শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৩
সুরভী আক্তার
সন্ধ্যাতেই রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে । আফতাবই বাকি ছিল । সে বাদে খেয়েছে সবাই । ময়না কোনো রকমে গিয়েছে দুই নলা । গলা দিয়ে ঢুকি নামছে না , খাবার তো অনেক দূর । খালেদা আফতাব কে খাবার বেড়ে দিয়েছে । ময়না বেরোয় নি ঘর থেকে । আফতাবের অনুপস্থিতির সুযোগে ও তড়িঘড়ি করে খাটের বিপরীতে মাটিতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়লো কাঁথা মুড়ি দিয়ে । খাওয়া শেষ করে একবারের জন্যেও ঘরে আসে নি আফতাব । বাইরে বেরিয়েছিল আবার । একটু হাঁটাহাঁটি করে অনেকটা সময় কাটিয়ে ফিরেছে । ঘড়ির কাঁটা নয়টার গড়িয়ে শেষ প্রান্তে । ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আশেপাশে । শেয়াল ডাকছে পাথারের কোথাও । স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তা । স্তব্ধ , ঘুমে বিভোর পুরো গ্রাম । কারোর কোনো সাড়া শব্দ নেই এতেই । রাত হয় নি বেশি , তবুও অনেক রাত ।
ময়না ঘুমিয়েছে এতোক্ষণে । আফতাব ভারী শ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকলো । খাটের উপর কাউকে না দেখে স্বস্তি পেলো বোধহয় । ময়না হয়তো মায়ের ঘরে । দরজা লাগাতে গেলে ডান দিকে নজর পড়লো আকস্মিক । অমনি কপাল গুটিয়ে আসলো আফতাবের । পা থেকে মাথা অবধি কাঁথা মুড়িয়ে গুটি শুটি মেরে শুয়ে আছে মেয়েটা ।
আফতাব কপাল অধিক গুটিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে চাইলো । খানিক রাগে ফুসলো । তবে বললো না কিছু । ক্ষিপ্ততায় খট করে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো নিজের খাটে । ময়নার দিকে আর একটা বারো তাকালো না । মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লো । ওর ঘুমোতে সময় লাগে না বেশি । এমনিতেও শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে সে । আজ ও তাই । ঘুমিয়ে পড়লো খুব জলদি ।
কাল বালা শায়লার সাথে ছিলো । আজ ও থাকতে চেয়েছিলো । তবে শায়লা থাকতে দেয় নি । তিনি জোর করে বালা কে আজ পাঠিয়েছেন অংকুরের ঘরে । এ পর্যন্ত বালা অংকুরের ঘরে পা রাখে নি । এসেছে থেকে হয় শায়লার ঘরে , নয়তো নিচে বসার ঘরে । সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ও কোনো দিকে তাকায় নি । শায়লার ঘরের পর একটা ঘর ফাঁকা । সেটাতে তালা দেওয়া থাকে সবসময় । তার পরের ঘরটাই অংকুরের । ও ঘরেই আছে । শায়লার ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে একা একা অনেক টা সময় পায়চারি করলো বালা । গলা শুকিয়ে আসছে । অংকুরের সামনা সামনি হয়েছিল খানিক আগে । শায়লা কে ঔষধ দিতে অংকুর এসেছিল তার ঘরে । ঔষধ খেয়ে এতক্ষণে ঘুমিয়েছেন তিনি । তবে ঘুমানোর আগে সুরবালা কে ওর নিজের ঘরে যেতে বলেছে । সুরবালা হাঁটাহাঁটি করে চোখ বুজে শ্বাস টানলো । নিজের মনের বিপরীতে কতো কিছুই করলো । আরো কতো কি করতে হবে কে জানে ।
মেয়েটা জোর পূর্বক জড়তা সমেত ওর ঘরের দিকে পা বাড়ালো । ঘরে হলদে আলো জ্বলছে। দরজা চাপানো । বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে । বালা ঠাস করে দরজা খুলে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে ঘরে ঢুকলো । টেবিলের পাশের চেয়ারে পায়ে পা তুলে বসে ছিল অংকুর । দৃষ্টি এতক্ষণ ছিল হাতে রাখা বইয়ের পাতায় ।
বালার সোজাসুজি দৃষ্টি ওর দিকেই । অংকুর সূক্ষ্ম নেত্রে তাকালো । মেয়েটার অস্বস্তি বুঝে নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখ সরালো । বালা চোরা চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো এদিক ওদিক । ঘরটা বেশ বড় । সাজানো গোছানো পরিপাটি ।
দেয়াল জুড়ে রঙিন আঁকি বুকি ।
ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো ও । অংকুর সেভাবেই বসে । বালা কে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতের বই টা বন্ধ করলো । তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বালার দিকে । ভড়কালো মেয়েটা । না চাইতেও আমতা আমতা করে মুখ খুললো…
” মা পাঠিয়েছে এই ঘরে , তাই এসেছি !
” তো ?
বালা মুহুর্তেই কন্ঠ নিরেট করলো….
” বাড়িতে কি আর ঘর নেই ? যেকোনো একটা ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিন !
” অন্য ঘরে থাকবে কেনো ?
বালা মুখ ফেরালো তিক্ততায় । চুপ করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো । অংকুর নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো । হাতের বইটা শব্দ করে ধপ করে রাখলো টেবিলের উপর । চমকে ঝট করে তাকালো মেয়েটা । অংকুর কে নিজের দিকে এগোতে দেখে বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো । ছ্যাত করে উঠলো ভীত নারী হৃদয় । ঝটপট কয়েক কদম পেছালো ও ।
” খবরদার আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না । নয়তো ভালো হবে না বলে দিলাম..
হাসলো অংকুর । তবে মনে মনে । বালা পেছাতে পেছাতে বসে পড়েছে খাটের উপর । অংকুর একেবারে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো । শান্ত স্বরে বলল…
” এটা তোমার ও ঘর । অন্য ঘরে থাকতে হবে না । এখানেই থাকবে আজ থেকে । আর এই বিছানাতেই ।
ঘন পলক ফেলছে বালা । মৃদু স্বরে উচ্চারণ করলো সে..
” আর, আপনি কোথায় থাকবেন ?
” কেনো , তোমার পাশে ! ডানপাশে আমি আর বাম পাশে তুমি । কোথাও পড়েছিলাম , স্বামীর বাম পাশে স্ত্রী কে স্থান করে দিতে হয় । বাম পাজরের হাড়ে তৈরি রমনী কে বুকের বাম পাশে বেঁধে রাখতে হয় ।
কথা গুলো ভীষণ কানে লাগছে বালার । হজম হচ্ছে না ঠিক । ও চোখ খিচে তপ্ত স্বরে বলে উঠলো….
” আমি থাকবো না আপনার সাথে ! আমাকে অন্য ঘরে জায়গা করে দিন । নয়তো নিচে বসার ঘরেই রাত কাটাতে পারবো আমি ।
অংকুর চেয়ে রইলো । কন্ঠ আরো বেশি খাদে নামালো….
” আমার ঘরে থাকতে সমস্যা , নাকি আমার সাথে এক বিছানায় ?
বালা উত্তর করলো না ।
খানিক অপেক্ষায় থেকে অংকুর আবার বললো…
” চিন্তা করো না , স্বামী হয়েছি তো কি হয়েছে , তোমার অনুমতি ব্যতীত কোনো দিন এক আঙ্গুলেও স্পর্শ করবো না তোমায় ।
” আর আমি আমাকে স্পর্শ করার অনুমতি কোনো দিন দেবো না আপনাকে ।
বরাবরের থেকে অধিক শক্ত শোনালো কথা টা । অংকুর চেয়ে থেকেই নরম আবেশে চোখে পলক ফেললো । বললো…
” সেটা সময়ই বলে দেবে !
আমাদের সম্পর্ক সময়ের হাতে সুরবালা । তবে মা যেন এসব জানতে না পারে । যেভাবে স্বাভাবিক আছো , সেভাবেই স্বাভাবিক থেকো তার সামনে ।
কথা শেষ করে হাতে একটা বালিশ তুলে নিলো ও । বিছানায় একটা চাদর রেখে অন্য একটা চাদর হাতে তুললো ।
” তুমি খাটে শোও , আমি সোফায় শুয়ে পড়বো ।
বলেই সুরবালার সামনে থেকে সরলো । হাঁফ ছাড়ল মেয়েটা । খাটে উঠে বসার আগেই আবারো অংকুরের ডাকে কেঁপে উঠলো ।
” সুরবালা…
চকিতে উত্তর ও করলো মেয়েটা…
” হুম !
” কাল তৈরি থেকো !
” কেনো ?
” বাড়িতে যাবে না ? সংগ্রাম জোয়ার্দার ফোন করেছিল । খবর করছিল তোমার । যেতে বলেছে কাল….
বালার মুখখানা বদলে গেলো । অংকুর ওর অভিব্যক্তি বোঝার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে । বালা রুদ্ধ স্বরে বুলি ফুটালো..
” যাবো না আমি !
” কেনো যাবে না ?
” ও বাড়িতে যাওয়ার জন্য আসি নি আমি ।
” একেবারেই তো যাচ্ছো না । দুদিনের জন্য শুধু । ঊনিশ টা বছর কাটালে , আর একদিনেই ভুলে গেলে বাড়ির কথা ?
” ভুলি নি , তবে ভুলতে চাই । কেনো মনে করাচ্ছেন আমায় ?
” মনে করাচ্ছি না । দায়িত্ব পালন করছি , তোমাকে নিয়ে যাওয়াটা দায়িত্ব আমার ।
” পালন করতে হবে না এই দায়িত্ব ! আমি যাবো না ।
” যাবে না বলছো , তো থেকে কি করবে ?
বালা এবার চোখ রাখলো অংকুরের চোখে । দৃষ্টি সরালো না এই পর্যায়ে । অংকুরের তীক্ষ্ণ চাহনি । বালা চোখে চোখ রেখেই বললো…
” এনেছেন কেনো আমায় ?
” বউ হিসেবে !
” বউ হিসেবেই থাকবো !
” আদৌ কি বউ হিসেবে আছো ?
প্রকম্পিত হলো মেয়েটা । চোখ সরাতে বাধ্য হলো । বুক কাঁপছে দুরুদুরু ,, কেনো জানি অনুভূতি । ও সময় নিয়ে ভিজে কাঁপা গলায় বললো….
” আপনার কাছেও বেশি হয়ে গেছি আমি ? একদিনেই আপনার কাছেও বেশি হয়ে গেলাম ?
” উহুম,, বেশি হয়ে যাও নি । বরং কম হয়ে গেছো ! আর একটু বেশি চাইছিলাম তোমায়….
পুনরায় কেঁপে উঠলো মেয়েটা । অংকুরের কন্ঠ স্বর অদ্ভুত লাগলো । চেয়ে আছে মোহিত দৃষ্টিতে । বালা গজগজ করে পা তুললো খাটে । গায়ে চাদর টানতে টানতে হিসহিসিয়ে বললো….
” কথা দিয়েছেন আমার অনুমতি ব্যতীত কোনো দিন ছোঁবেন না আমায় । কথাটা যেন মাথায় থাকে ….
অংকুর হাসলো নিঃশব্দে ঠোঁট চেপে । বললো…
” কথা কিন্তু দেই নি… বলেছি শুধু !
সবে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল মেয়েটা । অংকুরের কথায় ঝেঁপে উঠলো । চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বললো….
” আমি কিন্তু এখনো থাকবো না এখানে ।
অংকুর মুখো ভঙ্গিমায় দায় সারা ভাব টানলো । সোফায় শুতে শুতে বললো নিরেট কন্ঠে…
” ঘুমাও …
আর বিশ্বাস না হলে চলে যেতে পারো । দরজা খোলাই আছে ।
পা থেকে মাথা অবধি কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লো সে । বালা খানিক স্তম্ভের ন্যায় বসে থেকে নিজেও ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লো । ও শুতেই অংকুর চাদরের নিচ থেকে মাথা তুলে উঁকি দিলো….
” নতুন স্বামী স্ত্রীর ঘরে দরজা খুলে রাখা টা খারাপ দেখায় । দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে আসি ?
বালা উত্তর করলো না । চোখ বুজেই মুখ বাঁকালো । ভেংচি কাটলো মনে মনে । অংকুর পরিস্থিতি বুঝে ঠোঁট কামড়ে বললো….
” বাতি টাও নিভিয়ে দেই , কি বলো ?
এবার বালার ঝাঁজালো কন্ঠস্বর ….
” খবরদার , চুপচাপ ঘুমান ।
আলতো হাসলো অংকুর । চেহারায় অদ্ভুত দিপ্তী । এ কেমন করছে সে ? কি থেকে কি হয়ে গেল সে ! এভাবে কোনো দিন কারোর সাথে কথা বলেছে বা হেসেছে কি না সন্দেহ ! সোফায় মাথা এলিয়ে আরো একবার ঘাড় কাত করে ও তাকালো সুরবালার দিকে । অতঃপর স্বস্তিতে চোখ ফেরালো । বুজলো দুচোখ ।
রাত তিনটে পেরিয়ে চারটার কোঠায় । তাহাজ্জুদের নামাজে উঠেছে শ্যামা । টেবিলের উপর অসংখ্য জিনিস পত্র । কিছুই গোছানো হয় নি । মেলা থেকে কতো কি কিনে দিয়েছে সংগ্রাম । শ্যামা নামাজ শেষে সেগুলো গুছিয়ে রাখলো ।
সংগ্রাম স্বভাব সুলভ উবু হয়ে শুয়ে । এতক্ষণ স্বাভাবিকের ন্যায় শ্যামা কে বুকে জড়িয়ে ছিলো । উবু হয়ে শোয়া টা ওর অভ্যাস । তবে অভ্যাসে পরিবর্তন আসে শ্যামা কে বুকে জড়ালে । সারা রাত ওভাবে এক ধ্যানে জড়িয়ে রাখলেও একটুও কষ্ট, ক্লান্তি বা অবসাদ জাগে না ওর মাঝে । শ্যামা টেবিলের কাছ থেকেই সংগ্রাম কে দেখে মুচকি হাসলো । বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো এক মুহুর্ত । বাইরের অন্ধকারে গা ছমছম করে উঠলো । শিউরে উঠলো পুরো শরীর । ভীত শ্যামা তড়িতে ঘরে ঢুকলো ।
খাটের দিকে এগোনোর আগেই কানে ঠেকলো অদ্ভুত কিছু । দাঁড়ালো শ্যামা । বোঝার চেষ্টা করলো । কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো । শব্দ টা অতি ক্ষিন । ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না । রাতের নিস্তব্ধতায় দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে শব্দটা । শ্যামা কপাল গুটালো । আরো বেশি প্রগাঢ় হয়ে শোনার চেষ্টা করলো । দরজা ভেদে শব্দ টা ক্ষীন । দরজা খুললে হয়তো আরো ভালো ভাবে শোনা যাবে । কোনো কিছু না ভেবেই দরজার দিকে এগোলো শ্যামা । খুললো দরজা টা । এখন আগের তুলনায় শব্দ টা একটু স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে । কারোর ফোঁপানোর শব্দ । কেউ মুখ চেপে গুমরে কাঁদছে বোধহয় । গুটানো কপালে আরো কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো শ্যামার । ঘরের ভেতরে থেকেই গলা বাড়িয়ে করিডোরের এ মাথা থেকে ও মাথা দেখলো ভালো ভাবে । আলো জ্বলছে সব খানে । শব্দ টা ক্ষীন লুকায়িত , মাঝে মাঝে আরো একটা গুমোট কন্ঠ ভেসে আসছে তার সাথে ।
শ্যামা পিছু ফিরে একবার দেখলো ঘুমন্ত সংগ্রাম কে । ভয়ে , জড়তায় বাইরে পা রাখলো ঘর ছেড়ে । চঞ্চল চোখে তাকালো এদিক ওদিক । নিচের দিকে ও লক্ষ্য করলো একবার । কারোর উপস্থিতির কোনো লক্ষণ নেই । কোথা থেকে শব্দ টা আসছে ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না । ভড়কালো শ্যামা । আগের দিন গুলোর কথা মনে পড়লো । আগেও ও কখনো ভুল কিছু শোনেনি বা দেখেনি । আর আজও ভুল কিছু শুনছে না । তাহলে ও কেনো শোনে এসব । শ্যামা চোখ বুজে শ্বাস টানলো । মাথা নাড়লো দুদিক । নিজের মনের ভুল নয় এটাও । ও চোখ বুজে তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে ধারন করার চেষ্টা করলো সবটা । শব্দ নয় , কারোর গুমড়ে কান্নার আওয়াজ । কেউ কাঁদছে ? কিন্তু কে ? আবারো এদিক ওদিক তাকালো মেয়েটা । শব্দ টাকে অনুভব করে লক্ষ্য নির্ধারণ করলো । সেই অনুযায়ী কয়েক পা এগোতেই আরো প্রখর ভাবে কানে ধরা দিলো শব্দ টা ।
শ্যামা ঢোক গিললো । আরো এগোলো কয়েক পা । ধীরে ধীরে শব্দ টা কাছে আসছে মনে হচ্ছে । শ্যামা কাছে যাচ্ছে সেটার । করিডোরের শেষ প্রান্তে একটাই ঘর । জুনাইদ আর শবনমের ঘর এটা । শ্যামা থামলো সেখানেই । ঘরের দরজা খোলা বোধহয় ।
ভেতরের হলদে আলোর ছেটা দেখা যাচ্ছে । অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লো শ্যামা । আগে যাওয়া টা ঠিক হবে না হয়তো । শ্যামা ঝট করে ঘরে আসার জন্য পিছু ফিরলো । এবার আরো জোরে ফিকড়ে ওঠার শব্দ কানে ঠেকলো । আবার দাঁড়িয়ে গেল শ্যামা । ভেতরে পুরুষালি কন্ঠের গুমোট ফিসফিস শব্দ ।
অধর ভিজিয়ে তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করলো শ্যামা ।
সকালে খাবার টেবিলে সবাই চুপ । শান্ত পুরো বসার ঘর । কারোর নিঃশ্বাসের শব্দ টুকুও নেই । নিঃশব্দে নিজ ধ্যানে যে যার মতো খেয়ে যাচ্ছে । শ্যামা, শবনম বসে নি খেতে । শবনম জুনাইদের পাশে দাঁড়িয়ে । কপাল অবধি ঘোমটা । মুখখানা কেমন নিলচে দেখাচ্ছে । মাথা নুইয়ে স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে । শ্যামা বারবার আড়চোখে দেখছে ওকে । শবনম আজ একটা বারের জন্যেও তাকায় নি ওর দিকে । শ্যামা পরিবেশনের সময় একবার মুখোমুখি হলে চোখ নামিয়ে পাশ কাটিয়ে গেছে শবনম । খাওয়ার মাঝে থেকে শবনম সংগ্রামের দৃষ্টি থেকেও বাদ পড়েনি ।
লতিফ জোয়ার্দার খেতে খেতে নীরবতা ভাঙলেন…
” বালা আসবে না আজ ? আজ তো আসার কথা !
মুখের খাবার টুকু গিলে উত্তর করলো সংগ্রাম…
” কাল কথা হয়েছে অংকুরের সাথে । বললো তো আসবে । আসবে হয়তো ।
আবার নীরবতা । সৈকত বড় সোফা টায় বসে । খেলনা দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে ওকে । ও খেলছে । খেলতে খেলতে আচমকা ওর কান্নার আওয়াজে সবাই চকিতে তাকালো সেদিকে…
শবনমের উদ্বিগ্নতা হীন নির্বিকার চাহনি । খেলনা তুলতে গিয়ে সোফা থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে সৈকত । কেঁদে উঠেছে অমনি । শ্যামা দাঁড়িয়ে থাকায় চট জলদি ছুটলো ওর দিকে । বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো ঝট করে । শক্ত মেঝেতে পড়ে কোথায় লেগেছে কে জানে ! সংগ্রাম ও খাওয়া বাদ দিয়ে দৌড়ে এসেছে । শ্যামার কোল থেকে সৈকত কে নিজের কোলে নিলো সে । গায়ে,হাতে হাত বুলিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো…
” কি হলো বাবা , পড়লে কি করে তুমি ? ব্যাথা পেয়েছো ? কিচ্ছু হয়নি বাবা ! এই দেখো ,বাববা কোলে নিয়েছে তোমায় । কেঁদো না ।
সৈকত বাচ্চা মানুষ । কান্না জুড়লে সহজে থামে না ওর । একটু ব্যাথা পেলে তো আরো ও না । ও কেঁদেই যাচ্ছে । সংগ্রাম ওকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আবার বললো স্নেহ করে চুমু খেয়ে…
” বাবা আমার , কাঁদতে নেই এভাবে ! তুমি না ভালো ছেলে । চুপ করো বাবা…
এই দেখো তোমার বাববা তোমায় আরো অনেক খেলনা কিনে দেবে । আর কেঁদো না বাবা ।
শ্যামা মুচকি হাসলো সংগ্রাম কে এভাবে দেখে । পরমুহূর্তে কপাল কুঁচকালো । শবনমের দিকে তাকলো । সে এখনো ওভাবেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে । এদিকে ছেলের পানে ফিরেছিল একবার । কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আবার চোখ সরিয়েছে অবিলম্বে । ছেলেটা কাঁদছে এখনো । অথচ মা – বাপ কারোর কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই এদিকে । শবনম সৈকত কে নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক । ছেলে কে এক মুহুর্তের জন্যেও কাছ ছাড়া করে না । কাঁদতে দেয় না একটুও । শ্যামা সৈকত কে সেভাবে কাঁদতে দেখে নি কখনো । ছেলে কে পুরো তুলোয় মুড়িয়ে রাখে শবনম ।
অথচ আজ কাঁদছে ওর ছেলে , কিন্তু ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ? কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো । জুনাইদ এমন অদ্ভুত , এটা মানা যায় । সে কারোর দিকেই খেয়ালি নয় । এমনকি নিজের ছেলের দিকেও নয় । কিন্তু শবনমের দিকটা বিপরীত ।
সংগ্রাম সামলাতে পারছে না সৈকত কে । কান্না থামছে না ওর । অস্ফুটে দু-ঠোট নাড়িয়ে মা মা উচ্চারণ করছে । অথচ মায়ের সাঁড়া নেই । সজল চোখে সংগ্রামের ঘাড় থেকে মাথা তুলে কাঁদতে কাঁদতে শবনমের দিকে চেয়ে আছে বাচ্চা টা । কাঁদছে ফিকড়ে ফিকড়ে ।
লতিফা বিরক্ত হলো । তার নাতি তার প্রিয় । অতিব প্রিয় । সে এভাবে কাঁদছে, সহ্য হচ্ছে না । কিন্তু খাওয়া ছেড়ে উঠছেও না সে । শবনমের দিকে ফিরে ঝাই ঝাই করে উঠলো লতিফা…
” ছেলেটা কখন থেকে কাঁদছে দেখতে পারছো না ? কানে যাচ্ছে না ? ওভাবে শংয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেনো ওখানে ?
একটুও নড়লো না শবনম । সেভাবেই স্থির থেকে বললো ক্ষিন স্বরে…
” আপনার ছেলের যদি কিছু প্রয়োজন হয় ? আপনার ছেলের তো আবার সবকিছু পছন্দ হয় না , আমার এখান থেকে যাওয়াটা ও পছন্দ হবে না হয়তো । ও কাঁদছে , ভাই সামলে নেবে ওকে …
সংগ্রামের তপ্ত আওয়াজ….
” ভাবি ,, কাঁদছে সৈকত । ঘরে যান ওকে নিয়ে । এখানে কার কি প্রয়োজন হবে না হবে সেসব দেখার জন্য আর তদারকি করার জন্য বাড়িতে কাজের লোকের অভাব নেই । আপনি ঘরে যান ছেলে কে নিয়ে ।
শবনম এবার আর দাঁড়ালো না । সায় পেলো বোধহয় । এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে সংগ্রামের থেকে সৈকত কে নিয়ে ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো ।
সংগ্রাম গটগট পায়ে এগিয়ে এসে প্লেটে খাবার তুলে আদেশ করলো…
” ঘরে এসো বেগম..!
” এখানে খাবি না ?
সালেহার প্রশ্ন । সংগ্রাম চলতে গিয়ে থামলো । তপ্ত স্বরে বলল…
” খাওয়া শেষ আমার ।
” তাহলে এসব কার জন্য নিয়ে যাচ্ছিস ?
” তোমার বউমার জন্য !
” তাকে আবার আলাদা করে ঘরে গিয়ে খেতে হবে নাকি ? এখানে কি হয়েছে ?
” এখানে খাওয়ার মতো পরিবেশ নেই ।
কথা টা উচ্চারণ করেই গটগটিয়ে চলে গেল সংগ্রাম । সিঁড়ির নিচে থেমে পিছু ফিরে শ্যামা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারও ডাকলো । রসকস হীন কন্ঠ আজ…
” ডাকছি তো । দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? এসো…
ওর পিছু নিলো শ্যামা । সালেহা কটমট করে তাকিয়ে রইলেন যাওয়ার পানে ।
বড় বড় ধাপে উঠে এসেছে সংগ্রাম । টেবিলের উপর প্লেট রেখে বড় আলমারির দিকে এগিয়েছে । ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিলো শ্যামা । টেবিলের উপর রাখা প্লেট টার দিকে তাকালো একবার । সংগ্রামের ক্ষুব্ধ মনোভাব বুঝতে বাকি রইলো না । ও শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো…
” হঠাৎ রেগে গেলেন কেনো ?
আলমারির দরজা লাগিয়ে খাটের দিকে এগোতে এগোতে দায়সারা জবাব দিলো সংগ্রাম…
” কোথায় রাগলাম ?
” রেগেই তো গেছেন । দেখেই বোঝা যাচ্ছে ! আপনি রাগলে অদ্ভুত লাগে আপনাকে । কথার ধরন বদলে যায় আপনার !
” তাই ? এখন বুঝি কথার ধরন বদলেছে ? তা রাগলে কথার ধরন কেমন হয় আমার ?
” রুক্ষ !
” পুরুষ মানুষের কন্ঠ রুক্ষই হয় !
” আপনার হয় না । শুধু রাগলে হয় !
” আর না রাগলে ?
” মিষ্টি !
” আমার রাগ বোঝো তুমি ?
” বুঝি তো ।
” রাগের কারণ ?
” সেটা বুঝি না ।
” সেটা বুঝতেও হবে না । আর আমার রাগ কেও বুঝতে হবে না তোমায় । আমার রাগ , ক্ষিপ্ততা তোমার জন্য নয় । সেসব বুঝে কাজ নেই তোমার ।
” আপনার রাগের লক্ষন টা বুঝে রাখি ! এতে কাজ আছে !
কপাল গুটালো সংগ্রাম ।
” কি কাজ ?
” যদি কখনো আমার উপর রেগে যান । তখন যেনো অপ্রকাশ্যেই সেটা বুঝে যেতে পারি !
নিঃশব্দে হাসলো সংগ্রাম । কথা পাল্টালো…
” খেয়ে নাও ।
সংগ্রাম বেরিয়ে গেছে । খাওয়া শেষ করে একবারে যোহরের নামাজের পর ঘর থেকে বেরিয়েছে শ্যামা । খানিক বাদ সংগ্রাম ফিরবে । বালা আসার কথা , আসবে কি না কে জানে ! আর আসার কথা বলেছে কি না তাও তো বললো না সংগ্রাম ।
দরজা পেরিয়ে আতিয়া বেগমের ঘরে যাওয়ার আগেই সামনে পড়লো শবনম । শ্যামা চকিতে পূর্ণ দৃষ্টি পাত করলো ওর দিকে । তড়িঘড়ি করে মাথার কাপড় ঠিক করলো শবনম । শ্যামা কে উপেক্ষায় পাশ কাটাতে গেলে বিচলিত হয়ে ডাকলো শ্যামা…
” ভাবি ! কপালে কি হয়েছে আপনার !
দেখি দেখি ,, কাটলো কি করে এভাবে ?
শবনম কে থামিয়ে নিজের দিকে টেনে ফেরালো শ্যামা । মাথার কাপড় সরিয়ে কেটে জখম হয়ে যাওয়া কপাল দেখে আঁতকে উঠলো ।
” ভাবি , এভাবে কাটলো কি করে কপাল টা ?
” পোড়া কপাল এমনি এমনি কাটে না বোন । একটু আঘাত লেগেছে, পড়ে গেছিলাম তো তাই ।
” পড়ে গিয়ে এভাবে কপালে চোট পেয়েছেন ?
” হুম ।
” চোখের পাশে ? চোখের পাশেও তো নীলচে হয়ে আছে !
” মাদুরে পা মুড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম । চোখের পাশে আর কপালে লেগেছে ।
শ্যামা সূক্ষ্ম করলো নেত্র যুগল । শবনম উৎফুল্ল, উৎসুক স্বভাবের । হেসে হেসে মিষ্টি টোনে কথা বলে সবসময় । তবে আজ বিপরীত । কেমন যেনো অদ্ভুত লাগছে ওকে । চোখে চোখ মেলাচ্ছে না !
নেত্র যুগল জড়ো হয়ে ছোট দেখাচ্ছে । শ্যামা প্রশ্ন করলো কন্ঠের বাঁধ ঠেলে….
” আপনাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে । ঘুম হয় নি মনে হয় । সৈকত খুব জ্বালাতন করে রাতে , তাই না ?
হাসলো শবনম ।
” কে বললো ঘুম হয় নি । খুব ঘুম হয়েছে আমার । সৈকত তো রাতে আজকাল থাকে না আমার কাছে । আম্মার কাছেই থাকে , আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি । কালকেও ঘুমিয়েছি নিশ্চিন্তে । আসলে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছিলাম তো , ব্যাথার যন্ত্রণায় দূর্বল হয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছি টেরই পাইনি । সারা রাত বেঘোরে ঘুমিয়েছি জানো ! আজও তো উঠতে উঠতে বেলা হয়ে গেছে…
” ওও…
আপনার ফর্সা চেহারায় দাগ মানাচ্ছে না । হলুদ বেটে লাগিয়ে দেবেন , ব্যথার সাথে সাথে দাগ ও সেরে যাবে । ব্যথায় মলম লাগাননি ?
” না গো ,,
একটু লাগিয়ে দেবে ?
কথাটা কেমন করুন শোনালো । শ্যামা হাসার চেষ্টা করলো । বললো আলতো স্বরে…
” আপনি ঘরে যান । আমি নিয়ে আসছি ।
” ভাই তো নেই এখন । তোমার ঘরেই যাই ?
” আচ্ছা চলুন…
শবনম শ্যামার ঘরে বসেছে । নিচে গিয়ে কাঁচা হলুদ দিয়ে এক প্রকার টোটকা বানিয়ে আনলো শ্যামা ।
শবনম কেমন মনমরা হয়ে বসে আছে । শ্যামা ডাকতেই চকিতে নিজেকে স্বাভাবিক করলো ও । হাসার চেষ্টা করলো জোরপূর্বক । শ্যামা হাতে ছোট্ট একটা বাটি সমেত এগিয়ে গেলো । শবনমের মাথা থেকে ঘোমটা নামানো ।
কপালের জখমের স্থান থেকে অদূর অবধি কেমন তামাটে বর্ন ধারন করেছে । শ্যামা পুরোপুরি ভাবে লক্ষ্য করলো । ডান চোখের সাদা অংশে এক টুকরো লালচে দাগ । খোঁচা লেগেছে এমন । আবার চোখের পাশটাও কেমন বিবর্ন দেখাচ্ছে । দৃপ্তিমান চেহারা খানা কেমন দেখাচ্ছে ওর ।
শবনম শ্যামার চাহনি দেখে অপ্রস্তুত অবস্থা কাটাতে বললো….
” তোমায় কষ্ট করতে হবে না । আমায় দাও আমি লাগিয়ে দেবো ।
শ্যামা বোধহয় এ কথায় কান দিলো না । আচমকা বলে উঠলো….
” আপনার কি হয়েছে ভাবি ? এমন দেখাচ্ছে কেনো ?
” কই,, কিছু না তো !
” আপনার গলাটা ফাঁকা ফাঁকা দেখাচ্ছে । চেন ছিলো তো , না ?
শবনমের চোখের ঘন পলক নজর এড়ালো না শ্যামার । ঠোঁট ভেজালো শবনম । কন্ঠের জড়তা ঠেলে বললো…
” ওটা তো খুলে রেখেছি । তুমি এসব বাদ দাও তো । তুমিও না , কেমন করে দেখছো আমায় । এই প্রথম তোমার সামনে অস্বস্তি হচ্ছে আমার ।
” আমার সামনে অস্বস্তি হওয়ার কি আছে ? আমি তো আপনার বোন ।
যখন অস্বস্তিই হচ্ছে তখন বাদ দিলাম এসব । আমি লাগিয়ে দিচ্ছি এটা । আপনি বসুন ।
শবনম দ্বিমত করলো না । আলতো হাতে ওর কপালে হলুদের মিশ্রণ লাগিয়ে দিলো শ্যামা ।
সন্ধ্যার আগে আগে জমিদার বাড়িতে আগমন সুরবালার । সাথে তো অংকুর অবশ্যই ।
মেয়েটা আসতে চায় নি আজও । শায়লা আর অংকুরের কারনে আসতে হয়েছে । যখন এসেছে , তখন সংগ্রাম বাড়িতে ছিলো না । সালেহা মেয়ে টাকে দেখা মাত্রই ভালোবেসে কতক্ষন বুকে জড়িয়ে রাখলেন ।
সন্ধ্যার পর সংগ্রাম বাড়িতে এসেছে । বসার ঘরে লতিফ জোয়ার্দারের সাথে অপ্রস্তুত অবস্থায় বসে ছিল অংকুর । কি বলবে না বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না । লতিফ জোয়ার্দার টুকটাক প্রশ্ন করছিলো ও কোনো রকমে উত্তর দিচ্ছিল । আজ কেনো জানি লজ্জা লজ্জা লাগছে । কই আগে তো এমন লাগে নি । সেদিন ও তো বেশ কাঠখোট্টা হয়ে এনাদের সামনে বসে ছিল সে ।
সুরবালা কোথায় কে জানে ? ও এখানে থাকলে হয়তো অস্বস্তি কম হতো । অংকুর কে একা ফেলে সেই যে আসার পর পরই ঘরে ঢুকেছে আর বেরোয় নি । শ্যামা হয়তো আছে ওর সাথে ।
লতিফ জোয়ার্দার অংকুরের অস্বস্তি বুঝে গলা ঝেড়ে ওকে ঘরে যেতে বললেন । অংকুর যেন হাঁফ পেলো । তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই সংগ্রামের উৎসুক কন্ঠের ডাক….
” অংকুর ??
সবেগে ফিরলো অংকুর । সংগ্রাম কে দেখে ভিতরের খচখচ উধাও হলো নিমিষেই । একটু হাসলো । থেমে শরীর ঘোরালো । সংগ্রাম এগিয়ে এসেছে , জিজ্ঞেস করল ও…
” আরে , নতুন জামাই যে ? কি খবর বলো ? কখন এসেছো ?
” এইতো খানিক আগে । আপনাকে পেলাম না এসে ।
” গ্রামে গেছিলাম একটু । বালা কোথায় ?
” ঘরে ।
” নতুন জামাই কে একা রেখে ঘরে কি করছে ও ?
” আপনার বেগমের সাথে গল্প করছে হয়তো । সেখানেই যাচ্ছিলাম ।
” চলো তাহলে…
ঘরে সুরবালা নেই । শ্যামার ঘরে ও । ওর ঘরে যাওয়ার আগেই সংগ্রাম নিজের ঘরের দরজায় টোকা মারলো একবার । দরজা খোলাই ছিল , তবুও উপস্থিতি বুঝিয়ে অংকুর কে নিয়ে ঘরে ঢুকলো । সংগ্রামের সাথে অংকুর কে দেখে মুচকি হাসলো শ্যামা । সুরবালা এক পলক তাকিয়ে চোখ নামালো ।
সংগ্রাম সোজাসুজি ওর দিকেই তাকিয়ে । বেগুনি রঙের শাড়ি পড়নে মেয়েটার । আঁচল কাঁধ পেঁচিয়ে সামনে টেনে নেওয়া । ছোট্ট বালা টাকে শাড়িতে কেমন বড় বড় দেখাচ্ছে । এভাবে তো দেখে অভ্যস্ত নয় সংগ্রাম । নতুন ও লাগছে ওকে । নাকে নতুন নাক ফুল , হাতে গলায় চিকচিক গহনা । মুখশ্রীতে পরিবর্তন এসেছে অনেক টা । আগের মতোই তো আছে ও , তাহলে হয়তো সংগ্রামের দেখার ভঙ্গিমায় পরিবর্তন এসেছে ।
সংগ্রাম মুচকি হেসে বালার দিক থেকে চোখ সরিয়ে শ্যামার দিকে তাকালো । তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরালো মেয়েটা । হয়তো দৃষ্টি অগোচর করতে চাইলো । নাহ , শ্যামা কে দেখার মাঝে অদ্ভুত এক অনুভূতি যুক্ত তৃপ্তি আছে । যা অন্য কারোর মাঝে নেই । কাউকে দেখে এতোটা প্রশন্য লাগে না । যতটা এই শ্যামলা সৌন্দর্যের অধিকারিণী কে এক নজরে দেখলে অনুভূত হয় ।
শ্যামার অবস্থা ঠাহর করতে পেরে সংগ্রাম মনে মনে হাসলো । বালার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকা হয়তো পছন্দ হয় নি তার বেগমের । সংগ্রাম এগিয়ে বালা কে শুধালো নরম কন্ঠে…
” কেমন আছিস ?
” ভালো থাকার গন্তব্য খুঁজে দিয়েছেন , খারাপ থাকি কি করে ?
ভ্রু গুটিয়ে আসলো সংগ্রামের । তবে ঠোঁটের কোণে হাসি আছেই । বালা আজকাল কথা শিখেছে অনেক । ওর মতো করেই বললো সংগ্রাম…
” খারাপ নেই জানি । কতটা ভালো আছিস সেটা জানতে চেয়েছি !
” যতটা ভালো দেখছেন , তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি ভালো আছি আমি ।
” সেটাই তো চাই ।
” সেটাই হয়েছে ।
অংকুর সূচালো দৃষ্টিতে বালার দিকে চেয়ে । বালা ওর চোখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো । মেয়েটা কে অকৃত্রিম হাসলে কত সুন্দর লাগে , সেটা হয়তো ও জানে না । জানলে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে কাউকে দেখানোর চেষ্টা করতো না । সংগ্রাম শ্যামার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো…
” কি গল্প করছিলে ননদীনির সাথে ?
শ্যামার মিষ্টি উত্তর…
” তেমন কিছু না । শুনছিলাম ওর শাশুড়ির কথা । বালা বললো,, আম্মা খুব ভালো । এই দুদিনেই খুব যত্নে রেখেছে বালা কে ।
মাথা নুইয়ে এক গাল হাসলো বালা । এবার বোধহয় কৃত্রিম নয় । আসলেই তো শায়লা অনেক ভালো । এই দুদিনে শায়লার বালা কে নিয়ে সব মাতামাতি, উচ্ছাস , সবকিছুই শ্যামা কে বলেছে বালা ।
রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার ঘরে । সংগ্রাম ঠান্ডা হাওয়ায় খাওয়ার পর অংকুর কে নিয়ে বেরিয়েছে একটু । হাঁটা হাঁটি করে ফিরবে খানিক বাদ । অন্দরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে গেছে ওরা । পুরো অন্দর মহল ফাঁকা । এমনিতেও ফাঁকাই থাকে । তার উপর রাতে যে যার ঘরে । নামাজ শেষে কিছু সময় বারান্দায় আনমনে দাঁড়িয়ে ছিল শ্যামা । সংগ্রামের অপেক্ষায় সে । কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝে শরীর খানা শিরশির করে উঠতেই বারান্দা ছাড়লো শ্যামা । ঘরে এসেও করার মতো কিছু নেই । আজ আম্মার কথা মনে পড়ছে ভীষণ । সেও যায় না , আম্মা ও আসে না । পায়চারি করতে করতে মনমরা হয়ে পড়লো শ্যামা । সংগ্রাম কে সেদিন বললো , কিন্তু সংগ্রাম গুরুত্ব দিলো না তেমন । আজ আবার বলবে । এভাবে ঘর বন্দি হয়ে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে যায় মাঝে মাঝে । আম্মার ছোঁয়া , আম্মার পরশ , আদর পেতে ইচ্ছে করে । বালা কে নাকি ওর শাশুড়ি কতো ভালোবাসে । কিন্তু শ্যামা কে , সালেহা তো সহ্যই করতে পারেনা ওকে । ওর প্রতি সালেহার নরম মনোভাব বড় জোর দুবার দেখেছে শ্যামা । আর বরাবরই তাচ্ছিল্য কঠোর মনোভাব ।
পায়চারি করতে করতে চমকে উঠলো শ্যামা । দুহাত বুকে ভাঁজ করা ছিল , কেঁপে উঠে আলগা হলো হাতের ভাঁজ ।
শরীরে শিহরণ বয়ে গেল আচমকা ঘুঙুরের শব্দে । রিনঝিন আওয়াজ ? আবার ? কদিন তো ছিলো না , আবার ? শ্যামা কান খাড়া করলো , না নিজের মনের ভুল নয় ! মনের ভুল বলে কতো চালিয়ে দেবে আর ? ও তো ভুল করে না একবারও !
শ্যামা শুকনো ঢোক গিললো । দরজা লাগানো নয় । ও তড়িঘড়ি করে ভিতর থেকে দরজা টা লাগিয়ে দিলো খট করে । বাইরে কি হয়ে যায় যাক । ও বেরোবে না । নিজেকে আর বেকুব , ভুল প্রমাণ করবে না কারোর সামনে । কেউই তো ওকে বিশ্বাস করে না । বরাবরই ও ভুল সবার সামনে ।
শ্যামা কাঁপছে । অদ্ভুত এলোমেলো লাগছে নিজেকে । কেনো এমন হয় মাঝে মাঝে । কি হয় ওর , কেনো ও এসব শোনে ? আর কেউ শোনে না , কারোর কানে পৌঁছায় না এই শব্দ , তাহলে ও কেনো শোনে ?
ধড়ফড় করছে শ্যামার ভীত সত্ত্বা । জিভে অধর ভিজিয়ে গায়ে জড়ানো সংগ্রামের চাদর খানা খামচে ধরে একটানে খুলে ফেলল ও । মেঝেতে ছুড়ে ফেললো ওটা । শিরদাঁড়া বেয়ে শিরশির কিছু নোনা বিন্দু কণা গড়াচ্ছে । চোখ আর কান গরম হয়ে আসছে । শব্দ টা দরজা ভেদ করে ক্ষীন শোনাচ্ছে এখন । তবুও নাজেহাল অবস্থা করে ফেলছে শ্যামার । সংগ্রাম ও নেই এখন । শ্যামা জোরে জোরে শ্বাস টেনে কুলাতে পারলো না । মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো বন্ধ দরজার ভেতর ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩২
ধাম করে একটা শব্দ হতেই ছ্যাঁত করে উঠলো শ্যামা । শব্দের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ভেজা চোখে এলোমেলো অবস্থায় তাকালো বারান্দার দিকে । যা দেখলো তাতে ডাগর ভেজা বৃহৎ অক্ষি যুগলের সাথে প্রকম্পিত হলো পুরো শরীর । তবে কন্ঠনালিতে শব্দ আসলো না আর । শুকনো গলায় ঢোক টুকুও গিলতে পারলো না । খাঁড়া অবস্থায় শরীর খানা ভার ছেড়ে ধপ করে নেতিয়ে পড়ল মেঝেতে । বারান্দার দিকে তাকিয়েই ধীরে ধীরে ভীত নয়ন জোড়া বুজে আসলো ।
