শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৪
অনামিকা তাহসিন রোজা
নীলের মন চাইলো ওয়াশরুম থেকে সাবান আর হারপিকটা এনে ঢকঢক করে গিলে খেতে। সে অনেক নাটকবাজ দেখেছে, কিন্তু নিজের প্রেমিকার মত এত বড় নাটকবাজ কখনো দেখেনি। গত এক ঘন্টা যাবৎ কাঁদছে তো কাঁদছেই। থামার নামই নেই। নীল তাকিয়ে ছিল অনবরত। একটা সময় ক্লান্ত হয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ডাকল,
—” এশা, জান আমার? তোমার কি চোখে ট্যাঙ্কি লাগিয়ে রেখেছো? কান্না থামাবে ঠিক কত বছর পর?”
সালোয়ার কামিজ পরিহিত মিষ্টি চেহারার মেয়েটি ছলছল নয়নে চোখ তুলে তাকাল। জগতের সব শ্বাস একত্র করে রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
—” ইতর কোথাকার! চুপ থাক। একদম কানের নিচে দামামা বাজিয়ে দেব জানফান বলে ডাকলে। নির্লজ্জ, অকৃতজ্ঞ, পল্টিবাজ একটা। আমাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শহরে এসে ফুর্তি করছিলি বেয়াদব? ”
হতাশ হলো না নীল। গত তিন বছর ধরে সে এভাবেই নিজের প্রেমিকার কাছে গালি খেয়ে আসছে। এ আর নতুন কিছু নয়। বরং এখন গালি না খেলেই তার কাছে অস্বাভাবিক লাগে। কিন্তু সেও নিরূপায়। ভালোবেসে খাদে পড়েছে বেচারা। মেয়েটার মুখের ভাষা অত্যন্ত চমৎকার হলেও চেহারা অনেক ইনোসেন্ট। বাচ্চাদের মত চোখ, গাল। যা দেখে নীল চাইলেও কঠোর হতে পারে না। মাঝে মাঝে অবশ্য ‘বাবু’ বলে ডেকে দুটো চড়ও খেয়েছে সে নিজের প্রেমিকার নরম হাতে। খুবই আশ্চর্যজনক অবস্থা।
নীল এবারে চোখ সরু করে বলল,
—” তোমাকে তোমার ওই হিটলার মামা আর চামচিকা বড় ভাইটা এসব বলে উসকিয়েছে তাইনা? ওই হারামিগুলো কি জানেনা আমি বিজনেসের কাজে এসেছি শহরে? সবমসময় তোমার কানে আমার নামে বিষ ঢালে!”
—” শাট আপ। আমার শ্রদ্ধেয় মামা,ভাইকে নিয়ে কিছু বলবে তুমি। তারা অনেক ভালো। আমার ভালো চায়।”
মুখ বাঁকাল নীল,
—” হ্যাঁ অনেক। বাপ-মায়ের থেকে মামা-ভাইয়ের দরদ বেশি? তোমার বাবা-মা আমায় জামাই হিসেবে মেনে নিয়ে পায়েশের বাটি হাতে নিয়ে বসে আছে। আর এরা নাটক শেষ করেনা। শালারা আমাকে হিংসে করে বুঝেছো!”
নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত কোমড়ে রেখে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—” ওদের পা’ছায় কৃমি আছে।”
এশা নাক সিঁটকিয়ে বুকে ঘুষি মারল নীলের
—” বাজে কথা বললে মে’রে ফেলব একদম।”
—” আমি মোটেই বাজে বকছি না। তোমার ওই মামা আর ভাইয়ের সমস্যা কী জানো?”
এশা নাক টেনে বলল,
—” কী সমস্যা?”
—” ওরা নিজেরা বিয়ে করছে না। তাই আমারটাও হতে দিচ্ছে না।”
এশা চোখ কুঁচকে তাকাল,
—” কীসব আজেবাজে কথা!”
—” আজেবাজে না। একদম বৈজ্ঞানিক গবেষণা।”
—” গবেষণা আবার কীসের?”
নীল আঙুল তুলে গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করল,
—” দেখো, মানুষের একটা স্বভাব আছে। নিজে যদি প্রতি রাতে বালিশ জড়িয়ে ঘুমায়, তাহলে অন্যের সুখও সহ্য হয় না।”
এশা প্রথমে বুঝল না। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝে বড় বড় চোখে তাকাল,
—” নীল!”
—” কী? মিথ্যে বলেছি?”
—” একদম চুপ!”
—” আচ্ছা, তোমার ভাইয়ের বয়স কত?”
—” ত্রিশ।”
—” আর মামা?”
—” ছত্রিশ।”
নীল সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত ছড়িয়ে হেসে বলল,
—” এই যে! দুজনেই বিয়ের বাজারে ফুল ম্যাচিউর আম। কিন্তু ঝুলেই আছে। এখন বলো, আমার বিয়ে দেখলে ওদের কলিজা জ্বলবে না?”
এশা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
—” আমার ভাইয়ের নামে একটা কথাও বলবে না।”
—” আচ্ছা বলব না। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।”
—”আবার কী?”
—” তোমার ভাই যদি এতই পারফেক্ট হয়, তাহলে কোনো মেয়ে এখনো তাকে ধরে নিয়ে গেল না কেন?”
এশা গর্বিত গলায় বলল,
—” কারণ উনি খুব ভালো মানুষ। সবাইকে যাচাই-বাছাই করেন।”
নীল সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
—” না।”
—” তাহলে?”
—” সবাইকে ইন্টারভিউ নিতে নিতে প্রার্থীরাই অবসর নিয়ে ফেলছে।”
এশা হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর পাশের পানির বোতলটা তুলে সজোরে ছুড়ে মারল। বোতলটা নীলের মুখে এসে লাগতেই সে বুক চেপে নাটকীয় গলায় বলে উঠল,
—” আহ্! আবার গার্হস্থ্য নির্যাতন! কেউ ভিডিও করো!”
এশা দাঁত কিঁচিয়ে বলল,
—” আর একটা কথা বললে এবার বোতল না, টেবিল ছুড়ব।”
নীল বোতলটা বুকে জড়িয়ে নিরীহ মুখ করে বলল,
—” তোমার এই রাগটাই তো ভালোবাসি জান… উফ!”
শেষ কথাটা মুখ থেকে বের হতেই এশা আবার হাত তুলল। নীল দুহাত মাথার ওপর তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
—” আচ্ছা আচ্ছা! জান বললাম না। ভুল হয়ে গেছে। আদালত একটু দয়া করুক।”
এশা নাক টেনে রাগী গলায় বলল,
—” তোমার মুখেই সমস্যা।”
নীল দম ছাড়ল,
—” আমার মুখে সমস্যা না, তোমার প্রেমে সমস্যা। তিন বছর ধরে প্রেম করছি। এখনো হাত ধরতে পারি না। জান ডাকলে চড় খাই। বাবু ডাকলে কিল খাই। নাম ধরে ডাকলে রাগ করো। তাহলে বলো, আমি ডাকব কী?”
এশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গম্ভীর মুখে বলল,
—” ডাকতে হবে কেন? চুপ থাকো তুমি!”
নীল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল,
—” তাই নাকি? তাহলে বিয়ের পরও কি বলব—’এই যে মানবী, এক কাপ চা দিবেন?”
এশা হাসি চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করল। ঠোঁট কেঁপে উঠল। নীল সেটা দেখেই চেয়ার থেকে উঠে বিজয়ীর ভঙ্গিতে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলল,
—” এই যে! হাসছ! আদালতের নথিভুক্ত করা হোক। আসামি হাসছে। মানে আমার ওপরের রাগ কমছে!”
এশা তাড়াতাড়ি মুখ গম্ভীর করে ফেলল,
—” ভুল দেখেছ।”
—” না, আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
—” কিছুই দেখনি।”
—” দাঁতও দেখেছি।”
—” অশভ্য একটা।”
—” আচ্ছা আচ্ছা, চুপ করলাম। তবে একটা কথা বলে রাখি…”
সে একটু ঝুঁকে দুষ্টু হেসে ফিসফিস করল,
—” তোমার ওই হিটলার ভাই আর জেনারেল মামাকে আমি একদিন তোমার শ্বশুরবাড়ির বিরিয়ানি খাইয়েই আপন করে ছাড়ব!”
—” হ্যাঁ হ্যাঁ দেখা যাবে। আগে বিয়েটা হচ্ছে কিনা দেখো।”
নীল ভ্রু কুঁচকালো
—” হবে না কেন? আমার খালুকে চেনো? হিরো হিরো! নিজের ঝটপটা অশভ্য ছেলেকে বিয়ে করিয়ে মানুষ করে ছেড়েছে। সে এখন বউয়ের পেছনে ঘুরছে। আর তোমার মামা-ভাই কোন ক্ষেতের মুলা? আমাদের বিয়ের কথা পাকা করেই ছাড়বে।”
নীলের কথা মিথ্যে হলো না। সত্যি সত্যি এশার মামা-ভাই দুজনেই হাসিমুখে বিয়েতে রাজি হয়ে বিদায় নিল। এখানে আসার সময় যতটা গম্ভীর মুখে এসেছিল, ঠিক ততটাই আন্তরিকতার সাথে প্রফুল্ল চিত্তে চলে গেল তারা। নীলের সাথেও কথা বলে গেছে। এশা রীতিমতো হা হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি তারা গলে যাবে সে আশাও করেনি। গত তিন বছর ধরে এত চেষ্টা করল তারা, কেও কিচ্ছু করতে পারল না। নীলকে দুচোখে সহ্য করতে পারেনা এশার মামা। সেখানে কি সুন্দর করে হেসে কথা বলে গেল?সামিউল শেখ আসলেই জাদু জানেন বুঝি? এশা বুঝলো না। নীল গর্বিত ভঙ্গিতে কলার ঝাঁকিয়ে এশার মাথায় গাট্টা মারল,
—” দেখেছো জান, এ-ই হলো ম্যাজিক।”
এশা ঠোঁট উল্টিয়ে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। জিনিসটা আসলেই ম্যাজিকের মত।
—” এই নীল, শোনো না!”
—” বলো বলো।”
—” তোমার খালু কী এমন করেছে বলোতো!”
—” সে তো আমি জানিনা। নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে প্রশংসা করেছে। আমি অনেক ভালো মানুষ কিনা।”
মুখ কুঁচকালো এশা,
—” হ্যাঁ তুমি ভীষণ ভালো মানুষ। ছিঁচকা কোথাকার!”
—” হোয়াট ইজ ছিঁচকা?”
—” তোর মাথা।”
—” হবু বরের সাথে তুইতোকারি করতে নেই। আল্লাহ পাপ দেয়।”
এশা হেসে ফেলল। খুশিতে কান্না পাচ্ছে তার। প্রিয় মানুষটাকে আপন করে পাওয়ার মত খুশি বোধহয় এ জগতে আর কোনো কিছুতে নেই।
শ্রাবণ ও ধারা সেই কাঙ্খিত বাংলোতে এসেছে দুপুরের মধ্যেই। এসেই ধারা অবাক হয়েছে। এত সুন্দর বাংলো সে আগে কখনো দেখেনি। জায়গাটাও বেশ ফাঁকা, আরামদায়ক। মনেই হচ্ছে না এটা শহরের একটা অংশ। বাংলোর চারপাশে বড় বড় ফুলের গাছও লাগানো। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে কৃষ্ণচূড়া গাছটা। শ্রাবণ ফ্রেশ হয়ে এসে ধারাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেও পাশে এসে দাঁড়াল,
—” কী দেখছো?”
এক দৃষ্টিতে কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে তাকিয়ে থাকা ধারা চমকাল। দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” কিছু না।”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে বললো,
—” তুমি চাইলে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারো। ক্লান্ত লাগছে না?”
ধারার কেন যেন ভীষণ লজ্জা লাগছে। রেস্টুরেন্টে থাকাকালীনও এত লজ্জা লাগেনি। কিন্তু সময়টা পেরোনোর পর এখন কেন যেন মনে হচ্ছে সে আর শ্রাবণের দিকে তাকাতে পারবে না। তবুও সে মিনমিন করে বলল,
—” আমরা বাড়ি যাব কখন?”
—” দু-তিন ঘন্টা পর। বিকেলে রওয়ানা হবো।”
—” ওহ।”
শ্রাবণ আবারো বলল
—” তুমি ঘুমাবে একটু?”
—” উহু।”
—” তাহলে চলো পুকুরপাড়ে যাই?”
ধারা অবাক হলো। সব ভুলে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য সুরে বলল,
—” এখানে পুকুরও আছে?”
—” আছে তো। বাংলোর পেছনে। তোমার গ্রামের মত বড়সড় না। কিন্তু সুন্দর। যাবে?’
ধারা মাথা নাড়াল,
—” চলুন।”
খোলা বারান্দা থেকে নেমে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। দুপুরের রোদটা আর তেমন তেজি নেই। বিশাল বিশাল আমগাছের ছায়া পেরিয়ে ইট বিছানো সরু পথটা সোজা চলে গেছে বাংলোর পেছন দিকে। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন শহর বহু দূরের কোনো পৃথিবী। শুধু দূরে কোথাও কোকিলের ডাক, আর হালকা বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ। ধারা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। যত সামনে এগোচ্ছে, জায়গাটা তত সুন্দর হয়ে উঠছে। কয়েক কদম পরেই পুকুরটা চোখে পড়ল। পুকুর খুব বড় নয়, কিন্তু অপূর্ব। পানিটা কাঁচের মতো স্বচ্ছ। দুপুরের রোদ তিরতির করে জলের গায়ে ঝিলিক দিচ্ছে। চারপাশটা যেন যত্ন করে আঁকা একটা ছবির মতো। পুকুরপাড় জুড়ে ইট বসানো হাঁটার পথ। দু’পাশে সারি সারি ফুলগাছ। লাল, সাদা, গোলাপি গোলাপ। বেলি, হাসনাহেনা, জবা, টগর, কাঞ্চন, অপরাজিতা, সব ফুলেই যেন রঙের উৎসব বসেছে। আর সবচেয়ে নজর কাড়ছে মাথার ওপর ঝুঁকে থাকা তিনটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁকে অসংখ্য লাল ফুল ফুটে আছে। বাতাস এলেই টুপটাপ কয়েকটা ফুল জলের ওপর পড়ে ভেসে যাচ্ছে। ধারা হাঁটা থামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়। খুব আস্তে বলল,
—” এত সুন্দর…”
শ্রাবণ মুচকি হাসল,
—” ভালো লেগেছে?”
ধারা মাথা নাড়ল,
—” মনে হচ্ছে না শহরে আছি।”
শ্রাবণ ধীর পায়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল,
—” আমিও ছোটবেলায় এখানে এসে ঠিক এই কথাটাই বলতাম।”
ধারা এবার চারদিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে বলল,
—” এত ফুল… এত কৃষ্ণচূড়া… এগুলো কে লাগিয়েছে?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—” আমার দাদু।”
ধারা তাকাল তার দিকে। শ্রাবণ হালকা হেসে বলতে শুরু করল,
—” এই বাংলোটা আগে দাদু-দাদিরই ছিল। বাবা তখন ছোট। দাদি নাকি ফুল ছাড়া থাকতে পারতেন না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ ছিল বাগানে হাঁটা। কোনোদিন একটা নতুন ফুল দেখলেই দাদুকে জ্বালাতেন—’ওই গাছটা এনে দাও।'”
শ্রাবণ হেসে মাথা নাড়ল,
—” আর দাদু ছিলেন ভয়ংকর প্রেমিক। দাদির একটা ইচ্ছেও অপূর্ণ রাখতেন না।”
ধারা মুগ্ধ হয়ে হাসল। শ্রাবণ আবার বলল,
—” দাদি একবার নাকি বলেছিলেন, কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসতে খুব ভালো লাগে। এরপর দাদু একদিনে একটা না, তিনটা কৃষ্ণচূড়া এনে লাগিয়ে দিলেন।”
ধারা অবাক হয়ে বলল,
—” তিনটা?”
—” হুম।”
—” কেন?”
শ্রাবণ দুষ্টু হেসে বলল,
—” দাদুর যুক্তি ছিল, একটা যদি না বাঁচে, আরেকটা থাকবে। দুটো না বাঁচলে তৃতীয়টা থাকবে। কিন্তু দাদির ইচ্ছেটা মরতে দেওয়া যাবে না। আমি আগে থেকেই দেখেছি দাদি একটা কিছু চাইলে, দাদু তার অধিকই দেয়! ”
ধারা অজান্তেই হাসল। চোখ চকচক করল। শ্রাবণের চোখ আবার আটকে গেল সেই হাসিতে। পুকুরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দুজনে পাশাপাশি বসল। মাঝখানে খুব বেশি দূরত্ব নেই। আবার খুব কাছেও নয়। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ রইলো। শুধু বাতাস বইছে। অনুভবটাই বিরাট কিছু। হঠাৎ একটা নয়নতারা ফুল ভেসে এসে ধারের খুব কাছে পড়ল। ধারা নিচু হয়ে সেটা হাতে তুলে নিল। আঙুলের ডগায় ফুলটা ঘুরিয়ে দেখল। খুব আস্তে বলল,
—” আপনার দাদু দাদিকে খুব ভালোবাসতেন… তাই না?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” ভালোবাসা শব্দটা বোধহয় কম হয়ে যায়। দাদি মারা যাওয়ার পর দাদু প্রায় প্রতিদিন এখানে এসে বসে থাকতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাবা বলত, একদিন জিজ্ঞেস করেছিল’একা বসে কী করো? দাদু নাকি বলেছিলেন, ‘একা কোথায়? যার স্মৃতি পাশে বসে থাকে, সে মানুষ কোনোদিন একা হয় না।”
কথাটা শুনে ধারা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। বাতাস আবার বইল। গাছের ডাল দুলে উঠল। লাল কয়েকটা পাপড়ি ভেসে নেমে এল তাদের চারপাশে। শ্রাবণ এবারে ফট করে উঠে দাঁড়াল। ধারা চোখ তুলে তাকাল,
—” কোথায় যাচ্ছেন?”
—” একটু দাঁড়াও আসছি।”
বলেই দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। ধারা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। তারপর আবার পুকুরের পানিতে দৃষ্টি স্থির করল। বাতাসে আঁচল উড়ছে। অজান্তেই নিজের অনামিকায় থাকা নতুন আংটিটায় আঙুল বুলিয়ে দিল সে। পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলো। কয়েক মিনিটের মাঝে হঠাৎ শুকনো পাতার ওপর কারও পায়ের শব্দ ভেসে এলো। ধারা ঘুরে তাকাল। আর তাকিয়েই থমকে গেল। শ্রাবণ দুই হাতে করে একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়ার ডাল নিয়ে ফিরে আসছে। শুধু ফুল নয়, ছোট ছোট সবুজ পাতাসহ কয়েকটা ডাল। যেন পুরো একটা লাল বসন্তই বুকে করে নিয়ে এসেছে। তার শার্টের কাঁধেও দু-একটা পাপড়ি আটকে আছে। চুল এলোমেলো। মুখে সেই ছেলেমানুষি হাসি। এসে ধারার সামনেই বসে পড়ল সে। একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—” অনেক কষ্টে পেয়েছি।”
ধারা বিস্মিত চোখে শুধু ফুলগুলোর দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি উঠল শ্রাবণের মুখে। চোখেমুখে এমন এক সরল আনন্দ, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহার সে এনে ফেলেছে। শ্রাবণ দুই হাত এগিয়ে দিয়ে বলল,
—” নাও।”
ধারা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। গলার কাছে কেমন একটা দলা পাকিয়ে উঠল। এতটুকু একটা কাজ। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে, এই মানুষটা তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসটাই এনে দিয়েছে। শ্রাবণ একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।
—” আরে… এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? নাও না।”
ধারা আস্তে বলল,
—” এগুলো আমার জন্য?”
—” না না। পাশের বাসার আন্টির জন্য। আপাতত তুমি রাখো।”
ধারা ফিক করে হাসল,
—” ছিঁড়লেন কেন?”
—” তোমার জন্য। তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওই গাছে যত ফুল আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরগুলো তোমার হাতেই মানাবে।”
ধারার বুকটা কেঁপে উঠল। চোখ দুটো আবার ভিজে এলো। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকাল। শ্রাবণ নরম গলায় বলল,
—” তুমি কথায় কথায় এত কাঁদো কেন বলোতো? এখন তো তোমায় কষ্টও দিচ্ছি না। এভাবে সবসময় আনন্দে কাঁদলেও তো মুশকিল! পরে দেখা যাবে, আদর করলেও কাঁদছো!”
ধারা চোখ বড় করে পিটপিট করে তাকাল। শ্রাবণ বুঝলো অজান্তে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” ফুলগুলো সুন্দর না?’
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৩
ধারা ভ্রু কুঁচকাল। কিন্তু চোখের কোণ ভিজেই উঠল। শ্রাবণ মৃদু হেসে ফুলগুলো আরও একটু সামনে বাড়িয়ে দিল। ধারা আর নিজেকে আটকাতে পারল না। খুব ধীরে, খুব যত্ন করে দুই হাত বাড়াল। মনে হলো, ফুল নয় বরং শ্রাবণের যত্নটাকেই হাতে তুলে নিচ্ছে। কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলো বুকে জড়িয়ে ধরতেই কয়েকটা লাল পাপড়ি খসে তার কোলে পড়ল। সে নিচু হয়ে ফুলগুলোর গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে অচেনা একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
—” ধন্যবাদ।”
