শ্রাবণ ধারা পর্ব ২১
অনামিকা তাহসিন রোজা
রাত আরো গভীর হয়েছে। রাস্তার দুপাশে ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো পড়ে আছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে মাঝেমধ্যে। বাতাসে হালকা শীতল ভাব। শ্রাবণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা ধরে। এত দ্রুত হাঁটছে যেন কারো থেকে পালাচ্ছে। মুখ শক্ত। দুই হাত মুঠো করে রেখেছে। মাথার ভেতর তখনো বারবার ভেসে উঠছে ধারার সেই কঠিন চোখ। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল শ্রাবণের। ঠিক তখনই পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে নীলের আওয়াজ এলো,
—” এইইই ভাইইই! ভাইজান! দাঁড়ান! অলিম্পিকে নাম দিছেন নাকি?”
শ্রাবণ বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। ঘুরল না। শুধু আরো দ্রুত হাঁটতে লাগল। নীল দৌড়ে এসে পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, —” কি ব্যাপার ভাই? আজকে তো দেখছি হিরোদের মতো রাতের আঁধারে লং ওয়াক দিচ্ছেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ব্রেকআপের গান থাকলে পুরো সিন কমপ্লিট হতো।”
শ্রাবণ ঠান্ডা গলায় বলল,
—” আমার পেছনে আসছিস কেন?”
নীল নির্লজ্জের মতো হেসে বলল,
—” আপনার নিরাপত্তার জন্য। আজকাল এলাকার অবস্থা ভালো না। বিশেষ করে যাদের জেলাসি রোগ আছে, তাদের জন্য তো আরো বিপদ।”
শ্রাবণ সাথে সাথে থেমে কটমট করে তাকাল,
—” মানে?”
নীল নিরীহ মুখ বানিয়ে বলল,
—” কিছু না ভাই। আমি তো শুধু বললাম, মানুষের ভেতরের আগুন বেশি হলে শরীরের প্রেশার বাড়ে। ডাক্তারি তথ্য।”
শ্রাবণ আবার হাঁটতে শুরু করল,
—” বেশি কথা বলিস না। দুর হ।”
নীল এবার দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে আরাম করে পাশে হাঁটতে লাগল,
—” আচ্ছা ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? বেলি ফুলে আপনার এলার্জি আছে?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল। তার গরম চোখ দেখে নীল মেকি হেসে নিজেই বলল,
—” না মানে, ফুল দেখেই তো মনে হলো আপনি ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরি হয়ে গেছেন। আমি পরে ভেবে দেখলাম হয়তো মেডিকেল প্রবলেম।”
শ্রাবণ দাঁত চেপে বলল,
—” নীল।”
—” জ্বি ভাই?”
—” চুপ থাক।”
নীল সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল,
—” আচ্ছা থাকলাম।”
সর্বোচ্চ পাঁচ সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করল। তারপর নীল আবার বলল,
—” তবে একটা কথা বলতে হবে ভাই, ধারাকে কিন্তু ফুল পরে খুব সুন্দর লাগছিল। মানে সিনেমার নায়িকাদের মতো।”
শ্রাবণ এবার থেমে গেল। একদম ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল নীলের দিকে। সেই দৃষ্টি দেখে নীলের হাসি চেপে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল। তবুও গম্ভীর মুখে বলল, —” না মানে, আমি কি মিথ্যে বলেছি?”
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। কারণ সে নিজেও দেখেছে। দেখেছে ধারার খুশি হওয়া মুখটা। চুলে সাদা বেলি ফুল। চোখের কোণের আলো। আর সেই দৃশ্যটাই তাকে পাগলের মতো অস্থির করে তুলেছিল। কিন্তু সেটা প্রণয়াকাঙ্ক্ষায় নয়, অদ্ভুত কষ্টে। নীল আবার নিরীহ কণ্ঠে বলল,
—” আসলে একটা কথা কী জানো ভাইজান? মেয়েদেরকে ছোট ছোট জিনিসে খুশি দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে কেউ যদি মন থেকে…
—”ইনাফ নীল! শাট আপ!”
হিসহিসিয়ে উঠল শ্রাবণ। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে সে। চোখদুটো রাগে লাল হয়ে গেছে। নীল এবার সত্যি সত্যিই মজা পেল। ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপতে চাপতে বলল,
—” ভাই..তুমি কি সত্যি সত্যিই বুঝতে পারছো না তোমার সমস্যাটা কোথায়?”
শ্রাবণ এবারে নীলকে ধাক্কা দিল,
—” না বুঝতে পারছি না আর বুঝতেও চাইছি না। তুই আগে বল তো তোর সমস্যা টা কোথায়? কেনো আমার পিছু নিয়েছিস? এসব অযৌক্তিক ফালতু কথা শোনানোর জন্য?”
নীল নিষ্পাপ বাচ্চার মতো দুদিকে মাথা নাড়ল। শ্রাবণ এবার এক আঙুল তাক করে শক্ত কন্ঠে বলল,
—”শোন নীল, তোর হয়তো বাইরের মেয়েকে নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগতে পারে। বাট আমার এসব পছন্দ না। ওই মেয়েকে নিয়ে আমার সাথে কথা বলতে আসবি না। ”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—” ঠিক আছে।”
শ্রাবণ এবারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” যা এবার। বাড়ি যা।”
—” তুমি যাবে না?”
—” কাজ আছে।”
—” এত রাতে কীসের কাজ?”
—” সেটা তোর জানার বিষয় না। যা। ”
নীল ঠোঁট কাঁমড়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। এরপর বাধ্য ছেলের মত পিছু ফিরে হাঁটতে শুরু করল। শ্রাবণ দু আঙুলে কপাল ঘষলো কিছুক্ষণ। এরপর আবারো হাঁটতে শুরু করল।
জিহান বিরক্ত মুখে ট্যাক্সির সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনে গাড়ির পর গাড়ি। লাল ব্রেকলাইটের লাইন দেখে মনে হচ্ছে পুরো শহর আজ রাস্তাতেই ঘুমাবে। ড্রাইভারও বিরক্ত হয়ে স্টিয়ারিং চাপড়াচ্ছে। অনেকক্ষণ আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল জিহান। কিন্তু ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছে। তাই গত আধঘন্টা যাবৎ সে রাস্তায় গাড়িতে বসে বসে ট্রাফিক জ্যামের গুষ্টি উদ্ধার করছে। এ জীবনে শেখা সমস্ত গালির প্রয়োগ দেয়া শেষ তার। —” এই শহরের ট্রাফিক সিস্টেম বানাইছে কোন ছাগল! আল্লাহ জানে!”
মেজাজটা চরম লেভেলের খারাপ হলে সে সিদ্ধান্ত নিলে ট্যাক্সি থেকে নেমে হেঁটেই যাবে। কিন্তু বিরক্তিতে মাথা সিটে ঠেকাতেই হুট করে ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল— খোদার বান্দা। জিহানের চোখ চকচক করে উঠল। বিড়বিড় করল সে,
—” ওহহো। আহত গণ্ডার নিজেই কল দিছে! কিন্তু কেনো? ও কি জানতে পারল নীলের সাথে আমি ষড়যন্ত্রে নেমেছি?”
গলা খাঁকারি দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কল রিসিভ করল জিহান। লম্বা সালাম দিয়ে বলল,
—” আসসালামু আলাইকুম জনাব। কেমন আছেন? বেলি ফুলের সুবাসময় সন্ধ্যা কেমন কাটছে?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ রইলো। তারপর শ্রাবণের নিচু, ক্লান্ত গলা ভেসে এলো,
—” কোথায় তুই?”
জিহানের মুখের হাসিটা একটু থামল। সে বুঝল গন্ডারটার গলাটা স্বাভাবিক নেই। তবুও হালকা ভঙ্গিতে বলল,
—” কেন? আমার নামে মামলা হইছে নাকি?”
—” ফাজলামো করিস না।”
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো ওপাশ থেকে। শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
—” ব্যস্ত না থাকলে ব্রিজের উপর আয়।!”
জিহান এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল। মুখের দুষ্টুমি ভাবটা কিছুটা মিলিয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, শ্রাবণ সহজে এভাবে কাউকে ডাকে না। বিশেষ করে নিজে থেকে না। গলাটাও স্বাভাবিক না। মানে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা তাকে খুব বাজেভাবে নাড়া দিচ্ছে। জিহান নরম গলায় বলল,
—” কী হয়েছে?”
শ্রাবণ হাসল। তবে সেই হাসিতে কোনো প্রাণ নেই,
—” জানি না। আয় তুই।”
আবারো নীরবতা। রাস্তার হর্নের শব্দের মাঝেও সেই চুপ করে থাকা অনুভব করা যাচ্ছে। জিহান কিছু বলতে গেল, তার আগেই শ্রাবণ নিজে থেকে বলে উঠলো,
—” আজ আমি বাড়ি ফিরব না।”
জিহান ফিক করে হেসে বলল,
—” আবারো নেশা করবি? সাবধান! এবারেও কিন্তু অন্য মেয়েদের সাথে…
কথা শেষ করার আগেই শ্রাবণ ধমকে উঠল,
—” সেদিন কোনো অন্য মেয়ে ছিল না আহাম্মক। ”
ভ্রু কুঁচকালো জিহান। চোখ সরু করে জানতে চাইল,
—” তাহলে কে ছিল?”
শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে কথা এড়িয়ে গেল। তারপর খুব ধীরে বলল, —” আমার মাথার ভেতর সবকিছু উল্টাপাল্টা লাগছে জিহান। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। আবার…অদ্ভুত ভয়ও লাগছে।”
জিহান ভ্রু কুঁচকাল,
—” ভয়?”
—” হুম।”
শ্রাবণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তার শার্ট উড়ছে হালকা,
—” মনে হচ্ছে কিছু একটা হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমি বুঝতেই পারছি না ঠিক কী। ভালো লাগছে না কিছু।”
জিহান এবার আর মজা করল না। শুধু শান্ত গলায় বলল, —” এখন কোথায় আছিস?”
—” বাড়ির বাইরে। বেশি দুরে না।”
—” আচ্ছা ব্রিজের উপর যা, আমি আসছি।”
জিহান তড়িঘড়ি ড্রাইভারকে বলল,
—” ভাই, গাড়ি ঘুরান। ইমারজেন্সি।”
ড্রাইভার বিরক্ত মুখে তাকাতেই জিহান পকেট থেকে টাকা বের করে বলল,
—” ডাবল ভাড়া দিব। শুধু এই জাহান্নাম থেকে বের করেন।”
তারপর আবার ফোন কানে নিয়ে বলল,
—” দোস্ত সাবধানে আয়। আমিও আসছি।”
ওপাশে শ্রাবণ কিছু বলল না। শুধু খুব আস্তে একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
শহরের শেষপ্রান্তের পুরোনো ব্রিজটার উপর বসে আছে দুজন। নিচে কালো পানির ঢেউ। মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে। দূরে কোথাও গাড়ির ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে, তবে এই জায়গাটা তুলনামূলক নির্জন। জিহান ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। হাতে কফির কাগজের কাপ। আর তার পাশেই শ্রাবণ, দুই কনুই হাঁটুর উপর রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে। গত পনেরো মিনিট ধরে প্রায় কোনো কথাই বলেনি সে। জিহানও জোর করেনি। শুধু চুপচাপ বসে থেকেছে। কারণ সে জানে, কিছু মানুষকে কথা বলানোর চেষ্টা করলে তারা আরো গুটিয়ে যায়। অপেক্ষা করতে হয়। বাতাসে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ভাসল। তারপর হঠাৎ শ্রাবণ নিচু গলায় বলল,
—” আমার কী হয়েছে জিহান?”
জিহান পাশ ফিরে তাকাল। শ্রাবণ তখনো সামনের অন্ধকার পানির দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখদুটো ক্লান্ত। ভেতরে ভেতরে যেন নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ করছে। সে শুকনো হাসল একটু,
—” সিরিয়াসলি বলছি। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না আমার কী হয়েছে।”
জিহান কিছু বলল না। শ্রাবণ এবার দুহাতে নিজের মাথার চুল পেছনে সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” আগে সব সহজ ছিল। যা ভালো লাগত না, সরাসরি দূরে ঠেলে দিতাম। যেটা চাইতাম না, সেটা নিয়ে ভাবতামও না।”
একটু থামল সে। তারপর নিচু স্বরে বলল,
—” কিন্তু এখন…সব গুলিয়ে যাচ্ছে।”
জিহানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। খুব আড়াল করে ক্ষীণ হাসল সে। শ্রাবণ নিজেও এবার বিরক্তিতে হেসে ফেলল,
—” আজকে নীল যখন ওকে ফুল দিল, আমার মনে হচ্ছিল বেয়াদব দুটোরই হাতটাই ভেঙে ফেলি।”
জিহান ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কিছু বলল না। শ্রাবণ তৎক্ষণাৎ তাকাল তার দিকে, —” হাসছিস কেন?”
—” না। চালিয়ে যা।”
শ্রাবণ আবার সামনে তাকাল,
—” সবচেয়ে বাজে ব্যাপার কী জানিস? আমি জানিই না কেন আমার এত রাগ হচ্ছিল।”
বাতাস এসে শ্রাবণের চুল এলোমেলো করে দিল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” ও হাসছিল। খুশি হয়েছিল। স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল কেউ বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ও কেনো হাসবে অন্য পুরুষের জন্য? কই কখনো তো আমার সাথে হেসে কথা বলেনি?”
জিহান বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—” তুই মনে হয় হাসানোর মত খুব কাজ করেছিস!”
শ্রাবণ এবারেও অন্যদিকে তাকিয়ে কথাটা এড়িয়ে গেল। জিহান এবার ধীরে ধীরে মাথা নামাল। চোখের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠছে। শ্রাবণ সেটা দেখে বিরক্ত হলো,
—” হাসলে দাঁত কপাটি ভেঙে ফেলব তোর, আমি সিরিয়াস।”
জিহান কাশির ভান করল,
—” আচ্ছা আচ্ছা। তারপর?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—” সব ঠিক আছে। কিন্তু ও আজকে যেভাবে কথা বলল আমার সাথে…আমি কখনো ওকে এমন দেখিনি।”
গলাটা একটু ভারী হয়ে এলো শ্রাবণের,
—” আর অদ্ভুত ব্যাপার কী জানিস? রাগ হওয়ার বদলে…আমার ভয় লাগছিল।”
জিহান এবার সত্যি সত্যিই তাকাল তার দিকে। অবাক হয়ে বলল,
—” ভয়? ভয় লাগছিল?”
শ্রাবণ ফাঁকা চোখে সামনে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
—” হুম। মনে হচ্ছিল ও সত্যিই দূরে চলে যাচ্ছে। ওর ঘৃনাভরা চোখ দুটো আমি নিতে পারছিলাম না, আর আমি…আমি সেটা সহ্য করতে পারছি না।”
কথাটা বলেই সে থেমে গেল। সত্যি বলতে শ্রাবণ নিজেই নিজের মুখ থেকে বের হওয়া কথায় অবাক হয়েছে। জিহান এবার সত্যি সত্যিই তাকাল তার দিকে। ঠোঁটের কোণের হালকা হাসিটাও মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। এত বছর ধরে সে শ্রাবণকে চেনে। এই ছেলেটা কখনো নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে না। আজ করছে।
বাতাসে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ঝুলে রইল। অবশেষে খুব ধীরে অস্ফুটস্বরে শ্রাবণ শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে জিহানের দিকে তাকিয়ে আকুল কন্ঠে জানতে চাইল,
—” এই অনুভূতির নাম কী দেব জিহান? আমি কি….
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। ঠিক তখনই তীক্ষ্ণ হর্নের শব্দ ভেসে এলো। দুজনই একসাথে মাথা তুলে সামনে তাকাল। ব্রিজের পাশে একটা গাড়ি এসে থেমেছে। পরের মুহূর্তেই দরজা খুলে দ্রুত নেমে এলো নীল। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে সে। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে গেল। এই ব্যাটা আবারো এসেছে? নীল হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর দুই হাঁটুতে হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—” আহ! অবশেষে হারিয়ে যাওয়া আহত গণ্ডারকে খুঁজে পেলাম।”
জিহান হেসে ফেলল। শ্রাবণ বিরক্তিতে বলল,
—” তুই এখানে কেন এসেছিস?”
নীল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শার্টের কলার ঠিক করল।
—” কারণ তুমি বাড়ি ছেড়ে রাগ করে বের হয়েছো। খালামনি টেনশন করছে। আর আমি মানবতার খাতিরে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমাকে ছাড়া একা বাড়ি ফিরব না।”
—” নাটক করিস না।”
—” এটা নাটক না ভাই। এটা দায়িত্ববোধ।”
জিহান এবার সুর টেনে বলল,
—” ওরে, ভাতৃত্বের কি গভীরতা! কি ভালোবাসা! আহা! দেখেই বুক ভরে যায়।”
নীল গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
—” অবশ্যই। আমি ভাইজানকে অনেক ভালোবাসি, ঠিক যতটা আমি আমার এক্সকে ভালোবেসেছিলাম।”
শ্রাবণ সাথে সাথে কটমট করে তাকাল,
—” নীল।”
—” জ্বি ভাই?”
—” ব্রিজ থেকে ফেলে দেব।”
নীল দুই কদম পিছিয়ে গেল,
—” দেখছেন জিহান ভাই? মানুষ সত্য কথা সহ্য করতে পারে না।”
জিহান এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। শ্রাবণ বিরক্তিতে বড় শ্বাস ফেলল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার আগের মতো ভারী লাগছে না এখন। নীলের এই উদ্ভট কথাবার্তা পরিস্থিতির চাপটা একটু হলেও হালকা করে দিয়েছে। নীল এবার দুজনের মাঝখানে এসে রেলিংয়ে বসে পড়ল,
—” আচ্ছা, এখন সিরিয়াস কথা বলি। ভাই, তুমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর খালামনি এমন মুখ করে বসে ছিল যেন দেশের অর্থনীতি ভেঙে গেছে। আর ধারা…”
কথাটা বলেই থেমে গেল সে। শ্রাবণের চোখ সাথে সাথে তার দিকে উঠল। আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কী?”
নীল ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল,
—” কিছু না।”
—” নীল।”
—” আরে ভাই, সত্যি কিছু না।”
—” তো তুই ওর নাম নিলি কেনো?”
—” ভুলে ভুলে। পরনারীর নাম তোমার সামনে আর নেব না। তুমি তো সাধু মানুষ।”
জিহান মুখ কুঁচকে শ্রাবনের দিকে তাকিয়ে ভেঙচিয়ে বলল,—” ওহহো, পরনারী! বাবাহ!”
নীল এবারে জিহানের দিকে রহস্যভরা চোখে তাকালো। কয়েক সেকেন্ডেই চোখে চোখে তাদের মাঝে কি যেন আলাপ হয়ে গেল। শ্রাবণ সেটা টেরও পেল না। এবারে পরিকল্পনা অনুযায়ী নীল একটু গলা খাঁকারি দিয়ে চোখ টিপে জিহানের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
—” জানো জিহান ভাই, আমি প্রেমে পড়েছি।”
শ্রাবণ ফট করে তাকাল। কিন্তু নীল সেটা খেয়াল না করার ভান করল। জিহান এদিকে অবিশ্বাস্যভাবে অবাক হওয়ার দারুণ নাটক করে বলল,
—” আরে তাই নাকি? কে সেই সুন্দরী?”
শ্রাবণও এবারে নীলের বাহু ধরে জিজ্ঞেস করল গুরুতর কন্ঠে,
—” কীসের প্রেম? কার প্রেমে পড়েছিস?”
ছেলেটার কন্ঠে অজানা ভয় খেলে বেড়াচ্ছে।
নীল ভীষণ লজ্জা পাওয়ার ভান করল,
—” তোমাকে তো বলবই না ভাইজান। বড় ভাইয়ের কাছে প্রেমিকার নাম বলব? আমার লজ্জা করে না বুঝি?”
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল। অস্থিরতায় বুক কাঁপছে তার। আরো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জিহান মাঝপথে থামিয়ে দিল,
—” ধুর, তুই থাম তো। নাম পরে, আগে কামের কথা শুনি। তো নীল, মেয়েটাকে বলেছিস?”
হতাশ হওয়ার ভান ধরে নীল,
—” না গো জিহান ভাই, এখনো সুযোগই পাই নি। প্রপোজ করব করব বলে করা হচ্ছে না। কী যে করি। একটু সাজেশন দাও তো।”
জিহান খুব ভাব নিয়ে থুতনিতে হাত দিল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেম বিষয়ক মিটিং চলছে এখানে,
—” হুমম…প্রথমে জানতে হবে মেয়েটার পছন্দ কী। ফুল পছন্দ করে? চকলেট? নাকি সাহিত্যিক টাইপ? চঞ্চল নাকি শান্ত?”
শ্রাবণের মেজাজ খারাপ হলো। সে এখানে জিহানকে ডেকেছে তার শোক পালন করার জন্য, আর এই বলদ টা এসে প্রেমের সাজেশন নিচ্ছে? নীল নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, —” ফুল তো অনেক পছন্দ করে। বিশেষ করে বেলী ফুল।”
শ্রাবণের বুকের ভেতর কেমন ধপ করে উঠল। হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে গেল। চোখ সরু করে তাকাল নীলের দিকে। নীল নির্বিকার ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেই যাচ্ছে,
—” আর মেয়েটা খুব অদ্ভুত। সবার অনেক যত্ন করে। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখে। কেউ অপমান করলেও মুখে কিছু বলে না। একদম পারফেক্ট ওয়াইফ ম্যাটেরিয়াল।”
জিহান এবার ঠোঁট চেপে হাসি সামলালো। গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—” ওহ। ডেঞ্জারাস। তুই তো দেখি পুরোপুরি ডুবে গেছিস।”
নীল লাজুক হওয়ার অভিনয় করল,
—” হুম, মেয়েটা হাসলে মনে হয় পৃথিবী শান্ত হয়ে যায়।! আর বেচারি এতিম, আমি ছাড়া তার আর কে আছে বলো?”
জিহান দুঃখী মুখ করল। শ্রাবণের কপালের রগ টনটন করতে লাগল। হঠাৎ করেই বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
—” তোর থামবি? এসব প্রেম কাহিনী এখন বলতে হবে?”
নীল সাথে সাথে নিরীহ মুখ করে তাকাল,
—” কেন ভাই? প্রেম করা কি অপরাধ?”
—” আমি সেটা বলিনি।”
নীল এবারে একটু রেগে গিয়ে বলল,
—” অবশ্য এসব প্রেম ভালোবাসার মানে তুমি কী বুঝবে? জীবনে প্রেমে পড়েছো নাকি? জীবনে তো অভিজ্ঞতা নাও নি। এসবের মূল্য তুমি কী বুঝবে?”
তাল মেলাল জিহান,
—” ঠিক ঠিক।”
শ্রাবণ দাঁত খিঁচে বলল,
—” এসবের দরকারও নেই আমার।”
—” তাহলে চুপ করে থাকো তো। আমাকে সাজেশন নিতে দাও। নিজে বিয়েশাদি করবে না বলে কি আমরা ছোটরা পড়ে থাকব? তোমার আগে এক বাচ্চার বাপ হবো আমি দেখে নিও।”
শ্রাবণ চুপ করে গেল। কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপা অস্থিরতা জমছে। মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে তার ধৈর্য্য নিয়ে খেলছে। জিহান এবার আরো আগুনে ঘি ঢালল।
—” নীল শোন, আমার মনে হয় দেরি না করে বলে ফেলা উচিত। মেয়েরা কেয়ারিং ছেলে পছন্দ করে। বিশেষ করে যখন কোনো ছেলে তার খারাপ সময়ে পাশে দাঁড়ায়…
কথাটা শুনে শ্রাবণের মনে আচমকা দুপুরের দৃশ্য ভেসে উঠল। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা ধারা, চুপচাপ ফুল কুড়িয়ে নেয়া, তারপর সেই চোখ…তার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল।
নীল এবার হালকা হেসে বলল,
—” আসলে মেয়েটার জন্য মায়া লাগে। ও সবসময় নিজেকে ছোট করে রাখে। অথচ ওকে যে কেউ খুব যত্নে রাখবে, সেটা ওর প্রাপ্য।”
এইবার আর নিতে পারল না শ্রাবণ। হঠাৎ করেই রেলিং থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল সে,
—” নাম কী মেয়েটার?”
নীল চোখ পিটপিট করল,
—” কার?”
—” যাকে পছন্দ করিস তার!”
নীল ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে ফেলল। জিহান মুখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ সে হাসলে সব শেষ। নীল খুব ধীরস্বরে বলল,
—” বললে মা’রবে না তো ভাই?”
শ্রাবণের গলা এবার কর্কশ শোনালো,
—” নীল। নাম বল।”
বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। দূরে নদীর কালো জলে আলো কাঁপছে। নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে এমন ভাব করল যেন ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। তারপর নিচু গলায় বলল,
—” আসলে…ওর নামটা..বলা যাবে না।”
মুহূর্তেই শ্রাবণের মেজাজ খারাপ হলো। সে রীতিমতো তেড়ে আসতে চাইলো নীলের দিকে। জিহান আটকালো। -” আহহা, থাম তো শ্রাবণ। টিপিকাল বড় ভাইয়ের মত রেগে যাস না। পরে নাম শুনে নেব আমরা।”
শ্রাবণ কোনোমতে আবারো বসে পড়ল। নীল এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” ভালোবাসা জিনিসটা বড় ভয়ংকর ভাই। বিশেষ করে যখন দুইজন মানুষই সেটা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলে।”
জিহান তাল মিলিয়ে বলল,
—” এজন্যই বলছি, তুই কিন্তু দেরি করিস না নীল।”
শ্রাবণ আড়চোখে তাকিয়ে তাদের দুজনের কথা শুনলো। এরপর সিগারেট ধরালো। মাথা ঠিক করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দুটোর কথাবার্তাই সুবিধার লাগছে না তার।
সকালের আলো ফিকে হয়ে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। জানালার পর্দা দিয়ে হালকা সোনালি রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। সালমা বেগম চোখ মেলতেই একটা অস্বস্তি টের পেলেন। শরীরটা ভারী লাগছে, মাথার ভেতর হালকা চাপ। রাতে ভালো করে ঘুম হয়নি। বারবার ছেলের কথা মনে পড়ছিল। শ্রাবণ, নীল কেওই এখনো বাড়ি ফেরেনি। নীল শ্রাবণের সাথে আছে এটা ভেবেই তিনি একটু শান্ত রয়েছেন। ধীরে ধীরে উঠে বসলেন ভদ্রমহিলা। বেডমাইড টেবিলে চা না দেখে অবাক হলেন। ধারা তো কখনো চা দিতে দেরি করেনা। সালমা বেগম ঘুম থেকে উঠে সবসময়ই চা দেখতে পান। তাই তিনি উঠে পড়লেন বিছানা থেকে। গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলেন,
—”ধারা… ও ধারা! ”
কোনো সাড়া এলো না। বাড়িটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ। সাধারণত এই সময়ে ধারা রান্নাঘরে থাকে। চায়ের পানি ফোটা বা চামচের টুংটাং শব্দ শোনা যায়। আজ কিছুই নেই। সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়ালেন। রাতের অস্বস্তিটা যেন আরও বেড়ে গেল। শ্রাবণ তো কাল রাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারপর আর ফেরেনি। নীলও পরে বেরিয়েছিল ওকে খুঁজতে। কিন্তু কেউই ফোন ধরছে না।
—”ধারা!” আবার ডাকলেন তিনি। কিন্তু নিজের গলাতেই ফাঁকা আওয়াজ শুনতে পেলেন। দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। চুলা কেও ছোঁয়নি হয়তো। কেউ চা বানায়নি। টেবিলে কোনো কাপ নেই। সবকিছু যেমনকার তেমন। হঠাৎ তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ধারা কি এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি? মেয়েটা তো কখনো এত দেরি করে না। তিনি দ্রুত ধারার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। দরজাটা অর্ধেক খোলা। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না।
—”ধারা? মা…”
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২০
আস্তে আস্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন সালমা বেগম। ঘরটা খালি। বিছানাটা যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে, শুধু চাদরটা একটু এলোমেলো। আলমারির দরজা খোলা। ভেতরে প্রায় সবকিছু ফাঁকা। কয়েকটা পুরোনো জামা আর ওড়না ছাড়া আর কিছু নেই। ধারার ছোট্ট ব্যাগটাও নেই।
সালমা বেগমের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর এগিয়ে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, সেসব জামাকাপড়ই আলমারিতে পড়ে রয়েছে যেগুলো ধারাকে তিনি কিনে দিয়েছিলেন। এছাড়া কিচ্ছু নেই। একদম পুরো ঘর ফাঁকা। আঁতকে উঠলেন ভদ্রমহিলা। তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লেন। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। মেয়েটা কি চলে গেছে?
