শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮ (৩)
আফীফা আফনান
“অসভ্য শয়তান নেওয়াজ! তোকে… তোকে আমি ছাড়ব না, কিছুতেই ছাড়ব না…”
জ্বরের ঘোরে তোশক আঁকড়ে ধরে লাগাতার আবোল-তাবোল বকে চলেছে মেহুল। ধাই ধাই করে বাড়তে থাকা জ্বরের উত্তাপে তার ফর্সা গাল দুটো তখন একদম লাল টকটকে হয়ে আছে, ঠোঁট দুটো নীলচে আর শুকিয়ে কাঠ। চোখ দুটো আধবোজা, কপালে লেপে আছে ঘামের ফোঁটা—অথচ অসংলগ্ন মস্তিষ্কেও তার মুখে একটাই নাম আর চরম আক্রোশ!
এদিকে হুমা মুখ-চোখ কুঁচকে বিছানার পাশে বসে থেকে মেহুলের কপালে জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে। সে যেন ভেবেই পাচ্ছে না কী করবে!
গত মাঝরাত থেকেই মেহুলের শরীরে মারাত্মক জাঁকিয়ে জ্বর উঠেছে। অত রাতে উপায়ান্তর না পেয়ে হুম বাধ্য হয়ে মেহুলের ফোন থেকে হসপিটালের ডক্টর ফেরদৌসকে কল দিয়েছিল। ডক্টর ফেরদৌসের বলে দেওয়া ওষুধপত্র খাইয়ে হুমা ভেবেছিল—হয়তো সকালের আলো ফুটতেই মেহুল চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কিন্তু কোথায় কী! সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, এখন আকাশে সাঁঝের অন্ধকার নামতে চলল, অথচ মেহুলের জ্বর কমার কোনো নামগন্ধই নেই!
বরং শরীরের সমস্ত বোধশক্তি হারিয়ে সেই সাথে মানসিক আঘাত আর জ্বরের ঘোরে সে অবিরত সালমানকেই অভিশাপ দিয়ে চলেছে!
মেহুলের এই করুণ আর অদ্ভুত অবস্থা দেখে হুমার একদিক দিয়ে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে কিন্তু আবার অন্যদিক দিয়ে ভীষণ হাসিও পাচ্ছে। কাল রাত পর্যন্ত যে লোকটার নাম শোনার সাথে সাথে মেহুলের গা রি রি করে উঠত, যে মানুষকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে গণ্য করেছে—আজ বেঘোরে, এই তীব্র জ্বরের ঘোরেও তার মুখ দিয়ে অনবরত সেই এখন এক ও একমাত্র ওই নামই জপে চলেছে!
”উফ্ মেহু! সুস্থ থাকলে তুই হয়তো সালমানকেই খুন করতে চাইতিস, কিন্তু এখন জ্বরের ঘোরে তার নামই বলে যাচ্ছিম। যদি তুই এখন সুস্থ থাকতি তাহলে তাের চেহারাটা হয়তো দেখার মতো হতো।!”—হুমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালের জলপট্টিটা আবার ভিজিয়ে মেহুলের কপালে রাখল। ফলে মেহুল আবার হালকা ছটফট করে অস্ফুটে বলে উঠল, “শয়তান… অহংকারী শয়তান… তোকে আ…..”
হুমা মেহুলের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “হয়েছে রে মা, হয়েছে! তোর সেই শয়তান নেওয়াজকে তুই পরে সাইজ করিস, আগে জ্বরটা তো কমুক!”
কিন্তু হুমা কি জানত, মেহুলের মনের এই অবচেতন আক্রোশ আর জ্বরের ব্যাকুলতা ওদিকে অন্য আরেক জনের মনে ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে আসছে?
এদিকে মেহুলের কপালে বারবার ভিজিয়ে নেওয়া ঠান্ডা তোয়ালে চাপ দিয়েও জ্বরের উত্তাপ যেন কিছুতেই কমছিল না। সেই সাথে জ্বরের বেঘোরে তার উসখুস করা আর অসংলগ্ন বিড়বিড়ানি থামার কোনো লক্ষণ নেই। ফলে হুমা কপালের জলপট্টিটা আবার নিংড়ে মেহুলের কপালে রাখল, কিন্তু সেই সাথে চিন্তায় তার কপাল কুঁচকে উঠলো। আর
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের প্রধান দরজায় বেল বাজার তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এলো।
হুমা একটু অবাক হলো। এত সন্ধ্যায় তাদের এই ফ্ল্যাটে কে এলো? মেহুল তো হাসপাতালে যাওয়ার মতো অবস্থাতেই নেই, আর ওদিকের কাউকেও তো আসার কথা জানানো হয়নি। হুমা দ্রুত পানির বাটিটা পাশের সাইড টেবিলে রেখে মেহুলের গায়ের চাদরটা ভালোভাবে টেনে দিল। তারপর ধীরপায়ে হল পেরিয়ে গিয়ে দরজার আই-হোল দিয়ে বাইরে তাকাল।
তখনি দেখলো দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যবয়সী, শান্ত চেহারার ডক্টর ফেরদৌসী ম্যাডাম—হাতে ওনার নিয়মিত মেডিকেল কিট ব্যাগ।
হুমা চটজলদি দরজার লক খুলে একটু সরে দাঁড়াল। ডক্টর ফেরদৌসী মৃদু হেসে ঘরে পা রেখে বললেন, “কেমন আছো হুমা? মেহুল কেমন আছে? কাল রাতে ফোন করার পর সকালে তো মেহুলকে হাসপাতালে দেখলাম না। সারাদিন ওর ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম ডিউটি শেষে একবার নিজে এসেই দেখে যাই।”
হুমা ভীষণ রকমের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “আসুন আন্টি, খুব ভালো করেছেন আপনি এসেছেন! কাল রাত থেকেই মারাত্মক জ্বর উঠেছে ওর। সকালের পর থেকে ওষুধ দেওয়ার পরও কোনো উন্নতি হয়নি, উল্টো এখন তর তর করে টেম্পারেচার বাড়ছে আর জ্বরের ঘোরে উল্টোপাল্টা বকছে!”
শুনেই ডক্টর ফেরদৌসীর মুখের শান্ত ভাবটা নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর মুখে দ্রুত মেহুলের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন, “চল তো দেখি, কী অবস্থা মেয়েটার! কাল সকালেও তো দেখলাম ঠিক ছিলো হঠাৎ এক রাতের ব্যবধানে এমন জ্বর আসলো কিভাবে?
ঘরের ভেতরে ঢুকে বিছানায় ছটফট করতে থাকা মেহুলকে দেখে ডক্টর ফেরদৌসী নিজের ব্যাগ থেকে থার্মোমিটার ও স্ট্রেথোস্কোপ বের করলেন। মেহুলের হাতের কবজি ধরে পালস চেক করতেই ওনার কপাল চিন্তায় কুঁচকে গেল—শরীরটা যেন আগুনের মতো জ্বলছে!
অতঃপর থার্মোমিটারের পারদ দেখে গভীর এক নিশ্বাস ফেললেন। জ্বরের তাপমাত্রা একশো তিন স্পর্শ করেছে! তাই তিনি কালবিলম্ব না করে ব্যাগ থেকে একটা প্রেসক্রিপশন প্যাড বের করে দ্রুত কয়েকটা জরুরি ওষুধের নাম লিখে হুমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
”হুমা, শোনো! মেহুলের জ্বরটা সাধারণ থার্মাল ফিভার মনে হচ্ছে না। একটু নিচে যাও তো, নিচে দেখলাম রাস্তার অপর পাশে একটা ফার্মা শপ আছে, তুমি চট করে গিয়ে এই হাই- ডোজের সাপোজিটরি আর সিডেটিভ ইনজেকশনটা নিয়ে আসো। দ্রুত জ্বর নামাতে হবে, নয়তো বেইন স্ট্রেন হতে পারে।”
হুমা প্রেসক্রিপশনটা হাতে পেয়েই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। এক দৌড়ে নিচে গিয়ে ওষুধপত্র কিনে নিয়ে এলো। আনতেই ডক্টর ফেরদৌসী নিজ হাতে অতি দক্ষতায় মেহুলকে ইনজেকশন পুশ করলেন এবং জ্বর নিয়ন্ত্রণে আনার যাবতীয় জরুরি চিকিৎসা দিলেন।
ওষুধের প্রভাবে মিনিট পনেরোর মধ্যেই মেহুলের শরীরের প্রখর উত্তাপ একটু একটু করে কমতে শুরু করল, আর জ্বরের বেঘোরে উসখুস করা শরীরটাও আস্তে আস্তে শান্ত ও শিথিল হয়ে ভারী ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
অতঃপর সব কাজ গুছিয়ে নিয়ে ডক্টর ফেরদৌসী একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসলেন। তারপর নিজের পরনের শাড়ির আঁচলটা গুছিয়ে নিয়ে হুমার দিকে তাকিয়ে পরম স্নেহে বললেন, “হুমা, পুঁচকু সোনাটা কোথায় আছে? ওকে একটু আমার কোলে দেও তো, বাচ্চাটাকে কয়েক দিন দেখিনি!”
হুমা ততক্ষণে ডক্টর ফেরদৌসীর জন্য হালকা চা বিস্কুট আর ড্রাই কেকের নাশতার ট্রে রেডি করে ফেলছিল। তাই ট্রে-টা সেন্ট্রাল টেবিলে রেখে সে রুম থেকে কোলকাঁপানো পুঁচকুকে এনে ডক্টর ফেরদৌসীর কোলে বসিয়ে দিল। কোল পেয়েই পুঁচকু তার আধো-আধো মুখে ডক্টর ফেরদৌসীর শাড়ির প্রান্ত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল।
ডক্টর ফেরদৌসী আদর করে বাচ্চার দু-গালে হাত বুলিয়ে চুমু খেলেন। পুঁচকুর সাথে কিছুক্ষণ খেলতে খেলতেই হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন—
”আচ্ছা হুমা, আমাকে একটা সত্যি কথা বলো তো? মেহুলের হঠাৎ এভাবে এত মারাত্মক ফিভার ওঠার আসল কারণটা কী? আমার তো মনে হচ্ছে কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং মেয়েটা গভীর কোনো মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো। কিছু কি ঘটেছে?”
ডাক্তারের কথা শোনামাত্র হুমা থমকে গেল। নিজের হাতের আঙুলগুলো দুমড়াতে দুমড়াতে চোখ নিচু করে ফেলল সে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে ভাবতে লাগল—কথাটা কি ম্যাডামকে বলা ঠিক হবে, নাকি চেপে যাওয়াই ভালো?
এদিকে হুমার মনের এই দোটানা একলহমায় ধরে ফেললেন অভিজ্ঞ ডক্টর ফেরদৌসী। তিনি চা-এর কাপটা টেবিলে রেখে হুমার এক হাত পরম মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। আস্বাসের সুরে মৃদু হেসে বললেন—
”ভয় পেয়ো না হুমা। আমি শুধু মেহুলের সিনিয়র কলিগ বা ডক্টর নই, ওকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করি। তুই আমাকে নিঃসংকোচে বলতে পারো। বিশ্বাস কর, যা বলবে তা আমাদের এই ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
ডক্টর ফেরদৌসীর এই মাতৃসম আশ্বাস আর সহানুভূতি পেয়ে হুমার মনের আগল পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে আর গোপন রাখতে পারল না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হুমা আগের দিন সকালের হাসপাতালের করিডোরে নার্সদের সেই বিষাক্ত মুখরোচক গসিপ থেকে শুরু করে—মেহুলের ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা, সালমানের ওপর চড়াও হওয়া, স্যান্ডেল দিয়ে প্রকাশ্যে আক্রমণের চেষ্টা এবং তার জবাবে সালমানের সেই ঠান্ডা মাথার ভয়াল চক্রান্ত… যার মাধ্যমে পুরো জনসমক্ষে মেহুলকে নিজের ‘হবু স্ত্রী’ বানিয়ে দেওয়া—সবটা জলজ্যান্ত ছবির মতো বর্ণনা করল।
সবশেষে হুমা থমথমে গলায় যোগ করল, “বাসায় ফিরেই মেহুল একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে শাওয়ারের নিচে জমে দাঁড়িয়ে ছিল আন্টি! সালমানের কথাগুলো যেন কিছুতেই ওর শরীর ও মন থেকে মুছতে পারছিল না। তীব্র ঘৃণায় রি রি করতে করতে বাথরুমে অঝোরে ভিজেছে বলেই শেষমেশ হয়তো এত মারাত্মক জ্বরটা চেপে বসল…”
পুরো ঘটনা শোনামাত্র ডক্টর ফেরদৌসীর কোল থাকা পুঁচকুকে আদর করার হাতটা থমকে গেল! কারন এমপির ছেলে সালমান শাহ নেওয়াজের ক্ষমতার কথা পুরো রাজশাহী ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই লোকটা যে মেহুলের মতো এক সাধারণ স্বাবলম্বী মেয়ের পেছনে এভাবে আঠার মতো লেগেছে আর তার গোটা পরিচিতিটাকেই বিষাক্ত জালে বন্দি করে ফেলছে—তা ভেবে উনি নড়েচড়ে বসলেন।
—————★—————
অসুস্থতার রেশ কাটিয়ে মাঝখান থেকে কেটে গেছে পুরো দুটো দিন। মেহুল এখন শারীরিক মানসিক দিক থেকে বেশ কিছুটা সুস্থ ও চাঙা, তবে তার মনের ভেতরের অস্থির ছটফটানি আর অশুভ শঙ্কা একটুও কমেনি। তাই তো বিকেলের রক্তিম আলোয় নিজের মনের ভেতরের এই অব্যাখ্যীয় অস্থিরতাকে কাটাতে বারান্দার নিরিবিলি পরিবেশে নিঃশব্দে বসে ছিল সে।
এদিকে মেহুলের এই বিষণ্ণ নীরবতা দেখে হুমার মনটা ভীষণ ভার হয়ে উঠল। প্রিয় বান্ধবীকে টানা কয়েকদিন ধরে এতটা শান্ত আর গুটিয়ে থাকতে দেখে তার একটুও ভালো লাগছিল না। তাই সে মনে মনেই সিদ্ধান্ত নিল—যেকোনো মূল্যে মেহুলকে নিয়ে বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে হবে, যাতে ওর মানসিক ট্রমাটা কিছুটা হলেও দূর হয়।
যে ভাবা, সেই কাজ! ঘরে এসেই হুমা চটজলদি ধীরপায়ে মেহুলের পাশে গিয়ে বসল। মেহুলের শূন্য দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “চল মেহু, কোথাও থেকে ঘুরে আসি!”
মেহুল একটা বিষাদের নিশ্বাস ফেলে নিচুস্বরে বলল, ” ইচ্ছে করছে না রে হুমা…”
”এভাবে মুখ গোমড়া করে বসে থাকলে তো জীবনেও কোনো কিছু করতে ইচ্ছে করবে না! মনের ভেতর ইচ্ছেটাকে জোর করে হলেও টেনে আনতে হয়। চল চল, ওঠ তো!”
”সত্যি হুমা, আমার আজ কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না,” মেহুল মাথা নাড়ল।
হুমা চোখ বড় বড় করে বলল, “কিন্তু তাও আমরা যাব! তুই না করলেও যাব।”
মেহুল বাধ্য হয়ে শুধাল, “কোথায় যাবি এখন এই বিকেলে? একটু পরেই সন্ধ্যা হবে।”
”আমাদের এই কাছেই নদীর তীরে একটা খুব সুন্দর ওপেন-এয়ার ক্যাফে হয়েছে, ওখানেই যাব। শোন, আমি কিন্তু অলরেডি ফেরদৌসী আন্টিকে ফোন করে বলেছি আমাদের সাথে জয়েন করার জন্য! উনি কাজ সেরে সরাসরি ওখানে আসছেন। এখন তুই যদি না যাস, তবে উনি কী ভাববেন বল তো?”
মেহুল এবার হালকা অবাক হয়ে হুমার দিকে তাকাল, “তুই একটা কাজ কর, তুই আর আন্টি গিয়ে ঘুরে আয়।”
”উহুঁ! গেলে সবাই একসাথেই যাব, নাহলে কেউ না, তাই ওঠ বলছি!”
অতঃপর হুমায়রার অনবরত জোরাজুরি আর ডক্টর ফেরদৌসীর আসার কথা শুনে শেষমেশ রাজি হলো মেহুল। বারান্দা থেকে উঠে একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে প্রবেশ করতেই হুমা চটজলদি ড্রয়িংরুমে গিয়ে ডক্টর ফেরদৌসীকে ফোন লাগাল তাদের সাথে ক্যাফেতে যোগ দেওয়ার জন্য। এতক্ষণ তো হুমা মেহুলকে রাজি করানোর জন্য তার নাম ভাঙিয়ে বানিয়ে বলেছিল, কারণ তার বিশ্বাস ছিল ফেরদৌসী আন্টির কথা শুনলে মেহুল না করতে পারবে না! আর হলোও ঠিক তা-ই। মাত্র অল্প কিছুদিনের পরিচয়ে এই নারীটির সাথে মেহুল আর হুমার যেন এক গভীর, নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। সুখ কিংবা দুঃখ—যেকোনো প্রসংগে সবার আগে ওনার কথাই মনে পড়ে তাদের।
এদিকে মেহুল যখন ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বের হলো, তখন দেখল খাটের ওপর বিছানো রয়েছে হালকা মিষ্টি গোলাপি রঙের একটি সুতি ড্রেস। বুঝতে বাকি রইল না, হুমা তার জন্যই ড্রেসটা বের করে রেখে গেছে। মেহুল যখন চট্টগ্রাম থেকে নতুন নতুন এখানে এসে উঠেছিল, তার কিছুদিন পরেই একদিন হুমা বুটিক থেকে দুজনের জন্য ম্যাচিং করা বেশ কয়েকটা সুন্দর ড্রেস কিনে এনেছিল—বিশেষ বিশেষ দিনে দুজনে একদম একরকম পোশাকে জমিয়ে সাজার জন্য!
অতঃপর মেহুল ঝটপট রেডি হয়ে নিল। ওদিকে হুমাও নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে এবং পুঁচকুকে ছোট্ট পরীর মতো রেডি করিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে হাজির হলো।
”তোর হলো মেহুল?”—হুমা দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দিল।
”এই তো, আসছি!”
একটু পরেই রুমের পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এলো মেহুল। তিন দিনের টানা ধকল আর জ্বরের কারণে মিষ্টি চেহারায় কিছুটা মলিনতার ছায়া থাকলেও, সৌন্দর্য যেন বিন্দুমাত্র কমেনি! বরং সফট মেকআপ আর মিষ্টি গোলাপি রঙের পোশাকে তাকে একখণ্ড স্নিগ্ধ মেঘের মতো পবিত্র লাগছিল।
হুমা এক হাত গালে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল, “মাশাআল্লাহ মেহু! কী যে সুন্দর লাগছে তোকে!”
মেহুল মৃদু হেসে বলল, “তোকেও অনেক সুন্দর লাগছে, হুমা।”
”কিন্তু এই রঙটা তোর গায়ে দারুণ ফুটেছে রে!”
মেহুল চোখ কুঁচকে বলল, “এখন বের হবি, নাকি এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু রূপের প্রশংসা করবি?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, চল!”
ঠিক তখনই হুমার ফোনে ডক্টর ফেরদৌসীর কল বেজে উঠল। দুজনেই বুঝলো তিনি ইতিমধ্যে নিজের গাড়ি নিয়ে হুমাদের অ্যাপার্টমেন্টের গেটের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। অতঃপর দ্রুততার সঙ্গে তারা সবাই লিফটে চড়ে নিচে নামতেই গেটের সামনে ওনার সাদা রঙের প্রাইভেট কারটি দেখতে পেল। কাছে পৌঁছাতেই ডক্টর ফেরদৌসী কাঁচ নামিয়ে মৃদু হেসে তাদের ভেতরে ওঠার ইশারা করলেন। মেহুল আর হুমা গাড়িতে উঠতেই ওনার মুখে দুই বান্ধবীর রূপে মুগ্ধ হওয়া প্রশংসার ঝরনা বয়ে গেল। তারপরেই হুমার দেওয়া গুগল ম্যাপের লোকেশন ধরে গাড়িটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।
মিনিট কুড়ি পর গাড়িটি এসে থামল পদ্মার পাড়ে অবস্থিত এক অপূর্ব, মনোরম ক্যাফের চত্বরে। পুরো ক্যাফেটি নদীর একেবারে কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে—গাছের গুঁড়ি আর বাঁশের কারুকাজে তৈরি বসার আকর্ষনীয় সব ডেক, মাথার ওপর ঝুলন্ত ভিন্টেজ লাইটিং আর চারপাশের খোলামেলা নিস্তব্ধতা পরিবেশটাকে এক অলৌকিক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। এদিকে নদীর হিমেল বাতাস মেহুলের গালে আসতেই তার বিষাদগ্রস্ত মনটা মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল।
তবে মেহুল খেয়াল করল না—ভাগ্যচক্রে এই ক্যাফেটি ঠিক সেখানেই অবস্থিত, যেখানে নদীর একদম কাছেই সালমানের সেই রহস্যময় কাঠের গোলঘরটি দাঁড়িয়ে ছিল! আর ক্যাফেটি ঠিক সেই গোলঘরের লাগোয়া চত্বরটিকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
অতঃপর চারপাশটা দেখে একসময় তিনজনে মিলে একদম নদীর মুখোমুখি একটা সুন্দর কোণার টেবিল বেছে নিয়ে বসল। ফলে নদীর শান্ত ঢেউয়ের কলতান আর মুক্ত বাতাস যেন মেহুলের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা কালবোশেখি ঝড়কে এক নিমেষে জুড়িয়ে দিতে শুরু করলো…
পার্টি অফিসের নিজের খাস কামরায় চামড়ার ঘূর্ণায়মান চেয়ারটায় বসে আছে সালমান শাহ নেওয়াজ। চেহারায় ঘোর অমানিশার ছায়া, মেজাজ চরম বিষাক্ত। টানা দুটো দিন ধরে তার মনটা একদম ভালো নেই—কারণ এই দুটো দিন ধরে সে তার অপ্সরীর দেখা পায়নি!
হাসপাতালেও মেহুল পা রাখেনি। কেন আসেনি, সে কোনো ছুটি নিয়েছিল কি না—স্টাফদের কেউ কোনো সদুত্তর দিতে পারছে না। ফলে মেহুলকে নিয়ে সালমানের ভেতরটা এক চরম উসখুসে শূন্যতায় জ্বলছিল। যার ফলে সিগারেট জ্বালিয়ে শেষ করার বদলে অ্যাশট্রেতে পিষে ছাই করতে করতে সে ছটফট করছিল, আর চেহারাটা দেবদাসের মতো করে চেয়ারে বসে তা অনবরত ঘুরিয়ে চলেছে সে।
ঠিক তখনই কামরার দরজা ঠেলে ভেতরে এসে উপস্থিত হলো রবি।
”ভাই…”
সালমান একমুহূর্তে ঘোর ভেঙে রবির দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বরে যেন বিষ ঝরে পড়ল,
“কী?”
”ভাবির খবর নিয়ে আসছি।”
কথাটা শোনামাত্রই সালমানের পুরো শরীরে যেন একশো ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল! সে তড়িৎগতিতে সিধে হয়ে বসে রক্তচক্ষু মেলে শুধাল, “কী খবর?”
”উনি নাকি অসুস্থ, তাই হসপিটালে যাননি।”
রবীর মুখের কথাটা শেষ হওয়ারও সুযোগ দিল না সালমান। বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বা কিছু না বলে সে সোজা টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল সে।
তখনি রবি তড়িঘড়ি ডেকে উঠল, “কোথায় যান ভাই?”
সালমান না থমকে সংক্ষিপ্ত এক শব্দে হুকুম ছাড়লো, “অপ্সরার বাড়িতে।”
”কিন্তু ভাবি তো বাড়িতে নেই!”
কথাটা শোনামাত্র সালমানের প্রখর দুটি ভ্রু কপালে কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে পড়ে গুমোট কণ্ঠে শুধাল, “কী বললি?”
”ভাবি একটু আগে বাসা থেকে বের হয়েছে ভাই।”
”কে বলেছে তোকে?”
রবি মৃদু হেসে জবাব দিল, “কবিরকে ভাবির ফ্ল্যাটের সামনেই পাহাড়ায় রেখেছিলাম আজ দুদিন ধরে। ও মাত্রই কল দিয়ে বলল।”
সালমান নিজের শার্টের উপরের বোতাম লাগাতে লাগাতে প্রখর গলায় প্রশ্ন করল, “কোথায় আছে এখন ও?”
”নদীর পাড়ের ওই নতুন ক্যাফেটায় গেছে একটু আগে।”
”হুমমম…”
বলেই সালমানের ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই ফুটে উঠল সেই চেনা, ভয়াল মায়াবী হাসি! যে অপ্সরাকে দেখার জন্য গত আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে তার ভেতরটা শ্মশানের মতো জ্বলছিল, সেই অপ্সরা নাকি নিজ থেকেই চলে এসেছে সালমানের চেনা সীমানায়!
আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চাবির রিংটা আঙুলে নাচাতে নাচাতে হন্তদন্ত হয়ে পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল সালমান শাহ নেওয়াজ।
“তুমি সালমানের সাথে এমন ব্যবহারটা না করলেও পারতে, মেহুল…”
ফেরদৌস ম্যাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহুলের একটা হাত আলতো করে নিজের হাতের তালুতে তুলে নিয়ে কথাটা বলে উঠলেন তিনি। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত মাতৃত্ব আর উদ্বেগের ছায়া।
মেহুলের বুকের ভেতরটা তখনো রাগে ফুঁসছিল। সে চোখের দৃষ্টি কিছুটা কঠোর করে উত্তর দিল, “উনি যা করেছেন, তার বিপরীতে রাগে এমনটা করেছি ফেরদৌস ম্যাম। আপনি তো দেখেননি উনি কতটা সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন!”
“বুঝেছি মেহুল,” ফেরদৌস ম্যামের গলায় ঝরে পড়ল একজন অভিভাবকের নিঃশর্ত সহানুভূতি, “আমি সবটা শুনেছি হুমার কাছে। তবে তুমিও চিন্তা করো, ও একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিনিধি। তার ওপর ওর বাবা একজন এমপি—ওদের অঢেল ক্ষমতা, চারপাশ ঘিরে শক্তি। তোমাকে সবটা বিবেচনা করে কাজ করতে হতো, মা।”
মেহুলের চোখ দুটো নমনীয় হয়ে এলো অভিমানে, সে কিছুটা ব্যথিত গলায় প্রশ্ন করল, “আমি কি প্রতিবাদ করে ভুল করেছি, ম্যাম?”
“আমি সেটা বলছি না, বাচ্চা,” ফেরদৌস ম্যাম একগাল স্নিগ্ধ হেসে মেহুলের গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিলেন, “আমি তো তোমাকে নিজের মেয়ের মতোই মনে করি, তাই বলছি। যেকোনো পরিস্থিতিতে আগে নিজেকে ঠান্ডা রাখবে, তারপর পদক্ষেপ নেবে। তুমি এই শহরে নতুন, অচেনা পরিবেশ। আমি চাই না তুমি কোনো বড় সমস্যায় পড়ো।”
মেহুলের গলা ধরে এলো, “কিন্তু ম্যাম, লোকটা আমাকে সবার সামনে বিচ্ছিরিভাবে বিব্রত করলো! কতটা অসম্মানিত করলো আমাকে! পুরো হসপিটালের মানুষের কাছে আমাকে ছোট করার পরও আমি চুপ করে বসে থাকবো?”
“আমি তোকে চুপ থাকতে বলছি না মেয়ে,” ম্যামের কণ্ঠে এবার বাস্তবতার কঠিন সত্য ফুটে উঠলো, “কিন্তু বাস্তবতা হলো, তুমি ওদের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে পারবে না। কারণ দিনশেষে সবক্ষেত্রেই প্রভাব আর পাওয়ার সবার উপরে। আর সালমান লোকটা সবার থেকে ভিন্ন, মারাত্মক একঘেয়ে আর জেদী। সেই সাথে নেওয়াজ পরিবারের যে সামাজিক সম্মান, তা মানুষের চোখে স্পষ্ট। তাই আমার মনে হয়, তোমরা সামনাসামনি কথা বলে সবটা মিটমাট করে নাও। এতেই সবার মঙ্গল হবে।”
পাশে বসে থাকা হুমাও এবার ফেরদৌসী ম্যামের কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লো, “হুম মেহুল, ম্যাম কিন্তু একদম খাঁটি কথা বলছেন। অহেতুক জলঘোলা করে নিজেকে বিপদে ফেলার কোনো মানে হয় না।”
মেহুল চুপ হয়ে গেল। কারন ম্যামের শান্ত কথাগুলো তার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগলো। মেহুলের মনে হলো, ম্যাম যা বলছেন তার প্রতিটা বর্ণ সত্যি। আবেগের বশে গর্জে ওঠা সহজ, কিন্তু এই অচেনা শহরে টিকে থাকতে হলে বুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে।
অতঃপর কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো, সবাই যখন ব্যস্ত ঠিক তখন ক্যাফের পরিবেশটা এক ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। কারন বেশ কিছুক্ষণ আগেই সালমানের ভারিক্কি অবয়ব এসে উপস্থিত হয়েছে ক্যাফের বিশেষ ‘গোলঘর’ অংশটায়। তার নিঃশব্দ পদচারণা এতটাই নিখুঁত ছিল যে, ক্যাফের কেউ টেরই পায়নি তার আগমন।
বর্তমানে সালমানের গভীর ও তীক্ষ্ণ নজর আটকে আছে ক্যাফের আলো-আঁধারি ছাওয়া বাহিরের দিকের একটি টেবিলের ওপর। সেখানে মেহুল বসে আছে। তিন দিন আগেও যে মেয়েটা তার সামনে আগুনের মতো জ্বলে উঠেছিল, সে এখন একটা বাচ্চার সাথে অমলিন হাসি মুখে খেলা করছে। মেহুলের সেই নির্মল হাসির দিকে তাকিয়ে সালমানের চোয়াল কিছুটা শক্ত হয়ে এলো।
ঠিক তখনই একজন ওয়েটার ধোঁয়া ওঠা ফ্রেশ স্যুপের ট্রে হাতে গোলঘরের ওই কোণাটার দিকে এগোচ্ছিল। অবশেষে পৌছাতেই গ্রাহকের জন্য নিয়ে যাওয়া স্যুপের ট্রে-টা টেবিলে রাখতে যাবে, অমনি অন্ধকার থেকে ভেসে এলো সালমানের গম্ভীর, ভারী কণ্ঠস্বর—
“থামো।”
ওয়েটার চমকে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সালমান তার দীর্ঘ আঙুল দিয়ে ইশারা করে মেহুলদের টেবিলটা দেখিয়ে দিয়ে আদেশ দিল, “ওদিকে নিয়ে যাও।”
ওয়েটার বিন্দুমাত্র দ্বিমত না করে ট্রে ঘুরিয়ে সোজা মেহুলদের টেবিলের দিকে হাঁটা দিল।
মেহুলরা তখন কফির কাপে চুমুক দিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। মনটা এখন তার বেশ ফুরফুরে, এমন সময় ওয়েটার গিয়ে ট্রে-টা ওদের সামনে নামিয়ে রেখে বিনীতভাবে বলল, “ম্যাম, এটা আপনাদের জন্য।”
হঠাৎ এমন কথাতে মেহুল ভ্রূ কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল, “আমাদের জন্য? কিন্তু আমরা তো স্যুপ অর্ডার করিনি!”
হুমার মুখেও একই রকম বিস্ময়, আর ফেরদৌস ম্যাম অবাক চোখে ওয়েটারের দিকে তাকালেন।
তখনি ওয়েটার বিনীত হেসে বলল, “আপনাদের অর্ডার না হলেও, আপনাদের জন্যই এটা পাঠানো হয়েছে। ওই স্যারের তরফ থেকে।”
হুমা হাত নেড়ে শক্ত গলায় বলল, “কে পাঠিয়েছে? কোন স্যার আর আমাদের জন্যই বা কেন পাঠাবেন? আপনি এটা নিয়ে যান, আমাদের এসব লাগবে না।”
মেহুলের বুকের ভেতর কৌতুহলের এক সূক্ষ্ম ঢেউ খেলে গেল। সে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা কোন স্যার পাঠিয়েছেন, জানা যাবে?”
ওয়েটার এবার কথা না বলে শুধু হাত উঁচিয়ে ক্যাফের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গোলঘরটার দিকে ইশারা করল।
সবাই একযোগে সেদিকে তাকাল। কিন্তু ঘরটা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকায় ভেতর কিছুই স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। হুমা যখন ওয়েটারকে আরও প্রশ্ন করতে ব্যস্ত, তবে মেহুলের স্থির দৃষ্টি তখনও সেই অন্ধকার কুঠুরির দিকেই আঁকড়ে রইল।
ঠিক সেই মুহূর্তে—অন্ধকারের বুক চিরে হঠাৎ জ্বলে উঠলো একটা দেশলাইয়ের আগুনের উল্কা।
অনতিবিলম্বে সেই এক ঝলক হলদেটে আলোয় স্পষ্ট ফুটে উঠলো একটি ধারালো মুখশ্রী—সালমান! তার ঠোঁটে চেপে ধরা সিগারেট, আর আগুনের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠলো তার দুটো উজ্জ্বল, হিসেবী চোখ।
মুহূর্তের মধ্যে মেহুলের মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল। রক্তের গতি যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু সে ঘাবড়ালো না। তার চোখে পলকের জন্য ফুটে ওঠা ভীতি বদলে গেল তীব্র দৃঢ়তায়।
অতঃপর কাউকে কিছু না বলে মেহুল ধীরেসুস্থে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কদম বাড়িয়ে দিলো সামনে।
তখনি হুমা চমকে উঠে হাত ধরে টান দিল, “কিরে! কোথায় যাচ্ছিস?”
মেহুল পিছন ফিরে তাকাল না। শুধু শান্ত অথচ ধীর কণ্ঠে বলল, “অপেক্ষা কর, আসছি।”
কথাটা বলেই সে সোজা পা বাড়াল অন্ধকার গোলঘরের দিকে। সালমানের চোখ দুটো তখনো স্থির তার ওপর। আর মেহুলের প্রতিটা পদক্ষেপে যেন এক অসম, সম্মুখ যুদ্ধের বাজনা বেজে চলল।
মুখোমুখি বসে আছে সালমান ও মেহুল। চারপাশ নিঃশব্দ, নীরবতায় মোড়ানো। তবে সেই নীরবতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে দুজনের চোখের তীব্র ধার—কেউ যেন কারও চেয়ে এক ইঞ্চিও কম নয়। একজন যদি জ্বলন্ত আগুন হয়, তবে অন্যজন সেই আগুনের উত্তপ্ত শিখা।
অবশেষে সেই থমথমে নীরবতা ভেঙে মুখ খুলল সালমান, “আপনি যে নিজ থেকে আমার সামনে এসে বসবেন এটা আসলে অকল্পনীয়, তবে আমি খুব খুশি হয়েছি এবং সেই সাথে আমার সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
”আমারও সেদিন হুট করে রাগের মাথায় তেমনটা করা উচিত হয়নি,” মেহুল থামল একটু, তারপর সরাসরি চোখে চোখ রেখে বলল, “তবে আপনার পদক্ষেপগুলো আমাকে এখনো বেশ বিব্রত করে, মিস্টার সালমান।”
সালমান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে সামনে বসা রমণীর দিকে তাকাল। মুখে হালকা রহস্যের ছায়া টেনে বলল, “বিব্রত? হুম… আসলে আমি ওসব লুতুপুতু উপায়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না। আমার জীবনে আমি দুটো নিয়ম মানতে পছন্দ করি—এক, পছন্দের জিনিস সর্বদা নিজের করে নিতে হয়। আর দুই, ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখতে সব বাঁধা ডিঙিয়ে যেতে হয়। তাতে কে কী ভাবল, আই ডোন্ট কেয়ার।”
মেহুল চোখ সরু করে তাকাল, “আমি কোনো জিনিস নই, মিস্টার সালমান শাহ নেওয়াজ! আমিও রক্ত-মাংসের গড়া একটা মানুষ।”
”হ্যাঁ, ঠিক তাই! আর আমার সেই রক্ত-মাংসের মানুষটাকেই চাই,” হালকা হেসে সালমান আবার যোগ করল,
“আজ আবার আঘাত করবেন না তো? করলে করতে পারেন, তবে আই রিকোয়েস্ট—কমপক্ষে আজ হাত দিয়ে করবেন। এই সুযোগে যদি আপনার হাতের একটুখানি পরশ পাওয়া যায়।”
মেহুল সোজা হয়ে বসল। নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বলল, “আজ আমি রাগব না। চলুন, কিছু কথা আজ পরিষ্কার করা যাক। আমার পক্ষে আপনাকে নিজের জীবনে জড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, মিস্টার সালমান। তাই অনুরোধ করছি, আমার পিছু ছেড়ে দিন।”
সালমান সামান্য ঝুঁকে এসে বলল, “ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো আমি আপনার পিছু ধরিনি, অপ্সরা।”
”ডোন্ট কল মি অপ্সরা! আমি মেহুল, মেহুল ইকবাল।”
”উহু… অপ্সরী মেহুল ইকবাল। আম আই রাইট, অপ্সরা?”
মেহুল নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে বলল, “আমি আমার জীবনে কোনো জটিলতা চাই না, আর নতুন করে কোনো ঝামেলায় জড়ানোর ইচ্ছা তো একেবারেই নেই। আমি খুব সাধারণ একটা জীবন কাটাতে চাই। আপনার সাথে আমার জীবনধারা মেলে না, তাই দয়া করে আমাকে আর কোনো সমস্যায় ফেলবেন না। যতোদিন এখানে আছি একটু শান্তিতে থাকতে চাই। আমি খুব শান্তি প্রিয় মানুষ তাই এখান থেকে কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। ”
সালমান এবার আরও একটু ঝুঁকে এলো অতঃপর ধীর গলায় বলল, “একবার আমার সাথে জড়িয়েই দেখুন না… আপনার জীবনটা ফুলের মতো কোমল আর রঙিন বানিয়ে দেব।”
”ফুলের মাঝেও তো কাঁটা থাকে, মিস্টার।”
”যদি কাঁটা থাকেও, তা প্রতিহত করার দায়িত্ব আমার। আপনার দিকে শুধু মাএ সেই ফুলের কোমলতা আর সুবাসই পৌঁছাবে।”
একটি দীর্ঘ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে মেহুল বলল, “দুনিয়াতে এত এত মেয়ে থাকতে আমিই কেন?”
”কারণ আপনি অনন্য। আর এই অনন্যতাটাই সালমানের হৃদয় দাবি করে।”
”আমার শেষ কথা আমি আপনার সাথে নিজেকে জড়াতে পারব না।”
”কেন? মিস্টার আরমানের জন্য?” সালমান ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল।
মেহুল এবার আর অবাক হলো না। যে লোক তার এত খবর রাখে, তার পক্ষে এই নামটা জানা খুবই স্বাভাবিক। তবে সে শক্ত গলায় বলল, “মেহুল যে থুতু একবার ফেলে দিয়েছে, তা মাটিতেই শোভা পায়।”
”তাহলে আমার এই উপকারটুকু করুন অন্তত, আপনাকে মন বাড়িয়ে ছুঁতে দিন।”
মেহুল শীতল হেসে উত্তর দিল, “যেখানে সাধারণ একটা মানুষকে ভালোবেসে হৃদয়ে হাজারটা পেরাকের আঘাত সহ্য করতে হলো, সেখানে আপনি তো এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—আজ কিংবা কাল মন্ত্রী-এমপি হবেন! আপনার সাথে তো ঝুকি আরও বেশি…”
সালমানের চোখে স্পষ্ট এক অদ্ভুত আবেগ ভেসে উঠল, সে বলল, “রাজনীতি বাইরের জগতের জন্য, অপ্সরা। আপনার কাছে আমি কেবলই এক প্রেমিক পুরুষ… যার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন শুধু আপনার নামেই বাজে……।
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮ (২)
মেহুল আর কথা বাড়ালো না কারন সালমানের এমন কথার বিপরীতে আর কি বা বলবে, কারন সে বুঝে গিয়েছে এই লোককে আর কিছু বলে কাজ হবে না তাই সে উঠে গেলো, ঘুরে হাঁটা ধরলো কিন্তু কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েই থমকালো সে, অতঃপর না তাকিয়েই বলে উঠলো, — এই পৃথিবীতে ভালোবাসা বলতে কিছু নেই বুঝলেন মিস্টার সালমান! যা আছে সবটাই স্বার্থ, আর যতদিন স্বার্থ আছে ততদিন ভালোবাসা আছে, আর যেদিন স্বার্থ শেষ সেদিন ভালোবাসাও সমাপ্ত…….
