Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১৮

সে খলনায়ক পর্ব ১৮

সে খলনায়ক পর্ব ১৮
ফারহানা সানিয়াত

চারপাশে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ রাতে মুষলধারে বৃষ্টি সবকিছু ধুয়ে মুছে দিয়েছে। তবে সকাল হতে না হতেই সূর্যের কিরম ধরণীতে নতুন এক মনোমুগ্ধকর রূপ সৃষ্টি করছে। হালকা রোদ্র আর মৃদু বাতাস মন ছুয়ে যাওয়ার মত, প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে আশেপাশের চোখ বুলিয়ে হাতের ভেজা কাপড় ঝাঁটা দিয়ে তারের উপর মেলে দেয় আপাতত সে ছাদে ভেজা কাপড় মেলছে,, তার থেকে কিছু দূর দূরে রেলিং এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইভান দৃষ্টি সামনের স্নিগ্ধ মিষ্টি প্রাণপ্রিয়ার দিকে যার ঠোঁটের হালকা হাসি মনের ঝড় তোলার মতো, ইসস এই মেয়েটা অজান্তেই তাকে প্রেমের সাগরে ডুবিয়ে মারছে, মনে মনে ভেবে হালকা হাসে ইভান এরপর পা বাড়িয়ে প্রাণপ্রিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ই কাপড় ঝাঁটার পানি তার চোখ মুখ ভিজে যায়,,

শব্দ ‌করে হেসে ওঠে প্রাণপ্রিয়া সে ইচ্ছে করেই এমনটা করেছে‌। ইভান হাত দিয়ে পানি মুছে‌ প্রাণপ্রিয়ার খিলখিল হাসি শুনে তার হৃদয়ের ধুকপুক বেড়ে যাচ্ছে,, প্রাণপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে হেসে আবার ঝাটা মারে তবে এবার ইভান মুচকি হেসে নিজেও বালতি থেকে ভেজা কাপড় নিয়ে প্রাণপ্রিয়া দিকে ঝাটা শুরু করে ব্যাস এখানে ই দুজনের মাঝে দুষ্টুমি আর হাসাহাসি শুরু হয় যায়।
এরপর অনেকটা সময় পর,,
ছাদের সিঁড়ি দিয়ে হেলে দুলে নামছে প্রাণপ্রিয়া তার পিছে ইভান সেও হেলে দুলে নামছে তবে তার দু হাতে চারটে খালি বালতি যে গুলোতে ভেজা কাপড়চোপড় ছিল।
নিচ তলায় মোড়ায় বসে আছে সেলিনা পাশে রহমান আগের থেকে তার শরীর কিছুটা ভালো তিনি সেলিনার সাথে হালকা হেসে হেসে কথা বলছেন তবে সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ শুনে সেদিকে তাকাতেই মুখ থেকে হাসি তার চলে গিয়ে কিছুটা গম্ভীর্যতা চলে আসে। পাশে বসে সেলিনা ও খেয়াল করেন তবে তিনি হাসিমুখে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,,

__ কাপড় রোদ্রে দেওয়া শেষ?
প্রাণপ্রিয়া সাথে ইভান কাছে আসতে আসতে বলে,,
__ হ্যাঁ আন্টি,
__ আচ্ছা এখন তাহলে খেয়ে নাও বেলা অনেক ঘরিয়েছে আর সাথে ইভানকে ও,,, সেলিনা বাকি কথা বলার আগে ইভান বালতি নিচে রেখে না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে,,
__ আরে না না আন্টি আমি কিছু খাব না।
সেলিনা হালকা কপালে বাজ ফেলেন ,,কেনো খাবে না! প্রিয়া যাও তো তুমি ও খাও সাথে ‌ইভান কেও খাবার দাও, হয়তো আমরা এখানে এত ভালো ভালো পদের খাবার নেই কিন্তু খেয়ে অবশ্যই ভালো লাগবে ।
ইভান কিছুটা লজ্জা বোধ করে, এভাবে বলবেন না আন্টি আসলে আমার সত্যিই খিদে নেই,,
সাথে প্রাণপ্রিয়া ও ইভানের সাথে বলে ওঠে,,
__ আমারও খিদে নেই আন্টি আমি পরে খাবো।।
সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার কথা শুনে ধমক দিয়ে ওঠেন, কেন খাবে না? শরীরের অবস্থা দিন দিন কি বানাচ্ছো দেখেছো ৫০ কেজি ও তো মনে হয় হবে না।
__ আহা সেলিনা খিদে না লাগলে জোর করে খাওয়ার কিছু নেই মাত্র তো দুপুর হলো, রহমান পাশ থেকে বলে উঠেন,

প্রাণপ্রিয়া মাথা নিচু করে ঠোটে ঠোট চেপে আড়চোখে ইভান দেখে, ইভান ও প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকায় দুজন চোখের ইশারায় কিছু একটা বলে,,
রহমান প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকান ,, এখন না খাও কিছুক্ষণ পর খেতে হবে। না খেয়ে অসুস্থ হওয়া যাবে না দেখ না কত কষ্ট হচ্ছে আমার আর অসুস্থ হওয়ার পর কোনো কাজে হাত ও লাগাতে পারছি না কারো দেখাশোনা করতে পারছি না। সুস্থ থাকতে হবে আমাদের ঠিক আছে,,
আঙ্কেলের কথায় প্রানপ্রিয়া মাথা কাত করে,,
এরপর হাত দিয়ে ইভানের হাতে আলতো করে স্পর্শ করে বাহিরে যাওয়ার জন্য ইশারা করে,ইভান‌ও ইশারা বুঝে মিসেস সেলিনা আর রহমানকে বিদায় জানিয়ে বাহিরে চলে যায়, প্রাণপ্রিয়া ও হাসিমুখে তাদের কাজের কথা বলে বাহিরে বের হয়,,

রহমান সদর দরজার দিকে তাকিয়ে হাঁ করে শ্বাস ফেলেন,
আশ্রমের প্রতিটা বাচ্চা তার নিজ সন্তানের মত সবার জন্য তার অনেক ভালোবাসা তাদের নিয়ে সে অনেক চিন্তিত থাকেন, কিন্তু প্রাণপ্রিয়া মেয়েটা বড় তার প্রতি চিন্তা অন্যরকম , বয়সটাই মেয়েটার এমন যে কেউ কিছু একটা বলতে মুখে আটকাবে না আর সমাজে একজন আশ্রিতা মেয়ের মূল্যেই বা কি, সে অবশ্যই চায় হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়েটা সবসময় এমনই থাকুক সমাজের কালো দিকের নজর তার উপর না পড়ুক আর কারো জন্য তার চরিত্রের দাগ না লাগুক অসহায় মেয়ের লাভ কে না উঠাতে চায়।
সেলিনা রহমানকে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলেন,,

__ আমি জানি ভাইজান আপনি কি ভাবছেন, কিন্তু ইভান তেমন ছেলে না আপনিও জানেন আমিও ।
__ কিন্তু সমাজ জানে না সেলিনা, রহমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, একটা কথা মনে রাখবে অসহায় মেয়েদের লাভ যে কেউ উঠাতে পারবে। আর হ্যাঁ আমি জানি ইভান খুব ভালো ছেলে কিন্তু সমাজ দুজন কে ভালো চোখে দেখবে না কারণ দুজনের দুনিয়া আলাদা। ধরো যদি কোনদিন কিছু হয় তাহলে দোষ কার উপর পড়বে আমাদের প্রাণপ্রিয়ার উপর সবাই বলবে আশ্রমের মেয়ে ধনী ডক্টরের ছেলেকে উস্কিয়েছে,সাথে চরিত্র নিয়ে কথা বলবে মেয়েটার,কিন্তু এখানে ইভানের যে দোষ আছে কেউ দেখবে না কারন সে ধনী পরিবারের ছেলে এই সমাজে তার একটা পরিবার আছে যেখানে আমাদের প্রাণপ্রিয়া অসহায় আশ্রমের আশ্রিতা।

জঙ্গলের মাঝে পথ দিয়ে প্রাণপ্রিয়া আর ইভান হাতে বিশাল দড়ি আর কাঠের চওড়া টুকরো নিয়ে দুষ্টুমি করতে করতে ঝিলের থেকে একটু দূরে একটা গাছের নিচে গিয়ে থামে। এখানে আসার কারণ দোলনা বাধা। প্রাণপ্রিয়ার অনেক সখ এই দোলনা নিয়ে আর ইভানের আশ্রমে আসার কারণ এটাই ছিল কিন্তু ছাদে ওই কাপড় রৌদ্রে দেওয়া নিয়ে যাইহোক,,
সময় নিয়ে দুজন বিশাল গাছের ডালে সুন্দর করে দোলনা বাদে এরপর বাধা শেষ হলে খুব খুশি মনে প্রাণপ্রিয়া দোলনায় বসতেই পিছন থেকে ইভান আস্তে ধাক্কা দেওয়া শুরু করে,,
প্রাণপ্রিয়া খিল খিল করে হেসে উঠে সে দুলছে সবুজ ভেজা গাছের নিচে সামনে কিছু দূরে ঝিল সুন্দর প্রকৃতির মাঝে সে দোলনায় ঝুলছে,,আর পিছন থেকে ইভান মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে।

__ জানিস ইভান আমার জীবনে কোনো কিছু না থেকেও যা যা আছে তার জন্য আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করি,আর দোয়া করি
না থেকেও যা আছে এগুলো সারা জীবন যাতে থাকে।
ইভান মুচকি হাসে, আল্লাহ তাআলা তোর দোয়া কবুল করুক আমি এটা দোয়া করব।
প্রাণপ্রিয়া হাসি মুখে পিছে ঘুরে ইভান‌কে দেখে এরপর কিছুক্ষণের জন্য দুজন চুপ হয়ে যায় ,
অতঃপর খানিকটা সময় পার হলে,,প্রাণপ্রিয়া মিনমিন কন্ঠ শুনা যায়,,
__ একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
ইভান প্রানপ্রিয়ার পিঠে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বলে,,

__ হুম কর,
প্রাণপ্রিয়া ঢোক গিলে কিছুটা হাফসাফ করে,, একটা কথা কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি মানে তুই আমার মত আশ্রমে সাধারণ একটা ছোট মেয়ের সাথে ফ্রেন্ডশিপ কেন ক..রে..ছিস আর কি মানে,
ইভান প্রাণপ্রিয়ার কথা শুনে দোলনা আটকে
প্রানপ্রিয়ার দিকে তাকায়,,
প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখ পিটপিট করে,সে ছয় বছরের বন্ধুত্বের মধ্যে এমন কথা কখনোই জিজ্ঞেস করেনি,,
__ তুই সাধারণ কে বলেছে ইভান‌ নরম কন্ঠে বলে ওঠে, প্রাণপ্রিয়া ঘুরে তার দিকে তাকায়, আমার চোখ দিয়ে যদি নিজেকে কখনো দেখতে পারতি তাহলে তুই বুঝতি তুই কতটা অসাধারণ আর কত টা সুন্দর প্রাণোচ্ছল মনের মেয়ে যার আশ্রমে থাকা নিয়ে আমার কোনো কিছু যায় আসে না কারন সে আমার ছোট্ট বন্ধু আমার তিন বছরের ছোট বেস্ট ফ্রেন্ড যাকে আমি!!!
জীবনে সুন্দর সময় শেষ হলে খারাপ সময়ও চলে আসে ওই যে বলে না বেশি হাসলে কাঁদতেও হয়, তেমনি ই প্রাণপ্রিয়ার ক্ষেত্রেও । সেই রাতের পর এই যে আজকের দিন এরমধ্যে দামিয়ানের সাথে তার আর দেখা হয়নি,না না এটা বললে ভুল হবে সে দামিয়ানের চোখে কোনভাবেই না পড়ার জন্য এক প্রকার পালিয়ে পালিয়ে থাকছে, আর ওই রাতের ঘটনাটা ও মস্তিষ্ক থেকে ঝেড়ে ফেলে সুন্দর একটা সময় কাটাচ্ছে,, যেমন আপাতত সে দোলনায় রশির সাথে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে হয়তো ঘুমিয়েও গেছে। সাথে এখন ইভান ও নেই সে চলে গেছে অনেকক্ষণ হয়েছে বাসা থেকে তার দরকারি ফোন এসেছিল।

অন্যদিকে দামিয়ান বসার ঘরে খোলা জায়গাটার সামনে দাঁড়িয়ে ঝিলে স্বচ্ছ পানি দেখছে আর ভাবছে
ওই আশ্রিতা প্রাণপ্রিয়ার কথা যাকে সে ওই রাতের পর কেটে যাওয়া দিনগুলি মধ্যে একদিনও দেখেনি। কারন সে তার থেকে পালিয়ে থাকছে, আর এটা খুব ই‌ বিরক্ত খুব ই ,ওই মেয়ের পালিয়ে থাকা তাকে আগের থেকে বেশি আকর্ষণ আর তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। এটা খুবই হাস্যকর একটা তুচ্ছ মেয়ে তার মস্তিষ্ক জুড়ে কিন্তু এর পরিণাম কি হতে পারে ওই আশ্রিতা কি জানে! সে অবশ্যই চায় ওই মেয়েকে কিছুদিনের বিনোদন হিসাবে দেখতে তাকে তার নিজের জায়গায় রেখে। কিন্তু কামুক বাসনা! সে চায় না তার জীবনে অপ্রয়োজনীয় দাগ কিন্তু ওই মেয়ে!
__ স্যার আপনার বন্দুক, আকস্মিক পাশ থেকে বলে ।

দামিয়ান ভাবনা থেকে বের হয়ে পাশে তাকায়, তার বয়সে একজন ছেলে দাঁড়িয়ে যাকে নিকলাই চলে যাওয়ার জন্য হুমায়ূন তার সাথে রাখার জন্য দিয়েছে যাতে তার সকল প্রয়োজনীয় কাজ করাতে পারে,
__ দামিয়ান গম্ভীর মুখে ছেলেটির থেকে বন্দুক হাতে নিয়ে দেখা শুরু করে, বন্দুকটি স্বীকার করার বন্দুক। এখানে এত বছর পর আসার পর একবারও পাখি শিকারে যায়নি সে , তাই আজ ভেবেছে যাবে।
সামনে দাঁড়ানো ছেলে মানে নিলয় দামিয়ান কে জিজ্ঞেস করে,,

সে খলনায়ক পর্ব ১৭

__ স্যার আমি কি আপনার সাথে শিকারে যাব?
দামিয়ান বন্দুক দেখা থেকে চোখ তুলে তাকায় ,
__ না ছোট করে উত্তর ,
অতঃপর সে বেড় হয়ে যায় জঙ্গলের উদ্দেশ্যে।

সে খলনায়ক পর্ব ১৯