সায়রে গর্জন পর্ব ৫২
নীতি জাহিদ
কন্যা বিদায় কোনো পরিবারের নিকট সুখকর নয়। তবে কন্যার যদি পিতা না থাকে তবে সেই কন্যার জীবনে কি দুঃখের অভাব আছে? নেই তো! সবাই যখন অনুরোধ করেছিলো আজ রাত তাহিকে বিদায় না দিতে, অন্যদিকে লিমন তো এই বাড়ির ছেলে তাহিকে বিদায় দিতে হবে কেনো বলেছিলো মঞ্জিলা। সকলের চোখে স্পষ্ট তাহির কষ্ট সেখানে বাঁধ সাধলো শাহাদ। ঠিক রাত এগারোটায় প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে ঘোষনা দিলো তাহির বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হতে সকলকে। সুলতানা বেগম মনোকষ্ট নিয়ে ছেলেকে বুঝাতে চাইলেন,
– বাবু মেয়েটা সামলাতে পারবেনা নিজেকে। আমরা কাল সকালে পাঠাই?
নাছোড়বান্দা শাহাদ সকলকে বুঝিয়ে দিলো এই বলে,
– কাল সকালে কি মন খারাপ কম হবে নাকি লিমন ওকে ভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাবে? যদি কেউ আমাকে গ্যারান্টি দেয় রাতারাতি ম্যাজিক করে ওর মন ভালো করে দিবে তবে কাল কেনো পরশু গেলেও আমি বাঁধ সাধবো না।
বাইরের অতিথি বিদায় নিয়েছে। পরিবারের সকলের নাথা নত। লিমন হঠাৎ করে সাহস করে বলে উঠলো,
– ভাইজান, আমার মনে হয় আমাদের উঠা উচিত। এগারোটা তো বাজে অলরেডি।
– ভেরি গুড। আমি আসছি জাস্ট ফাইভ মিনিটস।
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– আমি যাচ্ছি ওদের রেখে আসতে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। শ্বশুর বাড়ি যেমনই হোক, ওটা শ্বশুর বাড়ি। লিমন বা চাচী আম্মু এখানে স্থায়ী ভাবে থাকেনা যে সবাই মিলে এই বাড়িকে শ্বশুর বাড়ি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন।
বোনঝির দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় সুলতানা বললো,
– আম্মু, রাগ করিস না আমাদের উপর। আমরা যা করি তোর ভালোর জন্য। হয়তো তোর মনে হতে পারে খালামনি খারাপ, ভাইজান খারাপ কিন্তু আমরা তোর অমঙ্গল চাই না মা।
তাহি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। আবেগ-অনুভূতি আজ ছুঁতে পারছেনা এই মেয়েকে। সাবিনা মেয়ের জামাইর দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছে এগিয়ে এসে হাত ধরলো। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলো সাদা সুতার কাজের পাঞ্জাবিতে ছেলেটাকে বেশ মানিয়েছে। বিয়ে বলে নিজেও কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কোনো ভাব-ভঙ্গি করেনি । সাবলীল সাজ। দুজনকে একসাথে বেশ লাগছে। মনেই হচ্ছে না মেয়েটা বড়। মেয়ের জীবনে সুখ আশা করাটা বোকামী তবে আল্লাহ চাইলেই মেয়ে ফিরে আসতে পারে নতুন জীবনে। তাই মন থেকে দোয়া করে লিমনকে বললো,
– বাবা আমার মেয়েটার যত্ন নিও। যদি কখনো মনে হয় তোমাকে অশ্রদ্ধা করেছে,অসম্মান করেছে আমাকে জানিও আমি নিয়ে আসবো। ও ছাড়া যে আমি নিঃস্ব।
লিমন শ্বাশুড়ির দুহাত ধরে আশ্বাস দিয়ে বলে,
– খালামনি, আপনার মেয়ে আমার কাছে আমানত। যে মানুষটার ছায়াতলে উনি শৈশব,কৈশোর কাটিয়েছেন আমিও একই মানুষটার আদর্শে বড় হয়েছি। তিনি বড় ভাইজানের ভালোবাসার স্নেহের একজন, রাশেদ ভাইয়ের মত অসাধারণ ব্যক্তির সহধর্মিণী হওয়ার জন্য যোগ্যতা লাগে। সেখানে ডাক্তার তাহি তো রাশেদ ভাইয়ের প্রাণ ছিলেন। আমি তো তুচ্ছ। বরং যদি কখনো আমার দ্বারা কোনো ভু ল চুক হয় অগ্রিম মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আর যাই করুক উনাকে বলবেন যেন আমাকে ছেড়ে না যায়। প্রয়োজনে ঝগড়া করবে,কথা না বলবে, আমাকে রান্না না করিয়ে একবেলা উপোস রাখবে এতে আমার আপত্তি নেই। তবুও যেন ছেড়ে না যায়। আমি আপনার সম্পদের হেফাজত করবো ইনশাআল্লাহ। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
কেনো আজ চারদিকে এত মুগ্ধতা। প্রতিটি কথাই কর্ণকুহুরে বেজে উঠেছে দুজন মানুষের। রাশেদের প্রিয় বন্ধু ও তার প্রিয়তমার। বন্ধুর ভেতরটা সুখে আন্দোলিত হলো এই ভেবে যে তার শিক্ষায় ঘাটতি হয়নি। অথচ প্রিয়তমার হুঁশ নেই।
শাহাদ গাড়ির চাবি হাতে রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় কানে এসেছে প্রতিটি বাক্য। সুলতানা কবির শাহাদকে দেখে বললেন,
– বাবু শিফাকে দিই তাহির সাথে?
ছেলের বুদ্ধি মাপতে এখনো অক্ষম সুলতানা কবির। বাবু ততক্ষণে প্রতিউত্তর করলো,
– ওরা ইতিমধ্যে সবাই ওই বাসায় আছে। আজ রাত থাকবে। আমি ফিরে আসবো আপনাদের বৌমাকে নিয়ে।
সুলতানা বেগম চমকে বললো,
– কখন গেলো ওরা?
– আধ ঘন্টা আগে সবাইকে কাব্য, নিশাদ এবং মেজরের সাথে পাঠিয়েছি।
বাকিরাও বিস্মিত। শাহাদ লিমন, তাহিকে তাড়া দিয়ে বললো,
– লিমন- তাহি আগাও। চাচী আম্মু চলুন বউ বরন করবেন।
সবাই আগালে শাহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু মনে যদি এমন কিছু উঠানামা করে তবে এখানেই থামুন। কাল মেয়ে পক্ষ হয়ে যাবেন। আজ রাতে আপনার বউ বরনের প্রয়োজন নেই। সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে শরীরের উপর। চাচী আম্মুকে যেতে হবে বলেই যেতে দিচ্ছি। আর নিরাপত্তার জন্য আমি স্বয়ং ওদের নিয়ে যাব এবং আমার গাড়ি বহর সাথে থাকছে। এখানে পাভেল, হামজা এবং তুহিনকে রেখে যাচ্ছি।
রায়হান সাহেব তাড়া দিয়ে বললেন,
– ঠিক আছে যাও। দেরী করোনা। অনেক রাত হলো।
রওয়ানা হলো শাহাদের ব্যক্তিগত রেঞ্জ রোভার। নিঃশব্দ পরিবেশ। যতবার ওদের দিকে তাকিয়েছে ততবার লিমনের জায়গায় রাশেদকে ভেসে উঠছে।
– ভাইজান একটু গাড়িটা পাশ করে রাখবেন। ডাক্তার তাহির খারাপ লাগছে। বমি করবে।
শাহাদ পাশ করে গাড়ি পার্ক করলো। কিছুটা চমকিত। তাহির কি শরীর বেশি খারাপ! সাধারণত জার্নিতে তো এই মেয়ের বমি হওয়ার কথা নয়। ডোর খুলে বের হয়ে বোনের ডোর খুললো। তাহিকে ধরে নামালো। শাহাদ ছেড়ে দিলো দায়িত্ব লিমনের উপর। দূর থেকে পর্যবেক্ষন করতে লাগলো। একটু আড়াল হতেই গলগল করে ছেড়ে দিলো। লিমন তাহিকে আগলে ধরলো। রত্না পানির বোতল নিয়ে বের হয়ে ছেলের বউকে পানি খাইয়ে মুখ ধুইয়ে দিলো। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে সামান্য দূরত্বে অবস্থান ভাইজানের। টিস্যু দিয়ে তাহির মুখ মুছে দিলো লিমন। একবারের জন্য মনে হচ্ছেনা এদের মাঝে বয়সের ফারাক। লিমনকে পরিণত লাগছে। পেছনে শাহাদের নিরাপত্তা গাড়ি বহর। ধীর পায়ে তাহিকে নিয়ে এগিয়ে এলো লিমন। কাট কাট প্রশ্ন শাহাদের,
– কিছু খাস নি কেনো দুপুর থেকে?
আনত মাথা তাহির। ভাইজান ধরে ফেলেছে। লিমন চমকে গিয়ে তাহির দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবছে সংগ্রাম তো সবে শুরু, এখন থেকেই সামলে নিতে হবে এই রমনীকে। জেনে বুঝে কুয়ায় ঝাঁপ দিয়েছে, ডুবে ডুবে জল খেতেই হবে। অন্যদিকে সাঁতার জেনেও সাতরাতে পারছেনা কারণ কুয়ার গভীরতা অপরিমেয়। দম ফেলে শাহাদকে বললো,
– ভাইজান বাসায় যেয়ে খেয়ে নিবে। সন্ধ্যায় আমাকে বলেছিলো মাথা ব্যাথা করছে।
তাহি স্বামীর দিকে তাকাতেই লিমন চোখ ঝাপটে আশ্বস্ত করলো। একবার লিমনের দিকে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো শাহাদ। রত্না তাহিকে আগলে পেছনে বসলো এবার। লিমন সামনে বসলো। ব্যাগ থেকে একটা কেক বের করে তাহিকে খাইয়ে দিচ্ছে। সুলতানা কবির আসার সময় জোর করে কিছু কেক,বিস্কুট দিয়েছিলো। গাড়িতে রত্নার শরীর খারাপ লাগে যদি, শরীরের উপর ধকল নিতে পারেনা বেশি। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে তাহির। পুনরায় শাহাদের ধমক,
– তাহি কাঁদার তো কিছু দেখছিনা আমি। কাঁদলে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিব।
লিমন শাহাদের দিকে তাকিয়ে পেছন ফিরলো। শাহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কথার মাঝে প্রাণ নেই। লিমনের মনে হলো ভাইজান খুশি নয় এই বিয়েতে। যত যাই বলছে আজ সারাদিন শাহাদের আচরণ পরিলক্ষিত ছিলো। যতক্ষন আম্মা ছিলো ততক্ষন হাসিখুশি ছিলো। পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠলো। লিমন ফোন বের করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ‘Amma’।
– আসসালামু আলাইকুম আম্মা।
– আব্বা ভালো আছেন?
– জ্বি আম্মা। আপনি পৌঁছাতে পেরেছেন?
– জ্বি আব্বা সুস্থ মত এসেছি। আমার বৌমা কেমন আছে?
– ভালো তবে কাঁদছে।
– দেন উনাকে।
মনোযোগ দিয়ে পেশীবহুল হাতে দক্ষতার সাথে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত শাহাদ। শার্টের উপর মাসল গুলো ফুলে ফুলে উঠছে। লিমন পেছন ফিরে তাহির দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো। কানে ফোন লাগাতেই শুনতে পেলো প্রিয় মানুষটার স্বর। রত্নার চোখ লেগে এসেছে। তাহি ধীরে ধীরে কথা বলছে। খুব সাদা মাটা প্রোগ্রামে আজ আকর্ষণ ছিলো মেহেরজান আম্মা। আজ এসেছিলো লে.কমান্ডার রাশেদের মা হয়ে। সুন্দর সাবলীল মার্জিত জামদানী শাড়িতে সকলের নজর কেড়েছিলো মেহেরজান আম্মা ওরফে মেহনাজ পাঠান। শাহাদ লিমন এক যোগে পরিচয় করিয়েছিলো রাশেদের মা হিসেবে। আড্ডা জমেছিলো সকলের সাথে। লিমনকে বুকে টেনে সকলের সামনে বলেছিলো,
– তাহিকে আমি কখনো মেয়ে বলবোনা। ও সর্বদাই আমার পুত্রবধূ। আমার রাশেদ না থাকুক, লিমন তো আছে। তাহির কাজ লিমনের ঘরনী হয়ে ওঠা। তাহি অবশ্যই ভাগ্যবতী নারী যে আমার দুই রত্নের সহধর্মিণী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
সকলে দেখেছে রাশেদের মায়ের তেজ। গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ এই নারী। মার্জিত শব্দ। কেউ জানেনা তার অতীত, জানতে চায়নি কোথায় ছিলো এতটা দিন। শুধু এতটুকুই জেনেছে দেশ রত্ন অকুতোভয় বুদ্ধিদীপ্ত তারকা নেভীর লে. কমান্ডার রাশেদ আবেদীনের মা মেহনাজ পাঠান। যার চোখে ছেলে হারানোর বেদনা থাকার কথা অথচ পরিবর্তে তার চোখে ছিলো ছেলের বউকে পুনরায় বিয়ে দেয়ার আনন্দ। লিমনকে ছেলে হিসেবে সকলের সামনে বুকে টেনে নিয়েছিলো। কেউ না জানুক মেহনাজ পাঠান জানেন লিমনের রহস্য। সিক্স স্পাইডারের প্রতিটি সদস্যকে চেনেন। তাদের সাহায্যই যে ফরিদকে ডুবাতে কাজে লেগেছিলো সে কথা পৃথিবীলোকের মানুষ গুলোর অগোচরেই থাকবে। একেকটা তথ্য নিজের জীবন বাজি রেখে উদ্ধার করে এনেছে এই লিমন। লিমনের মাঝে খুঁজে পায় অদম্য সাহসের অধিকারী রাশেদকে। তাই হয়তো সময় অসময়ে মাঝে মাঝেই ছেলেটাকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নেয়। মেহনাজ পাঠানের সংসার,সন্তান সব ধ্বংস হলো ফরিদের লোভের শিকার হয়ে। এভাবে অনেক নারী হারাচ্ছে তাদের সম্ভ্রম। মেহনাজ ছিলো একা। তাই তাহি একা থাকুক এই ব্যাপারটা মেহনাজ মেনে নিতে পারবেনা কখনো। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। তাহিকে রাজি করিয়ে ফেলেছে বিয়েতে।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছে। অবশ্য ঘড়িতে এখন ভোর চারটা। আজান দিবে আরো কিছুক্ষন পর। পিট পিট নেত্রে তাকিয়ে দেখে শেহজার বাবা কি যেন লিখছে। ল্যাম্পশেডের হলদে ক্ষীন আলোটা আবছায়া সৃষ্টি করেছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে শাহাদ-দিয়ার প্রায় একটা বেজেছে। ফ্রেশ হয়ে শেহজাকে খাইয়ে শুতে শুতে প্রায় দুটো। মানুষটার নিশাচরী স্বভাবটা গেলোনা। উঠে বসে দিয়া ডাক দিলো,
– শেহজার বাবা! কি করছেন?
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের প্রখরতায় খাট নড়েচড়ে উঠার আওয়াজটা কানে লাগে। তৎক্ষনাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় প্রেয়সীর পানে। কিঞ্চিৎ হেসে বললো,
– জরুরি কাজটা সেরে নিলাম। নতুবা এমন উষ্ণ পরিবেশ, আদুরে বউ ছেড়ে এখানে বসে লিখার সাধ্য ছিলোনা। তুমি উঠে গেলে যে?
ঘুমো ঘুমো চোখে দিয়া হেসে বললো,
– একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে হুট করে ঘুম ভেঙে গেলো।
সম্ভবত মানুষটা তার প্রিয় আইকনের ডায়েরিতে কিছু লিখছিলো। সযতনে ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ড্রয়ার খুলে সেখানে রেখে লক করে দিলো। অন্যসব ড্রয়ার থেকে এই ড্রয়ার আলাদা। দিয়া সেটি বুঝে। কোড লক দেয়া থাকে , আজ অবধি সাহস করেনি কেউ এই ড্রয়ার ধরতে। সে যাই হোক আপাতত শাহাদ সব কাজ শেষ করে স্বপত্নীকে সময় দেয়া জরুরি মনে করে উঠে তার পাশে বসলো। গালে ডান হাত রেখে নমনীয় গলায় বললো,
– স্বপ্ন বাস্তব হয়না ফারাহ্। আর খারাপ স্বপ্ন মস্তিষ্কের ভাবনা মাত্র। কিছু নিয়ে কি দুশ্চিন্তা আসছিলো মনে?
অসহায় গলায় বললো,
– হুঁ।
– কি সেটা?
– আপনার গ্যালাপাগোস।
হো হো করে হেসে উঠলো মানুষটা। এখনই এত উৎকন্ঠা। যাওয়ার দিন আসতে আসতে তো এই মেয়ে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিবে। স্ত্রীকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো,
– ম্যাডাম শুনুন তবে, আপনি যেমন কোহিনূরকে নিয়ে দূর দূরান্তে পাড়ি দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন ঠিক তেমনি আপনার স্বামীর ও সেই ছোট বেলা থেকে গ্যালাপাগোস যাওয়ার ইচ্ছে ধারণ করেছে। আপনার ইচ্ছা তো পূর্ণ করতে পারবোনা কারণ কোহিনূরকে নিয়ে আমরা চাইলেও বাংলাদেশের রাস্তায় বের হতে পারবোনা। এমন একটা ব্রিড মানুষ তাকে আঘাত করতে পারে। তবে আমি চাইবো শেহজা যেন কোহিনুরে পারদর্শী হয়। আপনি হবে তার মাস্টার। পারবেন না?
দিয়া মুখে হাসি ঝুলিয়ে জানান দিলো,
– পারবো ইনশাআল্লাহ । আচ্ছা আমরা কবে যাবো?
– নেক্সট উইক।
– আমাদের কি আপনি শিপে চড়াবেন?
– অবশ্যই। তাই তো আকাশপথ ছেড়ে সমুদ্রস্নানে নামবো। আগে সাগর মাতাকে দেখবেন। যেখানে আকাশ মিশেছে সায়রে, যেখানে সূর্য অতি নিকটবর্তী,যেখানে #সায়রে_গর্জন উঠে, যেখান থেকে ঝড়ের তীব্রতা সন্নিকটে তেমনি বাতাসের বেগ, পানির স্রোত আঁচড়ে পড়ে মানবকূলের পদমুখে। আপনার স্বামীর আসল বাড়ি হলো সমুদ্র। দেখাবো আমার শেহজাকে তার বাবা ‘ কিং অফ ওয়েব’ এর সমুদ্ররাজ্য। একটা শুভারম্ভ করতে যাচ্ছি আমরা ইনশাআল্লাহ। বুঝতে পেরেছেন শাহাদ প্রিয়া?
– কিন্তু শেহজা তো ভুলে যাবে বড় হতে হতে।
– দিবই না। কারণ আমি প্রতি বছর সাগর পাড়ি দেব আমার প্রিয় রমনী ও মেয়েকে নিয়ে।
– কিভাবে?
– আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন আপনার স্বামী একজন এক্স- লে. কমান্ডার? সাগরে যেতে কি তার টিকিট লাগে?
খানিকটা হাসলো দিয়া। কিছুটা শান্তি এই ভেবে যে আপাতত সব রকমের ঝুট ঝামেলা বিদায় হলো। শাহাদের কথার মাঝে কেমন রহস্য খুঁজে পাচ্ছে। তবুও দিয়া কর্ণগোচর করলো সেসব ভাবনা।
এভাবে কি ঘুমানো আদৌ সম্ভব। কিছুক্ষন মেঝেতে পায়চারি করছে, কিছুক্ষন খাটে বসছে। বউ বরনের পর্ব শেষে সবার প্ল্যান ছিলো আড্ডা দিবে। যাওয়ার আগে শাহাদের কড়া নির্দেশ দুজনকে বিশ্রাম নেয়ার জন্য, কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে, অন্যদিকে পাহারাদার হিসেবে এই বাড়িতে আছে একদল বিচ্ছু। মাঝে একবার বের হয়েছিলো কামরা ছেড়ে শাহীনের ধমক খেয়ে ভেতরে চুপচাপ বসে আছে। হাত পা নিশপিশ করছে আড্ডা দিতে। ডাক্তার তাহি ঘুমাচ্ছে তাতে কি হয়েছে, ঘুমাক তিনি। লিমনের আড্ডায় কেনো বাঁধ সাজছে বাকিরা? অন্যদিকে ঘুম আসছেনা। আবার এক বিছানায় শুতেও বেশ বিব্রত বোধ করছে। তাহি অনুমতি দেয় নি সরাসরি। মেয়েটা রাতে কোনো রকম খেয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কোনো সংকোচ নেই। এদিকে লিমন যে কষ্ট পাচ্ছে তাতে কিছুই না। বিছানায় শুয়ে পড়লো অধৈর্য্য হয়ে। সহসা ভেসে এলো মেয়েলী স্বর,
– না ঘুমিয়ে ছটফট করছেন কেনো?
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললো,
– আপনি ঘুমান নি?
– রুমে যেভাবে তান্ডব করছেন ঘুম পালিয়েছে যোগ হয়েছে মাথা ব্যাথা।
– স্যরি…
থেমে গেলো লিমন। পুনরায় বলে উঠলো,
– ঘুম না আসলে উঠে বসুন গল্প করবো। আমার ভালো লাগছেনা। অফিস থেকে কি ছুটি নিবো কাল?
মাথা টনটন করছে। গত কটা রাত ঠিক ভাবে ঘুমাতে
ভুলে গিয়েছে তাহি। আজ ও ঘুমাতে পারছেনা রুমের মাঝে এই তান্ডবের জন্য। বিরক্ত হয়ে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে উঠে বসলো। প্রশ্ন করলো,
– বলুন কি বলবেন?
– আরেহ পরামর্শ দিন ছুটি নিবো?
– আমি কি করে বলবো?
– আপনি কি কাল যাবেন হসপিটালে?
– নিশ্চিত নই। এমার্জেন্সি পেশেন্ট থাকলে তো যেতে হবে, বিশ্রাম নেয়ার পরিকল্পনা আছে।
– তাহলে আমি ছুটি নিই?
তাহির এবার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। এমন ভাবে আবদার করছে মনে হচ্ছে তাহি অনুমতি না দিলে ছুটি নিবেইনা। মাথার পাশে বালিশটাকে ঠিক করে শুয়ে বললো,
– সমস্যা না হলে নিতে পারেন।
লিমন খুশি হয়ে গাল ভরা হাসি দিয়ে বললো,
– ধন্যবাদ ডাক্তার তাহি। ও আরেকটা প্রশ্ন আপনার পাশে শুতে পারি?
লিমনের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়েছিলো তাহি। নাক মুখ বিরক্তিতে কুচকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
– লিমন বড্ড বিরক্ত করছেন। আমার পাশে শুবেন না তো রাস্তায় গিয়ে শুবেন? আপনার কি মনে হচ্ছে আমি এখন অশোভনীয়, অবিশ্বাস্য এবং অবাস্তব কথা বলবো যে আপনাকে নিচে শুতে হবে অথবা ডিভানে। যদিও আপনার রুমে ডিভান নেই। কথা কম বলে ঘুমান সুস্থ ভাবে। আমাকে ও ঘুমাতে দিন। আমি যত না সম্পর্কটা নিয়ে ভাবছি আপনি তার চেয়ে বেশি আমাকে ভাবাচ্ছেন। এমন অদ্ভুত ব্যবহার করবেন না। আমাকে স্বাভাবিক হতে দিন। আমি আপনাকে মনে প্রাণে স্বামী মেনে নিয়েছি বলেই এক বিছানায় শুতে এসেছি। উফ! আর বিরক্ত করবেন না তো। ঘুমাতে দিয়ে নিজেও ঘুমান।
চোখ বড় বড় করে লিমন ঠোঁট ভেঙচি দিয়ে বললো,
– উফ! বিরক্ত করবেন নাতো?
– ভেঙালেন?
– পাশে ঘুমাতে দিয়ে কি আমাকে উদ্ধার করেছেন? আমি এমনিতেও আপনার পাশেই ঘুমাতাম। শুধু ভদ্র ছেলের মতো অনুমতি নিয়েছিলাম। অনেক প্রতিশোধ নেয়া বাকি ডাক্তার তাহি।
– অনলি তাহি। মাইন্ড ইট। আর কিসের প্রতিশোধ?
– আমি ডাক্তার তাহিই ডাকবো। সবাইকে দেখাতে হবেনা আমার একজন বুদ্ধিমতি, প্রতিভাশালী ডাক্তার বউ আছে। এনিওয়ে, মনে নেই অপমান করেছিলেন যে? সেই প্রতিশোধ।
– কি ব্যাপারে?
– আমার সুন্নতে খৎনা…
– আল্লাহ, প্লিজ। এসব কেনো মনে রেখেছেন?
– হা হা হা প্রতিশোধ। আমি তো ছোট মানুষ,তাই না?
তাহি দু হাত জোড় করে বলে,
– মাফ চাই, আর বলবোনা। কখন কি বলেছিলাম নিজের ও মনে নেই। এখন এসব তুলবেন না।
– আপু ডাকতে বলেছিলেন না?
তাহি ঠান্ডা চোখে প্রশ্ন করলো,
– ডাকতে চান?
লিমন ঘাবড়ে গেলো। এতক্ষন সব ধরনের মজা ছিলো তাহির মুখে হাসি ফোটাতে। একা ভালো লাগছিলোনা তাই বকবক করছিলো। এখন তো মনে হচ্ছে ঘটনা বিগড়ে দিয়েছে। তবে কি বেশি বলে ফেললো। কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পড়াই ভালো। লিমন নিরবে বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়লো। তাহির পুনরায় প্রশ্ন,
– ডাকতে চান? উত্তর পাই নি।
তাহির দিকে ফিরে বললো,
– সামর্থ্য নেই আপনাকে অনেক কিছু দেয়ার মতো। তবে গত পরশু রাতে বের হয়ে একটা জিনিস কিনেছিলাম। সারাদিন পাঞ্জাবির পকেটে নিয়ে ঘুরেছি। দিবো?
– আগে উত্তর চাই?
– অনুমতি দিলে প্রিয়তমা ডাকতে চাই। দিবেন?
– উপহার নিয়ে আসুন।
সুস্পষ্ট ইঙ্গিত একটি সুন্দর স্বাভাবিক সম্পর্ক শুরুর। অনুমতি পেতেই উঠে বসলো লিমন। স্বীয় স্ত্রীকে অনুরোধের স্বরে বললো,
– উঠে বসুন।
তাহি নিরবে উঠে বসলো। লিমন পাঞ্জাবির পকেট থেকে উপহার বের করে তাহির সামনে মেঝেতে বসলো। নিজের হাঁটুতে তাহির ডান পা উঠাতেই মেয়েটা চমকে পা সরাতে চাইলে লিমন বললো,
– বন্ধু ভেবে বিশ্বাস করে চুপচাপ বসুন।
বক্স খুলে একটা সোনার পায়েল বের করে পায়ে পরিয়ে দিতে দিতে বললো,
– একটারই টাকা ছিলো। সোনার যা দাম। দুটো কিনতে গেলে কিডনী বেচলেও কম হবে। অন্য পায়ের জন্য পরে কিনে দিব। আপাতত এই অল্পই গ্রহন করুন তাহি।
পায়ের দিকে তাকিয়ে তাহি হেসে বললো,
– ধন্যবাদ, খুব সুন্দর হয়েছে।
অকস্মাৎ তাহি প্রশ্ন করে বসলো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৫১
– সবাই এতবার করে রাশেদের কথা বলে আপনার শুনতে খারাপ লাগেনা।
লিমন মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
– আমি, জেনে শুনে বিষ করেছি পান।
প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।
যতই দেখি তারে ততই দহি,
আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি,
তবু পারি নে দূরে যেতে, মরিতে আসি,
লই গো বুক পেতে অনল-বাণ।
আমি জেনে শুনে বিষ করেছি প্রাণ।
