Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৯
সুরভী আক্তার

মাঝে আরো একটা দিন কেটেছে । আজ দুদিনের মাথায় ভোর হতে না হতেই আলো ফোটার আগেই সংগ্রাম শ্যামা কে নিয়ে মাধবপুরের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে । এখনো আশপাশ আবছা । পূর্ব দিগন্তে সূর্যি উঁকি দেওয়ার ফুরসৎ খুঁজছে সবে । শ্যামা বারবার মলিন মুখে সংগ্রামের দিকে তাকাচ্ছে । গাড়ি চালাতে ব্যাস্ত সংগ্রাম । শ্যামা মনের কোণে জেঁকে বসা প্রশ্ন টা করেই ফেললো….
” এতো সকাল সকাল যাওয়ার কি আছে ? একটু দেরি করে আলো ফোটার পর গেলে কি এমন হতো ?
সংগ্রাম জবাব দিলো সহসা….
” একটু দেরি হলেই মানুষজন সবাই জেগে যাবে । এখন গুটি কয়েক । তোমার উপর কারোর নজর পড়ার ভয় নেই ।

শ্যামা কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো । কন্ঠ নালিতে আরো একটা প্রশ্ন এসে আটকে গেছে । যদিও এটা শ্যামার মনের বৃথা সংশয় । সে জানে এই প্রশ্ন করলে সংগ্রাম খানিক রেগে যাবে ‌। শ্যামা যা বলতে চলেছে ‌, তা সংগ্রাম মোটেও পছন্দ করবে না । তবুও শ্যামার জানতে ইচ্ছে হয় । সংগ্রাম শ্যামা কে নিয়ে কোথাও বেরোলে রাতের সময়টা বেছে নেয় । আর নয়তো ঠিক ভোরের সময়টা । উভয় লগ্নই অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে । অর্থাৎ যে সময়ে কেউ আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে না , প্রায় জনশূন্য থাকে আশপাশ,ঠিক সেই সময়টায় শ্যামাকে নিয়ে বেরোয় সংগ্রাম ।
কেনো এই সময়টা বেছে নেয় ? শ্যামাকে লুকায় কেনো সবার দৃষ্টি থেকে ? শুধুই কি গায়রত হিসেবে ? প্রশ্ন জাগে শ্যামার মনে । আবার না চাইতেও এই প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তর খুঁজে নেয় মন ।
শ্যামা ভাবতে চায় না তা , তবুও ভাবনায় আসে ।

শ্যামা আলতো করে অধর ভিজিয়ে নিলো । মিনমিনিয়ে অবশেষে বলেই ফেললো….
” আমি কালো , দেখতে অতটা সুন্দর নই , আপনার সাথে আমাকে কম মানায় , আমাকে চাঁদের কলঙ্ক মনে হয় আপনার পাশে , আমাদের সৌন্দর্যের রঙে আকাশ পাতাল তফাৎ — এ কারনেই সবার চোখ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন আমায় ? লুকিয়ে রাখেন এজন্যই ? যাতে কেউ তাদের জমিদারের কালো স্ত্রী কে দেখতে না পারে , তাইই ?
শ্যামার কথা শেষ কি হলো না , আকস্মিক গাড়িতে ব্রেক পড়লো । ধুলো ওড়া গ্রামের গর্ত যুক্ত রাস্তায় দ্রুতবেগে থামলো গাড়ির চারটে চাকা ।
গতীতে বাঁধা আসতেই জড়তার দরুন সামনের দিকে ছিটকে পড়তে নিলো শ্যামা । তবে পড়লো না । শ্যামার সম্মুখে হাত অগ্রসর করে শ্যামা কে টেনে ধরলো সংগ্রাম । শ্যামা শিহরিত হলো । ঝলকানি দিয়ে তাকালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রামের চোখের আগুন এক নিমিষেই যেনো নিভলো দপ করে । দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো সংগ্রাম । চোখ বুজে গলা ভিজিয়ে নিজেকে সংযত করলো । নিয়ন্ত্রণ করলো ক্ষুব্ধতা । কেননা তার বেগমের জন্য শুধুই তার ভালোবাসা প্রকাশিত হবে , ক্ষুব্ধতা নয় ।
শিথিল হলো সংগ্রাম । শ্যামা চৈতন্যে ফিরে ধীর কন্ঠে ডাকলো….

” ছোট জমিদার সাহেব ?
সংগ্রাম চোখ খোলে । রক্তিম চোখ তার । শ্যামার পানে তাকায় সেভাবেই । অতীব নরম কন্ঠে আফসোসের স্বরে বলে…..
” হয়তো তোমাকে বোঝাতে আমি ব্যার্থ বেগম ।
এসব মনে ধারনা করে পুষে তুমি যতটা ব্যাথা পাও , এসব আমার সামনে প্রকাশ করলে তোমার তুলনায় অধীক ব্যাথা পাই আমি । বিশ্বাস করো , ভীষণ ব্যথা পাই । মনে হয় , আমি হয়তো তোমাকে ভালবাসতে খামতি রেখেছি কোনো । অথবা নিজের ভালোবাসা বোঝাতে ব্যার্থ হয়েছি এতো দিনেও । তাইতো তোমার ধারনায় জন্মায় এসব । ঠিক না ? সন্দেহ করো আমার ভালোবাসায় ? ব্যার্থ আমি ??
অসহায় কন্ঠ । শ্যামা তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নাড়ালো..
” আমি সেভাবে বলতে চাই নি ছোট জমিদার সাহেব ! আপনার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার । আপনি বিশ্বাস করুন , আমি শুধু এমনি এমনি বললাম । ব্যর্থ নন আপনি । কোনো খামতি নেই আপনার ভালোবাসায় ।
” সেটা আমার বোঝা হয়ে গেছে ….

ছোট্ট বাক্য উচ্চারণ করে ফের গাড়ির ইঞ্জিন চালু করলো সংগ্রাম । নির্বিকার ভাবে শ্যামার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো । শ্যামা পরিতাপে আঁতকে ওঠে । ওর নিজের ভাবা ভুল ধারণার জন্য সংগ্রাম কষ্ট পেলো ?
শ্যামা মনে মনে নিজের উপর ক্ষুব্ধ হয় । হাত মুঠো করে গালিগালাজ করে নিজেকে । সে যে জানতো সংগ্রাম এসব শুনতে নারাজ , মোটেও পছন্দ করে না । তাও কেনো এসব বলতে গেলো শ্যামা ?
সংগ্রাম গাড়ি ধীরে চালাচ্ছে । সামনে থেকে মাধবপুর গ্রামের শুরু । শ্যামা করুন চোখে সংগ্রামের দিকে তাকালো । নিজের স্থান থেকে চেপে আসলো সংগ্রামের দিকে । আলতো করে সংগ্রামের পেশি বহুল শক্ত বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখার চেষ্টা করলো । অমনি সংগ্রামের কাঠ স্বর ভেসে আসলো…..
” গাড়ি চালাচ্ছি , বিরক্ত করো না ।
সহসা মাথা তুলে চায় শ্যামা । অনুতপ্ত নরম স্বরে বুলি ফুটায়..

” দুঃখিত ছোট জমিদার সাহেব , আমি আর কক্ষনো এসব এভাবে বলবো না । এবারের মতো ক্ষমা করে দিন ।
সংগ্রামের হালচাল নেই । একটা কথাও উচ্চারণ করলো না আর । শক্ত চোয়ালে রাস্তা পানে চেয়ে রইল । শ্যামা উত্তরের আশায় থেকে আবার বললো…..
” ও জমিদার বাবু , বলছি তো ভুল হয়ে গেছে । আর কক্ষনো এ ভুল করবো না । আমি জানি আপনি আমাকে খুব ভালোবাসেন , তাই সবার থেকে লুকিয়ে রাখেন আমাকে । আপনি তো শ্রেষ্ঠ স্বামীর দায়িত্ব পালন করেন । আমাকে ভালোবেসে আগলে রাখেন সবার অগোচরে ।
” ভালোবাসি না আমি তোমায়….
সংগ্রামের কন্ঠে রুক্ষতা । শ্যামা মলিন মুখ তুলে অসহায় কন্ঠে বললো….
” এভাবে বলবেন না ছোট জমিদার সাহেব । আপনার ভালোবাসা হীনা আমার যে আর কিচ্ছু নেই । আমি বেঁচেই আছি আপনার ভালোবাসার জোরে । এভাবে কেউ কোনো দিন ভালোবাসে নি আমায় , কেউ কোনো দিন স্বপ্ন দেখায় নি । আপনার মতো অঢেল ভালোবাসায় কেউ মুড়িয়ে নেয় নি আমায় । যেখানে আমি আপনার ভালোবাসার স্বীকারোক্তিতেই গলে জল হই , সেখানে আপনার ভালোবাসা পেলে মিলিয়ে যাই আমি । আপনার মুখে ভুল করেও ‘ভালোবাসি না’ শব্দটা যেন মরার আগ অবধিও কর্নপাত না হয় আমার । আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা শেষ হওয়ার আগেই যেন মরন হয় আমার ।
সংগ্রাম পরিপ্রেক্ষিতে মনে মনে আওড়ালো…..

” তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা কখনোই শেষ হওয়ার নয় , বেগম ।
পথিমধ্যে নীরবতা চলেছে । শ্যামার প্রত্যুত্তরে সংগ্রাম আর একটা কথাও বলে নি । শ্যামা ও মুখ করুন করে বসে আছে । বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো । আলো ফুটছে । অলকা উঠে পড়েছেন এতক্ষণে । দেউড়ির দরজা চাপানো । অন্যদিন হলে, সংগ্রাম আগে গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে গিয়ে শ্যামা কে নামায় হাত ধরে । তবে আজ হিতে বিপরীত হলো । গাড়ি থামিয়েই চড়া গলায় বলল সংগ্রাম….
” নামো !
মুখখানা আরো বেশি চুপসে যায় শ্যামার । এক মুহুর্ত বসেই থাকে । একটু পর নামে গাড়ি থেকে । মাটিতে পা রেখে সংগ্রামের দিকে ফিরে বলে….
” আপনি নামুন ।
” আমি যাবো না , তুমি যাও । বাপের বাড়িতে আসতে চেয়েছিলে , নিয়ে এসেছি । ইচ্ছে যতদিন, ততদিন আঁশ মিটিয়ে থাকো । বাঁধা দেবো না । আমি গেলাম ।
বলেই শ্যামা কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গাড়ি চালু করলো সংগ্রাম । এর মধ্যেই গাড়ির শব্দ পেয়ে খিড়কি খুলে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে এসেছেন অলকা । ছটফটিয়ে এগিয়ে আসলেন তিনি । সংগ্রাম খানিক দমলো । মুখে হাসি ফুটিয়ে অলকা কে সালাম দিতেই, হাসি মুখে উত্তর করলেন অলকা । শ্যামার মুখখানা কালো দেখে ভ্রু গুটালেন । বললেন সংগ্রামের দিকে চেয়ে….

” কেবলই তো আইলা বাপ , গাড়ি চালু করলা ক্যান ? ভিতরে আইবা না ? বইবা না ? শ্যামা কে একলা রাইখা এমনে বাড়ির বাইরে থাইকা চইলা যাইবা ?
” আপনার মেয়ে আসতে চেয়েছিলো আম্মা । তাই নিয়ে আসলাম । এখন আমার বসার সময় হবে না । এখন আসি ? আপনার মেয়েকে আপনার হেফাজতে রেখে যাচ্ছি । খেয়াল রাখবেন ।
অলকা বুঝলেন না ।
শ্যামা এখনো অসহায় চোখে সংগ্রামের দিকে ছোট ছোট নেত্রে চেয়ে আছে । সংগ্রাম অলকার থেকে চোখ ফিরিয়ে শ্যামার দিকে তাকালো । নরম কন্ঠ শক্ত করে শ্যামার উদ্দেশ্যে বললো….
” আসছি আমি । পরে আবার আসবো ।
বলেই গাড়ি ঘোরালো । পিটপিট করে ওষ্ঠ উল্টে তাকিয়ে রইল শ্যামা । সংগ্রাম ওর উপর রেগে গেছে ?
গাড়ি এগোলো কিছু দূর । শ্যামা আর অলকা তাকিয়েই রইলো । কয়েক কদম দূরে গিয়ে আকস্মিক থামলো গাড়িটা । সংগ্রাম পিছু ফিরলো শরীর হেলিয়ে । অমনি ছ্যাঁত করে উঠলো শ্যামা । সংগ্রাম সোজাসুজি শ্যামার দিকে দৃষ্টি রেখে ওষ্ঠ প্রসারিত করে মুগ্ধ চিত্তে নিদারুণ হাসলো । অলকার উপস্থিতিকে তুচ্ছ ধরে গলা বাড়িয়ে সেখান থেকেই বলে উঠলো….

” বেগম শুনছো ,, ভালোবাসি ! ভীষণ ভালোবাসি তোমায় । এখন যাচ্ছি , পরে আবার আসবো ।
অমনি ফিক করে লাজুক ভঙ্গিতে হেসে ফেললো শ্যামা । এতক্ষণে বুকের উপর জমা সব ভার , জটিলতা হালকা হলো নিমিষেই । ফুরফুরে হয়ে গেলো ডালিয়া । এক পর্যায়ে হাসির মাত্রা বাড়লো । খানিক শব্দ হলো হাসিতে । ইচ্ছে হলো এক ছুটে গিয়ে সংগ্রামকে জড়িয়ে ধরতে । কিন্তু ওকে আটকে ফেললো জড়তা । সংগ্রাম কথা গুলো বলেই আবার হেসেছে । জিপ চালু করে ছুটিয়ে নিয়ে গেলো সে । শ্যামা তাকিয়েই রইলো পিছন থেকে ।
এদিকে অলকা তাজ্জব হয়ে ভুত বনে তাকিয়ে আছেন । মেয়ে জামাইয়ের কান্ড বুঝতে সময় লাগলো তার । জিপটা চোখের অগোচর না হওয়া অবধি তাকিয়ে রইল শ্যামা । অতঃপর দৃষ্টি ফিরিয়ে অলকার পানে তাকাতেই থতমত খেলো । অলকা বড় বড় চোখে চেয়ে আছেন । ভিমড়ি খেলো শ্যামা । দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিলো । মন ফেরাতে প্রসঙ্গ ঘেঁটে বললো মিনমিন করে…..
” ভালো আছো আম্মা ?
নিঃশব্দে হেসে ফেললেন অলকা । মেয়ের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বললেন….
” হ , ভিতরে চল এহন ।

ময়নার দুটো পরীক্ষা শেষ । আজকেও বন্ধ আর আগামী কালও ‌। গনিত পরীক্ষার আগে দুটো দিন ছুটি পেয়েছে । এই নিয়ে ওর মাতামাতির শেষ নেই । সব সময় পড়তে হচ্ছে না । আফতাব ও বাড়িতে নেই । ঘুম থেকে উঠেই ক্ষেতে গেছে । ওকে পড়তে বসতে বলছে না কেউ । খালেদা রান্না বসিয়েছেন । ময়না উঠোনে নাচানাচি করছে এক প্রকার । শাড়ির আঁচল কোমরে বেঁধে একখানা গুটি নিয়ে ছক টেনে কুতকুত খেলছে । খালেদা কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওর ছেলে মানুষি পনা দেখে হাসছেন মিটিমিটি । বারবার সাবধান ও করছেন । আফতাব কিছুই খেয়ে বেরোয় নি । এর মধ্যেই বাড়ি ফিরে খাবে ও । আসবে যখন তখন । ময়না কে এভাবে লাফা ঝাপা করতে দেখলে ধমকাবে নিশ্চিত ।
ময়না খালেদার সাবধানী সতর্কতা শুনলে তবেই তো ! সে নিজের মতো উড়ছে । ডানা থাকলে আকাশে পাখনা মেলে উড়তো এতক্ষণে । আজ ভীষণ ফুরফুরে লাগছে নিজেকে । অন্তত দু’দিন পরীক্ষার ঝামেলা থেকে মুক্ত ।
আফতাব নিঃশব্দে উপস্থিত হয়েছে দেউড়ির কাছে । বেলা হতেই খেতে এসেছে ‌। এসেই থমকেছে এই মেয়ের চঞ্চলতা দেখে । ময়না এক পা তুলে লাফিয়ে লাফিয়ে গুটি খেলছে । আফতাব চোখ ছোট করে কয়েক মুহূর্ত পরখ করলো ওকে । অতঃপর চেচালো উপস্থিতি জানান দিতে…

” আম্মা !!
সহসা গুটি খেলতে থাকা চঞ্চলা মেয়েটা ভড়কায় । চোখ তুলে এক পলক তাকায় ছ্যাত করে । আফতাবের দৃষ্টি ওর নিজের দিকে নেই , এটা ঠাহর করা মাত্রই শাড়ি উঁচিয়ে ভোঁ দৌড় লাগায় ঘরের দিকে । খালেদা ওর কান্ডে মুখ টিপে হেসে উঠলেন । এখন এই মেয়ে ভয়ের চোটে বই নিয়ে বসবে । খালেদার ধারনা মতে , ভাঙিস আফতাব লক্ষ্য করে নি । নয়তো ধমক খেতো এক্ষুনি । খালেদা ময়নার থেকে চোখ ফিরিয়ে সাঁড়া দিলেন ছেলের ডাকে । আফতাব বললো….
” খাবার বাড়ো , ক্ষিদে পেয়েছে । আমি হাত মুখ ধুয়ে আসছি ।
কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে ভেজা হাত মুখ মোছার উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকলো আফতাব । টেবিলের দিকে দৃষ্টি যেতেই ভ্রু কুঁচকে আসলো । বই বের করে বসে আছে ময়না । বড্ড পড়ুয়া মেয়ে এসেছে । কত মনযোগ দিয়ে পড়ছে মেয়েটা । আফতাব গামছা তুলে মুখ মুছতে মুছতে এগোলো , কপাল খানা কুঁচকে এলো আরো বেশি । ময়না চোখ তুলে তাকিয়ে দাঁত কেলালো । ঘেমে গেছে এতক্ষণে । শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছলো ময়না । আফতাব জিজ্ঞেস করলো ভরাট কন্ঠে…..

” কতক্ষন ধরে পড়ছো ।
ঢোক গিলে আমতা আমতা করে হাতে গুনে উত্তর করলো ময়না…..
” অ…অনেক্ষণ । হিসাব করি নাই তো ।
” আচ্ছা ? হিসেব করো নি ?
মাথা নাড়ায় ময়না । চোখে কেমন ভয় ‌। আফতাব বোধহয় হাসতে চাইলো ওর অবস্থা দেখে , তবে হাসলো না । সংবরণ করলো হাসি । হাত বাড়িয়ে ময়নার সামনে থেকে বইটা তুলে উল্টে পাল্টে দেখলো । ভ্রু যুগল জড়ো করে সন্দিহান ভঙ্গিতে বললো….
” তোমার তো দুদিন পর অংক পরীক্ষা । তুমি ইংরেজি বই খুলে বসে আছো কেনো ? ইংরেজি পরীক্ষা তো শেষ হয়ে গেছে ।
বিরাট ঝটকা খেলো মেয়েটা । ছোট ছোট অক্ষি যুগল‌‌‌ কোটর ফেটে বেরোলো । এই রে , হাতে নাতে ধরা পড়ে গেলো । ঝটপট না দেখেই চোখের সামনে যে বইটা পেয়েছে , সেটাই সামনে নিয়ে বসে পড়েছে ময়না । এটা ইংরেজি বই লক্ষ্যই করে নি । আফতাব তো ধরে ফেললো ওকে । এবার কি হবে ? ফ্যালফ্যাল করে পিটপিট অক্ষি তুলে তাকালো ময়না । আফতাবের রুক্ষ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে পিলে চমকালো । পিছিয়ে ঢোক গিলে ওষ্ঠ উল্টালো মেয়েটা । মিনমিন করতে ধরলো….

” ঐ …আসলে…আমি ।
আফতাব এগোলো । প্রশ্ন করলো….
” ঐ আসলে আমি,কি ?
” না.. মানে ?
কথা শেষ হওয়ার আগেই আফতাব বাম হাত বাড়িয়ে মেয়েটার বাম কান মুচড়ে ধরলো । ক্ষিণ ব্যাথতেই ছটফটিয়ে উঠলো ময়না ! আফতাবের হাতের উপর হাত উঠিয়ে কান ছাড়ানোর চেষ্টা করলো ।
আফতাব জোর পূর্বক রাগ দেখিয়ে বললো দাঁত খিচে….
” ফাঁকিবাজি করছো ? মিথ্যে বলছো আমায় ?
প্রত্যুত্তরে করুন স্বরে বলে ময়না….
” ভুল হইয়া গেছে , আর ফাঁকিবাজি করমু না ! ছাইড়া দেন এইবার । লাগতাছে আমার….
” আমি তো জোর খাটিয়ে ধরিই নি , এতেই লাগছে ?
” হ , যারা কখনো ব্যাথা দেয় না , শুধু ভালোবাসে , তাগো সামান্য ফুলের টোকাতেও ব্যাথা লাগে ।
আফতাব কান ছেড়ে দিলো । চোখ সরু করে তাকিয়ে আলতো স্বরে বলল….
” আমি তোমাকে ভালোবাসি ?
” বাসেন না ?

করুন শোনালো ময়নার প্রশ্ন সূচক কথাটা । আফতাব ঘাড় উঁচায় । উত্তর করে না ! ময়না এক মুহুর্ত চুপ থাকলো । চোখ সরিয়ে অদ্ভুত চাপা কষ্টে মুখ ফুটালো….
” ভালোবাসেন না । কিন্তু আপনার কাছ থাইকা তো কখনো ব্যাথা পাই নাই । এই লাইগা অভ্যাস নাই । এই টুকুতেই লাগে তাই । কিন্তু আপনার ভাইয়ের কাছ থাইকা অনেক ব্যাথা পাইছি , জানেন ? আমারে মারতো খুব । প্রকাশ্যে দুই বেলার মার আপনারা দেখছেন । বাকি গুলা তো দেখেন নাই । দিনের তিন বেলার মধ্যে হাজার বার মারতো উনি আমারে । তখন খুব লাগতো ‌। শরীর জ্বলতো । এহন কয়দিন থাইকা কারোর মাইর গায়ে পড়ে নাই তো । শরীরে জ্বলন নাই আর ।
ময়না থেমে গেলো । নিজের মাঝে হাসলো । ডান দিক থেকে সামনে চোখ তুলতেই আঁতকে উঠলো । আফতাব শক্ত চোয়ালে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । ভড়কালো মেয়েটা । শুষ্ক ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিলো ।
তড়িঘড়ি করে আফতাব কে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরোলো কোনো রকমে ।

দুপুরের সময় রহিম করিম বাড়ি ফিরেছে । দুই ভাই গোসল সেরে বসেছে খেতে । ওদের মা বাড়িতে নেই । গেছে হয়তো পাশের বাড়িতে । অবশ্য ফুলি আসার পর অনেকটা রেহাই পেয়েছেন তিনি । পাড়া বেড়াতে পারেন টইটই করে । ফুলিটা একলাই থাকে সারাদিন । দিন রাত মিলে গুনে গুনে দশটা কথাও বলে কিনা সন্দেহ । করিম যতক্ষণ থাকে , ততক্ষণ সে নিজে নিজেই বকবক করে , ফুলি পাত্তা দেয় না ।
দুই ভাই কে খেতে দিয়েছে ও । দিয়ে সামনেই বসে আছে ‌। মুখে খাবার তুলে করিম ওর দিকে তাকালো । শুকনো মুখখানা দেখে শুধালো…..
” খাইছো ?
নির্বিকারে হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকায় ফুলি । অথচ খায় নি এখনো । করিম ভ্রু গুটিয়ে নিলো । মেয়েটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে সে , বাহানা খোঁজে , কিন্তু এই মেয়ে মাথা ঝাঁকানো ব্যাতীত মুখে টু শব্দও করে না । করিম মনে মনে বিরক্ত হয় । রহিম দুজনকে এক পলক করে দেখলো । খেতে খেতে বললো চাপা স্বরে…..

” ভাবি , জরিনারে দেখছো ?
ফুলি কপাল কুঁচকিয়ে উচ্চারণ করলো….
” কোন জরিনা ?
” আমগো গ্রামের । ঐ যে পাশের বাড়ির ‌। তোমার লগে দেহা করতে আহে নাই ? আমগো বাড়িত আহে তো মাঝে মাঝে ।
ফুলির মনে পড়লো । মাঝে মাঝে একটা মেয়ে আসে ‌। ফুলির সাথে কথাও বলে ভাব জমিয়ে । নামটা বলেছিলো প্রথম দিন । ফুলি ভুলে গেছে । এখন মনে পড়লো । চকিতে বললো….
” হ‌, মনে পড়ছে । দেখছি তো !
” ওরে তোমার কেমন লাগে ?
” ভালোই তো ।
” ওরে জ্বা বানাইবা ?
ফুলি খানিক বিস্মিত হলো । রহিম লজ্জা লজ্জা মুখে বললো….
” আমার একখান সেটিং করাই দেও না ভাবি । আমি বিয়া করুম । আমার কি বিয়া করতে ইচ্ছা করে না , কও ? জরিনারে ভালো লাগে আমার , আমি জানি হেতিও আমারে পছন্দ করে । খালি আম্মারে লইয়া ভেজাল । আম্মারে একটু মানাইবা তুমি ?

” আম্মা ? আর আমি ? আম্মা আমার কথা শুনবো ?
” ঠিক শুনবো । একবার কইয়া দেহো না । সরাসরি কইবা না । ঘোর প্যাঁচ কইরা ইঙ্গিতে বুঝাইবা একটু । বুঝাইবা হের ছোট পোলা আর ছোট নাই । বিয়া করবার চায় ।
ফুলি এবার একটু হেসে ওঠে । হাসি চেপে বলে…
” আইচ্ছা কমু ।
করিম ফুঁসলো চোখ পাকিয়ে । এই ফুলকপি ওর কথার উত্তরে টু শব্দও করে না , আর এই খাসির কথায় হাসছে ? বাহ্ বাহ্ । বিড়বিড় করলো করিম…..
” খালি খাওন শেষ কর খাসি , এর পর তোরে খাইতাছি আমি । আমার বউয়ের লগে ভাব জমাইতে আইছোস ? তোর বিয়া দিতাছি , খাড়া ।

মাগরিবের আজান পড়েছে । মা মেয়ে নামাজ সেরে বসেছে চুলার পাড়ে । অলকা রাধছেন, আর শ্যামা বসে আছে । টুকটাক কথা হচ্ছে দুজনের মাঝে । জমিদার বাড়ির কথা মাকে শোনাচ্ছে শ্যামা । কাকড়ি বুড়ি ঘরে । এই ক’মাসে বুড়ির শরীর ভেঙ্গে গেছে । চলতে পারেন না তেমন । লাঠি নিয়ে ঠুকঠুকিয়ে চলেন । শ্যামা এসেছে থেকে বুড়ি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন । কটাক্ষ করেছেন শ্যামা কে । এটা তো স্বাভাবিক । সময় বদলেছে , শ্যামা সরে গেছে এ বাড়ি থেকে , তবুও বুড়ির চিন্তা ভাবনা , তেজ আর কুচক্রী মস্তিষ্কের ক্ষোভ কমে নি ।
ঘর থেকে লাঠিতে ভর করে ঠুকঠুক করে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসলেন তিনি । শরীরের চামড়া, চোয়াল ঝুলে এসেছে । শ্যামা ফিরে তাকাতেই গজগজ করার চেষ্টা করে বললো বুড়ি……
” ঐ মাইয়া , জমিদারের হাঁড়িতে খাইয়া , ভোগ বিলাস কইরা ভালোই তো শরীরে চর্বি জমাইছোস । এহন এইহানে কিল্লাইগা আইসোস অন্ন ধ্বংস করতে ? শশুর বাড়ির খাওন ফুরাইলো এতো তাড়াতাড়ি ?
শ্যামা মুখখানা ছোট করলো । অলকাও মুখ কুঁচকে ফেললেন । শুরু হলো সবে । সকাল থেকে ইতোমধ্যে দুবার বকবকিয়ে কথা শুনিয়ে গেছেন বুড়ি । অলকা মুখ বুজে সহ্য করেছেন । কথা বাড়ানো মানে বেকার বেকার মুখ খরচ । শ্যামা তো সবসময় মুখ চাপা । সে কিছুই বলবে না । বৃথা হাঁফ ছাড়বে কেবলই ।
বুড়ি আবার রুক্ষ স্বরে বললো তাচ্ছিল্য করে….

” হুহহহহ , সকাল সকাল শশুর ঘর থাইকা একলা এই বাড়িতে আইসোছ , ব্যাপার খান কি ক দেহি ? তোরে আবার তাড়ায় দেয় নাই তো ঐ বাড়ি থাইকা ? আশ মিটলো জমিদারের পোলার ?
শ্যামা মুখ বিকৃত করে উঠে দাঁড়ালো এবার ।
” ভালো ভাবে কথা কও দাদি ।
” ভালো ভাবে কি কমু ? উচিত কথা কইলে গায়ে লাগে ? সাহস তো ভালোই হইছে দেখতাছি , এমনে ফোঁস কইরা ফনা তুইলা উঠলি !
গায়ে পায়ে তো গয়না গাটি দেখতাছি না । জমিদার কি খালি হাত পায়ে রাখে তোরে ? এই তুই জমিদারের বউ ? কই ভাবছিলাম , জমিদারের বউ হওয়ার পর সোনা গয়না দিয়া কালা চামড়া খান মুড়াইয়া দিবো একটু । তা না , এতো কোনো শ্রী নাই দেহে ।
শ্যামার হাতে দুটো চিকন চুড়ি । আর পায়ে নুপুর জোড়া ব্যাতীত তেমন কোনো গহনা নেই । সে গহনা পড়ে না , পড়তে পছন্দ করে না । নতুবা আলমারি ভর্তি ভারী ভারী গহনা আছে ওর । এসব জঞ্জাল মনে হয় শ্যামার নিকট । অলকা মুখ খুললেন এ পর্যায়ে….
” গায়ে দেখলেন আম্মা , অথচ পায়ে দেখলেন না ? পায়ে যে এক জোড়া সোনার নুপুর চিকচিক করতাছে , এইটা চোখে পড়লো না আপনার ? যে মাইয়ার পায়েই সোনা জ্বলে , সেই মাইয়ার দেহের শ্রী আপনার না দেখলেও চলবে !
মুখ বাঁকান কাকড়ি বুড়ি ।
সংগ্রাম এসেছে । পিছন থেকে ডেকে উঠলো সে…..
” ডালিয়া !
শ্যামার থেকে বেশি চমকে চকিতে চাইলেন অলকা ! ডালিয়া ? সংগ্রাম শ্যামা কে এই নামে ডাকে ? সংগ্রাম কে দেখেই আনমনে হেসে উঠলো শ্যামা । কাকড়ি বুড়ি ঘাপটি মেরে গেলেন ।

পরদিন সকাল হয়ে দুপুর । আজ হয়তো ফিরবে অংকুর । এ দুটো দিন,তিনটে রাত বেখেয়ালে পনায় কেটেছে সুরবালার । নিজের ঘরটায় অবধি থাকে নি । ছিলো শায়লার সাথে । প্রহর গুনেছে শুধু । কেমন ছটফট লেগেছে । লোকটাকে দেখা হয় নি, কথা হয় নি । মোদ্দা কথা ঝগড়া হয় নি । অংকুর তো বলে গেলো ও বিহীন এই তিনটে দিন শান্তিতে থাকবে সুরবালা । কিন্তু শান্তি কই ? অশান্তিতে ছটফট করেই কাটলো ।
গোসল সেরে সবে বেরিয়েছে সুরবালা । মাথা নিচু করে আয়নার সামনে দাঁড়ালো । ঘাড় গলিয়ে একপাশ করে মুছতে লাগলো ভেজা চুল গুলো । আয়নায় দৃষ্টি পড়তেই ছলকে উঠলো । ঠিক পেছনটায় হাতে ব্যাগ নিয়ে অংকুর দাঁড়িয়ে । দৃষ্টি সূচালো, তীক্ষ্ণ । আয়নাতেই চোখাচোখি হতেই ধক্ করে উঠলো মেয়েটা । ছ্যাঁত করে সহসা পিছু ফিরলো । প্রথম অবস্থায় নিজের ভ্রম মনে করলেও , সরাসরি দরজার কাছে অংকুর কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রম কাটলো মেয়েটার । নিমিষেই এক চিলতে হাসি ফুটলো ওষ্ঠপূটে । ছোট অক্ষি যুগল‌‌‌ তড়াক করে বৃহৎ হলো । হাসি ফুটলো দু’চোখেও । অংকুর ঘরের ভেতরে ঢুকলো কথা না বলে । হাতের ব্যাগটা চেয়ারের উপর রেখে পা থেকে জুতো খুললো । ধকল কাটিয়ে ফিরেছে , গরমে ঘেমে নেয়ে ম্যাজ ম্যাজ করছে শরীর । ঠান্ডা পানি দিয়ে লম্বা একটা গোসলের প্রয়োজন । মাথাটাও ভার হয়ে আছে । সুরবালা জোর কদমে পা বাড়িয়ে উৎকন্ঠিত হয়ে ডাকলো ছলকানো স্বরে…

” বাবড়ি ওয়ালা , আপনি এসেছেন ?
” হুম ।
ছোট্ট উত্তর বাবড়ি ওয়ালার । সুরবালার চমৎকার খুশি খুশি লাগে । ভালো লাগায় ভেসে যায় । হৃৎস্পন্দন জোরালো হয় আনন্দের দরুন ।
ও আরো ধাপ বাড়িয়ে অংকুরের নিকট আসা মাত্রই দরজা থেকে শায়লা ডাকলেন….
” সুরবালা…
উদ্যত পা যুগল থমকালো মেয়েটার । থতমত খেলো । হাত থেকে গামছা ফেলে উত্তর করলো…
” হ্যাঁ মা !
শায়লা ভেতরে পা বাড়ালেন না । এসেছিলেন অন্য কারনে , তবে এই মুহূর্তে আসাটা ঠিক হয় নি আন্দাজ করেই দরজা থেকেই বললেন কথা পাল্টিয়ে…..
” না ,তেমন কিছু না । অংকুর তো ফিরলো । ওর খাবারের ব্যাবস্থা করতে হবে । জাহানারা তো আসে নি । ও কি খাবে ,সেটাই জানতে এসেছিলাম । দুপুরের রান্না তো বসানো হয় নি এখনো ।
মায়ের কথায় অংকুর ভরাট কন্ঠে বললো….

” যা খুশি রান্না করো মা ।
শায়লা কথা না বাড়িয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন । তার চলে যাওয়ায় বিলম্ব সইলো না । অংকুর মায়ের যাওয়ার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকানোর আগেই আকস্মিক দুহাতে অংকুর কে জড়িয়ে ধরলো সুরবালা । ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো ছেলেটা । আকস্মিক মেয়েটার ঠান্ডা শরীরের সংস্পর্শে আসতেই কেমন গা শিউরে উঠলো । এক কদম পিছিয়ে গেলো অংকুর । সুরবালার ভেজা মাথাটা আলগোছে ঠাই করে নিলো অংকুরের বুকে । মেয়েটা আজকেও ঠিক মতো জড়াতে পারলো না লোকটাকে । এই বলিষ্ঠ দেহিকে জড়াতে ওর হাত দুটো নিতান্তই ছোট্ট । চোখ বুজে অংকুরের পিঠের টি শার্ট খামচে ধরে দীর্ঘ তৃপ্ত শ্বাস ফেললো সুরবালা । অংকুর হতবাক , বিমুর্ত । খেই হারালো সে । হাত দুটো নিশ্চল । উঠলো না সুরবালা কে জড়ানোর জন্য । সুরবালা শ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বললো…..
” আমি তো ভেবেছিলাম আপনার আসতে আসতে আরো দেরিই হবে । এই সময় আসবেন ভাবিনি ।
অংকুর অনড় হয়েই বুলি ফুটায় আস্তে ধীরে…..

” ছাড়ো , আমি ঘেমে আছি ।
” হোক । আপনি এতো নিষ্ঠুর কেনো হ্যাঁ ? এক কথায় চলে গেলেন আমাকে ছেড়ে ? আমার কথা মনে পড়ে নি ? একবারও ভাবলেন না আমার কথা ?
” কি ভাবতাম ?
” আমাকে একলা রেখে গেলেন যে !
” তো , তুমি যেতে আমাদের সাথে ?
” নিয়ে তো যান নি !
” কেমন কাটালে আমাকে ছাড়া দুটো দিন ?
” খুব দুঃসহ !
অংকুর মৃদু হাসলো । হাত তুলে সুরবালার পিঠে রাখলো । মেয়েটা যেনো আশকারা পেলো এতেই । চোখ নিভিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে মুচকি হেসে একটু নড়েচড়ে উঠলো । সিটিয়ে গেলো বুকের মাঝে । অংকুর দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো । মেয়েটার ভেজা চুল আর শরীরের মাদকিয় একটা গন্ধ ঠেকলো নাকে । বক্ষস্থল শীতল হয়ে আসলো অংকুরের । মৃদু হাসি প্রগাঢ় হলো তার । সিঁথির কাছটায় সুরবালার অগোচরে নরম আবেশে একটু স্পর্শ আঁকলো ।
বললো আধো স্বরে….

” দুঃসহ কেনো ? মনে পড়েছে আমায় ?
” ভীষণ !
” কেনো ?
” জানি না । শুধু জানি আপনাকে ছাড়া ভালো লাগেনা আজকাল ‌। সময় কাটে না কিছুতেই !
” তার মানে শুধু সময় কাটানোর জন্যই আমার সঙ্গ প্রয়োজন ?
সুরবালা উত্তর করে না । হাত আলগা করে মাথা তুলে চায় । অংকুরের চোখে চোখ রেখে অভীমান পিছনে ঠেলে বলে ডান ভ্রু উপরে তুলে…
” কি এনেছেন আমার জন্য ?
অংকুর ঘাড় উঁচিয়ে দায় সারা জবাব দিলো…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৮

” কিছুই না । আমি নিজে স্বয়ং এসেছে , এতে হবে না ?
গাল ফোলায় সুরবালা । অংকুর কে ছেড়ে বলে শুকনো কন্ঠে….
” সত্যিই কিছু আনেন নি ?
মাথা ঝাঁকায় অংকুর । সে তো কিছু আনেনি ? সত্যিই কি আনে নি ?

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০