সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪২
Raiha Zubair Ripti
সিকান্দার গ্রামের লোকদের কথা শুনে ধীর পায়ে বাড়ির পথের দিকে হাঁটা ধরে। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখা বোঝা যাচ্ছে সে হয়তো আন্দাজ করেছে কার এত বড় দুঃসাহস হবে। নদিম সকালেই ফোন করে খবর দিয়েছিল সেলিম মির্জা আসছেন। কিন্তু এই রূপে বুলডোজার সাথে নিয়ে আসবে সেটা ভেবে দেখে নি। তার পেছন পেছন গ্রামবাসীও আসলো। বাড়ির সামনে আসতেই অনেকগুলো মাস পর সরাসরি সাক্ষাৎ হলো তাদের বাবা ছেলের। কিন্তু চোখের চাহনিতে মনেই হলো না তারা বাবা ছেলে।
সেলিম মির্জার পাশেই চেয়ারম্যানও দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই সেলিম মির্জা এই গ্রামে পা রেখে সর্বপ্রথম তার সাথে দেখা করেছে। কথাবার্তা বলেছে। এবং পরামর্শ করে বাড়ি ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিকান্দার খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
” আপনি আসবেন জানতাম। কিন্তু এসেই ছাগলামি শুরু করে দিবেন সেটা জানতাম না। তা দিনকাল কেমন যাচ্ছে আপনার? ভালো? ”
সেলিম মির্জা এগিয়ে আসলেন। ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। কিছুটা হয়তো থমকেও গেলেন। ছেলের পরনে থাকা জামাকাপড়ে ময়লা লেগে আছে। খুবই কমদামের কাপড় গায়ে। যে ছেলের ধুলো বালিতে অ্যালার্জি হতো,সবসময় গোছগাছ হয়ে থাকতো। ব্রান্ডের জিনিসপত্র ইউজ করতো। সেই ছেলের হাল আজ এমন!
অথচ সেলিম মির্জা হয়তো জানে না। সিকান্দার তার জীবনের সবচেয়ে সুখী মুহুর্ত গুলো এই জীবনেই পাচ্ছে। তার আগের মতো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই,লাক্সারি জীবন নেই। কিন্তু এই জীবনে মুনতাহা মুন আছে। তাদের ছোটখাটো দুজনার একটা সুখী সংসার আছে। সে তার জীবনের বেস্ট একটি সময় অতিবাহিত করছে। সে উপলব্ধি করছে,এটাই আসল জীবন।
সেলিম মির্জার মুখ পরক্ষনেই আবার আগের ন্যায় হয়ে গেল। তার রাগ ক্ষোভ জমলো। এখন আর তার সিকান্দার কে প্রয়োজন নেই। কারন তিনি সিকান্দারকে রিপ্লেস করার মতো কাউকে পেয়েছে। সেই অহংকারে এখন তিনি আকাশচুম্বী তে।
” দেখতে আসলাম তোমাকে। ”
সিকান্দার বাকা হেঁসে বলল, ” বুলডোজার নিয়ে? ”
” হ্যাঁ। তোমাকে বলেছিলাম তো আমি,যে তোমাকে শান্তিতে থাকতে দিব না। ”
” তা কি করবেন এই বুলডোজার দিয়ে? ”
” তোমার বাড়ি ভাঙবো। ”
” তারপর? ”
” তারপর বুঝাবো। এই পৃথিবীতে সেলিম মির্জা ছাড়া আর কোথাও তুমি নিরাপদ নও। ”
সিকান্দার সে কথা শুনে শব্দ করে হেঁসে উঠলো। তারপর হাসি থামিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
” সেজন্য বুঝি কালো যাদু করেছিলেন। ইউ নো হোয়াট সেলিম মির্জা? আপনার চেয়ে অনিরাপদ জায়গা আমার জন্য আর কোথাও নেই। ”
” সিকান্দার! ” ধমকে উঠলো সেলিম মির্জা। তারপর আবার বলল, ” আমি কিন্তু সত্যি সত্যি তোমার বাড়ি ভেঙে দিব সিকান্দার। ”
” বেশ। তবে ভেঙে দেখান। আই ওয়ান্ট টু সি হোয়াট ইউ ক্যান ডু। শো মি ইয়োর অ্যাবিলিটিজ। ”
কথাটা শেষ করেই সিকান্দার বাড়ির সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। সেলিম মির্জা হাতের ইশারায় আদেশ দিলো বুলডোজার টা বাড়ির উপর দিয়ে উঠিয়ে দিতে। সিকান্দার তখনও শান্ত,নিরন্তর ভঙ্গিতে দাঁড়ানো। বুলডোজার টা বাড়ির দিকে কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই,হুট করে পূর্ব পাশ থেকে গ্রামের লোক এক এক করে দলবদ্ধ হয়ে লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে। সেলিম মির্জা সেদিক পানে তাকিয়ে কিছুটা ভীত হলেন। সিকান্দার বাঁকা হাসলো। তারা দৌড়ে এসে বাড়ির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
” চালা বুলডোজার। দেহি কেমনে পারোস আমাগো সিকান্দারের ঘর ভাঙতে। ”
সিকান্দার পাশ ফিরে দেখলো রাশেদ আসছে দৌড়ে। হাতে তার কোদাল। সে-ই পুরো গ্রামের মানুষকে ডেকে নিয়ে এসেছে। সিকান্দারের পাশে এসে দাঁড়ালো। দূর্ভাগ্যবশত তারা কেউ চিনে না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে কে। তার নাম কী। গ্রামের মানুষ এসবের খোঁজ খবর রাখে না। তাই তারা জানে না তাদের সামনে একজন জালিম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী দাঁড়ানো। সেলিম মির্জা তারপরও আদেশ দিলেন। বললেন মানুষজন সহ গাড়ি উঠিয়ে দিতে বাড়ির উপর। সে এও বললেন তার ক্ষমতা সম্পর্কে এই অশিক্ষিত দের ধারণা নেই।
চেয়ারম্যান নিজেও প্রথমে সিকান্দারের পরিচয় শুনে চমকে উঠেছিল। এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে তার গ্রামে। আর সে কেমন ব্যবহার করলো। তার বাপ আবার তাকে হুমকিধামকি দিতে এসেছে কি না,সেই ভয়ই পাচ্ছিল। তবে স্বস্তি তখন মিললো যখন সেলিম মির্জা তাকে অফার করলেন,যে এই সিকান্দার কে তাদের এলাকা থেকে বের করে দিতে হবে। ঘড় বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে। বিনিময়ে সেলিম মির্জা তাকে মোটা অংকের টাকা দিবে। সেজন্য তিনি রাজি হলেন। বাড়িতে তাদের কথোপকথন অবশ্য তখন বিনোদিনী বা প্রতাপ কেউ শুনে নি। তারা কেবল চমকেছিল সিকান্দারের পরিচয় জানার পর। ছেলেটা তার ব্যবহারে একটু বুঝতে দেয় নি,তিনি এত ক্ষমতাবান একজনের ছেলে।
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে আসলো সেলিম মির্জার ওমন কথা শুনে। গ্রামবাসীরাও সে কথা শুনে চটে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেলিম মির্জা কে পিটানোর জন্য উদ্যোত হলে সিকান্দার তাদের থামিয়ে দিয়ে বলল,
” থামুন আপনারা। ” তারপর এগিয়ে গেল সেলিম মির্জার দিকে। বলল, “ও হ্যালো মিস্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেলিম মির্জা। এটা তো আপনার ঢাকা শহর না। এটা তো মোহনগঞ্জ। এখানে ক্ষমতার কাছে মানুষ মাথা নত করে না, অন্যায়ের জবাব দিতে জানে। তাই বলছি, আমার বাড়ির দিকে আর এক কদম বাড়ানোর আগে আরেকটু ভালো করে ভেবে চিন্তে তারপর বাড়ান। নাহলে পরবর্তীতে আপনার পদবি, ক্ষমতা কিংবা নিরাপত্তাকর্মী,কোনোটাই আপনাকে এই গ্রাম থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। আফটার অল, আপনি দেশের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জনগণের হাতেই যদি মার খান, তাহলে বিষয়টি আপনার সম্মানের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না, তাই না?”
” হুমকি দিচ্ছ? ” রাগে বলে উঠলো সেলিম মির্জা।
সিকান্দার স্মিত হেসে বলল, ” নো। আইম জাস্ট ওয়ার্নিং ইউ। আমার স্ত্রী বাড়ি ফিরার আগে গেট দ্য হেল আউট। আর এই যে চেয়ারম্যান সাব। আপনার কি দিনকাল এতই খারাপ যাচ্ছে যে এসব মানুষের কথায় উঠবস করা শুরু করছেন? আপনি কি চান আমি আপনার গদি নাড়িয়ে দেই? আমি কিন্তু আপনার গদি নাড়িয়ে দিলে চেয়ারম্যান গিরি আর করতে পারবেন না। তাই নিজের গদি সামলাতে শিখুন। পরে যেন এটাও না হারাতে হয়। ইউ নো মি ভেরি ওয়েল বাই নাউ। ইউ নো হোয়াট আই ক্যান ডু, অ্যান্ড হাউ ফার আই ক্যান গো। সো বি কেয়ার ফুল চেয়ারম্যান সাব। অনেক অভিযোগ শুনেছি আপনার নামে। ”
চেয়ারম্যান একটু পিছিয়ে গেল ভয়ে। সেলিম মির্জা তখন অটল। কিন্তু চেয়ারম্যান ভয়ে সেলিম মির্জা কে টেনে নিয়ে চলে গেলেন। সিকান্দার তপ্ত শ্বাস ফেললো। গ্রামবাসী আর রাশেদের দিকে কৃতজ্ঞতা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। তারা তার পাশে আছে,এই আশ্বস্ত করলো। কারন তাদের একজন সিকান্দার শাহ্ এর বড্ড প্রয়োজন। তার কারনেই গ্রামে এখন বিদ্যুৎ এসেছে। আশা করছে সমানে আরো উন্নতি হবে।
সিকান্দার বাড়ির ভেতরে আসলো। সে কিঞ্চিৎ ভেবেছিল,হয়তো সেলিম মির্জা সুনেহরার বিয়ের খবর দিতে আসছে। কিন্তু তার ভাবনা ভুল প্রমান হলো। সেলিম মির্জা শুধরানোর লোক নন,সেটা তার বোঝা উচিৎ ছিলো।
কলপাড়ে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে সে পোশাক বদলে ভার্সিটি চলে গেল মুনতাহাকে আনতে। মুনতাহা ভার্সিটি থেকে আসার পর জানতে পারলো সেলিম মির্জা এসেছিলেন। মুনতাহাও আশা রেখেছিলেন হয়তো বিয়ের দাওয়াত দিতে এসেছিলেন। কিন্তু পরক্ষণে যখন শুনলো বাড়ি ভাঙতে এসেছিলেন তখন রাগে শরীর কামড়ে উঠলো। সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আপনার বাবার নাম,সেলিম মির্জা কে রেখেছিল শুনি? ”
সিকান্দার ঘাড় ঘুরিয়ে কেবল তাকালো। তারপর শান্ত গলায় বলল, ” আপনার দাদা শ্বশুর রেখেছিল। ”
” বদমাশ জালিম লোক একটা। তার নাম জালিম মির্জা রাখা উচিৎ ছিলো দাদা শ্বশুরের। নামের সাথে কাজের মিল পাওয়া যেত। এত পাঁজি লোক আগে কখনো দেখি নি। এখানেও চলে আসছে আমাদের জ্বালাতে। ”
” আচ্ছা বাদ দিন তার কথা। কারো অনুপস্থিতিতে তার নামে সমালোচনা করতে হয় না। ”
” হুমম। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুন। ”
সিকান্দার ঠোঁট চেপে রইলো। তারপর বলল,
” আল্লাহ যাকে চান তাকেই হেদায়েত দান করেন। কিন্তু এটাও সত্য যে আল্লাহ অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করবে জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা। এজন্য মাঝেমধ্যে তারজন্য ঘৃণা রাগের পাশাপাশি খারাপও লাগে । এত পাপ পুঁজি করছে। অথচ আখিরাতের জন্য একটিও ভালো কর্ম নেই তার ঝুলিতে। হাশরের ময়দানে উনার কি হতে পারে ভেবেই আমার বুক ভারী লাগে তার জন্য। তা এখন বলুন,পড়াশোনা ঠিকঠাক হচ্ছে তো ভার্সিটি তে? ”
” হ্যাঁ হচ্ছে। ম্যাম স্যার গুলো খুবই আন্তরিক। আমার পর্দার বিষয় নিয়ে তারা ভীষণ কোওপারেটিভ। ”
” আলহামদুলিল্লাহ শুনে ভালো লাগলো। আপনি এখন ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ক্ষেত থেকে সবজি তুলে আনছি। রাতে খেতে হবে তো আমাদের। ”
সিকান্দার চলে গেলে মুনতাহা দরজা লাগিয়ে দিয়ে গোসলটা শেষ করে ভেজা চুলে গামছা পেঁচিয়ে উঠানে জামাকাপড় মেলতে নিলে দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে মনে করলো সিকান্দার এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে দেখলো এ তো বিনোদিনী। বিনোদিনীর হাত খালি। সে সেদিন রাতে কুরআন শরীফ ফেরত দেওয়া স্থির করলেও আর দিতে পারলো না। কুরআন টা ধরলেই মনে হতো এটা তার দরকার। খুউব দরকার। এখানে প্রশান্তি লুকিয়ে আছে।
মুনতাহা তাকে দেখে ভেতরে আসতে দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। বিনোদিনী ভেতরে ঢুকলে মুনতাহা দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলল,
” আপনি এই ভর দুপুরে যে। সব ঠিকঠাক? নাকি কোনো প্রশ্ন নিয়ে এসেছেন? ”
বিনোদিনী এই প্রথম মুনতাহার সামনে একটু নত হলো সাথে বিনয়ীও। সে বলল,
” তোমাদের কুরআন মিথ্যা বলে মুনতাহা। ”
মুনতাহা মুচকি হেঁসে বলল,
” কুরআন কখনো মিথ্যা বলে না বিনোদিনী। কোন আয়াত বুঝো নি সেটা বলুন। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। ”
” তোমাদের কুরআন বলেছে,দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য; আর সচ্চরিত্র নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্র নারীদের জন্য।” সূরা আন-নূর, ২৪:২৬। তাহলে নূহ আর লূত আলাইহিস সালাম তো কম পবিত্র ছিলেন না। তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন। তাঁদের স্ত্রীদের কী হলো? আর ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া? তিনি তো নেককার ছিলেন, তাঁর স্বামী কেমন ছিল সেটা তো তুমিও জানো। তাহলে এই, যেমন মানুষ, তেমন জীবনসঙ্গী কথাটা গেল কোথায়?”
মুনতাহা বিনোদিনীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আয়াতটা এমনভাবে ধরছেন, যেন আল্লাহ বলেছেন দুনিয়ায় প্রত্যেক ভালো মানুষের জন্য ভালো জীবনসঙ্গী বরাদ্দ থাকবেই। কিন্তু আয়াতটা তো এমন কথা বলছে না।”
বিনোদিনী সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তা হলে আয়াতে পবিত্রদের জন্য পবিত্র বলা হলো কেন?”
“কারণ আয়াতের প্রসঙ্গটা আগে বুঝতে হবে। আয়াতের আগে পরে কি ছিলো সেটাও দেখতে হবে। শুধু একটা অংশ তুলে নিয়ে অর্থ করলে কুরআনের বক্তব্য বদলে যায়। এক সফরে হযরত আয়েশা (রা.) গলার হার হারিয়ে ফেলেন। এবং সেটা খোঁজার কারণে কাফেলা থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। পরে সাহাবি সাফওয়ান ইবন মু‘আত্তাল (রা.) তাঁকে দেখতে পেয়ে তাঁর উটের মাধ্যমে কাফেলার কাছে পৌঁছে দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই অত্যন্ত নোংরা অপবাদ ছড়াতে শুরু করে। দুঃখজনকভাবে কিছু মুসলিমও যাচাই না করে সেই কথাবার্তা প্রচার করেছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) এতে ভীষণ কষ্ট পান। এরপর আল্লাহ তাআলা ধারাবাহিক আয়াত নাজিল করে তাঁর নির্দোষিতা ঘোষণা করেন এবং অপবাদকারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। সূরা আন-নূর-এর এই আয়াতটি হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিরুদ্ধে ছড়ানো এই মিথ্যা অপবাদের প্রসঙ্গে এসেছে। সেখানে অপবিত্র কথা ও অপবিত্র মানুষদের বিপরীতে পবিত্র মানুষ ও পবিত্র কথার কথা বলা হয়েছে। এটাকে সরাসরি আপনি যেমন, আপনার স্বামীও তেমন হবেই এই দুনিয়াবি নিয়ম বানিয়ে দেওয়া একদমই ঠিক নয়।”
বিনোদিনী হেসে বলল, “বেশ সুন্দর ব্যাখ্যা! কিন্তু নূহ আর লূতের স্ত্রীদের কী করবে?”
মুনতাহা এবার একটু দৃঢ় হলো।
“কুরআন নিজেই তাদের উত্তর দিয়েছে। আল্লাহ নূহ ও লূত আলাইহিমাস সালামের স্ত্রীদের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁরা দুজনই আল্লাহর নবী ছিলেন, অথচ তাঁদের স্ত্রী ঈমানদার ছিলেন না। আবার ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন মুমিন নারী, অথচ তাঁর স্বামী ছিল ফিরআউন। যদি নেককার মানেই নেককার জীবনসঙ্গী আল্লাহর অব্যর্থ নিয়ম হতো, তাহলে কুরআন নিজেই এসব উদাহরণ দিত না।”
বিনোদিনী একটু থেমে বলল, “তাহলে ভালো মানুষ খারাপ মানুষকে বিয়ে করলেও সমস্যা নেই?”
“সমস্যা আছে কি নেই, সেটা আলাদা কথা। ইসলাম তো জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের সময় দ্বীন ও চরিত্রকে গুরুত্ব দিতে বলেছে। কিন্তু কাউকে বিয়ে করার পর সে কেমন হবে, সেটা সবসময় মানুষের হাতে থাকে না। আর একজন ভালো মানুষের জীবনে খারাপ জীবনসঙ্গী আসা মানেই সেই ভালো মানুষটি খারাপ এমন কথাও ইসলাম বলেনি।”
“মানে?”
“মানে, জীবনসঙ্গী সবসময় পুরস্কার নয়। কখনো পরীক্ষা। নূহ আলাইহিস সালামের স্ত্রী তাঁর পরীক্ষার অংশ ছিলেন। লূত আলাইহিস সালামের স্ত্রীও ছিলেন। আর আসিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য ফিরআউন ছিল ভয়াবহ পরীক্ষা।”
বিনোদিনী এবারও ছাড়ল না। “তাহলে ‘পবিত্ররা পবিত্রদের জন্য’ কথাটা?”
মুনতাহা ধীর স্বরে বলল, “ওটা সত্য। কিন্তু তার অর্থকে আপনার কথার মতো একটা সরল ফর্মুলা বানানো সত্য নয়। কুরআনের একটা আয়াতকে বুঝতে হলে তার আগের-পেছনের আয়াত, নাজিলের প্রসঙ্গ আর কুরআনের অন্য আয়াত সব একসঙ্গে দেখতে হয়। আর একটা বিষয় মনে রাখবেন। একজন মানুষের চরিত্রের বিচার তার জীবনসঙ্গীর চরিত্র দিয়ে হয় না। নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর স্ত্রীর কারণে খারাপ হননি। আসিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর স্বামীর কারণে অপবিত্র হননি। তাঁর স্বামী তাঁকে নেককার বানায়নি, আবার তাঁর স্বামীর কুফরও তাঁকে কাফির বানাতে পারেনি। কারণ আল্লাহর কাছে প্রত্যেক মানুষ নিজের ঈমান ও আমলের জন্য দায়ী। । আপনি হয়তো ভাবছেন, ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া মানেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার। কিন্তু সবসময় তা নয়। কখনো ভালো জীবনসঙ্গী নিয়ামত, আবার কখনো কঠিন জীবনসঙ্গী পরীক্ষা।”
বিনোদিনী এবার মুচকি হেসে বলল, ” তা তোমার জীবনসঙ্গী তোমার জন্য নিয়ামত হয়ে আসলো নাকি পরীক্ষা হয়ে? ”
এবার মুনতাহাও হাসলো একটু। ” আলহামদুলিল্লাহ, এদিক দিয়ে আমি বড় সৌভাগ্যবতী বিনোদিনী। আল্লাহ তায়লা আমাকে অনেক ভালোবেসে যত্ন করে বানিয়েছেন। সেই সাথে আল্লাহ তায়ালা আমাকে কতটা ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, তা আমি যতবার আমার জীবনের দিকে তাকাই, ততবারই নতুন করে বুঝতে পারি। সত্যি বলতে, আমার নিজের কাছেই মাঝে মাঝে অবাক লাগে আমি কী এমন করেছি যে আল্লাহ তায়ালা আমার ভাগ্যে এত সুন্দর একজন মানুষকে লিখে রেখেছেন। আমি তো এতটাও যোগ্য নই যে আল্লাহ আমার ভাগ্যে এমন একজন মানুষকে লিখে দেবেন। তবু আমার রব আমাকে দিয়েছেন। আমার মতো অযোগ্য একজনের জন্যও তিনি কত সুন্দর করে একজন স্বামীকে বেছে রেখেছেন! তাঁর ভালোবাসা, তাঁর মায়া, তাঁর চরিত্র সবকিছু দেখলে আমার নিজেরই মনে হয়, আল্লাহ আমাকে কতটা দয়া করেছেন। আমি তো এমন কিছু আমল নিয়ে আসিনি, এমন কোনো যোগ্যতা নিয়ে আসিনি যার বিনিময়ে এমন একজন মানুষ আমার প্রাপ্য হয়ে যাবে। এটা আমার প্রাপ্য নয়, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। তাই আমার ভাগ্য নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। বরং শুকরিয়া আছে। অগণিত শুকরিয়া। তাঁর সিদ্ধান্তে এমন এক সৌন্দর্য আছে, যা আমার চাওয়ার চেয়েও গভীর। তাঁর লিখে দেওয়া ভাগ্যের চেয়ে সুন্দর আশ্রয় আমার আর কী হতে পারে? আমার স্বামী আমার জন্য নিয়ামত,রহমত হয়ে এসেছে আমার জীবনে বিনোদিনী। ”
বিনোদিনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, আরেকটা কথা আছে।”
মুনতাহা তার দিকে তাকাল। “বলুন।”
বিনোদিনী এবার বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
“আল্লাহ তো বলেছেন, তাঁর কাছে দোয়া করতে। এমনকি বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ তাহলে আমি যদি আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাই, তিনি তো তাহলে আমাকে সেটা দেবেনই, তাই না?”
মুনতাহা মৃদু হেসে বলল,
“আপনি, ডাকে সাড়া দেব আর আপনি যা চেয়েছেন ঠিক সেটাই দেব। দুটোকে এক করে ফেলছেন।”
বিনোদিনী ভ্রু কুঁচকে বলল, “মানে?”
“ধরুন, আপনি কোনো একটা জিনিস চাইলেন। আপনি মনে করছেন, সেটাই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো। কিন্তু আল্লাহ জানেন,ওটার মধ্যে আপনার জন্য ক্ষতি আছে। তখন কি আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন বলে আপনার ক্ষতিকর চাওয়াটাও পূরণ করে দেবেন?”
বিনোদিনী একটু থেমে বলল,“কিন্তু আমি তো চেয়েছি।”
“চেয়েছেন বলেই কি সেটা আপনার জন্য কল্যাণকর হয়ে গেল?”
বিনোদিনী চুপ। মুনতাহা ধীরে বলল, “একজন ছোট শিশু যদি আগুন নিয়ে খেলতে চায়, তার মা কি তাকে আগুনটা হাতে তুলে দেয়? না। তার কান্না শুনেছে, তার চাওয়াটাও জানে, কিন্তু তাকে আগুন না দেওয়াই তার জন্য মঙ্গল।”
বিনোদিনী বলল, “তাহলে দোয়া কবুল হলো কীভাবে?”
“দোয়া কবুল মানেই সবসময় চাওয়া জিনিসটা হাতে তুলে দেওয়া নয়। আল্লাহ বান্দার দোয়ার জবাব বিভিন্নভাবে দিতে পারেন। কখনো বান্দা যা চেয়েছে সেটাই দেন, কখনো তার বদলে কোনো বিপদ সরিয়ে দেন, আবার কখনো সেই দোয়ার প্রতিদান আখিরাতের জন্য রেখে দেন।”
বিনোদিনী এবার একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তাহলে আমি যদি বলি, হে আল্লাহ, আমি অমুক মানুষটাকেই চাই, তাকে ছাড়া কাউকে চাই না তাহলেও?”
মুনতাহা শান্ত গলায় বলল, “তখনও।”
“কিন্তু আমি তো মন থেকে চাইলাম।”
“মন থেকে চাওয়া আর আল্লাহর কাছে সেটা তোমার জন্য নির্ধারিত হওয়া,এক কথা নয়।”
বিনোদিনী চুপ করে রইল।
মুনতাহা বলল, ” আপনি জানেন না আগামীকাল কী আছে। জানেন না আপনি যাকে নিজের জন্য সবচেয়ে ভালো মনে করছেন সে সত্যিই আপনার জন্য ভালো কি না। কিন্তু আল্লাহ জানেন। তাই দোয়ার সৌন্দর্য হলো,আপনি আপনার চাওয়াটা আল্লাহর কাছে বলবেন, কিন্তু সিদ্ধান্তটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে। মনে এই দৃঢ়তা রাখবেন। দোয়া করলেই কবুল হবে। আর কিভাবে সেটা কবুল হবে আমি তো বলেই দিলাম। দোয়া তিন ভাবে কবুল হয়।
বিনোদিনী ধীরে বলল,“তাহলে আমি কি নির্দিষ্ট কাউকে চেয়ে দোয়া করতে পারব না?”
“পারবেন। নিজের মনের কথা আল্লাহর কাছে বলতে তো নিষেধ নেই। আপনি চাইতে পারেন,‘হে আল্লাহ, আমি তাকে চাই। যদি সে আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তাকে আমার জন্য সহজ করে দিন এবং আমাদের একত্র করুন। কিন্তু এর সঙ্গে এই দাবিটা জুড়ে দেওয়া যাবে না আমি চেয়েছি, তাই আমাকে দিতেই হবে। আমরা অনেক সময় দোয়ার কবুলিয়তকে নিজের ইচ্ছার সঙ্গে বেঁধে ফেলি। ভাবি, আমি যা চেয়েছি তা পেলেই দোয়া কবুল, না পেলে কবুল হয়নি। অথচ বান্দার জ্ঞান সীমিত, আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তাই দোয়ার পর সবচেয়ে সুন্দর কথা হলো, যদি তা আমার জন্য অকল্যাণকর হয়, তবে আমার মনকে তা থেকে ফিরিয়ে দিন এবং আমার জন্য উত্তম কিছু নির্ধারণ করুন।’”
বিনোদিনী এবার আর কোনো তর্ক করল না। কেবল মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বলল, ” তুমি কি শুরু থেকেই এমন ছিলে মুনতাহা? মানে এত সুন্দর গুছিয়ে কথা বলো, পর্দা করো।”
” না, না। আমি শুরুতে মোটেও এমন ছিলাম না। আমি বেপর্দায় চলা ফেরা করতাম। মানে শালীনতার মধ্যে থাকলেও মাহরাম নন মাহরাম মানতাম না। কুরআন সম্পর্কে এত জ্ঞান ছিলো না। কেবল নামাজ টা ঠিক রাখতাম। কিন্তু আল্লাহ আমার জীবনে সিকান্দার শাহ্ কে পাঠানোর সাথে সাথে আমার জন্য হেদায়েত ও পাঠালেন। আমি বুঝলাম একজন মুসলিম দের জীবন কেমন হওয়া উচিৎ। আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে এসব শিখছি। তিনি আমার স্বামীর সাথে সাথে আমার শিক্ষকও। আপনি জানেন না বিনোদিনী এমন একজন স্বামী পাওয়া মানে পৃথিবীতে এক টুকরো জান্নাত পাওয়া। আমার স্বামী আমাকে পাওয়ার জন্য দীর্ঘ ১৩ টি বছর রবের নিকট চেয়ে এসেছে। অথচ আমি জানতামই না আমাকেও কেউ রবের নিকট চাইতে পারে। ”
” কিন্তু তুমি তো বললে তোমাদের পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছে। ”
” হ্যাঁ। উনি আমার মায়ের ভাসুরের ছেলে। ”
” তারমানে তোমরা চাচাতো ভাইবোন ছিলে? ”
মুনতাহা কিছুটা চুপ হয়ে গেল এই প্রশ্নে। পারিবারিক বিষয় পুরোটা বাহিরের মানুষকে বলার প্রয়োজন বোধ করলো না। সেজন্য বলল, ” হ্যাঁ কিছুটা তেমনই। তবে আমি আমার মামার বাড়িতে থাকতাম। উনাকে আমি কখনো দেখি নি। বছর কয়েক আগে ঢাকায় আসি। উনি আমেরিকায় থাকতেন তখন। আমার প্রথম দেখা হয় তার সাথে আমাদের বিয়ের কথাবার্তা যখন চলে তখন। আর উনি আমাকে তখন দ্বিতীয়বার দেখেন ১৪ বছর পর। সে জানালো সে আমাকে ভালোবাসে। আমি তাকে বললাম, আমাকে যে আপনি ভালোবাসেন, তার প্রমাণ কী…? সে বলল, ” দীর্ঘ ১৩ টি বছর ধরে আপনাকে একতরফা ভাবে আল্লাহর নিকট চেয়ে এসেছি। আপনার নামে ১১৩টি দেশের ১১৩টি মসজিদে এতিম শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। অসহায়দের মাঝে সদকা করেছি। কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়ার সময় মনে মনে আপনার জন্য দোয়া করেছি। কোনো এতিমের মাথায় হাত রাখার সময় আল্লাহর কাছে চেয়েছি,আমার মুনতাহাকে আমার জন্য হালাল করে দিন। ইস্তিখারা করেছি। আপনার অপেক্ষায় নিজের নফসকে সংযত করেছি। তাহাজ্জুদের সিজদায় আপনার জন্য অশ্রু ঝরিয়েছি। রমজানের ইফতারের আগে, জুমার শেষ মুহূর্তে, সফরের দোয়ায়,যখনই দোয়া কবুলের সময় পেয়েছি, আপনার জন্য হাত তুলেছি। বহু নফল রোজা রেখেছি, নফল সালাত আদায় করেছি। আপনাকে পাওয়ার আশায় নিজের দৃষ্টি হেফাজত করেছি, হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থেকেছি, কোনো নারীর দিকে তাকাইনি। মক্কার মসজিদুল হারামে দাঁড়িয়ে, কাবা শরিফের দিকে মুখ করে, মদিনার রওজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য নয় আপনার কল্যাণের জন্য দোয়া করেছি। আরাফার ময়দানে হাত তুলে আপনাকে চেয়েছি। অতঃপর ১৪ বছরের মাথায় আপনাকে আমি পেয়েছি। আমার জীবনের এই তেরো বছরই আমার ভালোবাসার প্রমাণ।
আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। তার মানে আমরা একে ওপরের জন্য কল্যাণকর ছিলাম বলেই আমরা একে ওপর কে পেয়েছিল।
আমি তাকে এটাও বললাম, “আপনি আমার থেকেও বেটার কাউকে ডিজার্ভ করতেন সিকান্দার শাহ্…!!
উনি আমাকে বললেন, “আপনার চেয়ে বেটার কাউকে আমি কীভাবে চাইব, মুনতাহা? বেটার তো তুলনার বিষয়। আর আপনি তো আমার কাছে তুলনার ঊর্ধ্বে। যেখানে এই পৃথিবীতে আপনাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো আর কাউকেই আমার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। সেখানে আপনার চেয়ে বেটার কেউ আছে কি না, বেটার কাউকে ডিজার্ভ করি কি না ,এই সে প্রশ্নই তো অবান্তর। আমার জন্য বেস্ট বলতে একজনকেই রাখা হয়েছিল পৃথিবীতে। আর সেটা কেবল মুনতাহা মুন। আমি আমার বেস্টটাকেই পেয়েছি। আর বেস্টের চেয়ে বেটার বলে কিছু হয় না। ”
বিনোদিনী যেন মোহের মধ্যে পরে গেল। তার হিংসে লাগলো মুনতাহার ভাগ্য টাকে। তার মনে হলো কেন সিকান্দার শাহ্ এর সাথে তার আগে পরিচয় হলো না?
” তুমি আসলেই সৌভাগ্যবতী মুনতাহা। তোমার মতো ভাগ্য যদি সবার হতো। তুমি যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের বউ। মনেই হয় নি। ”
” আমার পরিচয় আমার স্বামী কে দিয়ে। আল্লাহ সবাইকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। সবার, বিশেষ করে আমার মতো মেয়েদের জীবনে সিকান্দার শাহ্ এর মতো মানুষ আসা বড্ড জরুরী। ”
” আচ্ছা আজ আসি তবে। আমি যদি প্রায় আসি তোমার কাছে তুমি কি বিরক্ত হবে? ”
” অবশ্যই না। আমার ভালো লাগবে,কাউকে আমার ধর্ম সম্পর্কে বলতে। ”
” বেশ,ভালো থেকে। পরে কখনো আসবো। ”
নাদিম আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। ইলার বাবা ইকরাম ফরিদের বের হবার অপেক্ষা করছে লাঞ্চ না করে। আর ২০ মিনিট পর লাঞ্চ টাইম শেষ হয়ে যাবে। বারবার ঘড়িতে সময় দেখতে লাগলো। তাকে গেট দিয়ে বের হতে দেখেই নাদিম শার্টের কলার আর চুল ঠিক করে লম্বা করে দুটো শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরলো। গিয়ে সোজা ইকরাম ফরিদের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। ইকরাম ফরিদ আকস্মিক নিজের সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেখে মাথা উঁচু করে নাদিম কে দেখা মাত্রই বিরক্ত বোধ করলো। এ ছেলে তার কাছে এসেছে কেনো! নাদিম তার থেকে সালামের উত্তর না পেয়ে বলল,
” আপনি না টিচার মানুষ? কেউ সালাম দিলে সালামের জবাব দিতে হয়। জানেন না? ”
মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ইকরাম ফরিদের। ” কি জন্য এসেছ এখানে? কি চাই? ”
” যা চাই তা কি দিবেন? ”
” আমার কাছে এসেছ কেন? ”
” সরাসরি বলবো? মাইন্ড করবেন না তো? ”
” বলো আগে। ”
” আপনার একটা বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে। তাকে যদি একটু দয়া করে আমার হাতে তুলে দিতেন তাহলে উপকৃত হতাম। ”
চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো ইকরাম ফরিদের। ” তোমার হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিব মানে?”
” বিবাহের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিতে বলছিলাম আর কি। আমি কিন্তু ছেলে ভালো। জব করি। বেকার না। বাড়ি গাড়ি সবই আছে। আশা করি আপনার আমাকে পছন্দ হবে। ”
” কখনোই না। তোমাদের মতো জালিম পরিবারে আমার মেয়েকে দিব ভাবলে কী করে? ”
” ব্রেন দিয়ে ভেবেছি। আমার পরিবার নিয়ে সমস্যা হলে তারও সলিউশন আছে। ”
” কী? শুনি। ”
” আমি না হয় ঘর জামাই থাকবো। ”
” এই ছেলে এই রাগীও না আমায়। তোমার স্যালারি কত? ”
” ভালোই পাই। ”
” কত পাও? ”
” ৩০ হাজার। ”
” আর আমার মেয়ের মাসিক হাতখরচ কত লাগে জানো? তোমার মাসিক বেতনই আমার মেয়ের জাস্ট মান্থলি হাত খরচ।”
” আলহামদুলিল্লাহ। ”
” খাওয়া পড়া তো বাদই দিয়েছি। তোমার কাছে আমার মেয়ে বিয়ে দিলে তুমি সংসার চালাবে কি করে? ”
” কেন? তখন তো আমার মান্থলি সেলারি ৬০ হাজার হবে। ”
” কিভাবে? ”
” আপনি তো আপনার মেয়ের হাতখরচ দিবেনই ৩০ হাজার। আর আমার বেতনের ত্রিশ হাজার। মোট ষাট হাজার দিয়ে আমার আর আপনার মেয়ের সংসার আরামসে কেটে যাবে বিলিভ মি। ”
ইকরাম ফরিদ ভয়ংকর রেগে গেলেন। এ ছেলে বলছে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরও তার সংসারে টাকা দিতে! তিনি যেতে যেতে বললেন,
” ভবিষ্যৎে যেন তোমার মুখে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়ার কথা না শুনি। শুনলে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দিব। ”
নাদিম গলা উঁচিয়ে বলল,
” বারবার বলবো। একশো বার বলবো। আপনার মেয়েকে আমার কাছে না দেওয়া অব্দি বলতেই থাকবো। নিজের কান বাঁচাতে চাইলে তাড়াতাড়ি মেয়ে দিতে রাজি হন। আমার মতো যোগ্য পাত্র হারালে কাঁদতে হবে আড়ালে। ”
ইকরাম ফরিদ কান দিলেন না সেই কথায়। তিনি আজ বাড়ি গিয়ে মেয়েকেশাসাবেন।
বিনোদিনী চলে যাওয়ার পরপর সিকান্দার বাড়ি চলে আসে সবজি হাতে করে। দুজনে মিলেমিশে রান্না বান্না করা শেষ হলে সিকান্দার আবার বেরিয়ে যায় কাজে। মুনতাহা এশার নামাজ শেষ করে তখন আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করলো। তার আজ খুব সাজতে ইচ্ছে করছে সিকান্দারের জন্য। অনেকদিন হলো সে সাজে না। অফ মেরুন রঙের একটা শাড়ি পরলো সে। তারপর সিকান্দারের মেলা থেকে কিনে আনা চুড়ি,কাজল,লিপস্টিক সাথে কিছু গয়নাগাটি কিনে এনেছিল সেগুলোও বের করলো। গাড় করে কাজল দিল,লিপস্টিক দিলো,হাতে কাচের চুড়ি পরলো। কানে দুল,গলায় ছোট একটা পাথরের হার পরলো। লম্বা চুল গুলো খুলে রাখলো। তারপর নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিলো। মন্দ লাগছে না তবে। ভালোই লাগছে।
বিড়াল টা কোলে নিয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগলো সিকান্দারের ফেরার। এশার নামাজের পর পর চলে আসলো বাড়িতে সিকান্দার। সদর দরজা আজ খোলা ছিলো। হয়তো সিকান্দার আসার আগ দিয়ে মুনতাহা খুলে রেখেছে। সিকান্দার দরজা আঁটকে ভিতরের ঘরের দিকে যাওয়া শুরু করলো। বসার ঘরে আসতেই দেখলো পুরো রুম অন্ধকার। সুইচ খুঁজে লাইট জ্বালাতে নিতেই ভেতর থেকে নারীময় কোমল একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,“জ্বালাবেন না।”
সিকান্দার থমকে গেল। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন? কোনো সমস্যা?”
কোনো উত্তর এলো না। কিছুক্ষণ পর শোবার ঘরের দিক থেকে মুনতাহাকে দেখা গেল। এক হাতে ছোট্ট বিড়ালছানাটিকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে, অন্য হাতে জ্বলছে একটি মোমবাতি। মোমের নরম আলোয় ধীরে ধীরে তার অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠতেই সিকান্দারের দৃষ্টি আটকে গেল তার ওপর। মোমের ক্ষীণ আলোয় তার সামনে থাকা রমণীর মুখখানি যেন অন্ধকার ঘরের মধ্যে হঠাৎ ফুটে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদ।
মেরুন রঙের শাড়িটা তার গায়ে এমন কোমলভাবে জড়িয়ে আছে, যেন সন্ধ্যার শেষ আলো এসে শরীরটাকে ছুঁয়ে থেমে গেছে। চোখ দুটোতে গাঢ় করে টানা কাজল, যেন কালো রাতের বুক চিরে আঁকা দুটি গভীর রেখা। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের আভা। আর হাতভর্তি কাচের চুড়ি। মুনতাহা এক পা এগোতেই মৃদু ঝংকার তুলে উঠল। খোলা চুলের কয়েকগাছা ললাট ছুঁয়ে আছে। মোমবাতির কাঁপা আলোয় তাকে আরও মায়াবী লাগছে।
সিকান্দার স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। মুনতাহা এগিয়ে আসতে আসতে তার চাহনিটা টের পেল। লোকটার চোখে এমন এক মুগ্ধতা যেন সে সামনে কোনো মানুষকে নয়, অন্ধকারে হঠাৎ জ্বলে ওঠা কোনো অপার্থিব দৃশ্য দেখছে।
মুনতাহা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। সিকান্দারের মনে হলো, সৌন্দর্যের প্রশংসা করার জন্য পৃথিবীর যত উপমাই আছে, সবগুলোই আজ বড় অপ্রতুল। চাঁদ বলা যায়, অথচ তার মুখের কোমলতার কাছে চাঁদের আলোও যেন ফিকে। ফুল বলা যায়, অথচ তার সৌন্দর্যে ফুলের সৌন্দর্যও নীরব হয়ে যায়।
মুনতাহা বিড়ালছানাটাকে বুকের কাছে একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?”
সিকান্দারের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“তাকিয়ে থাকাটাই কি অপরাধ?”
মুনতাহা কোনো উত্তর দিল না। শুধু মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। অথচ তার গাল দুটো তখন মোমের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে বলল,
” আমি আজ অনেক দিন পর আপনার জন্য সেজেছি। আমাকে কেমন লাগছে? ”
সিকান্দার তার চোখের দৃষ্টি এক মুনতাহাতেই নিবদ্ধ রেখে শান্ত,নরম স্বরে বলল,
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪১ (২)
“ একান্তই আমার আমার লাগছে। একদম হৃদয় থমকে যাওয়ার মতো। একজন মানুষকে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকার জন্য যতটা সুন্দর একজন নারী দরকার, ঠিক ততটাই সুন্দর লাগছে,শুকরিয়া আদায় করার মতো । আল্লাহ আমাকে এত সুন্দর একটা নিয়ামত দিয়ে কীভাবে এতটা ভাগ্যবান করলেন! ”
