Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২০

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২০

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২০
jannatul firdaus mithila

❝ অপারেশন সাকসেসফুলি কমপ্লিট!দা পেশেন্ট ইজ আউট অফ ডেঞ্জার।❞
ওটির বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ফিজিশিয়ান। মুখ থেকে মাস্ক খুলতে খুলতে কথাটা বলে ওঠেন তিনি। এদিকে এরূপ কথা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই হসপিটালের বারান্দায় চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষারত ওসমান সিকদার, সায়মা খাতুন এবং অন্যান্যরা কেমন দু’হাত তুলে শুকরিয়া আদায় করলেন রবের। সায়মা খাতুন ছেলের জন্য ফের কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। পাশ থেকে ওসমান সাহেব তৎক্ষনাৎ একহাতে জড়িয়ে ধরলেন স্ত্রীকে। মোটা মোটা কন্ঠে কোনরকমে বললেন,

“ আহাঃ আবারও কাঁদছ কেনো? শুনলেনা ডাক্তার কী বললো? আমাদের রেহান এখন সকল বিপদ থেকে মুক্ত আলহামদুলিল্লাহ!”
সায়মা খাতুন শুনেছেন। তারপরও মা বলে কথা! ছেলের জন্য বুক তো পুড়বেই। এদিকে তাশরিক সাহেব তক্ষুনি জোরালো পায়ে ছুটলেন বাকিদের কাছে।এমুহূর্তেই তিন তলায় যেতে হবে তার। দিতে হবে রেহানের আপডেট। তাছাড়া রুহিরও তো অপারেশন চলছে। সেখানকার আপডেট নেওয়াটাও তো জরুরি।

তিন তলার সরু বারান্দা পুরোটাই স্তব্ধ নিরবতায় আবদ্ধ। বারান্দার একপাশে বিছিয়ে রাখা সিটগুলোর একটিতে থম মেরে বসে আছেন কবির সাহেব। গোটা একটাদিন মানুষটা কেমন নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে বসে আছেন এক জায়গায়। বাড়ির মানুষজন তাকে এ নিয়ে কতবার যে বলল — বাড়িতে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে! একটু খানাদানা খেতে কিন্তু উঁহুম! মানুষটার গলা দিয়ে একফোঁটা পানিও নামছেনা আজ। একটা দিনেই বুঝি লোকটার বয়স হুট করেই ২গুন বেড়ে গেলো! চোখেমুখে ভাঁজ পড়ে গিয়েছে বয়সের। দেহে ধরা দিয়েছে দূর্বলতার ছাপ। এদিকে জুবাইদা বেগমেরও যাচ্ছে তা-ই অবস্থা। কাঁদতে কাঁদতে এপর্যায়ে চোখ অব্ধি শুকিয়ে গিয়েছে তার। সর্বমুখে ছড়িয়ে পড়েছে ফ্যাকাশে বিবর্ণতা। তিনি কেমন দূর্বল হয়ে পড়ে আছেন অরিনের বুকে।অরিন যথাসাধ্য চেষ্টা করছে জুবাইদা বেগমকে সামলাতে। রাফিয়া বেগম সঙ্গেই আছেন। তবে মাইমুনা বেগম বাড়িতে গিয়েছেন। রাইসা বেগমসহ মেয়ে দুটো একা একা আছে বাড়িতে। সেদিকটাও তো সামলাতে হবে যেকারো। ওদিকে, অনিককেও রাফিয়া বেগম খবর দিয়েছেন ইতোমধ্যেই। মাঝরাস্তায় বোনের এহেন খবর পেয়ে বেচারার দিশেহারা অবস্থা! ত্বরিত গাড়ি ঘুরিয়ে পথ ধরেছে বাড়ির।

সময় পেরুচ্ছে না আজ! ঘড়ির কাঁটা যেন জ্যাম ধরে গিয়েছে এক জায়গায়।অপেক্ষারত প্রতিটি মুহূর্ত একেকটা বিষাক্ত তীরের ফলার ন্যায় বিঁধছে প্রত্যেকের গায়ে। ওদিকে রেহান বিপদমুক্ত হলেও বিপদ কাটেনি রুহির।বিগত পাঁচ ঘন্টা ধরে ডাক্তাররা অক্লান্ত পরিশ্রমে অপারেশন চালাচ্ছেন ওটিতে। ইতোমধ্যেই সি-সেকশনের জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক ফুটফুটে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে রুহি। তবে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকের অবস্থা ভীষণ করুণ। শরীর-হাত-পা সবটা কেমন নীল রঙ ধারণ করেছে বাচ্চাটার। শ্বাস-প্রশ্বাসও চলছেনা একইসাথে।একদিকে নবজাতককে ইমার্জেন্সি এনআইসিউতে পাঠানো হয়েছে। আরেকদিকে, রুহির গুরুতর অপারেশন চলছে। পেটে মারাত্মক ব্যাথা পাওয়ার দরুন মেয়েটার জরায়ু ফেটে গিয়েছে। এপর্যায়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা বাড়াতে ডাক্তারদের একপ্রকার বাধ্য হয়ে রোগীর জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় — ভাগ্যক্রমে রোগী বেঁচে গেলেও ভবিষ্যতে আর কখনো মা হতে পারবেননা তিনি।

মধ্যরাত! ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে এসে থেমেছে রাত ৩টের ঘরে। সুনশান-নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে আছে হসপিটালের বারান্দা। লাইট জ্বলছে নিবুনিবু আলোয়। বারান্দার সিটগুলোর একটিতে বসে আছে অরিন। পেশেন্ট কেবিনের পাশ্ববর্তী কেবিনগুলোর একটিতে আপাতত জুবাইদা বেগম ও কবির সাহেব বিশ্রাম নিচ্ছেন। বাদবাকি মানুষজন চলে গিয়েছেন বাড়িতে। চলে গিয়েছে বললে ভুল হবে, সে-তো অরিন-ই সবাইকে একপ্রকার জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে। রুহির অপারেশন কমপ্লিট। তবে তা আদৌও সাকসেসফুল হলো কি-না তা বোঝা যাবে ৭২ ঘন্টা পর, রোগীর দেহের রেসপন্স দেখে।

সিটের হাতলে বাঁহাতের কনুই ঠেকিয়ে, গালে হাত রেখে ঝিমুচ্ছে অরিন। সারাদিন ধরে মেয়েটা তো আর কম ছুটোছুটি করেনি! সেক্ষেত্রে ক্লান্ত হওয়া স্বাভাবিক। বেশ কিছুক্ষণ ঝিমাতে ঝিমাতে হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙলো অরিনের। সিটের হাতল থেকে কনুইটা সরতেই নড়েচড়ে ওঠে মেয়েটা। হকচকিয়ে তাকায় এদিক ওদিক। নিবুনিবু চোখে বারান্দার শেষ প্রান্তে তাকাতেই চোখ আঁটকে গেলো তার। অদূরে কেউ একজন দু’হাত পকেটে গুঁজে রেখে সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে এপ্রন বোধহয়। এদিকটায় অন্ধকার হওয়ায় মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না ঠিকমতো। অরিন ঢোক গিললো সামান্য। আশেপাশে একবার সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলো — কেউ আছে কি-না! তবে নাহ! এতোরাতে কেউ থোড়াই বারান্দায় বসে থাকবে?

ওদিকে মানুষটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। অরিন এবার ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো! মুখ ঘুরিয়ে অন্যত্র তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। কিয়তক্ষন বাদেই অরিন টের পেলো তার খুব কাছে কারো উপস্থিতি! মেয়েটা তৎক্ষনাৎ নিজের চোখমুখ কুঁচকে বসে রইলো। পরক্ষণেই সে টের পেলো তার কোমর চেপে ধরেছে একজোড়া শক্ত পোক্ত হাত। ত্বরিত চোখ খুললো অরিন।হতচকিত নেত্রে সম্মুখে তাকাতেই দেখলো রৌদ্র কেমন ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার পানে। তাকে দেখতে পেয়েই ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে অরিন। মুখ ফুটে কিছু বলবে তার আগেই রৌদ্র নিঃশব্দে মেয়েটার পেট বরাবর মাথা গুঁজে। পাদু’টো তার মেঝেতে গেঁড়ে রাখা। অরিন থমকায়। কাঁপা কাঁপা হাতে রৌদ্রের ঘন চুলগুলোর মাঝে আঙুল ডুবিয়ে দেয় আলগোছে। আলতো হাতে ছেলেটার চুলগুলো টেনে দিতেই, রৌদ্র কেমন নাক ঘষলো অরিনের পেটে। এহেন স্পর্শে গা শিরশির করে ওঠে অরিনের। সে তৎক্ষনাৎ খপ করে চেপে ধরে রৌদ্রের চুল। রৌদ্র সময় নিয়ে পড়ে রইলো একইভাবে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর, মুখ তুলে ক্লান্ত চাহনিতে তাকায় অরিনের মুখপানে। কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হুট করেই ভারি গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ বউজান! খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
অরিন হাসলো! দু’হাত বাড়িয়ে আলতো করে রাখলো রৌদ্রের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত গালের ওপর। তারপর নিজের মুখটাকে খানিক এগিয়ে এনে বেশ কায়দা করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো রৌদ্রের কপাল বরাবর। রৌদ্র আবেশে চোখদুটো বুঁজে নেয়। অরিন রৌদ্রের ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখেই বিরবির করে বলে,
“ তুমি থাকতে কিসের কষ্ট ডাক্তার সাহেব?”
রৌদ্র মুগ্ধ হাসলো।তৎক্ষনাৎ দু’হাতে অরিনকে ঝাপটে ধরলো বেপরোয়ার ন্যায়।এদিকে হঠাৎ এরূপ আক্রমনে সিটসহ নড়ে ওঠে অরিন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সর্তক কন্ঠে বলে,

“ ডাক্তার সাহেব! কেউ দেখে ফেলবে তো!”
রৌদ্র নাক ডুবিয়েছে মেয়েটার বুকে। ভ্রুক্ষেপহীন কন্ঠে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
“ দেখলে কার কী? আমি নিশ্চয়ই অন্যের বউকে ধরিনি। নিজের বউজানকেই ধরেছি।সো ইগনোর দেম এন্ড ফোকাস অন মি!”
অরিন হতবাক!ছেলেটার এহেন সোজাসাপটা উত্তরে আদৌও হাসবে না-কি কাঁদবে তাই ভাবছে হয়তো। রৌদ্র সময় নিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ছাড়লো মেয়েটাকে। পরক্ষণে নিজের খসখসে দুহাতের তালুতে অরিনের আদুরে মুখটা তুলে নিয়ে বলে,
“ খেয়েছো কিছু?”

অরিন মাথা নাড়ায় দু’ধারে। তা দেখে মুহুর্তেই মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটলো রৌদ্রের। এতক্ষণের শান্ত মেজাজটা যেন চটে গেল সেকেন্ডের ব্যাবধানে। সে কেমন দাঁত খিঁচে বলল,
“ খাস নি কেনো তুই? দুপুরে খাবার পাঠিয়েছিলাম না তোর? তারপরও খেলি না কেনো?”
এহেন কথায় মিইয়ে যায় অরিন।মাথা নুইয়ে মিনমিনে স্বরে বলে,
“ আপনিও তো সারাদিন খাননি তাই….!”
তেতে উঠে রৌদ্র। তৎক্ষনাৎ অরিনকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। দৃঢ় চোয়ালখানা বেশ শক্তভাবে ফুটিয়ে কঠিন গলায় ধমকে বলল,

“ আমি খাইনি বলে তুইও না খেয়ে থাকবি? তোর আর আমার বয়স সেম? বেশি পাকনা হয়ে গেছিস মনে হচ্ছে? এতো পাকনামি করতে বলেছে কে তোকে? বেশি সাহস হয়ে গেছে তাই-না? কতবড় সাহস হয়ে গেলে আমার কথা অমান্য করে না খেয়ে থাকে! বেয়াদব একটা!”
এহেন ধমকে কেঁপে ওঠে অরিন। ঠোঁট উল্টে বসে রইলো মাথা নুইয়ে। রৌদ্রের মেজাজ বিগড়ে গেছে দ্বিগুণ। মুখ ফুটে বেশকিছু কড়াবাক্য আওড়াতে ইচ্ছে করলেও ধৈর্য্যশীল পুরুষ বেশ কায়দা করে সামলালেন নিজেকে। কোমরের ওপর দু’হাত চেপে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো কোনরকম। পরক্ষণে গম্ভীর মুখে বলল,
“ চল খাবার খাবি!”

উঠলো না অরিন।উল্টো গাল ফুলিয়ে বসে রইলো চুপচাপ। রৌদ্র ভ্রু গোটায় তা দেখে। দাঁতে দাঁত চেপে ফের বলে,
“ ধমক খেতে না চাইলে উঠে পড়!”
এবারেও ঠায় বসে রইলো অরিন। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ নিজের মুখ ঘোরায় অন্যত্র। একহাতে অনবরত নিজের ঘাড় ম্যাসাজ করে আড়চোখে তাকালো মেয়েটার পানে। মনে মনে কষিয়ে দুটো কড়াবাক্য শোনাতেও ভুললোনা ছেলেটা। পরমুহূর্তে নিজেকে শান্ত করে একপা এগিয়ে এসে দাঁড়ায় অরিনের সামনে। তারপর কোনো বলা কওয়া ছাড়া, হুট করেই মেয়েটার ফোলা ফোলা ডানগালটায় ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় আলগোছে। বেশ শব্দ করে চুমু খেয়ে নরম কন্ঠে শুধালো,
“ চলো সানশাইন! আ’ম হাঙ্গরি!”

জ্ঞান ফিরেছে রেহানের।হাতের ক্যানোলা দিয়ে শরীরে এখনো চলছে স্যালাইন। মাথাটা এই বুঝি ফেটে যাচ্ছে তার। চোখদুটো আপাততঃ খুলে রাখা দায় পড়ছে তারজন্য। তারপরও ছেলেটার অবচেতন মন রুহিকে খুঁজছে। একটু কাছ থেকে মেয়েটাকে দেখতে চাইছে। তবে শরীরটা যে সায় দিচ্ছে না তার। রেহান একপ্রকার নিরব যুদ্ধ চালাচ্ছে নিজের শরীরের সাথে। বেচারা ভীষণ কষ্টে কোনরকমে উঠে বসে শোয়া ছেড়ে। খানিকটা সোজা হয়ে বসতেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে তার। সে তৎক্ষনাৎ বেন্ডেজের ওপর দিয়েই দু’হাতে চেপে ধরে মাথাটা। ব্যাথাতুর চাহনি এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখে, কেবিনে উপস্থিত নার্সটি কেমন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। রেহান হাত ছাড়া করলোনা এ সুযোগ। ত্বরিত ডানহাতের ক্যানোলাটা একটানে খুলে ফেলে পা রাখে মেঝেতে। সর্বাঙ্গ ব্যাথায় গুড়িয়ে যাচ্ছে তার তবুও সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই হাঁটা ধরলো কেবিনের বাইরে।

পাঁচতলা থেকে তিন তলায় আসতে ইতোমধ্যেই ভীষণ বেগ পোহাতে হয়েছে বেচারা রেহানের। সে-তো ভাগ্য ভালো গভীর রাত বলে কথা! নাহলে তাকে থোড়াই কেউ আসতে দিতো এখানে? অন্ধকার ফাঁকা বারান্দা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুচ্ছে রেহান। সামনেই কেবিন রুম।এতক্ষণে রুহির নিশ্চয়ই জ্ঞান ফিরেছে? রেহান নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে হাঁটতে লাগলো। একপর্যায়ে ঠিক চলে এলো ওটির বাইরে। দু’হাতে কেবিনের দরজাটা ভেতরের দিকে ঠেলে দিতেই দরজাটা কেমন খুলে গেলো দু’দিকে। রেহান আর সময় নষ্ট করলোনা। তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকলো নিঃশব্দে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন রুম। বেডে নিষ্প্রাণ হয়ে শুয়ে আছে রুহি।নাকে অক্সিজেন মাস্ক। দু’হাতে মোটা মোটা ক্যানোলা। পেট আর আগের মতো ফুলে নেই! ফুলে থাকা ভাবটা অনেকটাই কমে গিয়েছে ইতোমধ্যে। মেয়েটার শ্যামবরণ সুশ্রী মুখখানায় বেশকিছু ক্ষতের চিহ্ন। কপালে মোটা ব্যান্ডেজ। রেহান অদূরে দাঁড়িয়ে থেকেই অশ্রু ঝরাচ্ছে চোখ থেকে। সে রয়েসয়ে এগিয়ে আসে বেডের ধারে। দু-হাঁটু ভাঁজ করে বসে মেঝেতে। তারপর মেয়েটার মুখপানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কাঁদতে থাকে নিরবে। পরক্ষণে আলতো করে মেয়েটার ক্যানোলা পড়া বামহাতটা তুলে নেয় নিজের দু’হাতের মধ্যে। সেথায় ধীরে ধীরে ঠোঁট ছুঁইয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ উঠে পড়ো শ্যামবতী! প্লিজ ওঠো।”
এহেন কথা কানে যায়নি রুহির। রেহান তখন ছলছল চোখে তাকায় মেয়েটার মুখপানে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বলে,

“ আমার বাবু লাগবেনা শ্যামবতী! আমার শুধু তোমাকেই লাগবে!”
থামে রেহান। এপর্যায়ে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বায়না ধরার সুরে বলে,
“ এই শ্যামবতী! ওঠো না তুমি।”
এবারেও নিশ্চুপ রুহি! অদূরের মনিটরে দূর্বল হার্টরেট দেখা যাচ্ছে। রেহান দেখলো।ভয়ার্ত ঢোক গিলে তক্ষুনি তাকালো মেয়েটার দিকে। একহাতে নিজের বুক খামচে ধরে ভয়ার্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,

“ আমার বুক কাঁপছে শ্যামবতী! একটু কান পেতে শোনো, আমার বুকটা সত্যিই কাঁপছে খুব। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তোমাকে ছাড়া। আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। শ্যামবতী… এই শ্যামবতী! আমি ভয় পাচ্ছি দেখো।ভীষণ ভয় পাচ্ছি। তোমাকে নিজের কাছ থেকে হারিয়ে ফেলার মতো মরণ যন্ত্রণাকে খুব ভয় পাচ্ছি!”
থামে রেহান। রুহির বেডের ওপর মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে থাকে নিঃশব্দে। পরক্ষণে মাথা তুলে লাল হয়ে আসা চোখজোড়া তাক করে মেয়েটার নিষ্প্রাণ মুখের দিকে। ভঙ্গুর গলায় আবারও বলে,
“ এই বউ! আমার বউ। শুনতে পাচ্ছোনা তুমি? আমি কিন্তু এবার চিৎকার করবো! সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবো বলে দিলাম। তুমি বিনে আমার অস্তিত্ব হারাবে মেয়ে। এই রেহান নামক ভীতু ছেলেটা হারিয়ে যাবে চিরতরে।”
রেহানের বুকফাটা আর্তনাদ গুলো আদৌও যাচ্ছে রুহির কানে? উঁহুম! যাচ্ছে না তো।গেলে বুঝি সে এতক্ষণ পড়ে থাকতো?

হসপিটালের বাইরের সুনশান রাস্তা। সমগ্র নগরী গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। একহাতে হটডগ! মাঝেমধ্যে এক-দু বাইট বসেছে তার গায়ে। গুনে গুনে পা ফেলে হাঁটছে অরিন। তার ঠিক পাশাপাশি হাঁটছে রৌদ্র। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে, গম্ভীর মুখে! অরিন একটু একটু করে খাচ্ছে, মাঝেমধ্যে রৌদ্রকেও খাওয়াচ্ছে। রৌদ্রও কি সুন্দর গম্ভীর মুখে খেয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। অরিন খাওয়ার একফাঁকে হঠাৎ পায়ের গতি থামায়। রৌদ্রও দাঁড়িয়ে পড়ে তৎক্ষনাৎ। ঘাড় বাকিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাতেই দেখে — অরিন কেমন উদাস মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রৌদ্র তখন বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ কি হয়েছে সানশাইন? হঠাৎ মন খারাপ করলি কেনো?”
অরিন রয়েসয়ে চোখ তুলে তাকায়।মুহুর্তেই রৌদ্রের চক্ষুগোচর হয় মেয়েটার ছলছল চোখজোড়া। এপর্যায়ে অস্থির হলো রৌদ্র। তৎক্ষনাৎ দু’হাতে আগলে ধরে অরিনের আদুরে মুখখানা। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কি হয়েছে জানবাচ্চা? কাঁদছিস কেনো?”
অরিন নাক টানে। ছলছল চোখে রৌদ্রের মুখপানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে থেমে থেমে বলে,
“ ডাক্তার সাহেব! রুহিপুর সাথে যা হলো, এমনটা যদি কখনো আমার সাথে হয় তখন আপনি কি করবেন?”
থমকায় রৌদ্র। বলিষ্ঠদেহী যুবকের এই প্রথমবারের মতো সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে একসাথে। অরিন বেশ টের পেলো রৌদ্রের সে-ই কম্পন। সে তৎক্ষনাৎ হাত উঠিয়ে চেপে ধরে রৌদ্রের হাত। ওদিকে রৌদ্র নিজের শুষ্ক অধরজোড়া খানিক ভিজিয়ে নেয় জিভ দিয়ে। পরক্ষণেই কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে,
“ আমার রব না করুক সানশাইন, তোর গায়ে সামান্যতম ফুলের আঁচড় পড়লেও আমি মরে যাবো জানবাচ্চা! ঠিক মরে যাবো। তুই দেখে নিস!”

একহাতে হুইস্কির বোতল! আরেক হাতের মধ্যমা ও তর্জনীর মাঝে ধরে রাখা মোটা সিগারেট। ক্ষনে ক্ষনে সে সিগারেট চাপা হচ্ছে দু-ঠোটেঁর ভাঁজে। টানা হচ্ছে লম্বা লম্বা সুখটান। পরক্ষণে মুখের সে-ই কলুষিত ধোঁয়াগুলো ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে। সফেদ রঙা স্বচ্ছ টাইলসের মেঝেতে উদোম গায়ে শুয়ে আছে মুগ্ধ। বাদামী চোখদুটো বুঁজে রাখা আজ। তার বন্ধ চোখের পাতায় ভাসছে অতিতের বিষাক্ত কিছু স্মৃতি! একটা পাচঁ-ছয় বছরের বাচ্চা! তাকে ধরে রেখেছে কয়েকজন। সে কাঁদছে! ক্ষুধার জ্বালা তাকে পাগল করে দিচ্ছে। সে গলা ফাটিয়ে ডাকছে তার মা’কে। তার উঠছে না। ভাসছে নদীর জ্বলে। গায়ে লাল টুকটুকে শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা গলায় বাঁধা! কেউ একজন কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলছে,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৯

“ ডাক আম্মা! ডাক!”
ত্বরিত চোখ মেলে মুগ্ধ। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে একহাতে চুলগুলো খামচে ধরে শক্তভাবে। এতেও যেন শরীরের কাঁপন কমছেনা তার। সে তৎক্ষনাৎ উপায়ন্তর না পেয়ে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা নিজের পেটের সঙ্গে চেপে ধরে। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে থাকে ব্যাথাটুকু। এ-তো নতুন কিছু নয় তারজন্য! যুবকের ফর্সা পেট, বুকের চামড়াগুলোকে একটুখানি পরোখ করলেই দেখা যাবে সেথায় শতশত সিগারেট পোড়া দাগ জমেছে! হয়তো কখনো নিজের বুকের দহন কমাতে, নয়তো কোনো তীব্র যন্ত্রণা ভোলাতেই এই ব্যাবস্থা যুবকের। আধখাওয়া সিগারেটটা শরীরের চামড়া পুড়তে ব্যস্ত। অথচ মুগ্ধ হাসছে ঠোঁট পিষে। বিরবির করে বলছে,
“ আম্মা? ডাকবো নাকি?”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২১