সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৪
মৃধা মৌনি
রাতভর ক্লান্তির পরে দীক্ষা ঠিক মনে করতে পারল না কখন বিছানায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। দেহের উপর ভারি ক্লান্তি আর মাথার ভেতরে জমাট বিষণ্নতার দমবন্ধ অনুভব- সব মিলেমিশে ঘুমটা হল অচেতন ধরনের।
ঘরটা তখন ভিজে নরম সকালবেলার আলোয় ভরে গেছে। জানালার কাপড় ফাঁক দিয়ে ডাঙায় উঠা আলো সরু রেখা টেনে পড়েছে মাটিতে। ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে- দীক্ষার চোখ যেই খুলল, প্রথমেই তার কান ভরে এল কাপড় ভাঁজ করার ক্ষীণ সশব্দ “ফোস ফোস” আওয়াজ।
বিছানার পায়ের দিকে বসে আছে বকুল। পাতলা খয়েরি চুল গুছিয়ে ক্লিপে তোলা, মুখে হালকা ভাজ, চোখে চিন্তার ঝিলিক। সে বেশ কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে ভাঁজ করায় ব্যস্ত।
বকুল হালকা মাথা ঘুরিয়ে বলল,
—“উঠলে? এই দশটা বাজতেছে। ওঠো, মুখ ধুয়ে নাও, নাশতা খাবে। এরপর ওষুধ আছে।”
দীক্ষা চোখ দুটো একটু কচলাল, আবার চাদর টেনে মুখ ঢেকে রাখতে চাইল।
—“ক্ষিদে নাই আমার।”
স্বরে ক্লান্তি, মুখে বিষণ্নতার ভারী ছায়া- যেন কিছু বলার শক্তি অবশিষ্ট নেই তার ভেতরে।
বকুল কাপড় ভাঁজ থামিয়ে দীক্ষার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ সে কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল- তারপর ধীরে ধীরে উঠে এসে বিছানার পাশে বসে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—“আপা… এভাবে মুখ গোমড়া করে শুয়ে থাকলে চলবে? জীবনে যা হয়, ভালোর জন্যেই হয়। ভুল মানুষ সবার জীবনেই তো আসে। তুমি কেন এত চিন্তা করে মন খারাপ করছ? তুমি যা করেছ একদম ভালো করেছ। আমি হলে আরও দুই চারটা চ ড় থা প্প ড় বেশি দিয়ে আসতাম। ওই মানুষটা তোমার যোগ্যই না আপা।”
দীক্ষা কেমন যেন গুটিয়ে গেল কথাগুলো শুনে। চোখের কোণে জমে থাকা ব্যথা একটু নড়ে উঠল।
কিন্তু শেষ লাইনটা শুনে হালকা রাগে গলা কাঁপিয়ে বলল,
—“তুই খুব বুঝিস না? এত জ্ঞান দিচ্ছিস কেন?”
বকুল এবার সত্যি সত্যি রাগ দেখাল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“হ্যাঁ, তোমার চেয়ে ভালোই বুঝি! না খেয়ে জেদ ধরার বয়স এখন তোমার আছে নাকি? নিজেরে তো পাত্তা দিচ্ছো না, কিন্তু পেটে যে আছে, তারেও পাত্তা দিচ্ছো না! উলটো আমাকে আবার রাগ দেখাচ্ছ!”
দীক্ষা চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট কাঁপল একটু। সে কিছু বলতে গেল কিন্তু গলা আটকে এলো যেন।
বকুল আর সময় নষ্ট করল না। হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে কঠিন গলায় বলল,
—“চলো। উঠে দাঁড়াও। বাথরুমে যাও। মুখ ধুয়ে এসো। একদম দাঁড়িয়ে থাকবে না, হাঁটো আপা..”
দীক্ষা আপত্তি জানাতে চাইল,
—“বকুল ছাড়… মাথাটা ধরছে…”
—“চুপ! তোমার জেদ আমায় বুঝাবা না। চলো।”
বকুলের গলা কঠিন, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত স্নেহ মাখানো।
জোর করে দীক্ষার হাত ধরে তাকে বিছানা থেকে নামিয়ে দিল। দীক্ষা অনিচ্ছায় হলেও উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হল। তার পা একটু কেঁপে উঠল।
বকুল আবার বলল,
— “শোনো, দিমাগ ঠাণ্ডা রাখো। যা চলে গেছে, তারে নিয়ে এই ঘর অন্ধকার করো না। তুমি একা না—আমরা আছি। আর তোমার ভেতরে যে নতুন জীবন, তাকে নিয়েই ভাবো এখন থেকে। সেই তোমার শক্তি, তোমার একমাত্র আপনজন।”
দীক্ষার চোখ ভিজে উঠল সহসাই। বকুলের গলার দৃঢ়তা, তার হাতের টান- সব মিলিয়ে বুকের ভেতরের জমাট কষ্টটা যেন একটু নরম হয়ে এল।
—“চলো আপা, ফ্রেশ হবে।”
বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় দীক্ষার মুখে একটু ধোয়া-জলের সজীবতা দেখা গেলেও চোখের কোণে সেই মলিন ছায়া রয়ে গেছে। বকুল তোয়ালে নিয়ে এগিয়ে দিল।
—“চলো, ঘরে যাও। আমি চা-নাশতা আনি।”
বকুলের গলায় একটু কোমল সুর, একটু আদেশ। আজ যেন সে দীক্ষার বড় বোন সেজেছে। দীক্ষা খুব উপভোগ করল ব্যাপারটাকে। সেমাথা নেড়ে বলল,
—“না… ঘরে না। আমি পুকুর ঘাটে বসি। সেখানে এনে দিস।”
বকুল একদম চুপ হয়ে গেল। সে দীক্ষার মুখের দিকে তাকাল- কেমন যেন গভীর নিস্তব্ধতা জমে আছে দীক্ষার চোখে। কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু বলল,
—“ঠিক আছে। তুমি বস। আমি নিয়ে আসছি।”
তারপর নীরবে ফিরে গেল ভেতরের ঘরের দিকে।
পুকুরের পাশে পৌঁছাতেই গায়ের ভেতর কেমন একটা প্রশান্ত হাওয়া বয়ে গেল দীক্ষার। সকালের আলো পানির ওপর পড়েছে চকচকে রুপোলি ছিটে হয়ে। আজ ঘাটের ধারে জাল ফেলা হয়েছে।
কাজল কোমর বাঁধা কাপড় তুলে জাল টেনে তুলছে। তার মনোযোগ পুরোপুরি জালে আটকে থাকা মাছের নড়াচড়ায়।
এক পাশে শান্ত গাছের গুঁড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট ঠোঁটে, কিন্তু চোখ অন্যদিকে- যেন বহুদূরের জলের প্রতিফলনে। আরও দুই-তিনজন ছেলে-মেয়ে আগ্রহ নিয়ে মাছ ধরা দেখছে।
দীক্ষা এগোতেই শান্ত প্রথমেই তাকে দেখে ফেলল। চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল তার। হাতের সিগারেটটা এভাবে লুকাতে গেল যে তৎক্ষণাত গরম ছাই তার আঙুল ছুঁয়ে গেল।
চোখের পাতা পর্যন্ত নড়ল না। মুখ কুঁচকাল না।
শুধু খুব নিঃশব্দে সিগারেটটা পেছনে সরিয়ে রাখল- যেন দীক্ষার সামনে ধোঁয়া যাওয়াটাই অপরাধ।
দীক্ষার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল তাই দেখে, অনেকক্ষণ পর- একটা সম্পূর্ণ নীরব, তবু মর্মভেদী হাসি।
সে ধীরে বলল,
—“আপনি সিগারেট খেতে পারেন… আমার অসুবিধা নেই। আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় অভ্যস্ত।”
শান্ত একটু থমকাল। চোখে লুকোনো বিস্ময়ের ঝলক দু’সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হলো না- জলের ওপর পড়ে থাকা রোদের মতন ক্ষণিকের নরম আলোর ঢেউ। তারপরই সে ধীরে ধীরে হাত তুলে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিল। ভরাট স্বরে কথা চালালো।
—“কবে এলেন?”
দীক্ষা হালকা অন্যমনস্ক গলায় বলল,
—“এই তো রাতেই।”
—“ভাবলাম… চলে গেছেন একবারেই।”
দীক্ষা শান্তর চোখে চোখ ফেলে বলে উঠল,
—“কেন, গেলে কি খুশি হতেন নাকি?”
শান্ত অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে। খুকখুক করে কেশে অস্থির হাতে সিগারেট টা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল। দীক্ষা ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। ছেলেটা আজব রকম সরল! আজকাল এমন মানুষ থাকে নাকি!
ঠিক সেই সময়ে কাজল বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে বলল,
—“ভাই, এই জালের মাছ গুলা ছাড়ান, আমি আরেকটা উঠাই। আজ ভালোই মাছ পড়ছে।”
বলেই আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
শান্ত নিচু হয়ে জাল থেকে খুব আলগোছে মাছ ছাড়াতে লাগল। রুইয়ের পোনা, দুটো তেলাপিয়া, চারটে শিং, আর কিছু পাঁচমিশালি ছোট মাছ- জালটায় যেন জীবন্ত রঙতরঙ্গ তৈরি করেছে। দীক্ষাও মাথা উবু করে মন দিয়ে খেয়াল করছে। হঠাৎই বলে উঠল ওই অবস্থা থেকেই,
—“বললেন না তো… আমি না আসলে আপনি খুশি হতেন?”
শান্ত বিব্রত হাসিতে ঠোঁট বাঁকাল,
—“আমি কি তা বলছি?”
—“তাহলে ভাবলেন কেন, আমি চলে গেছি?”
—“আপনার স্বামীর ঘর ওখানে… তাই ভাবলাম বেড়াতে এসে গিয়েছিলেন, কাজকর্ম শেষ হলে চলে গেছেন। এটা ভাবায় কি অন্যায় হলো?”
দীক্ষা চোখ পাঁকাল,
—“ন্যায়–অন্যায়ের প্রশ্ন না। আমি জানতে চাচ্ছি… এত ভাবলেন কেন?”
শান্ত থমকে উঠল। গলায় অজানা খসখসানি।
—“ভাবতে নিষেধ করছেন?”
—“হ্যাঁ। সবকিছু নিয়ে এত ভাবতে নেই। এতে মাথা গরম হয়, মানুষ উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেরই ক্ষতি হয়।”
শান্ত চোখ ফিরিয়ে নিল। হাতের কাজে মন দিলেও মনে যেন ঢেউ খেলে গেল। দীক্ষা বুঝে ফেলেছে? নাকি সে সত্যিই এমনই তীক্ষ্ণদৃষ্টি? নারী মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া কি এত সহজ? পুরুষের চোখ দুইটা… আর এদের যেন ছত্রিশটা!
শান্ত হালকা শ্বাস ফেলতেই পাশে এসে দাঁড়াল বকুল।
—“আপা, তোমার নাশতা।”
ট্রেতে রুটি, সবজি ভাজি, সেমাই আর পানি। বকুল সঙ্গে করে পিড়ি বাড়িয়ে দিল। দীক্ষা বিরক্ত–হাসিতে বলল,
—“এত কিছু কেন? একটা রুটিতেই চলে যেতো।”
তা শুনে বকুল ভ্রু কুঁচকালো,
—“গতকাল দুপুরেও কিছু খাওনি, রাতে কেক আর কলা… এখনো কম খেলে চলে? তোমার পুচকি তো পরে আমাদের সবাইকে ধরবে। বলবে ওর মাকে আমরা না খাইয়ে রেখেছি, ওকেও ক্ষুধায় কাতর করেছি। না বাবা, অত অভিযোগ নিতে পারব না।”
দীক্ষা হেসেই দিল।
—“তোরা সবাই ধরে নিয়েছিস আমার মেয়ে হবে। মামীও একই কথা বলে!”
—“হবে। মা যখন বলে, তখন হয়। নব্বই ভাগ সময় ঠিক থাকে উনার কথা।”
—“আমার বেলায় ভুলও হতে পারে।”
—“কেন হবে? আচ্ছা, আপা, তুমি কি মেয়ে চাও না? ছেলেই পছন্দ?”
দীক্ষার চোখে এক ঝলক জল চকচক খেলল।
গলা নরম হয়ে এল,
—“নারী ললাটের লিখন নিয়ে আমার ভয় হয় রে বকুল… তাই মনে হয় ছেলে হলেই ভালো।”
বকুল কিছু বলার আগেই শান্তর ভারী গলা শোনা গেল,
—“সব মানুষের জীবন তো এক রকম না। হাতের পাঁচ আঙুল সমান না। আর সব পুরুষও এক হয় না।”
দু’জনেই তাকাল শান্তর দিকে।
সে অপ্রস্তুত হয়ে কাজ থামালো,
—“সরি… আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে ঢুকে পড়ছি বোধহয়। আপনি যা বললেন, তাই মনে হলো…”
দীক্ষা শান্তভাবেই রিয়েক্ট করল,
—“ইটস ওকে। কিছু মনে করিনি।”
বকুল এবার বলল,
—“কথা কিন্তু ঠিকই বলেছে ভাইয়া। তোমার সাথে যা হয়েছে তাই ভয় পাচ্ছ? তুমি কি চাও, তোমার ছেলে কারও সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করুক?”
দীক্ষা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—“কখনো না। করলে… জ্যা-ন্ত পুতে ফেলব।”
বকুল মাথা নাড়ল,
—“বলা সহজ, তবে কাজটা কঠিন। যাই হোক, ছেলে- মেয়ে যেটাই হোক, সুস্থ হোক, ভালো মানুষ হোক—এইটুকুই দোয়া।”
শিশির বাইরে বেরিয়েছে- কাজের খোঁজে। একটা জব ইন্টারভিউ আছে নাকি, তৃণাকে তাই বলে গেছে। ও দাঁড়িয়ে আছে ছাদের কোণে। একা একা কিছুই ভালো লাগছে না। অন্যান্য দিন এ জায়গাটায় এসে দাঁড়ালে মন খানিকটা শান্ত হয় উড়ো মেঘের ভেলা দেখে, আজ তাও হচ্ছে না। একরকম অশান্তি অস্থিরতা জেঁকে বসেছে মনে। কেন, কে জানে!
বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে আর কিছু বলেনি শিশির। তৃণাও বেশি জোর দেখাতে পারেনি। আজকাল এমনিতেই তার মেজাজ খারাপ থাকে ভীষণ, গতকাল নিজের বাড়ি থেকে ফিরার পথে সেই মেজাজ সপ্তমে চড়েছিল। ফোলা চোখ মুখ আর লাল বর্ণ হয়ে যাওয়া গাল দেখেই তৃণা বুঝেছিল, এক চোট মা র পি ট করে এসেছে। সেও আর ঘাটায়নি পরে। কি দরকার যেচেপড়ে ঝামেলা বাঁধাতে যাওয়ার?
তবে তৃণার টাকা দরকার। কিছু দরকারী জিনিসপত্র প্রয়োজন। শিশির তো তাকে কখনো জিজ্ঞেস ও করে না, কিছু লাগবে কিনা। তৃণা যেচেপড়ে কত বলবে? বাবা থাকতে কোনোদিন এত হিসেব কষতে হয়নি। মা রা যাওয়ার পরেও অভাববোধ করেনি। মা তো প্রতিমাসেই টাকা পাঠাতো, দীক্ষাও আলাদা করে টাকা দিতো। মাসের শুরুতেই একটা এমাউন্ট হাত খরচের নামে দিয়ে রাখত। আর এখন কিনা দশ টাকার ফুচকা খেতে মনে চাইলেও নিজেকে সংবরণ করতে হয়। কত খারাপ দিন এসেছে, হাহ!
তৃণা মনে মনে ভাবল, একটা টিউশন পেলে ভালো হতো। অন্তত নিজের হাত খরচ টা চালিয়ে নেওয়া যেতো, শিশিরের কাছে হাত পাততে হতো না প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু এই নতুন এলাকায়- টিউশন পাওয়া এত সহজ নয়। ছোট কোনো চাকরি টাকরি… ধুর, কিসব ভাবছে তৃণা! নিজেই নিজেকে ধমকে উঠল। মাত্র কলেজ পড়ছে সে। এই অবস্থায় কে চাকরি দেবে তাকে! চাকরির বাজার কি এতই সস্তা? কি যে করি…
অস্থিরতায় দিশেহারা বোধ করে তৃণা। হঠাৎ করেই নজরে পড়ে সহেলির ঘরখানা। তাকে কি একবার বলা যায় না? এই এলাকায় অনেক বছর ধরে থাকছে তারা, নিশ্চয়ই চেনাজানা আছে। যদি সাহায্য পাওয়া যায়….
তৃণা সব সময়ের মতোই নক না করেই রুমে ঢুকে পড়ে থমকে গেল। চোখে প্রথম ধাক্কাটা লাগল হাসিব ভাইয়ের খালি গায়ে এলিয়ে শোওয়া ভঙ্গিতে—হাত-পা ছড়িয়ে বিছানার ওপর গা এলিয়ে রেখেছেন, টেলিভিশনের নীল আলো তার রোমশ বুক জুড়ে পড়ে চকচক করছে। তৃণার মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠল- পাকা টমেটোর মতো।
হাসিব ভাইও খানিকটা চমকে উঠে তাকালেন, তারপরই হেসে গা ঝেড়ে নিলেন অস্বস্তি।
তৃণা তোতলানো গলায় বলল,
—“সরি সরি… আমি ভাবছিলাম আপা…”
হাসিব হাত তুলেই আশ্বস্ত করলেন,
—“আরেহ, কোনো ব্যাপারই না। ভেতরে আসো। কিছু লাগলে নিয়া যাও।”
তৃণা দরজার ফ্রেমে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইল- একা একা কেমন যেন অস্বস্তি তার।
—“না না… কিছু লাগবে না। আপা কই?”
হাসিব গা চুলকে হেসে বললেন,
—“সে কি আর ঘরে থাকনের মানুষ! কাম শেষ করলেই দৌড় দেয়। আমার দিকে কবে খোঁজ রাখে!”
তৃণা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল,
—“আপা তো বরং সবসময়ই আপনার প্রশংসাই করে, ভাইয়া… আপনারে নিয়ে কত কিছুই বলে।”
এবার হাসিব উঠে বসে গলা বাড়িয়ে দিলেন, চোখে কৌতূহলের ঝিলিক,
—“তাই নাকি? কী বলে শুনি… বদনাম নাকি?”
—“এইসব না… ভালোই বলে। অনেক ভালোবাসে আপনাকে।”
হাসিব চুনকি হাসি হাসলেন,
—“আচ্ছা, আসো ভেতরে। বাইরে দাঁড়াই আছো ক্যান? শরম করতে হবে না। আর শিশির ভায়ে কই?”
—“কাজের খোঁজে বাইরে গেছে।”
হাসিব বিরক্তির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন,
—“কত কইলাম আমার সাথে যাইতে! নতুন প্রজেক্টের কাম নিছি। হেল্পার হলেও দিন শেষে আটশো টাকা। নতুনদের ছয়শো দেই, কিন্তু শিশির ভায়ে পরিচিত মানুষ দেইখা আটশো ধরছিলাম… তাও আইলো না, খবরও দিলো না!”
তৃণা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
—“আপনার কাছে কি শুধু ছেলেদের কাজ থাকে, ভাইয়া? মেয়েদের জন্য কিছু নাই?”
হাসিব ধীর হাসি হাসলেন,
—“ক্যান, তোমার লাগবো নি?”
তৃণা লাজুক হেসে মাথা নাড়ালো,
—“থাকলে বলেন তো… সত্যি জানতে ইচ্ছা করছে।”
হাসিব লাইটার টিপে সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়াটা ছুড়ে দিলেন ঠিক তৃণার মুখের দিকে। চোখে জ্বালা ধরলেও তৃণা কিছু বলল না, চেপে গেল নিঃশব্দে। হাসিব খিকখিক করে উঠলেন, যেন তার অস্বস্তি উপভোগ করছে।
কিছুক্ষণ পর গম্ভীর স্বরে বললেন,
—“দেখো, পোলা-মাইয়া সবাইরে আমি কাজ দেই। কিন্তু মাইয়াদের কাজটা ব্যক্তিগত কাম। এডা সবাই পারে না।”
তৃণার কৌতূহল আরও ঘনীভূত হলো।
—“ব্যক্তিগত মানে? বেতন কত?”
হাসিব ধীরে ধীরে বললেন,
—“মাস গেলে দশ পনেরো হাজার কোনোটাই ব্যাপার না। যত কাজ তত টাকা। আমার সেট করা কিছু মাইয়া মাসে তিরিশও কামাইছে।”
তৃণার মাথা যেন চক্কর খেল—এত টাকা! জীবনে কখনো একসাথে দেখেওনি। সে গলা নিচু করল,
—“ভাইয়া… কী কাজ? আমাকে বলেন না… আমি আগ্রহী।”
হাসিব চোখ সরু করলেন,
—“উঁহু, তুমি পারবা না।”
—“পারব! প্লিজ বলেন।”
—“অনেক কষ্টের কাজ।”
—“হলেও করবো।”
হাসিব এবার দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে তাকে ওপর নিচে দেখে রহস্যময় হাসলেন।
—“মানুষ চিনতে ভুল হয় না আমার। তুমি কোন দিকের মানুষ- আগেই বুঝছিলাম। ঠিক আছে, তোমারে দিয়াই হবে। কিন্তু শর্ত একটাই… তোমার আপা বা তোমার জামাই- কেউ এই ব্যাপারে জানবো না।”
তৃণার শরীরে হালকা স্রোতের মতো ভয় বয়ে গেল এবার।
—“জানলে কী হবে?”
হাসিব চোখ পাকালেন,
—“তোমার আপা জানলে ভাববো- আমি যেন খারাপ কিছু করাই। আর তোমার জামাইরে বললে তো তোমারই লস। একসময় সে ঘরে বসে খাইবো, আর তোমারে দিয়া কামাইবো। তারচেয়ে তুমি কামাও, টাকা গুছাইবা নিজের হাতে।”
বাক্যগুলো অদ্ভুতভাবে তৃণার মাথায় গেঁথে গেল। কিছুটা যুক্তিও খুঁজে পেল সে।
—“ঠিক আছে… কাউকে বলব না।”
হাসিব তৃপ্তির হাসি দিলেন,
—“হইল। কাল সকালেই তৈরি থাকবা। আমি নিয়ে যামু।”
তৃণা ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এসে দাঁড়াতেই মনে হলো বুকের ভেতর কতগুলো রঙিন প্রজাপতি উড়ছে- পনেরো হাজার! জীবনটাই পাল্টে যেতে পারে। মাথায় দ্রুত হিসাব কষতে লাগল সে।
প্রথম মাসেই গাঢ় সবুজ থ্রিপিসটা কিনবে, যেটা বহুদিন ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে আসছে। পাঁচ হাজার দিয়ে নিজের জন্য মার্কেট, ঘোরাফেরা, খাওয়া-দাওয়া সব হবে। বাকিটা ব্যাংকে জমাবে। কালকেই একটা অ্যাকাউন্ট খোলা লাগবে- হাসিব ভাইকে নিয়ে গেলে দ্রুতই হয়ে যাবে।
ভবিষ্যতের চকচকে স্বপ্নে মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা যেন একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করেছে এবারে… তবে সে জানে না, এই উজ্জ্বলতার পেছনেই অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে নিষ্ঠুর ভাবে….
সন্ধ্যার আলোটা আজ যেন শিশিরের জন্য আরও একটু নিস্তেজ, আরও একটু ধূসর। ব্যর্থতার ভার মাথায় চাপা পড়ে আছে। চাপা রোদে পুড়ে যাওয়া লোহার মতো গরম, ভারী। রাস্তার ধারে একটা পুরনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সে সিগারেটটা ধরাল। আগুনের ছোট্ট ঝলকটাও তাকে আজ সান্ত্বনা দিলো না।
আজকের ইন্টারভিউটা আশাভঙ্গের চেয়েও বেশি কিছু- একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। এমনিতেই কোম্পানিটা খুব বড় কিছু না, একটা ঝানু-মানু সেলস চাকরি, তাও ঠিকমতো মুখ ফুটে বলা হয়নি। প্রশ্নের পর প্রশ্নে গুলিয়ে গেছে, কথার দড়ি ধরে রাখতে পারেনি।
স্যালারিও তেমন কিছু না- তবু মাস শেষে ক’টা টাকা হাতে আসত, দমফাটা বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত না এতটা অসহায় হয়ে। তৃণাকে বিয়ে করবে, সংসারটাকে মানুষ করবে, জীবনটাকে নিজের হাতে গোছাবে— এসব ভাবলেই বুকের ভেতর চাপ চাপ শ্বাস জমে ওঠে। এই শহরে যারা তাকে কোনোদিন পাত্তা দেয়নি, আজ যারা তাকে বুকে কালি মেখে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে- একদিন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়ার মতো কথা বলতে হবে। প্রমাণ করতে হবে সে পারে।
কিন্তু আজকের দিনটা তাকে ভেঙে দিয়েছে।
শিশির ধোঁয়াটা ছুড়ে দিল আকাশে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা যেন ধোঁয়ার সঙ্গেই মিলিয়ে যাবে- এ রকমই একটা আকালচিন্তা তার।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক কণ্ঠস্বর,
—“এই রে, শিশির! তুই?”
শিশির ঘুরে তাকাতেই দেখল মকবুল ভাই। আগের অফিসের কলিগ। খুব ঘনিষ্ঠ না, তবে ভালো মানুষ, পরিচয়ের টানটা এখনও আছে। মুখে মৃদু অবাক ভাব নিয়ে এগিয়ে এলেন।
—“এদিকে ক্যান? অনেকদিন তো দেখা নাই!”
শিশির জোর করে হাসল, চোখের ক্লান্তি যেন লুকোনোর চেষ্টা করছে।
—“এইতো আসছিলাম একটা কাজে… ইন্টারভিউ দিয়ে আসলাম। ভালো যায় নাই।”
মকবুল ভাই সামনে এসে দাঁড়ালেন, চোখে সামান্য সহানুভূতির রেখা উঁকি দিয়ে গেল।
—“তোর কথা প্রায় মনে পড়ে। অনেকের সঙ্গে আলোচনা ও হয়। আসলে যা হইছে তা উচিত হয় নাই একদমই। তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে এভাবে অফিস থেকে বের করে দেওয়া… সবটা তোর ভাইয়ের চাল ছিল বুঝছিস। তার ওই রিপোর্ট করাতেই.. আবার নাকি বসের কাছে পার্সোনালি গিয়েও বলে আসছে। তোকে ঘরে ফেরাতে এসব করছে। আমি বুঝলাম না, তুই কার সাথে থাকবি না থাকবি, এইটা তো তোর ব্যক্তিগত চয়েজ, না রে? এখানে জনে জনে সবাই ক্যান জড়াবে?”
শিশির কিছুই বলল না। মকবুল এক মুহূর্তেই বুঝে গেলেন, শিশিরের আজকের দিনটা খুব খারাপ গেছে।
মকবুল ধীরে বললেন,
—“চল, বসি সামান্য। শোনাই তো- মানুষ একটা দরজা বন্ধ হলে অন্যটা খোলে… তুই হয়তো দেখতে পাচ্ছিস না এখন। তাই বলে এত ভেঙে পড়িস না।”
শিশির সিগারেটের ঠোঁট টিপে নিভিয়ে দিল। বুক ভরা পরাজয়, আর চোখের ভেতর তবুও বেঁচে থাকা একটুখানি জেদ নিয়ে সে এগিয়ে চলল মকবুলের পাছে পাছে।
চায়ের দোকানের পেছনের অল্প আলো-অন্ধকার কোণে দু’জন মুখোমুখি বসে আছে। চারপাশে দোকানি কেটলিতে চা গরম করছে, দূরে ট্রাফিকের আওয়াজ ভাসছে- কিন্তু শিশিরের কানে কিছুই ঢুকছে না যেন। মাথার ভেতর আজ শুধু ব্যর্থতার আঁধার আর দায়িত্বের ভার।
মকবুল ভাই ধীরে ধীরে কথার জাল ফেলতে শুরু করলেন।
—“দেখ, তোর মতো হালকা-পাতলা চাকরির পিছনে দৌড়ানোর দিন শেষ। এখনকার বাজার বুঝলি? তুই এভাবে চললে হবে না। সংসার করবি, বউ-পোলাপান হবে… তাদের মুখের দিকে তাকাতে হবে না? অল্প ইনকামে আজকাল কি হয়? আমার দ্যাখ, স্যালারি তো খারাপ পাই না, তাও ওতে আমার দশ – পনেরো দিন চলে।”
শিশির দৃষ্টি নামিয়ে রাখল। হাতের আঙুলে সিগারেটটাকে পাকিয়ে ধরে আছে কিন্তু টানার শক্তিটুকুও নেই।
মকবুল কাছে ঝুঁকে এলেন, কণ্ঠটা একটু নিচু, রহস্যময়,
—“একটা কাজ আছে। ভালো কাজ না, কিন্তু টাকা খুব ভালো।”
শিশিরের শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা শিহরণ গেল।
—“ভালো কাজ না মানে… কী রকম?”
মকবুল ঠোঁটে একটা হালকা হাসি টেনে বললেন,
—“তুই যা ভাবছিস, তেমন ভয়ানক কিছু না। অনেকগুলো পক্ষ আছে—বড় লোক, বড় খেলোয়াড়। তাদের মালামাল ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আনাজপাতি না, ইলেকট্রোনিকস না- ধর, একটু অন্যরকম মাল। বুঝছিস?”
শিশির গভীর শ্বাস নিল।
মকবুল বলেই চলেছেন,
—“কাজটা আসলে ডেলিভারি… কিন্তু ঠিক সেই ডেলিভারি না, যা সবাই করে। লোক লাগে বিশ্বস্ত। সাহস লাগে। আর তুই… তোর চোখে যে ক্ষুধাটা দেখলাম, দুঃখটা দেখলাম, এই লোকজন এইটাই চায়। তোকে দিয়ে হবে।”
শিশির নড়েচড়ে বসল।
তার ভেতরে একটা নীরব যুদ্ধ সমানে চলছে।
মকবুল এবার আরও সরাসরি বললেন—
—“একেকটা চালানে যা পাবি… মাস গেলে তোর পুরা স্যালারি ওভারটেক করে দিবে। দুই-তিনটা চালান দিলেই তুই দাঁড়ায়ে যাবি। সংসার লাগাইতে পারবি। তৃণাকে নিয়ে সংসার গুছাইয়া মানুষ দেখাইতে পারবি। যারা তোকে ফেলছে- ওদের চোখে চোখ রেখে বলতে পারবি ‘আমি পেরেছি’। বুঝছোস?”
শিশির ধীরে চোখ তুলে তাকাল। মকবুলের এই একটা কথাই তাকে ধরে ফেলেছে। কাবু করে ফেলেছে তার অন্ধকার অস্তিত্ব।
মকবুল এবার হালকা করে তার কাঁধে হাত রাখলেন, নরম গলায় বললেন,
—“জীবনে সবসময় সোজা পথে হাঁটলে সোজা জায়গায় পৌঁছানো যায় না রে ভাই। মাঝে মাঝে বাঁকা রাস্তা ধরতেই হয়। অংশীদার অনেক, কাজ সহজ… শুধু মুখ বন্ধ রাখতে পারলে তুই রাজা। কি করবি?”
শিশির দীর্ঘক্ষণ চুপ রইল।
ধোঁয়াটে আলোয় তার মুখটা আরও গাঢ় দেখাচ্ছে।
মাথার ভেতর তৃণার মুখ, তাদের ভবিষ্যতের ছবি, দারিদ্র্যের দমবন্ধ করা বাস্তবতা- সব একসাথে ঠেলাঠেলি করছে।
অবশেষে সে সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে ধীরে বলল,
—“করব… মকবুল ভাই। আমি রাজি।”
একটা ভার যেন বুক থেকে নেমে গেল, আবার অন্য একটা ভার তার কাঁধে চড়ে বসল যেটা অনেক গভীর, অনেক অন্ধকার।
মকবুল সন্তুষ্ট হলেন। দাঁড়িয়ে বললেন,
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৩
—“ঠিক আছে। কাল সকালে ফোন দিবো। প্রস্তুত থাকিস। আর শোন, তোর এই নীরব, দৃঢ় মনোভাবটাই দরকার, আঁকড়ে রাখিস। দেখিস, তোর দিন ফিরবো।”
শিশির মাথা নেড়ে উঠল। তার বিবেকবোধ তো অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছে, আজ মনুষ্যত্বের শেষ কোণাটাও নীরবে ডুবে গেল কোথাও।
শহরের আলো-আঁধারিতে শিশিরের ছায়াটা আজ আর আগের মতো নেই। সেই ছায়া আরও লম্বা, আরও গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত।
