Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৫

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৫

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৫
Raiha Zubair Ripti

যতই বাঁশঝোপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, নারীকণ্ঠের আর্তচিৎকার ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। তার সঙ্গে ভেসে আসছিল কয়েকজন পুরুষের মাতাল হাসি।
সিকান্দারের পা থেমে গেল না। বরং শব্দের উৎসের দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে গেল সে। বাঁশঝোপের আড়াল পেরোতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল। চার-পাঁচজন যুবক নেশায় বুঁদ হয়ে একটি মেয়েকে ঘিরে রেখেছে। মেয়েটা প্রাণপণে নিজেকে তাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বারবার চিৎকার করে সাহায্য চাইছে, অথচ মাতালদের হাসি আর কদর্য কথার মধ্যে তার আর্তনাদ যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
সিকান্দারের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
পাশেই বাঁশঝোপের ধারে মাটিতে গেঁথে রাখা একটি শক্ত কাঠের খুঁটি চোখে পড়ল। সে এক টানে সেটি তুলে নিল।
গম্ভীর স্বরে বলল,

“মেয়েটাকে ছেড়ে দে।”
মাতালদের একজন ঘুরে তাকাল। অন্ধকারে সিকান্দারের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
“ওই কে রে তুই?”
সিকান্দার আরেক ধাপ এগিয়ে গেল।
” মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে বলেছি কিন্তু আমি। বাঁচতে চাইলে এক্ষুনি ছেড়ে দে।
লোকটা হেসে উঠল।
“ছাড়ব না। কী করবি তুই?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা এগিয়ে এসে সিকান্দারকে ধাক্কা দিতে হাত বাড়াল। সিকান্দারের হাত তার আগেই উঠে গেল। এক ঘুষিতে লোকটা ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। বাকি কয়েকজন মুহূর্তেই ক্ষেপে উঠল।
” ধর ওরে!”

চারদিক থেকে তারা সিকান্দারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
অন্ধকার বাঁশঝোপের মধ্যে শুরু হলো ধস্তাধস্তি। সিকান্দার একা, তবু একচুলও পিছিয়ে গেল না। হাতে থাকা খুঁটিটা দিয়ে একের পর এক আঘাত করে তাদের দূরে সরিয়ে দিতে লাগল। মাতাল অবস্থায় থাকায় ছেলেগুলোর শরীরে তেমন শক্তি ছিল না, কিন্তু সংখ্যায় তারা বেশি ছিল। একজন পেছন থেকে আঘাত করতে এগিয়ে এলে সিকান্দার ঘুরে দাঁড়াতেই লোকটার হাতে থাকা ছুরিটা তার বাহু ছুঁয়ে গেল।
চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। সিকান্দার একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল।
তারপর চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাতেই তার চোখের দৃষ্টি দেখে লোকটা এক মুহূর্ত থমকে গেল। পরের মুহূর্তেই সিকান্দারের হাতে থাকা খুঁটিটা ছুটে গেল তার গাল-কানের পাশ বরাবর। লোকটা বিকট চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। সিকান্দার এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

“আর কে আসবি?”
তার কণ্ঠে এমন হুমকি ছিল যে মাতালদের নেশাও যেন কিছুটা কেটে গেল। তারা একে অন্যের দিকে তাকাল।
তারপর দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালিয়ে গেল। সিকান্দার কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল। মেয়েটার দিকে সরাসরি না তাকিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি ঠিক আছেন?”
কোনো উত্তর এল না। মেয়েটা মাটিতে বসে জুবুথুবু হয়ে কাঁপছিল। দুই হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন ভয়ে অবশ হয়ে গেছে।
“ভয় পাবেন না। ওরা চলে গেছে। আপনি এখন নিরাপদ।”

অনেকক্ষণ পর মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চাঁদের আবছা আলোয় সিকান্দারের মুখটা চোখে পড়তেই সে স্থির হয়ে গেল। সিকান্দার শাহ্। বিনোদিনীর বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ভেঙে পড়ল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটাকে নিয়ে অন্যরকম একটা পরিকল্পনা ছিল তার, সেই মানুষটাই আজ তাকে এমন একটি বিপদ থেকে উদ্ধার করল, যার কথা ভাবলেই তার শরীর শিউরে উঠছে। যদি সিকান্দার না আসত? ভাবনাটা শেষ করার আগেই তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল বিনোদিনী।
সিকান্দার অস্বস্তিতে পড়ে গেল কান্নার আওয়াজ শুনে। বুঝলো মনের উপর দিয়ে কী যাচ্ছে মেয়েটার। তবে মেয়েটা এত রাতে এখানে কী করে আসলো? মেয়েটা আসলে কে?
” আপনি এত রাতে এখানে কিভাবে আসলেন? বাড়ি কোথায় আপনার? ”
বিনোদিনী এবার মাথা তুলে তাকালো। বিনোদিনীর মুখটা হয়তো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। নইলে সিকান্দার তাকায় নি তার দিকে। বিনু এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলো,

” আ…আমি ব..বিনোদিনী সিকান্দার সাহেব। ”
সিকান্দারের কপালে দুটি ভাজ পরলো। বিনোদিনী! সেই মেয়েটা! যার উপস্থিতি তে সিকান্দারের অস্বস্তি হত প্রতিবার! মুখটা গম্ভীর হয়ে আসলো।
“উঠুন। এভাবে বসে থাকবেন না।”
বিনোদিনী শব্দ করে কাঁদতে লাগলো। হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আপনি আজ সঠিক সময়ে না আসলে ওরা আমার সাথে… ”
“ এত রাতে বাড়ির বাহিরে বের হয় না কোনো ভদ্র বাড়ির মেয়ে। অন্তত একা একা না। জানি না আপনি কী জন্য বের হয়েছিলেন। শুনতেও আগ্রহী নই। আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করেছেন।”
বিনোদিনী চুপসে গেল। সিকান্দার নিজের শরীরের চাদরটি খুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এইটা গায়ে জড়িয়ে নিন।”
বিনোদিনী চমকে তার দিকে তাকাল। শাড়িটা দিয়ে বিনু কোনোভাবে শরীর ঢেকে রেখেছে, কিন্তু ছেঁড়া ব্লাউজের কারণে সে অস্বস্তিতে দুহাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল
বিনোদিনী কাঁপা হাতে চাদরটা নিল। তারপর সেটি বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। চাদরের ভাঁজে মুখ লুকাতেই আবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

” বাড়ি ফিরবেন কী করে এখন? আপনার বাবার ফোন নম্বর টা বলুন। তাকে ফোন করছি। ”
” বাবা বাড়ি নেই। শহরে গেছেন। ”
” আর প্রতাপ? ”
” বাবার সাথে গেছে। ”
” তাহলে ফিরবেন কী করে বাড়ি? ”
“আমি একা যেতে পারব।”
” এই অবস্থায় একা যাওয়া ঠিক হবে না। আমি আপনাকে বাড়ির গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি।”
বিনোদিনী মাথা নেড়ে হাঁটা ধরলো। পেছন পেছন ধীর পায়ে সিকান্দার হাঁটতে লাগলো। চেয়ারম্যান বাড়ির গেট অব্দি সিকান্দার বিনোদিনী কে পৌঁছে দিলো। বিনোদিনী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নত করে ধীরে বলল,
“ আমাকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ সিকান্দার সাহেব।”
সিকান্দার মাথা নাড়ল। “ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। সাবধানে চলাচল করবেন। এমন বোকামি আর দ্বিতীয় বার করবেন না। বিশেষ করে একজন নারীর একা একা গভীর রাতে এভাবে বাইরে থাকা নিরাপদ নয়। প্রয়োজন না থাকলে রাতের অন্ধকারে একা বের হওয়া থেকে বিরত থাকবেন। নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে অবহেলা করবেন না। বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে সঙ্গে কাউকে রাখবেন। নিজের সম্মান, নিরাপত্তা নিজেকেই রাখতে হবে। আসছি।

সিকান্দার চলে গেল। বিনোদিনীর অনেকক্ষণ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে গেটের ভেতরে ঢুকে গেল। রুমে এসে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার পুরো শরীর তখনও কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগের ভয়, অপমান, আতঙ্ক সবকিছু একসঙ্গে ফিরে আসছে। এমনটা তো হবার কথা ছিল না! সে মুখ চেপে কেঁদে ফেললো। যাকে বদনাম করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সেই তার সম্মান বাঁচালো! শরীরে ঐ নরপিশাচদের আঁচড়ের দাগগুলো তার ফর্সা শরীরে কলঙ্কের দাগের মতো তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি টানছে। শরীর ঝলসে যাচ্ছে বিনুর। দৌড়ে কলপাড়ে চলে গেল। শরীর টা ছোবা দিয়ে ডলতে ডলতে লাল বানিয়ে ফেললো। ঘৃণা ধরে যাচ্ছে এই শরীরে। কত গুলো পুরুষ তাকে ছুঁয়েছিল! সে ঐ রাস্তায় অপেক্ষা করছিল সিকান্দারের জন্য। পরিকল্পনা এটাই ছিলো যে সিকান্দার আসলেই তার সামনে যাবে। তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে। রাজি না হলে তাকে জড়িয়ে ধরবে। চিৎকার চেঁচামেচি করে লোক জরো করবে। কিন্তু সিকান্দার আজ আসতে অনেক দেরি করেছিল। অপেক্ষা করতে করতে কয়েকজন মাতাল এসে টেনে ধরলো তাকে। তারপর বাঁশ ঝোপের ভিতর টেনে নিয়ে গেল। ওদের বারবার বলছিল তাকে ছেড়ে দিতে। তার পরিচয়ও দিচ্ছিল। কিন্তু ওরা এতটাই মাতাল ছিল যে বিনুর পরিচয় টা কানেই নিচ্ছিল না। অবশেষে সিকান্দার আসলো। তাকে বাঁচাল।

আচ্ছা এতে কী বিনুর মধ্যে সামান্যতম অনুশোচনা এসেছে তার কৃতকর্মের প্রতি? কী জানি! যদি এসে থেকে তাহলে ভালো। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিয়েছেন। আর যদি তা না হয় তাহলে বিনু সেই আযীযের স্ত্রীর এক রূপ হতে যাচ্ছে। যার সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছিল।
সিকান্দারের বাড়ি ফিরতে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। মুনতাহা নামাজ শেষ করে সেহরির জন্য রান্না বসিয়েছিল। তারা প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখে। আর প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখে।
এই তারিখ গুলোতে রাসূল ﷺ রোজা রাখতেন।
নবী ﷺ সোমবার রোজা রাখতেন। তিনি বলেছেন, এ দিনেই তাঁর জন্ম এবং তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছিল। [সহিহ মুসলিম]।

নিয়মিতভাবে সোমবারের পাশাপাশি বৃহস্পতিবারেও রোজা রাখতেন। এক হাদিসে এসেছে, সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়, আর রাসূল ﷺ পছন্দ করতেন তাঁর আমল পেশ হওয়ার সময় তিনি যেন রোজাদার থাকেন। [সুনান আত-তিরমিজি]
আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। যাকে আইয়্যামে বিজ বলা হয়। [সুনান আবু দাউদ, সুনান আন-নাসাঈ]
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি মাসে তিন দিন নফল রোজা রাখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে এসেছে, প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখলে তা পুরো মাস রোজা রাখার সমতুল্য,কারণ একটি নেক আমলের জন্য দশগুণ সওয়াব দেওয়া হয়।[ সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৫৯c]
দরজায় ঠকঠক শব্দ পেয়ে মুনতাহা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দরজার সামনে আসলো। সিকান্দার আস্তে করে বলল,
” আমি। দরজা খুলুন। ”

মুনতাহা দরজা খুললো। দরজার সামনে একটা লাইট জ্বালানো থাকে রাতে। সেই লাইটের আলোয় মুনতাহা দেখলো সিকান্দারের পরনের শার্ট বাহুর কাছটায় একটু ছেড়ে। নামাজের সময় গায়ে যে চাদর ছিলো সেটাও নেই। মুনতাহা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
” আপনার শার্ট ছিঁড়লো কী করে? ” পরক্ষণেই চোখ বাহু থেকে নেমে হাতের কাছে যেতেই আঁতকে উঠল। হাত ধরে অস্থির কণ্ঠে বলল, ” আপনার হাত কাটলো কী করে? কী হয়েছে কী? শার্ট ছেঁড়া, হাত কাটা। ইশ রক্ত এখনো বের হচ্ছে। কী হয়েছিল চুপ করে আছেন কেন বলুন না। ”
মুনতাহার এমন অবস্থা যে সে কেঁদেই ফেলছে। সিকান্দার দরজা লাগিয়ে মুনতাহা কে রুমে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে বলল,
” সামান্য চোট। কাঁদবেন না একদম। ”
মুনতাহা সযত্নে তখন হাতের রক্ত মুছে দিচ্ছে। ” কী করে হলো বলুন না। মারামারি হয়েছিল কারো সাথে? ”
সিকান্দার হাতের দিকে তাকিয়ে তপ্ত এক শ্বাস ফেলে সবটা খুলে বলল। সবটা শোনার পর মুনতাহা থ হয়ে গেলো। বিনোদিনীর সাথে কী হতে যাচ্ছিল ভেবেই বুকটা কেঁপে উঠলো। হৃদয় ভার হলো। বিনোদিনীর উপর দিয়ে না জানি কী যাচ্ছে এখন। কয়েকদিনে অনেকটা চেনা জানা হয়ে গিয়েছিল তো বিনোদিনী। বন্ধু ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল মুনতাহা।

” উনার কোনো ক্ষতি হয় নি তো? ”
” না হয় নি। ঠিক সময় না পৌঁছালে খারাপ কিছু ঘটতো।”
” আল্লাহ রক্ষা করেছেন। ”
মুনতাহা এবার সিকান্দারের সারা শরীর খুঁজে খুঁজে দেখতে লাগলো আর কোথাও আঘাত পেয়েছে কী না। সিকান্দার সেটা দেখে বলল,
” আর কোথাও চোট পাই নি। রিলাক্স হোন। রান্না ঘরে কিছু বসিয়েছেন? পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি যে? ”
মুনতাহার মনে পরলো চুলায় ভাত বসানো। সে দৌড়ে ভাতের পাতিল নামিয়ে আবার চলে আসলো। ভাতের চেয়েও জরুরী এখন তার স্বামীর কাছে থাকা।
সুন্দর করে মুনতাহা সিকান্দারের হাতের রক্ত মুছে ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো । সিকান্দার ক্লান্ত দেহটা বিছানায় মেলে দিতেই মুনতাহা ধীর স্বরে বলল,
“আপনি নাদিম ভাইয়ের খবর জানেন?”
সিকান্দার চোখ মেলে তাকাল মুনতাহার দিকে।

“না তো। কী হয়েছে ওর?”
“উনি ইলাকে নাকি বিয়ে করতে চাইছেন।”
“দারুণ খবর তো। আর কত দিন সিঙ্গেল মিসকিন হয়ে থাকবে?”
“কিন্তু ইলার বাবা রাজি না।”
“কেন? নাদিম তো ছেলে হিসেবে মন্দ না।”
“আম্মার কারণে রাজি না। তাদের ধারণা, ইলা এ বাড়ির বউ হলে আম্মা অত্যাচার করবে।”
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কিন্তু চাচি তো অমন না। তিনি নাদিম আর সিমরানকে যথেষ্ট স্নেহ করেন।”
মুনতাহা মুখ নিচু করে মন খারাপ করা স্বরে বলল,
“হু। স্নেহটা কেবল করলেন না আমাকে।”
কথাটা শুনে সিকান্দার আর শুয়ে থাকতে পারল না। উঠে বসল। তারপর মুনতাহাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল। মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর স্বরে বলল,

“আমি আছি তো। আমি একাই সবার থেকেও বেশি স্নেহ করব আপনাকে। এটা ভেবে আর মন খারাপ করবেন না। আল্লাহ সবার ভাগ্যে পিতা-মাতার ভালোবাসা রাখেন না। কোনো কোনো মানুষকে তিনি এই অভাবের মধ্য দিয়েও পরীক্ষা করেন। হয়তো যে ভালোবাসাটা আপনি তাদের কাছ থেকে পাননি, তার বিনিময়ে আল্লাহ আপনার জন্য অন্য কোনো দরজা খুলে রেখেছেন। আর সবকিছুর পেছনেই আল্লাহর কোনো না কোনো হিকমত থাকে। আমরা সবসময় সেটা বুঝতে পারি না। তাই যেটা পাইনি, সেটা নিয়ে সারাজীবন কাঁদতে নেই। ”
মুনতাহা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখের কোণে জমে থাকা জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলল। সিকান্দার ও তো তার বাবা মায়ের ভালোবাসা পায় নি জীবনে। তাকে তো কখনো হা হুতাশ করতে দেখে নি। ভাগ্য কে দোষারোপ করতে দেখে নি। তারই স্ত্রী মুনতাহা কেন হা হুতাশ করলো মা বাবার ভালোবাসা পায় নি বলে? আল্লাহ দুজন এতিম কে কি নিদারুণ ভাবেই না জুড়িয়ে দিলো একে ওপরের সাথে। কী অদ্ভুত মিল এই জায়গাটায় এসে তাদের!

ইলার আজ মন-মেজাজ ভীষণ খারাপ। এই নাদিমের বাচ্চা তার বাবাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল তাদের বাড়িতে! দুদিন পরই সুনেহরার বিয়ে। বাড়িজুড়ে বিয়ের ব্যস্ততা, সবাই সেদিকেই ছুটছে। অথচ এই ছেলে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে নিজের বিয়ে পাকাপোক্ত করার জন্য একেবারে বাবা নিয়ে হাজির! ইলা দূর থেকে একবার তাদের দেখে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। তার রাগ হচ্ছে নাদিমের ওপর, আবার কোথাও যেন লজ্জাও লাগছে। লোকটা যে সত্যিই তাকে বিয়ে করার জন্য এতটা মরিয়া, সেটাও তো সে অস্বীকার করতে পারে না।
ইকরাম ফরিদও বেশ চটে আছেন। কী বেয়াদব পাজি ছেলে! একবার না করেছেন, দুবার না করেছেন। তারপরও মিষ্টি, ফলমূল নিয়ে বাবাকে সঙ্গে করে বাড়িতে চলে এসেছে!
সালমান মির্জা ইকরাম ফরিদের মুখের অবস্থা দেখে বুঝলেন, তাদের আগমনে তিনি মোটেও খুশি হননি। কিন্তু নাদিমের তো লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই। সে এমনভাবে বসে আছে, যেন বিয়ের কথাবার্তা নয়, নিজের শ্বশুরবাড়িতে এসে মেহমানি খেতে এসেছে।
সালমান মির্জা একটু ইতস্তত করে বললেন,

“ভাই, ছেলেমানুষ। ইলাকে পছন্দ করে বলেই হয়তো একটু বেশি তাড়া দিয়েছে।”
ইকরাম ফরিদ গলা ঝেড়ে কঠিন স্বরে বললেন,
“পছন্দ করলেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না। আমি স্পষ্ট করে না করেছি। তারপরও আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য এভাবে বাড়িতে চলে আসা কেমন কথা?”
নাদিম এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার মুখ খুলল,
” আঙ্কেল আপনি….”
“তুমি একটু চুপ করো। বড়দের কথা বলতে দাও।”
নাদিম সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। ইকরাম ফরিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” আপনাদের বাড়িতে আমার মেয়েকে বউ হিসেবে পাঠাতে রাজি নই। ”
সালমান মির্জা নড়েচড়ে বসে বললে,
” কারনটা বললে বোধহয় ভালো হতো। তাহলে সল্ভ করা যেত সেটা।”
” আপনার ওয়াইফের স্বভাব সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, তাতে ইলাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যদি প্রতিদিন তার চোখের পানি দেখতে হয়, তাহলে সেই বাড়িতে কী মেয়ে দিতে চাইবে কোনো বাবা?”

ঘরের পরিবেশটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সালমান মির্জা এবার ধীরে বললেন,
“আমি আপনার ভয়টা বুঝতে পারছি। ময়না ওমন নয় যে সে ইলার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে। ”
” যে নিজের সন্তানের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে। সে অন্যের সন্তানের সাথেও পারবে। ”
” আপনার কথাটা সত্য হলেও,ময়না কখনো আমার সন্তান দের সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি। নাদিমের ইচ্ছেটাও তো দেখছেন।”
“ইচ্ছা দিয়ে সংসার চলে না, সালমান সাহেব। দায়িত্ব লাগে। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা লাগে।”
নাদিম এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার পকেট থেকে ফোন বের করল। সিকান্দার কে ফোন করলো। সিকান্দার গ্রামের পথে হাঁটতে বের হয়েছিল সেই ছেলেপেলে গুলো কে খুঁজতে। কারন চেহারা তার ভীষণ মনে আছে। দেখা মাত্রই চিনে ফেলবে। হুট করে নাদিমের ফোন পেয়ে রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে নাদিম বলল,
” সিকান্দার, আমার বিয়েটা বাঁচা। ইলার বাপ টাকে একটু রাজি করা ভাই। ”
সিকান্দার হকচকিয়ে যায়। ” আমি কী বলবো? ”
” তোর শাশুড়ী মায়ের জন্য আমার বিয়ে হচ্ছে না। তুই কিছু করবি না? ”
” আচ্ছা ইলার বাবা কে ফোন টা দে। ”
নাদিম ফোনটা ইকরাম ফরিদের দিকে এগিয়ে দিল। সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল। ”
ইকরাম ফরিদও সালামের জবাব দিলেন। তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

“তুমি তো জানো, নাদিম ইলাকে বিয়ে করতে চায়।”
“জি, জানি।”
“কিন্তু আমি রাজি হতে পারছি না।”
“সমস্যাটা কী, আঙ্কেল?”
ইকরাম ফরিদ এবার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো খুলে বললেন।
“আমার ভয়, ইলাকে বিয়ের পর তোমাদের বাড়িতে গিয়ে অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। মুনতাহার আম্মার ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত নই। নাদিম যত ভালোই হোক, সে তো সবসময় বাড়িতে থাকবে না। আমার মেয়েটা যদি একা হয়ে যায়? যদি তাকে কেউ কষ্ট দেয়? তখন আমি কী করব?”
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। সিকান্দার মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
” বিয়ের পর মেয়ের সুখের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না আঙ্কেল। বাবা-মায়ের ঘরেও যেমন সবসময় সুখ থাকে না, স্বামীর ঘরেও থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ভালো মানুষকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা যায়। তবে আপনার ভয়টা অমূলক না, আঙ্কেল। মেয়ের বাবা হিসেবে এই ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে সমাধানও আছে। শুধু আবেগ দিয়ে বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কিছু বিষয় বিয়ের আগেই পরিষ্কার করে নিন। যেহেতু বললেন নাদিম কে নিয়ে সমস্যা নেই আপনার। ”

ইকরাম ফরিদ মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন।
” কী সমাধান? ”
“প্রথমত, নাদিমকে দায়িত্ব নিতে হবে। ইলাকে শুধু বিয়ে করলেই হবে না, তার নিরাপত্তা আর সম্মানের দায়িত্বও নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে বিয়ের পর ওদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা করুন। এতে কারও প্রতি অসম্মান হবে না, বরং নতুন সংসারে দুজন নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। আর যদি কোনো কারণে আলাদা থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে নাদিমকে স্পষ্ট করে বলতে হবে,ইলার সঙ্গে অন্যায় হলে সে চুপ থাকবে না। স্ত্রীকে মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যেমন ঠিক না, তেমনি মায়ের খাতিরে স্ত্রীর ওপর অন্যায় হওয়াও মেনে নেওয়া ঠিক না। দুজনেরই হক আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইলার মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। মেয়েটা রাজি থাকলে, নাদিমের চরিত্র ও দায়িত্ববোধে আপনি সন্তুষ্ট থাকলে এবং থাকার একটা নিরাপদ ব্যবস্থা করা গেলে শুধু ভয় থেকে একটা ভালো সম্পর্ক ফিরিয়ে দেওয়ারও দরকার নেই। আর নাদিমের ব্যাপারেও আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ছেলেটা হয়তো একটু পাগলাটে। কিন্তু আপনার মেয়েকে নিয়ে তার নিয়ত খারাপ নয়। খারাপ নিয়ত থাকলে বিয়ে করতে চাইতো না। ”

ইকরাম ফরিদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“তুমি কী মনে করো, আলাদা সংসার করলে সমস্যাটা কমবে?”
“ইনশাআল্লাহ, অনেকটাই। আর নাদিম যদি নিজের সংসারের দায়িত্ব নিতে শেখে, তাহলে আপনার ভয় পাওয়ার কারণও কমবে।”
ইকরাম ফরিদ এবার নাদিমের দিকে তাকালেন। মাথা নিচু করে বসে আছে। সিকান্দার আবার বলল,
” আঙ্কেল বিয়ে মানে শুধু দুজন মানুষের একসঙ্গে থাকা না। এটা একটা আমানত। আপনি আপনার মেয়েকে যার হাতে দেবেন, তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চাওয়াটা আপনার অধিকার। আর নাদিম যদি সত্যিই ইলাকে চায়, তাহলে তাকে সেই নিশ্চয়তাটা দেওয়ার দায়িত্বও নিতে হবে।”
ইকরাম ফরিদের বুকের ভেতরটা যেন একটু নরম হয়ে এলো। তিনি ধীরে বললেন,
“তাহলে তুমি বলছ, আমি রাজি হয়ে যাই?”
সিকান্দার মৃদু হেসে বলল,

“আমি আপনাকে রাজি হতে বলছি না, আঙ্কেল। আমি বলছি, ভয়টার সমাধান করে তারপর সিদ্ধান্ত নিন। আপনার মেয়ের জন্য যেটা কল্যাণকর মনে হবে, সেটাই করবেন।”
কথাটা শুনে ইকরাম ফরিদ কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন।তারপর ফোনটা নাদিমের হাতে দিয়ে দিলেন। ততক্ষণে সিকান্দার ফোন কেটে দিয়েছে। ইকরাম ফরিদ বললেন,
” আমাকে আর একটু ভাববার সময় দিন। আর নাদিম! আমার মেয়ের চোখে যেন কোনোদিন তোমার জন্য পানি না আসে খবরদার। ”
নাদিমের মুখের হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল। সে মাথা নত করে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, আঙ্কেল। চেষ্টা করব সারাজীবন ওর চোখের পানি মুছে দিতে।”
ইকরাম ফরিদ ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। সে বললো চোখে পানি আসতে দিতে না। আর এই ছেলে বলছে সারাজীবন চোখের পানি মুছে দিবে! তারমানে তার মেয়ের চোখে পানি আসবে! আহাম্মক ছাগল ছেলে।
” কী বললে তুমি! ”
নাদিম চোখ মুখ খিঁচে বলল,

” আঙ্কেল মিস্টেক হয়েছে। প্লিজ এটার জন্য বিয়ে ভেঙে দিবেন না। আমি আপনার মেয়ের চোখে আমার কারনে জল আসতে দিব না। কথা দিচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। ”
ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ইলা এতক্ষণ সব শুনছিল। বাবার শেষ কথাগুলো শুনে তার ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল। এই ছেলেটা সত্যিই একটা আহাম্মক।
তবু… কেন যেন তার এই আহাম্মক টাকেই আজকাল ভালো লাগতে শুরু করেছে।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৪

সিকান্দার পুরো গ্রাম খুঁজেও ঐ ছেলেদের হদিস পেলো না। আশ্চর্য হলো। নাকি গ্রামের বাহিরের ছেলে ছিল তারা? কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে সেটাও করতে পারছিল না। পরিশেষে খোঁজা বাদ দিয়ে বাসায় আসলো। মাগরিবের আজান কানে আসলে মুনতাহা আর সিকান্দার রোজা ভেঙে ইফতার করে। ইফতার করা শেষ হলে সিকান্দার মসজিদে চলে যায় নামাজ পড়তে। আর মুনতাহা বাসায় নামাজ পড়ে। নামাজ পড়া শেষে মুনতাহা উঠানে দাঁড়িয়ে হাঁসের বাচ্চা গুলোকে খোপে ঢুকাতে নিলে রাশেদের ছোট বোনটা দৌড়াতে দৌড়াতে দরজায় কড়া নেড়ে বলে,
” মুনতাহা আপু,মুনতাহা আপু। সিকান্দার ভাইরে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে…”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here