Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২
Raiha Zubair Ripti

আকাশে আজ দুটো শুকতারা উঠেছে। আকাশের দিকে তাকালেই সর্ব প্রথম এই তারা দুটোই নজরে আসছে। চাঁদের ঠিক দু পাশে জ্বলছে তারা। চাঁদের আলো টাও আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল। আজ বোধহয় জ্যোৎস্নার রাত। রাস্তার ধারে কুকুর গুলো ডেকে চলছে একাধারে। এমন এক পরিবেশে একা কানে ফোন হাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মুনতাহা। সিকান্দারের গলা শুনেই তার গা বরফের মতো জমে গেছে। এই জ্যোৎস্নার আলোয় কেমন ঠান্ডা অনুভব হলো তার। কাঁপা কাঁপা গলায় সিকান্দার কে মুনতাহা প্রশ্ন করলো-

“ আ..আপনি আমার ফোন নম্বর পেলেন কোথায়?”
ওপাশ থেকে শ্বাস ফেললো বোধহয় সিকান্দার। মুনতাহা শব্দ শুনলো। সিকান্দার রুম থেকে বের হয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
“ খুব কি কঠিন কাজ আপনার নম্বর পাওয়াটা আমার জন্য ? ”
“ না কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আপনি আমাকে ফোন করেছেন কেনো?”
“ কদিন পর আপনার আমার বিয়ে মন। ফোনে কথা বলে দু’জনের মধ্যে থাকা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং গুলো বোঝাপড়ার মাধ্যমে সল্ভ করে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ।”
“ আমি তো মানা করে দিয়েছি বিয়েতে। ”
“ নিউ কিছু বলুন। না থেকে সরে এবার হ্যাঁ তে আসুন। আমি বাংলাদেশে আসার পর থেকে শুধু আপনার না আর না-ই শুনে আসছি। ”

“ সম্ভব নয়। ”
“ কি সম্ভব নয়?”
“ আপনাকে বিয়ে করাটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
“ কি বললেন? আমি শুনতে পাই নি। ”
“ বলেছি আমার পক্ষে আপনাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। ”
সিকান্দারের গলার স্বর এবার আরো গম্ভীর আর শক্ত হয়ে আসলো-
“ আবার বলুন মন। আমি এবারও শুনতে পাই নি।”
মুনতাহা থতমত খেয়ে গেলো এমন স্বর শুনে। কতবার করে বললো। তাও নাকি লোকটা শুনতে পায় নি।
“ আপনি বোধহয় মিউট করে রেখেছেন ফোন টা। অন করুন। ”
“ অন আছে মন। আপনি বলুন। ”
মুনতাহা হতাশ হলো। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল-

“ আপনি আমাকে বিয়ে কেনো করতে চাইছেন ? কি উদ্দেশ্য আপনার? সত্যি করে বলুন। ”
“ পুরো একটা জীবন তো আর একা একা কাটিয়ে দেওয়া যায় না মন। জীবনটা আল্লাহর বানানো একটা লম্বা সফর, সেই সফরে পুরুষদের জন্য একজন সহধর্মিণী থাকা আবশ্যক। আর এই বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত একদম দৃঢ় যে আমি আমার জীবনসঙ্গিনী,সহধর্মিণী হিসেবে,আমার পরবর্তী প্রজন্মদের জন্য কেবল আর কেবল মুনতাহা মুন কে চাই, আর সেটাও হালালভাবে, সম্মানের সাথে, আজীবনের জন্য। সেজন্য আমার আপনাকে বিয়ে করাটা প্রয়োজন। ”
মুনতাহার শরীর কেমন ঠান্ডা হয়ে আসলো আরো। লোকটার গম্ভীর ঠান্ডা গলায় বলা কন্ঠ টা এতো অমায়িক আর সুন্দর! মুনতাহার বেলকনির রেলিং চেপে ধরে বলল-
“ আমি দোয়া করি আপনি আপনার মনের মতো একজন ভালো জীবনসঙ্গী পান। ”
সিকান্দার সেকথা শুনে কিঞ্চিৎ হেঁসে বলে-

“ হোয়াই নট ইউ মিস মন? ”
মুনতাহা কেনো নয়, সেই কারনটা বলার জন্য মুখ হা করতেই সিকান্দার বলে উঠলো-
“ আকাশের দিকে তাকান মন। ”
মুনতাহার হা করা মুখ টা বন্ধ হয়ে গেলো।
“ কিছু দেখতে পাচ্ছেন?”
“ জ্বি আকাশ দেখতে পাচ্ছি। ”
“ উঁহু চাঁদের দিকে তাকান। দেখুন আমাদের ভবিষ্যৎ। আমি আপনি আর আমরা। ”
মুনতাহা সিকান্দারের শেষ কথাটা শুনে বোকাচণ্ডী হয়ে যায়। কি মিন করছে সিকান্দার?
“ বুঝেন নি? এতটাই বোকা আপনি মন? ২ বছর প্রেম করলেন কি করে তাহলে? ”

মুনতাহা আকাশে থাকা চাঁদের দিকে ভালো করে তাকালো। দু’পাশে শুকতারা দুটো দেখে বুঝতে আর বাকি নেই সিকান্দার কি মিন করেছে। লজ্জায় মুনতাহা বোঝার সাথে সাথে ফোনটা কেটে দিলো।
সিকান্দার কেটে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকালো। ফোনের স্ক্রিনের আলো নিভে যেতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। রুম থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে অর্নবের রুমের দিকে গেলো।
অর্নব তখন ফেসবুকে নিউ আইডি খুলছিলো। কম করে হলো এই এক বছরে ৫ টা নিউ আইডি ব্লক করেছে মুনতাহা। আজ মেসেজ পাঠিয়েছিল। বলেছিল ভাইয়াকে যেন বিয়ে না করে। বিষয় টা কেমন দেখায় তার এক্স কে তার বড় ভাই বিয়ে করবে। সেই এক্স কে আবার ভাবি বলতে হবে। অর্নব পারবে না। এমনিতেই মায়ের কথায় একটা বোকা গাধা মেয়েকে বিয়ে করে জীবনটা তার ত্যানাত্যানা হয়ে গেছে। তার উচিৎ হয় নি মায়ের কথা শোনার। তারও উচিত ছিলো ভাইয়ের মতো শক্তিশালী হওয়া। ফোনে নিউ সিম কার্ড ভরে ফের নিউ আইডি খুলতে নিবে এমন সময় ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ পেয়ে অর্নব দরজার দিকে তাকায়। ভাইকে দেখে অবাক হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সিকান্দার কপাল স্লাইড করতে করতে এগিয়ে এসে বলল-

“ তুমি মুনতাহাকে আজও নক দিয়েছিলে? ”
অর্নব চমকালো। সিকান্দার জানলো কিভাবে এটা? মুনতাহা না বললে তো জানার কথা না। তাহলে কি দুজনের ভেতর কথা হচ্ছে! অর্নবের গলা শুকিয়ে আসে।
“ আসলে ভাইয়া….”
“ আসল নকল আমি শুনতে আসি নি। তুমি কোন সাহসে এমন কাজ করো? আমার শক্ত হাতে মা’র খেলে তবেই কি তুমি শান্ত হবে? তোমাকে বলেছি না স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই মন? শুনছো না কেনো? ঘরে বউ আছে তোমার। সে খেয়াল রেখো। দ্যিস ইজ ইউর লাস্ট ওয়ার্নিং। ডোন্ট ক্রস দ্যা লাইন এগেইন। এরপরও যদি এমন কিছু করতে দেখেছি তাহলে তোমার মুখের মানচিত্র আমি বদলিয়ে ফেলবো মে’রে নালায়েক নিকাম্মা । ”

অপমানে লাল হয়ে গেলো অর্নবের মুখটা। সিকান্দার চলে যেতেই অর্নব ঠাস করে বসে পড়লো বিছানায়। তার ভাইয়ের সাথে ছোট থেকেই অনেক দূরত্ব। কোনো এক কারনে সিকান্দারের সাথে এ বাড়ির কারোরই বনিবনা হয় না। না সিকান্দার এ বাড়ির কোনো বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করে,আর না সে তার জীবনে কাউকে ইন্টারফেয়ার করতে দেয়। সে তার নিজ মর্জিতে সব সময় চলাফেরা করে। অর্নব আর সিকান্দার যে দু ভাই সেটা তাদের দেখলে বোঝা যাবে না। কারন ভাই ভাইয়ের মাঝে যে সম্পর্ক থাকে সেটা তাদের মধ্যে নেই। অর্নব বেড়ে উঠেছে ছোট থেকে মির্জা বাড়িতে আর সিকান্দার কে একটা বয়সের পর আমেরিকায় গিয়ে থাকতে হয়েছে বাড়ি ঘর ছেড়ে। কিজন্য ১২ বছর আগে আচমকা সিকান্দার আমেরিকা চলে গিয়েছিল অর্নব জানে না। ১২ বছরে তাদের মধ্যে একবারও কথা হয় নি। তাদের কথা হলো আজ। আর সেটাও এমন থ্রেট দিয়ে।

সিমরান রাতের খাবার খেয়ে হেলতে দুলতে রুমে আসছিলো। মাঝপথে সিকান্দার কে দেখে ভেবাচেকা খেয়ে সুন্দর মতো হাঁটা শুরু করে। সিমরান ভয় পায় সিকান্দার কে। ছোট বেলায় কটা ধমক খেয়েছিল। সেগুলো আজও কানে শো শো করে বাজে। এখন বড় হয়েও ধমক খেলে মানসম্মান আর থাকবে না। রুমে এসে স্বামী অর্নব কে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে দেখে সিমরানের কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। স্বামীর পেছন পেছন সেও পায়চারি করতে করতে বলল-
“ কি হয়েছে তোমার অর্নব ভাইয়া? এভাবে পায়চারি করছো কেনো? কোনো সমস্যা? ”
অর্নব পায়চারি করা থামিয়ে দিয়ে পুরো কথা হাইড করে শুধু বলল-

“ ভাইয়া আমাকে নালায়েক নিকাম্মা বলে গেছে। ”
নালায়েক নিকাম্মা বলেছে! আর তার স্বামী রাগে ফেটে যাচ্ছে! তার মানে খারাপ কিছুই বলেছে। সিমরানও রাগে ফেটে পড়লো।
“ কিহ! সিকান্দার ভাইয়ার এত সাহস আমার স্বামী কে নালায়েক নিকাম্মা বলে! সে নিজে একটা নালায়েক নিকাম্মা। তার চৌদ্দ গুষ্টি সাথে তার ভবিষ্যৎ বউও নালায়েক নিকাম্মা । এ্যাহ আসছে আমার স্বামী কে এসব বলতে। ঠাডা পড়ুক ঐ মুখে। কিন্তু অর্নব ভাইয়া একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”
“ তুই আবার কি জিজ্ঞেস করবি? ”
“ না মানে নালায়ে নিকাম্মার মানে টা কি? খুব খারাপ কিছু?”
অর্নব আড় চোখে তাকালো। অশিক্ষিত হাঁদারাম মেয়ে এইটার মানে জানে না। অথচ এতক্ষণ সিকান্দারের গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলছিল। অর্নব বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে চলে গেলো।

মুনতাহা সিকান্দারের ফোন টা কে’টে দিতেই মনে পড়লো তার মা তাকে সেই কখন ডেকেছিল। এখনও তার যাওয়া হয় নি মায়ের কাছে। ফোনটা বিছানার উপর রেখে মুনতাহা বসার ঘরে আসলো। সাথে সাথে নজরে আসলো খাবার টেবিলে বসা নাদিম কে। নাদিম সালমান মির্জার বড় ছেলে। ময়না বেগম পাশের চেয়ারে বসে আছে। খাবার বেড়ে দিচ্ছে, পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে। কি আদর,কি আদর! অথচ মুনতাহার বেলায় মুনতাহা কিছুই দেখে না। মুনতাহা এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আমাকে ডেকেছিলে আম্মু?”
ময়না বেগম আড় চোখে একবার তাকালো। তারপর শক্ত রাগান্বিত গলায় বলল-
“ কখন ডেকেছি তোমায়? আসতে এতক্ষণ লাগলো কেনো? কি করছিলে কি তুমি? ভাত বেড়ে রাখা হয়েছে সেই কখন। খেয়ে উদ্ধার করো আমাকে। ”

মুনতাহা টেবিলের শেষ প্রান্তে তাকালো। একটা প্লেটে ভাত আর তরকারি বাড়া আছে। মুনতাহার কি ঐ ভাত গলা দিয়ে যাবে? না যাবে না। আম্মুর মুখে এমন শক্ত কথা শুনলে সেদিন আর মুনতাহার গলা দিয়ে ভাত নামে না। মুনতাহা মাথা নত করে বলল-
“ আমি খাবো না আম্মু। খিদে নেই। ”
ময়না বেগম সাথে সাথে তাকালো মুনতাহার দিকে।
“ খাবে না সেটা আগে বলবে না? তরকারি দেওয়া আছে ভাতে। এই ভাত এখন খাবে কে? নষ্ট হবে না?”
মুনতাহার চোখ দুটে টলোমলো করলো। চোখের পলক ফেললেই গাল বেয়ে টপটপ করে ফ্লোরে পড়বে। পাশ থেকে নাদিম বিরক্ত হলো। খেতে বসেও শান্তি নেই এ বাড়িতে। খাবারের উপর হাত ধুয়ে নাদিম বিরক্ত হয়ে চলে গেলো।
মুনতাহা নিজের চোখের জল আঁটকে বলল-
“ আমি সকালে খেয়ে নিব,তোমার খাবার নষ্ট হবে না আম্মু। আমার অভ্যাস আছে বাসি পঁচা খাবার খাওয়ার। ”
মুনতাহা খাবারের প্লেট টা নিয়ে ফ্রিজে রেখে রুমে চলে আসলো। রুমে আসতেই চোখের জল গুলো আর বাঁধ মানলো না। ভেঙে অঝোর ধারায় বেরিয়ে আসলো।

সারা রাত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো মুনতাহা। খুবই তিক্ত লাগছে সব। পরের দিন ঘুম ভাঙলো মুনতাহার খুব ভোরে। ফজরের নামাজ টা পড়ে বাড়ি ঘর ঝাড়ু দিয়ে এঁটো থালাবাসন সব মেজে রুমে এসে পড়তে লাগলো। মুনতাহা এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে। দিন রাত পড়াশোনা করে খুব পরিশ্রমের ফল হিসেবে মুনতাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে পেয়েছে। কারন ইন্টার পাশ করার পরই ময়না বেগম বলেছিলেন মুনতাহা কে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করানো সম্ভব হবে না। হয় তাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে পড়তে হবে আর তা না হলে ন্যাশনালে। মুনতাহা পাবলিক কেই বেছে নিয়েছিল। তখন অবশ্য ময়না বেগম মুনতাহাকে কোনো কাজ করতে দেয় নি। যথেষ্ট সময় দিয়েছিলেন পড়াশোনা করার জন্য। অনলাইনে কোর্স তিনিই কিনে দিয়েছিলেন। বই কিনে দিয়েছিলো নাদিম। মুনতাহা কে কেবল শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম তোলারই টাকা দেওয়া হয়েছিল। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পায় তাহলে আর কোথাও পরীক্ষা দিতে পারবে না। সরাসরি ন্যাশনালে যেতে হবে। মুনতাহা তার সবটুকু পরিশ্রম ঢেলে দিয়েছিল সেই তিনটা মাস। হাড় ভাঙা পরিশ্রমের জন্য সে এখন অনার্সটা করতে পারছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেদিন রেজাল্ট টা বের হলো। মুনতাহার ম্যারিট ১০ ছিলো। তখন কি যে খুশি লাগছিলো মুনতহার। মা’কে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন তার মা তার সামনে অব্দি আসে নি। নাদিম আর সালমান মির্জা শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। কিন্তু মুনতাহা একটু মায়ের বুক খুঁজছিল। কিন্তু পায় নি।

মুনতাহা দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ভার্সিটির ব্যাগ টা গুছিয়ে নেয়। তারপর নিজেও রেডি হয়ে বাহিরে এসে দেখে তার মা রান্না ঘরে কাজ করছে। মুনতাহা ফ্রিজ খুলে রাতের বাসি খাবার টা বের করতে নিলে দেখে সেই খাবার টা নেই,প্লেট টাও নেই। ময়না বেগম রান্না ঘর থেকে একটা প্লেট এনে খাবার টেবিলে রেখে ফের রান্না ঘরে যেতে যেতে বলল-
“ খাবার টেবিলে। ”
মুনতাহা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো প্লেটে গরম গরম পরোটা আর ডিম ভাজা। মুনতাহা খেয়ে নিলো খাবারটা। তারপর রুমে এসে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ময়না বেগম কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল-

“ আম্মু আমি আসছি। ”
ময়না বেগম রান্না ঘরের জানালা দিয়ে একবার তাকালো। মুনতাহ ব্যাগ কাঁধে চেপে হেঁটে যাচ্ছে। ময়না বেগম রান্নায় মনোযোগ দিলো।
মুনতাহা ভার্সিটি এসে নিজের ক্লাস রুমে যেতেই দেখা মিললো ইলার। ভার্সিটি তে উঠার পর তার এই একটাই ফ্রেন্ড হয়েছে। মেয়েটা এই ভার্সিটির ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টর খলিল স্যারের মেয়ে। বেশ মেধাবি ইলা। তার ম্যারিট পজিশন ৫ ছিলো। মুনতাহা কে দেখেই ইলা এগিয়ে এসে বলল-
“ কাল আসো নি কেনো ভার্সিটিতে মুন? অনেক মিস করেছি তোমাকে। ”
মুনতাহা ব্যাগটা নামিয়ে বসলো সিটে। ট্যিসু দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছে বলল-
“ একটু শরীর খারাপ ছিলো তো সেজন্য। ”
“ আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে নেক্সট উইক কক্সবাজার ট্যুরে যাচ্ছে। তুমি কি যাবে?”
মুনতাহার মন টা কিঞ্চিৎ ভার হলো। তার সমুদ্র, পাহাড় এসব অনেক পছন্দ। কিন্তু কখনো সামনা-সামনি দেখা হয় নি মুনতাহার। তবে বাসা থেকে যেতে দিবে না ভেবেই মনটা বেশি খারাপ। তারপরও জিজ্ঞেস করলো-

“ চাঁদা কত ধরেছে?”
“ সাড়ে চার হাজার। ১২ তারিখ যাব। মাঝখানে ১৪ তারিখ থাকবো,১৫ তারিখে ব্যাক করবো। যাবে তো? গত বছরও যাও নি তুমি। ”
“ না যাব না ইলা। বাসা থেকে পারমিশন দিবে না আম্মু। তুমি যাও। ছবি, ভিডিও পাঠিও আমাকে সমুদ্রের? যদি পারো ভিডিও কল দিও একটা?”
ইলা মন খারাপ করে বলল-
“ যাব না আমি মুন। গত বছর তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে নি সাজেক। আমি শিওর এবারও ভালো লাগবে না। টাকা গুলোই নষ্ট হবে। এরচেয়ে বরং তুমি আমি ১৪ তারিখ কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে যাব খেতে কি বলো?”
“ ঠিক আছে। ”

ক্লাসে স্যার আসতেই তারা ক্লাসে মনোযোগ দিলো। সব গুলো ক্লাস শেষ হলে ইলা তার বাড়ি চলে যায় আর মুনতাহা উল্টো রাস্তায় হাঁটা ধরে। একটা নতুন টিউশনি পেয়েছে মুনতাহা গত মাসে। সপ্তাহে তিন দিন পড়াবে,স্যালারি ৫ হাজার। মুনতাহা নীলক্ষেত দিয়ে সোজা আজিমপুরের রাস্তা ধরে হাঁটা দিলে একটা কালো গাড়ি এসে তার পাশে থামে। মুনতাহা তাকায় একবার। গ্লাস লাগানো থাকায় ভেতরে কে আছে তা বুঝতে পারে না। ব্যাগ চেপে হাঁটা ধরলে সিকান্দার গাড়ির জানালা টা নিচে নামিয়ে মুনতাহা কে ডেকে বলে-
“ আপনি এদিকে কোথায় যাচ্ছেন মন? বাড়ি তো অন্য রাস্তায়। ”
মুনতাহা দাঁড়িয়ে যায়। পেছন ফিরে দেখে সিকান্দার গাড়ি থেকে বেরিয়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। মুনতাহা দু হাত বুকে গুঁজে বলল-

“ আপনি আমাকে ফলো করেছেন?”
“ না তো। আমি বাবার পার্টি অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। আপনাকে দেখেই থেমেছি। কোথায় যাচ্ছেন আপনি? ”
মুনতাহা সহজ হলো। সিকান্দারের বাবা সেলিম মির্জা একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর এদিকেই তার পার্টি অফিস। মুনতাহা ব্যাগ চেপে হাঁটা ধরলে সিকান্দার বলে উঠলো-
“ আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম মন।”
মুনতাহা পেছন ফিরলো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বলল-
“ প্রথমত আমার নাম মুনতাহা,মন না। দ্বিতীয়ত আমি টিউশন পড়াতে যাচ্ছি। ”
“ চলুন আমি পৌঁছে দিচ্ছি আপনাকে। ”
“ তার প্রয়োজন হবে না। ”
“ আপনি আমার কোনো কথাই দেখি শুনছেন না মন। উঠে আসুন গাড়িতে। আমি আপনাকে আপনার গন্তব্যে নামিয়ে বাবার ওখানে যাব। ”

মুনতাহা কথা বাড়ালো না। না করলে আরো চেপে ধরবে। তারপর টিউশনি তে পৌঁছাতে দেরি হবে।
মুনতাহা গাড়িতে উঠে বসলে সিকান্দারও এসে বসে গাড়িতে। ইডেন মহিলা কলেজের সামনে সিকান্দার মুনতাহা কে নামিয়ে দেয়। মুনতাহা নেমে ধন্যবাদ বলে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে সিকান্দার বলে উঠলো-
“ আপনার পড়ানো শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে?”
“ ২ ঘন্টা, কেনো? ”
“ না,এমনি। আপনি যান। ”
মুনতাহা সামনের এক পাঁচ তালা বিল্ডিংয়ে ঢুকে গেলো। ২ ঘন্টার জায়গায় আড়াইঘন্টা লাগলো মুনতাহার পড়ানো শেষ করতে। তবে বাহিরে এসে সিকান্দারের গাড়িটা সেই আগের জায়গায় দেখে চমকে উঠলো। এগিয়ে এসে দেখলো সিকান্দার গাড়ির দরজা খুলে দিচ্ছে।
“ আপনি যান নি আর?”
“ না। ”
“ কেনো?”
“ আপনাকে রেখে যাই কি করে বলুন? উঠে আসুন। বাসায় নামিয়ে আসবো আপনায়। ”

মুনতাহা উঠে বসলো। সিকান্দার মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে খুবই সতর্কতার সাথে। মুনতাহার দৃষ্টি সামনে স্থির। গাড়ির ভেতর দুজনের মধ্যে এমন নীরবতা টাও এক প্রকার অস্বস্তির। মুনতাহা বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে তার মায়ের সিকান্দার কে খুব পছন্দ। মুনতাহা না করেছে বলেই তার ক্ষোভ টা হয়তো আরো বেড়েছে। আবার এমনও হতে পারে মুনতাহা কে আর সে তার নিজের কাছে রাখতে চাইছে না। ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। নীরবতা কে ভেঙে দিয়ে মুনতাহা বলল-
“ আমি খুবই ভীতু প্রকৃতির, সামান্য কথায় আঘাত পাই। ”
“ আমি ভীষণ শক্ত প্রকৃতির মানুষ মন। আপনার সামনে ঢাল হয়ে সর্বদা আপনাকে আগলে রাখবো। ”
“ আপনাকে বিয়ে করলে আপনার পরিবার আমাকে কোনো দিন মেনে নিবে না। আমাকে উঠতে বসতে অপমান করবে। ”

“ আমার পরিবারের মানা না মানার কোনো তোয়াক্কা আমি করবো না। তারা আপনাকে অপমান করলে তাদের সম্মান ধরে রাখার দায়ও আর আমার থাকবে না। ”
“ শুরুতে এমন কথা আপনার ভাইও বলেছিল। তারপর আমার অনুভূতি গুলো নিয়ে ছেলেখেলা করলো। ”
“ এই সাজাটা তো আপনার প্রাপ্যই ছিলো মন। ”
“ মানে?”
অবাক হয়ে তাকালো মুনতাহা সিকান্দারের দিকে।
“ ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। সেই ভুলেরই সাজা পেয়েছেন। ”
“ আমার অনুভূতি গুলো তো মিথ্যা বা ভুল ছিলো না। ”
“ আমি ব্যতিত সকল পুরুষের জন্য আপনার অনুভূতি হারাম। সেই হিসেবে আপনার অনুভূতি গুলোও ভুল মিথ্যা দুটোই ছিলো। ”
“ আপনি চাইলেই অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু সেটা কেনো করছেন না? আমি আপনার জেদ নয় তো? আপনার ভাই আমাকে ঠকিয়েছে বলে সহানুভূতি দেখানোর জন্য এমনটা করছেন না তো? ”
“ এমন নিম্ন মানের কথা বলে অন্তত নিজেকে ছোট করবেন না মন। আপনি ভীষণ দামী আমার কাছে। ”
“ আমি খুবই অপ্রাসঙ্গিক একজন তুচ্ছ মানুষ। যাকে কারনে অকারণে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যায়। এমন এক মেয়েকে কিভাবে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের জীবনের সাথে জড়াতে চাইছেন আমি আসলেই বুঝতে পারছি না। ”
“ একটা কথা আছে জানেন? যে জোর করে হলেও প্রিয় মানুষ কে নিজের করে নিবেন। আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাসী নই। আর পুনর্জন্ম বলতেও কিছু হয় না। তাহলে বলুন আপনাকে আমি পরিবারে কথায় ছেড়ে দেই কি করে? একটাই জীবন সেটাও যদি নিজের পছন্দের মানুষের সাথে কাটাতে না পারি তাহলে সেই জীবনটা কি বৃথা নয় আমার জন্য? ”

“ আমি আপনার প্রিয় মানুষ? ”
“ প্রিয়র চেয়েও তো বেশি কিছু। সুখ। আপনি আমার সুখ মন। আর যেই জিনিস আপনাকে সুখ দেয় সেই জিনিস পুরো দুনিয়া থেকে আড়াল করে নিজের কাছে রাখতে হয়। আর আমি সেটাই করতে চাচ্ছি। আমি আপনাকে আমার কাছে আজীবনের জন্য রাখতে চাচ্ছি ব্যস। আপনার সময় লাগলে সময় নিন। আমি আপনাকে পাওয়ার লোভে কেয়ামত অব্দিও অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আপনি যে শুধুই আমার মন। শুধু আমার। আপনার গন্তব্য অন্য কোথা থেকে শুরু হলেও আপনার সেই গন্তব্য কেবল আমিতেই শেষ। ”
সিকান্দার কথাটা শেষ করে ইশারায় কিছু একটা দেখালো। মুনতাহা সেই ইশারা দেখে বাহির পানে তাকিয়ে দেখলো তার বাসা। মুনতাহা আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ নেমে গেলো। সিকান্দার মুনতাহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। এবার দৃষ্টি দিলো ফোনের দিকে। তার বাবা সেলিম মির্জার একের পর একটা ফোন আসছে। মুনতাহা গাড়িতে উঠে বসতেই সিকান্দার ফোনটা মিউট করে রেখেছিলো। আর আনমিউট করলো না। বাবার পার্টি অফিসে না গিয়ে সিকান্দার সোজা মির্জা বাড়ির দিকে চলে গেলো।
বাড়িতে প্রবেশ করতেই সিকান্দার তপ্ত শ্বাস ফেললো। বসার ঘরের সোফায় বসে আছে সাইদা মির্জা, সুফিয়া মির্জা যে কি না সিকান্দারের সম্পর্কে ফুফু হয়। আর তাদের সামনে বসে আছে ঘটক ব্যাটা। সিকান্দার কে দেখেই সুফিয়া মির্জা উঠে এসে সিকান্দার কে টেনে নিয়ে ঘটকের পাশে দাঁড় করিয়ে টি-টেবিল থেকে ২০-২৫ টা মেয়ের ছবি উঠিয়ে বলল-

“ জুলি কে তোর বিয়ে করতে হবে না। আশা করছি এগুলোর মধ্যে একটা কে অন্তত তোর পছন্দ হবে। ”
সাইদা মির্জা আড় চোখে সিকান্দার কে আপাদমস্তক দেখে বলল-
“ তোমার না পার্টি অফিসে যাওয়ার কথা ছিলো? তোমার বাবা এত করে বললো। যাও নি শুনলাম। কেনো যাও নি? ফোনও কেনো তুলো নি? এতটা অবাধ্য কিভাবে হচ্ছো তুমি? এসব দিন দেখার জন্য কি তোমাকে আমরা এত বড় করেছি?”
সাইদা মির্জার এতো গুলো প্রশ্নের একটারও সিকান্দার জবাব দিলো না। সুফিয়া মির্জা ভাইপোর শক্ত মুখ দেখে সাইদা মির্জা কে থামিয়ে দিয়ে বলল-
“ আহ ভাবি থামো না। দেশে আসলোই তো ক’টা দিন হলো। একটু সময় দাও। আস্তেধীরে ব্যবসা রাজনীতি সব কিছুতেই ঢুকবে নে। এখন যেই কাজের জন্য আসা হয়েছে সেটা করা যাক আগে।”
“ হ্যাঁ সেটাই করো। কম করে হলেও ২৫ টা মেয়ের ছবি এখানে আছে। আর তারা সবাই বাংলাদেশের নামকরা বিজনেস ম্যান,মন্ত্রী দের মেয়ে। আমাদের স্ট্যাটাসের সমানে তারা। আশা করি পছন্দ হবে তোমার। ”
সুফিয়া মির্জা হাসি মুখে ছবি গুলো এগিয়ে দিলো সিকান্দারের হাতে। সিকান্দার চোখ পর্যন্ত বুলালো না। সোজা ছবি গুলো নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বলল-

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১

“ পাত্রী আমার পছন্দ আছে। আপনাদের কষ্ট করে মেয়ে খোঁজার কোনো দরকার নেই। আপনারা আর আপনাদের অতি মূল্যবান সময় আমার পেছন ব্যয় না করলেই বরং আমি খুশি হবো। এখন আপনারা যদি আমার সত্যি সত্যি বিয়ে দিতে চান তাহলে একটা কাজ করতে পারেন। সালমান মির্জার বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যান। যদি নাও যান তারপরও কোনো সমস্যা নেই। আমার বিয়ের প্রস্তাব আমি নিজেই রেখেছি চাচার কাছে। চাচার সম্মতি আছে। আমার সম্মতি আছে। এখন মুনতাহা সম্মতি দিলেই খুব শীগ্রই আমি বিয়ে করবো। আপনাদের অবশ্যই আমার বিয়েতে দাওয়াত দিব। দোয়া করে যাবেন আমাকে ও আমার স্ত্রী কে। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩