লাগছে কেন। রেদোয়ান মুচকি হেসে ধীরে ধীরে পিয়াসার দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, আজ থেকে তুমি শুধু আমার।
কথাটা শুনে পিয়াসার গাল দুটো আরও লাল হয়ে উঠল।পরের মুহূর্তে রেদোয়ান খুব আলতো করে তার কপালের ওপর ঝুঁকে এলো, তারপর স্নেহভরে তার ঠোঁটে এক ক্ষণিকের, কোমল চুম্বন এঁকে দিল।
পিয়াসা বিস্ময়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। লজ্জায় তার আঙুলগুলো শক্ত করে রেদোয়ানের হাত আঁকড়ে ধরল।রেদোয়ান মুচকি হেসে তাকে নিজের বুকে টেনে নিল।ধীরে ধীরে রেদোয়ানের ছোঁয়াগুলো আরও গভীর, আরও যত্নশীল হয়ে উঠতে লাগল। তার প্রতিটি স্পর্শে যেন বহু বছরের অপেক্ষা, ভালোবাসা আর না বলা হাজারো অনুভূতি মিশে আছে।পিয়াসার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।সে কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, তোমাকে… এমনভাবে আগে কখনো দেখিনি। আজ যেন তোমাকে নতুন করে আবিষ্কার করছি, রেদোয়ান ভাইয়া…রেদোয়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে তার কানের কাছে নরম স্বরে বলল,এতদিন আমি শুধু এই দিনের জন্যই অপেক্ষা করেছি, পিহু… আমাদের এই হালাল মুহূর্তটার জন্য।কথাগুলো শুনে পিয়াসার শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।
রেদোয়ান আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো।
এতটাই কাছে যে দুজনই একে অপরের উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করতে পারছে।
পিয়াসার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই রেদোয়ানের হাত আঁকড়ে ধরল।আলতো করে নিজের নীলাঞ্জনাকে কোলে তুলে নিল রেদোয়ান। পিয়াসা লজ্জায় তার শেরওয়ানির কলার মুঠো করে ধরে রইল।
ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল সে। তারপর উঠে গিয়ে ঘরের ফেয়ারি লাইটগুলো নিভিয়ে দিল। ঘরটা পুরো অন্ধকার হলো না, জানালার ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলোয় চারপাশে এক মায়াবী আবহ তৈরি হলো।রেদোয়ান আবার এসে তার পাশে বসল। কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে নিজের বউটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা পিয়াসার কোলের ওপর রাখল।একটা দীর্ঘ শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কী অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস, নীলাঞ্জনা! কেমন এক বউ-বউ গন্ধ তোমার কাছে… ইশ, কতটা মিষ্টি!কথাটা শুনে পিয়াসা খিলখিল করে হেসে উঠল।আর রেদোয়ানসে মুগ্ধ চোখে নিজের হাস্যোজ্জ্বল বউটার দিকে তাকিয়ে রইল।
চাঁদের নরম আলোয় তাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে।কিছুক্ষণ পর রেদোয়ান উঠে বসল। তারপর এক ঝটকায় পিয়াসাকে নিজের বুকে টেনে নিল।
মাথাটা নিজের বুকে রেখে নরম স্বরে বলল,
— নীলাঞ্জনা… তোমার জায়গা এখানে।
— এই মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরীর বুকে। বুঝেছো? আর কোথাও না।পিয়াসা মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল লাজ, ভালোবাসা আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি।সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
ঠিক আছে, জনাব।পরের মুহূর্তেই সে নিজেও একটু সরে এসে আরও আরাম করে রেদোয়ানের বুকে মাথা রেখে দিল।
এর পর আলতো করে নিজের প্রিয় মানুষ টার কপালে,মুখে, ঠোঁটে একে একে ভালোবাসার পরশ একে দিল ফিসফিস করে বললো ভালোবাসি।
রেদোয়ান ও মুচকি হেসে বললো ভালোবাসি।
এদিকে ইনায়া মনমরা হয়ে বসে আছে পিয়াসার রুমের বারান্দায়। রাত অনেক হয়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা, আর শীতল বাতাস আলতো করে তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।কিন্তু তার মনটা অদ্ভুত অস্থির।বারবার তার মনে পড়ছে গাড়ির ভেতরে ইউভির বলা কথাগুলো।ইউভি কঠোর গলায় বলেছিল,
— “আমি না আসা পর্যন্ত আমাদের রুমে যাবি না, আদর। আমার ফিরতে ফিরতে হয়তো তিনটা বেজে যাবে। একটু অপেক্ষা করিস, বনুর রুমে রেডি হয়ে থাকিস, বউ। আমি দ্রুত ফেরার চেষ্টা করব।”
ইনায়া কতবার জিজ্ঞেস করেছিল,কোথায় যাচ্ছেন?।কিন্তু ইউভি কোনো উত্তর দেয়নি।
শুধু তার কপালে ভালোবাসার একটা পরশ এঁকে দিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল,কাল সকালেই নিউজে দেখতে পারবি।
হঠাৎই ইনায়ার মনে পড়ল ইউভির সেই কথাটা—
“রেডি হয়ে থাকিস, বউ।”
রেডি?
কিসের জন্য?
কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎই তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।আজ তো আজ তো তাদের বাসর রাত!
মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বলল,আজ একটু সারপ্রাইজ দেওয়া যাক আমার শেহজাদাকে।।যেই ভাবা, সেই কাজ।সে এক প্রকার দৌড়েই রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল।তারপর জোর করেই তুবা, সাম্মি আর রানিকে ঘুম থেকে তুলে দিল।তুবা তখন সবে ঘুমিয়েছে। রাজ্যের সঙ্গে এতক্ষণ গল্প করে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গিয়েছিল।ঘুমজড়ানো গলায় বিরক্ত হয়ে বলল,
— “উফফ! বেবি, কী হয়েছে তোর? ঘুমোবি না?”
ইনায়া উত্তেজিত গলায় বলল,
— “আমাকে বউ সাজিয়ে দে। আমি সবকিছু নিয়ে আসছি। তোরা আগে মুখে পানি দিয়ে আয়।”
তিনজনই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ইনায়া হাতে কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে ফিরে এলো।সেখানে ছিল একটা গাঢ় লাল জামদানি শাড়ি যেইটা রাতিব চৌধুরী তাকে উপহার দিয়েছে বাবার দেওয়া শাড়ি টাই সে বেছে নিলো
দু সেট লাল কাঁচের চুড়ি একটা ছোট্ট লাল টিপ…
আর বউ সাজের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু।
তুবা, সাম্মি আর রানি একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।
তারপর শুরু হলো ইনায়াকে সাজানোর পালা।
প্রথমে চুলগুলো খুব যত্ন করে আঁচড়ে এক পাশে রাখা হলো।চুলের এক পাশে গুঁজে দেওয়া হলো ছোট্ট সাদা গোলাপ ফুল।তারপর ধীরে ধীরে তাকে পরিয়ে দেওয়া হলো লাল জামদানি শাড়িটা।
শাড়ির লাল রঙে যেন তার গায়ের ফর্সা আভাটা আরও ফুটে উঠল।সাম্মি তার হাতে একে একে লাল চুড়িগুলো পরিয়ে দিল।ঝুনঝুন শব্দে চুড়িগুলো যেন রাতের নীরবতায় নতুন এক সুর তুলল।রানি খুব যত্ন করে তার কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ এঁকে দিল।
তারপর হালকা কাজল টেনে দিল চোখে।
মুহূর্তেই ইনায়াকে যেন নতুন এক রূপে দেখা গেল।
একেবারে নতুন বউ।লজ্জায় রাঙা, শান্ত, মায়াবী।
সবশেষে ইনায়া আলতো করে হাতে তুলে নিল ইউভির দেওয়া সেই পায়েল টি মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।ধীরে ধীরে পায়েল টা পায়ে পরে নিল সে।ঝুনঝুন শব্দ উঠতেই তার বুকের ভেতরটাও কেমন যেন কেঁপে উঠল।
তুবা মুগ্ধ হয়ে বলল,মাশাআল্লাহ! আজ তোকে একদম নতুন বউ দের মতো লাগছে।”
সাম্মি বলল,”না, না একদম ওর বালের শেহজাদার বেগম লাগছে।”কথাটা শুনে সবাই এক সাথে হেসে ফেলল।
এদিকে গভীর রাত।
আর কিছুক্ষণ পরই ফজরের আজান ভেসে উঠবে।
আকাশের গায়ে ধীরে ধীরে ভোরের আভা ফুটতে শুরু করেছে।ঠিক তখনই চৌধুরী ভিলার সামনে এসে থামল কয়েকটা গাড়ি।
গাড়ি থেকে নেমে এলো—ইউভি…আদিল…অর্ক…রেসব…আলভি…রিমঝিম চৌধুরী…রাশেদ মির্জা…
সবার মুখেই এক রহস্যময় বিজয়ের হাসি।
মনে হচ্ছে, কোনো অসমাপ্ত কাজ শেষ করে ফিরেছে তারা।ইউভি ধীরে ধীরে ভিলার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,”সবাই রেডি থেকো। কালকের নিউজ দেখার জন্য। আর সবাই ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
সবাই নিজ নিজ রুমের দিকে চলে গেল
এদিকে ইউভি ক্লান্ত শরীর, ধুলো-মাখা জামাকাপড় নিয়েই নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
হয়তো কিছু সময়ের জন্য সে ভুলেই গিয়েছিল—
আজ তার বাসর রাত।রুমে ঢুকতেই ফুলের সাজ দেখে তার সব মনে পড়ে গেল।আর পরের মুহূর্তেই তার চোখ গিয়ে পড়ল বিছানার দিকে।বিছানায় বসে আছে।লাল টুকটুকে বউ সেজে থাকা ইনায়া।
ইউভি যেন হাঁটতেই ভুলে গেল।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
— “সাধে কি বলি তোকে বেয়াদব… এইভাবে তিলে তিলে আমাকে শেষ না করলেও পারতি তুই?”
এরপর গম্ভীর গলায় বলল,”তোকে এই রুমে আসতে মানা করেছিলাম, বেয়াদব।”ইনায়া ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে এল।বিছানার পাশ থেকে একটা প্যাকেট তুলে সেখান থেকে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা বের করল।তারপর মুচকি হেসে বলল, “আগে ফ্রেশ হয়ে আসো বর।”এই বলে চোখ টিপ দিল।ইউভি যেন কথাটা হজম হলো না বেশম খাওয়ার মত কাশতে শুরু করল।
— “কিহ! তুমি বললে?”
ইনায়া চোখে চোখ রেখে বলল,
কই? না তো।ইউভি তার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিল।তারপর নিচু গলায় বলল,তুমি যখন বলছ, আজ থেকে তুমি করেই বলবে।”ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,কেন, মিস্টার? আপনি তো একবার তুমি, একবার তুই বলেন। আমি বললে দোষ কোথায়?”ইউভি আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল,ভালোবাসার সময় তুমি… আর শাসন করার সময় তুই। সবকিছু বলব।এবার ইনায়া গম্ভীর গলায় বললো মিস্টার, সকাল হতে চলল। আর আপনি এখন আসছেন রুমে। আমাদের এই সুন্দর দিনটা নষ্ট করবেন না। যান না, ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি।”ইউভি আরেকটু কাছে এসে তার গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “আমার কাছে রোজই সুন্দর দিন, বউ। আজ আর অন্য দিনের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য পাই না।
ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে এক প্রকার জোর করেই ইউভিকে ওয়াশরুমের দিকে ঠেলে দিল।আর ইউভি যেতে যেতে মুচকি হেসে বলল,
— “এর শোধ আমিও নেব, মিসেস চৌধুরী…
অপেক্ষা করো।
বেশ কিছু সময় পর ইউভি ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অন্যরকম লাগছে। চুলের ডগা থেকে এখনো দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে।এদিকে ইনায়া নিজের শাড়িটা ঠিক করতে ব্যস্ত। অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করছে তার ভেতর। বারবার বুকের ওপর থেকে সরে যাওয়া আঁচলটা ঠিক করছে।
ঠিক তখনই ইউভি পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করতে করতে শান্ত গলায় বলল,সিডিউস করতেও শিখে গেছেন, মিসেস চৌধুরী? বাহ!”
ইনায়া ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
— “না… একদম না!”ইউভির ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
ভালোবাসার জাল কিন্তু আমি বুনতে পারি, মিসেস চৌধুরী। আপনার হাজব্যান্ড আমি। আপনাকে কীভাবে নিজের মোহে আবদ্ধ করতে হয়, তা আমি খুব ভালো করেই জানি। আমার মোহে একবার আবদ্ধ হলে ফেরার কিন্তু কোনো রাস্তা নেই…!”
ইনায়াও হার মানার পাত্রী নয়।
সে ধীরে ধীরে এক পা… এক পা করে ইউভির দিকে এগিয়ে এলো।তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “আর আপনি তো অনেক আগেই আমার মায়ায় হারিয়ে গেছেন, মিস্টার চৌধুরী। এখন চাইলে আর নিজেকে মুক্ত করতে পারবেন না।”আরও একটু কাছে এসে বলল,
— “আমার চোখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন… সেখানে শুধু আপনারই নাম লেখা।”
— “আপনার হৃদয়ের দরজার চাবিটা অনেক আগেই আমি চুরি করে নিয়েছি। এখন আপনার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা হাসি, প্রতিটা অনুভূতির ওপর আমার অধিকার। আপনি আমার… শুধু আমার। আর আমার জাদু থেকে পালানোর ক্ষমতা আপনার নেই, মিস্টার।”তাই সাবধান… আমার ভালোবাসায় একবার ডুবে গেলে সারাজীবন আমারই হয়ে থাকতে হবে।”
কথাগুলো শুনে ইউভি হো হো করে হেসে উঠল।
— “বাহ! বেয়াদবটার বুদ্ধি তো দেখি হাঁটু থেকে একটু ওপরে উঠেছে! আই অ্যাম ইমপ্রেসড, বউ।”
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে পাশে রাখা একটা ছোট্ট আলতার কৌটা হাতে নিল।তারপর সেটা ইউভির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,পরিয়ে দেবেন?”
এক সেকেন্ডও দেরি করল না ইউভি।তার হাত থেকে কৌটাটা নিয়ে বলল,অবশ্যই, বউ। কেন নয়?”
পরের মুহূর্তেই সে আলতো করে ইনায়াকে কোলে তুলে নিল।ইনায়া চমকে উঠে তার গলা জড়িয়ে ধরল।ইউভি তাকে বিছানার কিনারায় বসিয়ে দিল।
তারপর নিজে মেঝেতে বসে পড়ল।খুব যত্ন করে ইনায়ার দুটো পা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল।
পায়েলের ঝুনঝুন শব্দে মুহূর্তটা আরও মায়াময় হয়ে উঠল।ইউভি ধীরে ধীরে আলতার কৌটার ঢাকনা খুলল।তারপর অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নিজের বউয়ের পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
মুগ্ধ হয়ে ফিসফিস করে বলল,মা শা আল্লাহ
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
ইউভি খুব যত্ন করে তার পায়ে আলতা পরিয়ে দিতে লাগল।যেন এটা শুধু আলতা নয়… নিজের ভালোবাসার রঙ দিয়ে সে তার বউয়ের পা রাঙিয়ে দিচ্ছে৷
ইউভি খুব যত্ন করে আলতা পরাতে পরাতে মৃদু হেসে বলল এই আলতা রাঙা পা দুটো দেখার অধিকার শুধু আমার। অন্য কারও নজর পড়ুক, সেটা আমি একদমই চাই না, মিসেস চৌধুরী।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে মিষ্টি হেসে বলল,
— “কেন? এত হিংসা কেন, মিস্টার চৌধুরী?”
একটু থেমে আবার বলল,
— “এত সুন্দর করে পা রাঙিয়ে অন্য কাউকে দেখানোর কথা ভাবছ না কী মিসেস চৌধুরী?”
ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
তখন ইউভি তার পায়েলে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে নরম গলায় বলল,”এই লাল রাঙা পা দুটো শুধু আমার জন্যই সাজবে। এই পা দুটোও আমার ব্যক্তিগত সম্পদ, বউ।”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৪
তারপর ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,আজ থেকে এই পায়ের পায়েলের শব্দ, এই আলতার রঙ… সবকিছুর ওপর শুধু আমার অধিকার। কারণ তুমি আমার—শুধুই আমার, মিসেস চৌধুরী।”
এই রুমের বাহিরে কখনো আলতা পড়ে পায়েল পায়ে দিয়ে বের হবে না
