Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৬
‎আফীফা আফনান

হুমার ফ্ল্যাটের যে রুমটা এতদিন নির্জনতা আর বিষণ্ণ একাকীত্বে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল, আজ সেখানে যেন এক আনন্দের জোয়ার নেমে এসেছে। ছোট পুঁচকুর এই ছোট্ট আগমনী বার্তা যেন রুমের প্রতিটি কোণে কোণে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অন্যরকম মুগ্ধতা ও চঞ্চলতা।
দশটি দিনের পরিশেষে ​পুঁচকুকে নিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখতেই মেহুল রীতিমতো চমকে উঠল! বিস্ময়ে যেন তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। কারণ, হুমা পুরো রুমটাকে সাজিয়ে ফেলেছে রঙ-বেরঙের বেলুন আর মিষ্টি সব সফট টয়েজ দিয়ে। মেহুল কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে হুমা এত স্বল্প সময়ে এমন একটি সারপ্রাইজ গুছিয়ে রাখবে। তাই সকাল থেকে তার এতো কল করে খবর নেওয়া।

মেহুল চারপাশে নজর বুলিয়ে পরখ করলো, ​রুমের চারপাশটা চমৎকার করে সাজানো সেই সাথে ঠিক মাঝখানের টেবিলটিতে রাখা সুন্দর একটি চকলেট কেক। মেহুল অনুধাবন করলো সাজসজ্জার প্রতিটি সূক্ষ্ম ছোঁয়ায় যেন প্রকাশ পাচ্ছিল হুমার মেহুল আর পুঁচকুর প্রতি না বলা এক বুক উপচে পড়া ভালোবাসা। এরপর আরকি হুমার জোড়াজুড়িতে দেরি না করে পুঁচকুকে কোলে নিয়েই মেহুল আর হুমা হাসিমুখে কেক কাটল।
​কেক কাটা শেষে পুঁচকুকে হুমার জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে মেহুল ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকল।

​খানিক বাদে ফ্রেশ হয়ে এসে মেহুল খাটের পাশে পা ছড়িয়ে বসল। হাতে হুমার তার জন্য বেড়ে রাখা কেকের প্লেট, সে মন দিয়ে কেক উপভোগ করছে। আর অন্যদিকে হুমা খাটের ওপর তোশকে শুইয়ে রাখা পুঁচকুর সামনে একটা ঝুনঝুনি নিয়ে আহ্লাদে মেতে উঠেছে। তখন ঘরজুড়ে কেবল হুমার মিষ্টি, আল্লাদি কণ্ঠ ভেসে বেড়াচ্ছে। মেহুল তা দেখে ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে আবারও কেক খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিল।

এদিকে ​পুঁচকুর চিবুকে ঝুনঝুনি ছোঁয়াতে ছোঁয়াতেই হঠাৎ হুমা মুখ উঁচিয়ে মেহুলের দিকে তাকাল, “হ্যাঁ রে মেহু, তোদের আজ ফিরতে এত লেট হলো কেন? হাসপাতাল থেকে তো আরও ঘণ্টাখানেক আগেই বের হয়েছিলি, তাহলে এত দেরি?”

​মেহুল চামচে করে কেক মুখে পুরে নিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল, “আর বলিস না! মাঝপথে হুট করে গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”

​হুমার হাত থমকে গেল, “কী বলিস! কী হয়েছিল গাড়ির?”

​”ড্রাইভার বলল ব্রেকে নাকি সমস্যা।”

​”ওহ! এইজন্য এত দেরি,” হুমা একটু ভেবে আবার শুধাল, “তা তখন তোদের নিচে নামিয়ে দিয়ে ওটা কার গাড়ি চলে গেল? গেটের সামনে দাঁড়ানো ছিল যে! আবার ক্যাব নিয়েছিলি নাকি?”

​মেহুল মাথা নাড়ল, “নাহ। চেয়েছিলাম তবে ওই নির্জন জায়গায় নতুন করে ক্যাব বুক করলে আসতে অনেক দেরি হতো। তাই না চাইতেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই লিফট নিয়ে নিয়েছিলাম।”

​হুমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “খুব ভালো করেছিস। নাহলে এতগুলো জিনিসপত্র আর পুঁচকুকে নিয়ে যা ঝামেলার মধ্যে পড়তিস!”

​”হুম, ভাগ্য ভালো যে লিফটটা পেয়ে গিয়েছিলাম,” মেহুল কেকের প্লেটটা পাশে রেখে বলল, “বোকামি করে যদি ক্যাবের আশায় বসে থাকতাম, তবে হয়তো আরও ১-২ ঘণ্টা আটকে থাকতে হতো। প্রথমে আমি তো লিফট নিতেই চাইনি , নেহাত সাথে পুঁচকু ছিল তাই রাজি হলাম। এখন ভাবছি না নিলে হয়তো বড় কোনো বিপদে পড়তাম।”

​হুমা এবার ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, “কেন? লিফট নিতে চাসনি? তেমন সমস্যা থাকলে আমাকে কল করতে পারতি। আর গাড়িটাই বা কোথায় নষ্ট হয়েছিল?”

​”ওই যে আঁকাবাঁকা মোড়টা পার হয়ে আসার সময় যে জঙ্গল মতো একটা এলাকা পড়ে না? ওখানে।”

​”ওখানে!” হুমার মুখ এক লহমায় ফ্যাকাশে হয়ে গেল, “আল্লাহ! ওই এলাকা তো ভীষণ নির্জন! ভালো করেছিস তুই লিফট নিয়ে উঠে পড়েছিস। ভরসন্ধ্যাবেলা, তার ওপর তুই একা একটা বাচ্ছা নিয়ে—বড় কোনো বিপদ হতেই পারত!”

​মেহুল খানিকটা থেমে চুলে তোয়ালে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল, “হুম… তাই ভাবছি লোকটার সাথে আবার কখনো দেখা হলে আবারও একটা প্রপার থ্যাংকস দিয়ে দেব।”

​হুমা ফিক করে হেসে উঠলো, “তুই কি লোকটাকে চিনিস নাকি যে আবার দেখা হবে?”

​”হুম, চিনি তো!” মেহুল মুখ বেঁকিয়ে বলল, “প্রায়ই কাকতালীয়ভাবে লোকটার সাথে দেখা হয়ে যায়। আর যখনি দেখা হয়, উল্টাপাল্টা কথা বলে আমার মেজাজ গরম করে দেয়! তবে আজকে আশ্চর্যভাবে একদম চুপচাপ ছিল।”

​হুমার কৌতূহল এবার চরম সীমায় পৌঁছাল, “তুই কার কথা বলছিস মেহু? কার থেকে লিফ্ট নিয়েছিস তুই! কে সে?”

​মেহুল খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল, “তোর ওই ক্রাশ… সালমান শাহ নেওয়াজ!”

​”কীইইইই?” হুমায়রার চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো! সে ঝুনঝুনিটা পাশে ফেলে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “তুই বলছিস তখন উনি এসেছিলেন তোকে ড্রপ করতে? সিরিয়াসলি?”

“আস্তে হুমা! পুঁচকু ঘুমাচ্ছে।” মেহুলের কথাতে হুমা ও মেহুল দুজনেই ঘুমন্ত পুচকুর দিকে তাকালো”

“তুই সত্যি বলছিস মেহু!”

​মেহুল শান্ত কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ। কেন, তখন তো নিচে গাড়ি দাঁড়ানো ছিল, তুই দেখিসনি?”

​”নাহ!”—বলেই হুমা এক লাফে খাট থেকে নেমে সোজা দৌড় দিল বারান্দার দিকে!

হুমাকে যেতে দেখে ​মেহুল পেছন থেকে হাঁক ছাড়ল, “এই হুমা! কই যাচ্ছিস এভাবে?”

​কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। ততক্ষণে হুমা বারান্দায় গিয়ে গ্রিল ধরে নিচে ব্যগ্র চোখে তাকাল। চারপাশের আলো-আঁধারিতে ব্যাকুল হয়ে খুঁজল—আশেপাশে কোথাও কি সালমানের সেই রাজকীয় কালো গাড়িটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে কিনা? কিন্তু না, রাস্তা একদম ফাঁকা। অতঃপর প্রত্যাশিত সফলতা না পেয়ে হতাশার এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে কাঁধ ঝুলিয়ে আবারও ঘরের দিকে পা বাড়ালো, ঘরে ফিরে এলো।

হুমা আসতেই ​মেহুল অবাক হয়ে বলল, “কীরে, হঠাৎ দৌড়ে কোথায় গেলি?”

​হুমা মুখ হাঁড়ি করে বলল, “বারান্দায়…”

​”কেন?”

​”দেখতে গেলাম গাড়িটা এখনো নিচে দাঁড়িয়ে আছে কি না।”

​মেহুল চোখ মুখ ঘুরিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই কি সম্পূর্ণ পাগল হয়েছিস হুমা? আমরা বাড়িতে এসেছি প্রায় আধঘণ্টা হতে চলল! উনি এতক্ষণ নিচে গাড়ি নিয়ে তোর জন্য বসে থাকবেন নাকি?”

​হুমা একগাল বিষণ্ণতা নিয়ে মেহুলের পাশে এসে বসল, “তুই আমাকে আগে কেন বললি না মেহু যে গাড়িতে সালমান ছিল? একটা বার অন্তত দূর থেকে চোখে দেখে মনটা জুড়াতাম…”

​মেহুল বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকাল, “ধুর! চুপ থাক তো! আমি বুঝি না এই অদ্ভুত লোকটা কীভাবে কারও ক্রাশ হতে পারে! দেখলে আমার এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। যখনি দেখা হয়েছে, অদ্ভুত সব হাবভাব আর ভুলভাল বকেছে।”

​হুমা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল, “একদম ওমন বলবি না মেহু! তুই জানিস উনি কেমন ব্যক্তিত্ববান মানুষ? কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে ভুল করেও তাকান না উনি! তুই নিশ্চিত অন্য কারও সাথে গুলিয়ে ফেলছিস।”

​মেহুল ধপ করে বালিশে মাথা রেখে গায়ের ওপর চাদর টেনে বলল, “একদম না! এই পর্যন্ত আমার ওনার সাথেই দেখা হয়েছে… যতবারই হয়েছে মানুষটা উনিই ছিলেন!”

হুমা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল, “কী এমন বলেছে উনি তোকে?”

​”প্রথমবার দেখা হয়েছিল তখন বলেছে আমি নাকি…” মেহুল কথা শেষ না করে থেমে গেল। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আরে, বাদ দে তো ওসব যতোসব পাগলের কারবার!”

​ “উহু! এখন এমন বললে তো হবে না। বল বল, কী বলেছে আমি শুনব!”—হুমা নাছোড়বান্দার মতো মেহুলের হাত ধরে চাপ দিল।

হুমার জোড়াজুড়িতে থাকতে না পেরে অবশেষে ​মেহুল হালকা নিশ্বাস ফেলে বলল, “ওই দিন হাসপাতালে যখন থ্যাংকস জানাতে গেলাম, তখন বলল…”

​ “উনাকে তুই হাসপাতালে কোথায় পেলি?”—হুমা অবাক হয়ে মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিল।

​”এসেছিলেন তো! পুঁচকু যে কেবিনে ছিল, সেই করিডোরেই দেখা হয়েছিল।”

​ “তখনও আমাকে একটু বলিসনি?” —হুমা চোখ বড় বড় করে বলল।

​মেহুল মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আমি কি তখন জানতাম নাকি যে উনি তোর ‘কেরাসিন তেল’!”

“মেহু!”—​হুমা চোখ কুঁচকে কড়া গলায় ডাকলো।

সঙ্গে সঙ্গে ​মেহুল দুই হাত কানে দিয়ে হাসল, “ওকে ওকে, সরি, সরি!”

​”তারপর? এরপর কী হলো জলদি বল মেহু!”

​”এরপর আর কী! আমি ভদ্রতা খাতিরে থ্যাংকস বলতে গেলাম, আর উনি কিনা আমাকে সোজা বিয়ে, সংসার, বাচ্চা—এসব আবল-তাবল শোনানো শুরু করলেন!”

​হুমা চরম বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল, “কী বলিস! লাইক… সিরিয়াসলি, মেহু?!”

​মেহুল মাথা নাড়ার ভঙ্গিতে বলল, “একদম! আমি কেন তোকে মিথ্যা কথা বলতে যাব?”

​হুমা এবার খাটের ওপর সোজা হয়ে বসল। তার ভ্রূ জোড়া চিন্তা আর সন্দেহে কুঁচকে আছে, “উনি তোকে এসব কেন বলবেন? তোরা কি আগে থেকে একে অপরকে চিনিস?”

​”উহু! আমি তো উনাকে ফার্স্ট সেই ক্যাম্পেই দেখলাম। আর উনি যে এখানকার এমপির ছেলে, তাও প্রথম তোর মুখেই শুনলাম তাও হাসপাতালে। তাহলে আগে থেকে চেনার তো প্রশ্নই ওঠে না!”

​হুমা গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেল। মেহুল নিজের মতো করে যুক্তি দেখিয়ে বলল, “আমার কী মনে হয় জানিস? লোকটার সম্ভবত মাথায় কোনো মারাত্মক প্রবলেম আছে! নাহলে এভাবে হুট করে অচেনা-অপরিচিত কাউকে কেউ এসব বলে?”

​হুমা খুব ধীরস্বরে গহিন গলায় বলল, “অন্যটাও তো হতে পারে…হয়তো অন্য কিছু!”

​মেহুল অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কী অন্যটা?”

​মেহুল প্রশ্নটা করল ঠিকই, কিন্তু হুমার আর উত্তর দেওয়া হলো না। কারণ ততক্ষণে তোশকে শুয়ে থাকা পুঁচকুটা জেগে উঠে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠেছে!

​আর সেই কান্নার সুর শুনে দুজনেই এক লহমায় বুঝে গেল এই কান্নার মূল কারণ কী। অতঃপর হুমা দৌড়ে গিয়ে বারান্দা থেকে ময়লার ডাস্টবিনটা নিয়ে এলো, আর মেহুল চটজলদি ড্রয়ার থেকে নতুন একটা ডায়াপার হাতে নিয়ে খাটের ওপর বসল।
​মেহুল যখন পুঁচকুর সাথে মিহি স্বরে কথা বলতে বলতে ওর ডায়াপার চেঞ্জ করে দিচ্ছিল, তখন হুমা কেবল নিঃশব্দে ওর পেছনে এসে দাঁড়াল।
​বাইরে শান্ত নীরবতা ছেয়ে গেলেও হুমার মস্তিষ্কের ভেতরে তখন মেহুলের বলা কথাগুলো যেন ঢোলের মতো বিকট শব্দে পিটিয়ে বেড়াচ্ছে!

​হঠাৎ সালমান শাহ নেওয়াজের মতো এক পরাক্রমশালী, গম্ভীর পুরুষ তার বান্ধবীকে এসব কথা বলতে যাবে কেন? আর মেহুল যে ধাচের মেয়ে, তাতে করে ও যে মিথ্যা বানাবে বা বলবে—সেই জো-ও নেই। ​তবে কি এই সাধারণ দেখা সাক্ষাৎ আর কথপোকথন এর আড়ালে সম্ভাব্য কোনো গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে, যা মেহুল নিজেও জানে না… কিন্তু সালমান শাহ নেওয়াজ খুব ভালো করেই জানে?

—————★—————

সালমানের জীবনে প্রেমের আগমন ঘটেছিল ঠিক এক অনাকাঙ্ক্ষিত রজনীতে।
​সেদিন আকাশে জমেছিল ঘনকালো মেঘের ঘনঘটা, আর বাতাসে ছড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত শীতল আবেশ। বরাবরই সালমান ছিল বেশ গম্ভীর, জেদী এবং ভীষণরকম একরোখা স্বভাবের এক পুরুষ। কিন্তু এক দিন আকস্মিক তার জীবনের গতিপথে মেহুল নামের এক সপ্তদশী ডানা ঝাপটানো পাখির আগমন ঘটে। তখন ছিলো বর্ষাকাল আর সালমান ছিলো সিলেটে। সিলেটের আদিম ও স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের মাঝে যে তার এই বাঁধাধরা নিয়মানুবর্তী জীবনে হঠাৎ করে এক মহাপ্রলয় ও পরিবর্তনের আগমন ঘটতে যাচ্ছে—হয়তো সেদিন প্রকৃতিও তা খুব সূক্ষ্মভাবে আন্দাজ করতে পেরেছিল! তাই তো পুরো পরিবেশ সেদিন সেজে উঠেছিল তার আপন অনিন্দ্য রূপ নিয়ে।

​বাবার সুবিশাল ব্যবসায়িক খাতিরে সালমানের প্রায়শই সিলেটে আসা-যাওয়া লেগেই থাকত। কিন্তু সেবার বাবার ব্যবসায়িক কাজের পাশাপাশি কিছু অতি-গোপন ব্যক্তিগত বিষয়ের তাগিদে বিশ্বস্ত ভাইয়ের মতো ছায়াসঙ্গী রবিকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে পা রেখেছিল সে।

​পরপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আর অফিসের সব জটিল কাজ দিনভর একহাতে সামলাচ্ছিল সালমান। অতঃপর বিকেলের দিকে কাজ শেষ হতেই সে রবি সহ গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।

​গাড়িতে ওঠার সময় পাশে থাকা রবি হালকা গলায় শুধাল, “ভাই, সব মিটিং তো শেষ। এখন কি সরাসরি সার্কিট হাউসের দিকে যাব নাকি ঢাকার ফ্লাইট ধরব?”

​সালমান জানালার কাঁচ নামিয়ে দূরের উঁচু টিলাগুলোর দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলল, “না রবি, আপাতত কোথাও যাচ্ছি না। সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় আর ভালো খাবারের দোকানটায় চলো। সেখান থেকে কিছু কেনার আছে, তারপর অন্য এক জায়গায় যেতে হবে।”

​রবি সালমানের কথাতে একটুও অবাক হলো না আর না কোনো প্রশ্ন করলো শুধু গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। কারন সেও জানতো সালমান এরপরে কোথায় যাবে। এরপরেই তাদের গাড়ি সিলেটের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আর দৃষ্টিনন্দন ঐতিহ্যবাহী বাজারটিতে গিয়ে থামল। পুরো বাজার ঘুরে সেখানকার জনপ্রিয় ও নামকরা খাবারের দোকানগুলো থেকে সাতকড়ার খাঁটি আচার আর এখানকার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু চালের ফিরনি সহ আরো কিছু খাবার খুব যত্ন করে কিনে নিল সালমান।

পরবর্তীতে​ প্যাকেটগুলো রবির হাতে দিয়ে সালমান ধীরপায়ে আবারও গাড়িতে এসে বসল। সে বসতেই​রবি জিনিসগুলো পেছনের সিটে রেখে ড্রাইভিং সিটে বসে আয়নায় সালমানের দিকে তাকাল, “ভাই, এখন?”

​সালমান গম্ভীর কন্ঠে বলল, “স্কাউট ট্রেনিং সেন্টারের দিকে যা।”

“ঠিক আছে ভাই, এখনই রওনা হচ্ছি।”— ​রবি মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল।

​গাড়িটা যখন উঁচু টিলার আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মূল গেটের দিকে এগিয়ে চলল। তখন রোদ-মেঘের লুকোচুরি আর হিমেল বাতাসের মাঝে সালমান জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। কিন্তু সে জানত না—এই হঠাৎ সফর কেবল সেই প্রিয় মানুষের সাথে দেখা করতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়ালে এখানেই তার জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে যাবে!

​রবি আর সালমান যখন উঁচু টিলার ওপর গড়ে ওঠা সেই স্কাউট ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশের পরিবেশজুড়ে এক অনন্য কর্মচাঞ্চল্য। বিভিন্ন বয়সী স্কাউট সদস্যরা তখন সারিবদ্ধ হয়ে নানা রকমের শারীরিক কসরত ও ট্রেনিং অ্যাক্টিভিটিতে মেতে রয়েছে। এদিকে ​প্রশিক্ষণ চলায় সেই মুহূর্তে প্রাঙ্গণের ভেতরে সর্বসাধারণের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ছিল। তাই বাধ্য হয়ে সালমান ও রবি দুজনকেই বাইরে অপেক্ষা করতে হলো।

​রবি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “ভাই, ভেতরে ঢুকতে তো এখন কড়া বারণ। আমরা কি এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব, নাকি প্রধান স্যারকে একটা ফোন দিয়ে জানাব আমরা এসেছি?”

​সালমান হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল, “থাক, ফোন দেওয়ার দরকার নেই। ট্রেনিংয়ের নিয়ম ভাঙা ঠিক হবে না। দূর থেকে দাঁড়াই, প্র্যাকটিস শেষ হলেই ভেতরে যাওয়া যাবে।”

দেখতে দেখতে ​খানিক বাদে প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ শেষ হতেই প্রাঙ্গণের মূল ফটক উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। সালমান আর রবি ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খোঁজার উদ্দেশ্যে। বিশাল ময়দানের এপাশ-ওপাশ চোখ বুলিয়ে খুঁজতে খুঁজতে একপর্যায়ে ঠিকই মানুষটিকে দেখতে পেল তারা। অতঃপর ​সালমান ধীরপায়ে সেদিকে পা বাড়াবে—ঠিক তখনই!

​হঠাৎ এক অলৌকিক অচিন টানে থমকে দাঁড়াল সালমান শাহ নেওয়াজ। বুকের গভীর থেকে একটান দিয়ে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল তার হৃদস্পন্দন!
​চোখের সামনে ধরা দিল এক অপরূপ মায়াবী দৃশ্য—এক সপ্তদশী!

​স্কাউটের ধবধবে শুভ্র পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্মে এক প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো তার অপ্সরা। দু-পাশে দুটো ঝুটি করা চুল বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে দোল খাচ্ছে, আর নিষ্পাপ ঠোঁটে লেগে আছে একরাশ প্রাণবন্ত, চঞ্চল হাসি! আর তার সেই শুভ্রতা আর চপলতার আবেশ সালমানকে যেন এক পলকেই নিঃশব্দে খুন করে দিয়ে গেল!
​ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশে এতোক্ষণ ধরে জমতে থাকা কালো মেঘ গুলো গুরগুর করে ডেকে উঠল, আর তারওপরে ঝলসে উঠলো বিজলীর তীব্র আলো। চারপাশের সবাই যখন বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচতে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি শুরু করল, সেই চঞ্চল রমণীর মাঝে কিন্তু বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই! বরং ​আকাশ ভাঙা সেই বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাগুলো গায়ে পড়তেই যেন মেয়েটার ঠোঁটের কোণের ওই মিষ্টি হাসিটা আরও চওড়া হয়ে উঠল। সে কোনো কিছুর পরোয়া না করে পরম আনন্দে দু-হাত দু-পাশে মেলে ধরল বৃষ্টির পবিত্র জলে ভিজবে বলে।

​প্রকৃতির এই মেহক আর স্নিগ্ধতার মাঝে সপ্তদশীর এভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া দেখে সালমানের বুকের ভেতরের সময় যেন থমকে স্থির হয়ে গেল। পাথর হয়ে যাওয়া চোখে সালমান কেবল তাকিয়ে রইল—আর অনুভূতির অতল গহীনে নিঃশব্দে লেখা হয়ে গেল এক গোপন ভালোবাসার নতুন অধ্যায়।
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবি সালমানের এই আচমকা থমকে যাওয়া দেখে কৌতূহল নিয়ে শুধাল, “ভাই? কী হলো? এভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন যে? ভিজে যাচ্ছেন তো চলুন ওইদিকে…”

​সালমান চোখ না সরিয়েই অত্যন্ত নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “চুপ থাক রবি। একটা শব্দও বলবি না…”

​রবির দৃষ্টি সালমানের চোখ অনুধাবন করে সোজা গিয়ে পড়ল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা সেই রূপসী মেয়েটার ওপর। রবির বিস্ময়ের সীমা রইল না—যে লোকটা সারা জীবন নারীজাতি থেকে এক হাজার হাত দূরে থেকেছে, যার হৃদয় ছিল বরফের মতো কঠিন আর নিখাদ পাথরে বাঁধানো, সেই পুরুষের নজর আজ কোনো এক নামহীন অজ্ঞাতনামা মেয়ের ওপর আটকে গেছে!

এদিকে​ সেই শক্ত পাথরের মত বুকে তিরের মতো এসে বিঁধেছে এক সপ্তদশী রমণী। নামহীন, পরিচয়হীন সেই তরুণী সালমানকে এমন জাদুকরি আবেশে ঘায়েল করেছিল যে, মাত্র দুদিনের জন্য ব্যবসায়িক কাজে সিলেটে যাওয়া সালমান একে একে কাটিয়ে দিয়েছিল পুরো সাত-সাতটি দিন!
​প্রতিদিন এই ট্রেনিং সেন্টারের সীমানায় এসে সালমান ছায়ার মতো দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু তীব্র ইচ্ছে আর বুকভাঙ্গা আকুলতা থাকা সত্ত্বেও সে কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস করেনি—পাছে এই অপ্রস্তুত আকস্মিকতায় মেয়েটি ভয় পেয়ে যায়, কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই সে বাধ্য হয়ে কেবল দূর থেকেই ভালোবেসে গেছে সেই স্নিগ্ধ কিশোরীকে, যার চোখের চঞ্চলতা তার সমস্ত হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছিল।

​অবশেষে সাত দিন পরে না চাইতেও তাকে বাধ্য হয়ে ফিরতে হয়েছিল আপন নীড়ে। কিন্তু এরপরে সালমান যখন আবারও সিলেটে গেলো পরের দিনগুলোতে আর কখনো দেখা মেলেনি সেই মায়াবতীর। হন্যে হয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে সালমান—নাঃ, কোথাও আর তার বিন্দুমাত্র হদিস মেলেনি।

​সময়ের নিয়মে সেই স্মৃতি একটু একটু করে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু সালমান হার মানেনি। অবশেষে একদিন হঠাৎ আবার তার হদিস এসে পৌঁছাল তার দোরগোড়ায়!
​এবার আর কোনো ভুল হলো না। সেবার পাছে কেউ কিছু বলে, বা সমাজ-সংসার কী ভাববে—এই সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে সে পিছু হটেছিল। কিন্তু এবার আর তা হতে দেয় নি সালমান শাহ নেওয়াজ। সে যা একবার নিজের বলে হিয়াতে গেঁথে নিয়েছে, তা যেকোনো মূল্যে নিজের করে ছাড়বে। তাইতো এবার ভাগ্যও তার সাথেই আছে।

​”ভাই… ভাই! ভেতরে যাবেন না?”

​রবির পরিচিত ও চেনা গলার ডাকটায় গভীর অতীত আর স্মৃতির চাদর ভেদ করে এক লহমায় বাস্তবে ফিরে এলো সালমান। মনের পাতায় জমে থাকা সেই পুরোনো স্মৃতির ছবিগুলো দেখা থামিয়ে সে ধীরেসুস্থে চোখ মেলে তাকাল।
​ঠোঁটের কোণে এক গভীর, রহস্যময় ও ঠান্ডা হাসি ফুটিয়ে সে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের সেই চিরচেনা প্রখর ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্যে ভর দিয়ে সালমান গাড়ি থেকে নেমে ধীরপায়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। তার জোড়া চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সোজা সামনের প্রাচীন বিশাল অট্টালিকাটির দিকে নিবদ্ধ।

​বর্তমানে সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, এটি তার মায়ের পৈতৃক বাড়ি—অর্থাৎ তার নানা বাড়ি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক এই স্থানটিতেই একদিন এসে দাঁড়িয়েছিল মেহুল! সেদিন মেহুলের দৃষ্টিও ঠিক একইভাবে থমকে গিয়েছিল এই পুরোনো বাড়ির রহস্যময় কাঠামোর দিকে।

​অতঃপর সালমান ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়ির প্রাচীন কাঠের ভারী চৌকাঠে পা দিতেই সামনে থেকে উৎসুক মুখে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ, মতিউল ইসলাম—যাকে এই বাড়ির ছোট-বড় সবাই ভালোবেসে ‘মতি মিয়া’ বলেই ডাকতো। বর্তমানে বিশাল এই নীরব প্রাসাদে তিনি একাই পাহারাদার ও কেয়ারটেকার হিসেবে বসবাস করছেন।
​সালমানকে দোরগোড়ায় দেখতেই বৃদ্ধ লোকটির মুখে একগাল চওড়া হাসি ফুটে উঠল। তিনি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলেন, “ছোট সাহেব যে! কেমন আছেন? কতদিন পর এই ভিটায় আপনার পায়ের ধুলো পড়ল!”

​সালমান ঠোঁটের কোণে হালকা ও স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলল, “কাজের চাপে বড্ড ব্যস্ত থাকি মতি মিয়া। তবে আজ হঠাৎ তোমার কথা খুব মনে পড়ল, তাই সোজা দেখতে চলে এলাম।”

​বৃদ্ধ মতি মিয়া সানন্দে মাথা নেড়ে বললেন, “খুব ভালো করছ, খুব ভালো করছ ছোট সাহেব! আসো আসো, ভেতরে এসে বোসো।”

​সালমান রবিকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে গিয়ে প্রশস্ত ড্রয়িংরুমের পুরোনো সোফাটায় বসল। তারা বসতে না বসতেই মতি মিয়া ততক্ষণে ট্রেতে করে শীতল পানির গ্লাস নিয়ে হাজির হলেন। সালমান পরম শান্তিতে গ্লাসে এক চুমুক দিতেই মতি মিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠলেন—”রাতেন খাবারের জন্য কী রান্না করবো ছোট সাহেব? কি খবেন আপনারা?”

​সালমান মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “না মতি মিয়া, আমরা এখন কিছুই খাব না। তবে তোমার সাথে আমার বিশেষ কিছু জরুরি আলাপ আছে। বোসো আগে।”

​ছোট সাহেবের আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাধ্য মতি মিয়ার নেই। তাই তিনি বাধ্য হয়ে সালমানের ঠিক সামনের কাঠের মোড়াটায় এসে আসন নিলেন।
​ঠিক তখনই সালমান তার প্রখর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বৃদ্ধের দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “মতি মিয়া, তুমি জানো আমি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলা একদম পছন্দ করি না। তাই সরাসরি জিজ্ঞেস করছি—তুমি এই বাড়ির বহু পুরোনো সদস্য, তাই এই বাড়ির এমন অনেক কিছু আছে যা তুমি জানো, যা হয়তো আমারও অজানা। ঠিক বলছি তো?”

​মতি মিয়া কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে মাথা নিচু করে নীরবে সম্মতি জানালেন।
ঠিক তখনি ​সালমানের কণ্ঠের গাম্ভীর্য আরও খানিকটা বেড়ে গেল, “তাহলে এখন আমাকে বলো… জাবেদ শিকদার কে? কী জানো তুমি তার সম্পর্কে? আশা করছি আমার কাছে আজ কোনো কিছু লুকাবে না কিংবা মিথ্যা বলবে না।”

​’জাবেদ শিকদার’ নামটা কানে পৌঁছাতেই মতি মিয়া যেন একমুহূর্তের জন্য বরফ হয়ে গেলেন! ঘরের ভেতর নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। থমথমে থমকে থাকা বাতাসের মাঝে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন সালমানের প্রখর ও আদেশসূচক চোখ দুটো আবার তার ওপর গিয়ে পড়ল, মতি মিয়া আর চেপে রাখতে পারলেন না।
​এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ মতি মিয়া একে একে উন্মোচন করতে শুরু করলেন এক গভীর ও বিষাক্ত রহস্যের জট। অতীতে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া নির্মম সত্যের প্রতিটি পাতা যখন একে একে উন্মুক্ত হচ্ছিল, তখন ঘরের আবহাওয়া আরও বেশি ভারী হয়ে উঠছিল।

​সবটা শোনার পর সালমান কেবল এক বুক ভারাক্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার গভীর চোখের মণি দুটো জমে আসা ক্ষোভে আঁধার হয়ে এলো। সে নিজেকে সামান্য সামলে নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠল, “উনার কোনো ছবি হবে তোমার কাছে?”

​”হ্যাঁ ছোট সাহেব, পুরোনো একখান ফটো অ্যালবামে থাকার কথা।”—কথাটা বলেই মতি মিয়া চটজলদি উঠে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

​খানিক বাদে তিনি ধুলো জমে থাকা একটা পুরোনো ভারী অ্যালবামে এনে সালমানের হাতে তুলে দিলেন। অ্যালবামের পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করল সালমান। কত পুরোনো স্মৃতি, কত অপরিচিত মুখ!
​হঠাৎ এক জায়গায় এসে সালমানের বুড়ো আঙুলটা থমকে গেল। সে অ্যালবামের কাঙ্ক্ষিত ছবিটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ছবিতে তার মা বিপাশা শিকদার ও বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক বলিষ্ঠ যুবক। লোকটার চেহারার কাটিংয়ের সাথে তার মায়ের চেহারার এক অদ্ভুত ও অভাবনীয় মিল রয়েছে!

​সালমান ছবিটির দিকে আঙুল নির্দেশ করে মতি মিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শুধাল, “এটাই কি উনি?”

​মতি মিয়া চোখে চশমাটা এঁটে ছবিটার দিকে তাকালেন, তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন, “জি ছোট সাহেব, এটাই জাবেদ শিকদার। এই বাড়ির একমাত্র পোলা… আর আপনার নিজের বড় মামা!”

​সালমান ছবিটার দিকে আরও একবার প্রখর দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর অ্যালবাম থেকে ছবিটা তুলে নিয়ে ধীরপায়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
​মতি মিয়া ব্যাকুল হয়ে বললেন, “কিছু খাইবা না ছোট সাহেব? এত দূর থেকে আসলা…”

​সালমান ছবিটা পকেটে পুরে নিয়ে বলল, “পরে আরেকদিন এসে খাব মতি মিয়া। আপাতত আমার জরুরি কিছু কাজ আছে।”

​কথাটা শেষ করে সালমান যেই না দরজার দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকে গেল দোতলার সিঁড়ির পেছনের দেয়ালে! ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো-ছায়ায় সিঁড়ির গোড়ায় কারো একটা আবছা ছায়া ফুটে উঠেছে। কেউ যেন এতক্ষণ আড়ালে লুকিয়ে থেকে তাদের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল এবং সব কথা আড়ি পেতে শুনছিল!
​সালমানের চোখ সেদিকে পড়তেই ছায়াটি নিমেষে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৫

​সালমান একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম রহস্যময় ও বাঁকা হাসির রেখা। অতঃপর সে রবিকে কিছু একটা ইশারা করলো, রবি হয়তো বুঝলো সালমান কি বোঝাচ্ছে তাই সেও মাথা নাড়লো, এবং এরপরেই সালমান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল..

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here