Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৯

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৯

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৯
সাবা খান

নিশীথের গভীর অন্ধকার রজনী, চারদিক নিস্তব্ধ, ভারী, শ্বাসরুদ্ধকর। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলো যেন অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হালকা কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা শহরের যেখানে প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা ছায়া আরও বেশি স্পষ্ট, আরও বেশি ভীতিকর হয়ে উঠেছে। এই নিস্তব্ধতা বেদ করে একটা কালো মার্সিডিজ অন্ধকার চিরে তেজী ঘোড়ার ন্যায় ছুটে এসে থামে সিটি হসপিটালের সামনে।
দরজা খোলার হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে দুই মানব মানবী। এক সেকেন্ডও দেরি না করে তারা দৌড়াতে শুরু করে ভেতরের ভিআইপি করিডোরের দিকে। সানার চুল এলোমেলো হয়ে আছে, চোখে মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের চাপ। তার পাশে চলা আরজের একই অবস্থা, তারও চোখ লাল, অস্থির, ভয়ংকর হয়ে ওঠেছে। ভিআইপি করিডোরে ঢুকতেই তাদের নজরে আসে ডক্টর রাঘব।
আরজে বড় বড় কদম ফেলে তার সামনে দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন ছুড়ে,

–“রাঘব, মম কোথায়?
কেমন আছে উনি?
কোথায় রেখেছো তাকে?
কি হয়েছে? কেন ফোন করেছিলে? বল”
তার প্রতুত্তরে ডক্টর রাঘব একটু হাত তুলে বলে,
–“মিস্টার জাওয়ান, প্লিজ, একটু শান্ত হন। আমি….”
জিহবা খসে বাকি বাক্যটুকু বের হওয়ার আগেই আরজের চোখ রাগে জ্বলে ওঠে। সে এক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে,
–“শান্ত হবো? তুই আমাকে শান্ত হতে বলছিস? আমি তোকে কি বলেছিলাম, হ্যাঁ? আমার মমের উপর সারাক্ষণ নজর রাখবি, সেলের ভেতরে, বাইরে প্রতিটা কোণায় সিসিটিভি থাকবে, এক সেকেন্ডের জন্যও তাকে চোখের আড়াল করবি না। তার শরীরের অবস্থা, তার মেন্টাল কন্ডিশন প্রতিটা রিপোর্ট আমার কাছে আসবে, আমি তোকে বলিনি?”
আরজের গর্জনে ডক্টর রাঘব অনেক টা ঘাবড়ে যায়। হ্যাঁ, আরজে তাকে শুরুতেই সোফিয়ার জন্য ওখানে পাঠিয়েছে। কিন্তু, কীভাবে যে আজ এত বড় একটা কান্ড ঘটে গেছে সে বুঝতেই পারছে না। তার কণ্ঠ থেকে কোন শব্দ নিঃসৃত হওয়ার পূর্বেই আরজে এক ঝটকায় ডক্টর রাঘবের কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলে,

–“তাহলে এই অবস্থা কেন হলো? কোথায় ছিলি তুই?”
ডক্টর রাঘব হকচকিয়ে যায়। তার গলা থেকে যেন শব্দ বেরুচ্ছে না। তারপরও আটকে আসা গলায় শুধালো,
–“মিসেস সো… সোফিয়া এখন ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটারে আছে”
এই কথাটা শুনতেই আরজের চোখ আরও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সে তাকে ঝাকিয়ে বলে,
–‘”ওটিতে কেন? আমি তোকে কি দায়িত্ব দিয়েছিলাম জানিস? মমের গায়ে একটা স্ক্র্যাচও যেন না লাগে, তাহলে মম অপারেশন থিয়েটারে কেন?”
আরজে রাগে তাকে মুখে থাবা মারতে যাবে তার আগেই সাবা পরিস্থিতি উপলব্ধি করে দৌড়ে এসে আরজের হাত ধরে টেনে পেছনে আনে,
–“রানভীর স্টপ, প্লিজ”
আরজে আবার এগিয়ে যেতে চাইলে সানা তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলে,

–“রানভীর, প্লিজ… এখন না, এইভাবে কিছু ঠিক হবে না”
রাগে আরজের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তার হাত মুঠো করে আছে। কিন্তু সানার জড়িয়ে ধরাতে সে থেমে যায়। ওদিকে ডক্টর রাঘব কোনোমতে নিজের কলার ঠিক করে। গভীর শ্বাস নিয়ে হালকা কাশি দিয়ে তড়িঘড়ি করে বলে,
–“মিস্টার জাওয়ান, আমরা ঠিক সময়েই তাকে নিয়ে এসেছি। আপনি চিন্তা করবেন না। মিসেস সোফিয়া ঠিক হয়ে যাবেন”
তার বলা বাক্যগুলো যেন আরজে কে ছুঁতে পারছে না। সে শুধু তাকিয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটার দিকে, যেটা জ্বলছে আর যেন প্রতিটা সেকেন্ডে তার বুকটা আরও ভারী করে দিচ্ছে
কিয়ৎকাল পর অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা ক্লিক শব্দ করে খুলে যায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন ডক্টর আরমান হক। আরজে এক ঝটকায় তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“মম কেমন আছে?”
ডক্টর আরমান গভীর শ্বাস নিয়ে বলেন,
–“মিস্টার জাওয়ান, আমরা খুব অল্পের জন্য বড় একটা অঘটন এড়াতে পেরেছি”
–“মানে?”
–“মানে তিনি বারবার নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছেন ছুরি দিয়ে। এটা সরাসরি একটা অ্যাটেম্পট টু মার্ডার, নিজের উপর”
সাথে সাথে সানার বুক ধক করে ওঠে। আরজের চোখ স্থির হয়ে যায়। ডক্টর তার কথা চালিয়ে যায়,

–“শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত রয়েছে। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমাদের তাকে ইমার্জেন্সি ব্লাড ট্রান্সফিউশন দিতে হয়েছে, এখন অনেক টা স্টেবল আছে কিন্তু তার মানসিক অবস্থা খুবই সংকটজনক, তিনি ড্রাগ এডিক্টেড হওয়ার দরুন নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছেন। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ হতে পার……”
তার বাক্যটা সম্পন্ন হওয়ার আগেই আরজের মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। সে এক কদম এগিয়ে গিয়ে ডক্টর আরমানের কলার চেপে ধরে গর্জে উঠে,
–“মমের কিছু হলে, এই পুরো হসপিটাল আমি জ্বালিয়ে দেব”
ডক্টর আরমান আরজের চোখ দেখেই স্পষ্টতই ভয় পেয়ে যায়। তিনি তোতলাতে তোতলাতে বলে,
–“দে…দেখুন মিস্টার জাওয়ান, আমরা..”
–“চুপ….”
আরজে আর কিছু বলার আগেই সানা আবার ছুটে এসে তার হাত ধরে টেনে পেছনে আনে,

–“রানভীর, স্টপ ইট, প্লিজ কন্ট্রোল”
কিন্তু এই মুহূর্তে আরজে কিছুই মানতে চাইছে না। ওদের টানাটানির মাঝেই দ্রুত পায়ে করিডোরে এসে পৌঁছায় জ্যাক আর কাইলিন। ডক্টর আরমান সুযোগ বুঝে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিয়ে হালকা কাশতে কাশতে বলে,
–“আমাদের এখনি আরও ব্লাড লাগবে”
এই বলে তিবি দ্রুত আবার অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ঢুকে যায়। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যায় সাথে সাথে লাল আলোটা আবার জ্বলে ওঠে। সানা আটজে কে ছেড়ে ধীরে ধীরে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
আরজে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভেবে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। মনের পাতায় ভেসে ওঠে ডক্টরের বলা কথাটা, সোফিয়া ছুরি দিয়ে নিজেকে বারবার নিজেকে আঘাত করেছে। তার মাথায় বাজের মতো আঘাত করে বাক্যটা। সে চোখ বন্ধ করে তর্জনী দ্বারা কপাল ঘষে। ধীরে ধীরে তার সম্পূর্ণ বিষয় টা বুঝে আসছে। সেলের ভিতরে ছুরি আসবে কোথা থেকে? আর ছুরি সোফিয়ার হাতেই বা গেল কীভাবে? সে আর কিছু না বলে হঠাৎ জ্যাক আর কাইলিনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বুলি ছুড়ে,

–“কাই, জ্যাক”
–“ইয়েস বস’
–“ইমিডিয়েটলি একটা হেলিকপ্টার অ্যারেঞ্জ করো, রাইট নাউ”
কাইলিন হতভম্ব
তারা আরজের বিপরীতে টু শব্দটি না করে সাথে সাথে তার আদেশ পালনে লেগে পড়ে। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালের ছাদের হেলিপ্যাডে হেলিকপ্টার প্রস্তুত করা হয়। সবকিছু যেন ঝড়ের গতিতে ঘটে যাচ্ছে। সোফিয়াকে দ্রুত ট্রান্সফার করা হয় স্ট্রেচারে করে অচেতন, রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজে মোড়া অবস্থায়। তারপর আরজে, সানা সোফিয়া কে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। হেলিকপ্টারটা মাটি ছেড়ে দ্রুত আকাশে উঠে যায়। হাসপাতালের গণ্ডি পেরিয়ে উঁচুতে উঠতে উঠতে আরজে একবার নিচে তাকায়। নজরে আসে হাসপাতালের গেট ধরে ঢুকছে একের পর এক মিডিয়ার গাড়ি। আরজের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা রহস্যময় হাসি।

রাতের শেষ প্রহর চলছে অথচ আকাশে এখনো অন্ধকারের আধিপত্য, তবুও দিগন্তের এক কোণে হালকা ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। এই নিস্তব্ধ, ঠান্ডা রাতকে যেন জোর করে আটকে রাখা হয়েছে “অরোরা ক্রিস্ট প্রাইভেট মেডিকেলের” চারপাশে।হাসপাতালটাকে ঘিরে রাখা হয়েছে শত শত সশস্ত্র গার্ড। প্রতিটা প্রবেশদ্বারে, ডাবল লেয়ার চেকপোস্ট, বুলেটপ্রুফ ব্যারিকেড, স্ক্যানার, করিডোরজুড়ে ক্যামেরা। এমন ভাবে সিকিউর করা হয়েছে এই জায়গা টা একটা পিঁপড়েও যদি নড়াচড়া করে তারও হিসাব থাকবে। আর এই পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে আছে স্বয়ং যন্ত্রমানব, জ্যাক। সে নিজের ঠান্ডা ধূসর অনুভূতিহীন চোখজোড়া দিয়ে প্রতিটা স্ক্রিন মনিটর করছে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে।
ছয় ঘন্টা, পুরো ছয় ঘন্টা হয়ে গেছে সোফিয়াকে এখানে আনার হয়েছে কিন্তু এখনো তার জ্ঞান ফেরেনি। হসপিটালের ভেতরের একটা আলাদা, আইসোলেটেড কক্ষে শুধুমাত্র একজনকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর সেই একজন হলো আরজে।
কক্ষের ভিতর সোফিয়া শুয়ে আছে তার সারা শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ, হাতের শিরায় স্যালাইন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। সে নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজের উপর নির্দয়ভাবে একের পর এক আঘাত করে গেছে। আরজে তার পাশে বসে আছে না নড়ছে, না কথা বলছে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একসময় তার মা পুরো গোটা একটা সাম্রাজ্য চালাতো আর এখন সে এভাবে বেডে নেতিয়ে পড়ে আছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতর টা ভারী হয়ে ওঠে।
হঠাৎ সোফিয়ার আঙুল সামান্য নড়ে ওঠে।আরজে সেদিকে লক্ষ্য করে তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তার নেত্রপল্লব খুলে যায়, ঠোঁট নাড়িয়ে প্রথম শব্দ টা বের হয়,

–“ই…ক…বা…ল”
শব্দটা বের হতেই আরজের বুকের ভেতরটা যেন চেপে ধরে কেউ। এত কিছুর পরও আজ পর্যন্ত তার মায়ের ভালোবাসা তার বাবার প্রতি একটুখানিও কমেনি। সোফিয়া ধীরে চোখ খুলে তাকায় তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আরজের উপর। কয়েক পলক দুজনের চোখাচোখি হয় নীরবে তারপর হঠাৎ সোফিয়া একটানে অক্সিজেন মাস্ক খুলে উঠে বসার চেষ্টা করে। আর বলতে থাকে,
–“রনো, রনো তুমি দেখেছো ওকে?
তোমার ড্যাড… ওকে আমি দেখেছি, এখানেই ছিল। এই রুমেই… ঠিক এইখানে দাঁড়িয়ে ছিল”
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়, চোখ পাগলের মতো এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। আরজে এগিয়ে এসে তাকে ধরার আগেই সোফিয়া ফের পাগলামো করতে শুরু করে,
–“ও আমাকে ডাকছিল, বলছিল… সোফিয়া… সোফিয়া, তুমি শুননি? তুমি দেখোনি তাই না?”
–“মম, রিল্যাক্স, এখানে কেউ নেই”
বিপরীতে সোফিয়া তার কথা শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। সে আরজের হাত আঁকড়ে ধরে আবারও বলে,
–“রনো, বলো না, ও কোথায় গেল?
আমি তো একটু আগেই ওকে দেখলাম। ও কেন চলে গেল? ও আবার আমাকে ছেড়ে চলে গেল কেন? ইকবাল…ইকবাল তুমি কোথায়? আমাকে ফেলে যেও না”
সে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় চিৎকার করে ওঠে,
–“আমি এবার কিছু বলবো না। আমি আর পাগলামি করবো না। শুধু একবার ফিরে আসো। একবার… একবার আমার দিকে তাকাও”

মায়ের চোখের জল, মাথার উসকোখুসকো চুল আর সারা আদলে থাকা উন্মাদনার দিকে আরজে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে না রাগ, না দুঃখ শুধু একটা গভীর, চাপা যন্ত্রণা। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বেডের পাশে। তার হাত বাড়িয়ে সোফিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে। সোফিয়া সাথে সাথে থেমে যায়। তার দৃষ্টি আটকায় আরজের উপর। আরজে তার খসখসে পুরুষালী হাতটা তুলে সোফিয়ার গালে আলতো করে রেখে নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“প্লিজ, মম…এবার থামো। আর কতটা পাগলামি করবে তুমি?”
সোফিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে ছেলের বাদামী চোখজোড়ায়। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ অশ্রু জল। আরজে তা আলতো করে মুছে দিয়ে ফের বলে,
–“ড্যাড, আর আসবে না। তুমি যতই ডাকো… ওনি আর আসবে না। এগুলো সবই তোমার কল্পনা। প্লিজ এবার অন্তত ড্যাডের জন্য পাগলামি বন্ধ করো”
সোফিয়ার চোখে এখনও সেই উন্মাদ ঝড়। হঠাৎ সে আবারও ক্ষেপে ওঠে। এক ঝটকায় আরজের তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে,

–“না, না, আমি পাগল না। আমি ইকবালকে সত্যিই দেখেছি। সে এখানেই ছিল… এই রুমেই ছিল। তুমি বিশ্বাস করছো না আমাকে? তুমি তোমার নিজের মাকে বিশ্বাস করছো না?”
হঠাৎ সে আবার থেমে যায় আর পরমুহূর্তেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তার চোখে মুখে অদ্ভুত এক জেদের তীব্র ঝিলিক ফুটে ওঠে। সে হাসতে হাসতেই চোখ দিয়ে গরগর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে,
–“কেউই তো বিশ্বাস করে না আমাকে, কেউই না… কেউই না। তুমি কিভাবে করবে? তুমিও তো ওদের মতো। সবাই মিথ্যে বলে, সবাই বলে আমি পাগল”
হঠাৎ সে বেড থেকে নামতে উদ্যত হয়ে বলতে থাকে,
–“যাও, যাও তুমি এখান থেকে। আমি ইকবালের কাছে যাব। সে আমাকে ডাকছে তুমি শুনতে পাচ্ছো না? সে একা… সে আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। আমাকে যেতে হবে”
আরজে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে। সোফিয়া ছটফট করতে করতে চিৎকার করে ওঠে,

–“ছাড়ো আমাকে, রনো, আমি যাচ্ছি”
এই মুহূর্তে আরজের সকল ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। সে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে,
–“ড্যাড তোমাকে ভালোবাসে না, মম”
আরজের হুংকারে রুমটা যেন এক সেকেন্ডে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সোফিয়া থমকে যায়।আরজের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে ওঠে,
–“লিসেন, ড্যাড তোমাকে কোনোদিনও ভালোবাসেনি, কখনো না। তুমি যার জন্য আজও পাগল হয়ে আছো, সে মানুষটা মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তোমাকে ঘৃণা করেছে। সে তোমার দিকে তাকিয়ে শেষ মুহূর্তে বলেছিল, ‘আই হেট ইউ” তবুও তুমি এখনো তার জন্য কাঁদছো?
এতটা ঘৃণার পরও? কেন মম?”
আরজে একপলক থেমে সোফিয়ার দিকে তাকায় যে ইতিমধ্যে নিজের বিস্ফোরিত নয়ন জোড়া নিক্ষেপ করে আছে তার উপর। আরজে ফের বলে,

–“তুমি কেন এমন একজন মানুষের জন্য নিজেকে শেষ করে দিচ্ছো, যে তোমাকে মানুষ হিসেবেও দেখেনি?
কেন তুমি এখনো তাকে ভালোবাসো? কি আছে তার মধ্যে?”
সোফিয়ার তরফ থেকে কোন প্রতুত্তর আসে না। সে একদম স্থির হয়ে আছে। সাথে তার চোখ বড় বড় হয়ে আছে, মুখের পাগলামি টা মিলিয়ে গেছে কবেই। কক্ষে আর কোন শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না। কিয়ৎকাল পর আরজে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার সামনে। আস্তে করে আবার তার হাতটা ধরে নরম স্বরে আওড়ায়,
–“মম…এই সময়টুকু, এই সামান্য সময়টুকু… তুমি কি তোমার ইকবালকে ভুলে থাকতে পারো না? আমার জন্য, তোমার সন্তানের জন্য?”
সোফিয়ার চোখ ভিজে ওঠে। আরজে এখটু থেমে ফের বলে,
–“সারাটা জীবন তুমি ড্যাডের স্বপ্ন দেখে কাটালে। তার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজেকে শেষ করে দিলে। এবার… একবার, একবার আমাদের দিকে তাকাও। আমাদের জন্য কি তুমি একটুও বাঁচতে পারো না?”
সোফিয়া ধীরে ধীরে তার হাতটা ছাড়িয়ে নেয়।
মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব নিচু কণ্ঠে বলে,

–“আমি… তোমার সাথে এত কিছু করেছি, তোমার জীবন নষ্ট করেছি, তোমার স্ত্রী তোমার সন্তানকে, আমি চেষ্টা করেছি তোমাকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। আমি… আমি তোমার জন্য কিছুই করিনি। তাহলে… তুমি কেন? কেন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছো না, রনো?”
আরজে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটা অদ্ভুত, কষ্ট মিশ্রিত হাসি টেনে সে আবার এগিয়ে এসেন সোফিয়ার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“সন্তান কি কখনো তার মাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, মম?”
তুমি আমাকে যতই দূরে ঠেলো, যতই আঘাত দাও, যতই অন্যায় করো। এই “মা’ শব্দটার সামনে… সব হিসাব হার মেনে যায়, সব অভিযোগ ছোট হয়ে যায়, কোটি অন্যায়ও মাথা নত করে। কারণ তুমি মা, আর আমি তোমার সন্তান। আর সন্তানরা কখনো তার মাকে ঘৃণা করতে পারে না”
সে আরও কাছে ঝুঁকে আসে,

–“তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো ঠিক, কিন্তু তুমি আমাকেই জন্ম দিয়েছো। তোমার রক্ত আমার শরীরে এটা সবচেয়ে বড় সত্য। তাই যত কিছুই হোক, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি তোমার পাশেই থাকবো”
রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে যায় আবার। সোফিয়ার চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে জল গড়িয়ে পড়ে। সে আর কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে তার ছেলের দিকে।
আরজে আর কিছু বলার আগেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে সানা। তার পা থেমে যায় দরজার কাছে সামনের দৃশ্যটা দেখে। আরজে দ্রুত নিজের চোখের কোণে জমে থাকা জলটা আঙুলের ডগা দিয়ে মুছে নিজেকে আবারও শক্ত খোলসে আবদ্ধ করে নেয়। সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সানার দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করে বেরিয়ে যায়। কক্ষে এখন শুধু সানা আর সোফিয়া। সানা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বেডের পাশে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করে,

–“আপনি কেন এতটা ভালোবেসেছিলেন ইকবাল কে?
কি আছে উনার মধ্যে? যার জন্য আপনি আজও এমন হয়ে আছেন?”
রমণীর এমন প্রশ্নে সোফিয়া প্রথমে স্থির হয়ে যায়। সে কিয়ৎকাল থেমে থাকে তারপর ধীরে ধীরে তার মুখটা সানার দিকে ঘুরিয়ে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে মলিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুলি আওড়ায়,
–“ভালোবাসা! তুমি আমাকে এই প্রশ্নটা করছো?”
হঠাৎ সোফিয়া শব্দ করে হেসে ওঠে,
–“তুমি কোনোদিন কাউকে ভালোবেসেছো সানা?”
সানা তার প্রশ্নে থমকে যায়। সোফিয়া সামনে ঝুঁকে এসে চোখে উন্মাদনা নিয়ে নিজেই বলে,
–“যদি একবারও সত্যি করে ভালোবাসতে, তাহলে তুমি এই প্রশ্নটা করতে না। ভালোবাসা কারণ দেখে হয় না, ভালোবাসা যুক্তি মানে না,
ভালোবাসা একটা রোগ, যেটা তোমাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি তাকেই চাইবে”

–“সবটা জেনে বুঝে কেন এই ভয়ংকর রোগে বাঁধালেন”
সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে,
–“আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, কেননা সে আমাকে একবার বিশ্বাস করেছিল, শুধু একবার। পুরো পৃথিবী যখন বলছিল আমি খুনি, সে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি’। আমি ওই একটুকু কথায় পুরো জীবন দিয়ে দিয়েছি। ভেবেছি, সে আমার হবে, আমাকে ভালোবাসবে”
রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সানা অনেকক্ষণ চুপ থেকে তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে শুধালো,
–“সব ভালোবাসা এমন না, সব গল্পের শেষ এমন না। আপনি চাইলে নতুন করে শুরু করতে পারেন”
সে একটু হেসে ফের বলে,
–“ভীর, আপনাকে খুব মিস করে জানেন?
প্রতিদিন জিজ্ঞেস করতো, গ্র্যান্ড মা কোথায়? সে আপনার জন্য ছবি আঁকে, আপনাকে দেখাবে বলে রেখে দেয়। আপনি গেলে ও আপনাকে ছাড়বেই না”
বিপরীতে সোফিয়া কিছুই বলছে না। সে সানার দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে খুব আস্তে বিড়বিড় করে,

–“ইকবাল, তুমি কোথায়
আমাকে নিতে আসবে না?”
সানা আবারও বলে,
–“আপনি আমাদের সাথে থাকবেন, যেখানে কোনো চিৎকার থাকবে না, কোনো রক্ত থাকবে না, শুধু শান্তি থাকবে। আপনি চাইলে আমি আপনাকে সব দেখাবো, সকালের রোদে বসে চা খাবো, আরভি আপনার কোলে মাথা রেখে ঘুমাবে, আপনি গল্প বলবেন, আমরা শুনবো”
সে তার আরেকটু কাছে এসে ফিসফিসায়,
–“একবার চেষ্টা করবেন না?
আমাদের সাথে ফিরে যেতে?”

সানা থামছে না, সে একে একে বলেই চলছে আরো এটা সেটা। এদিকে সোফিয়ার চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। ধীরে ধীরে তার ক্লান্ত নেত্রপল্লব বন্ধ হয়ে যায়। সানা আরও কিছুক্ষণ বলার পর যখন খেয়াল হয় সোফিয়া কিছু বলছে না। তখনই বুঝতে পারে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। সে আস্তে শব্দ না করে বাইরে চলে আসে।
দরজা খুলে করিডোরে বের হতেই নজরে আসে আরজে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে থাকা জ্যাকের সাথে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে। আরজে সানাকে দেখে তার কাছে আসে। সানা চারদিকে তাকিয়ে একটু অস্থির কণ্ঠে বলে,
–“রানভীর, এখানে আসার পর থেকে রিয়ানাকে একবারও দেখলাম না। তার মায়ের এই অবস্থা, তার তো একবার আসা উচিত ছিল”
রিয়ানার নামটা শোনা মাত্র আরজের মুখে ছায়া নেমে আসে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে
তারপর ধীরে বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৮

–“তুমি রিয়ানার সাথে দেখা করতে চাও?”
–“কেন? রিয়ানার কি হয়েছে?”
আরজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে সানার হাতটা ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
–“চলো, তোমাকে ওর কাছে নিয়ে যাই”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০