সে খলনায়ক পর্ব ১
ফারহানা সানিয়াত
সবার জীবনে ভালোবাসার ব্যাখ্যা কি এক? সবাই কি একই ভাবে ভালবাসতে পারে? এই দুইটা প্রশ্নের উত্তর এক এক জন এক এক রকম ভাবে দিয়ে থাকে। এর মানে ভালোবাসার ব্যাখ্যা অনেক ধরনের আর সবাই একইভাবে ভালবাসতে পারে না। কারো কাছে ভালোবাসা জীবনে বসন্ত আসার মত,আবার কারো ভালোবাসা বছরের প্রথম বৃষ্টি। কিন্তু কারো ভালোবাসা যদি জীবনের সবকিছু কেড়ে নেয় তাহলে সেটা কেমন ভালোবাসা? পৃথিবীতে সকল মানুষের ভালোবাসা থেকে একটাই আশা থাকে। জীবনে ভালোবাসার মানুষ পেলে হয়তো সব দুঃখ চলে যাবে। আসলেই কি ভালোবাসার মানুষ পেলে জীবনে সুখ চলে আসে!!
আমি বলব নাহ। আসে না সবার জন্য ভালোবাসা এক হয় না। পৃথিবীতে সব নারী বা পুরুষ জীবনে বসন্ত আসার মত বা বছরের প্রথম বৃষ্টির মত ভালোবাসা পায় না। কারণ কিছু ভালোবাসা থাকে নিষ্ঠুরতা স্বার্থপরতা যেখানে দুজনের ভালোবাসার গল্পে একজনকে অপরজনের জন্য শুধু সব কিছু হারাতে হয়। স্বার্থের জন্য ওই অপর মানুষটিই জীবন থেকে সব কেড়ে নেয়। যার ভালোবাসার আগে থাকে পৈচাশিক জঘন্য চাওয়া।আর এমন এক ভালোবাসার মানুষ প্রাণপ্রিয়া নামের এক মেয়ে জীবনে চলে আসে। যে মেয়েটির জীবনে কিছুই ছিল না তবুও সবকিছু ছিল কিন্তু এরপর!, এরপর কি হয় গল্পের সাথেই জানা যাক।
গল্পটা শুরু হয় একটা অনাথ আশ্রমে। যেখানে প্রাণপ্রিয়া নামের তেরো বছরের মেয়েকে তার চাচা চাচি রেখে যায় অনাথ আশ্রমে। তার কারণ তাদের সামর্থ্য নেই মেয়েটিকে লালন পালন করার। মেয়েটা আশ্রমে এসে এক নতুন জীবনে পা রাখে। বাকি বাচ্চাদের থেকে বড় হলেও ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে বেশ ভালোভাবেই মিশে যায়। ব্যবহারে খুব ভদ্র আর মিষ্টি স্বভাবের একটা মেয়ে তবে সাথে অনেকটা চটপটে ও বটে।
আশ্রমে প্রাণপ্রিয়া আসার পর থেকে তাকে কেউ কষ্ট পেতে দেখে নি। সে সব সময় হাসি খুশি প্রাণোচ্ছল থাকে। তাকে দেখে প্রথম আশ্রমের দায়িত্বে থাকা অর্ধব বয়স্ক মিস্টার রহমান আর ৩০-৩৫ বছরের মিসেস সেলিনা অনেকটা অবাক হয়েছিল। কারণ মেয়েটিকে বুঝের বয়সে চাচা চাচি রেখে যাওয়ার কারণে হয়তো কান্নাকাটি করবে। কিন্তু নাহ প্রাণপ্রিয়া নামের মেয়েটা আশ্রমে এসেই যেনো সবকিছু সাথে, সবার সাথে মিশে গেছে। সব থেকে বেশি মিছে গেছে এই আশ্রমের চারপাশে গাছপালা প্রকৃতির সাথে। যার দিনটা শুরু হয় এই আশ্রমের পিছে জঙ্গলের সাথে সময় কাটিয়ে। প্রাণপ্রিয়া বয়সে বড় দেখে রহমান আর সেলিনাও জঙ্গলে যাওয়া নিয়ে তাকে নিষেধ করেনি তবে বাকি বাচ্চাদের যাওয়া নিষেধ।
ঢাকার পূর্বাঞ্চলের কিছুটা গ্রাম সাইডের শান্তি নিবাস নামে এই আশ্রমটি অবস্থিত। নিরিবিলি চারপাশের গাছ-গাছালি ঘেরা দু তলা বিশিষ্ট আশ্রম। আশ্রম টি দেখলে কেউ বলবে না এটা কোনো আশ্রম বলবে এটা একটা পরিবারের বাড়ি। যেখানে অনেকগুলো বাচ্চা একজন বয়স্ক পুরুষ আরেকজন মহিলার থাকে। শান্তি নিবাস নামে আশ্রমটি নামের মতই শান্তিতে ভরপুর যেখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের খুবই আদর যত্নে লালন পালন করা হয় সাথে পড়াশোনার সুযোগ সুবিধা ও আছে। আর এসব একমাত্র এই আশ্রমের মালিক হুমায়ুন আবরার তার জন্য সম্ভব।, লোকমুখে আর এই আশ্রমের দায়িত্ব যারা আছে তাদের থেকে শোনা যায়। তিনি অসহায়দের প্রতি কতটা দয়ালু, যাইহোক…
শান্তিতে ভরপুর আশ্রমে সকালটা শুরু হয় খুব হইচইয়ের মধ্যে দিয়ে। ছোট ছোট সাত আট বছরের বাচ্চাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে ফ্রেশ করে নাস্তা খাইয়ে পাঠানো হয় স্কুলে। এসবের দায়িত্ব রয়েছে মিস সেলিনা ৩০-৩৫ বছরের মহিলা স্বামী সংসার হারিয়ে এই আশ্রমের আশ্রয় নিয়েছে আর এই বাচ্চাদের লালন পালন করার মধ্যে দিয়ে জীবন উৎসর্গ করছে। আশ্রমে সব বাচ্চারা স্কুলে চলে গেলেও, প্রাণপ্রিয়ার যায় হয়নি। কারণ বছরের অনেকগুলো মাস কেটে গেছে।, সে এসেছে কয়েকদিন ধরে এই সময় স্কুলে ভর্তি করানো যাবে না, তাই প্রাণপ্রিয়ার এ বছরটা গ্যাপ যাবে। কি আর করার সময় কাটানোর জন্য মিস সেলিনা সাথে ঘরের কাছে হাত বুলানো শুরু করে…
মিস সেলিনা মাঝে মাঝে অবাক হয় প্রাণপ্রিয়ার উপর মেয়েটা খুব ছোট হলেও অনেকটা বুঝদার। এই যে এখন ফ্রি টাইমে সে খেলাধুলা করতে না গিয়ে তাকে সবজি কাটার কাজে হেল্প করছে। ইস বড়ই আফসোস এমন একটা মেয়ে তার হলে কি হতো, অবশ্য এখনো এই মেয়েটাকে সেই তো লালন পালন করবে।, সেলিনা নিজের ভাবনার মাঝে প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকান।, এতোটুকু মেয়ের রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়তো উচিত হবে না। তবে মেয়েটি যেন খোদা তায়ালা সব দিক দিয়ে নিখুত ভাবে বানিয়েছে।, দুধে আলতা গায়ের রং, বড় বড় চোখ ঘন ঘন পাপড়ি সরু নাক পাতলা গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট, পিঠ পর্যন্ত চুল কিছুটা আঁকাবাঁকা, তবে মেয়েটার সাথে খুব মানিয়েছে। এত নিখুঁতভাবে বানানোর পরও খোদা তায়ালা মেয়েটাকে অনাথ বানালো সবই যেন ভাগ্য। মিস সেলিনা একা একা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
সামনে বসা প্রাণপ্রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে সবজি পরিষ্কার করছে,,
__ তুমি গিয়ে খেলা করো প্রিয়া। আমি এসব করছি, মিসেস সেলিনা বলে ওঠেন। প্রাণপ্রিয়াকে ছোট করে প্রিয়া বলে ডাকেন সে,,
প্রাণপ্রিয় চোখ তুলে মিসেস সেলিনার দিকে তাকায়,,
__ আমি তো বড় হয়ে গেছি আন্টি আমি তোমাকে হেল্প করতে চাই। সেলিনা চোখ তুলে প্রাণপ্রিয়ার দিকে
তাকান মুখে তার হাসি চলে এসেছে। হুম বড় তো হয়েছ তাহলে একটা কাজ কর, পিছে যে জঙ্গলটা আছে তার শেষ মাথায় কয়েকটা আম গাছ দেখেছিলাম হয়তো আম ধরেছে। তুমি যদি পারো সেগুলো পেরে নিয়ে আসো, পারবে তো?
প্রাণপ্রিয়া জঙ্গলে যাওয়ার কথা শুনে এক লাফে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। আমি পারবো তুমি শুধু অপেক্ষা কর। বলেই তাড়াহুড়োর মধ্যে দৌড়ে বের হতে নিলে সেলিনা সাবধান বলতে যাবে তার আগেই প্রাণপ্রিয়া হোঁচট খেয়ে নিচে পড়ে তবে থামেনা পিছে না তাকিয়েই দৌড়।
মিসেস সেলিনা হো হো করে হেসে উঠে। নিজের কপালেই নিজেই চাটি মারে সে, জানতো এই চঞ্চল মেয়ে জঙ্গলের কথা শুনলে এক মুহূর্ত আর এখানে থাকবে না,
প্রাণপ্রিয়া বের হয়ে আশ্রমের পিছের জঙ্গলটার দিকে ছুটে যায়। বড় বড় গাছপালায় ঘেরা সবুজ জঙ্গল, প্রাণপ্রিয়ার মুখে এক চমৎকার হাসি। তার ছুটে যাওয়ার সাথে সাথে পিঠ পর্যন্ত চুলগুলো হেলে দুলে উড়ছে। পরনে হলুদ রঙের পা পর্যন্ত লম্বা গোল ফ্রক, মনে হচ্ছে জঙ্গলের ভিতরে যেন এক হলুদ রংয়ের ছোট্ট পাখি মুক্তমনে জমিনে দৌড়াচ্ছে। প্রাণপ্রিয়ার মুখে খিলখিল শব্দের হাসি জঙ্গলের চারপাশ জুড়ে, গাছের প্রতিটা পাতা যেন তাকে কয়েক দিনই চিনে গেছে কেমন তার হাসির সাথে বাতাসে নড়ছে । জঙ্গলের প্রতিটা পশুপাখি তার বন্ধু হয়ে গেছে। সে যে দৌড়াচ্ছে সাথে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিছু পাখি ছুটে চলছে, কি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। প্রাণপ্রিয়া কিছুদূর ছুটে জঙ্গলের একদম মাথায় চলে আসে কয়েকদিনে সে এই পুরো জঙ্গল মুখস্থ করে ফেলেছে। তবে এখন যে জায়গায় এসেছে এটা তার জঙ্গলের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা কারণ এই জঙ্গলের শেষে একটা বড় স্বচ্ছ ঝিল আছে।
আর ঝিলের অপর পাশে এক বিশাল বড় রাজকীয় বাড়ি, যে বাড়িতে প্রাণপ্রিয়ার মতে খুব ভালো ভালো মানুষ থাকে। যাদের এই বিশাল বড় বাড়ি তাদের বিশাল বড় মন ও আছে। আর এটা সত্যিও সে শুনেছে এটা তাদের আশ্রমের মালিক হুমায়ূন আবরার তার বাড়ি, লোকটার মন কত বড় আঙ্কেল আন্টি থেকে শুনেছে তাদের সবকিছু নাকি তিনি ই দেন কত দয়ালু। তাহলে এ বাড়ির সব মানুষই খুব দয়ালু আর খুব ভালো । প্রাণপ্রিয়া মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে ছোট মনে নানান কথা ভাবতে থাকে,, কিন্তু সে যা ভাবছে আসলেই কি তা? নতুন জীবনে মাত্র শুরুতে পা রেখেছে সে,তার সরল মনে ভাবনা বাস্তবে কি এমনই থাকবে? নাকি এই ভাবনা পাল্টে চলে আসবে শুধুই ঘৃণা,
