Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৩১

সায়রে গর্জন পর্ব ৩১

সায়রে গর্জন পর্ব ৩১
নীতি জাহিদ

বাইরে বৃষ্টি। মাঝ রাস্তায় ফেঁসেছে দুজন। লিমন কল দিয়ে বলেছিলো আসবে, বারণ করে দিয়েছে এক জুনিয়র সাথে আছে জানিয়েছে। তার সাথেই যাবে। লিমন ও আর জোর করেনি। আজ নিজের ও কাজের অনেক চাপ। তাহি ইনফিনিটির শোরুমে এসেছে এক কলিগের জন্মদিনের উপহার কিনতে। সেই কলিগকে আবার সাথে আসা জুনিয়র, প্রমা পছন্দ করে। ভেতরে এত ভিড় দেখে মাথা ঘুরে উঠলো। স্বাভাবিক ভেতরে একটা চাপা গরম। এর মধ্যে প্রমা সবাইকে বিরক্ত করে তুলেছে। ওয়াচ দেখেছে অনেক গুলো কিন্তু কেনে নি, প্যান্ট দেখেছে,টি শার্ট দেখেছে। ঘুরে ঘুরে দেখলো কিছুই পছন্দ হলোনা। শেষমেষ প্রমাকে ধমকে বললো,

– তুই তোর ক্রাশের পছন্দ বুঝিস না। কিছু কি বাদ রেখেছিস দেখা?
– হ্যাঁ শার্ট আর পারফিউম।
– যা ওইদিকে, শার্ট দেখ আমি পারফিউম দেখছি। সাইজ জানিস তো?
– জানি আপু।
– ওকে যা।
তাহির ধমক খেয়ে প্রমা শার্ট দেখতে গেলো। একে একে প্রায় আটটা শার্ট খুলে ফেললো। তাও আবার ইনফিনিটির মতো শো রুমের। সেলসম্যানকে বলে বসে,

– ভাইয়া এই শার্টটা পরে দেখুন তো কেমন হবে?
– ম্যাডাম আমরা পরতে পারবোনা। নিয়ম নেই।
– কেনো কেনো নাহলে বুঝবো কিভাবে?
– যার জন্য নিবেন তাকে নিয়ে আসুন।উনি ট্রায়াল দিক।
– সারপ্রাইজ দিব
– তাহলে আপনাকে একটা সাইজ অনুমান করে নিতে হবে।
– আন্দাজে নিব নাকি?
– আমাদের এই ক্ষেত্রে কিছু করার নেই। অন্য অপশন দেখুন।
– আপনি কিন্তু বেয়াদবি করছেন।
সেলসম্যান হতচকিত হয়ে গেলো। সে কখন বেয়াদবি করলো। প্রমা চিৎকার দিয়ে ম্যানেজারকে ডাকলো, এ পাশ থেকে তাহি ছুটে আসলো। আরো কয়েকজন এসে ভিড় করে ফেললো। প্রমাকে ম্যানেজার বুঝানোর চেষ্টা করছে। ওর জোরালো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে,

– আপনাদের সেলসম্যান গুলো এত বেয়াদপ কেনো? এভাবে কথা বলে ক্লায়েন্টের সাথে। আমি শার্ট নেব বলেই তো পছন্দ করেছি। ও মুখের উপর কিভাবে বলে অন্য অপশন দেখুন।
তাহি ভিড় ঠেলে সামনে আসলো।
– কি সমস্যা হয়েছে, চেঁচাচ্ছিস কেনো?
– দেখো না আপু, এই বেয়াদপ ছেলেটা আমাকে বলে অন্য অপশন দেখুন।
তাহি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে লিমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাহিকে দেখে এই ছেলে চমকে যাওয়ার কথা,কিন্তু চমকায় নি। উল্টা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রমা তখনো চেঁচাচ্ছে,
– ছোট লোক, কিভাবে ক্লায়েন্ট ট্রিট করতে হয় জানেনা। আসছে সেলসম্যান হতে। রাস্তার ফুটপাতে যাওয়া উচিত।
– একদম চুপ…
সবার সামনে প্রমাকে তাহি ধমক দিলো। লিমনের চোখ ছলছলে। ছেলেটা এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিমনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

– কি হয়েছে এখানে?
লিমন ইশারা দিয়ে ভাঁজ খোলা সব শার্ট দেখালো। তাহি বুঝতে পেরে চোখ গরম করে প্রমার দিকে তাকালো। ইচ্ছে করছে সবার সামনে অপমান করতে। নিজেকে দমাতে গিয়েও আজ তাহি পারলোনা লিমনের চোখের দিকে তাকিয়ে। প্রমা তাহির চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তাহি রেগে বললো,
– তুই কি চাস আমি তোকে সকলের সামনে কষে দুটো চড় দি?
– আমি কি করেছি আপু?
– চল তুই?
– আপু..
– কিসের আপু? এতগুলো শার্ট কেউ শোরুমে এসে নামায়। জীবনে শো রুম থেকে শপিং করিস নি। নিউ মার্কেটে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো তোকে। এতক্ষন ধরে দেখছি শুধু ঘুরছিস। এই বেচারা তোকে অন্য অপশন দেখতে বলেছে,আমি হলে তো বলতাম অন্য শপিং মলে যান আপনার জায়গা বসুন্ধরায় না। চল তোর গিফট কেনার দরকার নেই আমার সাথে। নিজে নিজে কিনিস। আমি আমার টা কিনে নিয়েছি।

– আপু আর করবো না প্লিজ…
ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বললো,
– স্যরি ভাই।
– ইটস ওকে ম্যাডাম। ওর ও দোষ আছে। এভাবে বল উচিত হয়নি ক্লায়েন্টকে।
তাহি আর কতটুকু সেভ করবে লিমনকে। যা শোনার এখন ওরা বেরিয়ে গেলেই শুনবে। সকালে ছেলেটার কথা বিশ্বাস হয়নি। এখন ছেলেটাকে দেখেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। লিমনের দিকে তাকিয়ে বিনা শব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে ইশারায় স্যরি বললো। এখান দিয়ে অনবরত ম্যানেজার ঝাড়ি দিচ্ছে। তাহি স্যরি বলায় এই মন খারাপের মাঝেও লিমনের ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। চোখের পলক ব্লিংক করে ঠোঁট কামড়ে হালকা মাথা নাড়িয়ে বুঝায় ইটস ওকে। এই দৃশ্যটা সুন্দর। তাহি নিজেও হেসে দিলো।

বাড়ির পাশের টং দোকানে বসেছে শাহীন,পাভেল,তুহিন আর হাম্মাদ। এখানেই একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে যোগাযোগের সুবিধার জন্য। মেসেজের আওয়াজে ফোন বের করলো শাহীন। মেসেজ পড়ে মুখটা ঝুলে গেলো। দু অধর আলগা হয়ে আছে। মনে হলো যেন অসম্ভব, অদ্ভুত, অপ্রত্যাশিত কিছু দেখে ফেলেছে। হাম্মাদ একটু ধাক্কা দিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে?
ফোন বাড়িয়ে দিতেই হাম্মাদ ফোনটা নিলো। হাম্মাদ নিজেও চোখ বড় বড় করে ফেললো। মুখে উচ্চারণ করলো,
– ইয়া আল্লাহ রহম করো।
শাহীন উঠে দাঁড়ায়। হাঁটা শুরু করলো। তুহিন চায়ের বিল মিটিয়ে দিলো। ওকে অনুসরণ করে বাকিরাও এলো। এক জায়গায় দাঁড়ালো যেখানে মানুষের আনাগোনা কম। পাভেল প্রশ্ন করলো,

– মুখটা এমন বাংলা পাঁচের মত করলি কেনো?
– তুই জানিস রাশেদ ভাইয়ের চাচা কে?
– কে?
– ফরিদ রেজা।
– আল্লাহ আল্লাহ।
তুহিন ও একইস্বরে বলে উঠলো,
– ইয়া আল্লাহ।
পাভেল পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– আপন চাচা।
– ছোট চাচা।
– তোকে কে জানিয়েছে?
– ভাইজানকে ছবি পাঠিয়েছিলাম। মাত্র ভাইজান মেসেজ দিলো।
– তার মানে বস সব জানে?
– সেটাই তো মনে হচ্ছে। আমরা যা মাত্র জেনেছি ভাইজান তা অনেক আগেই জেনেছে। আমাকে শুধু লাস্ট মেসেজ এটা দিলো যেন দুয়া করি ভাইজানের জন্য। আর সব প্রমান রেডি রাখি। উনি এসে বাকিটা বুঝবে।

এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ঘড়ি চেক করছে। এইতো আর ত্রিশ মিনিট। এরপর আকাশে উড়বে। ঝলমলে আকাশ। শাহাদের অপারেশনের আগেই পৌঁছে যাবে মনি। এরপর সেখান থেকে সব প্ল্যানড। সরিয়ে ফেলবে শাহাদকে। কিছুতেই আর কাউকে সেই সুযোগ দিবেনা শাহাদকে পাবার। ইয়ার ফোনে গান শুনছে। মন আজ ফুরফুরে। খালেদ পারভেজ ও ফরিদ রেজাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মনি চলে যাচ্ছে সেই খবর কেউ রাখেনি। রাখবে কি করে আজ যে খালেদ পারভেজ এর জনসভা আছে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সরাসরি জনসভায় চলে যাবে। আর ফরিদ রেজার প্রধানমন্ত্রীর সাথে মিটিং। এই দিনের অপেক্ষায় ছিলো মনি। খালেদ পারভেজ নিজ হাতে রিপোর্ট হারিয়েছে এতে মনির কি দোষ। গত রাতে লোক পাঠিয়েছিলো আজ সন্ধ্যায় দেখা করতে মনি সরাসরি নাকোচ করে দিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে এসবের মাঝে সে আর নেই। যার জন্য এত কিছু করলো সেই মানুষটাই যদি না থাকে এসব করে তো লাভ নেই।

– আসসালামু আলাইকুম
সালাম শুনে পাশ ফিরে দেখে সুদর্শন একজন বসে আছে। সালামের জবাব নিয়ে বললো,
– আমি কি আপনাকে চিনি?
– না আমরা কেউ কাউকে চিনিনা। মনে হলো একই ফ্লাইটে যাবো তাই কথা বললাম। আপনি মাইন্ড করলে বলবোনা।
– ইটস ওকে। আমি ডক্টর মনিকা।
– ওয়াও নাইস টু মিট ইউ। আমি ইয়াজ, জার্নালিস্ট।
অল্প কিছুক্ষনে আলাপ জমে উঠলো।
– আপনার পারফিউমের নাম কি ডক্টর? নাইস ফ্র্যাগরেন্স।
– গুড গার্ল।
– আই নো ইউ আর আ গুড গার্ল
– নো ইটস পারফিউম নেইম।
– ওয়াও ইটস সো সুইট। আই হ্যাভ আ পারফিউম। ইট ওয়াজ গিফটেড বাই মাই মম। ডু ইউ ওয়ান্টু টেস্ট?
– ইয়াহ, শ্যুর। প্লিজ…

ইয়াজ পারফিউম টা বের করে মনিকার হাতে দিলো। মনিকা নাকের কাছে স্মেইল নিতেই মাথা ঘুরে উঠলো। সেখানেই সেন্স লেস হয়ে গেলো।ইয়াজ একটা মাস্ক বের করে পরে নিলো।এতক্ষন এমনিতেই চোখে সানগ্লাস ছিলো। সাথে সাথে এয়ারপোর্টে পুলিশ ডাক দিলো। পুলিশ আসলে বললো,
– একটু হেল্প করবেন আমার ওয়াইফ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাদের ফ্লাইট ছিলো। কিন্তু মিস হয়ে যাবে মনে হয়?
– আপনি কি করতে চাচ্ছেন?
– একটু ব্যাগ গুলো গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা গেলে খুব ভালো হত। আগে আমার ওয়াইফের সুস্থতা এরপর আবার যাব। আমরা হানিমুন ট্রিপে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিলাম।
পুলিশের সাহায্যে ইয়াজ মনিকাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। গাড়ি ছুটালো গন্তব্যে। গাড়িতে অট্টহাসি দিয়ে ফোন লাগালো খালেদ পারভেজকে,
– বস ডান। এখন মালটাকে কি করবো?
– আমার ডেরায় রেখে আয়। উৎসব করবো। কত বড় সাহস আমাকে না জানিয়ে পালায়। অনেকদিন উৎসব হয়না। খবর দে সবাইকে।
– ওকে বস।

তাহির বারান্দায় কে যেন দূর থেকে টর্চ মা*রছে। একটা কেস স্টাডি করছিলো তাহি। বিরক্ত হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সামনে তাকিয়ে দেখে বা*দরটা দাঁড়িয়ে আছে। তাহি বিরক্ত হয়ে ইশারায় বললো, কি হয়েছে?
লিমন হাত দিয়ে তাহিকে নামতে বললো। তাহি নামবে না দেখানোতে লিমন পুনরায় হাত জোর করে অনুনয় করলো। এবার তাহি হাত দিয়ে দেখালো,আসছি। গায়ে ওড়না জড়িয়ে বড় ঘোমটা দিলো। সাবিনা জিজ্ঞেস করলে বললো একটু দোকানে যাচ্ছে আইসক্রিম আনতে। সাবিনা বোনের সাথে শাহাদের ব্যাপারে কথা বলছিলো,তাই আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি আসার আদেশ করলো। তাহি চারতলা থেকে নেমে গেট দিয়ে বেরিয়ে আশে পাশে তাকিয়ে সোজা হাঁটতে থাকলো। কিছুটা দূর যাওয়ার পর পাশে পাশে লিমন ও হাঁটছে। লিমনের দিকে তাকিয়ে তাহি হেসে দিলো। মুখে মাস্ক থাকায় অন্য কেউ না বুঝলেও লিমন থমকে দাঁড়িয়ে বললো,

– ডাক্তার সাহেবা হাসলেন কেনো? আমাকে কি জোকার লাগছে?
– তা কখন বললাম তবে একটা ক্লাস নাইন টেনের বাচ্চা লাগছে। আম্মু পছন্দ করে একটা Ven-10 টিশার্ট আর এডিডাস থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট কিনে দিয়েছে সেটা বড় আপুকে দেখাতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এসেছো মনে হচ্ছে।
লিমন চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
– আপনি এমন কেনো ডাক্তার সাহেবা,সারাক্ষন আমাকে এভাবে বলেন। আমি আপনার থেকে মাত্র তিন বছরের ছোট।
– একদম বাবু তুমি আমার থেকে মাত্র তিন বছরের ছোট। চলো আপু আইসক্রিম কিনে দিই।
মুখ বাঁকিয়ে লিমন বললো,
– ঠিক আছে।
লিমন লাফাতে লাফাতে গাছের ডাল ছিড়লো। সেটা নাচাতে নাচাতে বললো,

– ডাক্তার সাহেবা আপুউউউউউউউউউ, আইসক্রিম খাবোনা ফুচকা খাবো
লিমনের মুখ থেকে এই ডাক শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় তাহি। কিভাবে অসভ্যের মতো টান দিলো। ফুচকার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লিমন বললো,
– মামা ঝটপট দু প্লেট ফুচকা। একপ্লেটে ঝাল টক অন্যটাতে মিষ্টি টক। ঝালটাতে অবশ্যই নাগা মরিচ দিবেন যাতে ম্যাডামের চোখে আমার জন্য পানি আসে।
এতক্ষন তাহি এঞ্জয় করলেও এখন তাহি থমকে গেলো। ফুচকাওয়ালা রফিক মামা। দশ বছর ধরে এই পাড়ায় ফুচকা বিক্রি করে। জনপ্রিয় ফুচকা তার। লিমনের কথায় রফিক মামাও হকচকিয়ে গেলো। এভাবে কথা বলার ধরন রফিক মামার পরিচিত। এর আগেও শুনেছে এই কথা। লিমনের মুখের দিকে তাকিয়ে তাহির দিকে তাকালো। তাহি সিচুয়েশন নিজের আয়ত্ত্বে এনে বললো,
– মামা তাড়াতাড়ি দাও বাসায় যাব।
দুজনই বসলো তাহি হঠাৎ চুপসে যাওয়াতে লিমন তাহিকে বললো,

– আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?
– নাহ ঠিক আছি।
– আপনি না চাইলে আমরা চলে যাবো উঠুন।
– আমি ঠিক আছি, তুমি এখানে কেনো এসেছো?
– আমি সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে এদিক সেদিক যাই। আজকে মন খারাপ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভালো লাগছিলোনা তাই আপনার কাছে এসেছি।
– ওহ।
– আচ্ছা একটা কথা বলি?
– বলো?
– রাগ করবেন নাতো?
– রাগ করার মতো হলে করবো?
– তাহলে থাক।
– আচ্ছা বলো?
– রাশেদ ভাইকে অবিশ্বাস না করলে ও তো পারতেন?
তাহি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ফেললো।

– আচ্ছা বলতে হবেনা। রাশেদ ভাইয়ের জায়গায় আমিও হতে পারি ভবিষ্যতে। যদি আমার ওয়াইফ আমাকে অবিশ্বাস করে,তখন আমি ও কি ম*রে যাবো? আপনারা মেয়েরা অনেক স্বার্থপর জানেন। আপনাদের একটু সাপোর্টের জন্য আমরা মুখিয়ে থাকি। সবাই তো খারাপ না…
– চুপ করবে…
ধমকে উঠলো তাহি। লিমন স্যরি বলে চুপ হয়ে গেলো।
রফিক মামা ফুচকা দিতেই তাহিকে ফুচকা বাড়িয়ে দিলো। তাহি চুপচাপ ফুচকা খেয়ে যাচ্ছে। লিমন টক ঢেলে একটা ফুচকা মুখে দিতেই চোখ মুখ খিচে ফেললো। রফিক মামা বুঝিয়ে দেয়ার সত্বেও গুলিয়ে ফেলেছে কোনটা কার ফুচকা। নাগা মরিচের টক দেয়া, ফুচকা দুটোর বেশি খেতে পারলোনা। তাহির ততক্ষনে সব কটা শেষ। তাহি পানি চেয়ে নিলো। নিজে এক ঢোক খেয়ে লিমনকে বললো,

– দেরি হচ্ছে চলো উঠি।
লিমনকে চুপচাপ দেখে ওর দিকে তাকাতেই দেখে ছেলেটার নাক,মুখ,চোখ লাল হয়ে আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ফুচকার প্লেটটা রেখে জাস্ট মুখ খুলে বললো,
– আমাকে একটু পানি দেন।
তাহি পানির বোতল টা বাড়িয়ে দিলো। লিমনের প্লেটের ফুচকার টক চামচ দিয়ে একটু মুখে দিয়ে যা বুঝার বুঝে গেলো। পুরো বোতল পানি শেষ করে আরেক বোতল শেষ করলো। এবার রফিক মামা একটা শসা এগিয়ে বললো,
– মামা এটা খান ঝাল কমে যাবে।
লিমন চোখ মুখ খিচে শসা চাবাচ্ছে। মুখটা আরেকবার ধুয়ে উঠে দাঁড়ায়। তাহির বাসার সামনে যেয়ে বললো,

– আপনি চলে যান,আমি চলে যেতে পারবো।
– কিভাবে যাবে?
– সাইকেলে?
তাহির চোয়াল ঝুলে গেলো। মুখ ফসকে বলেই ফেললো,
– লিমন সিরিয়াসলি সাইকেল চালাও তুমি আই মিন তোমার বয়সীরা এখন বাইক নিয়ে বের হয়। সাইকেল তো বাধ্য বাচ্চারা চালায়।
– বাইক ভাইজান কিনে দিয়েছিলো। একবার এক্সিডেন্ট করেছি আরেকবার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হয়ে ধরা খেয়েছি। তাই বাইক ব্যানড আমার জন্য। জবে ঢুকলে দিবে বলেছে।
তাহি হো হো করে হেসে বলে,

– দেখেছো তুমি কতটা পুচকু। আর তুমি নাকি আমার সাথে…
লিমন তাহির হাসি দেখেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। গম্ভীর স্বরে বললো,
– আমি নাকি আপনার সাথে কি??
তাহি হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বললো,
– বাসায় যাও রাত হয়েছে।
লিমন কথা না বাড়িয়ে বললো,
– সকালে আমি আসবো। আল্লাহ হাফেজ।
সাইকেলে চড়ে পেছনে ও তাকালো না। সোজা চলে গেলো। আচমকা লিমনের মাঝে এমন পরিবর্তন যেন তাহিকে ভাবাচ্ছে। এই তো লাফাচ্ছিলো বাচ্চাদের মত আবার কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো। সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে, রফিক মামার ফুচকা দোকানের সামনে বলা প্রতিটি কথা, রাশেদ ও এভাবে বলতো। যেন ঝালের কারণে রাশেদের জন্য চোখে পানি এসে যায়। কোথাও একটা প্রাণোচ্ছল ভাবের মিল আছে লিমনের সাথে রাশেদের। তাহি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা যেন হাসছে। শরীরের ঠান্ডা বাতাস লাগলো। মনে হলো কেউ খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ফিসফিস গুঞ্জন,

– আমি বড্ড একা তাহি, তাহি বিহীন রাশেদ শূন্য।
সামনে বড় একটা প্রাইভেট কার। তাহির হুঁশ নেই। মনে হচ্ছে যেন বিভোরে হাঁটছে। ড্রাইভার হাত দিয়ে ইশারা করছে। নড়ার কোনো লক্ষ্মণই নেই তাহির মাঝে। আচমকা দুটো হাতের বেষ্টনী এসে নিজের মাঝে তাহিকে আবদ্ধ করে রাস্তার একপাশে নিয়ে আসে। হুঁশ আসে তাহির। ড্রাইভার পেছন দিক থেকে গালাগাল করছে। তাহি মানুষটার বুকে নিজেকে আবিষ্কার করলো। চোখ মেলে দেখে লিমন। এখনো ওর বুকের স্পন্দন শোনা যাচ্ছে। তাহি আচমকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। জোরে ধমকে বললো,
– বেয়াদপ কোন সাহসে আমাকে ছুঁয়েছো। শুধু ছোঁয়ার বাহানা তাই না। নারীর শরীর পেলেই খুশি!
লিমন হকচকিয়ে যায়। সে তো বাঁচাতে এলো। শরীরের কথা কিভাবে আসলো।এতো বাজে কথা তাহি বলতে পারলো! ক্ষেপে গিয়ে বললো,
– কি আবোল তাবোল বকছেন। রাস্তার মাঝে কেউ এভাবে হাঁটে! আপনি পাগল! এখনই তো জান যেতো।
– গেলে আমার যেতো তাতে তোমার কি?
– আশ্চর্য চেঁচাচ্ছেন কেনো? বাসায় যান মাথা ঠিক নেই আপনার।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩০

লিমন এগিয়ে এসে হাত ধরে বাসায় দিয়ে আসতে চাইলো। স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাহি স্টেবল নেই। হয়তো রাশেদের স্মৃতি মাথা চড়া দিয়েছে। তাহির হাত ধরলে হাত ঝামটা মে*রে ফেলে দিয়ে এক চ*ড় দেয় লিমনের গালে। ভাগ্য ভালো রাতের বেলা। আশপাশটা শান্ত। কেউ নেই তেমন। লিমন তাহির দিকে চেয়ে রইলো। চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। তাহি গজগজ পায়ে বাসার গেটের দিকে ঢুকে গেলো। যতক্ষন তাহির ছায়া ছিলো ততক্ষন লিমন ছিলো। এরপর নিজের গন্তব্যে রওয়ানা হলো। তাহির প্রতিটি কথায় আজ কষ্ট পেয়েছে। মেয়েটাকে কি জোর করেছে কেউ! এত খারাপ আচরণ করার মত কি হলো! লিমন নিজেকে নিজে দোষারোপ করতে করতে বাড়ির পথে পথ ধরলো। আর কখনো আসবেনা এই পাষাণ মানবীর সামনে। মন ভেঙ্গে দিয়েছে আজ।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩২