Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৪
সানজিদা আক্তার মুন্নী

বাইরের প্রবল তুফান এখন শান্ত হয়ে গেছে আর চারপাশের পৃথিবী ডুবে আছে এক দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতায়। ​বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভেজা, রক্তাক্ত নাজহাকে পাঁজকোলা করে ঘরে নিয়ে আসে তৌসির। নাজহার জ্ঞান নেই তার নিস্তেজ শরীরটা তৌসিরের দুই হাতে এলিয়ে আছে সঁপে দেওয়া পাতার মতো। অতি যত্নে তৌসির তার শরীর থেকে ভেজা কাপড়গুলো ছাড়িয়ে নেয়, প্রতিটি ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দেয়। অনেক কসরত করে সব নোংরা আর রক্তাক্ত কাপড় খোলে তার গায়ে পরিয়ে দেয় একটি শুকনো টি-শার্ট। এরপর আঙুল চালিয়ে সযতনে গুছিয়ে দেয় তার অবিন্যস্ত, ভেজা চুলগুলো। তবে ব্যান্ডেজ করার সুবিধার্থে একটু পরেই টি-শার্টটি খুলে কোমর পর্যন্ত একটি কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয় নাজহার শরীর। ​

নাজহার ফর্সা চামড়ায় চাবুকের কালশিটে দাগগুলো এখন ক্রমশ গাঢ় রূপ ধারণ করছে। সেই কালচে দাগগুলোর দিকে তাকাতেই তৌসিরের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। মনে হয়, চাবুকের প্রতিটি আঘাত তার নিজের পিঠেই পড়ছে। নাজহা এখনো জ্ঞানহীন। তার দগ্ধ আর ক্ষতবিক্ষত চামড়ায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তৌসিরের গলা চিরে বেরিয়ে আসে একবুক হাহাকার “আমার যতটুকু সুখ ছিল, তা আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তুই গাদ্দারি না করলেও পারতি! আমি এসবের কিছুই চাই না, কিন্তু আমার হাতে আর কোনো উপায় নেই।”
​তৌসিরের হাত ধীরগতিতে নেমে আসে নাজহার তলপেটে। নাজহার গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানের কথা সত্যিই কি না এই সন্দেহ মনের কোণে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে তবু এক অজানা মোহ এসে ভর করে তৌসিরের ওপর। সে আলতো করে কান পাতে নাজহার পেটে। অনুশোচনা আর যন্ত্রণায় তার ভেতরটা এখন ছটফট করছে, বুকটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে ওর। নিজের সন্তানের অস্তিত্বের কথা এমন এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত পরিস্থিতিতে জানতে হবে, তা তৌসির কল্পনা করতে পারেনি কখনো।

​নাজহার পেটে মাথা রেখে সে স্তব্ধ হয়ে শুয়ে থাকে। কিছুই আর ভালো লাগে না তার, চারপাশের চেনা পৃথিবীটা বড্ড অচেনা আর অন্ধকার ঠেকে এখন। তার নিজের শরীরটাও আজ বেশ ক্ষতবিক্ষত, তবে আত্মার রক্তক্ষরণ যেন তার চেয়েও বহুগুণ বেশি। একবারের জন্য হলেও তার মনে হচ্ছে এখন৷ এই বীভৎসতা হতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত হচ্ছে না। নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকা তৌসিরের চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে নাজহার নাভিতে। মারিয়ামের মৃত্যুর পর দীর্ঘ বাইশটি বছর পেরিয়ে আজ প্রথমবার তৌসিরের চোখ দিয়ে পানি ঝরে। ​ঠিক এমন ঘোরলাগা মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যায়। বাইরে বিবিজান আর একজন মহিলা ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন। তৌসিরের শরীরটা বিছানা ছেড়ে উঠতে চায় না, তবু নিজেকে একপ্রকার জোর করেই টেনে তোলে সে। ভারী, ভাঙা গলায় আওয়াজ দেয়, “আসছি।”
​ডাক্তারকে শরীরের ক্ষতগুলো দেখাতে হবে, তাই নতুন করে কোনো কাপড় না পরিয়ে কাঁথাটা গলা অবধি সযতনে টেনে দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে।

​কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চলে যান। তৌসির আবার নাজহার শিয়রে এসে পাথরের মতো বসে থাকে। ডাক্তার জানিয়ে গেছেন, নাজহা তিন সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক ধকলের কারণে তার অবস্থা এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে তাকে। ডাক্তার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, নাজহাকে এখন সম্পূর্ণ শান্ত রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত ছোটাছুটি, দুশ্চিন্তা বা সামান্যতম মানসিক চাপও এই মুহূর্তে গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। এরই মধ্যে তার শরীরে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে, তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তৌসির পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার মুখের দিকে। নাজহার শুভ্র-লালচে গালগুলোতে এখন নীলচে কালশিটে, ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে পুরো চেহারাটায় এখন এক বিধ্বস্ত হাহাকারের ছাপ।
​আরও কিছুক্ষণ এই নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকার পর, তৌসির ধীর ও ভারী পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। দাদাজান তলব করেছেন তাকে। বাইরে বেরিয়ে ছাদে যায় ছাদে এসে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে সে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে, মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। ইয়াদ আর ওয়াসেম নিঃশব্দে এসে বসে তার দুই পাশে। ​বিবিজান তৌসিরের দিকে তীক্ষ্ণ, হিসেবি দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, “এখন কী করবি?”
​তৌসির এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “কী আর করব? কী-ই বা করার আছে? তোমার মনে হয় ও এই বাচ্চা রাখবে?”

​বিবিজানের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক কুটিল, শয়তানি হাসি। চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বলেন, “ও রাখবে না, তবে আমরা ওকে দিয়ে রাখাব। তোর বংশধর এখন খুব প্রয়োজন।”
​তৌসিরের কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে, ভ্রু কুঁচকে সে জিজ্ঞেস করে, “কেমনে?”
​বিবিজান এবার পাশ ফিরে তাকান দাদাজানের দিকে। দাদাজান তৌসিরের চোখে চোখ রেখে এক ক্রুর, পৈশাচিক হাসি হেসে বলেন, “শোন তাহলে।
​দাদাজানের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা শোনার জন্য তৌসির কৌতূহল নিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে।
এদিকে নাজহার জ্ঞান ফিরে।
জ্ঞান ফিরতেই নাজহার গোটা স্নায়ুতন্ত্র জুড়ে সাপের তীব্র বিষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ধমনিতে অসহ্য এক জ্বালা, মনে হচ্ছে ওর কেউ ওর শিরায় শিরায় গলিত সীসা ঢেলে দিয়েছে। যন্ত্রণায় শরীরটা কুঁকড়ে যায়, অসাড় হাত-পা থরথর করে কাঁপতে থাকে। গায়ে তৌসিরের পরিয়ে দেওয়া ঢিলেঢালা একটা বার্সেলোনার টিশার্ট আর ট্রাউজার। কিন্তু এই শারীরিক যন্ত্রণাও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, যখন স্মৃতির আঘাত এসে আছড়ে পড়ে বুকের ঠিক মাঝখানে।

ঘোর কাটতেই মাস্টার চাচ্চুর সেই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত মুখচ্ছবিটা মস্তিষ্কের পর্দায় বিদ্যুৎ-চমকের মতো ভেসে ওঠে। লুটিয়ে পড়া দেহ, রক্তে ভেজা সাদা শার্ট কাটা গলা, নিথর দু’চোখ, সবকিছু একসঙ্গে ঝাপটা মেরে আসে। আর এক মুহূর্তও বিছানায় স্থির থাকতে পারে না নাজহা। অবশ, ক্লান্ত শরীরটা টেনেহিঁচড়ে সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। বিছানায় পড়ে থাকা ওড়নাটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে, খাঁচায় বন্দি কোনো আহত, ক্ষিপ্ত পাখির মতো ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তার গন্তব্য একটাই, নিজের বাড়ি। এক্ষুনি সে বাড়ি যাবে।
কিন্তু নিচে নেমো সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তৌসিরের মা আর চাচি পথ আটকে দাঁড়ান। দু’দিক থেকে জাপটে ধরে কাতর গলায় বোঝানোর চেষ্টা করেন, “তুমি প্রেগন্যান্ট নাজহা! এভাবে দৌড়াদৌড়ি করলে তো বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে।”
‘বাচ্চা’ শব্দটা নাজহার ভেতরে জ্বলা দাউদাউ আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। তার চোখের কালচে সবুজ মণিতে হিংস্রতা খেলে যায়। তাদের আঁকড়ে ধরা হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে তীব্র আক্রোশে ছটফট করতে করতে সে চিৎকার করে ওঠে, “যাক মারা! এই পাপ মরে গেলে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার বড় সন্তানতুল্য মানুষটাই যখন দুনিয়াতে নেই, তখন এই জানোয়ারের সন্তান বাঁচবে কেন? এ আমার পেটেই ধ্বংস হোক! ছাড়ুন আমাকে, আমাকে আমার বাড়ি যেতে দিন!”

নিচতলায় এসেছিল রুদ্র সে গিয়ে তৌসির দের বলে নাজহার এই উন্মাদনার কথা এই খবর পেয়ে সিঁড়ি ভেঙে ঝড়ের বেগে নেমে আসে তৌসির। করিডোরে পা রাখতেই তার কানে আছড়ে পড়ে নাজহার বুকফাটা আর্তনাদ। ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে নাজহা বলছে, “আম্মা, আমায় ছাড়ুন! আমার মাস্টার চাচ্চুর লাশটা আমায় শেষবারের মতো দেখতে হবে। আমাকে এই পেটের সন্তানকে মারতে হবে, আমাকে আটকাবেন না!”
বলতে বলতেই হু হু করে কেঁদে ওঠে নাজহা। শোক আর ক্ষোভে অন্ধ হয়ে সে নিজের পেটেই পাগলের মতো কিল-ঘুষি মারতে শুরু করে, সে মনে করে এই কোমল উদরে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট প্রাণটাই তার সমস্ত যন্ত্রণার কারণ। বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে তাকে আটকাতে ছুটে আসেন। একপর্যায়ে নাজহা তাদের ভিড় ঠেলে সদর দরজার দিকে এগোতে সক্ষম হয় কিন্তু আফসোস একটু এগোতে চাইলেই তৌসিরের সুঠাম, পুরুষালি বাহুডোরে শক্তভাবে বন্দি হয়ে যায় সে। তৌসির এসে তাকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে পিছন থেকে। এতে নাজহা ছটফট করতে করতে কাতরাতে থাকে, “আমাকে যেতে দিন! আমার মাস্টার চাচ্চুকে দেখতে দিন তৌসির। ছাড়ুন আমায়!”
তৌসির তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে, দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে সজোরে এক ঝাঁকিয়ে চাপা কণ্ঠে গর্জে ওঠে, “তুই একা না এখন! তোর পেটে আমাদের সন্তান। তোর এই পাগলামিতে ওর ক্ষতি হয়ে যাবে!”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তৌসিরের গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে দেয় নাজহা। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে চিৎকার করে ওঠে, “এই সন্তান আমার না! এ আমার পেটে হলেও এই সন্তান আমার না। আমি ওকে পৃথিবীর আলো দেখতে দেব না। তুই আমার সন্তানের মতো চাচাকে মেরে ফেলেছিস, আর ভাবছিস তোর সন্তানের সুরক্ষা আমি দেব? আমি এই কীটকে দুনিয়াতে আসতে দেব না। ছাড় আমায়!”

নাজহার মুখে নিজেরই অনাগত সন্তানকে হত্যার এমন নির্মম ঘোষণা শুনে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বাড়ির সবাই তো স্তব্ধ এটা শুনে। মায়ের মুখে সন্তানের এমন মৃত্যু কামনা দেখে সবাই থ মেরে গেছেন। এই থমথমে স্তব্ধতার মাঝেই বিবিজানের গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে তৌসির কে বলেন, “ওকে নিয়ে ঘরে যা, তৌসির।”
তৌসিরের গ্রাস থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে নাজহা প্রলাপ বকতে থাকে, “আমি যাব না! আমাকে বাড়ি যেতে হবে। আব্বাকে গিয়ে বলতে হবে তোরা আমার চাচ্চুকে মেরে ফেলেছিস। তৌসির শিকদার, ওরা তোকে ধরে নিয়ে গেল, তোকে মারল না কেন? তুই মরিস না কেন? তুই মরে গেলে আমার জন্য অনেক ভালো হতো। তুই মারা যা, নয়তো আমি তোকে কুপিয়ে মেরে ফেলব! তোর ওই ব্যাস**সা বিবিজান, আর তুই তোরা সবকটা মর! এত পাপ করিস, তাও তোদের ওপর আল্লাহর গজব পড়ে না কেন?”
মানসিক ভারসাম্য প্রায় হারিয়ে ফেলা নাজহা যা মন চায় তা বকতে থাকে। তবে তাকে আর একটা শব্দ উচ্চারণের সুযোগ না দিয়ে তৌসির তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। যাওয়ার সময় বিবিজানের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু একটা বুঝিয়ে সোজা হাঁটা ধরে নিজেদের ঘরের দিকে।

ঘরে এনে নাজহাকে বিছানায় বসিয়ে দেয় তৌসির। নাজহা স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে উঠতে চাইলেই তৌসির তাকে শক্ত হাতে চেপে ধরে আটকিয়ে নাজহার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। মাথা নিচু, দু’হাত প্রসারিত। একজন সর্বস্বান্ত, অসহায় ভিক্ষুকের মতো করুণ গলায় সে বলে, “আমার সাথে সংসার করা লাগব না নাজহা তোর। আমি জানি, তুই আমায় কখনোই আর আপন করবি না। কিন্তু এই মুহূর্তে, আমি তোর কাছে আমার সন্তানের জান ভিক্ষা চাচ্ছি। দিবি আমার সন্তানের জান ভিক্ষা আমায়? একটু দয়া করবি এই হতভাগাকে?”
নাজহার চোখের পানি ততক্ষণে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সেখানে এখন শুধু জমাট বাঁধা শূন্যতা আর একরাশ তীব্র ঘৃণা, তার ভেতরটা এখন অগ্ন্যুৎপাতের পর জ্বলেপুড়ে যাওয়া এক ধূসর জনপদ। তৌসিরের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে শীতল গলায় সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আপনি দয়া করেছিলেন আমায়? আমার মাস্টার চাচ্চুর প্রাণ ভিক্ষা দিয়েছিলেন?”

নাজহার কালচে সবুজ চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তৌসির অবিচলিত কণ্ঠে জবাব দেয়, “ওটা তোর গাদ্দারির প্রাপ্য ছিল। ওখানে আমার কথা বলা জায়েজ ছিল না।”
কথাটা শোনামাত্রই নাজহার কপালের রগ ফুলে ওঠে। নীলচে শিরাগুলো মনে হয় এখুনি ছিঁড়ে যাবে। বুকের ভেতর ডুকরে ওঠা হাহাকারটা প্রাণপণে চেপে রেখে সে ক্ষিপ্ত গলায় হিসহিস করে বলে ওঠে, “আমি বলিনি! আমি কোনো গাদ্দারি করিনি। আমি তো এই সন্তান আর আপনাকে নিয়ে একটা সুন্দর সংসারের স্বপ্ন দেখছিলাম। এর বাইরে কারো সাথে আমার কোনো লেনাদেনা ছিল না। আমাকে আর একটা বার বিশ্বাস করলে কী হতো তৌসির শিকদার? আরেকটাবার পারা যেত না? আমার জন্য নাকি আপনার কাছে সব মাফ, তাহলে বিনা অপরাধে আমার সামনে আমার সন্তানের হত্যার এই শাস্তি কেন দিলেন? আপনি আমার সন্তান সমান চাচ্চু কে বাঁচতে দেননি, আমিও আপনার সন্তানকে আমার পেটে ঠাঁই দেব না। ব্যাস, কথা শেষ! আমার ‘না’ আর কোনোদিন ‘হ্যাঁ’ হবে না!”
নাজহার কথাগুলো তৌসিরের বুকের ভেতর একটা গভীর ক্ষত তৈরি করে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। সেই দৃষ্টিতে আছে এখন এক অসহায় পুরুষের ভেঙে পড়া অস্তিত্ব। তৌসির আর স্থির থাকতে পারে না। সে হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় আরো একটু এগিয়ে যায় নাজহার পায়ের কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতে নাজহার দুটো হাত নিজের মুঠোয় তুলে নিয়ে ও ভেঙে পড়ে মিনতির ভারে,
“তুই যা চাইবি আমি তাই করমু। আমার মরণ তো তোর সবচেয়ে বড় কাম্য, তাহলে আমি মইরা যামু। তারপরও তুই আমার নিষ্পাপ বাইচ্চাটারে একটু তোর পেটে ঠাই দে না। দয়া কর না এতটুকু আমারে। আমার পাপের শাস্তি দিস না আমার নিষ্পাপ অস্তিত্বটারে। আমার সন্তানের জানটা আমারে ভিক্ষা দে, নাজহা! দিবি এই হতভাগারে ভিক্ষা? আমার সন্তানের জানটা ভিক্ষা দে আমারে! আর নিঃশ্ব করিস না নাজহা আমায়। আর নিতে পারমু না সহ্য ক্ষমতা ফুরায়া গেছে আমার।”

নাজহা এসব শুনে নিজের হাত ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করে না। কারণ হাত ছাড়ানোর জন্য যে শক্তির প্রয়োজন, তা তার ভেতর আর অবশিষ্ট নেই। সে এখন সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছে। এমন এক পাথর, যার বুকে আঘাত করলেও আর কোনো শব্দ ওঠেবে না বা কোনো প্রতিধ্বনি ফেরবে না। তার চোখের পাতাও কাঁপে না। পাথরের মতো নিথর কণ্ঠে নাজহা বলে ওঠে,
“তাহলে আমার মাস্টার চাচ্চুর প্রাণ ফিরিয়ে দিন। আমিও আপনার সন্তানকে আমার গর্ভে ঠাই দিব।”
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ তৌসির নাজহার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নাজহার মুখে এখন আর কোনো আবেগ, ক্রোধ বা অভিযোগ নেই। সেখানে আছে শুধু এক ভয়ংকর শূন্যতা, যা যেকোনো অভিশাপের চেয়েও ভয়ংকর। তৌসিরের ঠোঁট কাঁপতে শুরু করে অনেক কষ্টে, প্রায় শ্বাস বন্ধ করে সে উচ্চারণ করে,
“এইটা সম্ভব না।”
নাজহার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক টুকরো হাসি। তাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ আর ভাঙনের সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই, সে বলে ওঠে,

“তাহলে এই সন্তানেরও বাঁচা অসম্ভব। আপনার মতো পশুর সন্তান আমি জন্ম দিব না, অবশ্যই না। আমি জন্ম দিব, তারপর বড় হবে, বড় হয়ে আপনার মতো পশু তৈরি হবে, আপনার মতো কত মায়ের বুক খালি করবে, মায়েরা আমার মতো সন্তানকে হারিয়ে হাহাকার করবে, আর এই পেটের সন্তান আপনার মতো পশুরূপ নিয়ে তা দেখবে। না, আমি আর পাপ বাড়াতে দিব না। আমার সবচেয়ে বড় ভুল, আমি আপনায় ভালোবাসতে চেষ্টা করতাম। আপনার সাথে সংসার করার স্বপ্ন দেখতাম। বিছানায় আপনার সুখের জন্য কাতরানোর মতো যন্ত্রণা নিয়েও আপনাকে সায় দিতাম। আপনার জন্য নিজের বাপ-চাচার বিরুদ্ধে গিয়েছিলাম। আপনার জন্য নিজের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে এই সংসারে থাকার স্বপ্ন দেখতাম। আপনার জন্য নিজের প্রথম ভালোবাসাকে ভুলার চেষ্টা করতাম। আপনার জন্য তাহাজ্জুদের মোনাজাতে বসে আপনার ভালো চাইতাম। আপনার জন্য নিজের রাগ-জেদ ছেড়ে দিতাম। আপনার হাসিমুখ দেখলে নিজেও হাসতাম। আপনি এত খারাপ হওয়ার পরও আপনাকে আদর্শ স্বামী হিসেবে দেখতাম।
কথাগুলো বলতে বলতে নাজহার গলা ধরে আসে না, চোখও ভেজে না। কারণ কান্নার জন্য যে অশ্রুর প্রয়োজন, তা তার অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। সে পথারের মতো বলতে থাকে,

“আর এই অত্রকিছু আমার অপরাধ ছিল। যে অপরাধের মাসুল দিতে গিয়ে নিজেও রক্তাক্ত হলাম, সাথে নিজের সন্তানের মতো চাচার রক্ত দিয়ে গোসল করলাম। সব আমার ভুল সব আমার ভুল আর এর প্রায়শ্চিত্তও আমি করব। প্রথমে এই সন্তানকে মারব, তারপর নিজে মরব। ব্যাস, সব শেষ।”
তারপর হঠাৎ নাজহার কণ্ঠে ফিরে আসে সেই বিদ্রূপ আর তীব্র বিষাক্ত হাসি ও তাচ্ছিল্য করে বলে,
“আপনি সন্তানের জন্য এত বেপরোয়া হচ্ছেন কেন? মাগিবাজ আপনি, মাগিদের অন্যের মানুষের বিছানায় পাঠাতে পারেন, আর নিজের বিছানায় আনতে পারেন না? এতদিন আনেন নাই, এখন আনবেন। একেকজনের থেকে একেকটা সন্তান নিবেন, সমস্যা কী?”

নাজহার এই কথাগুলো বুলেটের মতো ছিটকে এসে বিঁধে তৌসিরের বুকে। তার কাছে প্রতিটা শব্দ এক একটা ক্ষত, প্রতিটা বাক্য এক একটা মৃত্যুর মতো মনে হয়। তার বুক ফাঁপা লাগতে শুরু করে, মনে হচ্ছে তার ভেতরে কিছুই নেই, সব কিছু খালি, সব কিছু শূন্য। সে আর কোনো কথা বলতে পারে না। কী বলবে সে? কোন যুক্তিতে নিজেকে আড়াল করবে? কোন মিথ্যে দিয়ে এই সত্যকে ঢাকবে?

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৩

ধীরে ধীরে সে নাজহার হাত ছেড়ে দেয়। হাতটা প্রাণহীন বস্তুর মতো ঝুলে পড়ে নাজহার পাশে। তৌসির মাটিতে বসে পড়ে। না, ঠিক বসা নয়, মনে হয় কোনো অদৃশ্য ভার তাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। সে অচেতন, অসাড় হয়ে পড়ে এমনকি তার নিঃশ্বাসটুকুও মনে হয় তার নিজের নয়।
তৌসির মাথা নিচু করে বসে থাকে। কী হলো তার সংসারের? হায়, আজ কী দশা হলো তার সংসারের? এ কেমন দশা!

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৫

5 COMMENTS

  1. খুব পাট গুলো একটু তাড়াতাড়ি দিবা প্লিজ তুমি কিন্তু অনেক দেরি কেন দাও

    অপেক্ষায় থাকবে আপনার এক নিরহ পাটিকা এই উপন্যাসের জন্য

  2. অপেক্ষায় থাকলাম নেক্সট পার্ট এর জন্য

Comments are closed.