সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩১
মৃধা মৌনি
হাসপাতালের করিডোরটা যেন চিরকালই এমন; অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তার ভার আর নীরব আতঙ্কের গন্ধ মেখে থাকে এখানকার বাতাসে। জরুরি বিভাগের পাশ ঘেঁষে থাকা সরু করিডোরটির ফ্যাকাশে হলুদ আলোয় সে রাতটা আরও বেশি বিবর্ণ, আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে উঠেছিল। আলো আছে, অথচ উষ্ণতা নেই। মানুষের যাতায়াত আছে, অথচ প্রাণ নেই। সবকিছুই যেন আটকে আছে এক অদৃশ্য শ্বাসরোধী মুহূর্তে।
অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজার ঠিক সামনে, একটি প্লাস্টিকের নোংরা চেয়ারে বসে আছেন খালেদা বেগম। তাঁর আঁচল ভেজা- চোখের জলে, বুকের হাহাকারে। আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে তিনি এমনভাবে কাঁদছেন, যেন এই কান্নার মধ্য দিয়েই জীবন থেকে শেষ অবলম্বনটুকু ফসকে যাচ্ছে। চোখ দু’টো রক্তবর্ণ, স্বর রুদ্ধ, নিঃশ্বাস এলোমেলো- তবু কান্নার স্রোত থামছে না।
‘আল্লাহ! এ কী হলো আমার মেয়ের!’ ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে ব্যথাতুর বিলাপ, ‘আমমার দীক্ষার কিছু হবে না তো? ওর কিছু হলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব, আল্লাহ!’
করিডোরের নীরবতা বারবার ভেঙে যাচ্ছে তাঁর কান্নায়। আশেপাশের মানুষগুলো চুপ করে তাকিয়ে থাকে, কেউ কিছু বলে না- কারণ এই কান্না থামানোর মতো কোনো শব্দ কারও জানা নেই।
খালেদা বেগমকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বকুল। তার নিজের চোখেও জল চিকচিক করছে, বুকের ভেতর দম আটকে আসছে, তবু সে প্রাণপণে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। এই মুহূর্তে সবাই যদি ভেঙে পড়ে, তবে খালেদা বেগম পুরোপুরি ভেঙে যাবেন, এই ভয়টাই তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করছে।
সে খালেদা বেগমের কাঁপা কাঁধে হাত রাখে, ধীরে ধীরে সান্ত্বনার সুরে বলল, ‘ফুপু, এভাবে কাঁদলে আপা কি সুস্থ হবে? আপনি শক্ত থাকেন। দীক্ষা আপা খুব লড়াকু- সে হাল ছাড়ার মেয়ে না। ডাক্তাররা চেষ্টা করছে। আল্লাহ আছেন। আপনি শুধু দোয়া করেন…’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নিজের কথার ভেতরেই বকুলের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। সে নিজেও জানে- পরিস্থিতি কতটা জটিল।
আজ রাতেই আট মাসের গর্ভবতী দীক্ষাকে উদ্ধার করা হয়েছে তাদের বাড়ির বদ্ধ ঘর থেকে অজ্ঞান অবস্থায়। আনতে আনতে তার ম্যাক্সি ভিজে সপসপে ছিল, যেন সে কোনো গভীর জলে ডুবে ছিল অনেকক্ষণ। হাসপাতালে আনার পর করিডোরের সাদা আলোয় একটিমাত্র বারের জন্য সে চোখ মেলেছিল। সেই চোখে ছিল আতঙ্ক আর যন্ত্রণার ছাপ- এক লহমার জন্য সে যেন তার মাকে চিনতে পেরেছিল। ঠোঁট কেঁপে উঠেছিল, কিছু বলার চেষ্টা করেছিল আর তারপরই আবার নিস্তেজ, সেন্সলেস হয়ে পড়ে শরীর।
চিকিৎসক এক মুহূর্ত দেরি করেননি।
‘ইমারজেন্সি ওটি!’ – এই নির্দেশ যেন করিডোরের বাতাসে আতঙ্কের এক কঠিন সিলমোহর এঁকে দিয়েছিল।
এখন দীক্ষা ভেতরে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে এক সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দোদুল্যমান দুইটি প্রাণ- মা এবং তার অনাগত সন্তান।
বাইরে শুধু অপেক্ষা।
শান্ত মুখ গুঁজে বসে আছে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে জপে চলেছে, হে আল্লাহ, হে পরওয়ারদিগার… রহম করুন…সহায় হন আপনি, আমার বোনটার উপর সদয় হন, তার আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে কেউ নাই, কারো সাহায্য নাই.. আপনিই যথেষ্ট ইয়া রব, এতগুলো প্রাণের দোয়া শুনুন…’
ঠিক তখনই, অপেক্ষার সেই করুণ, ভারী আবহটা তীব্র এক ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল।
জরুরি বিভাগের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে নয়, প্রায় আছড়ে পড়ল ভেতরের দিকে অরুণিমাভ চৌধুরী।
ভিজে চুপচুপে পাঞ্জাবি, এলোমেলো চুল, আর চোখ দু’টোয় উন্মত্ততা নিয়ে করিডোরে ঢুকে পড়লেন তিনি। তাঁর প্রবেশ যেন শান্ত করিডোরের বুকে এক বিধ্বস্ত ঘূর্ণিঝড়।
পা ফেলে এগোতেই যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
প্রথম যে নার্সকে দেখলেন, তাকেই প্রায় চেপে ধরে উচ্চস্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘ভেতরে কী চলছে? ও কেমন আছে? ডাক্তার কোথায়? ডাক্তারকে ডাকুন, এক্ষুনি!’
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো সংযম, কোনো নিয়ন্ত্রণ। আশেপাশের রোগী আর স্বজনেরা চমকে তাকাল। কেউ এগিয়ে এল না। এই মুহূর্তে অরুণিমাভকে থামানোর সাহস কারও নেই।
খালেদা বেগম কান্না থামিয়ে থমকে তাকালেন তাঁর দিকে। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোলো না। এই ছেলে কেন এমন পাগল? দীক্ষার জন্য? তবে কি…কিছু একটা ছুটে গেল মস্তিষ্কে, এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এলো তাঁর।
বকুল তাকিয়ে ছিল আরও বিস্ময়ে।
এই লোকটাকে সে যতটুকু চেনে- তাতে ঠান্ডা মাথার, হিসেবি, যাঁর মুখ দেখে মন বোঝা যায় না, এমন লোকই মনে হয়। অথচ এখনকার অরুণিমাভ সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখ-মুখের পেশিগুলো টানটান, চোয়ালের হাড় শক্ত, ভেতরের ভয় আর অসহায়তা স্পষ্ট।
তার দৃষ্টি আটকে আছে শুধু ওটি-র বন্ধ দরজায়।
তিনি পায়চারী শুরু করলেন। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছেন বারবার। একবার দরজার কাছে গিয়ে কান পাতেন, আবার দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করেন, ‘দীক্ষা… প্লিজ আল্লাহ…’
এই অস্থিরতা, এই ভাঙন- বকুল কখনো দেখেনি।
ঠিক তখনই, ওটি-র বন্ধ দরজাটা সামান্য শব্দ করে খুলে গেল।
করিডোরের বিবর্ণ আলোয় দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন একজন মধ্যবয়সী চিকিৎসক। তাঁর সার্জিক্যাল ড্রেস তখনও র ক্তে র ছিটেফোঁটায় ভিজে, মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু তাঁর ঠোঁটে ছিল এক ফোঁটা প্রশান্তির হাসি।
দরজা খোলার শব্দে করিডোরের জমাট বাঁধা বাতাস যেন এক তীব্র ধাক্কা খেল। সবাই- খালেদা বেগম, বকুল, শান্ত, এবং উন্মত্ত অরুণিমাভ, এক লহমায় ডাক্তারকে ঘিরে ধরল।
ডা. মোমেন শান্তভাবে তাঁর মাস্কটা নামালেন।
অরুণিমাভ হড়বড় করে বললেন, ‘কী হলো? দীক্ষা কেমন আছে? সব ঠিক আছে তো? বলুন না ডক্টর!’
তাঁর কণ্ঠ জুড়ে এক অসহ্য আকুতি গলে গলে পড়ছে।
ডা. মোমেন ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন, চোখজোড়া অরুণিমাভর দিকে স্থির করলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা সফল হয়েছি। মা ভালো আছে। আল্লাহর রহমতে র ক্ত পা ত থামানো গেছে। আমরা ইমারজেন্সি সিজার করে ফেলেছি।’
সঙ্গে সঙ্গেই যেন খালেদা বেগমের হৃদপিণ্ডটা এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল। তাঁর মুখ থেকে একটা স্বস্তির চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। বকুলও হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, তার চোখ দিয়ে চিকচিক করে জল গড়িয়ে পড়ল।
অরুণিমাভ এক মুহূর্তে সব রাগ, সব অস্থিরতা ভুলে গেলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে লম্বা করে একটা শ্বাস নিলেন, যেন এতক্ষণ শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে আওড়ালেন, ‘আর… আর বাচ্চাটা?’
‘অভিনন্দন! পেশেন্টের ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তান হয়েছে! এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে আমাদের চমকে দিয়েছে!’
এই কথা শুনে খালেদা বেগম আনন্দে হাতজোড় করে আল্লাহর কাছে তক্ষুনি কৃতজ্ঞতা জানালেন। বকুলের চোখে আনন্দের বন্যা। দিক দিশা সব ভুলে শান্ত বকুলকে জড়িয়ে ধরল এক হাতে… অরুণিমাভের নিজের চোখ জোড়া জ্বলছে জ্বলজ্বল করে, দীক্ষা… কন্যা সন্তানের জননী হলো, অবশেষে! এত অপেক্ষার পর….
তবে এই আনন্দের আবহ বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ডা. মোমেনের মুখের হাসিটা এবার সামান্য ম্লান হলো। তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর, সতর্ক।
‘তবে,’ তিনি দোনোমোনো করে বললেন, ‘একটা খারাপ খবর আছে। বাচ্চা ভালো নেই।’
ডা. মোমেনের এই কথাটা যেন করিডোরের বাতাসে আতঙ্কের দ্বিতীয় শীতল সিলমোহর এঁকে দিলো। অরুণিমাভর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
‘কী… কী সমস্যা? কী হয়েছে বাবুর?’
‘তাকে খুব বেশি আঘাত সহ্য করতে হয়েছে। শরীরের ভেতরে জলের প্রভাব পড়েছে, মনে হচ্ছে সে ডুবে গিয়েছিল। তার শ্বাসযন্ত্রে তীব্র সংক্রমণ হয়েছে এবং সময়ের অনেক আগে জন্ম নেওয়ার কারণে তার ওজনও খুব কম। আমরা তাকে এখনই এনআইসিইউ-তে দিয়ে দিয়েছি। তার জন্য লড়াই চলছে।’
অরুণিমাভ চৌধুরীর দুই চোখ যেন তীব্র যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। কিছুক্ষণ আগের আনন্দ মুহূর্তেই তীব্র আতঙ্কে পরিণত হলো। তিনি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না।
‘এনআইসিইউ? কোথায়? আমাকে দেখান! এক্ষুনি!’
তিনি প্রায় ছুটতে শুরু করলেন করিডোরের শেষ প্রান্তের দিকে, যেখানে এনআইসিইউ-এর সঙ্কেত। পেছনে পেছনে ছুটল সবাই। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে থাকা দুইজনের মধ্যে একজন বেঁচে ফিরলেও, আরেকজনের জন্য লড়াইটা কেবল শুরু হলো।
অরুণিমাভ চৌধুরীর নেতৃত্বে সবাই প্রায় ছুটতে ছুটতে হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU – Neonatal Intensive Care Unit) এর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঁচের ওপাশে এক ভিন্ন জগৎ- নীরবতায় মোড়ানো, যন্ত্রপাতিতে ঠাসা আর সতর্ক নজর চারদিকে..
ডা. মোমেন এবং তাঁর সহকারী দ্রুত অরুণিমাভকে থামালেন।
‘দাঁড়ান মিস্টার চৌধুরী। আপনারা সবাই এখানে অপেক্ষা করুন। ভেতরে এখন ঢোকা যাবে না।’
‘কিন্তু ডাক্তার! ওকে কেন ভেতরে রাখা হয়েছে? কী হয়েছে ওর?’
‘আপনারা যেমনটা জানেন, ডেলিভারি আট মাসেই হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বাচ্চাটি প্রিটার্ম বা অপরিণত। ওর শরীরের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।’
তিনি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ধীর, ‘প্রধান সমস্যা হলো শ্বাস-প্রশ্বাস। আট মাসে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের ফুসফুস পুরোপুরি তৈরি হয় না। একে আমরা রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম বলি। ওর ফুসফুসে সারফ্যাক্ট্যান্ট নামে এক ধরনের পদার্থ তৈরি হওয়ার কথা, যেটা ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোকে চুপসে যেতে দেয় না। যেহেতু সেটা তৈরি হয়নি, তাই সে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। ওকে এখন কিউবেটরে রেখে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে।’
ডা. মোমেন আরও যোগ করলেন, ‘তাছাড়া, ওর ওজন খুব কম, শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নেই এবং ইমিউন সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। সংক্রমণ এড়ানোর জন্য এবং ওর তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্যই কিউবেটর এবং এনআইসিইউ-এর এই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দরকার।’
বকুলের চোখ জলে ভেজা। সে ডাক্তারকে প্রশ্ন করল, ‘ডাক্তার, এখন কি তাহলে একবারও দেখা যাবে না? এতটুকু একটা বাচ্চা, আমরা… আমরা একটু দেখব না?’
ডা. মোমেন দৃঢ়ভাবে মানা করে দিলেন, ‘না, এখন একেবারেই না। ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত রাখতে হয়। কোনো ভিজিটরকে এখন ঢুকতে দেওয়া সম্ভব নয়।’
‘ডাক্তার, প্লিজ। আমি জানি নিয়ম মানতে হবে। কিন্তু আমি ওকে একবার… শুধু একবার চোখের দেখা দেখব। প্লিজ। আমি পাঁচ সেকেন্ডের বেশি থাকব না। শুধু একবার…’ অরুণিমাভের এই আকুতি আর চোখেমুখে ফুটে ওঠা যন্ত্রণা দেখে ডা. মোমেন কিছুটা নরম হলেন। তিনি চারপাশে একবার তাকালেন।
‘দেখুন মিস্টার চৌধুরী, নিয়ম ভাঙা ঠিক না। তবে, যেহেতু আপনি বাবা এবং আপনার মানসিক অবস্থা ভালো নয়… ঠিক আছে। শুধুমাত্র একজন প্রবেশ করতে পারবেন। যিনি যাবেন, তিনি যেন সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হন।’
‘উনি বাচ্চার বাবা…’ শান্তকে পায়ে পাড়া মে রে চুপ করিয়ে দিলো বকুল, চোখ রাঙালো, বোঝালো মুখ খুললে জানে মে রে দেবে এখানেই। শান্ত চুপসে গেল তাই জন্যে। ডা. মোমেন ভাবছেন অরুণিমাভ চৌধুরী এই কন্যাটির জনক- তবে তার এই ভুল কেউই ভাঙালো না। বরং অরুণিমাভ এই পরিচয়ের জের ধরেই দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। মাথা নেড়ে দ্রুত সম্মতি দিলেন। বকুল বা খালেদা বেগম- কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না।
বললেন, ‘আমি যাব। এক্ষুনি।’
হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত অরুণিমাভকে এনআইসিইউ-এর ভেতরের লবিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাঁকে বিশেষ পোশাক পরানোর ব্যবস্থা করা হলো।
অরুণিমাভর শরীরে পরানো হলো নীল রঙের জীবাণুমুক্ত এপ্রোন, মাথায় পরা হলো সার্জিক্যাল ক্যাপ, মুখে আঁটা হলো মাস্ক। এক মিনিটের মধ্যে তাঁকে দেখলে মনে হবে, তিনি যেন কোনো বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক। তাঁর চোখ ছাড়া শরীরের আর কোনো অংশ দৃশ্যমান নয়।
তিনি যখন কাঁচের দরজার কাছে এলেন, তাঁর হৃদপিণ্ড তীব্রভাবে দাপাদাপি শুরু করে দিলো। নার্স দরজা খুলে তাঁকে সাবধানে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো।
ভেতরের কক্ষটি নীরব। বিভিন্ন মেশিনের মৃদু শব্দ আর মনিটরের আলোগুলো মিটমিট করছে। অরুণিমাভ দেখলেন, কক্ষের এক কোণে, একটি স্বচ্ছ কাঁচের বাক্সের (কিউবেটর) ভেতর রাখা হয়েছে ছোট্ট শিশুটিকে!
কিউবেটরের ভেতরে আলো ঝলমল করছে। তার ক্ষুদ্র, নরম দেহটি অজস্র তার আর নল দিয়ে মোড়ানো। ছোট্ট মুখে লাগানো আছে অক্সিজেন মাস্ক। কন্যাটি যেন এক ভঙ্গুর, কাঁচের পুতুল, যা চরম সতর্কতায় রাখা। তার ছোট্ট হাত-পাগুলো কাঁপছে, যেন সে এই পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রাণপণে সংগ্রাম করছে।
অরুণিমাভর চোখ ভিজে উঠল। তাঁর চোখের জল মাস্কের ভেতর দিয়েই গড়িয়ে পড়ল। এই প্রথম, তিনি সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া এক ফেরেশতাকে এত কাছ থেকে দেখছেন! কি সুন্দর কি সুন্দর! অরুণিমাভ বিড়বিড় করে পড়লেন, ‘মাশা আল্লাহহহ…’
আরহামকে দেখেছেন মার দেড়েক পরে, আর আয়ানকে দেখতে তার নয়টি মাস লেগেছিল! তাই এবারের অনুভূতি একেবারেই ভিন্ন, অন্যরকম!
কেন এত বেশি টান অনুভব করছে ওই ছোট্ট শিশুটির উপর, অরুণিমাভ জানেন না।
তিনি কিউবেটরের কাঁচের ওপর হাত রাখলেন। কাঁচের ঠান্ডা স্পর্শ তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করতে পারল না। তিনি ফিসফিস করে, প্রায় শব্দহীন কণ্ঠে বললেন,
‘লড়তে থাকো মা, লড়াই থামাবে না। দেয়ালের প্রাচীর ডিঙিয়ে একদিন তুমি আমার কোলে এসো, তোমায় জানাবো, আমি তোমায় প্রথম দেখায় কতটা ভালোবেসে ফেলেছি…’
তিনি জানেন, এই কিউবেটরের দেয়াল ভেদ করে তাঁর কথা কন্যার কাছে পৌঁছাবে না। কিন্তু একজন জন্মদাতা পিতা না হয়েও বাবা হয়ে ওঠার প্রতিজ্ঞা, সন্তানের জন্য ভালোবাসা- সেটা তো আর কাঁচের দেয়ালে আটকে থাকার নয়।
সময় ফুরিয়ে এলো। নার্সের ইশারায়, অরুণিমাভ চোখ মুছে, সেই অপূর্ণ অনুভূতি আর এক বুক আশা নিয়ে নীরবতা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
এ বাড়ির আবহাওয়া আজ ভয়ংকর গরম। মিনারা বেগম যাকে সামনে পাচ্ছেন, তাকেই কুৎসিত ভাষায় গালাগালি করছেন। রাসেলও বাদ যায়নি, দুই গালে উত্তম-মধ্যম খেয়েছে। সব সর্বনাশের মূলে এই ছেলেটাই। তৃণাকে তো রীতিমতো তুলোধুনো করছেন, কিন্তু তাতে তৃণার বিশেষ কিছু যায় আসে না। সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে তাকে হতে হবে কালা, বোবা আর অন্ধ। তবে জন্মগত নয়। প্রয়োজন হলে কড়া জবাবও দিতে হবে, ঠিক সময় বুঝে।
সে যে একেবারে দুর্বল- এই ভুল ধারণা যেন কেউ না পোষে। সবচেয়ে বড় কথা, রাসেলের সন্তান এখন তার পেটে। সেই সূত্রে এই বাড়িতে থাকার পূর্ণ অধিকার তার আছে। কিন্তু তার আগে রাসেলকে নিজের আয়ত্তে আনতেই হবে। কীভাবে আনবে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয় তৃণার কাছে। তবু সে নিশ্চিত, আনবে। যেভাবেই হোক।
নিজের হক নিজেকেই আদায় করতে হয়। আর এই বিষয়ে তৃণার আলাদা করে ডিগ্রি নেওয়া আছে।
তৃণা কাপড় গোছাচ্ছিল। গতকাল রাত থেকেই সে রাসেলের ঘরে শিফট হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক বসেছে- কথার পর কথা, চিৎকারের পর চিৎকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিনারা বেগম কিছুই করতে পারেননি। নিজের স্বামী, এমনকি ভাসুরও রাসেলের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। যে ভুল করেছে, তার মাশুল তো তাকেই গুণতে হবে।
আর তৃণা এখন রাসেলের বউ। বিয়েটা যেভাবেই হোক- সে তো রাসেলের বউই। কাজেই সে তার ঘরেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় তাকে নিচে থাকতে দেওয়া- সে আবার কেমন বিচার? মিনারা বেগম অবাক হয়ে আরও কতক্ষণ বিলাপ করেছেন।
‘কেমন বিচার?’
কোথাকার কোন রাস্তার মেয়েকে তার ঘরের পুত্রবধূ রূপে তাকে গ্রহণ করতেই হবে! কেন এই জোরজবরদস্তি? ছেলে তো তার, সেই ছেলের বিয়ে করা বউ কে হবে, সেটাও তো তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন নাকি? এত ভালো ভালো ঘর.. বড় ভাইয়ের মেয়েকে আনলেও বিপুল সম্পত্তি পেতো। সব বাদ দিয়ে এখন এই মেয়েকে তুলুতুলু করতে হবে। না করলে ৫০ লাখ টাকার জরিমানা। পঞ্চাশ লক্ষ টাকা মুখের কথা নাকি?
আহারে… তার সোনার টুকরো ছেলেটা! আহারে তার সোনার সংসারটা! এক কালবৈশাখী ঝড়ে সব শেষ… আহারে… মিনারার আক্ষেপ, বিলাপ কিছুতেই কমে না।
তৃণা এসবের একটা কথাও কানে তোলেনি। দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। রাসেল অনেকক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করেছিল, শেষমেশ একাই থেমে গেছে। তৃণা কোনো জবাব দেয়নি। জবাব না পেলে ঝগড়াই বা হবে কী করে?
ঘরের ভেতরটা এখনো থমথমে। তৃণা দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে, চোখ দুটো বন্ধ কিন্তু ঘুম আসছে না। শরীর টা ঝাড়া দিয়ে উঠছে থেমে থেমে। শীত শীত লাগছে ভেতরে। হঠাৎ করেই বাইরে থেকে আবার চিৎকারের শব্দ ভেসে এল। মিনারা বেগমের গলা, চেনা ঝাঁঝ, চেনা বিষ।
‘এই ছেলের জন্য আমার কপালের এই দশা। এমন জানলে পেটে থাকতে টিপ্পা মাইরা ফেলতাম। জা নো য়া র পোলা…বাইরে বেরোন যাইতেছে না। সবাই আইসা মুখের উপর জিগায়, পোলায় নাকি বাচ্চা সহ বউ তুলছে। ছি ছি ছি… কি বিচ্ছিরি ব্যাপার। তোর কি লজ্জাও লাগে না রে রাসেল? এমন অকাম ঘটানোর আগে একবার ভাবলি না? করছিলি ভালো কথা, ব্যবস্থা বুঝবি না? মানুষ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারে, তুই তো কুড়ালের উপর ঝাপ দিয়া পড়ছোস। আবার চোখ গরম করে তাকাস আমার দিকে.. তোর চোখ আমি উপড়াইয়া ফেলবো, অসভ্য ইতর…’
রাসেল ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, ‘মা, আর কত? ভুল করছি, মেনে নিছি। কিন্তু এখন যা হইছে, সেটা তো আর উল্টানো যাবে না!’
‘উল্টানো যাবে না?’ মিনারা বেগম হঠাৎই হেসে উঠলেন, ‘আমি কি তোর মতো বোকা গর্দভ নাকি? এই মেয়েরে আমি এই বাড়িতে থাকতে দেব- এই আশা করিস না!’
তৃণার বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে এল। সে চুপ করে থাকবে বলে ঠিক করেছিল। কিন্তু কিছু কথার জবাব না দিলে, মানুষ ধরে নেয়, সে দুর্বল – অসহায়।
তাই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।
‘আপনি দেবেন না- এই সিদ্ধান্তটা আপনি কোন অধিকারে নিচ্ছেন?’ তৃণার গলা শান্ত, চোখেমুখে নিস্তব্ধ গাম্ভীর্যতা।
মিনারা বেগম ঘুরে তাকালেন। চোখে আ গু ন নিয়ে বললেন, ‘ওরে বাবা নবাবের বংশধর গরম বিছানা ছেড়ে উঠে এলো তবে… হ্যাঁ রে, বলি তোর কি শরম লজ্জা নেই? আমার ছেলের নাহয় নেই, তুই তো মেয়ের জাত- গলায় কলসি বেঁধে ডুবে ম র লি না কেন? ওই তো পেট ঢুকিয়ে জোরজার করে আমার ছেলের ঘাড়ে চেপেছিস, এই বাড়ি এসেছিস.. আবার মুখে মুখে তর্ক!’
রাসেল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘মা! এসব কথা বলো না তো, আমার নিজেরও আর শুনতে ভালো লাগছে না।’
তৃণা আরও এক পা এগিয়ে এল, ‘পেট দেখিয়ে না, বিয়ে করেই ঢুকেছি। আপনার ছেলে নিজেই আমাকে এই বাড়ির বউ বানিয়েছে।’
‘বউ?’ মিনারা বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেললেন।
‘এই বিয়েকে আমি মানি না। আর যাকে আমি মানি না, সে এই বাড়িতে থাকবে- সেটাও হবে না।’
‘আমাকে বের করা এত সহজ না। আপনি আমাকে বের করতে পারবেন না।’
‘দেখবি, পারব!’
মিনারা বেগম এবার তৃণার দিকে একেবারে তেড়ে এলেন, ‘এই বাড়ি আমার। আমি চাইলে আজই তোকে বের করে দিতে পারি!’
এই প্রথম তৃণার চোখে এক ঝলক আগুন জ্বলে উঠল।
‘বের করবেন?’
সে হেসে ফেলল। সেই হাসিটা মিনারার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, ‘কীভাবে করবেন, সেটাই আমি দেখতে চাই।’
‘বেশি কথা বলিস না!’ মিনারা বেগম চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, তোকে আমি এই বাড়ি থেকে বের করেই ছাড়ব!’
তৃণা এবার একদম সামনে দাঁড়াল, ‘আর আমি বলছি- এই বাড়ি থেকে আমাকে বের করা আপনার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে।’
রাসেল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
‘তৃণা,’ ডেকে ওঠতেই তৃণা রাসেলের একটা হাত চেপে ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে দিলো, ‘আর হ্যাঁ, বিয়েটা যেভাবেই হোক, ও আমার হাজবেন্ড, এইটা আমার হাজবেন্ডের ঘর। যদি আমার হাজবেন্ড এখানে থাকে, আমিও থাকব। সে না থাকলে আমি চলে যাবো। আমাকে বের করতে হলে ওকে আগে বের করুন…তারপর আমার দিকে তেড়ে আসবেন ওই গুন্ডি গুন্ডি লুক নিয়ে, ওকে?’
মিনারা বেগম বিস্ময়ে কাঁপছেন। কি সাহস রে বাবা! জীবনেও কল্পনা করতে পারেননি, এই মেয়ের কলিজা এতবড়! তিনি ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে বললেন, ‘দেখব কতদূর যেতে পারিস।’ তারপর নিজেই উঠে গিয়ে ঘরের দুয়ার দিলেন।
‘সময় সব দেখিয়ে দেয়- কে টিকে থাকে, আর কে হেরে যায়।’ বিড়বিড় করে তৃণা।
ঘরের ভেতর নেমে আসে পাথরের মতো নীরবতা। এই বাড়িতে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আর এই যুদ্ধে তৃণা আর নিরীহ শিকার নয়।
দীক্ষাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। তার পাশটায় প্রায় ছায়ার মতো লেপ্টে আছেন খালেদা। এক মুহূর্তের জন্যও মেয়ের দৃষ্টি-সীমার বাইরে যেতে রাজি নন তিনি। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনটুকুও ভুলে গেছেন এই আশঙ্কায়- কখন মেয়ের কিছু লাগে যদি! ফুপুর এমন অস্থির, অথচ নিঃস্বার্থ যত্ন দেখে বকুলের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নামে। ভালো লাগে… খুব ভালো লাগে।
আর ঠিক সেই ভালো লাগার ফাঁক গলিয়েই বিষণ্নতার একটা ঘন মেঘ এসে চেপে বসে তার বুকের ভেতর।
ইশ্… তার মা যদি বেঁচে থাকত!
বকুল ধীরে ধীরে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বাইরে ঝলমলে রোদে ভরা দুপুর। আকাশের দিকে তাকালেই চোখে লাগে তীব্র আলো, যেন আলো নয়- কিছু স্মৃতি এসে বিঁধছে। করিডোরের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। মনটা আচমকাই ছুটে যায় বহু দূরে… মানসপটে ভেসে ওঠে মায়ের সেই মমতাভরা মুখখানি- যে মুখের দিকে তাকালেই সব ভয়, সব ক্লান্তি মিলিয়ে যেত।
‘মা’
দুটো অক্ষরের এই ডাকটার ওজন যে কত ভারী, তা যার নেই, সে ছাড়া আর কেউ বোঝে না। মা মানে নিঃশর্ত আশ্রয়, বিনা প্রশ্নে আগলে রাখা, নিজের সবটুকু নিঃশেষ করে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত শক্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা আসলে কোনো ঘর নয়, একজন মায়ের বুক।
বকুলের চোখ দুটো অজান্তেই ভিজে ওঠে। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা আর চেপে রাখতে পারে না সে।
আহা মা… কিছু শূন্যতা কোনোদিন পূর্ণ হয় না।
এমন সময় হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে বকুল একটু চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নেয় সে। কিছু প্রকাশ না করেই আঙুলের পিঠ দিয়ে চোখের কোণটা আলতো করে ডলে নেয়- জমে থাকা জলটুকু লুকোনোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
ঠিক তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত মুখ- সম্মুখপানে দাঁড়িয়ে শান্ত ভাই।
ভ্রু কুঁচকে সে তাকিয়ে আছে বকুলের দিকে।
হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যেন কিছুই হয়নি বিগত কয়দিনে, এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘কাঁদিস না কাঁদিস না। তোর-ও বাচ্চা হবে একদিন। আমি দোয়া করে দিতেছি দাঁড়া, এক দোয়ায় ডাবল বাচ্চা।’ শান্ত বকুলের মাথার উপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে সূরা পড়ার ভঙ্গি করতেই বকুল ঝামটা মেরে তাকে সরিয়ে দিলো।
গম্ভীরমুখে বলল, ‘আপনার দোয়া আমার লাগবে না। পকেট ভরে রেখে দিন।’
‘এমন ছ্যাৎ ছ্যাৎ করিস কেন?’ শান্ত বিরক্তি চোখে তাকাল।
‘আপনার সাথে কি ভালো ভাবে কথা বলার সম্পর্ক আছে আমার?’ বকুল শান্ত চোখে তাকাল, গভীর স্বরে বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে কথা না বললেই আমি খুশি হই। এখান থেকে যান, আমি খানিকক্ষণ একা থাকতে চাই।’
‘চলে যাব?’ এক ভ্রু নাচায় শান্ত।
মন থেকে সায় নেই তবু জোর করে জবাবে বলল, ‘যান।’ মুখ ঘুরিয়ে সম্মুখপানে তাকাল। শান্ত আবারও শুধালো, ‘সত্যি চলে যাবো? এবার গেলে আর কোনোদিন ফিরবো না কিন্তু!’
এ কথায় হালকা কেঁপে ওঠে বকুল, কেন কে জানে।
সত্যি ফিরবে না বলতে কি বোঝালো? অবশ্য কোথায়ই বা ফিরবে সে? বকুলের জন্য তো তার কিছু নেই।
‘কি হলো, চুপ কেন, বল, চলে যাই?’
ঘুরে দাঁড়াল বকুল, রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পিটপিটে চোখে তাকাল, ‘বিরক্ত না করে যেতে ইচ্ছে হলে যান তো।’ ভ্রু নাচালো সেও!
‘ওবাবা, বিরক্ত হচ্ছিস এখন? আমার উপর?’
‘হওয়া নিষেধ নাকি?’
‘এত জেদ তোর হলো কি করে? খুব তো সম্মান দিতি, আজকাল কোন ভূত চেপেছে?’
‘চেপে ছিল, সেটা নেমে গেছে।’
‘তাই বুঝি?’
‘হুঁ।’
‘আর চাপবে না?’
‘জানা নেই।’
‘বকুল।’
‘কি?’
শান্ত এগিয়ে এলো। আশেপাশে কেউ নেই। করিডোরটা ফাঁকা একদম। লাঞ্চের সময় হওয়ায় সবাই যার যার কাজেই ব্যস্ত। এই সুযোগে বকুলকে স্তব্ধ করে দিয়ে ওর একদম একদম কাছে এগিয়ে এসে… নিচু হয়ে আলতো ঠোঁটে একটা চুমু এঁকে দিলো শান্ত। গালের উপরে…এতই আস্তে যেন কাঁচের পুতুল সে, সামান্য টোকায় ভেঙে চুরে যাবে। এতই আকস্মিক ভাবে ঘটল যে, বকুল প্রতিক্রিয়া ও দেখাতে ভুলে গেল সম্পূর্ণ ভাবে। কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা দৃষ্টিতে মগজের ভেতর এখনো প্রসেস করছে- হলো টা কি?
তাই দেখে শান্ত হাসল, দু আঙুলে গাল টিপে দিলো মেয়েটার, নরম সুরে অধিকার নিয়ে জানাল, ‘ফের এসব জেদ রাগ দেখালে এভাবেই শাস্তি পাবি। বুঝেছিস?’
পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলে চালান করে দিলো পরক্ষণেই। ঠোঁট গোল করে শিষ দিতে দিতে এগিয়ে চলল সম্মুখপানে। রেখে গেল হতভম্ব হওয়া বকুলের থমথমে মুখ- মাথার ভেতরে এখনো ঘুরছে কয়েক সেকেন্ড আগেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যটি!
দরজায় দুটো টোকা পড়ল। খালেদা গামছা ভাঁজ করছিলেন, মুখ তুলে তাকিয়ে শুধালেন, ‘কে এলো!’
উত্তরটা দীক্ষাই দিলো, ‘উনি মা।’ লজ্জায় বুঁজে এলো কণ্ঠস্বর। মেয়ের এমন চেহারা দেখে অবাক বনে গেলেন তিনি। তবে কি মনে মনে যা সন্দেহ করেছেন তাই ঘটতে চলেছে? এমন কিছু হলে সেটা কি খুব ভালো হবে? নাকি খুব খারাপ হবে?
বুঝলেন না খালেদা। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই অরুণিমাভ চৌধুরী হাসি ছুঁড়ে দিলেন। তার হাতে একটা ফ্লাওয়ার বুকে, ‘আসতে পারব ভেতরে?’
দীক্ষা নিজেই হাত বাড়িয়ে একটা গামছা তুলে বুকের ওপর জড়ালো, বলল, ‘আসুন।’
খালেদা সরে দাঁড়ালেন।
কেবিনে শিফট করার পর একবার দেখতে পেয়েছিল অরুণিমাভ, দীক্ষা তখন ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে, এখন দেখল আবার,
‘শরীরটা কেমন লাগছে?’ বসতে বসতে বললেন তিনি। বুকে টা রাখলেন পাশেই। দীক্ষা দেখল টকটকে লাল গোলাপ ছাড়া আর কিছু নেই। কোনদিন যেন কথার ফাঁকে জানিয়েছিল, তার লাল গোলাপই বড্ড প্রিয়। ভদ্রলোক মনে রেখেছেন!
দীক্ষা হাসি ছুঁড়ে দিলো, যদিও তলপেটের নিচে অসম্ভব ব্যথা- তবু বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’
‘যাক ভালো।’ অরুণিমাভ একটু নিশ্চিন্ত হলেন, ‘তুমি চিন্তা করবে না। বাবু ভালো আছে। আমি খেয়াল রেখেছি।’
দীক্ষা একদণ্ড তার মুখপানে স্থির চোখে চেয়ে থেকে ধীর ভাবে মাথা নাড়াল, ‘চিন্তা করছি না।’
‘রিল্যাক্স মুডে থাকো, খাও ঘুমাও, সুস্থ হও। এভাবে তোমাকে দেখতে…’ একটু থেমে উনি দীক্ষার দিকে তাকালেন, চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘ভালো লাগে না।’
দীক্ষা কিছু বলল না। দৃষ্টিও সরিয়ে নিলো না। অরুণিমাভই মাথা নিচু করলেন, খালেদার উপস্থিতি টের পেয়ে। দীক্ষাও নজর সরালো। কিছু একটা ভাবলো। তাকাল, বলল, ‘আপনি হঠাৎ করেই আমাদের একজন হয়ে গেলেন, কত সহজেই না সম্পর্ক তৈরি হয়, আপনি জীবনে না এলে বুঝতেই পারতাম না।’
অরুণিমাভ মুচকি হাসলেন এ কথার পৃষ্টে। দীক্ষা বলে চলে, ‘আমার একটা উপকার করবেন? বলতে পারেন শেষ উপকার…’
শব্দটা চুবলো হৃদয়ে, তবে প্রকাশ না করেই তিনি মাথা ঝাঁকালেন, ‘হুঁ? বলো?’
ধীরে ধীরে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো দীক্ষা। একবার খালেদার দিকে তাকিয়ে আবারও অরুণিমাভের দিকে দৃষ্টিপাত করে, ‘সময় হয়ে গেছে। আমি ওর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।’
‘কার সঙ্গে?’ সহসা বুঝতে না পারলেও হঠাৎ নামটা মাথায় ঘুরে এলো তার, চুপ হয়ে গেলেন তিনি,
দীক্ষা বলল ফের, ‘একবার ব্যবস্থা করে দেবেন? ও জেলে আছে।’
‘আমি জানি।’
‘কীভাবে?’ চমক খেলে গেল তার দু-চোখে।
অরুণিমাভ উত্তর দিলেন না।
কেন যেন বারবার মনে হচ্ছিল, শিশির ফিরে আসতে পারে, দু’জনের সম্পর্কের সুতোর জোর কমে গেলেও ছিঁড়ে তো যায়নি। সেই জোর আবারও দৃঢ় করতে পারে তাদের দু’জনের সন্তান! সেই তাগিদেই কেন যেন খোঁজ খবর করেছিলেন তিনি। জেনেছিলেন সবকিছুই। শিশিরের না-পুরুষ হওয়া, ড্রাগসের মামলায় জেলে যাওয়া- কিছুটা নির্ভার হয়েছিলেন তিনি। তবে আজ সেই নিশ্চিন্ত মনে পুনরায় জেঁকে বসছে একটা ভয়, আতংক- দীক্ষা কি আবারও শিশিরের কাছে চলে যেতে চাইছে?
‘কি হলো, বলুন? কি করে জানলেন? আমায় সে রাতে ফোন করেছিল আমার শ্বাশুড়ি, তার মাধ্যমেই সব খবর পাই আমি। জানানোর জন্য উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে পড়ে যাই… কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন যে সে জেলে আছে?’
এবারেও নিশ্চুপ রয় অরুণিমাভ। তারপর মৃদু শ্বাস ফেলে মাথা ঝেড়ে মুখ তুলে তাকান তিনি, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি জোর করে মেলে ধরার চেষ্টা করে বলেন, ‘তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাও তো? আমি দেখা করার সব আয়োজন করব।’
‘কেন দেখা করব, আপনি জানতে চান না?’
‘উঁহুম, তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি নাক ঢোকাবো কেন?’
অরুণিমাভ উঠে দাঁড়ালেন, ‘চিন্তা করো না, কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না ঠিক, তবে এর গভীরতাও কিছু দিয়ে মাপা যায় না। হঠাৎ করেই এই পৃথিবীতে অনেক কিছু হয়ে যায়। অনেক সম্পর্ক জুড়ে যায়, অনেক সম্পর্ক ছিঁড়ে যায়। হঠাৎ করেই… এই পৃথিবীটা একদিন তৈরি হয়েছিল যেভাবে, ঠিক সেভাবেই…আসি দীক্ষা, টেক কেয়ার!’
অরুণিমাভ বেরিয়ে গেলেন।
খালেদা তরতর করে এগিয়ে এলেন এবারে, ‘ওকে জানালি না কেন, কি জন্য দেখা করতে চাইছিস তুই? এই রহস্যটা কেন করলি?’
দীক্ষা অদ্ভুত চোখে মায়ের দিকে তাকাল, ‘তুমিও দেখেছ মা? দেখেছ তার চোখে?’
‘দেখব না! পৃথিবীর সবাই দেখছে, তার চোখে তোর জন্য… তুই তাকে বললেই হতো। বেচারা কি কষ্টটাই না পাচ্ছে ইশ!’
‘পাক…’ দায়সারা কণ্ঠে শুধালো সে, ‘কে বলেছে আমার জন্য তাকে কষ্ট পেতে? একা একা কে বলেছে একটা সম্পর্কের গভীরতায় নেমে মাপামাপি করতে? এখন ডুবে গেলে যাক…কেউ উদ্ধার করবে না, কেউ না।’
‘তুই ও না?’
দীক্ষা জবাব না দিয়ে ফুলের বুকেটার দিকে তাকিয়ে রইল। টকটকে লাল গোলাপ যেন ভালোবাসার প্রতীকী চিহ্ন বহন করে!
মাসখানেক পর।
রোববারের ঝলমলে সকাল। প্রকৃতিতে আজ উৎসবের আমেজ, সোনালী রোদ এসে পড়েছে গাছের পাতায়, পথঘাট ঝলমল করছে। অথচ দীক্ষার মনে আলোর ছিটেফোঁটা ও নেই। তার কোল জুড়ে এক গভীর শূন্যতা, আর হৃদয়ে এক তীব্র যন্ত্রণা। বুকের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে আজ এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে এসেছে।
নিরাপত্তা তল্লাশি শেষ করে দীক্ষা যখন জেলখানার ভিআইপি ভিজিটিং রুমের নির্জন, বিষণ্ণ পরিবেশে প্রবেশ করল, তখন তার শরীরের সমস্ত র ক্ত যেন হিম হয়ে গেল।
অপেক্ষার পর, গারদ দেওয়া সাক্ষাৎকারের ঘরে এল শিশির। চমকে গেল সে। দুই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই লোকটা কে? কোথায় সেই হ্যান্ডসাম, চার্মিং ছেলে? কোথায় সেই শিশির, যার হাসি দেখলে শত রাগ নিমেষে গলে যেত!
শিশিরকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সময়ের স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এক অজানা, অন্ধকার গুহায়। তার চেহারা একদম বিধ্বস্ত, গায়ের রঙ চিমসে গেছে, গালে রুক্ষ খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সবচেয়ে চোখে লাগছে তার পোশাক। ময়লা, কুঁচকানো, কত বছর না ধুয়ে ব্যবহার করা হয়েছে, কে জানে! অথচ এই ছেলে একসময় আয়রন ছাড়া জামা পরত না, সবসময় ম্যাচিং করে পোশাক পরতে ভালোবাসত। পরিস্থিতি মানুষকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়!
গলার হাড় বেরিয়ে গেছে আরও। সে যেন তার আগের শরীরের খোলস ছেড়ে অন্য কারো শরীর ধারণ করেছে।
দীক্ষার দুই চোখের পানি আর বাঁধ মানল না। সে দু’হাতে মুখ চেপে ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।
আর শিশির, সে কল্পনাতেও ভাবেনি এ জীবনে দীক্ষাকে আরেকবার দেখতে পারবে! সেই তৌফিক তাকে দেবে রব! দীক্ষাকে এইখানে, তার সামনে- এ যেন এক অলীক স্বপ্ন।
সে খেয়াল করল, দীক্ষার সেই উঁচু পেট নেই। এর মানে কি বাবু চলে এসেছে? কোথায় বাবু? সে কি তার সন্তানকে এক নজর দেখতে পারবে না? দীক্ষা কোথায় থাকে এখন, কী করে, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ভদ্রলোকই বা কে? কত কত প্রশ্ন তার হৃদয়ের ভেতরে দলা পাকিয়ে উঠছে, অথচ মুখ ফুটে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারে না শিশির। তার কণ্ঠস্বর যেন কোথাও আটকে গেছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
দীক্ষা চোখ মুছে এবার নিজেকে সামলে নেয়। দু’হাতে গ্রিল চেপে ধরে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঠেকায় গ্রিলের ওপরের রডে। চোখ বন্ধ করে আওড়ালো, তার কণ্ঠস্বর কান্নার কারণে প্রায় রুদ্ধ,
‘তুমি আমায় ভেঙেছিলে যেন আর উঠে দাঁড়াতে না পারি বলে, শিশির। অথচ দেখো- আমি হৃদয়ের ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে নতুন রূপে, নতুন সাজে মোসাইক আর্ট করি আজকাল। সে খবর তোমার আঙিনায় বসা দোয়েলের থেকে জেনে নিও, একসময়ের প্রিয়, আজকের অপ্রিয়!’
কথাগুলো গ্রিলের সীমানা পার হয়ে শিশিরের বুকে গিয়ে বিঁধে।
দীক্ষা একদণ্ড দম টেনে নেয়, বুকটাকে ভরার চেষ্টা করে, আওড়ায় আবার, ‘তবে এমনই অপ্রিয় হলে তুমি যে… তোমার জন্য এখনো আমার চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। তবে এই জল, তোমার এই ধ্বংস দেখতে পাওয়ার আনন্দ নয় কষ্ট। এই জল – আমাদের পুরোনো দিনের স্মৃতিকে বিদায় জানানোর বেদনা। তুমি ভেবো না, তোমায় এভাবে দেখে আমি আনন্দে উল্লাসিত বোধ করছি। অত পাষাণ এ হৃদয় নয়। এককালে এই হৃদয়ের মণিকোঠায় তুমিই তো ছিলে… আমার রাজা হয়ে…’
শিশির কোনো জবাব দিতে পারল না। তার চোখে শুধু অনুশোচনা, অসহায়তা আর হারানোর যন্ত্রণা। সে জানে, এই ব্যবধান চিরকালের। কোনো কিছুর বিনিময়েই যে আর ফেরত চাওয়াও যায় না.. অধিকার পুরোপুরিই ফুরিয়েছে!
দীক্ষা শেষবারের মতো শান্তভাবে তার দিকে তাকাল, যেন এই দৃশ্যটাই তার জীবনের শেষ পাতা। এরপর আর চাইলেও বুঝি ওই মুখটা দেখা হবে না। একদণ্ড দম টানলো আবারও। তার চোখ দুটি তখন শিশিরের বিধ্বস্ত চেহারা থেকে সরিয়ে নিয়ে গ্রিলের দিকে স্থির।
‘তোমার হয়তো মনে হচ্ছে, আমি এখানে এসেছি তোমার এই করুণ অবস্থা দেখতে। অথবা তুমি হয়তো ভাবছো, অতীতের দুর্বলতা ভুলে গিয়ে আমি হয়তো তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি।’
দীক্ষা মাথা নাড়ে। একটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে, ‘না, শিশির। আমি এখানে তোমাকে ফিরিয়ে নিতে আসিনি। আমি জানি, শত কষ্ট হলেও, ভাঙা হৃদয়ের টুকরোগুলির প্রতি আমার মর্যাদা রাখতে হবে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্যই আজ আমি এসেছি, একটা চূড়ান্ত ফয়সালা নিয়ে।’
নিশ্চুপ শিশির।
দীক্ষা এগিয়ে এলো, গ্রিলে সামান্য চাপ দিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে….’ গলা কাঁপছে তার, তবু…তবু যে বলতেই হবে… দীক্ষা চোখ বন্ধ করে নিলো, তারপর ফুরালো বাকি কথাটা, ‘তোমাকে…ডিভোর্স দিয়েছি।’
শিশির হতবাক হয়ে গেল। চোখের চাহনি থেকে নিভে গেল সমস্ত আলো। ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এমন কিছু। তবে… এই কি ঠিক নয়?
যে মানুষটার বিশ্বাস নিয়ে খেলেছিল সে, যে মানুষটাকে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল সে নিজেই, সে তাকে কেন ফিরিয়ে নেবে? একদিন শিশির তাকে একা করে দিয়েছিল, আজ দীক্ষা তাকে একা করে দিয়েছে। হিসেব সমান সমান। দীক্ষা সইতে পারলে তাকেও যে সইতে হবে…
তাকে চুপ থাকতে দেখেই দীক্ষা তাকাল চোখ মেলে, অদ্ভুত স্বরে বলল, ‘কাগজে সই করে ডিভোর্সের সমস্ত আইনি নথি ডাকে পাঠানো হয়েছে। জলদিই পৌঁছে যাবে তোমার কাছে, জেলের ভেতরেই।’
একটু থেমে আবার বলল, ‘তোমাকে শুধু একটা কাজই করতে হবে, শিশির। ওই কাগজে সই দিয়ে আমার প্রতি তোমার করা অন্যায়ের ঋণ মেটাও। আমার জীবনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দাও। তোমার সেই ঋণ পরিশোধ হোক আমার নামের পাশ থেকে তোমার নামের শেষ অংশটুকু মুছে দিয়ে।’
শেষবারের মতো চোখে জমা শিশির নামক জলফোঁটা মুছে নেয় সে। মুখ তুলে তাকাল। বুক জ্বালা করছে। মানুষটার সব ভুল ক্ষমা করে একবার জড়িয়ে ধরা গেলে… না না, কীসব ভাবছে সে! অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ নেই.. নেই নেই নেই! অন্যায় যে করে… তার প্রতি ভালোবাসা কিসের? দুর্বলতা কিসের? মানুষটা তাকেই ঠকাইনি, ঠকিয়েছে তার মাকে, মিথ্যে করেছে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক, নিজের সঙ্গে নিজেই হটকারিতার চরম মূল্য শোধাচ্ছে আজ!
দীক্ষা পিছিয়ে গেল এক লহমায়, ‘আ…আসি।’
পিঠ ঘুরালো, আর ঠিক সেই মুহূর্তে, শেষবারের মতো শুনতে পেল শিশিরের মুখ থেকে বের হওয়া তার প্রিয় ডাক, ‘মহারানী!’
কেঁপে উঠল দীক্ষা। ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ল চোখের জল, গালে বেয়ে বুকে নামলো অঝোর ধারায়। দীক্ষা ফিরলো না। হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল থমকে।
শিশির হাসল অস্ফুটে, ‘ভয় নেই, তোকে থাকতে বলব না। চলে যাওয়ার সব বন্দোবস্ত তো আমিই করেছিলাম! শুধু এইটুকুই বলব, পৃথিবীর সব সুখ তোর নামে হোক… যা ছিল স্বপ্ন, তোর, আমার- আমাদের, সব পূরণ হোক, সব পূরণ হোক। আর হ্যাঁ… সরি!’
ফিরতি পথের পুরোটা সময় হাউমাউ করে কেঁদে গেল দীক্ষা। এ যেন মন আর মস্তিষ্কের এক নীরব স্নায়ুযুদ্ধ। মন চায় তাকে ফিরে পেতে, মস্তিষ্ক বলে, ফিরলেই যে নিজের প্রতি নিজের অসম্মান! যা সে করেছে, তাতে তার এই শাস্তিই কি প্রাপ্য নয়? মন বলে, প্রাপ্য কিন্তু তারপরও কাঁদে… গুমরে গুমরে কাঁদে…পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে। কেঁদে কেঁদে হয়রান হয়। থামে। আবার কাঁদে। এ অবর্ণনীয় কষ্টের নেই কোনো ব্যাখ্যা, এ যুদ্ধের নেই যেন শেষ।
অরুণিমাভ তাঁর হাতটি রাখলেন দীক্ষার হাতের উপর; স্পৰ্শটি মেঘের পালকের মতো কোমল- যেন যুগান্তরের মৌন সম্মতি। সেই হাতের উষ্ণ পিঠেই দীক্ষা তার অশ্রুভারিত গালটি নত করল, আর মুহূর্তেই ভিজিয়ে দিল সেই আলতো আশ্রয়টুকু।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩০
অরুণিমাভ নীরব রইলেন। জীবনের এমন কিছু সীমারেখা থাকে, যেখানে সমস্ত কথারা ফুরিয়ে যায়, কেবল হৃদয়ের নিস্তব্ধ ভাষণই সেখানে একমাত্র ভাষা।
যে হাহাকার-মাখা কান্না দিয়ে এই উপন্যাসের প্রথম পাতাটি উন্মোচিত হয়েছিল, আজ এই সমাপ্তি-চিহ্নটিও পড়ল সেই দীক্ষারই আর্দ্র নয়নজলে। অথচ, এই দুই কান্নার মধ্যে বিস্তর ফারাক। প্রথমটি ছিল হারানোর ভয় ও শূন্যতার আর্তনাদ; আর এই শেষতম অশ্রুধারা হলো- সকল পাওয়া, সকল পূর্ণতা এবং এক অনির্বচনীয় মুক্তির শান্ত সমর্পণ।
