Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০
সাবা খান

নিস্তব্ধ রজনী, যেন এক বিস্মৃতির উদ্ভাস অস্বাভাবিক নীরব পরিবেশ। চাঁদের স্বর্ণালী আলো মেঘের পর্দায় লুকানো, আর চারপাশে শুনশান এক শূন্যতা। চারদিক জুড়ে ঘন কালো অন্ধকার, যেন পৃথিবীর বুকের উপর এক বিশাল শোকের চাদর বিছিয়ে আছে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও বাতাসের ঝাপটা গাছের ডাল নড়িয়ে দিচ্ছে, সেই শব্দটুকুও যেন এই রাতের গভীর নীরবতার কাছে খুব ক্ষীণ হয়ে আসে।
এই গভীর অন্ধকার রাতের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে “জাওয়ান ম্যানশন”
দূর থেকে দেখলে এটি যেন রাজকীয় কোনো প্রাসাদ। বিশাল লোহার গেট, সুদৃশ্য বাগান, মার্বেল পাথরে তৈরি উঁচু স্থাপত্য সবকিছু দেখে যে কারো চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠবে। মানুষ ভাববে, এ যেন বিলাসিতা আর ক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু এই ম্যানশনের দেয়াল জানে অন্য গল্প। কত মানুষের আর্তনাদ এই দেয়ালের ভেতরে চাপা পড়ে আছে, তা কেউ জানে না। কত নিরীহ মানুষের র*ক্ত মিশে আছে এই মাটির সাথে তার কোনো হিসাব নেই।
জমিনের উপর থেকে ম্যানশনটাকে দেখে মানুষের চোখ বিস্ময়ে ঝলমল করে ওঠে। কিন্তু যদি কেউ মাটির নিচের সেই ভয়ংকর বেজমেন্টটা দেখতে পেত, তাহলে সেই চোখগুলো ভয়েই ঝলসে যেত। ম্যানশনের নিচের বেজমেন্ট যেন অন্য এক জগৎ। সেখানে আলো কম, বাতাস ভারী, আর চারদিকে একটা অদ্ভুত পচা গন্ধ ভাসে যেন মৃত্যুর গন্ধ।

এই অন্ধকার বেজমেন্টের মাঝখানেই রয়েছে সোফিয়া জাওয়ানের সেই কুখ্যাত কক্ষ। ঘরের চারদিকে কাঁচের বড় বড় শোকেস সাজানো। আর সেই শোকেসগুলোর ভিতরে মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কোথাও শুকনো হাত, কোথাও কাটা আঙুল, কোথাও বিকৃত মুখের খুলি সবকিছু কাচের ভেতরে সংরক্ষিত। যেন কোনো অসুস্থ মানসিকতার মানুষের বিকৃত সংগ্রহশালা।
সেই শোকেসগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এক মানব পরিষ্কার করছে কাঁচগুলো। তার মাথা ভর্তি চুল অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে। এলোমেলো চুল কাঁধ ছাপিয়ে নেমে এসেছে। গোঁফ-দাড়ি সারা মুখ ঢেকে রেখেছে, যার কারণে বোঝাই যায় না তার আসল চেহারাটা কতটা সুদর্শন ছিল। কিন্তু তার চোখে মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। চোখের নিচে বহু দিনের গভীর ক্লান্তি জমে আছে, ঠোঁট শুকনো, মুখে অবসাদের রেখাা। তবুও তার হাত থামছে না ক্ষণিকের জন্য। একটার পর একটা শোকেস সে মুছে যাচ্ছে যন্ত্রের মতো। এই মানুষটা আর কেউ না,
“এসিপি তালহা আদিল”

একসময় যে মানুষটা ছিল দেশের একজন সাহসী অফিসার, আজ সে বন্দি। গত ছয় বছর ধরে সোফিয়া জাওয়ানের এই ভয়ংকর বেজমেন্টে বন্দি হয়ে আছে সে। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ যদি এই জায়গায় কয়েকদিন থাকত তাহলে সে নির্ঘাত পাগল হয়ে যেত। হয়তো তালহা অসাধারণ মানসিক শক্তির অধিকারী বলেই এখনো টিকে আছে।
কিন্তু তার চোখে তাকালেই বোঝা যায়, সে ভেঙে পড়েছে, ধীরে ধীরে ভিতর থেকে। যেন প্রতিটা দিন সে একটু একটু ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এই জায়গা থেকে পালানোর চেষ্টা সে বহুবার করেছে। অন্ধকার করিডোর দিয়ে দৌড়েছে, লুকিয়েছে, সুযোগ খুঁজেছে, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সোফিয়া জাওয়ানের সেই কুখ্যাত আলফা টিম। একদল প্রশিক্ষিত, নিষ্ঠুর মানবের দল, যারা এই বেজমেন্ট পাহারা দেয়। তারা কাউকে পালাতে দেয় না।
সোফিয়া জাওয়ান তাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে এক অদ্ভুত কারণে। তালহা তার জীবনের প্রথম ব্যক্তি যে স্বেচ্ছায় এই বেজমেন্টে এসেছিল, সত্যটা জানার জন্য।আর সেই ভুলটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও একটা কারণ আছে। সোফিয়া তাকে রেখেছে তার স্বামী ইকবাল জাওয়ানের নিঃসঙ্গতার জন্য। তার ইকবাল নাকি ভয় পায়।

তালহা এই ছয় বছরে একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে, সোফিয়া তার স্বামী কে অসম্ভব রকমের ভালোবাসে। বলতে গেলে অসুস্থ ভালোবাসা। সে প্রতিদিন দিনে একবার হলেও শত ব্যস্ততার মধ্যে ইকবাল জাওয়ানের সাথে দেখা করতে আসবে এবং তার সাথে যতক্ষণ সময় পারে এখানে বসে কথা বলতে থাকে, ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় সোফিয়া নড়ে না। নিজেই প্রশ্ন করে আবার নিজে উত্তর করে।
ওই সময় তালহাকে বের করে দেওয়া হয়, সোফিয়া শুধু একা থাকে। তালহা বুঝতে পারছে না, যদি স্বামীকে এতটাই ভালবাসে তাহলে হ*ত্যা করার কারণ কি?
নিশ্চয় কোন গভীর কারণ আছে যেটা সোফিয়া ছাড়া আর কেউ জানে না।
বেজমেন্টের এক পাশে রাখা আছে একটা বড় কাঁচের বক্স, সেটা এখনো খালি। কিন্তু তালহা জানে, ওটা খালি থাকার কারণ কী?

সোফিয়া যেদিন সানাকে খুঁজে পাবে, সেদিনই হবে তালহার শেষ দিন। সেই কাঁচের বক্সে বন্দি করা হবে সানাকে। আর তালহাকে হ*ত্যা করা হবে। এই ভাবনাটাই তাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে। তার মনের মধ্যে এখনো একটা ক্ষীণ আশার আলো আছে। ছয় বছর আগে সে এখানে একটা গোপন ক্যামেরা বসিয়েছিল। সেটা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু তার ভিতরে যত ভিডিও রেকর্ড হয়েছিল, সবকিছুর এক্সেস আছে তার ফ্ল্যাটে থাকা সার্ভারে। সেই সার্ভারের পাসওয়ার্ড শুধু তালহা জানে, স্বয়ং সিতারাও না। যদি কোনোভাবে সে এখান থেকে বের হতে পারে,
তাহলে সে এই নরকের সব সত্যি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবে। তাকে সোফিয়া নিজের সাথে হাত মিলনোর অফারও দিয়েছিল, কিন্তু তালহা তার মুখের উপর সাফ সাফ বলে দিয়েছে,
‘সে জীবন দিবে কিন্তু অন্যায়ে হাত দিবে না, আর না আপোষ করবে’
সোফিয়া জাওয়ান তাকে প্রতিদিন মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। তার টর্চারগুলো ভয়ংকর। একদিন তার হাতে একটা চাবুক ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার সামনে আনা হয় একটা ছোট নিষ্পাপ বাচ্চা। আর পাশে রাখা হয় এসিড ভরা একটা কন্টেইনার। সোফিয়া শান্ত গলায় বলে,

-“নিজেকে মা*রো, নাহলে বাচ্চাটাকে এসিডে ফেলে দেব”
তারপর তালহা নিজেই নিজের শরীর র*ক্তাক্ত করে ফেলে, যতক্ষণ তার হাতে শক্তি ছিল সে নিজেকে মে*রেছে, শুধু ওই শিশুটাকে বাঁচানোর জন্য। আরেকদিন তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল মৃতদেহের পাশে। আরেকদিন তাকে খাবার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বলা হয়েছিল, খাবারটা খেলে একজন বন্দিকে মে*রে ফেলা হবে। তালহা না খেয়ে থেকেছিল, কখনো তাকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয় দিনের পর দিন। কখনো কানে হেডফোন লাগিয়ে মানুষের আর্তনাদের শব্দ শোনানো হয়। এই সব মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়েই দিন কাটছে তার।
তালহার মতো শক্তপোক্ত পুরুষটাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। তালহা একটা শোকেস মুচছে ঠিক তখনই, দরজাটা ক্যাঁক করে খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করে সোফিয়া জাওয়ান।
তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্যের হাসি। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে রাখা একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে। তার চোখ স্থির হলো তালহার দিকে। ধীরে ধীরে ব্যঙ্গ করে বলে,

-“ওহ… এসিপি তালহা আদিল, দেশের গর্ব, তাই না?
দেখো তোমাকে একটা নোংরা বন্দির মতো কাঁচ মুচ্ছ”
তার প্রত্যুত্তরে তালহার তরফ থেকে কোনো উত্তর এলো না। সে এইসবে অভ্যস্থ, প্রথম প্রথম বলতো, পরে চুপ করে গেছে। সে মাথা নিচু করে নিজের কাজ করতেই থাকে।সোফিয়া আবার বলে,
-“তুমি যদি সেদিন এত কৌতূহলী না হতে আজ হয়তো মুক্ত মানুষ থাকতে”
কিছুক্ষণ থেমে ফের ঠোঁটে ক্রুর হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“ইউ নো, তোমাকে মারতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি চাই, তুমি নিজে এসে আমার কাছে তোমার মৃত্যুর ভিক্ষা চাও।
কারণ তুমি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছিলে।
তোমার মৃত্যুটা যেন হয় তোমার নিজের ইচ্ছায়”
তালহা এক মুহূর্তের জন্য মাথা তুলে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর আবার মাথা নিচু করে কাজ করতে লাগল। সোফিয়া আরও কিছুক্ষণ এটা সেটা বলে তারপর উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,

-“ভাবো, কতদিন টিকতে পারো”
তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কক্ষে নেমে এলো ভারী নীরবতা। সোফিয়া চলে যাওয়ার পর তালহার হাত থেকে কাপড়টা পড়ে যায়। সে ধীরে ধীরে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, মাথাটা নিচু করে। যেন যুদ্ধ হেরে যাওয়া এক আহত সিংহ। কিছুক্ষণ সে এভাবেই বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবার উঠে দাঁড়ায়,
কাপড়টা হাতে নিয়ে আবার শোকেস মুছতে শুরু করে। কারণ সে জানে, এই কাজটা সময়মতো শেষ না হলে, তার শাস্তি শুধু তার উপরেই পড়বে না। আরেকটা নিষ্পাপ প্রাণ হারিয়ে যাবে।

রাত অনেকটাই গভীর হয়ে এসেছে। অরোরা গ্র্যান্ড প্যাভিলিয়ন এর সামনে বিশাল গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট। সেখানকার সাদা আলোয় চারপাশটা আধো অন্ধকার, আধো আলোর মধ্যে ডুবে আছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে চারদিকে, কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস চারপাশে ছড়িয়ে আছে। দূরে শহরের রাস্তা ধরে মাঝে মাঝে গাড়ি চলে যাচ্ছে তাদের হেডলাইটের আলো এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার কেটে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। প্যাভিলিয়নের ভেতরের পার্টি এতক্ষণে থেমে গেছে। এই নিস্তব্ধ রাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ। পাভিলিয়নের গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে সানা।
সানার কোলের মধ্যে নিশ্চিত ভাবে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট আরভি। ছোট্ট বুকটা ধীরে ধীরে উঠানামা করছে। বাচ্চাটার মাথা মায়ের কাঁধে হেলান দিয়ে আছে, তার শান্ত নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে সানার কাঁধে। সানা তাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। তার বুকের ভেতর তীব্র অস্থিরতা। সে এভাবে আরজের সামনে পড়বে এটা কল্পনাও করেনি। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। কয়েক মুহূর্ত আগেই সানার মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া সেই শব্দ,
-“আমার ছেলে”

কথাটা শোনার পর কয়েক সেকেন্ড আরজে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ধীরে ধীরে নেমে এল সানার কোলের দিকে, ঘুমন্ত বাচ্চাটার উপর। তারপর আবার উঠল সানার মুখে। তার চোখে তখন এমন একটা অভিব্যক্তি যেন সে বুঝতেই পারছে না সে ঠিক কী শুনল। তার মুখে স্পষ্ট বিস্ময়, নাহ, শুধু বিস্ময় না।এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস। যেন তার মস্তিষ্ক এখনও কথাটা বুঝে উঠতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড, তারপর হঠাৎ আরজে অজান্তেই দু তিন কদম পিছিয়ে যায় যেন কেউ তাকে ধাক্কা দিয়েছে। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। সামনের রমণীর দিকে ফাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বহু কসরতে কণ্ঠস্বর থেকে দুটো শব্দ বের করে,

-“আমার ছেলে…..”
শব্দটা যেন পুরোপুরি বের হতেও পারছে না। তাই ফিসফিস করে আবার আওড়ায়,
-“আমার ছেলে…”
সানা তার মুখের দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কণ্ঠে কঠোরতা মিশিয়ে বাক্য ছুঁড়ে,
-“ও শুধু আমার ছেলে, শুধু আমার”
রমণী আরভিকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে টেনে নিল। তারপর স্পষ্ট করে ফের বলে,
-“আপনার না, বুঝতে পেরেছেন?”
কিন্তু সানার বলা কথার একটুও যেন আরজের কানে পৌঁছাচ্ছে না। চারপাশের বাতাস, শব্দ, আলো সবকিছু যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে তার কাছে। তার মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
“আমার ছেলে”

শব্দগুলো যেন তার মস্তিষ্কের ভেতর ধাক্কা মারছে। তার মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করে তার শরীরের সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে। পা গুলো কেমন ভারী হয়ে আসছে যার কারণে সে নড়তে পারছে না। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে,
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জমে উঠছে, অবিশ্বাস, ধাক্কা, শূন্যতা, আর এমন এক আবেগ যার নাম সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না। দৃষ্টি আবার নেমে আসে বাচ্চাটার দিকে, ছোট্ট মুখ, নরম চুল, মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা। হঠাৎ তার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ছে।
হঠাৎ আরজের মনে হচ্ছে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার হাঁটু যেন দুর্বল হয়ে আসছে। তবুও অজান্তেই ধীরে ধীরে তার পা এগোতে শুরু করে। যেন প্রতিটা কদম তুলতে তাকে ভেতর থেকে লড়াই করতে হচ্ছে। সে সানার দিকে এগিয়ে আসে তার চোখ এখনও সেই বাচ্চাটার উপর স্থির। কণ্ঠ ছিড়ে কয়েকবার খুব নিচু স্বরে শব্দ বের হয়,
-“আমার র*ক্ত”

শব্দগুলো যেন নিজের অজান্তেই বেরিয়ে যাচ্ছে। সে আর একটু কাছে আসে, তার চোখে এখনও অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের অদ্ভুত মিশ্রণ। যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না তার অংশ সানার কোলে। তার কাঁপতে থাকা হাত ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিল সানার কোলের দিকে। আজ তার হাত অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। শুধু হাত না তার পুরো শরীর যেন কাঁপছে। তার আঙুলগুলো স্থির থাকতে পারছে না। মনে হচ্ছে সে ভয় পাচ্ছে, ভয় পাচ্ছে স্পর্শ করতে। যেন স্পর্শ করলেই সবকিছু ভেঙে যাবে। তার মনে হচ্ছে হয়তো সে স্বপ্ন দেখছে, হয়তো এটা সত্যি না, হয়তো এক মুহূর্ত পর সবকিছু মিলিয়ে যাবে। চোখ স্থির সেই ছোট্ট মুখের উপর।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই সানা হঠাৎ আরভিকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে। যেন কাউকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতে চাইছে। তার চোখে আবার সেই কঠিন দৃষ্টি ফিরে এল। সে শক্ত গলায় শুধালো,

-“আপনাকে বলছি না আমি? ও শুধুমাত্র আমার ছেলে”
সে একহাতে আরভিকে সামলে সরাসরি আরজের চোখে চোখ রেখে তর্জনী উঁচিয়ে বলে,
-“ওর উপর আপনার কোনো অধিকার নেই।
আমি একাই ওকে বড় করেছি। ও অসুস্থ হলে রাত জেগে আমি একাই ওর পাশে বসেছি। ও ব্যাথা পেয়ে কাঁদলে আমি একাই ওকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করেছি।
আজ হঠাৎ এসে বলবেন ও আপনার?
না, এমনটা কখনোই হবে না”
রমণী মাথা নাড়িয়ে ফের বলে,
-“ও আমার ছেলে, শুধু আমার”

কিন্তু তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা মানব যেন কিছুই শুনছে না। আরজে এখনও হাত বাড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির আরভির দিকে। তার চোখে এমন এক আবেগ জমে আছে, যা শব্দে বোঝানো যায় না। তার হাত এখনও কাঁপছে, বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। সে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। সানা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি আটকায় আরজের বাদামি চোখজোড়ায় আর ঠিক তখনই, তার বুকের ভেতর কিছু একটা নরম হয়ে গেল। সেই কঠিন দেয়ালটা, যা সে এতক্ষণ ধরে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, সেটা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। তার মস্তিষ্কে একের পর এক স্মৃতি ভেসে উঠতে থাকে,
সানা আরভিকে ছোটবেলা থেকেই আরজের ছবি দেখিয়ে বড় করেছে। আরভি যখন থেকে একটু বুঝতে শিখেছে প্রায় প্রতিরাতেই একটা প্রশ্ন করত,

-“মম, আমি আমার ড্যাডকে দেখবো
ড্যাড কোথায়?”
কখনো ঘুমানোর আগে তার ছোট্ট হাত সানার গলা জড়িয়ে ধরে বলত,
-“মম, আমি ড্যাডের কাছে যাব”
সবার ড্যাড আছে।
আমার ড্যাড কোথায়?”
সানা প্রতিবারই মেকি হাসি দিয়ে ঢেকে দিত, ছেলের কাছে শান্তনা সুরে আওড়াতো,
-“আমরা দুদিন পরেই ড্যাডের সাথে দেখা করব।
ড্যাড দূরে কাজে আছে, দুদিন পরই চলে আসবে”
কিন্তু সেই দুদিন আর কখনো আসেনি।প্রতিবারই সে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। নিজে অন্ধকারে বসে কেঁদেছে। আজ যদি সে আরভিকে তার বাবার সাথে দেখা না করায়, তাহলে কি সে সত্যিই তার ছেলের সাথে অন্যায় করবে না?

এই ভাবনাটা তার বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র একটা কষ্ট উঠিয়ে দিল। সাথে আরেকটা ভাবনা তার মনে ধাক্কা খায়, আজ যদি সে এখান থেকে ভ্যালিতে ফিরে যায় তাহলে হয়তো আরজের সাথে আর কোনোদিন তার দেখা হবে না, আর আরভিরও না। কেননা দিলরুবা খানম তাকে বলেছে যেহেতু আরজে তাকে দেখে নিয়েছে তাই সে সত্যিটা জানার আগ পর্যন্ত থামবে না। এজন্য সানাকে আরভির সাথে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যেখানে আরজে যাতে না পৌঁছাতে পারে সবকিছু শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত। তার বুক ভারী হয়ে উঠে। এতদিন ধরে সে নিজেকে একটা কথাই বলে এসেছে,
সে ঠিক করেছে,
সে ঠিক কাজ করেছে,
কিন্তু সত্যি কি তাই?
নাকি, সে নিজের ছেলের কাছ থেকে তার বাবার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে?
এই প্রশ্নটা তাকে প্রতিদিন কষ্ট দিয়েছে। আজ আবার সেই প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে, চোখের কার্নিশ বেয়ে একটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। রাতের ঠান্ডা বাতাসে সেই ফোঁটা জল যেন ঝলসে উঠছে। সে ধীরে চোখ খুলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আরজের দিকে যে তার সামনে এখনও কাঁপা কাঁপা হাতগুলো বাড়িয়ে রেখেছে।

আরজের চোখে এখনও সেই অবিশ্বাস, সেই তীব্র আকুলতা। যেন সে ভয় পাচ্ছে, এক মুহূর্ত পর সবকিছু হারিয়ে যাবে। সানার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল তার সেই দৃষ্টি দেখে। শত রাগ থাকলেও মানুষটাকে যে সে অসম্ভব রকম ভালোবাসে। ধীরে ধীরে সে নিজের হাত ঢিলা করে আরভিকে একটু সামনে এগিয়ে দিল আরজের বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে। এই মুহূর্তটা যেন থেমে গেল। আরজের হাত এখনও অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তারপর খুব সাবধানে আরভিকে নিজের কোলে তুলে নিল, যেন ভাঙা কাঁচ ধরছে, যেন একটু শক্ত হলেই সব ভেঙে যাবে।

যেন এটা কোনো বাস্তব জিনিস না একটা স্বপ্ন। তার হাত এখনও সামান্য কাঁপছে। বাচ্চাটাকে ঠিক করে ধরতেই আরজে এক পলক নিচে তাকায়, আর সেই তাকানোতেই, তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। তার চোখে হঠাৎ বিস্ময় খেলে যায় কেননা তার কোলে থাকা ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে।
একদম হুবহু তার মতো, নরম চুলগুলো কপালে পড়ে আছে, চোখের গড়ন, ঠোঁটের আকার।এমনকি ঘুমন্ত মুখের সেই শান্ত অভিব্যক্তিটাও সবকিছু যেন তারই ছোট্ট সংস্করণ। আরজের বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠে। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে, কিন্তু আশ্চর্য আজ যেন সেই ঢোক গিলতেও তার কষ্ট হচ্ছে। গলার ভেতর শব্দ আটকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে তার বুক চেপে ধরেছে। আরজে অবিশ্বাসের সুরে ফিসফিস করে আওড়ায়,
-“এটা… আমার র*ক্ত…..”
সামনের রমণীর কণ্ঠস্বর থেকে ছোট করে বের হয়,
-“হুম”

আরজে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, এই নিষ্পাপ ফুলটা, এই ছোট্ট মুখটা, এই শান্ত নিঃশ্বাস, তার র*ক্ত, তার অংশ। এই সত্যিটা যেন তার ভেতরের সবকিছু উল্টে দিচ্ছে। ঠিক তখনই আরভি একটু নড়েচড়ে উঠে। ঘুমের ভেতরেই তার চোখ দুটো আধখোলা হয়ে অস্পষ্টভাবে সামনে থাকা মুখটার দিকে তাকায়। তার চোখ পুরোপুরি খোলা না, তবু যেন কোনো অচেনা অথচ নিরাপদ উষ্ণতা তাকে ঘিরে ধরেছে পর মুহূর্তেই ছোট্ট দুই হাত ধীরে ধীরে উঠে আসে। সে দুহাতে আরজের গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে মাথাটা এনে রাখল আরজের কাঁধে। তার ছোট্ট হাতটা অজান্তেই আরজের শার্টের পিছনের কাপড় আঁকড়ে ধরে। এই স্পর্শে আরজের বুকের ভেতর যেন কিছু বিস্ফোরিত হলো। আর এক মুহূর্তের মধ্যেই আরভি আবার ঘুমিয়ে পড়ে। আরজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাচ্চাটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখে তখন আর কোনো সন্দেহ নেই। শুধু অবিশ্বাস্য এক আবেগ, যেন সে জীবনে প্রথমবার শ্বাস নিচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর থেকে খুব নিচু স্বরে বের হয়,

-“আমার ছেলে”
ঠান্ডা আবহাওয়ার দরুন আরভি আরও একটু নিজের বাবার বুকের ভিতর মিইয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আরজে আরও জোরে চেপে ধরে আরভি কে নিজের সাথে যেন একটু আলগা করলেই এই মুহূর্তটা হারিয়ে যাবে।যেন সবকিছু মিলিয়ে যাবে। তার এখনো মনে হচ্ছে এটা একটা স্বপ্ন, একটা নরম, অবিশ্বাস্য স্বপ্ন। আর যদি সে চোখ পিটপিট করে, তাহলে হয়তো এই স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। ভাঙা কাঁচের মতো ফাটল ধরে সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। সে যেন নিঃশ্বাস আটকে ধরে আছে বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরে।
হঠাৎ তার মাথার ভেতর একটা শব্দ ধাক্কা দিল, “বাবা” শব্দটা যেন ধীরে ধীরে তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। সে বাবা, এই ছোট্ট মানুষটার বাবা। শব্দটা কতটা ভারী, কতটা গভীর, কতটা দায়িত্বে ভরা। সে আবার আরভিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ঠিক তখনই তার কাঁপা হাতটা ধীরে ধীরে আরভির পিঠে এসে থামে নরমভাবে। আর অদ্ভুতভাবে যেই মুহূর্তে তার হাত বাচ্চাটার পিঠ ছুঁয়েছে, তার হাতের কাঁপুনি থেমে যায়। যেন এই ছোট্ট শরীরটা তাকে স্থির করে দিয়েছে। যেন এই স্পর্শ বলছে, সবকিছু সত্যি। আরজের চোখ ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,

-“আমি… এতদিন জানতামই না তুমি আছো।
তুমি আমার ছেলে….”
সে একটু থেমে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফের বলে,
-“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য”
কিছুক্ষণ সে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে পাভিলিয়নের ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। তার বুকের সাথে এখনও শক্ত করে জড়িয়ে আছে আরভি। সে কয়েক কদম এগিয়ে তারপর
হঠাৎ থেমে যায়, ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়, সানা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির আরজের উপর। আরজে মুখ ফুটে কিছু বলল না। কিন্তু তার সেই দৃষ্টিতেই স্পষ্ট সে তার জন্য অপেক্ষা করছে। রমণী সেটা বুঝে এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আর কোনো কথা না বলে সে এগিয়ে গিয়ে আরজের পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর দুজন একসাথে হাঁটতে শুরু করে অরোরা গ্র্যান্ড প্যাভিলিয়নের ভেতরের দিকে। রাতের নীরবতার মধ্যে একজন বাবা প্রথমবার নিজের ছেলেকে বুকে নিয়ে হাঁটছে।

অরোরা গ্র্যান্ড প্যাভিলিয়নের বড় কাঁচের দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরের আলোয় কিছুক্ষণ দেখা গেল আরজে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে আরভিকে, আর তার পাশে নীরবে হাঁটছে সানা। তারপর তারা ধীরে ধীরে লবির গভীরে মিলিয়ে গেল। বাইরের রাত আবার আগের মতো নীরব হয়ে উঠল। ঠিক তখনই প্যাভিলিয়নের সামনে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কালো গাড়ির হেডলাইট হঠাৎ জ্বলে উঠে। আলোটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য গেটের সামনে পড়ে আবার স্থির হয়ে গেল। গাড়িটার ভেতরে বসে আছে
সারহাদ চৌধুরী।

তার মুখে আলো পড়াতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চোখের কোণ চিকচিক করছে। সে অনেকক্ষণ ধরেই এখানে আছে।। আরও অনেক আগেই এসেছে। যখন সানা ফোন করেছিল সে তখনই ঝড়ের বেগে হাই স্পিডে ড্রাইভ করে চলে এসেছিল তাকে নিতে। কিন্তু গাড়ি থেকে বের হয়নি। যখন সে দূর থেকে আরজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল, তখন সে নীরবে গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে দিয়েছিল। আর সেখানেই বসে ছিল।
সে দেখতে চেয়েছিল, সানা কি করে?
সাথে মনে মনে নিয়েছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত। সানা যদি আজ আরজে কে ছেড়ে আসে তাহলে সে নিজেই সানাকে আর কোনদিনও আরজের কাছে যেতে দিবে না। কিন্তু নাহ, সানা আসল না, তার সানাম একবারের জন্যও তার দিকে আসেনি। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে। সে যেন নিজের মনেই বলে,
-“আমি জানতাম…”

তার চোখ স্থির সেই দরজার দিকে যেখানে একটু আগে সানা ঢুকেছে। তার আঙুলগুলো স্টিয়ারিংয়ের উপর আলতো টোকা দিচ্ছে। সে নিচু গলায় ফিসফিস করে,
-“একদিন না একদিন আরজে সব জানবেই।আর সেদিন সে আবারও আমার সানাম কে নিয়ে নেবে”
কিছুক্ষণ সে চুপ করে রইল। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা ধীরে ম্লান হয়ে যায়। তার চোখের ভেতর অন্যরকম একটা ছায়া নেমে আসে, সে খুব আস্তে বলে,
-“না, আমার কিভাবে?
সে নিজের কথাতেই হালকা মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“সানাম তো কোনোদিনও আমার ছিল না”
গাড়ির ভেতর ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। দূরে রাতের বাতাসে কোনো পাতা নড়ল।সারহাদ ধীরে চোখ বন্ধ করে তার মাথায় একের পর এক স্মৃতি ভেসে উঠছে। মিসেস দিলরুবা খানম সানার প্রায় সব তথ্য পৃথিবী থেকে মুছে ফেলেছিলেন। কিন্তু সব না, কিছু কিছু জায়গায় তখনও চিহ্ন ছিল। আর সেই চিহ্নগুলো, সারহাদ নিজেই মুছে দিয়েছিল।
কারণ সে জানত, আরজের লোকেরা থামবে না, তারা খুঁজবে। আর সত্যিই একসময় আরজের লোকেরা চায়নাতেও পৌঁছে গিয়েছিল, সানাকে খুঁজতে। সেই লোকেদের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল সারহাদ। সে অনেক চেষ্টা করেছে। অনেক কিছু করেছে,, শুধু একটা জিনিস ঠেকানোর জন্য।

“ভাগ্য”
কিন্তু সে জানত, ভাগ্যকে কখনোই পুরোপুরি ঠেকানো যায় না। হ্যাঁ, যদি সানা আরজের কাছে যেতে চাইতো তাহলে সে কখনো আটকাতো না, কিন্তু সানা না চাওয়া পর্যন্ত সে নিজের চেষ্টা চালিয়েছে।
সে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ আবার সেই দরজার দিকে গেল। যেখানে সানা কয়েক মুহূর্ত আগে ঢুকেছে। তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে, কিন্তু এবার সেই হাসির ভেতর জমে আছে দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি। সে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে,
-“কি আশ্চর্য, তাই না…
যে মানুষটা কোনোদিনই আমার ছিল না,
তাকে হারানোর ভয়েই বারবার কেঁপে ওঠে আমার বুক। অধিকার ছিল না, তবু হারানোর যন্ত্রণা কেন এত সত্যি হয়ে ওঠে? কেন মনে হয়, তুমি চলে গেলে আমার ভেতরের একটা পৃথিবী ভেঙে পড়ে?”
কিছুক্ষণ সে নীরব বসে রইল। যেন নিজের জীবনের হিসাব মেলাচ্ছে। নাহ, প্রাপ্তির খাতায় বরাবরের মতো শূন্যই ভেসে ওঠছে। তারপর খুব আস্তে বিড়বিড়ায়,

-“সানাম, ডু ইউ নো…
এই পৃথিবীতে লাখে মাত্র একজন মানুষ তার সত্যিকারের ভালোবাসাকে পায়। বাকিরা শুধু দূর থেকে দেখে, হাসির আড়ালে নিজের ভাঙন লুকিয়ে বাঁচে।
সেই একজন তুমি।
আর বাকিদের ভিড়ে আমি শুধু আরেকটা নীরব নাম যার বুকের ভেতরটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে”
সে বুঝতেই পারল না কখন এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে। সে আবার তাকায় সেই দরজার দিকে। ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত কাঁচের দরজা দিয়ে ভেতরের আলোয় সানার ছায়াটুকুও আর দেখা যায় না। ধীরে ধীরে সবকিছু মিলিয়ে গেল, লবি ফাঁকা, দরজা নিঃশব্দ। রাত আবার আগের মতো নিস্তব্ধ। তারপর লবি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে। এক মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে নিজের মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে বিড়বিড়ায়,

-“আমার ভাগ্যের সুখটুকু তুমি নিয়ে নাও,
তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে বাঁচো।
তোমার হাসিটা যেন কখনো ম্লান না হোক,
কারণ সেই হাসিটাই তো ছিল আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ। আমি দূর থেকেই দেখব, তোমার সুখের ভেতরেই নিজের বেঁচে থাকার অজুহাত খুঁজে নেব”
সারহাদ কিছুক্ষণ স্থির বসে রইল। তারপর ধীরে মাথাটা এগিয়ে এনে গাড়ির হেডবোর্ডে ঠেকাল। কতক্ষণ সে এভাবেই বসে রইল সে নিজেও জানে না। হয়তো কয়েক মিনিট, হয়তো আরও বেশি। তারপর ধীরে মাথা তুলে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে স্টিয়ারিংয়ের উপর হাত রেখে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। বেইমান চোখ দুটো ঘুরেফিরে আবারও সেদিকে গিয়ে থামে। মনে মনে ভাবছে, হয়তো সানাম এখনি বেড়িয়ে আসবে,
হ্যাঁ আর একটু পরেই আসবে তার কাছে, তাকে আবার সারাদ বলে ডাকবে।
কিন্তু নাহ, সময় গড়িয়ে যায়, সানাম আর আসে না। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে। নিচু স্বরে বলে,

-“হ্যাঁ, নিজেকে বোঝাব, এই দূরত্বটাই আমাদের নিয়তি।
শুধু মাঝে মাঝে, এক পলকের জন্য তোমাকে দেখার সুযোগ দিও। কারণ তুমি না থাকলে এই পৃথিবীটা আমার কাছে বড় নির্জন হয়ে যায়। টাস্ট মি, আমি তোমার কাছে কিছু চাইব না, না কোনো অধিকার, না কোনো প্রতিশ্রুতি।
শুধু এতটুকু…. যাতে দূর থেকে দেখে বলতে পারি। নিজের মনকে বুঝাতে পারি, হ্যাঁ, সে ভালো আছে।
কারণ তুমি যদি ভালো থাকো,
তাহলেই হয়তো আমার এই ভাঙা বুকটা
আরেকটা দিন বেঁচে থাকার সাহস পাবে”
সারহাদের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ একটা অদ্ভুত ভাঙ্গা হাসি ফুটে ওঠে,
-“আর যদি কোনোদিন আমাকে আর না দেখো, তবু মনে রেখো…
পৃথিবীর কোথাও একটা মানুষ ছিল,
যে নিঃশব্দে তার পুরো জীবনটা তোমাকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিয়েছে”
কালো গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগোতে শুরু করে। প্যাভিলিয়নের আলো পিছনে পড়ে রইল। রাতের অন্ধকার রাস্তার ভেতর গাড়িটা মিলিয়ে গেল। আর পিছনে রয়ে গেল এক মানব,
যে নিজের ভালোবাসাকে ছেড়ে দিয়েও
তার সুখের জন্যই প্রার্থনা করে।

অরোরা গ্র্যান্ড প্যাভিলিয়নের উপরের তলাটা তখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে নিস্তব্ধতা ছিল, এখন সেখানে অদৃশ্য এক সুরক্ষার বলয় তৈরি হয়েছে। পুরো ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আরজের সিকিউরিটি গার্ডরা। করিডোরের দুই মাথায় দুজন করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ ওয়াকিটকিতে নিচু গলায় কথা বলছে। কেউ দরজার লক আবার চেক করছে। সবকিছু এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন এই তলার ভেতর দিয়ে একটা বাতাসও অনুমতি ছাড়া ঢুকতে না পারে।

কারণ এই ফ্লোরে এখন আছে আরজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আরজে সেটা খুব ভালো করেই জানে। তাই ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই সে জ্যাক আর কাইলিনকে নির্দেশ দিয়েছিল, পুরো ফ্লোর আবার নতুন করে সিকিউর করতে। তারা এক মুহূর্তও দেরি করেনি। সব গার্ডদের অ্যালার্ট করে দিয়েছে। প্রতিটা দরজা, প্রতিটা জানালা, প্রতিটা ক্যামেরা সব আবার চেক করা হচ্ছে। কারণ আরজে তার শত্রুদের খুব ভালো করেই চেনে। আর সে এক মুহূর্তের জন্যও চায় না, তার অংশটার উপর কোনো বিপদ নেমে আসুক। সবকিছু হচ্ছে খুবই নিঃশব্দে, কেননা আরজে আগেই বলে দিয়েছে, একটা পিনপতন শব্দেও যদি তার ছেলের ঘুম ভেঙে যায় তাহলে তাকে সারা জীবনের মতো ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হবে। তার এমন আদেশের বিপরীতে সবাই যেন এখন পা ও ফেলছে খুব সাবধানে যেন কোন আওয়াজ না সৃষ্টি হয়।

নিজের রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। তার কোলে এখনও ঘুমিয়ে আছে ছোট আরভি। সে ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে নিয়ে বিছানার দিকে গেল। বিছানার উপর রাখা নরম কুশনের উপর খুব সাবধানে তাকে শুইয়ে দিল। এতটা সাবধানে যেন কাঁচের কোনো জিনিস রাখছে। আরভি একটু নড়ে তারপর আবার শান্ত হয়ে গেল। ঘুমন্ত মুখটা আলোয় একদম নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। ছোট্ট বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। আরজে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি হটছে না, সে তাকিয়ে আছে ভ্রুক্ষেপহীন। মনে হচ্ছে
সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও তার জীবনে এই বাচ্চাটা ছিল না। আর এখন তার সামনে শুয়ে আছে তার সন্তান, তার নিজের র*ক্ত। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জমে আছে। সে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে আঙুলগুলো অজান্তেই এগিয়ে গিয়ে আরভির চুলে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। যেন আবারও নিশ্চিত হতে চাইছে এটা সত্যি, স্বপ্ন না।
ঠিক তখনই রুমের দরজার কাছে কয়েকটা বুটের শব্দ হলো। আরজে ধীরে মাথা তুলে তাকায় নজরে আসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, এসপি, ঈশানী, জ্যাক ও কাইলিন।

এসপি ঐসময় যায়নি সানার হাজার টা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সানিতাকে বলে তার পিছু পিছু এসেছিল। সে কীভাবে এই মেয়েটাকে একা ছেড়ে দিবে। সে দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখেছে, আরভিকে কোলে নেওয়া, আরজের মুখের সেই অবিশ্বাস সব। সে মনে মনে এটাও ভেবে নিয়েছিল, যদি এই জাওরা কোন কারনে আরভিকে নিয়ে কটকটি কে সন্দেহ করে সাথে সাথে সে গিয়ে দু’চারটা পাঞ্চ বসাবে আগে। কিন্তু নাহ, আরজের চোখে সে এক মুহূর্তের জন্য কোন সন্দেহ দেখেনি। তাই সে কিছু না বলে ঈশানীকেও কল করে ডেকেছে।। ঈশানীও দ্রুত চলে এসেছে। এখন সবাই দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না। ঘরের ভেতর একটা নীরবতা ছড়িয়ে আছে। আরজে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় তার দৃষ্টি গিয়ে থামে সানার উপর যে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আরজের দিকে দৃষ্টি পড়তেই
সে মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিল। তারপর আড়চোখে আবার তাকায় আরজের দিকে।ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা রইল।

তারপর হঠাৎ আরজে এগিয়ে আসে, এক মুহূর্তের জন্যও কিছু না বলে সে সোজা সানার সামনে এসে দাঁড়ায়। রমণী অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। আরজের চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। পরের মুহূর্তেই সে একটানে সানাকে কোলে তুলে নিল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না।সানা হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে আরজের গলা জড়িয়ে ধরে অবাক হয়ে বলে,
-“আ…আপনি কি করছেন?”
কিন্তু বাকিটা শেষ করার আগেই আরজে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে, তার চোখে তখন অদ্ভুত আ*গুন। সানার বিপরীতে তার পক্ষ থেকে একটা শব্দও এলো না। সে সোজা দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯

এসপি ভ্রু কুচকে তাকায়, আর ঈশানী নিঃশব্দে শ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে আরভির দিকে। আরজে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে সামনে এগিয়ে যায়। তবে দরজার সামনে থেমে পিছন না ফিরেই রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুঁড়ে,
-“এই ফ্লোর এখন থেকে বন্ধ, যদি ওর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে তাহলে এই করিডোরটাই কবরস্থানে পরিণত হবে”
তারপর আর কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে করিডোরে বেরিয়ে সোজা পাশের একটা রুমের দিকে যায়। আরজে ভেতরে ঢুকেই দরজাকে “ঠাস” করে লাগিয়ে দিল।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (২)