শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৫
সুরভী আক্তার
শ্যামা সংগ্রামের বুকে মুখ লুকিয়ে গুটিয়ে আছে নীরবে। সেপ্টে আছে ও। সংগ্রাম ও নীরব। ওর এক হাত শ্যামার মাথার চুলের ভাঁজে অন্য হাত পিছন থেকে কোমর জড়িয়ে রাখা। শ্যামার শরীরের মৃদু কাঁপুনি টের পাচ্ছে ও। মুহুর্ত পরপর ফিকড়ে উঠছে শ্যামা। সংগ্রাম তার বেগমের চুলে ভাঁজে হাত বুলিয়ে অতি আদুরে মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো….
” বেগম ??
বেগম ডাকে অনেকটা সময় পর শ্যামার নরম ক্ষীণ স্বর শোনা গেল…
” হুম !!
স্বস্তি পেলো সংগ্রাম। এতক্ষণের জমে রাখা শ্বাস ফেললো দীর্ঘ। শীতল কন্ঠে বলল…
” ঠিক আছো তুমি?
শ্যামা মাথা তুললো তার ছোট জমিদারের বক্ষ থেকে। টলছে ও। মাথা টা পিছনের দিকে হেলে পড়তেই সংগ্রাম ঝট করে ধরলো। শ্যামার নিভু নিভু চোখ। শরীর নেতিয়ে আসছে। জোর নেই হাতে পায়ে। সে সংগ্রামের উপর নিজের ভার ছেড়ে নেতিয়ে পড়ল। নিজেকে সামলে আধো আধো স্বরে বলল…
” কখন এসেছেন? ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি? ডাকলেন না কেনো আমায়?
” এক্ষুনি এসেছি আমি! ঘুমিয়েছিলে তুমি, তাই ডাকিনি! ঘুম হয়নি,, ঘুম প্রয়োজন তোমার, ঘুমাও!
শ্যামা নিভু নিভু চোখে অল্প বিস্তর তাকিয়েই সংগ্রাম কে দেখলো। মন উৎসুক হলো এতেই। এক চিলতে নরম হাসির রেখা ফুটলো ওর ঠোঁটের কোণে। আধো চোখ খোলার চেষ্টা করলো পুরোপুরি। বারান্দায় নজর যেতেই চক্ষু দ্বয় প্রস্তর হলো ওর। বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকার আন্দাজে ঠেকলো। শক্তি জুগিয়ে উঠে বসলো শ্যামা। বাইরের দিকে তাকিয়েই বললো….
” রাত হয়েছে? কটা বাজে? আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম সেই বিকেলে! এতোটা সময় ঘুমিয়ে ছিলাম আমি?
সংগ্রামের ললাটে ভাঁজ পড়লো কয়েক স্তর। নরম চাহনি তীক্ষ্ণ হলো এবার। সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো ও….
” কখন ঘুমিয়েছিলে তুমি? বিকেলে?
শ্যামা মাথা নাড়ালো উপর নিচ। মুখায়ব মলিন ওর। শ্যামার শ্যামলা মুখে পানির বিন্দু বিন্দু কণা চিকচিক করছে এখানে ওখানে। সংগ্রাম দুহাত বাড়িয়ে শ্যামার মুখখানা আগলে নিয়ে নরম হাতে মুছিয়ে দিলো মুখখানি। সংগ্রামের বরফের ন্যায় ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো শ্যামা। এবার সম্বিত ফেরালো নিজের দিকে। পড়নের শাড়ি টা ভেজা অল্প বিস্তর। পানির ছেটা ছোপ ছোপ। কিন্তু ভিজলো কি করে শাড়ি? শ্যামা নিজেকে ভালো ভাবে পরখ করে সংগ্রামের দিকে নরম চাহনিতে তাকালো। প্রশ্ন করলো….
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আমি ভিজলাম কি করে? শাড়ি ভেজা কেনো?
সংগ্রামের শীতল উত্তর…
” আমার হাত থেকে পানির গ্লাস টা উল্টে পড়েছিল তোমার শাড়ি তে।
” কখন? আমি টের পেলাম না কেনো? ঘুমিয়ে ছিলাম?
” গভীর ঘুমে ছিলে, তাই টের পাও নি হয়তো।
সংগ্রামের কন্ঠস্বর বিষন্ন। দেখে কেমন যেন লাগছে। শ্যামা ঘাড় কাত করে পর্যবেক্ষণ করলো ওকে। গাঁ ঘেঁষে সংগ্রামের বাহু জড়িয়ে ধরলো। ভেতরটা কেমন ধকধক করছে ওর। বাইরে থেকে শান্ত হলেও ভেতরে কেমন যেন অস্থির লাগছে। অনুভূতি অদ্ভুত ওর। শ্যামা নিজে থেকে সংগ্রামের এতো কাছে আসার পরও সংগ্রাম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। দেখে মনে হলো, হাসলো জোর পূর্বক। শ্যামা আরো বেশি সন্নিকটে বসলো। ডাকলো নরম কন্ঠে….
” ছোট জমিদার সাহেব..
” বলো, বেগম…..
” কি হয়েছে আপনার? এমন দেখাচ্ছে কেনো?
” ভাবছি আমি!
” কি ভাবছেন?
” তোমায় নিয়ে !
শ্যামা কপাল কুঁচকালো। প্রশ্ন করলো সন্দিহান হয়ে…
” আমায় নিয়ে? আমায় নিয়ে কি ভাবছেন ?
সংগ্রাম চুপ থাকলো মুহূর্ত কয়েক। হাসলো এবার। শ্যামা ওকে জড়িয়ে রেখেছে যে হাতে, সেই হাতটা ছাড়িয়ে সংগ্রাম নিজে জড়িয়ে ধরল ওকে। আলতো ভেজা চাদরটা এক হাতে সরালো শ্যামার কোল থেকে। শ্যামা চেয়ে আছে নিগুড় শান্ত চোখে। সংগ্রাম টামুল টুমুল হয়ে বসে বললো….
” সারাদিন তুমি বাড়িতে একা থাকো, তোমার খারাপ লাগে না? আমি তো সবসময় থাকি না তোমার সাথে। একা একা লাগে তোমার, তাই না?
শ্যামা এতক্ষণে একটু হাসলো। সংগ্রাম চোখ ভরে দেখলো নরম হাসি টুকু। শ্যামা উত্তর করলো…
” একা থাকি কোই? বাড়িতে তো সবাই আছে, দাদি জান আছে, ভাবি আছে, বালা আছে, আরো সবাই আছে।
” ওরা তো থাকে না তোমার সাথে। ঘরে একা থাকো, ভয় করে তোমার?
” না..
সাবলীল উত্তর শ্যামার। তবে মন থেকে নয়। আজকাল তো আঁধার নামতেই ভয় ঘিরে ধরে ওকে। কেমন যেন গাঁ ছমছম করে। ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় চারপাশে। এসব প্রকাশ করলো না শ্যামা।
সংগ্রাম রুক্ষ শুকনো অধর জিভে ভেজালো। শ্যামা এখন সংগ্রামের বুকে। সংগ্রাম শ্যামার এক হাত ধরলো। হাতটা উল্টে পাল্টে দেখে চুমু বসালো হাতের উল্টো পিঠে। তৃপ্ত অনুভূতিতে সংগ্রামের বুকে আরো বেশি সিটিয়ে গেলো শ্যামা। সংগ্রামের বুকের ধুকপুকানির শব্দ ব্যাতীত আর কোনো শব্দ নেই আশেপাশে। আপাতত নীরব পুরো ঘর। সংগ্রাম নীরবতা ভেঙে সুপ্ত স্বরে ডাকলো…
“বেগম…
” হুম !
” তোমার একাকিত্বের একজন স্থায়ী সঙ্গীর প্রয়োজন!
” আপনি তো আছেন !
” সব সময় থাকি না তো !
আমার এই ক্ষনিকের অবর্তমানেও তোমাকে একা থাকতে দিতে চাই না আমি। একজন স্থায়ী সঙ্গী উপহার দিতে চাই তোমায়!
” কিভাবে? কি উপহার?
সংগ্রাম ঠোঁট পিষে মৃদু হাসলো। শ্যামার কানের কাছে মুখ গুজে চোখ বুজে বললো চাপা স্বরে….
” আমি উপহার দেবো। আর তুমি গ্রহণ করবে! তবে তোমাকে সেই উপহার দেওয়ার জন্য আমার তোমায় প্রয়োজন!
শ্যামার কৌতুহল বাড়লো। মাথা তুললো ও। প্রশ্ন করলো দ্বিগুণ অনুসন্ধিৎসায়…
” মানে?
সংগ্রাম চক্ষু জোড়া জড়ো করলো। তার বেগম যে বড্ড হতচেতন। সংগ্রাম ভনীতা হীন বললো আবেশিত কন্ঠে..
” উপহার গ্রহণের আগে তোমায় কিছু দিতে হবে। আগে চাইবো তোমার কাছে। তোমার কাছে একটা জিনিস চাওয়ার আছে, বেগম!
শ্যামা ফটাফট বললো…
” চেয়ে নিন, আপনাকে কিছু দিতে পারলে ধন্য হবো আমি। ধন্য হবে আপনার বেগম…
মৃদু হাসলো সংগ্রাম। কোমর জড়ানো হাতের বাঁধন দৃঢ় করলো। অন্য হাত শ্যামার গাল বেয়ে কানের নিচ পর্যন্ত পৌঁছালো ওর। শ্যামা খানিক ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। নড়েচড়ে উঠলো ও। সংগ্রামের দৃষ্টি অদ্ভুত, এই দৃষ্টির সম্মুখীন আগেও অনেক বার হয়েছে ও। শ্যামার বুঝতে বাকি রইলো না সংগ্রামের নিষ্পাপ চাহনি সম্পর্কে। শ্যামা দৃষ্টি ঘোরালো এদিক ওদিক। সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে ওর কপোলের পাশে চুমু খেলো শব্দ করে। শ্যামা চোখ বুজেছে তৎক্ষণাৎ। সংগ্রাম মুখ তুলে কপালে কপাল ঠেকালো। নাকের ডগায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো হাস্কি স্বরে….
” তুমি আমার প্রাপ্তি বেগম, আর আমি আমার প্রাপ্তিতে পূর্ণতা চাই। পূর্ণতা চাই আমার ভালোবাসার। পূর্ণতা হিসেবে চাই আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন কে। নতুন এক নবজাতক কে। যে আমাদের প্রেম আঙ্গিনায় প্রাপ্তি হবে। যে হবে আমার আর আমার বেগমের ভালোবাসার প্রথম নিদর্শন।
আপাতত এটুকুই চাই, দেবে আমায়?
শ্যামা জিভে ঠোঁট ভেজালো। কান গরম হয়ে আসছে ওর। ওদের মধ্যে যে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে পূর্ণতা পায় নি তা নয়। শ্যামা পরিপূর্ণ তার ছোট জমিদারের ভালোবাসায়। তার স্বামীর ভালোবাসায়। তবুও শ্যামা ইতস্তত থাকে সবসময়। এখনো তাই। সংগ্রামের কথা গুলো অস্বস্তিতে ফেললো ওকে। এতোক্ষণে সংগ্রামের ইঙ্গিত বুঝতে বাকি রইলো না। শ্যামার ইতস্ততা দেখে ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করলো সংগ্রাম। বললো মেকি স্বরে….
” আমি কিন্তু আমার জন্য চাইছি না কিছু। চাইছি তোমার জন্য। তোমার একলা থাকার বিষয়টা ভাবলাম। কাউকে প্রয়োজন তোমার। তাই আর কি….
শ্যামা বলে উঠলো….
” আপনার বাচ্চা অনেক প্রিয় তাই না?
” অনেক! অনেক, অনেক, অনেক বেশি। জানো, যখন গ্রামে যাই , সব বাচ্চারা কেমন ছুটে ছুটে আসে। কি সুন্দর করে হাসে ওরা। সৈকত কে দেখো না? কি সুন্দর , ছোট ছোট হাত,পা, চোখ, মুখ, ছোট্ট শরীর। কতো মায়াবী। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।
সংগ্রামের কথা গুলো বাচ্চাদের ন্যায় শোনাচ্ছে। উপভোগ করছে শ্যামা। আনমনে বলেই যাচ্ছে সংগ্রাম…
” তুমি চাও না আমাদের ঘরে এমন কেউ আসুক? তোমার কোল আলো করে আসুক কেউ। ছোট্ট ছোট্ট গুটি গুটি পায়ে তোমাকে ঘিরে ঘুরে বেরাক সবসময়। মা ডাক শুনতে চাও না? আমি চাই বাবা ডাক শুনতে! ভীষণ ভাবে চাই। যতটা তীব্র তোমাকে চাই, ঠিক ততটা তীব্র ভাবে আমাদের অনাগত ‘সুফিয়ানা’ কে চাই !
শ্যামা মন দিয়ে শুনলেও শেষ পথে ভ্রু গুটালো…
” সুফিয়ানা?
” হুম, আমাদের অনাগত কন্যা সন্তান! সুফিয়ানা! সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম ডালিয়ার – ছোট্ট পরী, আলোর ফুল, আধ্যাত্মিক, লাবন্যময়ী অর্থের সুফিয়ানা।
শ্যামার দৃষ্টি বিমুঢ়। চক্ষু শীতল। বললো না ও কিছু। সংগ্রামের দৃষ্টি ফের আগের মতো ঘোরে ডুবলো। সে বললো ফিসফিসিয়ে….
” কি হলো বেগম? আমার কিন্তু চাই!
শ্যামা নিশ্চুপ। ও এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সংগ্রামের পানে। শ্যামার নীরব সম্মতি দেখে সংগ্রাম নিঃশব্দে ঠোঁট চেপে মৃদু হাসলো। চোখের চাহনি আধো করলো। শ্যামার দিকে ধীরে ধীরে হেলে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো শ্যামার কপালে। শিহরণে চোখ বুজেছে শ্যামা। সংগ্রাম তা দেখে আবারও মৃদু হাসলো। শ্যামার গালে রাখা নিজের হাতের স্পর্শ গাঢ় হলো ওর। কপোলের পাশের ছোট চুল গুলো উড়িয়ে দিলো ফুঁ দিয়ে। শ্যামার লাজুক রাঙা লালিত মুখখানা বেশ আকর্ষিত করছে ছোট জমিদার সাহেব কে। সংগ্রাম ঢোক গিললো। এবার চুমু খেলো কানের পাশে। শ্যামা নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। এক হাতে শক্ত করে খামচে ধরেছে সংগ্রামের পাঞ্জাবির কলারের অংশ। সংগ্রাম যেন সায় পেলো অধিক। অধর ডোবালো শ্যামার অধরে। শ্যামার হাতের খামচি শক্ত হওয়ার সাথে সাথে দৃঢ় আর গাঢ় হলো সংগ্রামের স্পর্শ। বেগতিক শ্বাস প্রশ্বাস দুই নর নারীর। যা আছড়ে পড়ছে একে অপরের উপর। সংগ্রাম পুনরায় আপন করে নিলো তার বেগম কে। দীঘল রজনী ক্ষুইয়ে ক্ষুইয়ে অতিবাহিত হলো এই ভালোবাসার সাক্ষী হিসেবে।
দীর্ঘ সময় পর শ্যামার গলায় নাক ঘষে আলতো মাথা তুললো সংগ্রাম। শ্যামার চোখ বন্ধ। সংগ্রাম কোমল নেত্রে তার বেগম কে এক পলক দেখে, কানের কাছে মুখ গুজে আলতো অধর ছোঁয়ালো কানের লতিতে। অতঃপর ফিসফিস করলো…
” তৃপ্ত আমি তোমাকে পেয়ে পরিতৃপ্ত, বেগম। ভালোবাসি তোমায়, নিজের থেকেও বেশি,,অনেক অনেক বেশি। ভালোবাসি আমার ডালিয়াকে , আমার অনাগত সুফিয়ানা’র জননী কে। আমার বেগম কে,, ভালোবাসি…..
আওয়াল পুর গ্রাম…
ভোরের আলো ফুটছে সবে। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের লাল আভা। শীত কেটে সূর্যি উঁকি দিচ্ছে বোধ হয়। আজ একটু তাড়াতাড়ি সূর্যের দেখা মিলছে। গ্রামের শেষ মাথা। শেষের আর দুটো বাড়ি আছে।
মসজিদ গ্রামের মাঝে। গায়ে শাল মুড়িয়ে মাথা নুইয়ে মসজিদ থেকে ফিরছিল আফতাব। হাতে একটা বাজার ভর্তি ব্যাগ ও আছে। ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেছে আজ। মসজিদ থেকে বাজারের দিকে গেছিলো একটু। সকালের টাটকা বাজার সেরে ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। গ্রামের শেষ মাথার বাড়িটাই ওদের। এখন শীত নেই বেশি। আশপাশ টা বেশ স্পষ্ট। তবে অদূর অস্পষ্ট । আফতাব মাথা নুইয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলার পথে বাড়ির দিকে চেয়ে মাথা তুললো। আচমকা চোখ কোনো এক দিকে আবদ্ধ হতেই আঁতকে উঠলো ও। চোখ বড় বড় করে তাকালো ও। সামনেটা স্পষ্ট। পাশের বাড়ির দেউড়ির বাইরে সোপ মেরে বসে আছে কেউ। একবারে গুটিয়ে হাত পা জড়ো করে বসে আছে। আফতাব বৃহৎ নয়নে তাকিয়েই কপাল গুটালো। খানিকটা জোরেই হেঁটে ছুটে গেলো এক প্রকার। বাজারের ব্যাগ রেখে এক হাঁটু মুড়ে বসে আধো উদ্বিগ্ন স্বরে ডাকলো….
” ময়না…?
সামনের জন নড়লো না। আর না সারা দিলো। আফতাব ডাকলো বেশ কয়েক বার। এই মুহূর্তে আশেপাশে কেউ নেই , এতো বার ডাকার পরেও সাঁড়া না পেয়ে আফতাব ঢোক গিললো। ইতস্তত হয়ে ময়নার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাত ফিরিয়ে নিলো আবার। ময়না কে স্পর্শ করা হারাম ওর। তবে এই মুহূর্তে আফতাব এতো কিছু ভাবলো না। ইতস্ততা কাটিয়ে কম্পিত হাত বাড়িয়ে ঝাঁকালো ময়নাকে…
” ময়না?
আলতো ঝাঁকাতেই মাটিতে টলে পড়লো ময়না। ভড়কালো আফতাব। মেয়েটা যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই টলে পড়েছে। শরীর জমে শক্ত পাথরের ন্যায় হয়ে গেছে ওর। হাত পা কুঁকড়ানো অবস্থায় টানটান। আফতাব এবার পুরো হাতে স্পর্শ করলো ওকে। শরীর বরফের ন্যায় জমাট বেঁধেছে। ঠান্ডা হিম হয়ে আছে পুরো শরীর। হাত দেওয়া যাচ্ছে না শরীরে। আফতাব পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ওর মুখের দিকে। পরবর্তীতে হাত পায়ের দিকে। নীলচে হয়ে আছে ওর পুরো শরীর। ঠোঁট জোড়াও কালো ঠিকরে হয়ে গেছে। আফতাব শুকনো ঢোক গিললো। দেউড়ির দিকে তাকালো একবার। ভেতর থেকে লাগানো। তার মানে বাড়ি থেকে বের হয়নি কেউ। ময়নার শরীরে পাতলা একটা শাড়ি ব্যাতিত কোনো ভারী কাপড় নেই। মেয়েটা কখন থেকে এভাবে এখানে পড়ে আছে বুঝতে বাকি রইলো না আফতাবের। অমনি চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো ওর। দাঁতে দাঁত পিষে ময়নার নীলচে মুখটার দিকে তাকিয়ে আপাতত সংযত করলো নিজেকে। এই মুহূর্তে আর কিছু ভাবলে চলবে না। বাজারের ব্যাগ ফেলে দ্বিধা কাটিয়ে আফতাব দুহাতে কোলে তুলে নিলো ময়না কে। হন্তদন্ত পায়ে ছুটলো নিজের বাড়ির দিকে। বাইরে থেকে ডাকলো উচ্চ স্বরে…..
” আম্মা ,, ও আম্মা , তাড়াতাড়ি এসো….
বলতে বলতে ঘরের দিকে এগুলো। নিজের ঘরেই গেলো। ময়না কে শোয়ালো নিজের খাটে। আফতাবের মা খালেদা বেগম ছুটে এসেছেন। পেছন পেছন ওর বাবাও। আফতাব ময়না কে বিছানায় শুইয়ে কম্বল, লেপ, সব জড়িয়ে দিয়েছে ওর গায়ে। খালেদা বেগম ঘরে এসেই এমন পরিস্থিতি দেখে আঁতকে উঠলেন। বললেন আতঙ্কিত স্বরে….
” ময়না? বউমা? বউমার কি হইছে বাপ?
আফতাব উত্তর করলো না। বললো শুধু…
” সরিষার তেল নিয়ে এসো আম্মা। তাড়াতাড়ি….
খালেদা বেগম আর পুছলেন না কিছু। দৌড়ে গেলেন তেল আনতে। আফতাবের বাবা ময়না কে এমন অবস্থায় দেখে পরিস্থিতি ঠাহর করলেন মুহূর্তেই। অমনি মুখখানা মলিন অপরাধীর ন্যায় হয়ে গেলো তার। কথাও বলতে পারলেন না তিনি। খালেদা বেগম তেল নিয়ে ছুটে আসতেই আফতাব নিজের হাতে তেল ঢেলে ময়নার হাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে বলল….
” পায়ের তালুতে তেল মালিশ করো আম্মা। জলদি…
সাদাসিধে খালেদা বেগম অবুঝ আহাম্মকের ন্যায় চেয়ে আছেন। তার মাথায় ঢুকছে না কিছু। তবুও তিনি কথা না বাড়িয়ে ছেলের কথা মতো ময়নার পায়ে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলেন। অতিরিক্ত ঠান্ডা ওর শরীর। খালেদা সঙ্কিত হয়ে বললেন এক নিঃশ্বাসে…
” বউমার এই অবস্থা ক্যামনে হইলো বাপ? কোই পাইলি বউ মারে? হেয় তো জারে জইমা গেছে। কি হইছে বউ মার ?
” আম্মা, কথা বাড়িও না। যা বলছি তাই করো আগে….
খালেদা আর কথা বাড়ালেন না। গরম লেপের উষ্ণতা আর দীর্ঘ সময় তেল মালিশের পর আগের তুলনায় ময়নার শরীর হালকা গরম হয়েছে একটু। ঠান্ডা কাঠিন্যতা ভাব কেটে উষ্ণ গরম হয়েছে শরীর টা। আফতাব এতক্ষণে স্বস্তির দম ফেললো। মেয়েটার ঠোঁট মুখের নীলচে বর্ন মিলিয়ে গেছে। মলিন মুখখানা স্পষ্ট এখন। এতোক্ষণে নজরে আসলো, ময়নার ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট। কেটেছে অনেকটা। গাল লালচে। পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট।
এতো দিনেও ময়না কে দু’চোখে দেখে নি আফতাব। চোখ পড়লেই এক পলকে সরিয়ে নিয়েছে। ময়না পরিচিত হলেও ওর চেহারা স্পষ্ট ভাবে পরিচিত নয় আফতাবের নিকট। আফতাব তো কোন দিন এক মুহুর্তের জন্যেও ঠিক ভাবে চোখ তুলে তাকায় নি পর্যন্ত ময়নার দিকে। শুধু ময়না নয়, অন্যান্য সকল মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই। ময়না কে সেভাবে দেখার প্রয়োজন বা হেতু কোনোটাই জাগে নি কখনো।
আজ দেখলো আফতাব। নজর বুলিয়ে ভালো ভাবে দেখলো ময়না কে। খালেদা গল্প করতো সবসময় ময়না কে নিয়ে। বলতো মেয়েটা সুন্দর। আসলেই সুন্দর মেয়েটা।
বেহুদা মনভাব জাগ্রত হতেই আফতাব তৎক্ষণাৎ এক ঝটকায় চোখ সরালো। ছিঃ ছিঃ কি সব চিন্তা আসছে? সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা তো দূর ময়নার দিকে তাকানোও পাপ। ময়না বেগানা নারী। ওর ভাইয়ের স্ত্রী। আর সবচেয়ে বড় কথা – শ্যামা, শ্যামার বোন ময়না। শ্যামার কথা মনে আসতেই আফতাব এদিক ওদিক চোখ ঘোরালো। খালেদা বলে উঠলেন এর মধ্যেই….
” কি হইলো বাপ? তুই কি ভাবতাছোস? বউমার শরীর খান তো গরম হইছে এহন। কি হইছিলো ওর? এমন অবস্থায় কোই পাইলি বউ মারে?
আফতাব এবার চোখ তুলে তাকালো। সামনে ওর আব্বা। আম্মার দিকে তাকাইতেই তার সহজ সরল অবুঝের ন্যায় চাহনি নজরে আসলো। আফতাব বললো নিরেট কন্ঠে….
” বাড়ির বাইরে পেয়েছি।
” বাইরে পাইছোস মানে? এই কাক ভোরে বউ মার এমন অবস্থা ক্যান?
আফতাব তাকালো ওর আব্বার দিকে। আফতাবের দৃষ্টি নিজের দিকে পড়তেই নজর চোরালেন ওর আব্বা।
সকালে বাইরে যাওয়ার সময় আফতাব এদিক ওদিক লক্ষ্য করে নি তেমন। ফেরার সময় ভাগ্যিস লক্ষ্য করেছিল। নয়তো কি যে হতো! মেয়েটার দশা খারাপ হতো আরো। আফতাব এসব ভেবেই চোয়াল শক্ত করলো পূণরায়। হাত মুঠো করে উদ্যমে উঠে দাঁড়াতেই খালেদার কন্ঠ কানে ঠেকলো….
” ময়না,, বউমা? উঠছো তুমি? কি হইছিলো তোমার বউমা?
আফতাব দাঁড়ালো,, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ময়নার দিকে। ময়না চোখ মুখ কুঁচকেছে। আফতাব ফের বসে ডাকলো….
” ময়না, উঠুন?
সময় নিয়ে আধো নিভু নিভু চোখ খুললো ময়না। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে ওর। আঠার মতো লেগে আছে, রক্তিম বর্ন চোখ। তবুও জোর পূর্বক চক্ষু দ্বয় প্রসস্থ করলো ময়না। সামনে, খালেদা, আফতাব আর ওর আব্বা কে দেখলো একে একে এক পলক করে। আফতাব আর খালেদার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দৃষ্টি স্থির করলো আফতাবের বাপের দিকে। যিনি এখনো একই অবস্থায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন। দূর্বোধ্য মুখো ভঙ্গিমা তার। ময়না তার দিকে তাকিয়েই ফিকড়ে উঠে ঠোঁট উল্টালো। চোখ ছাপিয়ে মুহুর্তেই চুপিসারে গরম জল গড়ালো কর্নিশ বেয়ে। মেয়েটার এমন অশ্রুসিক্ত করুন চাহনি দেখে পলাতকের ন্যায় মুখ ফিরিয়ে স্থান ত্যাগের জন্য পিছন ফিরলেন আফতাবের বাবা। অমনি ডাকলো আফতাব….
” দাঁড়াও আব্বা!
তিনি থামলেন, তবে পেছন ফিরলেন না। আফতাব বাঁকা চোখে একবার তাকে দেখে ময়নার দিকে ফিরলো। ভ্রু যুগল জড়ো করে রাখা ওর। ও প্রশ্ন করলো নিরেট কন্ঠে….
” কি হয়েছিল? বাড়ির বাইরে ছিলেন কেনো আপনি?
ময়না চোখ বুজে ঢোক গিললো। গলায় দলা পাকিয়ে আটকে আসছে নিঃশ্বাস। যন্ত্রণা হচ্ছে ভীষণ। রুদ্ধ আধো স্বর ওর…
” ওরা বাইর কইরা দিছে আমারে !
” মেরেছে আবার?
ময়না উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। আফতাব আদেশের স্বরে বলে,,,
” উঠুন !
ধীরে ধীরে উঠে বসে ময়না। খালেদা বেগম ওকে সাহায্য করলো বসতে। দূর্বল শরীর খানা টলছে ওর। আফতাব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ফের আদেশ করলো….
” চলুন আমার সাথে!
ময়না যেন চমকে উঠলো। ভয়ে সিটিয়ে গেলো পেছনের দিকে। কাঁপা গলায় বুলি ফুটালো….
” যামু না আমি!
আফতাব ফিরে তাকাতেই ভরাট চোখে চেয়ে ভেজা কন্ঠে ফিসফিস করলো ময়না…
” আমি আর যামু না। উনি, উনি ছাইড়া দিছেন আমারে। আমারে রাইখা বিয়া করছেন আবার…
বিড়বিড় করা কথা গুলো কর্নপাত হতেই চোখ বড়বড় করে তাকালো আফতাব। সাথে সাথে খালেদা আর আফতাবের বাবাও। কথা গুলো বুঝতে অসুবিধা হলো ওনাদের। খালেদা আতঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করলেন….
” কি কইতাছো বউমা? মানিক বিয়া করছে? তোমারে রাইখা আবার বিয়া করছে?
ময়না ছলছল চোখে চেয়ে উপর নিচ মাথা দোলালো। আফতাব অবিশ্বাস্য স্বরে প্রশ্ন করলো…
” বিয়ে করেছে মানে? কবে বিয়ে করেছে?
ময়না পাগলের ন্যায় হাসলো। অথচ চোখ টই-টুম্বুর পানিতে ভরা। ক্লান্তিতে শরীর এলানো। ও আফতাবের চোখে চোখ রেখে বলতে আড়ম্ভ করলো…
” কাইল রাইতে নতুন বউ নিয়া আইসা সতিন উপহার দিছে আমারে। ঘরে তো জায়গা নাই, তাই আমারে বাইর কইরা দিছে ঘর থাইকা।
মানিকের নতুন করে বিয়ের বিষয়টা যেন অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে পারলো না আফতাব আর ওর বাবার উপর। তবে খালেদার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো এহেন কথায়। আফতাব চেয়ে আছে ময়নার ছল ছল চোখের পানে। যেখান থেকে পানি গড়াচ্ছে অনবরত। ময়না ঢোক গিলছে বারবার। পেট চেপে বসে আছে ও। কেউ কিছু বলছে না দেখে ময়না জড়ানো গলায় ঢোক গিললো আবার। গলা পরিষ্কার করে রোদনরত স্বরে আবারো বলতে লাগলো….
” জানেন, ওনারা কাইল থাইকা আমারে কিচ্ছু খাইতে দেয় নাই। খাওন চাইছিলাম, দেয় নাই। আম্মা আমারে ঘরে আটকাইয়া দোর দিয়া রাখছিলো। রাইতে যখন দোর খুইলা দিলো, তখন সামনে আমার স্বামীরে তার নতুন বউয়ের লগে বর সাজে দেখলাম। কিছু কোই নাই , খালি তাকাইয়া ছিলাম হের বউয়ের দিকে। এই লাইগা মারছে আমারে ,,এই দেখেন কেমন জানোয়ারের মতো মারছে আমারে। আমার কি ব্যাথা লাগেনা কন দেহি? আমি তো কোনো দিন মাইর খাই নাই কারো। আম্মা মারতো মাঝে মাঝে, তাও আদর কইরা, কষ্ট দিয়া কেউ কোনো দিন মারে নাই আমারে। এমনে কষ্ট দিয়া মারলে খুব ব্যাথা লাগে, জানেন? খুব যন্ত্রণা হয় শরীরে। মইরা যাইতে ইচ্ছা হয় আমার।
বলতে বলতে হাঁটুতে মুখ গুজে ডুকরে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। খালেদার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়েছে কোনো এক সময়। তিনি জাপটে ধরলেন ময়না কে। ময়না কে যে এভাবে মারে, বা ময়নার অ’সুখের বিষয়ে সম্পূর্ণ অঙ্গাত খালেদা। অদৃষ্টপূর্ব ছিলো তার কাছে সবকিছু। আফতাব দাঁতে দাঁত পিষে হজম করার চেষ্টায় রত ওর কথা গুলো। আফতাবের বাবা এক দু’পা করে এগিয়ে গিয়ে ময়নার মাথায় হাত রাখলেন। তার পরশে মাথা তুললো ময়না। ভরাট চোখে চেয়ে ঠোঁট উল্টে বললো….
” আমার আব্বা টাকা দিতে পারে নাই কাকা। এই লাইগা ছাইরা দিছে আমারে।
আমার জীবনটা এমন ক্যান হইলো কাকা? এই জীবনের থাইকা তো আমার পড়াশোনা করা জীবন অনেক ভালো আছিলো। আম্মার আদর পাইতাম ঐ জীবনে।
কিন্তু দেখেন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলাম আমি। এই জীবন তো চাই নাই আমি। ক্যান এমন হইলো আমার জীবনটা?
ময়নার করুন স্বরের কথা গুলো গিললো আফতাবের বাবা। নরম কন্ঠে বলল…
” তোমার ক্ষুদা লাগছে, আম্মা?
ময়না তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকালো দুদিকে, অশ্রুপ্লুত কন্ঠে বলল…
” নাহ….
সূর্য উঠেছে পুরোপুরি। শুনশান গ্রাম এখন কোলাহলে পূর্ণ। যে যার কাজে ব্যস্ত। হাঁটা চলা, গরু মোষের ডাক চারপাশে। খালেদা ময়না কে খাইয়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়েছেন। মেয়েটা মুখে অমত করলেও পেটের ক্ষুধা মত মানে নি। আফতাব কাঁচা বারান্দার এক পাশে বসে আছে লুঙ্গির এক কোচা ধরে। চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি মাটিতে। অন্য পাশে বসে আছে ওর আব্বা। কারোর মুখেই রা নেই কোনো। খালেদা হাত মুছতে মুছতে এসে একপাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালেন। দোনামোনা করছেন তিনি। খচখচ করছে নারী কোমল অন্তর। মনে অনেক প্রশ্ন তার। তিনি তো জানেন না অনেক কিছুই। শুধু জানেন মানিকের বিয়ের দিন বউয়ের পরিবর্তে বউয়ের বোনের সাথে বিয়ে হয়েছিল মানিকের। এমনকি নিজের ছেলের যে বিয়ে ঠিক হয়েছিল শ্যামার সাথে, এই সম্বন্ধেও এখনো অঙ্গাত তিনি। এই বিষয়ে শুধু জানেন, তার ছেলে বিয়ের উদ্দেশ্যে বিদেশ ছেড়েছে।
তবে এতো দিনেও ছেলে বিয়ে সম্বন্ধে ছেলে বা ছেলের বাপ কারোর কোনো উদ্যোগ না দেখে নিজে উদ্যোগী হয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ওদের বাড়ি থেকে চারটে বাড়ি পর জরিফ মোল্লার বাড়ি। তার মেয়ে আছে একটা। গ্রাম্য সাদাসিধে মেয়ে। বয়স কম, সবে চৌদ্দ। একেবারে সহজ সরল। ওকে বেশ পছন্দ খালেদার। গরীব পরিবারের মেয়ে। সংসারে অনটন লেগে থাকে সবসময়। ওকে বাড়ির বউ অর্থাৎ ছেলে আফতাবের বউ করলে খারাপ হয় না। আফতাব রা যে উচ্চবিত্ত তা নয়। মধ্যবিত্ত ও নয়। একেবারে নিম্নবিত্ত সাধারণ পরিবার। দিন আনে দিন খায়। তবে আল্লাহর রহমতে সংসারে অনটন নেই কখনো। গরীব পরিবারের মেয়ে, তাদের বাড়িতে বউ হয়ে আসলে মন্দ হয় না।
এই ভেবে ছেলের বিয়ে নিয়ে নিজে থেকে আফতাবের বাবার নিকট কথা পেড়েছিলেন তিনি। আফতাবের কানে এই কথা যাওয়া তেঁতে উঠেছিল ও। তবে আম্মার সামনে প্রকাশ করে নি। শান্ত ভাবে নিজের আম্মার পরিপন্থি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছেলের অমত দেখে খালেদা কথা এগোন নি আর। অনাড়ম্বর খালেদা এই নিয়ে আর ঘাটেন নি কিছু।
বারান্দায় ওদের নীরবতার মাঝে কয়েক জোড়া খড়খড়ে পায়ের শব্দ ভেসে আসলো। চোখ তুলে একই সাথে তিন জনে তাকালো খিড়কির দিকে। বাড়ির ভেতরে ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে কয়েক জন। মানিক, মানিকের মামা,আম্মা, আরো গ্রামের কয়েকজন। ভেতরে এসেই তীব্র বাজখাঁই কন্ঠে ঝাঁজিয়ে উঠলো মানিক….
” বাহ্ রে বাহ্ …
কোই আফতাব,, দেহি তোর চেহারা খানা। আমার ছাইড়া দেওয়া বউরে তুইলা আইনা নিজের ঘরে সোহাগ দিয়া রাইত কাটাইলি, দেহি চেহারায় রুপান্তর আইছে কি না!
এহেন বিব্রতকর কথায় চোখ মুখ কুঁচকালো আফতাব। খালেদা মুখ সিটকে বাইরের পুরুষের সামনে থেকে ঘরের দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন। আফতাব উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষণাৎ। মানিক আফতাব কে দাঁড়াতে দেখে অট্ট হাসলো। বললো অদ্ভুত মেকি কন্ঠে…
” কোই,, আমার পরিত্যক্ত বউ কোই? দেহি হের চেহারা খানা? অকাম কুকাম কইরা কোই লুকাইয়া আছে? স্বামী ছাড়লো এক রাইত ও হইলো না, তাতেই নয়া নাগোর জুটাইয়া ফেলাইলো।
আফতাবের দৃষ্টি অপরিবর্তনীয়। ওর আব্বা চোখ মুখ খিচে গর্জে উঠলেন….
” কিসব কথার ধরন এই গুলা? মুখ সামলাইয়া কথা …
মানিক যেন বাঁধ ছাড়ালো এবার…
সময় পার না করে বলতে শুরু করল…
” মুখ আর কি সামলামু কাকা । বউরে তো সামলাইতে পারলাম না । স্বামী ছাইড়া দেওরের ঘরে রাইত কাটাইনা বউ আর চাই না আমি । কাইল একলা একলা আধা ছাড়ছিলাম, আইজ হঙ্গলের সামনে জবান খুইলা কইতাছি, সাক্ষী রাইখা কইতাছি হঙ্গলরে , আমি ছাইড়া দিলাম আমার বউ রে । তালাক দিলাম আমি ওরে । ।
আফতাব এবার হাত মুঠো করে চোখ বুজে দাঁত পিষলো । গাঁ রি রি করে জ্বলে উঠলো ঘৃনা আর রাগে । আর কতটা নিচে নামবে মানিক । ওর কুকর্ম সম্পর্কে তো অজানা নয় আফতাব । সব জানে ও । বিদেশে থাকাকালীন ও একটা বিয়ে করেছিলো মানিক । সেই বিয়ে করেছিলো বাধ্য হয়ে চাপে পড়ে । সেই মেয়ে টাকে প্রলোভন দেখিয়ে সম্পর্কে জড়িয়েছিল মানিক । যা অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল । পরবর্তীতে বিয়ে না করে আর উপায় ছিল না । কিন্তু দেশে ফেরার আগে সেই মেয়েটাকে ও তালাক দিয়ে এসেছে ও ।
এখন ময়নার জীবন টাও নষ্ট , এরপর অন্য একটা মেয়েকে জড়ালো নিজের সাথে ।
মানিকের কথার সমস্বরে তাল মেলাচ্ছে উপস্থিত অনেকে । কথার রোল পড়েছে সবার মাঝে । এবার আফতাব মানিক কে উদ্দেশ্য করে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো…
” বিয়ে করেছিস আবার ?
সবার সামনে এমন প্রশ্নে আচমকা থতমত খেলো আফতাব । নিজেকে সামলে বললো…
” হ করছি তো । চার বউয়ের হাদিস আছে তো । আমিও করছি আরেকটা বউ । হেই ডাই এহন থাকবো আমরা সংসারে ।
এমন বেহুদা, নির্লজ্জ, চরিত্র হীন, নাগোর খাটানা বউ লাগবো না আমার ।
আফতাব এবার গর্জে উঠলো । নিজেকে সংযত করতে অক্ষম হলো এবার । লুঙ্গির কোণা ছেড়ে ও তেড়ে আসলো মানিকের দিকে । কলার চেপে দাঁত পিষে হুংকার ছাড়লো….
” জবান সামলে কথা বল ! মেয়েদের সম্মান করতে শেখ । ও বিয়ে করা বউ তোর ।
আচমকা আক্রমণে প্রস্তুত ছিল না মানিক । ও ভড়কে পিছুলো এক কদম । উপস্থিত সবাই ও চমকে উঠেছে । মানিকের মামা আফতাবের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো মানিকের করার থেকে । পারলো না । শেষে মানিক এক ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে ধৃষ্ট স্বরে বলল….
” বা*লের বউ আমার । তালাক দিছি আমি ওরে । মানি না হেরে আমি । যেই লাইগা বিয়া করছিলাম হেইডা তো দিতে পারে নাই আমারে । বেকার বেকার ওরে বসাইয়া খাওয়ামু আমি । ঠেকা পড়ে নাই আমার অতো ।
” মানবি না মানিস না । কিন্তু একটা মেয়েকে মিথ্যা অপবাদ দিবি না । অনেক অত্যাচার করেছিস ওকে, আর না । যা এখান থেকে…
মানিক ফিচেল হাসলো । একটু এগিয়ে আফতাবের মুখোমুখি দাঁড়ালো । সামান্য ঝুঁকে ফিসফিস করলো…
” গায়ে লাগতাছে ? ক্যান ক দেহি ? শ্যামার বোইন বইলা ? এহনো ভুলতে পারোস নাই শ্যামা রে ? বিশ্বাস কর , শ্যামা রে আগে দেখলে আইজ ময়নার জায়গায় ওয় থাকতো । তহন তোর সুবিধা হইতো বল ? আমার ছাড়া মাল নিজের কইরা নিতি । তয় , ময়নারে নিতে পারোস কিন্তু , যতই হোক শ্যামারই তো বোইন । একটু ধলা খালি । যদি ময়নার বাপে টাকা কড়ি দেয় , তাইলে আবার ফিরাই লইয়া যামু । ফের ট্যাকে মাল কম পড়লে দিয়া দিমু তোরে । কি জানোস ,,কারেন্ট আছে কিন্তু মাইয়ার শরীরে । শ্যামারে তো ছুঁই নাই, তাই ওর শরীরের কারেন্ট….
বাকি কথা শেষ করতে পারলো না মানিক । তার আগেই শক্ত পোক্ত মাংসাসি হাতের কঠিন একটা আঘাত পড়লো ওর গালে । উক্ত আঘাতে ছিটকে দূরে পড়লো মানিক । কেঁপে উঠলো উপস্থিত সবাই । মানিক কয়েক মুহূর্তের জন্য চোয়ালে হাত রেখে মূক বনে রইলো , পরমূহূর্তে হিংস্রের ন্যায় তাকালো আফতাবের দিকে । আফতাব গর্জে উঠে বজ্রের ন্যায় ফের আঘাত করার জন্য উদ্যত হতেই পেছন থেকে ওকে জাপ্টে ধরে বাঁধা প্রদান করলো ওর বাবা । মানিক ও আঘাতের প্রতিশোধে তেড়ে আসতে চাইলে বাঁধা দিলো ওর মামা । আফতাব রিতিমত হিসহিস করছে রাগে । শ্যামলা চেহারা খানা কৃষ্ণ বর্ন ধারন করেছে ওর । কপালের রগ, শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে । আফতাব শান্ত স্বভাবের । রাগ খুব কম ওর । রেগে গেলেও শান্ত থাকে যথার্থ , ক্ষিপ্ততা প্রকাশ করে না ও । তবে এখনকার ওর রাগের প্রকাশ ভঙ্গি আলাদা । ওকে এতোটা রেগে যেতে কোনো দিন দেখে নি ওর আব্বা । আম্মা তো একেবারেই না । দরজার আড়াল থেকে খালেদা ছেলেকে এমন রাগান্বিত অবস্থায় দেখে ছলকে উঠলেন । দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইলেন তিনি । তবে ময়না কে নিজের পিছনে এসে দাঁড়াতে দেখে আর পারলেন না । দুহাতে ময়না কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বাইরে থেকে আড়াল করলেন ওকে ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৪
আফতাব ছোড়াছুড়ি করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো । আব্বার উপর কঠোর শক্তি প্রয়োগ না করে এক পর্যায়ে শান্ত হলো ও । শান্ত হতেই ছাড়া পেলো আব্বার হাত থেকে । অমনি এক ঝটকায় দু’পা এগিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে ঝংকার তুললো….
” নাফরমান ,, এক্ষুনি বেরিয়ে যাবি আমার বাড়ি থেকে । দ্বিতীয় বার যদি তোর পা আমার বাড়ির গন্ডির মধ্যে আসে , তাহলে কেটে ফেলবো তোকে । বুঝলি? বেরিয়ে যা… চলে যা আমার চোখের সামনে থেকে…
