Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা গল্পের লিংক || অনামিকা তাহসিন রোজা

শ্রাবণ ধারার রূপকথা গল্পের লিংক || অনামিকা তাহসিন রোজা

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১
অনামিকা তাহসিন রোজা

মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক বাচ্চা মেয়েকে বাসর ঘরে দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শ্রাবণ। কিছুক্ষণ আগেই কবুল বলে এসেছে সে। গায়ে এখনো মেরুনরঙা পাঞ্জাবি। রীতিমতো বাবা মায়ের চাপে বাধ্য হয়েই বিদেশ থেকে ফেরামাত্র বিয়েতে রাজি হয়েছে সে, এমনকি কনের মুখ না দেখেই বিয়েতে বসতে হয়েছে শ্রাবণকে। অথচ বাসর ঘরে ঢুকেই যে এভাবে একটা চমক খাবে তা ভাবেনি। বিছানায় ফুলের সমাহারের ঠিক মাঝে বসা কিশোরী শ্রাবণকে এক পলক দেখে আরো বেশি গুটিয়ে এলো। এলোমেলো করে কোনোমতে পড়া লাল টুকটুকে শাড়িটাও জড়িয়ে নিল গায়ে, ঠোঁট চেপে ঘোমটার আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করল তথাকথিত বুড়ো লোকটাকে।

তবে এই মুহুর্তে ঘোমটার আড়ালে থেকেই ধারা আবিষ্কার করল, চাচির কথামতে তাকে মোটেই কোনো বুড়ো লোকের সাথে বিয়ে দেয়া হয়নি। তার সামনে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বেশ সুন্দর, একদম ছোট বেলায় তার দাদির মুখে শোনা সুদর্শন রাজপুত্রের মত। এত সুন্দর লোকটা তো মোটেই বুড়ো নয়। বিষয়টা ভেবেই আরো গুটিয়ে এলো ধারা। চোখ নামালো সহসা। ভয় পেলো, অজানা আশঙ্কায় ঠোঁট কেঁপে উঠলো। হুট করে মনে হলো, তাকে যদি এখন এই লোকটা মা’রে! গ্রামে যে কতবার এসব দেখেছে সে! সে তো শুনেছিল স্বামীরা নাকি অনেক খারাপ হয়, মাঝে মাঝে মা’র’ধর করে! এখন কি এই লোকটা তাকে আ’ঘাত করবে? এবার আরেকটু কুন্ঠিত হলো মেয়েটা। ঠোঁট ফুঁপিয়ে কান্না পেলো!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এদিকে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ ভাবতে থাকলো তার এখন কী করা উচিত! সে আসলেই ভাবতে পারছে না যে, কীভাবে তার বাবা এমন একটা বাচ্চা মেয়েকে তার জন্য নিয়ে এলো। মেজাজ খারাপ হলেও নিজেকে শান্ত রেখে বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। সকালে বাবার সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে।

শ্রাবণকে এগিয়ে আসতে দেখে সহসা বিছানা থেকে নামলো ধারা। চুড়ির রিনঝিন শব্দে মুখরিত হলো নীরবতা। শ্রাবণ বোঝেনি কেনো মেয়েটা হুট করে লাফ দিল। পুরোপুরি বিছানার কাছে আসতেই ধারা দ্রুততার সহিত ঝুঁকে শ্রাবণের পা ছুঁয়ে সালাম করল। পায়ে কোমল হাতের স্পর্শ পেতেই চমকালো শ্রাবণ, কিন্তু নড়লো না। ভ্রু কুঁচকে রইলো। সালামের পাঠ চুকিয়ে দাঁড়ালো ধারা, ঘোমটাটা এখনো গলা অব্দি। মাথা নিচু করেই হাত কচলাতে শুরু করল। এখানে বসিয়ে রেখে তখন তাকে এক খালা বলেছিল, যাতে উনি আসলে পা ছুঁয়ে সালাম করে।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো মেয়েটার ছটফটানি, কেনো এভাবে মুঁচড়াচ্ছে মেয়েটা। সে কি কিছু বলেছে, নাকি করেছে? কী বলবে তা বুঝতে না পেরে শ্রাবণ লক্ষ্য করল গরমে মেয়েটা হয়তো ছটফট করছে, তাই ফট করে বলল,

—” ঘোমটা উঠিয়ে নাও!”
“স্বামীর সব কথা শুনবি”— বারবার এই কথা বলা হয়েছে ধারাকে। সর্বদা নাকি স্বামীর সব কথা মেনে চলতে হয়, নাহলে আল্লাহ বেজার হয়। গুরুজনের কথা মনে রেখেছে ধারা, তাই সে বাধ্যের মত দুহাত উঠিয়ে ঘোমটা উঠিয়ে ফেলল। সাথে সাথে লাল হয়ে যাওয়া রক্তজবার ন্যায় মুখশ্রীর দেখা পেলো শ্রাবণ। স্নিগ্ধ মুখটা চোখে পড়তেই কুঁচকানো ভ্রুজোড়া শিথিল হয়ে এলো। গাঢ় করে কাজল দেয়া টানাটানা চোখটা নিচে নামানো, সদ্য ফোটা কৃষ্ণচূড়ার মতো লালিমা তার গালজোড়া রাঙিয়ে তুলেছে। বয়সের কৈশোরসুলভ স্নিগ্ধতা আর ভয়ের মিশেল থাকা মুখটা যেন অবিচারিত সুন্দর্য্যের নিঃশব্দ প্রতিবাদ। পাতলা গোলাপি ঠোঁটজোড়া ক্ষীণ কাঁপছে ধারার। নাকের পাশে ছোট্ট তিলটা মুহুর্তেই নজরে এলো শ্রাবণের।

সাথে সাথে ঢোক গিলল শ্রাবণ। কি এক পরিস্থিতিতে পড়ল সে? ধারা বুঝলো না কিছু। লাল রঙা শাড়িটা তার কোমল হাত দুটো আঁচল জড়িয়ে ধরেছে বাচ্চাদের মত, যেন নিজেকে কোনোভাবে আগলে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস। ছোট ছোট চুলগুলো কপালে এসে সুড়সুড়ি দিয়ে বিরক্ত করলে ধারা চুড়ি পরিহিত হাতটা উঠিয়ে ঠিক করল চুল। ঘামে ভেজা কপালটা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নিল।
শ্রাবণ এবার ঠোঁট কাঁমড়ে তাকালো ধারার দিকে। এক মুহুর্তের জন্য আবিষ্কার করল মেয়েটার বয়স কম, তবে স্নিগ্ধতা অফুরন্ত। গলা ভারী হয়ে এলো তার। চোখ সরিয়ে নিল সেই মুখ থেকে। কারণ তার সামনে থাকা এই কিশোরী মেয়েটা কোনো স্ত্রী নয়, একেবারে শিশু। কোনো ভালোবাসার উদ্রেক হলো না তার ভিতর, বরং জেগে উঠল প্রবল এক মায়া।
কিছুক্ষণ ভেবে নিজেকে বুঝ দিল শ্রাবণ। ধারার দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, কোনো সিদ্ধান্ত শোনার অপেক্ষাতেই আছে। ওর এমন উৎসুক দৃষ্টিতে অপ্রস্তুত হলো শ্রাবণ। গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—” নাম কী তোমার? ”
ধারা ঠোঁট ভেজালো,শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়ে মিনমিন করে বলল,
—” ধারা।”
শ্রাবণ মাথা নাড়লো। এর মধ্যে উপলব্ধি করল মেয়েটার কন্ঠটাও অনেক স্নিগ্ধ, অনেক মায়াময়। এত সুন্দর সাবলীল সংযত কন্ঠ তো আজকালকার মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় না। অথচ কি মিষ্টি লাগে একটা মেয়ের কোমল কন্ঠস্বরে। শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
—” সোফায় ঘুমোতে পারবে?”
ধারা আড়চোখে পাশে থাকা সোফাটা দেখে নিল ৷ শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আবারো বাধ্যের ন্যায় মাথা নেড়ে জানালো,

—” জ্বি পারব।”
শ্রাবন সন্তুষ্ট হলো। তার এমনিতেও কেনো যেন খুব অসস্তি হচ্ছে। ভালো লাগছে না কিছুই! বিদেশ থেকে ফিরে যে তাকে বাচ্চা একটা মেয়েকে বিয়ে করতে হবে, এটা আগে জানলে ফিরতোই না সে। দ্রুততার সাথে শ্রাবণ বিছানা থেকে ফুল ঝেড়ে ফেলে একটা বালিশ নিয়ে সোফায় রাখলো। এরপর বাম হাতে নিজের ঘাড় ডলে বলল,
—” ঘুমিয়ে পড়ো তাহলে।”
বলতে দেরি, কিন্তু ফট করে বিছানায় শুয়ে পড়তে দেরি করল না শ্রাবণ। ওদিকে মুখ ফিরে চোখ বুঁজে ফেলল লোকটা।

এদিকে ধারা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো শ্রাবণের পিঠের দিকে। অবাক হলো এত সুন্দর ব্যবহারে। তাকে বকাবকি করল না, গ্রামের লোকগুলোর মত মারল না? ভেবেই মুচকি হেসে শোকর আদায় করল সে।
গ্রামের মেয়ে ধারা, ছোট্ট বেলায় বাবা মা কে হারিয়ে যখন সে চাচা-চাচির বোঝা হয়ে দাঁড়ালো। তখনই মায়া করে টাকার বিনিময়ে শ্রাবণের বাবা সামিউল সাহেব ধারাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, কোনো ভালো ছেলে পেলেই ধারাকে বিয়ে করিয়ে দিবেন, কিন্তু তার নিজের ছেলে এরমধ্যে বিদেশ থেকে ফিরে এলেই মাথায় বুদ্ধি উদয় হয় তার। ধারার মত এত লক্ষী মেয়েটাকে ছাড়তে ইচ্ছা হলো না আর, তাই নিজের ছেলে শ্রাবণের সাথেই বিয়ে পড়িয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু বেচারি ধারা কিছুই বুঝতে পারেনা। তাকে যখন গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হলো, তখন তার চাচি তাকে বলেছে,— তোকে বুড়ো লোকের সাথে বিয়ে দেবে। এ নিয়ে ভীষণ মন খারাপও হয়েছে ধারার। কিন্তু ছোট্ট থেকেই অবহেলায় জর্জরিত মেয়েটা আর মুখ খোলেনি। যদিও এখন সে বুঝতে পারলো লোকটা মোটেই বুড়ো নয়।

প্রচুর গরম লাগছে ধারার। তাই কোনোমতে সোফার কাছে গিয়ে বসে লোকটার কথামত শুয়ে পড়ল। তবে শোয়ার আগে পরনের শাড়িটা আলগা করল ধারা। আগে কখনো এমন ভারি কাচের শাড়ি পড়া হয়নি তার। খুবই অসস্তি লাগছিল এইভাবে থাকতে। ধারা শুয়ে পড়তেই হুট করে শ্রাবণের গুমোট কন্ঠ ভেসে আসলো,
—” লাইট অফ করলে ভয় পাবে?”
সহসা চোখ ফেরালো ধারা। দেখলো, লোকটা ওদিকে ফিরেই কথাটা বলেছে। তাকে দেখছে না কেনো, কে জানে। কিন্তু কথাটা শুনে কিঞ্চিৎ হাসলো ধারা, সে শুনেছিল শহরের বড়লোকেরা আলো নিভিয়ে ঘুমোয়, তাই সে ধীর কন্ঠে আওড়ালো,

—” আমি অন্ধকারে ভয় পাইনা। আপনি আলো নিভিয়ে দিতে পারেন!”
এবার পিঠ ফিরিয়ে থাকা শ্রাবণ ওভাবেই ভ্রু কুঁচকালো। আজব তো! মেয়েটা কি একটু বেশিই অদ্ভুত! কথাটা এমন ভাবে বলল যেন অন্ধকারে থেকেই অভ্যস্ত। অত কিছু ভাবার আর সময় পেলো না শ্রাবণ। তীব্র মাথা যন্ত্রণায়, আর এমন এক কান্ড হওয়ায় মেজাজ চরম খারাপ তার। এক লম্বা ঘুমের প্রয়োজন টের পেয়েই চট করে লাইট অফ করে চোখ বুঁজলো শ্রাবণ। আপাতত সবকিছু ভুলে গিয়ে আরাম করে ঘুমানোর আয়োজন করে ফেলল। অথচ অন্ধকারেই সেই আবছায়া লোকের পিঠটার দিকে তাকিয়ে রইলো ধারা।

লোকটা কেনো তার দিকে পিঠ করে ঘুমিয়েছে, আবার এক বিছানাতেও ঘুমোতে দিল না! কেনো? তাকে কি অপছন্দ করছে? ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না পেলো ধারার। ভয় পেলো একটু! ছোট থেকেই তো সে চাচা-চাচির অত্যাচারে নির্মমভাবে জর্জরিত হয়ে এসেছে। এসব কথা শুনে অনেকেই তাকে বলত, তার চাচা-চাচি তাকে পছন্দ করে না বলেই তাকে মারধর করে। এখন কি এই লোকটাও তাকে মারধর করবে? চিন্তায় ভয়ে আতঙ্কে সারারাত আর ঘুমোতে পারল না ধারা।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২