হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫২
সাঞ্জেনা শাজ
পজা তুলোর মতো হালকা পলকা শির্নকায় তনুকে বক্ষবন্ধনী করেই হাসপাতালে থেকে বাড়িতে পৌচেছে মেহরাদ। গাড়িতেও নিজের অস্তিত্বের একমাত্র অবলম্বনটাকে নিবিড় মমতায় বুকের পাজরে আগলে রেখেছে। যেন সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম আঁচ থেকেও দু হাতের কঁবচ দ্বারা রক্ষা করছে সে তার প্রান’কে।
বাড়িতে পৌছাতে পৌছাতে বিকেল হয়েছে তাদের। পূব আকাশে তখন কিঞ্চিৎ লালিমার আস্তরণ। ব্যাথা নাষক ঔষধের প্রভাবে তন্দ্রায় শুভ্রতা দু’চোখ বুদে ঘুমের রাজ্যের পারি দিয়েছি সেই কখন। মেয়েটা মেহরাদের কোলেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে কাটিয়ে এসেছে সারা রাস্তা। শায়ান তালুকদার আঁড়ে আঁড়ে বার কয়েক দেখেছে মেহরাদের শান্ত স্থীর মুখভঙ্গি। অনুভূতি শূন্য চোখ দুটো ঘুমন্ত মেয়ের দিকেই দাবিত দেখেছে যতবার পিছু তাকিয়েছে ততবার। অন্তস্থঃতলের কোথা থেকে যেন আক্ষেপের মিশলে দীর্ঘশ্বাস বেরয়ে আসে। তারা তালুকদার বাড়ির ছেলেরা আসলেই জান প্রান দিয়ে ভালোবাসতে পারে।যেমন ভেসেছিলো সে!
রিমা আর তার ডিবোর্সের কার্যক্রম কবে থেকেই চলছে। খুব শিগগিরই শেষ কার্যক্রমের ডাক ভেসে আসবে বোধহয়! আবারও প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। ভুলের ক্ষমা হয়, অন্যায়ের নয়। কাউকে ধোকা দেওয়া কখনোই অনিচ্ছাকৃত হয় না। এটা হিয় সম্পূর্ণ প্ল্যান মাফিক। তাই এর ক্ষমার কোন প্রশ্নই আসে না।
গাড়ি বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দমকা হাওয়ার ন্যায় অতীতের সকল স্মৃতিরা ঝেকে ধরলো। সেদিনের সেই ব্যবহার, আচার আচরণ সব। সে কি করে আবার আজ তাদের মুখোমুখি হবে! কি ভাববে তারা? নিজের অচল, পিতৃ পরিচয়হীন মেয়েকে গছিয়ে দিতে এসেছে!
গাড়ি থামতেই পুরনো স্মৃতির ভেলা থেকে বের হলো শায়ান তালুকদার। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে গাড়ি থেকে বের হয়ে পিছনের গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। মেয়ে তার এখনো গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। ঠিক কতো দিন পর মেয়েকে এভাবে ঘুমাতে দেখলেন সঠিক বলতে পারবেন না তিনি।
দৃষ্টি উচিয়ে মেহরাদকে বললেন,
“ওঁকে ডেকে দাও। এভাবে সকলের সামনে নিয়ে যাওয়া টা সমীচীন নয়….”
“প্রয়োজন মনে করছি না।” মেহরাদের কাট কাট কন্ঠের এক বাক্যের প্রতিউত্তর। মেয়েটাকে ওভাবেই নিয়ে বের হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো।
তালুকদার বাড়ির সকলে আশ্চর্যের শিয়রে। হতভম্ব ভাব যেনো তাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে৷ এ যেনো কোন ভিম্রম। শুভ্রতাকে খুঁজে পেয়েছে এটা যেন অবিশ্বাস্য কিছুই! মেহরাদ উপস্থিত সকলের সামনে করেই সিড়ি ভেঙে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হলো ভারী কদম ফেলে। কারো সাথে কোন বাক্য বিনিময় করার প্রয়োজন বোধ করলো না সে।
জাহানারা বেগম, সুরাইয়া বেগম, শান্তা,সোহানা সকলেই আশ্চার্যিত৷ তাদের কারো জানা ছিলো না শুভ্রতাকে খুঁজে পাওয়ার কথা। দু’বোন এক ছুটে ভাইয়ের পিছু পিছু উপরে উঠে গেলো।
ধীর কদমে শায়ান তালুকদার বাড়ির চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। ঢুকতেই এক জোড়া অনূভুতি শূন্য, দয়ামায়াহীন দৃষ্টির কবলে পরলেন। চোখের তারায় প্রশ্নের বান। যেন দৃষ্টিতই প্রশ্ন ছুড়ছে, এটা তো কথা ছিলো না! কথার বরখেলাপ কেন হলো?
আড়ষ্টতায় কন্ঠ রোদ হয়ে এলো শায়ান তালুকদারের। খুব বড়ো মুখ করে তার থেকে নিজের মেয়েকে সম্পূর্ণ দূরে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আর কখনো ফিরবে না দম্ভ নিয়ে ঢাকা শহর ছেড়ে ছিলেন। নিজের দম্ভ টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি, তার দম্ভ শেষ পর্যন্ত বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়েছে মেহরাদের প্রেমিক সত্তার কাছে। তাই, দ্বিতীয় বার আর সেদিকে দৃষ্টি দিলেন না তিনি৷ ত্রস পায়ে চলে গেলেন নিজ কামরার দিকে। সুরাইয়া বেগম আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না। দু’দিকের শ্মশানের মতো শুনশান নীরবতা তাকে গভীর ভাবনায় ডুবিয়ে দিলেন বেশ।
“কোন জাত পরিচয়হীন মেয়ে কিভাবে তালুকদার বাড়ির বড়ো বউ হতে পারে? ওর পা’য়ের অপারেশনে ব্যার্থ হয়েছে ডাক্তাররা। ঠিক হবে কি হবে না, তার-ও কোন নিশ্চয়তা নেই। জীবনের আশংকা রয়েছে।এতো এতো ত্রুটিযুক্ত মেয়েকে আমি আমার একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না। আজ থেকে ৩ মাস পূর্বে আমার বক্তব্য যা ছিলো আজও ঠিক তা-ই। এর কোন হেরফের হবে না। এবার তোমরা যা খুশি ভাবতে পারো। আমি আমার বক্তব্যে অটল। ওর জন্যই আমার ছেলে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে এসেছে। এতদিন মনে না হলেও তখন আমি উপলব্ধি করেছি, শুভ্রও ওর জন্যই মা/রা গিয়েছে। ও একটা অপয়া, অলুক্ষণে। আমি চাইনা ওর কোন ছায়া আমার ছেলের জীবনে পরুক, ব্যাস।”
সন্ধ্যার গুমোট পরিবেশকে আরও কিছুটা ভারী করে তুললো জাহানারা বেগমের একেকটা বাক্যে৷ চারদিকে তখন গা ছমছমে নিঝুম নীরবতা বিরাজমান। উৎকন্ঠায় ছটফটিয়ে উঠছে উপস্থিত প্রাণদের অন্তস্তল। অপ্রত্যাশিত বাক্যালাপ কর্নকুহুর হতেই সুরাইয়া বেগমের চোখ কপালে উঠে গেলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিপাত বড়ো জা’তে নিবদ্ধ।
শান্তা, সোহানা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া শুরু করেছে। তারা। মেয়েটাকে কতটা ভুল বুঝে ছিলো এতদিন! আর মেয়েটা কতোই না কষ্ট ছিলো! এতসব কিছু তাদের কাছে আড়াল করে রাখা হয়েছে। সুরাইয়া বেগম বরাবরই আবেগীয় নারী। তাই তাকেও জানানো হয় নি এ বিষয়ে কিছু।
মেহরাদকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়ার পর পরই শুভ্রতার পা’য়ের অবস্থা বেগতিক দেখে ডক্টররা অপারেশনএর ডিসিশন নিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ এক অপারেশনের পরেও আশানুরূপ সাফল্যতা আসেনি তাতে। শায়ান তালুকদার তখন দিশেহারা প্রায়। রিমা বেগমের সাথে সম্পর্কে তখন নাই এর কোঠাতে। পরিবার থেকে একে একে সকলের কিছুটা নিস্প্রানতা তাকে পুরো পুরি ভেঙে দিয়েছলো।
দীর্ঘদিন হাসপাতালে এডমিট থাকা অবস্থাতে বার দু’য়েক কেউ আসতো বাড়ি থেকে। তখনও শুভ্রতার পা’য়ের নিশ্চলতার কথা কেউ তেমন জানতো না। সকলের ধারণা ছিলো চিকিৎসা চলছে, ঠিক হয়ে যাবে। তারপর একদিন হাসপাতালে জাহানারা বেগম উপস্থিত হলেন। মেহরাদ তখন আউট অফ ডেঞ্জার ছিলো।
ছেলের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েই তিনি শুভ্রতা নামক অপয়া মেয়েকে ছেলের জীবন থেকে সম্পূর্ণ দূর করার জন্য শায়ান তালুকদারকে কাট কাট কন্ঠে জানিয়েছিলেন, তিনি তার ছেলের জীবনে শুভ্রতাকে কখনো দেখতে চায় না৷ যেখানে মেয়েটার কোন বংশ পরিচয় নেই, কিছু নেই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন বিকলাঙ্গতা। সেই মেয়েকে তার ছেলে সারাজীবন কিভাবে বয়ে বেড়াবে? ছেলের এমন অনিশ্চিত জীবন কিছুতেই মানতে পারবে না তিনি। বলেছিলেন, বাড়ির মেয়ে হিসেবে ওকে রাখাই যেতো , এমনি সম্পূর্ণ পাওনাও পাবে আর্থিক ভাবে। কিন্তু তিনি তার ছেলের জীবন কিছুতেই নষ্ট হতে দিবে না। তাই মেহরাদ আসার আগেই দূরে কোথাও চলে যেতে বলেছিলো।
প্রবল আত্নসম্মানী শায়ান তালুকদার বড়ো ভাবির কথা শুনে, সেদিন অনেকটা দম্ভ নিয়েই মেয়েকে নিয়ে সবার প্রথমে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও যুৎসই কিছু হলো না। বরং কেচো খুড়তে কেউ সাপ বেড়িয়ে এসেছিলো। চারদিক থেকে বিপদের সংকেত। অথৈ জলে পরে হাবুডুবু খাওয়ার মতোই অবস্থা হয়েছিলো তার। এতকিছু যখন একা সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, ভেবেছিলেন বড়ো ভাই আসলে তার সাথে এ বিষয়ে আলাপ করবেন। সাহায্য চাইবেন।
আলতাফ তালুকদার তখন ছেলের সাথে বাহিরেই ছিলো। মাঝখানে একবার আদনানকে ওখানের দেখবাল করতে বলে দেশে ফিরেছিলেন। শায়ান তালুকদার সে সুযোগে ভাইয়ের সাথে কথা বলেও আশানুরূপ কোন প্রতিউত্তর পায়নি। ঘুরেফিরে একিই প্রতিক্রিয়ায় সম্মুখীন হয়েছে। তাই অনেকটা জেদ নিয়েই সকলের থেকে দূরে চলে গিয়েছে। শুভ্রতা তখন ছিলো সম্পূর্ণ জড়বস্তুর ন্যায় । নিজেকে তখন বোঝা ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। শুধু দুচোখের অশ্রুতে প্লাবিত হয়েছে কোপল।তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো অপেক্ষারত ছিলো, কেবল একটা বার মেহরাদ নামক মানবের সকল বাধা বিগ্নতা পায়ে পিষে তাকে কাছে টেনে নেওয়ার। দুনিয়ার সকল কিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করে ওঁকে বক্ষপিঞ্জিরায় বন্দী করে নেওয়ার। আবার কখনো নিজের সাথেই নিজে লড়াই করে বুঝিয়েছে, সে কারো বোঝা হতে চায় না। এ দূরত্বই কল্যানকর। সে কারো ক্ষতি ছাড়া ভালো কিছুই বয়ে আনতে পারে না। যাদের ভালোবাসে তাদের ক্ষতি হোক কিছুতেই সে চায় না। কিছুতেই না।
মেহরাদ যেন নীরব পাথর মূর্তিতে পরিনত হয়েছে। বজ্রহতের ন্যায় অনুভূতিশূন্য হয়ে শুনে যাচ্ছে সব।নিস্প্রভ দৃষ্টি যুগোল কেবল মমতাময়ী মা’য়ের কাঠিন্য রুপেই নিবদ্ধ। সোফার আরেকপ্রান্তে মাথা নিচু করে বসে আছে তার বাবা। কাকে কি বলবে সে! সবই তো তার আপনজন! কি করলে এ বিচ্ছিরি ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে!
“আমি পারিবারিক কোন দন্দ চাই না মেহরাদ৷ মেয়েটা খুব কষ্টে নিজেকে একটু একটু করে শক্ত করার চেষ্টা করেছে। সফল না হলেও সম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়নি৷ সেটা তোমার থেকে পালিয়ে বেরানোর প্রমাণ। আমি চাইনা ও এরকম কোন পরিবেশে থাকুক যেখানে ও আমন্ত্রিত নয়। যে জিনিস গুলো কারো হাতে থাকে না, তা নিয়ে খোটা শুনা খুবিই জঘন্য তম বিষয়, মেহরাদ। তোমার জন্য ওঁকে এখানে থাকতে হলেও, নিজেকে সর্বদা গুটিয়ে রাখতে হবে ওঁকে। হীনমন্যতায় ভুগবে। মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরবে। ওনাদের জায়গা থেকে ওনারা সম্পূর্ণ ঠিক হতে পারে। কোন জাত পরিচয়হীন, বিকলাঙ্গ মেয়েকে ওনারা মেনে না-ই নিতে পারে। খারাপ কিছু নয় এটা। আবার শুভ্রতার জাত পরিচয় নেই, এক পা নিশ্চল এতে মেয়েটারও কোন দোষ নেই। ও কেন অযথা কষ্ট পাবে? এতসব কিছু থেকে তোমাদের দু’জনার দূরত্বই আমি বেটার মনে করি। তুমি চাইলে…..”
“শুভ্রতা এতিম, তাই বলে ওকে মানতে সমস্যা হচ্ছে মা? তাই বুঝিই নতুন জীবন শুরু করতে বলেছিলে সেদিন?”
শায়ান তালুকদারকে থামিয়ে দিয়ে মা’কে নিস্প্রভ কিন্ঠে শুধালো মেহরাদ। কন্ঠে হিমপ্রবাহের ন্যায় শীতলতা। জাহানারা বেগমের মুখশ্রী আধারে ছেয়ে।
ছেলের প্রশ্ন শুনেও কোন প্রতিউত্তর করলেন না তিনি। বাবার দিকে তাকালো মেহরাদ। শূন্য, নির্জিভ কন্ঠে জানতে চাইলো,
“তুমি এতে সাপোর্ট করেছো? আমি বিশ্বাস করবো এটা?”
আলতাফ তালুকদারের নত মস্তক আরও খানিকটা নত হয়ে এলো। লজ্জার ভারে ছেলের দিকে দৃষ্টি স্থাপন করতে পারলো না। তখন যা সঠিক মনে হয়েছে তা-ই করেছে। তবে, আজ কেন এতো লজ্জিত হচ্ছে!
“শুভ্রতার পরিবারের বিষয়টা সম্পূর্ণ আমাদের হাতের বাইরে। এ বিষয়টি নিয়ে টানাহেঁচড়া করা নিতান্তই নিম্ন মনমামসিকতার কাজ। কার জন্ম কোথায় হবে এটা কখনোই কারো হাতে থাকে না। ওর হাতেও নেই। এ নিয়ে মেয়েটাকে পুরনো দিনের মানুষের মত কটু কথা শোনানো একদম লেইম একটা বিষয়। ছোট চাচ্চু আপনি ওকে বাহিরে কোথাও নিয়ে গেলেন না কেন চিকিৎসার জন্য? মেয়েটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে! ” আদনান জিজ্ঞেস করলো তাড় স্বরে। তার কন্ঠে শুভ্রতার জন্য উপচে পড়া মায়া। এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে মেহরাদের বাবা মা’কে তার কাছে সবচেয়ে জঘন্য মনে হচ্ছে। ছেলেটা এতদিন কি কষ্ট গুলোই না পেলো! তবুও একটা বার সত্যটা জানালো না! কি সুন্দর অভিনয় করে গেলো!
“সময়, সুযোগ, অর্থ কোনটাই ছিলো না আদনান। চট্টগ্রাম যখন গেলাম, এক্সিডেন্টের ব্যাপারে খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানলাম, এটা ফুল প্রুফ প্ল্যানিং ছিলো শুভ্রতাকে মা’রার। আমার মেয়ে বলে ওঁকে মা’রার সুপারি দিয়েছিলো আমার এক শত্রু। যেই মেয়েটাকে আমার মেয়ে বলে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেই মেয়েটার সাথে আমার কেবল রক্তের সম্পর্ক নেই বলেই আমার পরিবারের মানুষদের কতো বিমুখতা। চট্টগ্রাম ছিলো বিদায় ওঁদের হাতের নাগালে পেয়েছিলো ওঁরা। সবচেয়ে বড়ো কথা, শত্রু ছিলো স্বয়ং আমার ক্যাম্পের কর্নেল ওসমানী পাশা। ওনার এক সন্ত্রাস পুত্র’র মৃত্যু হয়েছিলো আমার গুলিতে এক মিশনে। উপরে উপরে উনি সবিটা মেনে নিলেও ভেতরে জঘন্য পরিকল্পনা করে গিয়েছিলেন। এতসব কিছু প্রমাণ সহ আইনের ধারস্ত হতে হতেই প্রায় মাসখানেক কেটে গিয়েছি।
শুভ্রতার তখন রেগুলার নরমাল চেক-আপ চলেছে। আর্মির জব পুরো পুরি ছেড়ে চট্টগ্রাম থেকে সরে গিয়েছিলাম। ভাই আসতে ওনাকে সব জানাতে উনিও নিরাশ করেছে আমায়। চট্টগ্রামকে নিরাপদ মনে হয় নি আমার। এতদিনের সখের চাকরি ছেড়েছি, পেনশন পেতেও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন তারউপর নিজ ইচ্ছেয় চাকরিচুত্য হয়েছি। রাজশাহী ছিলাম মেয়েকে নিয়ে। নতুন করে চাকরির দারস্ত হয়েছি জীবিকা চালাতে।
তালুকদারের এক পয়সাও নিজেদের রিজিকে লাগাবো ভাবলেও ঘৃনা হয় আমার। যে পরিবার বিপদে পাশে থাকে না, তার থেকে সাহায্য কিংবা প্রাপ্য কোনটাই আমার প্রয়োজন নেই। এই যে বসে আছি? বিশ্বাস করো? আমার রুচিতে বাধছে। ” বলতে বলতেই বিতৃষ্ণায় ছেয়ে গেলো শায়ান তালুকদারের মুখাবয়ব।
“আবারও যে কোন এট্যাক হবে না এর কোন নিশ্চয়তা আছে বলো? মেহরাদের কোন ক্ষতি হবে না এর কোন গ্যারান্টি আছে? সন্তানের ভালো চাইতে গেলে পৃথিবীর সকল মা বাবা-ই স্বার্থপর হয়, শায়ান। মেহরাদের এক্সিডেন্টের পরবর্তী মূহুর্ত গুলো আমি ছিলাম ওর পাশে। বাবা হয়ে সন্তানের মৃত্যু সংবাদ শোনার অপেক্ষায় ছিলাম এক প্রকার। এ যন্ত্রণা আমি ছাড়া কেউ কখনোই বুঝবে না। শুধু এতটুকুই বলবো, তুই ভুল বুঝছিস আমাদের।” ভাইয়ের উদ্দেশ্যে অপরাধী কন্ঠে বললেন আলতাফ তালুকদার।
শায়ান তালুকদার একটা তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে বললেন,
“আত্নার সম্পর্কে কখনো রক্তের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না ভাই। শুভ্রতার সাথে আমার আত্নার সম্পর্ক। আমার মেয়ে ও। আমার একমাত্র সম্ভল। তোমাদের প্রত্যাখ্যান ও নিজ কানে শুনেছে ভাই….” কন্ঠ রোদ হয়ে এলো ওনার। খুব কষ্টে আওড়াল,
“আমি ওকে দু ‘ দু’বার আত্নহত্যা করা থেকে বাচিয়েছি। আমার….আমার যন্ত্রণাটুকু কাকে বোঝাবো ভাই? কে আছে আমাদের শোনার? তোমাদের কাছে ও এতিম হলেও, আমার কাছে, আমার একমাত্র সম্ভল ও। ভাগ্যের নির্মমতা কি সুন্দর মেয়েটার উপর চাপিয়ে নিজেরা আদর্শ মা বাবা সাজছো বলো! বাসায় রেখে বাহিরে গেলে, আতংকে থাকতাম কখন না আবার ভুল কিছু করে বসে। তোমরা গিয়েছো কখনো এ যন্ত্রণায়….”
উপস্থিত সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে পরলো শায়ান তালুকদারের কথায়। জাহানারা বেগমের কলিজা মুচড়ে উঠলো। মেয়েটাকে ছোট থেকে মানুষ করেছে, ক্ষতি হোক চায় না কেবল দূরত্ব বাড়াতে বলেছিলো। তারা জানে শুভ্রতার মানসিক অবস্থার কথা। অবিশ্বাস্য কিছুই ঠেকলো না। সকলের চোখে অশ্রুর আভাস। এতটা কষ্টেই বুঝি ছিলো মেয়েটা! কেউ কাউকে দেয় এতটা কষ্ট! !
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো মেহরাদের স্নায়ুতন্ত্রে তীব্র অস্থিরতার আগুন দাবানলের বেগে ছড়িয়ে পড়ল । বুকের রক্ত তোলপাড় করা যাতনায় কাতর হয়ে উঠলো অনূভুতিরা। দিকবিদিকশুন্য হলো মস্তিষ্ক। এতক্ষণের শূন্য দৃষ্টি জলন্ত স্ফুলিঙ্গে পরিনত হয়েছে। চোখের তারায় দাউদাউ করছে আগুনের লেলিহান। ঝড়ের বেগে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েই হীম শিতল বাক্য ছুড়লো মা বাবার উদ্দেশ্যে,
“কোন এতিমকে পুত্রবধূ হিসেবে মানতে হবে না তোমাদের।। দুঃখীত তোমাদের মন মতো শু’পিসের পুত্রবধূ দিতে না পাড়ায়।ত্যাজ্যপুত্র করে দাও আমাকে। আমি আমার এতিম স্ত্রীকে নিয়ে আজ এই মূহুর্তে বাড়ি তালুকদার বাড়ি ত্যাগ করবো। তালুকদারদের সাথে আজ, এই মূহুর্ত থেকে সকল সম্পর্ক ছিন্ন হলো আমার। তোমাদের অমানবিক মনস্কামনা অপূর্ণ রাখার মতো অযোগ্য পুত্র হওয়ার জন্য আরও একবার দুঃখীত। আমার কষ্ট তোমাদের ছুঁতে না পারলেও তোমাদের কষ্টে আমি সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করবো।সুযোগ্য পুত্র না হলেও, পুত্র হিসেবে সবটুকু দায়িত্ব পালক করে যাওয়ার চেষ্টা করবো শেষ সময় অব্দি। আসছি….”
“মেহরাদ!!!” অশ্রুসিক্ত কন্ঠে চেচিয়ে উঠলেন জাহানারা বেগম। মেহরাদ পিছু ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাথায় জর্জরিত মেহরাদের কন্ঠে রোধ হয়ে আসে মা’য়ের মুখশ্রী কল্পনায় ভাসলে।দূরের মানুষের কাছ থেকে আশাহত হলে, রাগ হয়, জেদ বাড়ে। কিন্তু আপন মানুষদের থেকে আশাহত হলে আক্ষেপ হয়, দুঃখ বাড়ে। এঁদের সাথে কখনো যুদ্ধ করা যায় না। রাগ বাড়ে না, জেদ হয় না, দ্বীমুখতা আসে না। কেবল মর্মাহত হয় অন্তরগহীন।
জাহানারা বেগম ছেলের কাছে ছুটে গেলেন। এই এক ছেলে তার সব কিছু। ছেলের ভালোর জন্যই তো তিনি এসব কিছু করলেন! মা হয়ে ছেলের ভালো চাওয়া টা কি অন্যায়ের? তাহলে এ অন্যায়ের দণ্ডনীয় অপরাধী তিনি। তাই বলে এতবড় সাজা শুনাবে ছেলে? কিভাবে বাচবেন তিনি তাহলে?
ছেলের এক বাহু আকড়ে ধরলেন তিনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলের দিকে তাকাতেই মেহরাদের দুচোখ খিচে এলো হাহাকারে ৷ কোন সন্তানকি মা বাবার চোখের অশ্রু সহ্য করতে পারে?
“আমি তোর ভালোর কথা ভেবেই এসব করেছি বাবা। আমাদের তুই ভুল বুঝিস না। আমরা কি শুভ্রতাকে কম ভালোবাসতাম বল? আমরাই তো মানুষ করেছি ওঁকে? কিন্তু, কিন্তু ওর জন্য তোর কোন ক্ষতি আমরা কিভাবে মেনে নিবো বল? ছেলের জীবন নিয়ে শংকায় কোন মা বাবাই ভালো করে বাচতে পারে বল? আমাদের ছেড়ে জাস না বাবা। আমরা কি নিয়ে বাচবো বল? আমাদের তো শুভ্রতার প্রতি কোন রাগ জেদ নেই, আমরা শুধুই তোর কথা ভেবে ওকে দূরে রাখতে বলেছি। তুই কেন চলে যাবি বল? একটা বার মা’য়ের কথা ভাব! আমাদের ছেড়ে জাস না বাবা।”
“আমি তোমাদের থেকে এমনটা একদমই আশা করি নি মা। ” ছেলের ব্যাথা বিজোড়ীত কন্ঠে জাহানারা বেগমের দুনিয়া যেনো এলোমেলো হলো। ছেলে তাদের উপর বিশ্বাস হাড়িয়েছি, কষ্ট পেয়েছে তাদের আচরণে এটা যেন ধারালো অশ্রর ন্যায়ই খোচাতে শুরু করলো বক্ষস্থলে। অপরাধীর ন্যায় তিনি ছেলের পাজরে মাথা এলিয়ে বললেন,
“কি করলে মা বাবাকে ক্ষমা করবি, বাবা? তোর কন্ঠের অবিশ্বাস যে গলা চেপে ধরছে আমার। আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিস না বাবা। বাচতে পারবো না তো। এই অদম মা বাবাকে ক্ষমা করা যায় না, বাবা?”
“তোমরা আমায় একটুও বুঝো নি মা। বুঝলে কিছুতেই শুভ্রতাকে দূরে পাঠাতে পারতে না। ওর কিছু হয়ে গেলো আমি প্রাণহীন এক অস্তিত্বে পরিনত হতাম, মা। কিভাবে পারলে এটা করতে?”
“আমি ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবো, বাবা। তবুও ছেড়ে জাস না। তখন তোর উপর কোন কিছুই বেশি মনে হয় নি। তোর ভালোটাই মূখ্য মনে হয়েছে। আমাদের একা করে দিস না বাবা। ”
“শুভ্রতার জন্য আমার কি ক্ষতি হবে, মা? তোমাদের থেকে এরকমটা কিছুতেই আশা করা যায় না। এক্সিডেন্ট টা ফুলপ্রুফ প্ল্যানিং হলেও তখন আমাদের অজানা ছিলো সব কিছু। এখন তো সব কিছুই জানি, এখন নিশ্চয়ই কেউ চাইলেই ক্ষতি করতে পারবে না! আইন আছে,সোর্স আছে, ক্ষমতা আছে। কেউ চাইলেই আমার শহরে এসে আমার ক্ষতি করতে পারবে না, মা। সবচেয়ে বড়ো কথা, তুমি শুধু তোমার ছেলের কথা ভাবলে, আরেকটা মেয়ের কথা ভাবলে না? এতটা স্বার্থপর বলে তো আমি তোমাদের জানি না।”
অপরাধবোধে কুন্ঠিত হয়ে গেলো জাহানারা বেগম। ছেলে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে নিজেদের নিচু কর্মকান্ড। আহাজারি করে বললেন,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১
“আমাদের ভুল হয়ে গিয়েছে রে। কিভাবে মুখোমুখি হবো মেয়েটার? কি করলে মেয়েটা ক্ষমা করে দিবে আমাদের?”
বুক চিড়ে ব্যাথাতুর দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো মেহরাদের। তার মা বাবা অতিমাত্রায় নির্বোধ। নয়তো যত্রতত্র এমন শিদ্ধান্ত কিছুতেই নিতে পারতো না। ছেলের শোকে বিবেক লোপ পেয়েছিলো বুঝি! কে জানে! সে বরাবরই তার মা বাবার ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিলো, তাইতো কেন বিয়ে করেছে,কিভাবে করেছে, কিভাবে কি হলো দ্বিতীয় বার প্রশ্নটুকুও করে নি। তাদের কাছে বরাবরই সে প্রথম ছিলো। অঅতিমাত্রায় ভালোবাসা তাদের অন্ধ করেছে এটাই তার প্রমান।
