Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৮

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৮

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৮
সুরভী আক্তার

শ্যামা কে নিয়ে বাইরে এসেছে সংগ্রাম । শ্যামার শরীর কালো চাদরে মোড়ানো । টলটল পায়ে কোনো রকমে সংগ্রামের গায়ে ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে ও । চোখের দৃষ্টি ঝাপসা । বাইরে গাড়ির সামনে রিক্তা,জবা, তহুরা , ওরা সবাই । অংকুর নেই । সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম কে আসতে দেখে একপাশে দাঁড়ালো ওরা । সকালে তহুরার ব্যাঙ্গ করা মুখে শ্যামার কথা শুনে ওকে এক পলক দেখার কৌতুহল বসত আলামিন তাকালো সংগ্রামের পাশে শ্যামার দিকে । দেখতে তো পেলো না , উল্টো মুখোমুখি হলো সংগ্রামের টাটানো দৃষ্টির । অমনি চোখ সরালো আলামিন । নত করলো দৃষ্টি । সংগ্রাম একে একে দেখলো সবাইকে । ওর চোখ বোধহয় খুঁজলো কাউকে । কিন্তু পেলো না ।
শ্যামা কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো সংগ্রাম । আদেশ করলো চড়া কন্ঠে….

” যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি চালাও…
সংগ্রামের পাশে শ্যামা কে দেখে চোখ মুখ কুঁচকালেন সালেহা । বললেন ঝাইঝাই কটাক্ষ স্বরে…
” এই মেয়ে এখানে কেনো ? কেনো নিয়ে এসেছিস ওকে ?
” ওও যাবে আমাদের !
ছোট্ট উত্তর সংগ্রামের । সালেহা যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন । শক্ত হাতে খামচে ধরলেন শাড়ির অংশ । শ্যামার যেন হুঁশ জ্ঞান নেই ‌। আশেপাশের কোন কিছুই ধ্যানে নেই ওর । ও টলছে শুধু । গাড়ি বাক নিতেই শ্যামা হেলে পড়লো সংগ্রামের উপর । সংগ্রাম আরো শক্ত করে ধরলো ওকে । ওর মাথাটা রাখলো নিজের কাঁধের উপর । চোখ বুঝেছে শ্যামা । খুলে রাখা অত্যন্ত দায় হয়ে পড়েছিল । সংগ্রাম একহাতে ওর কাঁধ জড়িয়ে বালার পানে তাকালো । অন্য হাত বাড়িয়ে ঝুলে পড়া হাতটা ধরলো বালার । শরীর ঠান্ডা নয় । উষ্ণ গরম । চোখ বুজে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সংগ্রাম । বালার মুখে গ্যাস পাইপ লাগানো । চোখের কোণে পানি এক বিন্দু কণা চিকচিক করছে মুক্তার দানার ন্যায় ।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আজ প্রথম বার বোধহয় বালা কে দেখে আফসোস লাগলো সংগ্রামের । তবে এটা অনুশোচনা নয় ।
সালেহা নিজের সামনে শ্যামা কে নিয়ে সংগ্রামের অমন প্রবৃত্তি দেখে হিসহিসিয়ে উঠলেন । চোখের সামনে অমন দৃশ্য তিক্ত লাগছে তার কাছে । অবলীলায় তিরষ্কারের ভঙ্গিতে চোখ সরালেন তিনি । হিসহিসিয়ে উঠলেন….
” পাগলের পাগলামো তে কতোদিন মত্ত হয়ে পাগল থাকিস আমিও দেখবো ।
সংগ্রাম চোখ তুললো । বললো অবিলম্বে…
” সারাজীবন থাকবো আম্মা , সন্দেহ করো না এতে । চেনো তুমি আমায় , একটাই তো জীবন বলো , ওর প্রতি না হয় , ওকে ভালোবেসে পাগল হয়েই কাটিয়ে দিলাম ।
দাঁত খিচলেন সালেহা । বিড়বিড় করলেন আরো কিছু ।

রাতের আঁধারে ঘনীভূত চারদিক । শীত অল্প বিস্তর । গ্রামের শেষ প্রান্ত হওয়ায় শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে পাথারের দিক থেকে । দমকা শীতল হাওয়া বহমান আপন গতিতে । আফতাবের ছোট্ট টিনের ঘরটায় বেশ কজনের উপস্থিতি । ময়না গুটিয়ে অলকার দুহাতের বন্ধনে । বিকেলের দিকে মোখলেছ অলকা কে নিয়ে এসেছেন আওয়াল পুরে । এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নন তারা । সকাল থেকে পরবর্তীতে কি ঘটেছে জানা নেই ।
খানিক বাদ বাদ ফিকড়ে উঠে হেঁচকি তুলছে ময়না । অলকা নিশ্চুপ পাথরের ন্যায় । জবান খোলার শক্তি যেন নেই তার । ভীষণ ভারী লাগছে জবান । জ্বিভ নড়ছে না । কথা আসবে কি করে ? মোখলেছ ও নীরব । তিনি লজ্জায় । মেয়ের এই অবস্থার জন্য তো তিনিই দায়ী । প্রথম থেকে যদি আশকারা না দিতেন, তাহলে হতো না এমনটা । ময়নাকে কি ফেরাতে পারতেন না তিনি এই নরক থেকে ? পারতেন তো ! কিন্তু তিনি করেন নি তা । যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন । ভোগ তো তিনিই করছেন না , করছে ময়না । এতো দিন নির্যাতিত হয়ে এসেছে । আর এখন , ছাড়া পেয়েও নিজেকে কীটের ন্যায় অনুভূত হচ্ছে ওর ।

আফতাবের বাবা একপাশে দাঁড়িয়ে । হাত দুখানা গোটানো তার । কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ । খালেদা বারবার পিটপিট করে তাকাচ্ছেন তার দিকে । উশখুশ করছেন কথা তোলার জন্য । অনেক কিছুই তো ঘটলো পরবর্তীতে । আফতাব ও নেই এখন , রেগে মেগে সেই বিকেলের দিকে বেরিয়েছে হনহনিয়ে । ফেরে নি এখনো । ময়নার বাপ-মায়ের আসার খবর পৌঁছায় নি ওর কাছে ।
অলকা এই প্রথম আসলেন মেয়ের শশুর বাড়ির গ্রামে । তাও ভাগ্যের পরিহাসে । তিনি তো প্রতিঙ্গা করেছিলেন মানিক নামক ঐ নচ্ছার কুলাঙ্গারের ভিটে তেও পা রাখবেন না তিনি । আজ ভাঙ্গতে হলো আপন পন ।
তবে মানিকের বাড়ির ভিটের দিকে ফিরেও তাকান নি তিনি । মানিক যা নাকি বাড়িতে নেই , সন্ধ্যার আগে ওর নতুন শশুর বাড়িতে গেছে বাড়ি শুদ্ধ সবাই । বাড়িতে তালা দেওয়া ।

মোখলেছ সোজা আফতাব দের বাড়িতে নিয়ে এসেছে অলকা কে ।
এসে দেখে ময়না ঘরের দুয়ারে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে । অলকা শান্ত স্বরে ডাকতেই ছলকে উঠলো মেয়েটা । হুড়মুড়িয়ে ছুটে এসে আছড়ে পড়লো আম্মার বুকে । এতোক্ষণের চাপা কান্না বেরিয়ে আসলো তীব্র আর্তনাদ হয়ে । হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । মেয়ের কান্নার সাথে সাথে ভিজে আসলো অলকার বুকের সাথে অক্ষিপটও । মোখলেছ শুধু চোখ চোরাচ্ছিলেন এদিক ওদিক । মেয়ের অমন কান্নার শব্দে মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর ও সাহস কুলোয় নি তার বুকে ।

আফতাবের বাবার সাথে কুশল বিনিময় স্বরুপ দু-একটা কথা হয়েছে এ পর্যন্ত । এখন সবাই চুপ । কেউই আগ বাড়িয়ে কথা তুলছেন না । এদিকে তারা থেমে থাকলেও সময় থেমে নেই । গড়ালো মুহূর্তের পর মুহুর্ত ।
আফতাব আসলো নয়টার দিকে । চোখ মুখ তামাটে বর্ন ধারন করেছে ওর । ভ্রু যুগলের মাঝে ভাঁজ কয়েক স্তর । সাংঘাতিক শক্ত চোয়াল । বাইরে কাউকে না দেখে ও মাথা নত করে ঘরে ঢুকলো । এই ঠান্ডাতেও শরীরে গরম কাপড় নেই । ফতুয়া আর লুঙ্গি পড়ে বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে , সেভাবেই আছে এখনো । আফতাব ঘরে ঢুকে চোখ তুলেও তাকালো না । দরজার পেছনের হুক থেকে নতুন একটা ফতুয়া হাতে তুললো । অতঃপর গামছা হাতে তুলে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই হীম শীতল কন্ঠের একটা নির্মল ডাক কানে ঠেকলো….

” আফতাব..?
থমকালো আফতাব । পিছু ফিরলো ঝট করে । এতক্ষণের কপালের ভাঁজ গায়ের হয়েছে নিমিষেই । ঘরে এতো গুলো মানুষের উপস্থিতি মোটেও ঠাহর করতে পারে নি সে । ওর মন মস্তিষ্ক তো এদিকে ছিলোই না ।
অলকা , মোখলেছ আর নিজের আব্বা, আম্মা সহ ময়নাকে একসাথে দেখে বোধহয় অপ্রস্তুত একটা অবস্থায় পড়লো আফতাব । খানিক চেয়ে থাকলো অলকার পানে । চোখ ফিরিয়ে ফের নত করলো দৃষ্টি । নত দৃষ্টিতেই বাঁকা চোখে দেখার চেষ্টা করলো ময়না কে । অতঃপর স্বাভাবিক করলো নিজেকে , বললো…

” আপনারা ? ভালো আছেন আম্মা ?
আম্মা সম্বোধনে ঝট করে চাইলো খালেদা । সূচালো দৃষ্টি তার । আফতাব এনাকে আম্মা বলে ডাকলেন কেনো ?
অলকা বললেন নত স্বরে….
” ভালো আর রইলাম কোই,বাবা ?
কাতর শোনালো কন্ঠ স্বর । আফতাব অপ্রস্তুত, ইতস্তত । ও চোখ ঘোরাচ্ছে এদিক ওদিক । এনারা কখন এসেছে জানা নেই । আব্বা আম্মাও বা এনাদের কি বলেছে কে জানে ? আফতাব কথা টেনে বললো…
” বসুন আপনারা , আমি হাত মুখ ধুয়ে আসছি ।
বলেই পলাতকের ন্যায় নিজেকে আড়াল করলো সে । চোখ বুজে হাঁফ ছাড়ল বাইরে এসে ‌। কল পাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বেরোতেই মুখোমুখি হলো নিজের আব্বার । আফতাব তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটাতে চাইলো । ছেলের উপেক্ষা বুঝে বললো আফতাবের বাবা…

” ওনারা আইছেন থাইকা তেমন কোনো কথা হয় নাই । যা কথা কওয়ার তুমি কও । আমরা কেউই কথা কমু না এই বিষয়ে । তোমার উপর সিদ্ধান্ত ছাড়লাম দেইখা যা খুশি তা কইরো না আবার । মাইয়াডার জীবন তো আর নিজে থাইকা এমন হয় নাই । ওনারা আইছেন ওনাগো মাইয়ারে নিয়া যাইতে ! রাইখাই বা কি করবো ?
তয় যা করার ভাইবা চিন্তা কইরো…
আফতাব একটু থেমে কথা গুলো শুনলো । অতঃপর গটগটিয়ে স্থান ত্যাগ করলো । বারান্দার রশি থেকে চাদর টেনে গায়ে জড়ালো । ঘরে আসলো তারপর । মোখলেছ বসেছেন দরজা বরাবর কাঠের চেয়ারে ।
আফতাব প্রথমেই দেখলো তাকে । খানিক রাগ হলো তাকে দেখে । চড়াউ করে উঠলো পূর্বের ক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক । তবে সে বরাবরের ন্যায় সামলালো নিজেকে । অলকার পানে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো । খালেদার দিকে ঘুরে বললো….

” আম্মা ! খাবারের ব্যবস্থা করো নি এখনো ? তুমি গিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করো , আমার কথা আছে ওনাদের সাথে !
খালেদা নড়ার আগে তৎক্ষণাৎ বাঁধ সাধলেন অলকা…
” খাওনের লাইগা আমরা আহি নাই বাবা ! তোমার লাইগাই অপেক্ষা করতাছিলাম , তুমি আইছো , বসো ।
” কেউ কারোর বাড়িতে খেতে যায় না আম্মা ! অতিথি তো আপনারা , আম্মা বলে ডেকেছি আপনাকে , ছেলের বাড়িতে প্রথম বার এসেছেন , কিছু না খাইয়ে ছাড়ি কি করে ?
আফতাব ফের ইশারা করতেই খালেদা পা বাড়াতে গেলেন । ফের বাঁধা দিলো অলকা…
” কিছুর ব্যবস্থা করার কোনো দরকার নাই আপা ! খামু না আমরা !
থামলেন খালেদা ।
আফতাব শ্বাস ফেললো তপ্ত । ওর আব্বা এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে । আফতাব এবার বললো ভনিতা হীন সোজাসুজি….

” আপনার মেয়ে কে নিয়ে জান আম্মা !
ও সুখি হবে না এখানে ?
” সুখ তো আসে নাই আমার মাইয়ার জীবনে । আর কি সুখের আশা করমু ? এহন তো সব শেষ ! আর কিছু বাকি নাই !
” তাই তো বলছি , নিয়ে যান ওকে ।
আফতাবের বাবা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে চেয়ে আছেন শুধু । বলার মতো কিছুই নেই তার কাছে । খালেদা ছেলের কথা শুনে চকিতে তাকালেন ছেলের বাবার দিকে । একটু এগিয়ে গলা নামিয়ে চাপা স্বরে বললেন…
” আপনি কিছু কইবেন না ? বেয়াই আর বেয়াইন বউ মারে নিয়া যাইবো মানে ? ওনাগোরে তো জানান হয়‌ নাই সবকিছু । বউমা তো…

” চুপ করো ,
তোমারে ভাবতে হইবো না । তোমার পোলা যা করতাছে করতে দাও !
খালেদা চুপসে গেলেন । তাকালেন ময়নার দিকে । মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে বসে আছে । করুন চোখে তাকালেন খালেদা । তিনি দেখেছেন ময়নার শরীরে মানিকের দেওয়া আঘাতের চিহ্ন । ফর্সা শরীরে টকটকে অসংখ্য মারের দাগ । যা সবার থেকে লুকিয়ে এসেছে মেয়েটা । এতো দিন ধরে কি না কি সহ্য করে এসেছে ও !
আফসোস লাগলো খালেদার কাছে ।
অলকার কথায় ধ্যান কাটলো খালেদার । অলকা বলে উঠলেন…
” আমার মাইয়াটারে অসময়ে নিজের কাছে ঠাই দিছিলেন , এই লাইগা অনেক অনেক শুকরিয়া আপনাগো কাছে । এহন আসি আমরা আমাগো মাইয়ারে লইয়া ? ভালো থাইকেন আপনেরা…
অলকা উঠে দাঁড়ালেন । টেনে তুললেন ময়না কে । ও এখনো নতজানু ‌। আফতাবের বাবা মুখ খুললেন এবার…

” আপনাগোর লগে সম্পর্ক হইয়াও হয় নাই কোনো এক দিন । আবার হইয়াও হইলো না । যেটা হইলো , ঘটলো, সেটা একটা খারাপ স্মৃতি । আমি আপনারে আপা ডাকছিলাম না ? অন্য সম্পর্ক বাদ , এই সম্পর্কের সাথে কোনো এক সম্পর্ক জুইড়া আবার দেখা হইবো আপনার লগে । কি কন দেহি , আপনাগো লগে সম্পর্ক টা বোধহয় বিধাতাও ভাঙ্গতে চাইতাছেন না । কোনো এক দিক থাইকা ঠিক জুইড়া দিতাছেন আপনাগো লগে ।
অলকা আর বললেন না কিছু । মোখলেছ আর এসব শুনতে পারছেন না । তিনি হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাইরে । ময়নার হাতটা শক্ত করে ধরলো অলকা । আফতাব বসা থেকে দাঁড়িয়েছে । আফতাব কে পাশ কাটিয়ে ময়না কে নিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরোলো অলকা । ময়না টা একবারের জন্যও তাকালো না কোনো দিকে । জড় মস্তিষ্কে ও শুধু পা চালিয়ে বেরোলো আম্মার জোরে ।

ফজরের আজান পড়েছে । মানুষের কোলাহলে পূর্ণ হাসপাতাল । এই কাক ভোরেও মানুষের হাঁটা চলা, আনাগোনার অভাব নেই । হাসপাতালের তিন তলায় একপাশে শুনশান একটা কেবিন । তিন তলা টা একটু নিস্তব্ধ । শোরগোল নেই তেমন । জরুরী বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে বালা কে । যদিও এখন অবস্থা স্বাভাবিক । শহরে হাসপাতালে আসতে আসতে রাত্রি অর্ধ প্রহর গড়িয়েছে । বালার চিকিৎসা শুরু হয়েছে সাথে সাথে । আগে থেকেই ব্যবস্থা করা ছিল সবকিছুর । শুধু আসতে যা দেরি ছিল ওদের ।

স্যালাইন চলছে বালার শরীরে । হাসপাতালের সাদা চাদরের বেডে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ওর নিথর দেহ খানা । সালেহা পাশের সোফায় মাথা এলিয়ে । সারা রাত চোখের পাতা এক হয় নি । এখন একটু চোখ বুজেছেন তিনি । ডাক্তার একটু আগেই বালা কে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন । রক্ত বমির কারন টা সাধারণ নয়‌, এটা সবার জানা । ডাক্তার বলেছেন বালার পাকস্থলীতে পেপটিক আলসার ধরা পড়েছে । এটাই রক্ত বমির মূল কারণ । একেই জীর্ণ শরীরে রক্ত স্বল্পতা মেয়েটার । তার উপর রক্ত বমিতে অধিক রক্ত ক্ষরণ হওয়ায় মস্তিষ্কে ও শরীরে রক্ত সঞ্চালন ও অক্সিজেন সরবরাহ হতে পারে নি । যার কারনে মস্তিষ্কের তীব্র অচলতায় অধিক সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিল মেয়েটা । এখন ও তাই ।

বালার আলসার এর কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে সালেহার । সাথে সাথে সংগ্রামের ও । সালেহা ঠিক থাকতে পারেন নি গতকাল খবর শুনে । ভেতরে ভেতরে ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছিলেন তিনি । যত যাই হোক , ছোট বেলা থেকে বালা কে নিজের সন্তানের স্বরূপ দেখে এসেছেন তিনি । বালার ক্ষেত্রে তো লতিফার কথা বাদ । ও তো শুধু জন্মই দিয়েছে মেয়ে টাকে । মায়ের আদর, স্নেহ , ভালোবাসা দিয়ে বালা কে আগলে বড় করেছেন সালেহা ।
বালার অমন অসুখের কথা বিশ্বাস হয় নি তার কাছে । ডাক্তার শান্তনা দিয়েছেন । বালা নাকি ঠিক আছে ! ডাক্তারের এই শান্তনা দেওয়া কথাটাই নিজের মন কে বুঝিয়েছে সালেহা ।
এখন সংগ্রাম এখানে নেই । ডাক্তারের সাথে বেরিয়েছি তখন । শ্যামা পাশের কেবিনে শুয়ে । কাল থেকে ও নিজেও অর্ধ জ্ঞান হীন ।

সংগ্রাম দোতলায় , ডাক্তারের কেবিনে দাঁড়িয়ে স্বভাব সুলভ পেছনে হাত গুটিয়ে । মুখে খানিক আতঙ্কের ছাপ । বারবার ঢোক গিলছে ও । বুক ধড়ফড় করছে । ডাক্তার কিছু কাগজপত্র উল্টে পাল্টে দেখছেন ওর সামনে । সংগ্রাম সূচালো দৃষ্টিতে ডাক্তারের মুখো ভঙ্গিমা আন্দাজ করতে ব্যস্ত । অবশেষে তপ্ত শ্বাস ফেললেন ডাক্তার । তিনি কাগজপত্র গুলো সংগ্রামের দিকে বাড়িয়ে দিলেন । বললেন একই সাথে….
” চিন্তার কোন কারন নেই জোয়ার্দার সাহেব ! রিপোর্ট নেগিটিভ এসেছে । ক্যান্সারের কোন লক্ষণ বা প্রতিক্রিয়া নেই ওনার মাঝে ।

সংগ্রাম বসলো ধপ করে । টেবিলের উপর দুহাত আড়াআড়ি করে রেখে কপাল ঠেকালো সেখানে । এতক্ষণের জমে রাখা শ্বাস বেরিয়ে আসলো দীর্ঘ হয়ে । বুকে যেন পাথর চাপা ছিল ওর । কাল থেকে স্থির থাকতে পারে নি ও । সালেহার অগোচরে ডাক্তার আরো অনেক কিছুই বলেছিল সংগ্রাম কে । বালার অবস্থা দেখে ক্যান্সার সম্পর্কে ধারনা প্রকাশ করেছিলেন ডাক্তার রা । সেটা শুধুই ধারনা প্রকাশ ছিলো । যা এখন মিথ্যে প্রমাণ হলো । ক্যান্সারের কোন লক্ষণ নেই বালার শরীরে । এই মুহূর্তে সংগ্রামের ইচ্ছে করলো ধরলার পাড়ে গিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিতে ।
মাথায় কি না কি আজেবাজে চিন্তা আসছিলো কাল থেকে । বালা তো ছোট্ট একটা মেয়ে , এইতো সেদিন জন্মালো, কি আছে ওর মাঝে , ওর নাকি আবার ক্যান্সার হবে ? সংগ্রাম ডাক্তারের ধারনাতে বিশ্বাস করে নি কখনো । কিন্তু মন ও মানে নি ।

ও ভাবলো কাল সারারাত , বালা কি পেলো জীবনে ? না মায়ের আদর – ভালোবাসা , না মাকে কাছে পেলো ছোট বেলা থেকে , আর না বাবাকে , আর না ভাইকে ! তবুও তো সুখে ছিলো মেয়েটা । কতোই না স্বপ্ন বুনতো নিজের মধ্যে , কিন্তু সংগ্রাম কি করলো ? সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিলো মেয়েটার । ওর বুনে যাওয়া সুখ টুকু মুছে দিলো ওর জীবন থেকে । বালার তো কষ্ট হয় , জানে সংগ্রাম ! কিন্তু কখনো গুরুত্ব দেয় নি । ও যে শুধু বোন হিসেবেই দেখে এসেছে বালা কে । সংগ্রাম কাল প্রশ্ন করলো নিজের মনকে – ও কি কখনো আশকারা দিয়েছিল বালা কে , ওর প্রতি বালার মনে জন্মানো অনুভূতি গুলো কে ?
মন উত্তর করলো — আশকারা দেয় নি , তবে বাঁধাও দেয় নি কঠোর ভাবে । বাঁধা দেওয়ায় হাত যদি কঠোর হতো , তাহলে হয়তো জল গড়াতো না এতো দূর ।

কাল রাতে ঘুমায় নি সংগ্রাম । সালেহা কে বালার কাছে রেখে শ্যামার কাছে ছিল ও । আজ আর ফজরে নামাজ পড়ে নি শ্যামা । সংগ্রাম পড়েছে , তাও নিজ উদ্যোগে । মন‌ থেকে । সংগ্রামের নামাজের মোনাজাতে প্রথম শামিল কৃত নারী ছিলো শ্যামা , যাকে সে আজীবন নিজের করে রাখার জন্য প্রার্থনা করেছিল খোদার নিকট । সেই প্রার্থনা ছিলো বিয়ের পর , যেদিন শ্যামার কথায় নামাজ পড়েছিল সংগ্রাম , সেদিন । আজ সংগ্রামের নামাজের মোনাজাতে ঠাই করে নিয়েছিল বালা । বালার ক্যান্সারের নিশ্চয়তার কথা শুনে খোদার কাছে ওকে নিয়ে প্রার্থনা করেছিল সংগ্রাম । যে প্রার্থনা বৃথা যায় নি ।
কিছু হয় নি বালার । ক্যান্সার হয় নি ওর । সুস্থ আছে ও । শুধু একটু অসুখ হয়েছে , সেরে যাবে ওটা !
বুক ভরে বড় বড় শ্বাস টানলো সংগ্রাম । ডাক্তার রিপোর্টের কাগজ গুলো টেবিলের উপর রাখতেই মাথা তুললো ও । বললো করুন স্বরে…

” বালা ঠিক হয়ে যাবে তো ডাক্তার সাহেব ?
” বললাম তো চিন্তা করবেন না , ক্যান্সারের মতো মরন ব্যাধি যখন ধরা পড়ে নি , তখন নিশ্চয়ই ঠিক হয়ে যাবেন উনি । শুধু একটু সময়ের প্রয়োজন ।
” আর আমার বেগম ?
ডাক্তার চুপ থাকলেন কিছুক্ষণ । কন্ঠ খাদে নামিয়ে মিনমিনিয়ে বললেন কিছু । সংগ্রাম বেরিয়ে আসলো অতঃপর ।
বালার জ্ঞান ফিরেছে । চোখ খুলে পিটপিট করে চাইলো ও । হাত পা নাড়াতে পারছে না । ভীষণ ভারী লাগছে নিজেকে । বাম হাতের পিঠে স্যালাইনের সূচ । চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে সেখানে । বালা চোখ খুলে প্রথমে দেখতে পেলো না কিছু । হাত পা নাড়ানোর চেষ্টা করলো , পারলো না । খানিক চোখ বুজে থেকে ফের পিটপিট করে চোখ খুললো বালা । এবার ধীরে ধীরে ঝাপসা চোখে দেখতে পেলো আশপাশ টা । বালা পূর্ণ দৃষ্টি মেলে চোখ ঘোরালো এদিক ওদিক । নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়ার চেষ্টা করলো । আন্দাজ করার চেষ্টা করলো আশপাশ । কোথায় আছে ও ?
বাম দিকে চোখ যেতেই ও দেখতে পেলো সালেহা কে । সূক্ষ্ম হলো বালার দৃষ্টি । ও ডাকলো জড়ানো ক্ষিন স্বরে…

” মা…মামি…?
গলা থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে না ওর । ভীষণ ভাবে জড়িয়ে আসছে শব্দরা । বালা ঢোক গিললো । পানির তৃষ্ণা জেগেছে ভীষণ । ও ডাকলো ফের নিভু স্বরে…
” মা..মামি ?
সালেহা চকিতে তড়িঘড়ি করে লাফিয়ে উঠলেন । বালা কে দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠলেন তিনি । ছুটে গেলেন এক প্রকার । বললেন হাঁসফাঁস করে..
” বালা ,, কি হয়েছে মা ? জ্ঞান ফিরেছে তোর ? জেগেছিস তুই ? আল্লাহ !! তুই থাম বালা , আমি এক্ষুনি সংগ্রাম কে ডেকে আনছি…
সালেহা উঠতে গেলে ওনার এক আঙ্গুল আলতো করে ধরলো বালা । থামলেন সালেহা । তার ঠোঁট ভেঙে আসছে খুশির কান্নায় । চোখ ছলছল করে উঠছে । কাল থেকে তিনি অপেক্ষমান বালার চেতনা ফিরে আসার । এখন অপেক্ষার অবসান ।
বালা বোধহয় আলতো ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে । তবে কন্ঠ নালি নিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না । বেরোলেও অতি ক্ষিণ । যা বোঝা যাচ্ছে না ।
সালেহা ও বুঝতে পারলেন না কিছু । তিনি বললেন নরম কন্ঠে…

” কি হয়েছে মা ‌? কি বলছিস তুই ? বল আমায় , জোরে বল একটু । আমি সংগ্রাম কে ডেকে আনবো ?
বালার চোখের কর্নিশ বেয়ে পানি গড়ালো আপনা আপনি । সালেহা ওর গুঙ্গিয়ে বলা কথা ভালো ভাবে বোঝার জন্য একটু ঝুঁকলেন বালার দিকে । বালার মুখের কাছে কান বাড়িয়ে শোনার চেষ্টা করলেন । নিভু স্বরে বলছে বালা…
” পা.. পানি খাবো ! একটু পানি দেবে ?
সোজা হলেন সালেহা । স্যালাইন চলছে বালার । এই মুহূর্তে কোনো কিছু খাওয়া কড়া ভাবে নিষেধ । ডাক্তার পানি টুকু দিতেও নিষেধ করেছেন । জানিয়েছেন জ্ঞান ফিরলে তাকে ডাকতে ।‌ সালেহা আর‌ বসলেন না । নিজের আঙ্গুল ছাড়িয়ে দ্রুত বেরোলেন কেবিন থেকে । পাশের কেবিনের দরজায় টোকা মারার আগেই দরজা খুলল সংগ্রাম । সালেহা কে উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখে বৃহৎ নয়নে তাকালো ও । সালেহা বললেন উত্তেজিত হয়ে…

” সংগ্রাম , বালার জ্ঞান ফিরেছে !
আর কিছু শুনলো না সংগ্রাম । খেই হারিয়ে ছুটলো ও । বালা কে আধো চোখ খোলা অবস্থায় দেখে তৃপ্তি স্বস্তির শ্বাস ফেললো । এগিয়ে গিয়ে বেডের পাশে চেয়ার টেনে বসলো । ঢোক গিলে ডাকলো…
” বালা ?
ঘাড় কাত করলো বালা । সংগ্রাম কে মুচকি হাসলো স্বভাব সুলভ । বললো একই ভাবে…
” আমি পানি খাবো, সংগ্রাম ভাই । পানি দেবেন একটু ? গলা শুকিয়ে গেছে । কষ্ট হচ্ছে ভীষণ । পিপাসা মিটিয়ে গলাটা ভিজিয়ে দেবেন একটু ? একটু পানি দিন….
সংগ্রাম একটু হেলে বালার মাথার হাত রাখলো । চোখ বুজলো মেয়েটা । ফের দু’চোখের কর্ণিশ বেয়ে আরো দুফোঁটা জল গড়ালো নিঃশব্দে । মেয়েটা শ্বাস ও ফেললো নিঃশব্দে । ঢোক গিললো । গলাটা ভিজলো একটু ।
সংগ্রাম মোলায়েম স্বরে বলল…

” এই সময় ডাক্তার কিছু খেতে নিষেধ করেছেন । এখন খাওয়া যাবে না । আগে স্যালাইন যাক পুরোপুরি, তার পর পানি দেবো ।
বালা চোখ খুললো । বললো…
” কি হয়েছে আমার ?
” কিচ্ছু না ! একটু অসুখ করেছে শুধু ! স্যালাইন শেষ হলে একদম ঠিক হয়ে যাবি তুই !
সংগ্রাম যেন ছোট বাচ্চার ন্যায় মোলায়েম স্বরে বোঝাচ্ছেন বালা কে । সালেহা মূক বনে তাকিয়ে আছেন ছেলের দিকে । বালা হাসলো । বললো কেমন করে…
” মরে যাবো আমি ?
” বালা ? কি সব কথা ? কি হয়েছে তোর ? কিচ্ছু হয় নি তোর , শুধু বমি করেছিলি কাল ! শরীর দুর্বল তো , তাই স্যালাইন দিতে হয়েছে ।
মরার কথা মুখেও আনবি না । এতো তাড়াতাড়ি মরবি কেনো তুই ? বয়স কতো তোর , হ্যাঁ ? বিয়ে করবি না ? বিয়ে দেবো তো তোকে এবার ! সুস্থ হয়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেবো তোকে ! বলেছিলাম না , রাজপুত্র আসবে তোর জন্য । রাজপুত্রের সাথেই বিয়ে দেবো তোকে ! সে তোকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে অনেক দূরে নিয়ে যাবে ।
বালা হাসলো আবার । সংগ্রাম বালার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল কথা গুলো । বালা চোখ ফেরালো । বললো…

” হাত সরান সংগ্রাম ভাই !
থমকে গেলো সংগ্রামের হাত । ধীরে ধীরে হাত ও সরিয়ে নিলো ও । হাসার চেষ্টা করলো ।
দুপুরে বাড়ি থেকে সবাই এসেছে । জুনাইদ লতিফা বাদে । তাদের আসার চিন্তাও করে নি কেউ । আর না আসার সময় তাদের একবার ও দেখেছে । বালা পিঠের কাছে বালিশ দিয়ে হেলে বসে আছে ।‌ শবনম , আতিয়া বেগম , সালেহা,সবাই ঘিরে রেখেছে ওকে । শ্যামা ও আছে । সে বসে বালার পাশে । আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া হবে না ওকে । কাল বাড়িতে ফিরবে ।
বালা চঞ্চল চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । মুখখানা শুকনো ওর । মাথার বেনি টাও এলোমেলো । ও বোধহয় খুঁজছে কাউকে । আতিয়া বেগম বালাকে ওভাবে এদিকে ওদিক তাকাতে দেখে শুধালেন..
” কারে খুঁজতাছোস বুবু ?
তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকালো বালা । বললো কন্ঠ চেপে…
” কাউকে না !
শবনম বোধহয় বুঝলো । ও বসলো বালার কাছে । গলা নামিয়ে বললো…
” আম্মা আর তোমার ভাই আসে নি , বালা ! তাদের খুঁজে লাভ নেই !
বালা চোখ নামালো । আড়াল করলো ছলছল দৃষ্টি । সে তো জানতো আম্মা ভাই আসবে না । কেনো আসবে না জানা নেই । বালার প্রতি তাদের কেনো এতো অবহেলা সেটাও জানা নেই । এই অবহেলা বালার মনে কখনো প্রভাব ফেলতে পারে নি । আজ ও ফেললো না অতোটা । একটু খারাপ লাগলো শুধু । এটা স্বাভাবিক , সয়ে গেছে বালার কাছে ।

শ্যামা অবাক হলো । কাল থেকে ও লতিফা আর জুনাইদের আচরণ দেখে এসেছে বালার প্রতি । নিজের মেয়ের প্রতি কোনো মায়ের এতোটা উদাসীনতা থাকে বুঝি ?
শ্যামা তাজ্জব ! কেনো যেনো খটকা লাগছে ওর কাছে ।
বিকেলে চলে গেছে বাড়ির সবাই । সংগ্রাম সালেহা কেও পাঠিয়ে দিয়েছে সবার সাথে । শ্যামা আর ও আছে । বালা ঘুমিয়েছে । বালার কেবিনের বারান্দায় বুকে হাত গুটিয়ে আসমান পানে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সংগ্রাম । বুক খানা ভারী ওর । যা হালকা করার জন্য শ্বাস ফেলছে মুহূর্ত পর পর । শ্যামা পিছনে এসে দাঁড়ালো । কালকের রাতের কোনো ঘটনাই মনে নেই ওর । কি কি ঘটেছিল কে জানে ! ও হাসপাতালে কখন আসলো সেটাও ভুলে গেছে বেমালুম । আজ সকালে চোখ খুলে দেখে ও হাসপাতালের বেডে ঘুমিয়ে । বালা কে দেখলো আরো পরে ‌।
শ্যামা ডাকলো নিচু স্বরে…

” ছোট জমিদার সাহেব ?
চকিতে তাকালো সংগ্রাম । হেসে উত্তর করলো…
” এসো বেগম ।
এগোলো শ্যামা । সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতেই সংগ্রাম ওকে জড়ালো নিজের বাহুডোরে । শ্বাস ফেললো তৃপ্ত । ওর কাছে সবকিছুর উপশম তার বেগম । অদ্ভুত ভাবে তৃপ্তি আসে এই মেয়ে টাকে জড়ালে । শ্যামা গলা নামিয়ে ডাকলো আবার….
” ছোট জমিদার সাহেব..?
” হুম !!
” কিছু প্রশ্ন করি ?
” অনেক গুলো করো !
আবেশিত নরম কন্ঠ তার ছোট জমিদার সাহেবের । হাসলো শ্যামা । শুধালো এবার খানিক ইতস্তত হয়ে…
” বালা কে তো সবাই ভালোবাসে । আপনিও বাসেন । কিন্তু , ফুফু আম্মা আর ভাইজান…? ওনাদের ক্ষেত্রে আলাদা কেনো ? বালার প্রতি ওনাদের মাঝে কোনো উদ্বিগ্নতা দেখিনি আমি । ফুফু আম্মা কেও কখনো দেখিনি বালার সাথে কথা বলতে ! কালকেও ফুফু আম্মা আর ভাইজান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় নি । কেনো ? বালা তো ওনাদেরি মেয়ে আর বোন । তাহলে ?
সংগ্রাম চোখ খুললো । বললো আধো স্বরে…

” সবাই তো সবাইকে ভালোবাসতে পারে না, বেগম । বালা কে আমরা সবাই ভালোবাসি । ওর মা আর ভাই ভালোবাসে না , এটা হয়তো ওদের ব্যর্থতা নয়‌তো বালার দুর্ভাগ্য ।
” কেনো ভালোবাসে না । বালা তো কতো সুন্দর লক্ষী একটা মেয়ে । ওকে ভালো না বেসে কেউ থাকতে পারে ? তাও আবার আপন মা আর ভাই ?
সংগ্রাম মাথা তুললো উপরের দিকে । শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । শ্যামা উত্তরের অপেক্ষায় । সংগ্রাম বললো সময় নিয়ে….
” বালার অতীত আছে বেগম ! জানো না তুমি !
শ্যামা চকিতে তাকালো । শুধালো দ্বিগুণ কৌতুহলে…
” মানে ?
সংগ্রাম উত্তর করতে ইতস্তত । ও বলল দীর্ঘ সময় পর…
” বালা অনেক সুন্দর বলেছিলে না ? আসলেই হয়তো সুন্দর ! ছোট বেলায় ও একদম পুতুলের মতো ছিলো , জানো ? ওর যখন দুই বছর বয়স , তখন ওর বাবা মারা যায় ‌। তোমার ফুফু আম্মা ওকে আর জুনাইদ কে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসেন তখন । তখনকার পর আজ দীর্ঘ সতেরো বছর পেরোলো তাদের আমাদের বাড়িতে আসার ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৭

” অতীত বললেন যে ?
” শুনতে চাও ?
উপর নিচ মাথা নাড়ালো শ্যামা । চোখ দুটো অস্থির ওর । অধির আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে পড়ছে মন । সংগ্রাম ওকে সামনা সামনি দাঁড় করালো । কথা বলতে গলায় বাঁধছে ওর । জড়িয়ে আসছে কন্ঠ স্বর । তবুও বললো গলা ভিজিয়ে…
” বালা কে কেউ কোন দিন তার অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিল, বেগম । কালো হাতের স্পর্শে ওর পবিত্রতা নষ্ট করতে চেয়েছিল কেউ ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৯