Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৫

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৫

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৫
সুরভী আক্তার

“ হুম ।
আলতো স্বরে সুরবালার ডাকে ক্ষিণ উত্তর করলো অংকুর । মেয়েটা আঁতকে উঠলো পুনরায় । এবার গোটা হাতে অংকুরের গলা বেয়ে নামা রক্তের‌ স্রোতে স্পর্শ করলো । লাল তরলে রাঙিয়ে উঠলো ওর হাতের তালু ।
ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো মেয়েটা । অংকুরের শক্ত পোক্ত দুই বাহু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলো । কাঁপা গলায় থেমে থেমে বললো….
“ র…রক্ত ?
বাবড়ি ওয়ালা ! রক্ত ,কোথা থেকে ? আপনি…
“ আমি ঠিক আছি !

ফের নিস্তেজ স্বর । ভড়কায় বালা । কাঁপে ওর দৃষ্টি যুগল । ও ঠেলে অংকুর কে দূরে সরায় । আবার কাছে যায় । উচ্চতায় সে অংকুরের বুক পর্যন্ত । পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে উঁচু হওয়ার চেষ্টা করলো সুরবালা । হাত বাড়িয়ে মাথার পিছনে এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের ভাঁজে হাত চেপে ধরতেই ভেজা ভেজা আঠালো কিছু অনুভব হয় । ঝট করে হাত সরায় সে । হাত ভিজে জবজবে ।
শক্ত বাঁশের দাম আঘাত লেগেছে মাথায় । যা লাগার কথা ছিল সুরবালার মাথায় । অংকুরের মাথা ফেটে গেছে । রক্ত গলগলিয়ে কাঁধ গলিয়ে পড়ছে । তবুও নাকি এই লোকটা ঠিক আছে ?
চেয়ে আছে এক স্থির দৃষ্টে । চোখ খানিক সরু । বালা ঝাঁকালো অংকুর কে ! উঁচু গলায় চেঁচিয়ে উঠলো…
“ আপনি ঠিক আছেন মানে ?
ম…মাথা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে আপনার ! মাথা কেটে গেছে । আমার হাতে রক্ত । রক্ত আমার হাতে….
বিচলিত হয়ে পড়লো মেয়েটা । কাঁপতে লাগলো পুরো শরীর । অংকুর না ছুঁয়ে ধীরে বললো….
“ কিছু হয় নি ! আমি ঠিক আছি…
“ চুপ ! ঠিক আছেন আপনি ? চলুন নিচে…
ঝাড়ি মেরে অংকুরের হাত চেপে ধরলো সুরবালা । শায়লার শাড়ি দুটো পড়ে গেছে সুরবালার হাত থেকে । টালমাটাল পা ফেলে অংকুর কে টেনে দপাদপ নিচে নামলো মেয়েটা । সিঁড়ি থেকে বিচলিত গলায় ডাকলো….

“ মা….
শায়লা নিচেই বসে ছিলেন । সাদা কালো টিভিতে খবর দেখছেন তিনি । জাহানারা পাশে বসে দেখতে দেখতে মটরশুটির খোসা ছাড়াচ্ছেন । বাগানের কাজ শেষ । সুরবালার আতঙ্কিত স্বরের ডাকে দু’জনেই চকিতে চাইলেন সিঁড়ির দিকে । কেউ বুঝলেন না কিছু । সুরবালা অংকুর কে টেনে সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে নামলো । শায়লা শুধালেন উদ্বিগ্ন হয়ে….
“ কি হয়েছে বউ মা ?
সুরবালা ছলছলে চোখে চায় । ঠোঁট উল্টায় সে । তা দেখে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে দাঁড়ান শায়লা । ছেলে কে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেই আঁতকে ওঠেন । ছেলের কাঁধে রক্ত । ছলকে ওঠে মাতৃ হৃদয় । ছুটে আসেন তিনি ।
“ অংকুর ! কি হয়েছে বাবা ? রক্ত ? রক্ত কেনো ? রক্ত কোথা থেকে এলো ? মাথা থেকে রক্ত ঝড়ছে কেনো তোর ? কি হয়েছে বল না !
শায়লার ব্যস্ত স্বর । অংকুর স্বাভাবিকের ন্যায় শান্তনা দিলো তাকে ।

“ আমি ঠিক আছি মা । কিচ্ছু হয়নি । ছাদের বাঁশ টা পড়েছিল , আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম , খেয়াল করি নি । মাথায় পড়েছে সেটা । হয়তো কেটে গেছে একটু । এর বেশি কিচ্ছু নয় ।
আরো বেশি আঁতকে ওঠেন শায়লা । রক্ত গড়িয়ে পড়তে পড়তে অংকুরের ঢিলে ঢালা পশমি গেঞ্জি টা ভিজে জবজবে । কত রক্ত ঝড়েছে আন্দাজে ঠাহর করতে পারলেন না শায়লা । ছেলে কে টেনে সোফায় বসালেন তিনি । চুল হাতড়ে কাটা জায়গা খুঁজলেন রক্তের ধারা অনুসরণ করে । অনেক টা কেটে থেঁতলে গেছে । শাড়ির আঁচল দিয়ে অংকুরের কাঁধ চেপে ধরলেন শায়লা ।
মাথা ঝমঝম করছে অংকুরের । শায়লা ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পড়লেন ছেলে কে নিয়ে । সুরবালা স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে । অংকুর মিথ্যে বললো ?
বালা কে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শায়লা সংকিত হয়ে বলে উঠলেন….
“ বউ মা ! তাড়াতাড়ি গিয়ে ঔষধের বাক্স নিয়ে আয় । কতটা কেটে গেছে দেখতো ? জখম হয়ে গেছে পুরো ।
এভাবে বেখেয়ালি হয়ে দাঁড়িয়েছিলি কেনো তুই ? আর বাঁশ টা মাথায় পড়লো কি করে ?
অংকুর উত্তর করলো না । শায়লা নিজের মাঝে ছেলেকে নিয়ে আহাজারি করতে করতে একই কথা আওড়াচ্ছেন বারবার ।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা । এই ভর সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে ময়না । মাগরিবের আজান পড়ে গেছে । খালেদা ঘরে এসে দেখেন ময়না কোমর পর্যন্ত কাঁথা মুড়িয়ে গুটিয়ে ঘুমিয়ে আছে । ঘুমিয়েছে সেই বিকেলে । কাল থেকে কেমন শুকিয়ে গেছে মেয়েটা । রাতে জ্বর এসেছিল । এখনো উষ্ণ গরম শরীর । খেতেও পারে নি সকালে কিছু । একটু খেতেই বমি করে দিয়েছে । পোড়া জায়গাটা কর্দমাক্ত হয়ে গেছে কেমন । বারবার বলছিলো মেয়েটা, গা গুলিয়ে মাথা ঘোরাচ্ছে ওর ‌।
টান ধরেছে মাথায় । ঝিম মেরে বসে ছিল সকাল থেকে । মেয়েটা কে ওভাবে নিথর হয়ে ঘুমাতে দেখে খালেদা আর ডাকলেন না । দরজা খানিক চাপিয়ে দিয়ে তিনি চললেন নামাজ পড়তে ।

ওযু করে এসেই বাইরে সামনাসামনি হলেন আফতাবের । সে গেছিলো বাজারে । হাতে ঔষধের প্যাকেট ।
খালেদা ময়নার অবহেলার কথা আফতাব কে বলে ঘরে ঢুকলেন নামাজ পড়তে । আফতাব খানিক দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও নিজের ঘরে ঢুকলো । দরজা ঠেলে ঢুকতেই বিছানার উপরের মেয়েটাকে নজর পড়লো । কাত হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা । আফতাব নিজের হাতের ঔষধের প্যাকেট টা টেবিলের উপর রেখে নিঃশব্দে শিয়রের পাশে দাঁড়ালো । একটু ঝুঁকে দেখলো মেয়েটার মুখ খানা । ঠিক মতো দেখতে পারলো না । মুখের উপর চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আছে । গালের পোড়া ক্ষতস্থানেও কয়েকটা চুল আঁচড়ে পড়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে ।
আফতাব বিরক্ত হলো । কপালে ভাঁজ ফেলে গোড় আগালে মেয়েটা কে দেখলো । দৃষ্টি আটকালো এক জায়গায় । মেয়েটা কোমর অবধি কাঁথা টেনে শুয়ে আছে বেঘোরে । ফর্সা উদর থেকে শাড়ি সরে গেছে । ফর্সা উদরের কোমল পৃষ্ঠ স্পষ্ট । অবাধ্য দৃষ্টি আটকালো উন্মুক্ত উদরের উপর । এলোমেলো অবস্থা শাড়ির । মুহুর্তেই দৃষ্টি ফিরিয়ে চোখ বুজলো আফতাব । শুষ্ক ঢোক গিললো সে । বড় শ্বাস টেনে মেয়েটার মাথার কাছে বসলো । রাতেও জ্বরের ঘোরে এভাবে এলোমেলো হয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে ছিলো এই মেয়ে । ঘুমের ঘোরে গুঙ্গিয়েছে সারা রাত । আফতাব গোঙানির শব্দে শরীরে হাত রাখতেই আঁতকে উঠেছিলো । সেই রাতেই জ্বর উঠেছিল অনেকটা । নিজে কিছু না করে খালেদা কে ডেকে সারা রাত উষ্ণ শরীরের জ্বর ছেকা হয়েছে । ঘুমোয় নি খালেদা । আফতাব ও ঘুমোয় নি সারা রাত ।
এই মেয়ে তো অশান্তিতে হলেও বেঘোরে ঘুমিয়েছে । এখনো কেমন ঘুমিয়ে আছে দেখো ? নিজের দিকে খেয়াল আছে ? এভাবে এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে আছে যে ? শরীরের কাপড় ঠিকঠাক নেই শরীরে । ওষ্ঠ উল্টে নিজের মতো ঘুমোচ্ছে ।

আফতাব ভ্রু গুটিয়ে চেয়ে মৃদু হাসলো । মাথার কাছে বসলো মেয়েটার । মেয়েটা কে আজকাল বিরক্ত লাগে না । অবশ্য ওর প্রতি বিরক্তি কখনো এসেছে কি না জানা নেই । তবে উহ্য ক্ষোভ তো ছিলোই । যে অবস্থায়,যে পর্যায়ে থেকে ওদের সম্পর্কটা জোরা হয়েছে , তা আফতাব মানতে পারে নি । মানার কথাও ছিলো না । এখনও মানে কি না ওর জানা নেই হয়তো । তবে যা বোধগম্য হয় , এই মেয়েটা কে এখন আর অসহ্য লাগে না । বরং সহ্য করতে ইচ্ছে করে ।
ঐ যে আছে না , হালাল সম্পর্কের জোর ! সেই জোরেই হয়তো এমনটা হচ্ছে ! অনুভুতি জন্মাচ্ছে আফতাবের মনে । সেই বিয়ের পর থেকেই যখন ময়না কে ও বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো , তখন থেকেই ভ্রোমে আসতো এই মেয়ে । অবয়ব ছোটাছুটি করতো চোখের সামনে । আফতাব তখন চরম বিরক্ত হতো । ময়নার সাথে ওর সম্পর্কের কথা ধ্যানে আসলে ঘৃণিত মনভাব জাগতো ।

অথচ এখন ? এখন এই মেয়েটা কে দেখতেও ভালো লাগে । হালাল সম্পর্কের বাঁধন বোধহয় এটাকেই বলে !
শ্যামার চিন্তাও মাথায়,মনে আসে না এখন । শ্যামা কে কি ও কখনো ভালোবেসেছিল ? হয়তো বেসেছিলো ঐ শ্যাম বর্ণের মেয়েটাকে । যাকে না দেখেই অদ্ভুত অবাধ্য টানে ছুটে এসেছিল । আর দেখার পর তো অনুভুতি বেড়েছিল ! মেয়েটা শ্যামলা হলেও অদ্ভুত তৃপ্তি আছে চেহারায় । দেখার ভঙ্গি পাল্টে যদি ওকে দেখা যায় , তাহলে যে কেও প্রেমে পড়তে বাধ্য হবে । আফতাব ও বাধ্যই হয়েছিল । শ্যামলা মেয়েদের অভাব নেই দুনিয়ায় , তবে শ্যামার মতো শ্যামলা মেয়েকে সেই একটাই দেখেছে আফতাব ।

ময়না কে গাঢ় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ পরখ করলো আফতাব । মেয়েটা অনেক সুন্দর । আজকাল ওর সৌন্দর্য অন্য ভাবে চোখে ধরা দেয় । অবাক হয় আফতাব । মেয়েটার বয়সই বা কতো ! এতো ছোট বয়সে কত কি সহ্য করলো ! জীবনের মোড় ঘুরে এসে পড়লো আফতাবের কাছে । আফতাব কি পারে ওকে অবহেলা করতে ? পারবে না সে !
মুখের উপর আছড়ে পড়া চুল গুলো ময়না কে ঠিক ভাবে দেখতে বাধাগ্রস্ত করছে । আফতাব খানিক বিব্রত হয় । আচানক হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটার দিকে । প্রথমে কাঁথা টেনে ঢেকে দেয় শরীর । অতঃপর খুব সন্তর্পণে মেয়েটার মুখের উপর সেপ্টে থাকা চুল গুলো এক আঙ্গুলে আলগোছে সরিয়ে দেয় । গুঁজে দেয় কানের পাশে । ময়না ঘুমের ঘোরে মুখ কুঁচকে নড়েচড়ে উঠলো । আফতাবের দিকে পাশ ফিরলো সে । শরীর থেকে কাঁথা সরে গেছে আবার । আগের ন্যায় দৃশ্যমান হয়েছে পেটের অংশ । আফতাব ও মুখ কুঁচকায় । এই মেয়ে কে শাড়িতে দেখলেই কেমন অদ্ভুত লাগে ‌। সবসময় একে শাড়িতে দেখতে দেখতে নিজেকে এখনো অভ্যস্ত করতে পারে নি আফতাব । শাড়িতে কেমন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বড় লাগে একে । গলা ঝেড়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আফতাব । চিন্তা ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে ময়নার দিকে ঝুঁকে পড়ে একটু । বেকার বেকার কাল মেয়ে টাকে ধমকালো সে । কাল থেকে মুখ ভার এই মেয়ের ।
আফতাব ফুঁ দেয় ময়নার মুখের উপর । ধীর চাপা স্বরে ঠোঁট চেপে বলে…

“ একটা থাপ্পর মারি ময়না পাখি ? ঘুমের মাঝে আমার হাতের থাপ্পর খেলে , খুব বেশি ব্যাথা পাবে কি ? এভাবে এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে আছো যে ? লজ্জা নেই ? মারবো একটা থাপ্পর ? মারি ?
ঘুমের মাঝে আবার নড়েচড়ে ওঠে ময়না । তাৎক্ষণিক সরে আসে আফতাব । উঠে দাঁড়ায় সে । এই মেয়ের ঘুম ভেঙ্গেছে হয়তো । আফতাব সরে এসে নিজেকে টান টান করলো । পেছনে হাত গুটিয়ে ভাবসাব পাল্টে গম্ভীর করলো নিজেকে । পিটপিট করে অক্ষি যুগল‌‌‌ মেলল ময়না । কিছু কিছু শুনেছে সে । তবে বোঝে নি ।
শুয়ে থেকেই গা মোড়ালো ময়না । ঘাড় কাত করে আফতাব কে ওভাবে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হকচকিয়ে উঠলো । ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো সে । চমকেছে আচমকা । ঘুমে আচ্ছন্ন অক্ষি যুগল বড় আকার ধারণ করেছে । নিজের অবস্থা দেখে তড়িঘড়ি করে নিজেকে ঠিক করলো আগে । অতঃপর ফ্যালফ্যাল হাসলো । ওর হাসি টুকু দেখেও কোনো প্রকার পরিবর্তন আসলো না আফতাবের । বরং সে সোজাসুজি নিরেট স্বরে বলল…

“ এই শোনো ! আজ থেকে শাড়ি পড়বে না আর । বাজার থেকে সেলোয়ার কামিজ এনে দেবো কাল, সেগুলোই পড়বে । শাড়ি পড়লে কেমন বউ বউ লাগে তোমায় । এভাবে তোমাকে বউ বউ লাগলে আমার স্বামী হতে ইচ্ছে করবে । যেটা এখন হতে চাই না আমি । তাই নিজেকে আমার বউ দেখাতে হবে না । শাড়ি পড়বে না আজ থেকে….
ভ্যাবাচ্যাকা খায় ময়না । চোখ ঝাপটে আবার তাকায় হা বনে । মাথার উপর দিয়ে কথা গুলো গেলেও বুঝলো একটু একটু । ও তড়িতে চোখ নামায় । আগে সখের বসে শাড়ি পড়তো । সব সময় পড়তে ইচ্ছে করতো । বিয়ের পর কদিন টানা শাড়ি পড়তে পড়তে বিরক্তি এসে গেছিলো । তবে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে । ছিমছাম শরীরে শাড়ি সামলাতে অসুবিধা হয় না অতটা । ময়না কে মাথা নোয়াতে দেখে আফতাব অবস্থা বুঝে প্রসঙ্গ পাল্টানোর কায়দা খুঁজে বলে উঠলো….

“ ঔষধ এনেছি । খালি পেটে একটা খেতে হবে । খেয়ে নাও । তারপর খাবার খেয়ে বাকি গুলো খাবে ।
সবে ঘুম থেকে ওঠা , মাথা টলছে ময়নার । মুখ কুঁচকে নিলো ও । এসব ঔষধ খেতে ভালো লাগে না । কাল থেকে প্রত্যেক বেলা খালেদা জোর করে ঔষধ খাওয়াচ্ছেন । আফতাবের ঝাড়ি খাওয়ার ভয়ে চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে ময়না । একেই বমি বমি ভাব হচ্ছে , বমি হচ্ছে কাল থেকে । তার উপর এসব ঔষধ খেলে গা গুলিয়ে আসে আরো ।
ময়না খানিক ঝিম মেরে বসে রইলো । আড়চোখে আফতাবের ভাবগতিক দেখার চেষ্টা করলো । আর এক মুহূর্ত বসে থাকলে এক্ষুনি ঝাড়ি মারবে এই লোক । এখন ধমক খাওয়ার বদলে চুপচাপ ঔষধ খেয়ে নেওয়া ঢের ভালো । খাট থেকে পা নামিয়ে মাটিতে পা রাখালো ময়না । আঁচল ঠিক করে এক পা বাড়াতেই কেঁপে উঠলো মাটি । দুনিয়া শুদ্ধু চক্কর দিয়ে উঠলো ওর কাছে । অবসন্ন শরীর ভার ছেড়ে নেতিয়ে টলে পড়তে গেলে তৎক্ষণাৎ এক হাতে ময়না কে আগলে নিলো আফতাব ।
চঞ্চল হয়ে ডাকলো তড়িতে….

“ ময়না , কি হলো ?
মেয়েটা স্বাভাবিক করলো নিজেকে । আফতাব তড়িঘড়ি করে ওকে বসালো খাটে । মাথা চক্কর দিচ্ছে ময়নার । চোখ বুজে নিলো সে । মনে হচ্ছে আশেপাশে সবকিছু তাল গোল পাকিয়ে ঘুরছে । বিছানার চাদর খামচে ধরলো ময়না । আফতাব ঝাকালো ওকে…
“ এই মেয়ে ! কি হলো ? মাথা ঘুরছে আবার ?
মাথা ঝাঁকায় ময়না । হ্যাঁ সূচক সম্মতি দেয় । গলা কাঁপছে ওর । আফতাব তড়িঘড়ি করে পানি এগিয়ে দিলো ।
“ খেয়ে নাও ।
না বোধক মাথা ঝাঁকায় ময়না । খাবে না কিছু । আফতাব বললো এবার….
“ ঔষধ খেয়ে নাও তাহলে ! ঠিক হয়ে যাবে ।
বলতে বলতে প্যাকেট খুলে পাতা থেকে ঔষধ বের করলো । ময়নার দিকে গ্লাস আর ঔষধ দুটোই বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
“ নাও ।
মাথা তোলে ময়না । ঔষধের কি বিদঘুটে গন্ধ । নাকে লাগছে ভীষণ । গা গুলিয়ে আসছে আরো ।
ময়না নাক সিঁটকালো । অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘাড় উঁচিয়ে বললো…

” কি বাজে গন্ধ । খামু না আমি !
“ কোথায় গন্ধ ? খেয়ে নাও জলদি ।
চড়া স্বর আফতাবের । ময়না এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে নাক চেপে ধরলো । তড়িঘড়ি করে আফতাবের হাত থেকে ঔষধ টা নিয়ে মুখে দিলো । চটজলদি গ্লাস নিয়ে পানি গিললো ঢকঢকে ।
মুখ থেকে গ্লাস সরাতেই উগলে আসলো সবটা । ঔষধ সমেত পেটে যা ছিলো গলাগলিয়ে বেরিয়ে আসলো সবটুকু । নাভি চেপে ধরে কাত হয়ে মাটিতে বসে পড়লো ময়না । শিউরে উঠলো পুরো শরীর । সকাল থেকে যা খেয়েছে, সাথে সাথেই সবটা বের করে দিয়েছে । পেটে এখনকার গেলা পানি টুকু ছাড়া আর কিছুই নেই । সেটুকু ও গেলা মাত্রই বের করে দিলো ।
আফতাব আকস্মিক কান্ডে চমকালো । নিজেও হাঁটু মুড়ে বসে মেয়েটাকে ফেরালো নিজের দিকে । ময়নার মুখ অবিলম্বে ঘৃণা হীন মুছিয়ে দিলো নিজ হাতে । এলোমেলো চুল দুহাতে সরিয়ে দুহাতের আজলে জীর্ণ মুখখানা আগলে ধরলো ।

“ কি হয়েছে তোমার ! আবার বমি করলে কেনো ! খুব বেশি অস্বস্তি হচ্ছে ? কেমন লাগছে বলো ?
ময়না নিজের অবস্থা সম্পর্কে নিজেই অজ্ঞাত । আফতাবের হাতের স্পর্শ পোড়া জায়গায় লাগতেই ব্যাথার চোটে ঝটকা মেরে আফতাবের হাত সরিয়ে দিলো সে । খিটখিটে স্বরে বলল….
“ কইলাম আমি ঔষধ খামু না , জোর করলেন ক্যান আমারে ?
খালেদা ছুটে আসলেন ।
মেঝেতে ওভাবে ওদের কে দেখে সংকিত হলেন । বমি করেছে আবার ময়না । তিনি বললেন….
“ বউ মা ! এমনে বারবার বমি করতাছো ক্যান ? গা গুলাইতাছে এহনো ?
এবার আফতাব কে উদ্দেশ্য করে বললেন…
“ আব্বা , এমনে মুখ জবানি দিয়া ঔষধ না আইনা বউমারে ডাক্তারের কাছে লইয়া গেইলে তো পারোস । জ্বরে ভুগছে সারা রাইত । মুখ তেতো হইয়া গেছে । খাইতে পারতাছে না । এই লাইগা বমি করতাছে বারবার ।
আফতাব উঠে দাঁড়ালো । খালেদা এসে টেনে তুললেন ময়নাকে । নিজের উপর ভর করিয়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে কুলকুচি করলেন । আফতাব নির্বাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখলো ওকে । চোখ মুখো ভঙ্গিমা দুর্বোধ্য । শিথিল ভ্রু ।

সংগ্রাম সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই শ্যামা কে নিয়ে বেরিয়েছে । গেছে মাধবপুর । সেই ধরলার পাড়ে ছোট্ট কুটিরে । কুটিরের বাইরে আজ ভিড় অনেক । গ্রামের মানুষের আনাগোনা । মুখ চেপে চেপে একেকজন বাড়ির ভেতরে ঢুকছে , তো একেকজন বেরিয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে । হতাশার আফসোস সকলের চাপা স্বরে । এই আনাগোনা চলছে সেই বিকেল থেকেই । আজ কেউ ঘৃনা, উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য নিয়ে আসছে না । আসছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে । ফরিদা আর নেই । শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিকেলে । বিকেলে কি না তাও সন্দিহান । তার নড়চড় নেই সেই দুপুর থেকে । এমনিতেও অঢেল হয়ে এভাবেই পড়ে থাকেন সবসময় । আজ ও ছিলেন । নিঃশব্দে কখন প্রাণ পাখি উড়ে গেছে খোঁজ নেই । শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন কখন জানা নেই । বিকেলে মাকে সেই একই নিঃস্পন্দন অবস্থায় দেখে ফুলি বসেছিল মায়ের পাশে । ফরিদার মুখ বেঁকে গেছিলো অনেক আগে । আজ মায়ের মুখ স্বাভাবিক দেখে আঁতকে উঠেছিল ফুলি । খুশিতে চিকচিক করে উঠেছিল ওর চক্ষু জোড়া । মা সুস্থ হবে না জানা , তবে স্বাস্থ্যের পরিবর্তন আসবে,এটা অলৌকিক নয় । লৌকিক ঘটনাই ঘটেছে আজ । মায়ের এই টুকু সুস্থ পরিবর্তন দেখে বেসামাল অবস্থা হয়েছিল ফুলির ।

হাস্যোজ্জ্বল মুখে মাকে কয়েকবার ডাকলো সে । প্রথম প্রথম সাড়া পেলো না । তার পর একটু ঝাঁকিয়ে ডাকতেই সম্পুর্ন শরীর দুলে উঠলো ফরিদার । ফুলি তখনো অবুঝ । কিছুই বুঝলো না সে । এভাবে যে মা টা মরে পড়ে আছে , ধারনাও জাগে নি ।
আত্মহারা হয়ে বেশ কবার ঝাঁকিয়ে ডেকেও সাঁড়া না পেয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে পরিবর্তন আসে ফুলির । মাকে ঘোরায় নিজের দিকে । আবার ডাকে , তবুও সাঁড়া নেই ।
নির্বোধ ফুলির বোঝার ও ক্ষমতা নেই । সে তো জানে একটা মানুষ মরে গেলে আর ওর ডাকের সাঁড়া দেবে না । হাজার ডাকলেও দেবে না । অন্য সময় ডাকলে , ভেজা চোখ তুলে নির্বিকার চাইতেন ফরিদা । আজ চাইলেন না ।
নড়লেনও না একা একা । ফুলির আত্মহত্যা হৃদয় আঁতকে উঠলো অনেক পর । মায়ের সাঁড়া না দেওয়ার মানে বোঝা মাত্রই ছিটকে দূরে সরে পড়লো মেয়েটা ।
তীব্র ভয়ে ভীত হয়ে আসলো বক্ষ স্থল । কাঁপলো পুরো শরীর । শিউরে উঠলো লোম কুপ ।
ফুলি নিজেকে সামলে আবার এগোয় । ঝাঁকায় মাকে । পুরো শরীরে হাত বোলায় । ঠান্ডা হয়ে গেছে শরীর ।
মরে গেছে ওর মা । শ্বাস পড়ছে না আর । ফুলি মায়ের বুকের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে , নিঃশ্বাস নেই , নিঃশ্বাসের সাথে ওঠা নামা নেই বুকে । প্রাণ হীন মৃত দেহে স্পন্দন নেই ।

এখন সেই মৃত দেহটাকে গোসল করানো হয়েছে । চার পায়া বাহনে কয়েক টুকরো সাদা কাপড়ে মোড়ানোও হয়েছে । এবার সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হবে ওর মাকে ।
নিস্তব্ধ, নিস্তেজ হয়ে ঘরের দোরে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে ফুলি । মাথাটা এলিয়ে হাঁটুর উপর রাখা । চেয়ে আছে নিরবে । চোখে পানি নেই । তবে অঝোরে পানি ঝড়েছে এর চিহ্ন স্পষ্ট ।
ফুলির এক দৃষ্টি খাটিয়ার দিকে । পুরো পুরি মোড়ানো হয়েছে ওর আম্মা কে । মোড়ানোর আগে এক পলক দেখানো হয়েছে ফুলি কে । কি আশ্চর্য ! এর পর আর ও দেখতে পারবে না ওর মাকে । খেদমত করতে পারবে না । ওর মা আর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকবে না মেঝেতে । ফুলির পানে চেয়ে চেয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি বিসর্জন দেবে না । তার চোখ দুটো বুজে গেছে একেবারে । আর খুলবে না ।
ফুলি আর কাঁদছে না । কাঁদলে নাকি মায়ের কবরে আজাব হবে । একফোঁটা নোনা পানি মাটিতে পড়লে এরও কৈফিয়ত দিতে হবে ।

তাই কাঁদছে না ফুলি । শ্যামা ওর পিছে দাঁড়িয়ে । গ্রামের মানুষ ফুলির মাকে দেখতে এসেছে ঠিকি , তবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে শ্যামা কে । যদিও মাথায় এক হাত ঘোমটা টানা । মুখ দেখার উপায়ন্তর নেই । শ্যামা আছে বিধায় বাড়ির ভেতরে এখনো অবধি কোনো পুরুষ ঢোকে নি । এখন কাঁধে খাটরি তোলা হবে । সংগ্রাম দরজার কাছে এগিয়ে চাপা স্বরে শ্যামা কে কিছু বললো ।
ফুলি কে টেনে দাঁড় করালো শ্যামা । মেয়েটা দাঁড়ালো শ্যামার জোরে । শরীরে শক্তি নেই জোর খাটানোর । ফুলি কে নিয়ে ঘরে ঢুকলো শ্যামা । ঘরে কজন মহিলা ছিলেন । এর ওর কানে গুজুর গুজুর করে কথা বলা বলি করছিলেন । তাদের কথার প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই শ্যামা । শ্যামা বুঝতে পেরেছে তা । অনেক দিন শ্যামা কে দেখে না কেউ । যদিও ওকে খুব কম কেউই দেখেছে । আশপাশ ব্যাতীত শ্যামা কে আর কেউই দেখে নি তেমন । আজ সবাই সুযোগ পেয়েছে ।
শ্যামা ফুলি কে টেনে ঘরে আনতেই ঘরের মহিলা গুলো ঘিরে ধরলো শ্যামা কে । ফুলি কে খাটে বসালো শ্যামা । ফুলির দিকে ঠিকমতো নজর দেওয়ার আগেই একটা শক্ত হাত হেঁচকা টানে শ্যামা কে ফেরালো নিজের দিকে । সাথে মহিলা কর্কশ স্বর….

“ দেখি লো মোখলেছের মাইয়া ! কপাল খানা কত্ত্ব বড় তোর দেখি ! এই কপালে জমিদারের বউ হওয়া লেখা আছিলো । দেখি দেখি কেমন কপাল !
শ্যামা তৎক্ষণাৎ বিরক্ত হলো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই মধ্যবয়স্ক মহিলা এক টানে শাড়ির আঁচল দিয়ে টেনে রাখা ঘোমটা সরিয়ে দিলেন শ্যামার মাথা থেকে । ঘোমটার ঝটকায় আলতো করে খোঁপা করা চুল গুলো ঝাঁপিয়ে পড়লো পিঠে । কপাল আপনা আপনি গুটিয়ে আসলো শ্যামার । ঘরে না হলেও সাত থেকে আট জন উপস্থিত । শ্যামার মুখ থেকে ঘোমটা সরতেই দৃষ্টি বৃহৎ হয়ে আসলো সকলের । তৎক্ষণাৎ একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো সবাই । সামনের মহিলা টা মুখ বাঁকিয়ে বললেন ব্যাজ্ঞ করে…
“ হুনছিলাম কালা , তা কালা না হইলেও শ্যামলা । মানান ও আছে মুখে । কিন্তু আমগো জমিদারের লগে একদম মানায় নাই‌,কি কও তোমরা ?
পাশ থেকে হুকারি দিলেন সবাই ।

বিরক্ত শ্যামার বিরক্তি বাড়লো । কোন অবস্থায় কোন কথা ! সামান্য হিতাহিত জ্ঞান টুকুও নেই এদের ?
শ্যামা সবাইকে উপেক্ষা করলো , উপেক্ষা করলো সবার কথা । হাত খোঁপা করে আবার কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে নিলো মাথায় । ফুলির পাশে বসে ফুলি কে ফেরালো নিজের দিকে । দুহাতে মেয়েটার আধো ভেজা চোখ মুছিয়ে দিয়ে শান্ত আহত স্বরে বলল….
“ এমনে ঝিম ধইরা বইয়া আছোস ক্যান ? কইবি না কিছু ? কাকি রে লইয়া গেছে । সেই শেষ মাথার গোরস্থানে কবর হইবো ।
বলতে বলতে কাপলো শ্যামার নরম স্বর । ফুলি আর পারলো না নিজেকে ধরে রাখতে । এ পর্যায়ে আর কিছুই মাথায় আসলো না । ডুকরে উঠলো মেয়েটা । ঝাপিয়ে পড়লো নিজের একমাত্র সইয়ের বুকে । দুহাতে জাপটে ধরে ডুকরে উঠলো সে ।
বুক খানা মুচড়ে উঠলো শ্যামার । টলমল চোখ ছাপিয়ে পানি গড়ালো ‌। ফুলি আর্তনাদ করে উঠলো….
“ আমার সত্যিই সত্যিই আর কেউ রইলো না রে শ্যামা ! আর‌ কেউ রইলো না । একলা হইয়া গেলাম আমি ! এতো বড় দুনিয়াতে আমার আর কেউ নাই । বাপ মা কেউ নাই । কারোর ঠাই নাই দুনিয়াতে । আমারে একলা কইরা সব পালাইলো । আমি কি করমু ? বাঁচমু ক্যামনে আমি ? আমার আম্মা আর নাই শ্যামা ! মইরা গেছে । মইরা গেছে হেয় । আমারে একলা কইরা পালাইছে ।
আইজ থাইকা আর জ্বালাইবো না আমারে । আর কাঁনতে কাঁনতে গোঙ্গাইবো না । আমার শেষ সম্বল শেষ শ্যামা । আমি শেষ , শেষ আমি ।
চোখ বুজে নিলো শ্যামা । কাঁদতে দিলো ফুলি কে । ফুলি থামতেই পাশ থেকে একজন মুখ ঝামটি মেরে বলে উঠলেন…

“ এমনে কান্দোনের কি আছে ! ব্যারামি মা মরছে ভালো হইছে । বেকার বেকার ঘাড়ের উপর জ্বালা আছিলো এতদিন । বয়স তো তোর কম হয় নাই ফুলি , মায়ের জ্বালায় এহনো একখান সংসার পাততে পারোস নাই । তার উপর গায়ের রং কালা । এহন এই বয়সে আর কেডায় বিয়া করবো তোরে ?
শ্যামা চকিতে চোখ খুললো । তীর্যক দৃষ্টি পাত করলো মহিলার দিকে । ক্ষিপ্ততা দৃষ্টিতে । রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠলো শ্যামা….
“ আজব তো ! কোন সময় কোন কথা বলছেন আপনারা ? সাধারণ জ্ঞান নেই ?
মহিলা ভড়কে তাকালেন । মুখে হাত দিয়ে বলে উঠলেন…
“ ও মা গো মা ! এই মাইয়ার দেখি তেজ ও আছে । জমিদারের বউ হইয়া দেমাগ বাড়ছে । ক্যামনে কটমটাইয়া ঝাই ঝাই কইরা কথা কইতাছে দেখ !
তাল মেলালো সকলে । ফুলি নাক টেনে হেঁচকি তুললো । মুখ চেপে চুপসে গেলো সে ।
অন্য একজন মহিলা বলে উঠলেন….
“ দেমাগ হইবো না ? জমিদারের বউ এখন হেয় ! বামন হইয়ি আসমানের চাঁন হাতে পাইছে । মাটিতে তো পা পড়বোই না ।
শ্যামা স্বাভাবিক করলো নিজেকে ।

“ দেখেন কাকি । এখানে এসব কথা বলার জায়গা নয় । মরার বাড়ি এটা । আপনাদের কূটকাচালি করার জায়গা নয় । অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি মুখ চেপে কানাকানি করছিলেন । আমাকে নিয়েই হোক বা অন্য কাউকে নিয়ে । দেখতে চেয়েছিলেন তো আমায় ? দেখেছেন ! এবার এখান থেকে যেতে পারেন । মা মরা একটা মেয়েকে সহানুভূতি দেখাতে না পারলে উত্যক্ত ও করবেন না ।
সবার মাঝে রোল ফেটে পড়লো ।
“ মুখের চোপা দেখছো মেয়ের ?
“ হ তো , দেখতাছি ! কমু অলকা রে গিয়া । হেয় তো জানে না হের মাইয়ার অহংকারের কথা ! চাঁন্দে উঠলে মাইনষের অহংকার বারে । গায়ের রংয়ের নাই শ্রী , আর অহংকার দেখলে বাঁচি না ।
চলো গো এইখান থাইকা । জমিদারের বউ , বেশি কিছু কওন যাইবো না । পরে নাইলে আমগোর নামে নালিশ ঠুকবো জমিদারের কাছে । চলো চলো…..

নিজেদের মাঝে গজগজ করতে করতে একে একে বেরিয়ে গেলেন সবাই । ফাঁকা শান্ত হলো পুরো ঘর । শ্যামা তপ্ত শ্বাস ফেললো । কি এমন হলো হঠাৎ ? এতোটা চড়াও হয়ে উঠলো ওর মেজাজ ! ও তো এমন শক্ত নয় ।
শ্যামা ভাবলো না । মনযোগ দিলো ফুলির দিকে । ফোপাচ্ছে ফুলি । শ্যামা হাত রাখলো ওর মাথায় । ধীরে বললো….
“ কাঁনতে নাই ফুলি ! চুপ কর ! মানুষ তো সারাজীবন থাকার লাইগা দুনিয়ায় আহে না । মানুষ আসে ক্ষনিকের লাইগা । ক্ষনিকের মোহ জাগাইয়া চইলা যায় । মাইনা নিতে পারলে মোহ কাটানো যায় । কাকি কতো অসুখে আছিলো ক ? শান্তি পায় নাই দুনিয়ায় বাঁইচা । এখন দোয়া কর , যেন আল্লাহর কাছে গিয়া একটু শান্তিতে থাকতে পারে । আল্লাহ যেন হেরে জান্নাত নসিব করেন । কাঁদিস না এহন….

আমি আছি তো তোর লাইগা ।
শ্যামা জানে আহাদের বিষয়ে । আজই জেনেছে । আহাদের বউটাকে দেখলো এখানে এসে । বেশ সুন্দর । আহাদ ফরিদার খাটিয়া ধরেছে । অধিকার রাখে সে । ওর বউটাকে ওর মা নিয়ে গেলো টেনে টুনে ।
একবার অলকার চিন্তা ও মাথায় এসেছে । তিনি আসলেন না যে ফরিদা কে দেখতে ? খবর তো পৌঁছেছে নিশ্চয়ই । আর খবর পেলে তো আসার কথা ! তাহলে কি হলো ?
ফুলি ঘাপটি মেরে রইলো শ্যামার বুকে । বুক চিরে যাচ্ছে ওর । ডুকরে ডুকরে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ।

রাতের রান্না বান্না শেষ । সুরবালা নিচ থেকে উপরে উঠলো । বিবস মুখে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা অংকুর কে দেখতে পেলো । মাথায় সাদা ধবধবে মোটা ব্যান্ডেজ । চিত হয়ে শুতে পারছে না সে । পিছনের দিকে ব্যান্ডেজ ভেদ করে খানিক লাল রক্তের ছাপ দেখা যাচ্ছে ‌। সুরবালার মুখখানা আহত হয়ে আসলো । আজ হয়তো অংকুরের জায়গায় ও নিজে থাকতো ।
ঘুমিয়েছে অংকুর । সুরবালা ধীর পায়ে এগিয়ে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো । একটু হেলে অংকুরের মুখখানা দেখার চেষ্টা করলো । কিন্তু দেখা গেলে তো ! বাবড়ি চুলে ঢেকে তার মুখ । সুরবালা গলা খাঁকারি দিলো । ডাকলো ধীরে….
“ শুনছেন ?
সাঁড়া নেই । ঘুমিয়ে অংকুর । সুরবালা আবার ডাকলো…
“ এই যে বাবড়ি ওয়ালা , শুনছেন ?

এবার ও হুস নেই । সুরবালা এভাবে আরো দুই একবার ডাকলো । সাঁড়া না পেয়ে নিঃশব্দে দুরত্ব রেখে বসলো খাটের উপর । অংকুর খাটে ঘুমায় না আজ কতদিন । সোফাতেই আরাম হীন ঘুমায় অভিযোগ ছাড়া । সেবার জবা দেখতে দেখতে বেঁচে গেছে । ঘরে আসার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল অংকুর ।
আজ অনেক দিন বাদ আরামছে শরীর ছড়িয়ে খাটে শুয়েছে । আরাম আর কোথায় ? ঐ মাথা যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়েছে ।
সুরবালা অংকুরের দিকে হাত বাড়িয়েও আবার সরিয়ে নিলো । ইতস্তত সে । খানিক বাদ ইতস্ততা কাটিয়ে ধীরে অংকুরের কোমল চুলে হাত রাখলো । মৃদু হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । কয়েক বার হাত বুলিয়ে দিলো চুলে । অতঃপর ঝট করে হাত সরিয়ে ডাকলো….

“ বাবড়ি ওয়ালা , উঠুন । ডাকছি কখন থেকে ! উঠুন না….
এবার নড়েচড়ে উঠলো অংকুর । পাতলা ঘুম ভেঙ্গেছে সেই প্রথম ডাকেই । সে প্রতিক্ষায় ছিলো সুরবালার পদক্ষেপ দেখার । নড়ে চড়ে উঠে খানিক কাতর স্বরে বলল অংকুর…
“ কি হয়েছে ? ডাকছো কেনো ?
“ উঠবেন না ? খাবার তৈরি । খেয়ে ব্যাথার ঔষুধ খেতে হবে । নিচে চলুন !
“ খাবো না । তোমরা গিয়ে খেয়ে নাও ।
“ খাবেন না মানে ? উঠুন বলছি , খেয়ে ঔষধ খেতে হবে তো । মাথা ফাটিয়ে রেখেছেন ! কে বলেছিল আমার সামনে আসতে ? আঘাত লাগলে আমার লাগতো,আমি ব্যাথা পেতাম । আপনার তো কিছু হতো না । আপনি কেনো আমার জায়গায় আসতে গেলেন ?

“ আমি কি তোমাকে আঘাত পেতে দেখার জন্য বিয়ে করেছি নাকি ? তোমাকে বিয়ে করেছি আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য । আমি থাকতে একটা ফুলের টোকাও লাগবে না তোমার শরীরে ।
আমি আছি কি করতে ? সব আঘাত আমার উপর বর্তাক , তুমি আঘাত হীন শুভ্র অলকানন্দা হয়ে থাকো ।
সুরবালা কিঞ্চিত থমকায় । উঠে বসে অংকুর । মাথাটা কেমন টান ধরেছে । সুরবালা গলা নামিয়ে বলে…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৪

“ নিচে চলুন । খাবেন !
“ খিদে নেই ।
“ আমি রেঁধেছি !
অংকুর তাকাতেই চোখাচোখি হয় দুজনের । অংকুর খানিক স্তব্ধের ন্যায় চেয়ে থেকে নিদারুণ শীতল কন্ঠে বলে….
“ তোমরা গিয়ে খেয়ে নাও । আমার খাবার উপরে নিয়ে এসো । খিদে পেলে খেয়ে নেবো আমি !

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৬