Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৩

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৩

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৩
Raiha Zubair Ripti

তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ দোয়া দুরুদ, জিকির করতেই ফজরের আজান ভেসে আসে কানে সিকান্দারের। সে ফজরের নামাজ টা শেষ করে উল্টো ফিরতেই দেখলো মুনতাহা তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ওজু করেই দাঁড়িয়েছে। কারন মাথায় তখন ওড়না পেঁচানো। সিকান্দার এগিয়ে এসে কপাল চেক করলো। জ্বর কিছুটা কমেছে। নাকের ব্যান্ডেজ খুলে রেখেছে। সিকান্দার সাইডে সরে বলল-
“ আমি আপনাকে ডাকতেই যাচ্ছিলাম নামাজ টা শেষ করে। আপনি এসে গেলেন। এখন কি আগের থেকে বেটার লাগছে? সিজদায় মাথা নত করতে গিয়ে সমস্যা হবে? ধীরে ছোঁয়াবেন নাক মাটিতে কেমন? ”
মুনতাহা উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে নামাজে দাঁড়ালো। পেছনেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এক হাত হাঁটুর উপরে রেখে সিকান্দার মুনতাহা কে দেখতে লাগলো। মুনতাহা সিজদায় মাথা নত করার সময় ধীরে ধীরে নত করলো।
সিকান্দার বসা থেকে উঠে রুমে এসে দুই মগ কফি নিয়ে আবার নামাজ ঘরে আসলো। দুটো মগ ফ্লোরে রেখে একটা বই বের করে পড়তে লাগলো।
মুনতাহা নামাজ শেষ করে এসে সিকান্দারের পাশে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বলল-

“ মনে মনে না পড়ে আমাকেও শুনিয়ে পড়ুন। আমি কিন্তু শ্রোতা হিসেবে খুবই ভালো। ”
সিকান্দার মুনতাহা কে শুনিয়ে শুনিয়ে বইটা পড়তে শুরু করলো। ডান হাত দিয়ে একটা কফির মগ এগিয়ে দিলো তার দিকে। মুনতাহা নিলো। সে চা পাগল হলেও কফি খায় না বিষয়টা মোটেও এমন না। তার কফিও পছন্দ। তবে সিকান্দার খায় ব্লাক কফি উইদাউট সুগার। মুখে নিতেই তার স্বাদ মিষ্টি পেয়ে ত্বরিত গতিতে তাকালো। সিকান্দার নিজেও কফির মগে চুমুক বসিয়ে বলল-
“ আমি জানি আপনি আমার স্টাইলে খাওয়া কফি খেতে পারবেন না। সেজন্য চিনি দিয়েছি। খারাপ লাগছে খেতে?”
“ উঁহু। দারুন লাগছে। ”
সিকান্দার তারপর পড়ায় মনোযোগ দিলো। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের কিছু কষ্টের মুহূর্ত পড়ে শোনাচ্ছে।

সীরাতের শেষের দিকে যখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের বর্ণনা পড়লো সিকান্দার। ওফাতের বর্ণনা শুনে মুনতাহার মনে হলো পৃথিবীর বিবরণ যেন এখানেই শেষ। আর কিছু জানার নেই, বোঝার নেই। তবে ওফাতে মুনতাহা যতটুকু কষ্ট পেয়েছে, তারচেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে যতবার আবু তালিবের বর্ণনা পড়েছে ততবার।
আবু তালিব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর খুব কাছের মানুষদের মধ্যে একজন তিনি। তার প্রিয় চাচা। তিনি নবিজী (সাঃ) কে তাঁর আট বছর বয়স থেকে দেখাশোনা করেছেন। নিজের কাছে রেখে বড় করেছেন, তাঁর ভরনপোষণ করেছেন,পুরো শৈশব কেটেছে এই আবু তালিবের কাছে। বড় হওয়ার পরেও এই আবু তালিব তার পাশে ছিলেন সব সময়। দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আবু তালিব তাকে সাহায্য করে গিয়েছেন। কুরাইশদের ষড়যন্ত্র থেকে তাঁকে রক্ষা করেছেন। ইসলাম প্রচারে তাকে সব ধরনের সাহায্য করে গিয়েছেন।
অথচ আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় এই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের এতো কাছাকাছি থেকেও, তাঁকে এতো সাহায্য সহযোগিতা করার পরেও এই আবু তালিব মৃত্যুবরণ করেছেন কাফের অবস্থায়। কারণ তিনি তার জীবদ্দশায় রাসূল (সাঃ) কে ইসলাম প্রচারে সাহায্য করলেও তার হৃদয়ে ইসলামকে জায়গা দিতে পারেননি। তার মৃত্যুর সময় রাসূল (সাঃ) তার পাশে বসে কতো আকুতি আর আবেগের সাথে তাকে বলেন – “ চাচা আপনি একটিবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন,

কিয়ামত দিবসে আমি আপনার জন্য সাক্ষ্য দিব। কিন্তু তিনি অস্বীকার করলেন। তার জীবনের অন্তিমকালেও সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীন ইসলামকে গ্রহণ করাতে পারেননি। তার শেষ কথায় তিনি বলে গিয়েছেন যে, “আমি আমার পিতা আবদুল মুত্তালিবের দ্বীনের উপরই মৃত্যুবরণ করবো।” এবং এ কথা বলেই তিনি চলে গেলেন দুনিয়া থেকে। এরপর আল্লাহ তা’য়ালা নাযিল করলেন- “ নিশ্চয় তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভালো জানেন। ”
কথার একট একটা শব্দ মুনতাহার কানে যাচ্ছে আর তা হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করছে। কি এমন হতো একবার ইসলাম গ্রহণ করলে? যেই ভাতিজাকে এত ভালোবাসলেন, তার তরীকাকে একবার আঁকড়ে ধরতেন। আবু তালিব এর কথা মনে হলেই তার দম আটকে আসছে। মুনতাহার মনে হচ্ছে আবু তালিবের মতো তারও প্রিয় মানুষের সাথে এমন বিচ্ছেদ হয়ে যাবে না তো? আল্লাহ না করুন।

সারাজীবন রাসূল ( সাঃ) কে ভালোবেসেও আবু তালিব জাহান্নামী। আর কষ্ট, লাঞ্ছনা দেওয়ার পরও আবু সুফিয়ান, খালিদ, ইকরামা রা: গণ একেকজন সাহাবী! ইসলামের রাহবার।
মুনতাহার চোখ অশ্রু তে ভরে উঠলো। কফির মগে চুমুক বসিয়ে বলল-
“ আপনি অনেক কিছু জানেন ইসলাম সম্পর্কে। ”
সিকান্দার ছোট্ট করে বলল-
“ অনেক যে জানি তেমন না। তবে যা না জানলেই চলে না তার চেয়ে কিছুটা বেশি জানি। ”
“ বাট আই ডোন্ট নো টু মাচ অ্যাবাউট ইসলাম। ”
সিকান্দার তাকালো তার দিকে।
“ ডোন্ট ওয়ারি উই উইল লার্ন ইট টুগেদার। ”
মুনতাহা মাথাটা তার কাঁধে রেখে বলল-
“ শুনুন। ”
“ বলুন,আমি শুনতে সদা প্রস্তুত। ”
“ আপনি কেমন সহধর্মিণী চান?”
“ সহধর্মিণী হিসেবে কেমন চাই সেটা কখনো ভাবি নি। তবে সহধর্মিণী হিসেবে আমি আপনাকে চেয়েছি আর পেয়েছিও আমি আপনাকে। ”

“ আমাকে না আপনি শিখিয়ে পড়িয়ে আপনার মনের মতো গড়ে নিবেন দয়া করে। আমার খুব হিংসে হয় আপনাকে,আপনার ব্যক্তিত্বকে। কাশ আমি ছোট থেকেই এমন হতাম। আমাকে কেউ কখনো আপনার মতো করে যত্ন করে নি। আপনার মতো করে এত ভালো ব্যবহারও করে নি। আপনার একনিষ্ঠা সততা দায়িত্বশীলতা আর ভালোবাসা দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ। শুনুন আমি আপনার সাথে এভাবেই থাকতে চাই। আমি আপনার যত্নে ভালেবাসায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যতই বাঁধা বিপত্তি ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেনো আমাদের মাঝে,আপনি আমাকে ছেড়ে দিবেন না। আমিও আপনাকে ছাড়বো না। ”
সিকান্দার জড়িয়ে ধরলো তাকে। বুকের উপর মাথাটা চেপে ধরে বলল-
“ কিছু শুনতে পারছেন? ”
“ হু । ”

“ মাই হার্টবিট’স ফর ইউ। সেখানে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া মানে আমার হার্টের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া। ”
“ শুনুন আমি দুনিয়ার পাশাপাশি পরকালেও আপনার জীবনসঙ্গী হিসেবে থাকতে চাই। এর জন্য আমাকে যা যা করতে হবে আমি সব করবো। আপনার পাশে কোনো জান্নাতি হুর কে আমি সহ্য করতে পারবো না। আপনি শুধুই আমার। রব কি আমার এই ইচ্ছে টা পূরণ করবে..? ”
সিকান্দার হাসলো এই কথা শুনে। নারী মন মানেই স্বামী নিয়ে হিংসে থাকবেই। সিকান্দার মুনতাহার হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-
“ ঘোড়ার কপালে যেমন কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ লিখে দেওয়া হয়েছে…তেমন সিকান্দার শাহ্ এর কপালে দুনিয়া থেকে শুরু করে জান্নাত পর্যন্ত মুনতাহা মুন কে লিখে রাখা হয়েছে..সুতরাং আপনি ইহকালেও আমার,আর পরকালেও আমার.. জান্নাতে কোনো জান্নাতি হুরের প্রয়োজন নেই আমার। আপনি একাই ৭২ জন হুরের সমান। আপনার মর্যাদা, সৌন্দর্য জান্নাতি হুর দের থেকেও অধিক সম্মানজনক ও শ্রেষ্ঠ। ”
মুনতাহা চেপে ধরলো সিকান্দার কে। এমন একটা মানুষ কে কি ভালো না বেসে থাকা যায়? সিকান্দার আবার তার হাতে ঠোঁট ছুঁয়ালে মুনতাহা বলে উঠে-

“ আপনি শুধু আমার হাতে আর কপালেই চুমু খান। আর কোথাও খান না কেনো?”
সিকান্দার বাঁকা চোখে তাকালো। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনি আর কোথায় কোথায় চান আমার ঠোঁটের ছোঁয়া? বলুন শুধু একবার। আমার ঠোঁট সদা প্রস্তুত আপনাকে ছুঁয়ে দিতে। ”
“ ন..না মানে আমি…”
মুনতাহা ঠোঁট কামড়ে চুপ হয়ে রইলো। ধূর লজ্জা লাগছে তার। সিকান্দার মুনতাহা কে ধরে বসা থেকে উঠালো। তারপর হাত ধরে রুমে আসতে আসতে বলল-
“ Holding hands, hand kisses, and forehead kisses— the sweetest gestures of love. A hand kiss brings a different kind of feeling, and a forehead kiss is the purest love language. ”
“ আপনার দাদিজান আমাকে খুব লজ্জায় ফেলে প্রতিদিন। সে ভাবে আপনাকে আমি কাছে আসতে দেই না। ছুঁতে দেই না। ”
সিকান্দার মুনতাহার দু গালে হাত রাখলো। তারপর বলল-

“ আপনি কি জানেন, কিছু মানুষকে দোয়া ছাড়া ছোঁয়া যায় না। আর আপনি ঠিক সেইরকম। বিয়ে হলেই যে সাথে সাথে আমাদের শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে হবে বিষয়টা আমার ভালো লাগে না বললেই চলে। হ্যাঁ স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করাটা সদকার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আমি চাই না আমাদের সম্পর্কে এই বিষয়টা খুব বড় ভাবে প্রভাব ফেলুক। আমরা হারিয়ে যাচ্ছি না মন। শারীরিক সম্পর্কের চেয়েও আমাদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক হওয়াটা বেশি জরুরি। আর সেটা ইতিমধ্যে আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে। তাই খুব একটা সময় লাগবে না আমার আপনার কাছে আসতে। যখন তখন আসতে পারি। তবে শুনে রাখুন আমি কিন্তু মোটেও ভালো পুরুষ নই। সময় হোক। আমি আমার হক ঠিকই বুঝে নিব আপনার থেকে। দাদিজানের কথায় কান দিবেন না। বয়স হচ্ছে। আমার মতো এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিবেন। তিনি আমার বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই সুখবর শুনতে চায় আমাদের থেকে। মানে বুঝতে পারছেন তিনি কতটা এগিয়ে পৃথিবীর থেকে! ”

৮ টা বাজতেই সিকান্দার অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নেয়। ধবধবে সাদা শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে আয়নার সামনে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিল সে। পাশে বিছানায় বসে থাকা মুনতাহা চুপচাপ নিজের নাকের ওপর আলতো হাত রাখল। এখনও ব্যথাটা পুরোপুরি কমেনি। আজ আর কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তার।
ইলার একটা বদঅভ্যাস আছে কথায় কথায় মানুষের নাক টেনে ধরা। না জানি কখন নাক টা টেনে ধরে ফেলে।
সিকান্দার তাকিয়ে বলল-
“চলুন, নিচে যাই।”
মুনতাহা মাথা নেড়ে ধীরস্বরে বলল-
“আপনি যান, আমি আসছি।”
ঠিক তখনই সিকান্দারের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই তার মুখের ভাব বদলে গেল। কল রিসিভ করে সে রুম থেকে বের হয়ে করিডরের শেষ প্রান্তে চলে গেল। নিচ থেকে সেলিম মির্জা ডেকে উঠতেই সে সেদিকেই এগিয়ে গেল।
রুমে একা থেকে মুনতাহা ওড়নাটা মাথায় টেনে নিল। তারপর ফোন হাতে নিয়ে ইলাকে একটা ছোট্ট মেসেজ পাঠালো- ‘আজ যাচ্ছি না ভার্সিটিতে আমি।’
মেসেজ পাঠিয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হতেই হঠাৎ কারও সাথে ধাক্কা লাগতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল সে। সামনেই দাঁড়িয়ে অর্নব। মুহূর্তেই মুনতাহার মুখ বিরক্তিতে শক্ত হয়ে গেল।

“আপনার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? আমি রুম থেকে বের হলেই আপনি এসে হাজির হন। সমস্যা কি আপনার? কাজকাম নেই?”
অর্নব দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“তুমি তো জানো আমি বেকার। কাজকর্ম করি না।”
কথাটা বলতে বলতেই তার দৃষ্টি মুনতাহার মুখ বেয়ে নেমে গেল নাকের দিকে। কপাল কুঁচকে বলল-
“নাকে কি হয়েছে তোমার? ভাইয়া মেরেছে নাকি?”
এই বলে সে হাত বাড়িয়ে নাক ছুঁতে চাইতেই মুনতাহা তড়িঘড়ি পিছিয়ে গেল। কিন্তু অর্নব এবার তার কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। মুনতাহা সাথে সাথে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
“হাত ছাড়ুন!”
অর্নব তাকে টেনে নিজের সামনে এনে নিচু গলায় বলল-
“মুনতাহা, তুমি ভাইয়াকে ছেড়ে দাও। আমি জানি তুমি সুখে নেই।”
মুনতাহার চোখ জ্বলে উঠল রাগে।
“আমি কি আপনাকে বলেছি আমি সুখে নেই? নাকি আমার চোখেমুখে লেখা আছে?”
“তা লেখা নেই। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি।”

অর্নব আরো ঝুঁকে এলো- “তুমি যদি সত্যিই সুখী হতে… ভাইয়াকে ভালোবাসতে… তাহলে এতদিনে তোমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয়ে যেত। ইউ নো হোয়াট আই মিন?”
মুনতাহা হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শক্ত গলায় বলল-
“আপনাকে কে বলেছে আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি?”
অর্নব ঠোঁট টেনে হাসল।
“যদি হত… তাহলে তোমার মাথার চুল প্রতিদিন এমন শুকনো থাকত না।”
এক মুহূর্তে যেন পুরো শরীর ঘৃণা আর অপমানে কেঁপে উঠল মুনতাহার। এই মানুষটা এতটা নোংরা হতে পারে! সে জোরে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল-
“আমার হাত ছাড়ুন! আপনার মতো জঘন্য মানুষ আমি দুটো দেখি নি। আপনার লজ্জা করে না? আমার আর আমার স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার আপনি কে? আমরা কি করব না করব সেটা পুরোপুরি আমাদের প্রাইভেট বিষয়!”
অর্নব এবার গলা উঁচু করে বলল-

“প্রাইভেট বিষয়? ভাইয়াকে তুমি ভালোবাসো না এটা সবাই বুঝে! তুমি শুধু নামের বউ হয়ে আছো!”
“চুপ করুন!” মুনতাহার চোখে পানি চলে এল রাগে। “আর একটা কথাও বলবেন না!”
অর্নব তার হাতের চাপ আরো শক্ত করে বলল-
“তুমি চাইলে এখনও…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা কেউ পেছন থেকে অর্নবের কলার চেপে ধরল। পরের মুহূর্তেই চড় পরলো গালে। চড়টা আর কেউ মারে নি সিকান্দার মেরেছে। তার চোখ দুটো রাগে রক্তিম হয়ে আছে। চোয়াল শক্ত। শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।
“ তোমাকে আমি ওয়ার্নিং করেছিলাম না? তারপরও টত সাহস কোথায় পাও? আমার বউয়ের গায়ে হাত দেওয়ার!”
বলেই সিকান্দার সজোরে আবার চ’ড় মারলো অর্নবের গালে। দানবের মতে শক্ত হাতের চড় খেয়ে অর্নব টাল সামলাতে না সামলাতেই আরেকটা চড় এসে পড়লো তার গালে।

“ভাইয়া…!”
অর্নব কিছু বলতে গিয়েও পারল না। সিকান্দার যেন শুনতেই পাচ্ছে না। সে আরো একটা চ’ড় মেরে বলল-
“ মরতে চাও আমার হাতে তুমি? বলো মরতে চাও? আসো তোমাকে আমি মেরেই ফেলি। ”
মুনতাহা ভয়ে জমে গেল। সে কখনও সিকান্দারকে এত ভয়ংকর রাগতে দেখেনি। সাইদা মির্জা চেঁচামেচি শুনে এসে দেখেন ছেলের নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। সিকান্দার অর্নব কে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে সাইদা মির্জা তাড়াতাড়ি এসে সিকান্দারের হাত টেনে সরানোর চেষ্টা করলেন।
“ছাড়ো ওকে! মেরে ফেলবে নাকি আমার ছেলেটাকে তুমি? ”
সিকান্দার ছাড়তে নারাজ। তবে সাইদা মির্জাও কম নন। সেলিম মির্জাও এগিয়ে আসলেন। অবশেষে দুজনে অনেক কষ্টে অর্নবকে সিকান্দারের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের পেছনে নিয়ে এলেন। অর্নবের ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। শার্টের কলার ছিঁড়ে গেছে।
সাইদা মির্জার শরীর কাঁপছে রাগে। তর্জনী তুলে চিৎকার করে বলল-

“ তুমি কোন সাহসে আমার ছেলেকে এতগুলো চ’ড় মারলে সিকান্দার? তোমার কলিজা কয় হাত হয়ে গেছে শুনি? সাইদা মির্জার সামনে তুমি তার ছেলে কে মারো! ”
সিকান্দার রাগী চোখে তাকালো। অন্য সময় হলে এই রাগান্বিত চোখ দেখে সাইদা মির্জা চুপ হয়ে যেতেন। কিন্তু আজ হচ্ছে না।
“ আমার কলিজা বরাবরই ১০০ হাত। আর আপনার ছেলেকে প্রথম চড় টা মেরেছি আমার স্ত্রী কে ছোঁয়ার অপরাধে। দ্বিতীয় চড় টা মেরেছি ভাইয়ের স্ত্রী কে ভাবি না ডেকে নাম ধরে ডাকার
অপরাধে। তৃতীয় চড়টা মেরেছি আমাদের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে আমার স্ত্রী কে কুরুচিপূর্ণ আকারইঙ্গিত করে হেনস্তা করতে চাওয়ার অপরাধে। আর সর্বশেষ চড়টা মেরেছি নিজের সীমা যেন ভবিষ্যতে ভুলে না যায় সেজন্যে। এতগুলো চ’ড় খাওয়ার পরও যদি আপনার ছেলে এই সেম ভুল গুলো আবার রিপিট করে..আই স্যোয়ার ওর হাত আমি শরীর থেকে আলাদা করে ফেলবো। মুনতাহা আমার স্ত্রী,তাকে ছোঁয়ার অধিকার কেবল আমারই। ”

কথাটা শেষ করেই সিকান্দার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে মুনতাহার দিকে তাকালো। তারপর এগিয়ে এসে বলল-
“ আপনার সাথে কি হাত নেই? এরপর থেকে ও আপনার ধারে কাছে এসে বেয়াদবি করা তো দূরে থাক কথা বলার চেষ্টা করলেও চড়িয়ে ওর গাল লাল করে দিবেন। বাকিটা আমি সিকান্দার শাহ্ দেখে নিব। দিন কে দিন অধপতনে যাচ্ছে এই ছেলেটা। আর তারজন্য এর বাবা মা’ই দায়ী। ”
সাইদা মির্জা মোটেও এই অপমান গিলবে না। এর চেয়ে ১০০ গুন উগ্রে ফেরত দিবে। ছেলেকে নিয়ে রুমে আসলেন। ঠোঁট নাকের র’ক্ত মুছে মলম লাগিয়ে দিলেন। সিমরান দূর থেকে শুধু দেখে গিয়েছে। সাইদা মির্জা তার উপরেও রাগ ঝেড়ে বললেন-
“ কেমন স্ত্রী তুমি তোমার স্বামী কে একজন মারছিলো আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলে। ”
সিমরান শক্ত মুখে বলল-
“ আপনার ছেলে নিজের দোষেই খেয়েছে মা’র। সে কেনো অন্যের বউয়ের পথ আটকিয়ে তাকে অপদস্ত করতে যাবে? এখন যদি একটু সুধরায় আপনার ছেলে। ”
সিমরানের কথা শুনে অর্নব আরো রেগে গেলো। ঝাড়ি দিয়ে বলল-
“ এই তুই যাবি এখান থেকে? গাধার মুখে খই ফুটছে। ”
সিমরান চলে গেলো।

ইসলামে কালো যাদু বা জাদুটোনাকে বলা হয় সিহর। এটি এমন একটি কাজ, যেখানে মানুষ জিন বা শয়তানের সাহায্য নিয়ে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুতর পাপ এবং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
পবিত্র কুরআনে সিহরের উল্লেখ আছে এবং এর মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, যাদু মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং তা ফিতনা ও ধ্বংসের কারণ হয়। তাই মুসলমানদেরকে এ ধরনের কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যারা কালো যাদু করে, তাদেরকে ইসলামে সাহির বলা হয়। একইভাবে, যারা তান্ত্রিকতা, জিন ডাকা, তাবিজ-কবচের মাধ্যমে অদৃশ্য শক্তির সাহায্য নিয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের দাবি করে, তাদের কাজকেও ইসলামের দৃষ্টিতে ভুল ও হারাম বলা হয়েছে।

জাদুকররা শয়তান বা অবাধ্য জিনদের সন্তুষ্ট করতে বিভিন্ন জঘন্য ও শিরকপূর্ণ কাজ করে থাকে, যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু কোরবানি করা বা শয়তানের পূজা করা। কুরআন শরিফের পাতা অবমাননা করা বা নাপাক স্থানে বসে শয়তানের নাম জপ করা। নাউজুবিল্লাহ….!!
দীর্ঘসময় অপবিত্র অবস্থায় থেকে শয়তানের মন্ত্র পড়া। শয়তানকে খুশি করতে নির্দিষ্ট রঙের পশুর রক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস উৎসর্গ করা হয়।
সিকান্দার কে বশে আনার জন্য তান্ত্রিক সেই সবই করলো। ইসলামপুরের সেই পুরোনো ভবনের ভেতরটা এখন আরও অস্বাভাবিক ঠান্ডা। তান্ত্রিক সেলিম মির্জার দিয়ে যাওয়া সিকান্দারের একটা ছবি আর কিছু চুল সামনে রাখলো। ঘরের মাঝখানে মাটির উপর একটা অদ্ভুত সাজানো জায়গা। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কালো কাপড়, শুকনো কিছু জিনিস, আর অর্ধনিভে যাওয়া মোমবাতি।
তান্ত্রিক ধীরে বসলো। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। তারপর বিরবির করে কিছু ঠোঁটের কোণে আওড়ালো। কোনো অচেনা ভাষার মতো, যার অর্থ সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে।
কিছুক্ষণ পর সে চোখ বন্ধ করলো। চারপাশে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো। মোমবাতির শিখা কাঁপতে লাগলো। তান্ত্রিকের মুখে ঘাম জমছে, কিন্তু সে থামছে না। তার সামনে রাখা ছবির উপর হালকা ছায়া পড়লো।
তান্ত্রিক ফিসফিস করে বলে উঠলো-

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১২

“ জানি এটা সহজ হবে না। ছেলেটা অনেক ধার্মিক। তোমাকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হবে। আমি এটাও বুঝতে পারছি তুমি তার ধারে কাছেও যেতে পারবে না। কিন্তু তুমি দূর থেকে যেটা পারো সেটাই করো। তার ভেতরে সন্দেহ ঢোকাও… তার শান্তি কেড়ে নাও। তার সংসার ভেঙে দাও। এমন ভাবে সবটা করো যেন সে তার স্ত্রী কে সহ্য করতে না পারে। ঘৃণা করতে থাকে। তার বিনিময়ে তোমাকে খুশি করার দায়িত্ব আমার। যা চাইবে তাই দিব। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৪