Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৩

সে খলনায়ক পর্ব ৩

সে খলনায়ক পর্ব ৩
ফারহানা সানিয়াত

জড়োসড়ো হয়ে সেলিনার পিছে দাঁড়িয়ে আছে প্রাণপ্রিয়া,, সামনে দুটো চেয়ারে হুমায়ুন আর দামিয়ান বাসা উপস্থিতি সবাই প্রাণপ্রিয়ার চিৎকারের কারণ সেলিনার থেকে শুনেছে বাচ্চা মেয়ে কি আর করার বুঝতে পারেনি, এজন্য মিসেস সেলিনা আর রহমান খুবই দুঃখিত…
হুমায়ুন আশ্রমের কিছু দরকারি কথা বলার সাথে তার পাশে দাঁড়ানো কালো সুট পড়া লোকটিকে দিয়ে একটা বড় কার্টুন বক্স প্রাণপ্রিয় জন্য দেন, বাকি বাচ্চাদের সাথে প্রাণপ্রিয়া নতুন আর বয়স বড় বলে তাকে বড় একটা উপহার দিয়েছেন,,
জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ানো প্রাণপ্রিয়া সেলিনার পিছ থেকে উঁকি মেরে বক্সটা দেখে সাথে ভীত চোখে সুদর্শন যুবক ভয়ংকর ছেলেটিকেও দেখে যে তার দিকেই খুব শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,,

আশ্রমের বিশাল বড় গেটে পার হয়ে বাঁ দিকে সোজা কিছুদূর হাঁটলেই বিশাল রাজকীয় আবরার মেনশন,, এক কথায় আবরার মেনশন পার হয়ে শান্তি নিবাস আশ্রমে যেতে হয়, কিন্তু আশ্রম থেকে আবরার মেনশন আশ্রমের জঙ্গলের পিছে, যাইহোক আশ্রম থেকে বের হয়ে হুমায়ুন আর দামিয়ান সরু পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে ধীরগতিতে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটছে তাদের পিছে কালো স্যুট পড়া লোক যিনি আসলে হুমায়ূন আবরার তার এসিস্টেন্টন,,
(তাদের তিনজনের হাঁটার মাঝে আবরার পরিবারের সম্পর্কে জানা যাক)
বাংলাদেশে নামকরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন হলেন হুমায়ূন আবরার, তাকে বাংলাদেশ কয়েকজন ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন গণনা করা হয়,, আর তার একমাত্র ছেলে দামিয়ান আবরার, তবে দামিয়ান একজন রাশিয়ান নাগরিক এর কারণ হলো হুমায়ুন আবরারের স্ত্রী ক্যাথরিন তিনি ছিলেন একজন রাশিয়ান, ব্যবসায়ী কাজে হুমায়ুন অনেক বছর রাশিয়া থাকার ফলে সেখানকার একজন ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে ক্যাথরিনের সাথে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তার বিয়ে হয়েছিল, এরপর দামিয়ানের জন্ম কিন্তু বছর দশেকের পর দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়,,

বিচ্ছেদে দুজনেরই মত ছিল আর তাদের একমাত্র ছেলেকে দুজনে ই হারাতে চাইনি তাই নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না করে দামিয়ানের ইচ্ছেমতো সে যেখানে থাকার, যা করার তার উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন তারা,, আর দামিয়ান ও খুব অল্প বয়সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে সব সময় ই রাশিয়াতে থাকবে তবে বাবার কাছেও প্রতিবছর আসবে সাথে তার জীবনের কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাবার মত ই সবার প্রথম ,, তাছাড়া হুমায়ুন আবরারের ব্যক্তিগত জীবনের পর তার পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে তার ছোট ভাই হাবিব আবরার স্ত্রী রাইমা তাদের দুজনের একমাত্র ছেলে আহনাফ,সে দামিয়ানের দু বছরের ছোট ,, বাকি তাদের সম্পর্কে গল্পের সাথে আরও জানা যাবে আপাতত তিনজন আবরার ম্যানশন এ পৌঁছে গেছেন, সাদা ফকফকে টাইলসের সিঁড়ি বেয়ে বিশাল বড় সেগুন কাঠের কারুকাজের নকশা করা সদর দরজা দিয়ে সুবিশাল বসার ঘরে ঢুকেন,, বসার ঘরে চারপাশে সুন্দর্য বোঝা যাচ্ছে হুমায়ুন সবকিছু নিয়ে কতটা যত্নশীল আর রুচিশীল,, বসার ঘরে সাদা রংয়ের সোফায় হাবিব আর তার স্ত্রী রাইমা বসে তাদের জন্য ই অপেক্ষা করছিলেন,, পাশে আরেকটা সোফায় পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে এই বাড়ির আরেক ছেলে আহানাফ,,

__ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ভাইজান ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার টেবিল সাজিয়েছি, রাইমা বাসুরের উদ্দেশ্যে বলে ব্যস্তত পায়ে কিচেনের দিকে চলে যান,,
হুমায়ুন কিছুটা পথ হাঁটার ফলে হালকা রেস্ট এর জন্য ছোট ভাইয়ের পাশে সোফায় বসেন দামিয়ান দাঁড়িয়ে নিজের‌ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে, সোফায় শুয়ে থাকা আরিয়ানের চোখ বন্ধ তবে হঠাৎ হাবিবের ধমক শুনে চট করে ওঠে বসে আশেপাশে তাকায়, ভাতিজার কাণ্ডে হুমায়ুন হালকা হেসে ফেলেন,,
আহানাফ আশেপাশে তাকিয়ে বড় বাবা আর তার চাচাতো ভাই দামিয়ানকে দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে বাবাকে বলে,, দিলে তো সাধের ঘুমটা নষ্ট করে,
হাবিব কড়া চোখে তাকায়, স্টুপিড ছেলে বড়রা বসে আছে আর তুমি মাঝখানে ঘুমিয়ে আছো এটা কি ভদ্রতা,

__ আহা হাবিব কোনো ব্যাপার না এখন বকাঝকা করো না,,
__ ভাই আপনি ওকে মাথায় তুলছেন বয়সের সাথে সব শিখতে হবে , আমাদের দামিয়ানকে দেখেন মাত্র দুই বছরের বড় কিন্তু দুজনের মধ্যে তফাৎ আকাশ‌, পাতাল,,
ছোট ভাইয়ের এই কথায় হুমায়ুন সাথে সাথে হতাশার শ্বাস ফেলেন,দামিয়ান পা বাড়িয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়‌। আহনাফ বসা থেকে উঠে একপ্রকার ভেগে যাওয়ার মত দামিয়ানের পিছে সে ও হাঁটা ধরে,, তারা যাওয়ার পর হুমায়ুন সোফায় হেলান দিয়ে বসে সে ভাবে,, তার ছেলে বিশ বছরের যুবক তবে বয়সে তুলনায় বেশ ম্যাচিউর, নিজেকে ইচ্ছে করে যেন বড় বানিয়ে রাখে পড়াশোনা দায়িত্ব আর তার বিচক্ষণ ঠান্ডা মাথার বুদ্ধি সব কিছু মিলিয়ে সব সময় সবার কাছে সে প্রশংসনীয় এর জন্য সেও খুব খুশি, কিন্তু তার কাছে আহানাফের চঞ্চলতা ‌ পছন্দের এমনটা না সে সব দিক দিয়ে পিছিয়ে তবে তার ভাতিজা তার মনের মতো,,

আশ্রমে দোতলায় বিশাল বড় একটা হলরুমের মত ঘর, যেখানে দু পাশে সারিবদ্ধ করে চারটি করে সিঙ্গেল খাট রাখা, বাচ্চাদের আকর্ষণের জন্য ঘরে নানান রঙ দিয়ে দেয়ালে কার্টুন আর্ট করা, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জন্য দেয়াল ফিট করে রাখার ব্যবস্থা আছে যাতে বাচ্চাদের নিজে থেকে কোনো কিছু নিতে সমস্যা না হয় সব থেকে আকর্ষণীয় হলো এই ঘরের দুটি বিশাল বড় বড় জানালা যেটা দিয়ে সামনের উঠান আর জঙ্গল দেখা যায় , আর জঙ্গল দেখা যায় জানালার পাশে একটা সিঙ্গেল খাট প্রাণপ্রিয়ার জন্য সেলিনা ঠিক করে দিয়েছিলেন যেদিন সে প্রথম এসেছিল যাইহোক, ‌
এখন প্রাণপ্রিয়া নিজ সিঙ্গেল খাটে বসে আছে, তার পাশের খাটগুলোতে ‌ বাচ্চারা দুপুরের খাবার খেয়ে এখন ঘুম, তবে তার চোখ দুটো জানালার বাহিরে, দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস নেই, তাই বাহিরে তাকিয়ে ভাবছে কি করবে খুবই বোরিং সময় লাগছে এখন তাই বাইরের তাকিয়ে হা করে শ্বাস ফেলে,, এরপর এভাবেই কেটে যায় কিছু সময় অতঃপর.…

নাহ আর ভালো লাগছে না এবার, বাহিরে যাওয়া উচিত কিন্তু আন্টি যদি বকা দেয়, ভেবেই কিছুক্ষণের জন্য প্রাণপ্রিয়া থেমে যায় অতঃপর ফের ভাবে কোনো ব্যাপার না খেলাম না হয় একটু বোকা, ভাবনা অনুযায়ী ‌ খাট থেকে নেমে পড়ে প্রাণপ্রিয়া, আর স্লিপার জুতোটা পড়তে থাকে তখনই চোখ যায় তার খাটের নিচে বক্সের দিকে,, যে বক্সটা উপহার হিসেবে বড় সাহেব তাকে দিয়েছিল,,ব্যস এখানেই বাইরে যাওয়ার ভাবনা শেষ সে কপাল হালকা গুটিয়ে ‌ খাটের নিচ থেকে বড় কার্টুন বক্সটা বের করে এরপর প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে সেটা খুলতে থাকে,, বক্সটা অনেকগুলো কসটিপ দিয়ে লাগানো তাই খুলতে একটু সময় লাগছে ছোট মেয়েটার তবে যখন বক্সটা খুলে তোর চোখ দুটো খুশিতে চকচক করা শুরু করে সাথে ঠোঁটের কোনে হাসি ,, বক্সের ভেতর তার প্রয়োজনীয় জামা কাপড় পরিপাটি থাকার কিছু সামগ্রী আর সব থেকে খুশি হয় বক্সে তার জন্য ড্রইং খাতা আর অনেক অনেক রং পেন্সিল রাখা, যেগুলো ছোট ‌প্রাণপ্রিয়ার খুবই শখের কারন সে ড্রইং করতে খুবই ভালোবাসে,,
সাথে সাথে সে বক্স থেকে ড্রইং খাতা, রং পেন্সিল গুলো বের করে খুশি মনে সবকিছু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে……

দুপুর সময় পার হয়ে বিকেল গ্রীষ্মের উত্তপ্ত সূর্যের তাপ কমে এসেছে, বাহিরে এখন মৃদু বাতাস গাছ গাছালিতে পাখির কিচিরমিচির শব্দ এমন সুন্দর পরিবেশে আবরার ম্যানশনের গার্ডেনে চায়ের আসর জমেছে, বাড়ির সকলে উপস্থিত, বেতের সোফায় সবাই আয়েশ ভঙ্গিতে বসা,,হুমায়ুন চায়ের কাপে ঠোট ছোঁয়ান তার পাশে হাবিব, রাইমা কাপে চা ঢালছে বরাবর আহনাফ আর দামিয়ান দুজন কোনো ব্যাপার নিয়ে তারা কথা বলছে,, হুমায়ূন হাতের কাপটা টেবিলে রাখে‌ন ,,
__ তুমি কি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছো তাই করবে? ছেলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন হুমায়ুন,,দামিয়ান আহনাফ থেকে চোখ ঘুরে বাবার দিকে তাকায়,,
__ হ্যাঁ, তার ছোট করে উত্তর,
__ তোমার সকল সিদ্ধান্তে আমার সব সময় মত আছে, এটাতেও থাকবে ‌ কিন্তু তুমি এখনো বয়সে খুব ছোট তুমি কি পারবে পড়াশুনার সাথে তোমার নানার ব্যবসায় ও মনোযোগী হতে,,পাশ থেকে হাবিবও বড় ভাইজানের কথা একই কথা বলেন,,
দামিয়ান চায়ের কাপে ঠোঁটে ছোঁয়ায়,,পারবো মম বলেছে সবকিছুতে আমাকে সাহায্য করবে,,,
হুমায়ুন ছেলের কথায় মাথা নাড়ান,, হুম অবশ্য তোমার মম যখন তোমাকে এই বয়সে দায়িত্ব দিচ্ছে কিছু একটা ভেবেই দিচ্ছে কিন্তু খেয়াল রাখবে তোমার পড়াশুনা কোনো কিছুতে যাতে প্রভাব না পড়ে,,

__ তাহলে কি দামিয়ান বাংলাদেশ এখন আর আসতে পারবে না, কারণ সবকিছু নিয়ে তো ব্যস্ত হয়ে পড়বে,, হাবিব বলে ওঠে,
__ হ্যাঁ আপাতত কয়েক বছরের জন্য আসতে পারবো না, সেখানে থেকে ব্যবসা পুরোপুরি ভাবে বুঝতে হবে এ ব্যাপারে মম আমাকে রিকোয়েস্ট করেছে,,

সে খলনায়ক পর্ব ২

হুমায়ুন কিছুটা চিন্তিত মুখে দামিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে, ক্যাথরিনের বাবা এক বছর আগে মারা গেছেন হুমায়ুন এটা শোনার পর ক্যাথরিনের সাথে কথা বলেছিলেন এরপর সবকিছু ক্যাথরিন ই সামলাচ্ছে কিন্তু হঠাৎ এত অল্প বয়সে ছেলেকে ব্যবসায় জড়ানো অবশ্যই কোনো কারণ আছে যাইহোক এ ব্যাপারে মাথা ঘামানো ঠিক হবে না কারণ ক্যাথরিন খুবই দায়িত্বশীল আর যত্নশীল একজন মা সে যা করবে ভালোর জন্য ই করবে,,

সে খলনায়ক পর্ব ৪