Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৫
সাবা খান

সাতসকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। ধূসর শুভ্রতার এক নিস্তব্ধ চাদর মুড়ে রেখেছে সমগ্র কবরস্থানটাকে। শিশিরভেজা ঘাসের ডগাগুলোতে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়লেও সেই আলো যেন এখনো সম্পূর্ণ জেগে উঠতে পারেনি। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখিরা ক্ষীণস্বরে ডাকছে, আর সেই ডাক মিলিয়ে যাচ্ছে সকালের ঠান্ডা বাতাসে। সেই কবরগুলোর মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক।

কালো ওভারকোটের পকেটে গুঁজে রাখা দুটো হাত। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। অথচ তার ভেতরে যেন বহু বছরের জমে থাকা বিষাক্ত স্মৃতিরা একে অপরকে ছিন্নভিন্ন করছে। তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিজভী। আর রিজভীকে দেখার মুহূর্তেই জ্যাকের মনে ভেসে ওঠে বহু পুরোনো, বহু ঘৃণিত এক অধ্যায়,
“আলভী তুৎমিশ”, রিজভীর বাবা। তার নিজেরও রক্তের সম্পর্কযুক্ত মানুষ। যে সম্পর্ককে জ্যাক সারাজীবন ঘৃণা করেছে। একমাত্র আরজের জন্য আজ পর্যন্ত রিজভীর সাথে কিছু করেনি জ্যাক। কেননা আরজে শুধু তাকে সেই নরক থেকে মুক্তি দেয়নি যেখানে তার মায়ের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বরং তাকে একটা নতুন জীবনও দিয়েছে।

হঠাৎ তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে সেই রাত, মদে বুঁদ হয়ে থাকা কিছু পশুর রাত। সেই রাত, যেদিন ইকবাল এবং তার বন্ধুরা মাতাল উন্মত্ততায় হারিয়ে গিয়েছিল। যদিও সবাই সেখানে ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একমাত্র আলভী তুৎমিশই জ্যাকের মা এভেলিন গ্রেস কার্টারের জীবনের সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। ইকবাল ও বাকিরা পরে অন্য নারীদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অথচ আলভী ছিল তাদের ফাঁদের শিকার। বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র ভার্জিন হওয়ার কারণে তাকে পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল সেই পরিস্থিতির মধ্যে।
আর সেই রাতের ফলাফল, জ্যাক।

একটি অনাকাঙ্ক্ষিত জন্মের মধ্যমে একটি ভাঙা জীবনের শুরু হয়। কিন্তু জ্যাক জানে না পরবর্তী কাহিনী। সে জানে না, অপরাধবোধে দগ্ধ হয়ে আলভী বহুবার ফিরে গিয়েছিল সেই বারে। বারবার খোঁজ করেছিল এভেলিনকে, কিন্তু পায়নি। সে জানে না, বছরের পর বছর অনুসন্ধানের পর একদিন আলভী সত্যিই এভেলিনের খোঁজ পেয়েছিল অতঃপর জেনেছিল জ্যাকের কথা, জেনেছিল তার নিজের অপরাধের রক্তমাংসের অস্তিত্ব পৃথিবীতে বেঁচে আছে।
আর সেই সত্য জানার পর এক রাতে সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে সে সবকিছু স্বীকার করেছিল তার স্ত্রী ডক্টর সাইয়েদার কাছে। সেই রাত থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের সম্পর্কের অবনতি। কারণ একজন স্ত্রী অনেক কিছু ক্ষমা করতে পারলেও, স্বামীর অতীতের এমন পাপকে হৃদয়ে ধারণ করা সহজ নয়। আলভী চেয়েছিল জ্যাককে নিজের পরিচয় দিতে, নিজের নাম দিতে। সাইয়েদা সেটা কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি। তবুও সে জ্যাককে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করেনি। কিন্তু যখন আলভী বলেছিল, সে এভেলিনকেও বিয়ে করতে চায় তখন থেকেই তাদের সংসারে প্রতিদিনের ঝড় শুরু হয়। তর্ক, বিতর্ক, মান অভিমান, নীরবতা আর ক্ষোভ। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে সেই অস্থিরতা।

অবশেষে একসময় আলভী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে আর এভেলিনকে বিয়ে করবে না। কিন্তু জ্যাককে পৃথিবীর সামনে নিজের ছেলে হিসেবে স্বীকার করবে। তবে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভাগ্য ইতোমধ্যেই নিজের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত লিখে ফেলেছে। এভেলিন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। আর জ্যাক হারিয়ে যায় অজানা কোনো ঠিকানায়। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলভী তাকে খুঁজেছে দেশ দেশান্তরে। কিন্তু কখনো খুঁজে পায়নি। এই অপরাধবোধই ধীরে ধীরে তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কিন্তু এসবের কিছুই জানে না রিজভী। সে শুধু ভ্রু কুঁচকে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে আবারও প্রশ্ন করে,
—”জ্যাক? তুমি এখানে কেন?”
জ্যাক নিজের চিন্তার গভীর অন্ধকার থেকে ফিরে আসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ততা এনে বলে,
—”জগিং করতে বের হয়েছিলাম। এদিক দিয়ে আসতে গিয়ে দেখলাম, তাই একটু দাঁড়ালাম”
রিজভী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে। জ্যাক আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। সে পাশ কাটিয়ে ধীর পায়ে কবরস্থান ছেড়ে চলে যায়। রিজভী কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখে তারপর ঘুরে দাঁড়ায়। সামনে তার বাবার কবর, আলভী তুৎমিশ। রিজভী ধীরে ধীরে কবরটার সামনে এসে দাঁড়ায়। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। সে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,

—”আসসালামু আলাইকুম, ড্যাড।
জানো, আজ আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটা। কেননা আজ আমার বিয়ে। ছোটবেলা থেকে যতবার এই দিনের কথা ভেবেছি, ততবার ভেবেছি তুমি থাকবে। আমার কাঁধে হাত রেখে বলবে ‘আমার ছেলে বড় হয়ে গেছে।’ কিন্তু আজ তুমি নেই, ড্যাড”
অজান্তে তার চোখের কার্নিশ ভিজে ওঠে,
—”আমি ডাক্তার হয়েছি, তুমি দেখোনি। আমি নিজের জীবন গুছিয়েছি, তুমি দেখোনি। আজ আমি সংসার শুরু করছি, তাও তুমি দেখছো না। খুব মিস করি তোমাকে, ড্যাড, খুব”
কথা বলতে বলতে তার চোখ চলে যায় পাশের কবরটার দিকে। আর মুহূর্তেই তার বুকটা আবারও হাহাকার করে ওঠে পাথরের পলকে
“মিসেস সাইয়েদা তুৎমিশ” নামটা দেখে। তার বাবার নামের ঠিক পাশেই খোদাই করা রয়েছে সেই নাম। সাইয়েদা বডি প্রথমে খুঁজে পাওয়া যায়নি কেননা মার্কান তাকে ফ্রোজেন করে নিজের আস্তানায় রেখে দিয়েছে আর আরজে সেখান থেকে তাকে নিয়ে এসেছে।
রিজভী নিঃশব্দে মায়ের কবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। পরমুহূর্তেই গড়িয়ে পড়ে উষ্ণ অশ্রু অবিরাম ধারায়। সে নিচু স্বরে ডেকে ওঠে,

—”মম…”
একটা শব্দ উচ্চারণ করতেই যেন তার গলা আটকে আসে তবুও আওড়ায়,
—”মনে আছে, তুমি আমাকে একদিন কটাক্ষ করে বলেছিলে “একদিন তুই ঠিকই বিয়ে করবি, কিন্তু সেদিন আমি থাকব না” তখন তোমার কথা শুনে কত রাগ করেছিলাম। বলেছিলাম, এসব বাজে কথা বলতে নেই”
একটা অসহায় হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে। তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে সে ফের বলে,
—”দেখো না মম, ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর খেলা… তুমি ঠিকই বলেছিলে। আজ সত্যিই আমার বিয়ে হচ্ছে… অথচ তুমি নেই। মম, আমি তোমার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করছি, তোমার ঈশানীকে। মনে আছে, তুমি সবসময় বলতে ‘পরিবার হারা মেয়েটার একটু ভালোবাসা দরকার, একটু ভালোবাসা ফেলেই ঈশানীর মতো মেয়ে সংসার আলো করে রাখবে?”
সে মাথাটা আরো নিচু করে বলে,

—”দেখো না মম… তোমার পছন্দটাই শেষ পর্যন্ত আমার ভাগ্যে লেখা ছিল। একবার যদি আজকে থাকতে… একবার যদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে ‘আমার ছেলে ঠিক রাজপুত্রের মতো লাগছে’…খুব দরকার ছিল তোমাকে, মম, খুব… খুব দরকার ছিল”
তার দুটো হাত কবরের উপর স্থির হয়ে যায়। সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যায়। সূর্যের আলো একটু একটু করে উজ্জ্বল হতে থাকে।
কিন্তু সেই আলোও যেন রিজভীর বুকের ভেতরের শূন্যতাটুকু আলোকিত করতে পারে না আর না রিজভীর থেকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা যন্ত্রমানব কে। হ্যাঁ, জ্যাক এখনো যায়নি। কেন যায়নি সে নিজেও জানে না, কেন রিজভী কাঁদার সময় তার হাতটা পকেট থেকে বের হয়ে একটু উপরে উঠেছিল সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। তাহলে একেই কী বলে রক্তের টান?
নাহ, সে এগুলোর কখনো তোয়াক্কা করেনি আর না মানে। এবার চোয়াল শক্ত করে গটগট পায়ে বেড়িয়ে পড়ে।

বিকেলের শেষ প্রহর ধীরে ধীরে গড়িয়ে সন্ধ্যার সোনালি সীমানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলো যখন আকাশের পশ্চিম প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই যেন সমগ্র ব্ল্যাক ম্যানশন এক নতুন পরিচয়ে, এক নতুন মহিমায় নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে। আজ আর সেটাকে শুধুমাত্র একটি ম্যানশন বলা চলে না বরং আজ সেটি যেন কোনো রাজবংশের শতাব্দীপ্রাচীন প্রাসাদ, কোনো কিংবদন্তির সম্রাটের বিবাহমণ্ডপ, কোনো স্বপ্নলোকের অলৌকিক স্থাপত্য।
দূর থেকে তাকালেই মনে হয়, মাটির বুকে নেমে এসেছে আলোর তৈরি কোনো সাম্রাজ্য। সম্পূর্ণ ম্যানশনটিকে সজ্জিত করা হয়েছে অসংখ্য ঝাড়বাতি, স্ফটিক প্রদীপ এবং হাজার হাজার ফেয়ারি লাইট দিয়ে। সাদা মার্বেলের দেয়ালগুলো সোনালি আলোর প্রতিফলনে এমনভাবে ঝলমল করছে যেন প্রতিটি ইটের গাত্রে গলিত স্বর্ণ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

প্রবেশপথ থেকে শুরু করে মূল প্রাঙ্গণ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার তাজা ফুল। যাদের মধ্যে অন্যতম রক্তিম গোলাপ, সাদা লিলি, নীল অর্কিড, গোলাপি পিওনি, দুর্লভ বিদেশি টিউলিপ। প্রতিটি ফুল এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যেন প্রকৃতি নিজেই আজ নিজের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। মাথার উপর বিশাল বিশাল ফুলের আর্চ আর সেগুলোর গায়ে জড়ানো স্ফটিকের মালা মাঝে মাঝে বাতাসে দুলতে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁচের ঘণ্টা। যখনই হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে, তখনই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে মৃদু সুরেলা ঝংকার। এই মুগ্ধ করা ঝংকার পুরো পরিবেশটাকে আরও বেশি অলৌকিক করে তুলছে।

আজকের দিনটিতে সাধারণ মানুষের জন্যও প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে ব্ল্যাক ম্যানশনে। দূর দূরান্ত থেকে আসা মানুষজন বিস্মিত চোখে চারপাশ দেখছে, কারও চোখে অবিশ্বাস, কারও চোখে মুগ্ধতা, কারও চোখে স্বপ্ন। অতিথিদের জন্য আলাদা বিশাল ভোজনব্যবস্থা করা হয়েছে। দীর্ঘ সারিতে সাজানো রয়েছে অসংখ্য খাবার, দেশি ও বিদেশি শতাধিক পদ। কেউ খাওয়া শেষ করে সন্তুষ্ট মনে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ শুধু বিয়ের এক ঝলক দেখার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে। এদিকে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। তারা ইতোমধ্যেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে। কারো হাতে হাই এন্ড ক্যামেরা, কারো কাঁধে বিশাল লেন্স, আবার কেউ লাইভ সম্প্রচারে ব্যস্ত। একটার পর একটা ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠছে। মুহূর্তগুলোকে বন্দি করার জন্য যেন সবার মধ্যেই এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে।
সন্ধ্যা যত ঘনিয়ে আসে, মানুষের উচ্ছ্বাস ততই বাড়তে থাকে। অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত, বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের কোলাহল যেন নতুন মাত্রা পায়। সমগ্র প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি বিশাল রাজকীয় বিবাহমঞ্চ, বা চারটি পৃথক আসর। সাদা ও সোনালি রঙের বিশাল কাঠামোর উপর তৈরি প্রতিটি আসর দেখতে যেন রাজপ্রাসাদের ক্ষুদ্র সংস্করণ। মাঝখানে বর ও কনের জন্য আলাদা আসন রাখা হয়েছে। তাদের মাঝখানে টানানো হয়েছে সূক্ষ্ম নকশাখচিত পাতলা পর্দা।

প্রতিটি মঞ্চের মাথার উপর বিশাল ফুলের গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। ফুলের ফাঁক দিয়ে ঝুলছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন ফুল দিয়ে তৈরি চারটি স্বর্গীয় ছাতা আকাশ থেকে নেমে এসেছে। সাদা গোলাপের স্তর, তার মধ্যে ঝুলন্ত অর্কিড, আর চারপাশে হাজারো ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু পুরো পরিবেশকে স্বপ্নের মতো করে তুলেছে।
এরই মধ্যে হঠাৎ জনতার মধ্যে উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে গেল। সবার দৃষ্টি ঘুরে যায় মূল প্রবেশপথের দিকে। কেননা বরেরা এসে গেছে। প্রথমে প্রবেশ করে একদল সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। কালো ইউনিফর্মে আবৃত দীর্ঘদেহী প্রশিক্ষিত গার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে পুরো পথ পরিষ্কার করে ফেলে। মানুষজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রেস ও মিডিয়ার সদস্যদেরও নির্ধারিত সীমারেখার পেছনে রাখা হয়।

তারপর সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় কেননা তখনই প্রবেশ ঘটে আরজের। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের শব্দ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কেউ মোবাইল তুলে ধরে, কেউ বা চিৎকার করে ওঠে। ফ্ল্যাশের ঝলকানি কয়েকগুণ বেড়ে গেল । আজ তাকে যেন কোনো সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো প্রাচীন সাম্রাজ্যের সম্রাট কিংবা কোনো গ্রিক কিংবদন্তির দেবপুরুষ। আজ তার গায়ে শোভা পাচ্ছে রাজকীয় সোনালি শেরওয়ানি। শেরওয়ানির প্রতিটি অংশে সূক্ষ্ম ডার্ক রেড জরি ও হ্যান্ড এমব্রয়ডারির কাজ করা। তার বুকে বসানো ব্রোচের ক্ষুদ্র হীরকখণ্ডগুলো আলোর প্রতিফলনে বারবার ঝলসে উঠছিল। আর তার সঙ্গে মানানসই ঐতিহ্যবাহী জুতা তাকে আরও রাজসিক করে তুলেছিল। যদিও আরজে বিয়ের জন্য স্যুট ঠিক করেছিল কিন্তু সানা তাকে একপ্রকার জোর করে এটা পরিয়েছে। রমণীর সাফ সাফ বলে দিয়েছে, আরজে এটা না পড়লে সে বিয়েই বসবে না। আরজে আর কী করবে?
বাধ্য স্বামীর মতো বউয়ের কথা মেনে নিল।

কিন্তু পোশাকের থেকেও বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল তার ব্যক্তিত্ব। কপালের উপর পড়ে থাকা সামান্য এলোমেলো চুল, তীক্ষ্ণ চোয়াল, ডার্ক ব্রাউন আইস, অহংকারমিশ্রিত রাজসিক স্থিরতা সব মিলিয়ে তাকে লাগছে অন্যন্য। তার জন্য নির্ধারিত পথজুড়ে বিছানো রক্তিম কার্পেট আর মাথার উপর ফুলে মোড়া বিশাল টানেল।
দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিরা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। আরজে একবার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের নির্ধারিত আসরের দিকে এগিয়ে যায়। তার পেছনেই প্রবেশ করে এসপি। আজ তার পরনে গাঢ় সোনালি শেরওয়ানির উপর সূক্ষ্ম মেরুন কারুকাজ। তারপর প্রবেশ করে রিজভী, সে হালকা আইভরি গোল্ড রঙের শেরওয়ানি বেছে নিয়েছে। এটা বললে ভুল হবে কেননা সে নয়, বরং এটা ঈশানীর পছন্দ ছিল।

সবশেষে প্রবেশ করে যন্ত্রমানব, আর তার প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ যেন আবার বদলে যায়। তার পরনে কালো ও সোনালির সংমিশ্রণে তৈরি রাজকীয় শেরওয়ানি। দেখে মনে হচ্ছে অন্ধকারের কোনো সম্রাট ভুলবশত আলোয় ভরা এই প্রাসাদে এসে উপস্থিত হয়েছে। তার মুখে বিন্দুমাত্র হাসি নেই। একটু পর কাইলিন আসে সম্পূর্ণ সাদা স্যুটে। এক এক করে চারজন নিজেদের নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসে পড়ে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ অবিরাম ঝলসে পড়তে থাকে তাদের দিকে।
সবাই বসার পর স্বাভাবিক থাকলেও এসপির চোখে মুখে স্পষ্ট এক ধরনের অস্থিরতা। সে বারবার নিজের মুঠোফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে আর বারবার কাউকে কল দিচ্ছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটাই নাম, “বিগ ব্রো”
কিন্তু প্রতিবারই কল বেজে কেটে যাচ্ছে। বিপরীতে কোনো সাড়া নেই। এসপির ভ্রু ক্রমশ কুঁচকে আসে। আজ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। আর সেই দিনে তার বড় ভাই উপস্থিত থাকবে না এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

অন্যদিকে, নিজের নির্ধারিত আসনে বসে থাকা আরজে কাইলিনের দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করে কিছু। কাইলিন মুহূর্তেই ইশারার অর্থ বুঝে ফেলে। কোনো কথা না বলে সেখান থেকে সরে যায়। কয়েক মিনিট পর সে ফিরে আসে তবে একা নয়। তার সঙ্গে রয়েছেন একজন নারী। একজন এমন নারী, যাকে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মৃত বলে জানে। সে আর কেউ না, সোফিয়া জাওয়ান।
তবে আজ তাকে চেনার উপায় নেই। তার মুখের অধিকাংশ অংশ ঢেকে আছে কালো মাস্কে। মাথায় পরা প্রশস্ত কিনারার কালো হ্যাট মুখের উপর ছায়া ফেলে রেখেছে। সঙ্গে রয়েছে গাঢ় কালো লম্বা কোট। বাইরের কেউ তাকে দেখলে সাধারণ কোনো অতিথি বলেই মনে করবে। এতদিন তাকে জনসমক্ষে আনা হয়নি। একদিকে তার নাজুক মানসিক অবস্থা অন্যদিকে মিডিয়ার অবিরাম নজরদারি। পৃথিবীর সামনে বহু আগেই সোফিয়া জাওয়ানের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। আবার যদি হঠাৎ করে কেউ তাকে চিনে ফেলে তাহলে নতুন করে শুরু হবে বিতর্ক। নতুন করে জেগে উঠবে পুরোনো ঝড়। যদিও আরজে এসবের কোনো তোয়াক্কাই করত না। কিন্তু সানা চেয়েছিল আর কোনো ঝামেলা না হোক। তাই এতদিন তাকে আড়ালেই রাখা হয়েছে। আজ তাকে ড্রাগস দিয়ে আনা হয়েছে যার কারণে সে অনেকটা স্বাভাবিকই আছে।

আরজে নিজের মাকে দেখামাত্র ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটিয়ে তোলে। সে হাত তুলে ইশারা করে কাছে আসার জন্য। কিন্তু সোফিয়া মৃদু মাথা নেড়ে না সূচক ভঙ্গি করেন। তারপর হাত তুলে ইশারা করেন, তিনি এখানেই ভালো আছেন, দূর থেকেই দেখবেন। বিপরীতে আরজে আর জোর করল না। সে শুধু চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে তাকায়। মুহূর্তেই আরও কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড সোফিয়ার চারপাশে অবস্থান নেয়। যাতে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি তার আশেপাশে ঘেঁষতে না পারে।
এদিকে এসপি তখনও একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছে। তার ধৈর্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ঠিক সেই সময় তার দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়ে মূল প্রবেশপথের দিকে যেখানে গেটের বাইরে একসঙ্গে চারটি কালো বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামে। চারপাশের কয়েকজন অতিথি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে থাকে। গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে নেমে আসে এজাজ ও ইয়ান। তারপর মাঝখানের গাড়ির দরজা খুলে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ নিচে নামে। আর তাকে দেখেই এসপির চোখ চকচক করে ওঠে, সারহাদ চৌধুরী।

আজ সম্পূর্ণ কালো পোশাকে আবৃত সে। গভীর কালো শেরওয়ানির উপর সূক্ষ্ম কালো সূতার কারুকাজ, হাতে কালো চামড়ার গ্লাভস, চোখে কালো সানগ্লাস। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছে রাতের অন্ধকার যেন মানুষের রূপ নিয়ে হেঁটে এসেছে। তবে সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা কেউ দেখতে পায় না। কেউ জানে না, তার কৃষ্ণকালো চোখ দুটো কতটা লাল হয়ে আছে, কতটা ফুলে আছে। কত রাতের নির্ঘুম যন্ত্রণা সেখানে জমে আছে। সারহাদ গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে দেয়। সেখান থেকে নেমে আসেন রাহেলা চৌধুরী।
গত কয়েকদিন ধরেই তিনি জেদ ধরে বসেছিলেন। যেভাবেই হোক, তিনি এই বিয়ে দেখবেন। নিজের ছোট ছেলের জীবনের সবচেয়ে বড় দিনে তিনি অনুপস্থিত থাকবেন না। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সারহাদকে সেখানেই রেখে দ্রুত এগিয়ে যান এসপির দিকে। আর সারহাদ?
সে ধীর পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে। নির্লিপ্তভাবে দূর থেকে সবকিছু দেখতে থাকে। ওদিকে রাহেলা চৌধুরী এসে দাঁড়ান এসপির ঠিক সামনে। এক মুহূর্তের জন্য মা ছেলে দুজনের চোখাচোখি হয়। পরের মুহূর্তেই এসপি শিশুর মতো ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। এত মানুষের সামনে, এত আলো ঝলমলের মাঝেও সেই আলিঙ্গনে যেন এক ছোট্ট ছেলের সমস্ত ভালোবাসা মিশে থাকে।
রাহেলা চৌধুরী স্নেহভরা হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর মাতৃত্বভরা কণ্ঠে বলেন,

—”আমার ছেলেটা আজ সত্যিই বড় হয়ে গেল”
এসপি সাথে সাথে হেসে বলে,
—”অনেক আগেই বড় হয়েছি, মম”
রাহেলা চৌধুরী হালকা ধমক দিয়ে ওঠে তাকে,
—”মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না”
তিনি তার দুই গাল স্পর্শ করে চোখ ভরে তাকিয়ে থাকেন। তারপর আবেগভরা কণ্ঠে আওড়ান,
—”আজ তোকে দেখে আমার বুক ভরে যাচ্ছে। আল্লাহ তোকে সুখী রাখুক, বাবা। তোর ঘরটা হাসিতে ভরে থাকুক, তোর জীবনে যেন কোনো অন্ধকার আর না আসে”
তিনি থেমে চোখের কোণে জমে ওঠা জল লুকানোর চেষ্টা করে ফের বলেন,
—”স্ত্রীর হাত কখনো ছেড়ে দিবিনা, সুখের সময় যেমন পাশে থাকবি, তেমনি কষ্টের সময়ও তার ছায়া হয়ে থাকবি। সংসার ভালোবাসা দিয়ে গড়তে হয়, জেদ দিয়ে না”
এসপি নীরবে শুনতে থাকে তার মায়ের কথাগুলো। তার মা এমনই, খুব নরম মনের মানুষ। রাহেলা তার কপালে চুমু খেয়ে শুধালো,

—”আমি অনেক কিছু চাই না, সারফারাদ। শুধু চাই, তোরা সবাই একসাথে থাক হেসে খেলে। আমি যখন থাকব না, তখনও যেন তোদের মুখে এই হাসিটা থাকে”
এসপি হঠাৎ মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ফেলে,
—”এমন কথা বলবে না, মম”
—”জীবনের নিয়ম কেউ বদলাতে পারে না, বাবা। তবে আমি যতদিন আছি, ততদিন তোদের সুখ দেখেই বাঁচতে চাই”
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদ নীরবে সেই দৃশ্য দেখছে। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু গভীর কোথাও হৃদয়ের এক গোপন কোণে অদ্ভুত এক শূন্যতা নীরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন এসপি মায়ের কাছ থেকে সরে নিজের বড় ভাই সারহাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, তখনই হঠাৎ সমগ্র প্রাঙ্গণের আবহ বদলে যায়। চারদিকে একসাথে জ্বলে ওঠে শত শত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। মিডিয়াকর্মীদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। অতিথিদের ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন বাড়তে থাকে। কারও চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে আসে, কেউ আবার দ্রুত নিজের ফোন তুলে ধরে সেই মুহূর্তটাকে বন্দি করার জন্য। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সমস্ত দৃষ্টি ঘুরে যায় মূল প্রবেশপথের দিকে।

আর তারপর ফুলে সজ্জিত দীর্ঘ রক্তিম কার্পেটের উপর ধীরে ধীরে পদচারণা করে প্রবেশ করে সানা। মুহূর্তেই চারপাশের কোলাহল যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয়, এতক্ষণ পর্যন্ত সবাই শুধু অপেক্ষাই করছিল এই একটি দৃশ্য দেখার জন্য। আজ সানাকে কোনো সাধারণ কনে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কোনো প্রাচীন সাম্রাজ্যের রাজকন্যা বহু শতাব্দীর নিদ্রা ভেঙে পৃথিবীর বুকে ফিরে এসেছে নিঃশব্দ কবিতার মতো। রমণীর পরনে টকটকে রক্তিম লেহেঙ্গা। গাঢ় লালের সেই বর্ণ যেন অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোকে নিজের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। লেহেঙ্গার প্রতিটি স্তরে সূক্ষ্ম সোনালি জরি, রেশমি সুতা ও হাতে করা কারুকাজ। অসংখ্য ক্ষুদ্র ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা সোনালি সুতোর বুননে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেন পোশাকের উপর কোনো শিল্পী মাসের পর মাস ধরে নিজের স্বপ্ন এঁকে গিয়েছে। লেহেঙ্গার নিচের প্রান্তজুড়ে ভারী সোনালি এমব্রয়ডারি। মাথার উপর দিয়ে নামা সেই দোপাট্টাটাও রক্তিম রঙের যার প্রান্তজুড়ে সূক্ষ্ম মুক্তোর কাজ। গলায় স্তরে স্তরে হীরকখচিত ও কুন্দনের গয়না, কানে ভারী ঝুমকা, কপালে সূক্ষ্ম টিকলি সাথে হাতে লাল চুড়ি আর সোনালি অলংকারের মিশ্রণ।

মেহেদির গাঢ় রঙে রাঙানো হাতদুটো দিয়ে সে নিজের লেহেঙ্গার দুই পাশ আলতো করে ধরে এগিয়ে আসছে। আজ তার শ্যামরঙ্গা আদল সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে ভারী মেকআপের আস্তরণে। তার পিছনে তখন বাজতে শুরু করেছে সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের মৃদু সংগীত, বেহালার কোমল সুর আর পিয়ানোর ধীর মূর্ছনা। সবকিছু মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মাঝেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে হলো আরজে।
সে একবারও চোখের পলক ফেলছে না, যেন চোখ সরালেই দৃশ্যটা হারিয়ে যাবে, যেন এই মুহূর্তটা বাস্তব নয়, কোনো স্বপ্ন। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জমে উঠছে। অসংখ্য যুদ্ধ জয় করা মানুষটি আজ নিজের হৃদয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে। হঠাৎ তার মনে হলো, এটা কি সত্যিই সেই সানা?

সেই মেয়েটা, যার সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া হয়, যে তাকে কটমট করে তাকায়, যে তাকে বকাঝকা করে, যে তার সমস্ত অন্ধকারের মাঝেও আলো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ তাকে কেন এত অপরিচিত লাগছে, এত অপরূপা লাগছে, এত নিজের লাগছে। মুহূর্তে তার গলায় যেন কিছু একটা আটকে যায়। গভীর শ্বাস নিয়েও বুকের ভার কমে না। তার দৃষ্টি সানার উপর স্থির হয়ে থাকে। অবশেষে খুব ধীরে, খুব নিচু স্বরে সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠে,
—”এই মেয়েটা নিশ্চিত আমাকে প্রলুব্ধ করার জন্য কোন কালো জাদু করেছে। নাহলে কেন ওকে দেখলেই পৃথিবীর সবকিছু ভুলে যাই আমি? কেন মনে হয়, ওকে ছাড়া আমার জীবনের বাকি সব অর্জন অর্থহীন?”
তার বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে একটু ছোঁয়ার জন্য। তার চোখের গভীরে ফুটে ওঠে নিষিদ্ধ চাহনার তীব্র বাসনা। মুহূর্তের জন্য সে চারপাশের সব শব্দ ভুলে যায়, মিডিয়ার ফ্ল্যাশ, মানুষের উচ্ছ্বাস, সঙ্গীত সবকিছু যেন মিলিয়ে যায় বাদামী চোখজোড়ায়। তার পৃথিবী তখন শুধুই একটিমাত্র মানুষকে ঘিরে, সানা। আর রক্তিম কার্পেটের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা সেই রাজকীয় অবয়বকে দেখেই আরজের মনে হয়, জীবনে যদি কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে, তবে সেটা এই মেয়েটাই।

সানার প্রবেশের পর যেন মুহূর্তের জন্য সমগ্র প্রাঙ্গণের সময়চক্র থমকে দাঁড়ায়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো একের পর এক জ্বলে উঠতে থাকে, অথচ সেই ঝলকানির মাঝেও সকলের চোখে একই বিস্ময়। বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের মুখেও প্রশংসার শেষ নেই। আর এই সমস্ত বিস্ময় আর প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে সানা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে নিজের নির্ধারিত আসনের দিকে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটে। আরভি এতক্ষণ আরজের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আরজে তখন সম্পূর্ণ বেখেয়াল। তার সমস্ত সত্তা, সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে আছে শুধুমাত্র সানার মাঝে। ফলে সুযোগ বুঝে আরভি তার হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর হঠাৎই কারও দিকে তাকিয়ে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে,

—”বড় পাপা…”
পরমুহূর্তেই ছোট্ট পা দুটো নিয়ে দৌড়ে চলে যায় সে। আরজে কিছুই খেয়াল না করলেও সানা কিন্তু ঠিকই খেয়াল করেছে। মাতৃত্বের স্বভাবসিদ্ধ টানেই তার দৃষ্টি আরভির দিকে চলে যায়। প্রথমে সে শুধু দেখে আরভি দৌড়াচ্ছে। তারপর সে অনুসরণ করে সেই গন্তব্যকে আর ঠিক তখনই, তার দৃষ্টি এসে থামকে যায় সারহাদের উপর। যে স্থির দাঁড়িয়ে আছে অচঞ্চল ও নিঃশব্দে। তার কালো সানগ্লাস অনেক আগেই খুলে রাখা। সেই কৃষ্ণকালো চোখদুটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সানার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কী আছে?
না সেখানে কোনো অভিযোগ আছে, না কোনো প্রশ্ন, না কোনো দাবি। শুধু এক গভীর, দুর্বোধ্য নীরবতা। একটা নীরবতা, যার গভীরতা সমুদ্রের মতো। সানা সেই দৃষ্টি বুঝতে পারল না। সে বুঝতে পারল না, সেই চোখের আড়ালে কত বছরের জমে থাকা যন্ত্রণা নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। অথবা সে বুঝতে চায়নি, কত শত অপূর্ণতা সেখানে কবর হয়ে আছে। রমণী শুধু আরভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়ে। তারপর ইশারায় সারহাদকে ধন্যবাদ জানায় ছেলেটার দিকে নজর রাখার জন্য। আর আবারও সামনে এগিয়ে যায়।

কিন্তু সেই একটুকরো হাসিই যেন সারহাদের সমস্ত পৃথিবীকে ভেঙেচুরে দেয়। মনে হয়, তার চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে গেছে, কিছুই নেই শুধু আছে সেই হাসি, সেই মুখ, সেই বিধ্বংসী নারী। তার মনে হয়, স্বর্গের কোনো অপ্সরা হয়তো ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। এত সুন্দর কাউকে কি সত্যিই সৃষ্টি করা সম্ভব?
এত আলো কি কোনো মানুষের ভেতরে থাকতে পারে?
তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হৃদস্পন্দন যেন কানে এসে বাজতে থাকে, সে চোখ সরাতে পারল না, চাওয়া সত্ত্বেও পারল না। যেন দৃষ্টি আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ঠিক তখনই নিচ থেকে একটা ছোট্ট হাত এসে তার কোট টানতে শুরু করে,
—”বড় পাপা….”
—”বড় পাপা”
—”আমার দিকে তাকাও, আরে নিচে তাকাওওও..”

শিশুসুলভ কণ্ঠ স্বরে সারহাদ ভ্রম থেকে ছিটকে বাহিরে আসে। অতঃপর সে নিচে তাকায় নজরে আসে আরভি দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত উঁচু করে কোলে নেওয়ার আবদার করছে। সারহাদ একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে নিচু হয়ে আরভিকে কোলে তুলে নেয়। আরভি তার গলা জড়িয়ে ধরে। সেই মুহূর্তেই সানা আরেকবার পিছনে তাকায় আরভিকে দেখার জন্য। আর তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় সারহাদের। সানা এবার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটিয়ে তোলে, একটা ছোট্ট
স্বাভাবিক হাসি। আরভিকে কোলে নেওয়ার জন্য, কৃতজ্ঞতার হাসি।
কিন্তু সেই হাসিটুকুই যেন সারহাদের হৃদয়ের শেষ প্রতিরক্ষা ভেঙে দেয়। তার মনে হয়, এই একটি হাসির বিনিময়ে সে হয়তো সমস্ত জীবন দিয়ে দিতে পারত, মৃত্যুকেও বিনা দ্বিধায় স্বাগত জানাতে পারত। কারণ এত সুন্দর হাসি সে আগে কখনো দেখেনি, কখনোই না। অথবা কখনো দেখার চেষ্টা করেনি। সে চোখ নামিয়ে ফেলে। কারণ আর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলে হয়তো নিজের ভাঙন লুকিয়ে রাখতে পারবে না। তার বুকের গভীর থেকে ধীরে ধীরে শব্দগুলো বেরিয়ে আসে,

—”দেখো সানাম…আজও আমি তোমাকে দেখলে শ্বাস নিতে ভুলে যাই। আজও তোমাকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সব রং তোমার কাছ থেকে ধার নিয়েছে”
ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ফের ভাবে,
—”লোকে বলে, সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়…মিথ্যে, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন মিথ্যা টা বলতো তারা। তারা জানে না, কিছু মানুষ চলে যায় না, সানাম। তারা রক্তের ভেতর বাসা বাঁধে, শ্বাসের সঙ্গে মিশে যায়, আত্মা কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর ওই ক্ষত পৃথিবীর কিছুই ভুলাতে পারে না। তোমাকে ভুলতে গিয়ে আমি শুধু নিজেকেই হারিয়েছি”
তার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে আসে আরভির পিঠে। বাচ্চাটা চোখ কুচকে অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। কিন্তু সারহাদ যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে যেখানে তার সানাম ছাড়া কেউ নেই,
—”ইউ নো সানাম, আমি খুব করে একটা জিনিস বুঝলাম, কিছু প্রেম পাওয়ার জন্য জন্মায় না, কিছু প্রেম শুধু বয়ে বেড়ানোর জন্য জন্মায়। আমার ভাগ্যে হয়তো তোমাকে পাওয়া লেখা ছিল না…কিন্তু তোমাকে ভালোবাসা ঠিকই লেখা ছিল”

এক ফোঁটা অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ে তার কার্নিশ বেয়ে, সেটা কেউ দেখল না, কেউ খেয়াল করল না। সে তড়িঘড়ি করে আবারও নিজের চোখ কালো সানগ্লাসের আড়ালে ঢেকে ফেললো। চারদিকটা তখনও হাসি, আনন্দ, উল্লাস মেতে আছে। আর সেই উৎসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি মানুষ নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতরটা যেন দাউদাউ আগুনে জ্বলছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস টেনে নিতে কষ্ট দিচ্ছে। প্রতিটি হৃদস্পন্দন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে কিছু গল্প কখনো পূর্ণতা পায় না। কিন্তু কেউ শুনল না তার সেই বুকফাটা আর্তনাদ সবশেষে সে মাথা নিচু করে খুব আস্তে ফিসফিস করে,

—”তুমি আবারও জন্ম নিও, সানাম…আমি আবারও তোমার প্রেমে পড়ব”
এদিকে সানা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। তার রক্তিম লেহেঙ্গার ভারী ঘের মেঝের উপর নরম ঢেউ তুলছে। রমণী মঞ্চের কাছাকাছি আসতেই আরজে নিজেই কয়েক ধাপ নেমে আসে। তারপর কোনো কথা না বলে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। সানার ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি একটুকরো হাসি ফুটে ওঠে। সে বিনা দ্বিধায় সেই হাত ধরে। তারপর উপরে ওঠার জন্য প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই হঠাৎ থমকে যায়। তার জুতোর ফিতাটা আবারও খুলে গেছে। অনেকক্ষণ ধরেই এটা তাকে বিরক্ত করছিল। গর্ভবতী হওয়ার কারণে আজ সে কোনো হাই হিল পরেনি। বরং আরামদায়ক লেস আপ জুতোই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এটা যে এমন হবে তার কল্পনায় ছিল না। সানা সামান্য ঝুঁকে নিজেই ঠিক করতে যাবে, কিন্তু তার আগেই এমন কিছু ঘটে, যা দেখে পুরো প্রাঙ্গণ স্তব্ধ হয়ে যায়। আরজে হঠাৎ তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার সামনে। মুহূর্তেই চারপাশের গুঞ্জন থেমে যায়। সানা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলে,

—”রানভীর… আপনি কী করছেন?”
সে কয়েক কদম পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে আরজের বড়, উষ্ণ পুরুষালী হাতদুটো আলতো করে তার পায়ের কাছে পৌঁছে গেছে, অত্যন্ত যত্নে সহকারে, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ এটাই। সে নিচু হয়ে সানার খুলে যাওয়া ফিতাটা ঠিক করে বাঁধতে শুরু করে। চারপাশে তখন শত শত মানুষ, বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, মিডিয়া, অতিথি, অসংখ্য ক্যামেরা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আরজের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যে মানুষটাকে দেখে পৃথিবীর মানুষ বিস্মিত হয়, যার নাম শুনে ক্ষমতাবান মানুষও হিসাব কষে কথা বলে, সেই মানুষটা আজ ঝুঁকে নিজের স্ত্রীর জুতোর ফিতা বাঁধছে। এমন যত্ন নিয়ে, যেন কোনো অমূল্য ধন রক্ষা করছে। ফ্ল্যাশের ঝলকানি আরও বেড়ে যায়।

সানার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। তার চোখ টলমল করে ওঠে। অদ্ভুত এক উষ্ণতা এসে জমা হয় হৃদয়ের গভীরে। এত মানুষের সামনে, এত সম্মান, এত ক্ষমতার মাঝেও একজন মানুষ তাকে এতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে, এতখানি যত্ন করছে। আরজে ফিতাটা সুন্দর করে বেঁধে দেয়। তারপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার দেখে। নাহ, সব ঠিক আছে। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে আবার নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয়। সানা কিছুক্ষণ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে তখন জল চিকচিক করছে। মনে মনে অদ্ভুত কিছু ভাবনা ভেসে ওঠে। হয়তো সে ভুল মানুষকে ভালোবাসেনি, হয়তো মানুষটাকে বুঝতে ভুল করেছে, হয়তো এই উদ্ধত, অসভ্য, জেদি মানুষটার ভালোবাসার ভাষাটা সে সবসময় পড়তে পারেনি। হয়তো তার রূঢ়তার আড়ালেও একটা বিশাল কোমল পৃথিবী আছে, একটা নিরাপদ আশ্রয় আছে, একটা ভালোবাসা পূর্ণ ঘর আছে। রমণীর ঠোঁটের কোণে আবেগমাখা হাসি ফুটে ওঠে। এইবার সে নিজ থেকেই আরজের হাতটা শক্ত করে ধরে একসাথে মঞ্চে উঠে যায়।
মঞ্চে পৌঁছে আরজে অত্যন্ত যত্নে সানাকে তার নির্ধারিত আসনে বসিয়ে লেহেঙ্গার ভারী ঘের ঠিক করে দেয়, ওড়না গুছিয়ে দেয়। তারপর নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করে,

—”এভরিথিং ওকে?”
সানা মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয় ল,
—”ওকে”
আরজে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
—”বাট আ’ম নট ওকে, ওয়াইফি।”
সানা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে বিচলিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”কেন? কী হয়েছে আপনার?”
আরজে গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঘোর লাগা কণ্ঠে শুধালো,
—”তোমাকে দেখার পর থেকে আমার সব হিসাব নিকাশ গুলিয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন শুধু বাসর বাসর ফিলিংস আসছে”
তার বাক্যটা শ্রবণ হতেই এতক্ষণ ধরে রমণী যে আবেগে ভেসেছিল তা এক৷ লহমায় উধাও হয়ে গেল। সেই জায়গায় ভিড় করল তীব্র রাগ। মানে, এইরকম একটা শুভ মুহুর্তে এই লোক এসব কি করে বলতে পারে’। আরজে তার দৃষ্টি বুঝে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফের আওড়ায়,

—”এই লাল রঙটা পরে আমার দিকে এভাবে তাকানো বন্ধ করো। নাহলে বিয়ের পরের কাজ এখনই হয়ে যাবে”
সানা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে এই লোককে কি বলবে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না। আরজে সামান্য ফুঁ দিয়ে সানার মুখের উপর পড়ে থাকা কয়েক টা বেবি হেয়ার সরিয়ে দিয়ে পুরুষালী হাস্কিস্বরে শুধালো,
—”চলো ওয়াইফি, বিয়ে আবার অন্য কোন সময় করব আগে বাসর সেড়ে ফেলি। শুভ কাজে দেরি করতে নেই”
সানা লজ্জায় চোখ বড় বড় করে ফেলে। তারপর মৃদু ধাক্কা মেরে বলে,
—”অসভ্য লোক”
—”এই উপাধিটা তোমার মুখ থেকে শুনতেই সবচেয়ে ভালো লাগে”
সানা আবারও ধাক্কা দিয়ে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”কানের নিচে বাজানোর আগে সরুন”
—”তোমার হুমকি শুনে আরো কাছে আসতে ইচ্ছা করে”

এবার রমণীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে মুখ খুলে আর কিছু বলার আগেই আরজে হেসে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। ঠিক তখনই আবারও পুরো ভেন্যু উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। প্রবেশপথে একসাথে শত শত ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠে। কেননা কারণ এবার প্রবেশ করছে বাকি তিন কনে সানিতা, ঈশানী এবং ইবেলিনা। তিনজন যেন তিনটি ভিন্ন সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। সানিতার পরনে গাঢ় লাল আর সোনালির মিশেলে তৈরি ঐশ্বর্যময় লেহেঙ্গা। মুখভর্তি লাজুক হাসি তাকে আরও অপূর্ব করে তুলেছে। ঈশানীর পরনে গাঢ় মেরুন রঙের কারুকাজখচিত পোশাক। আর ইবেলিনা, আজ সে পরেছে রাজস্থানি ধাঁচের ভারী লেহেঙ্গা। গাঢ় লাল, কমলা ও সোনালি রঙের অপূর্ব সমন্বয়। মাথার অলংকার থেকে শুরু করে গলার হার পর্যন্ত প্রতিটি অংশে রাজকীয়তার ছাপ।

কিন্তু দুর্ভাগ্য মিডিয়ার, কারণ তারা ঠিকমতো তার ছবি তুলতেই পারেনি। মাত্র এক-দুইটা ফ্ল্যাশ পড়েছে কি পড়েনি। তার আগেই জ্যাক নিজের আসন ছেড়ে নেমে আসে। একটানে ইবেলিনাকে নিজের পাশে টেনে নিয়ে এমনভাবে নিজের আড়ালে রাখে যেন পৃথিবীর কেউ তাকে দেখতে না পায়। মিডিয়াকর্মীরা হতাশ হয়ে যায়। জ্যাকের মুখভঙ্গি দেখে আর কেউ দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার সাহসও পায় না।। এরপর এসপি এগিয়ে এসে সানিতার হাত ধরে। রিজভী এগিয়ে যায় ঈশানীর দিকে। অপরদিকে জ্যাক ইবেলিনাকে নিয়ে নিজের স্থানে বসে পড়ে। চারদিকে আবারও উচ্ছ্বাস ধ্বনিত হয়। আর কিছুক্ষণ পর চার জোড়া যুগল পাশাপাশি বসে পড়ে বিয়ের পিঁড়িতে।
চারটি পৃথক আসরে তখন একসঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে পবিত্র নিকাহ্‌র আনুষ্ঠানিকতা। চারজন কাজী চারটি আসরে অবস্থান নিয়েছেন। চারদিকে অতিথিদের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। সবাই অপেক্ষা করে সেই পবিত্র মুহূর্তটির জন্য। এক এক করে কাজীরা শর্তাবলি পাঠ করেন, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন এবং কনের সম্মতি গ্রহণ করেন। পাতলা পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসে স্থির, লজ্জাভরা অথচ দৃঢ় মেয়েলি কণ্ঠস্বর,

—”কবুল”
আবার তাদের প্রশ্ন করা হয়,
—”কবুল”
একইভাবে চারটি আসরেই উচ্চারিত হয় পর পর তিনবার সেই পবিত্র শব্দ, ‘কবুল’। আর যখন বরদের কণ্ঠেও একই স্বীকৃতি ধ্বনিত হয়, ঠিক তখনই যেন পুরো প্রাঙ্গণ একসঙ্গে প্রাণ ফিরে পায়। সবার কন্ঠ থেকে একসাথে উচ্চারিত হয়,
—”আলহামদুলিল্লাহ”
চারদিক থেকে উল্লাসধ্বনি উঠে আসে। অসংখ্য মানুষের কণ্ঠ একাকার হয়ে যায়। করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল প্রাঙ্গণ। কিন্তু এই অসংখ্য হাসিমুখের মাঝেও একজন মানুষ নীরবে কাঁদছেন, তিনি আর কেউ না ‘সোফিয়া জাওয়ান’। কালো মাস্কের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকলেও বাদামী চোখ দুটোকে লুকানো যায় না। সেই চোখ থেকে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন নিজের ছেলের দিকে। আজ কত বছর পর তিনি নিজের ভেতরে এমন এক অনুভূতির স্পর্শ পেয়েছেন, যার নাম তিনি বহু আগে ভুলে গিয়েছিলেন। সেই অনুভূতির নাম কি?

হয়তো সুখ, শান্তি, পরিতৃপ্তি। জীবনের এতগুলো বছর ধরে তিনি ভেবেছিলেন মানুষ কেবল স্বার্থ বোঝে, ক্ষমতা বোঝে, প্রতিশোধ বোঝে। ভালোবাসা বলে কিছু নেই সবই মিথ্যা, সবই অভিনয় ইকবাল জাওয়ানের মতো। কিন্তু আজ, আজ তিনি নিজের চোখে দেখছেন। একজন পুরুষ কীভাবে তার স্ত্রীর দিকে তাকায়। একজন স্ত্রী কীভাবে নিঃশব্দে তার স্বামীর হাত খুঁজে নেয়। একটি পরিবার কীভাবে ভাঙাচোরা অতীতের ওপর দাঁড়িয়েও নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ব্যথা করে ওঠে। মনে হয়, তিনি হয়তো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকেই কখনো চিনতে পারেননি। তার দৃষ্টি বারবার চলে যায় আরজের দিকে। আজ ছেলেটাকে সত্যিই রাজপুত্রের মতো লাগছে। তবে বাহ্যিক সাজসজ্জার জন্য নয়। আজ তার চোখে এমন এক আলো আছে, যা কোনো মুকুট দিয়েও কেনা যায় না। এটা সুখী মানুষের আলো।
হঠাৎ আরজের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়। দূর থেকে তিনি মাথা সামান্য নাড়েন। চোখের ভাষায় জানান, তিনি ঠিক আছেন। আরজের চোখে ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর সানাও তার দিকে তাকায়, সোফিয়া তাকেও আশ্বস্ত করে। তারপর আবার তিনি নিজের ছেলের দিকে তাকান।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে ফেলেন।
মনে মনে বলতে থাকেন,

—”সুখে থেকো, রনো।
জীবন তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। এবার তোমার প্রাপ্যটুকু তোমাকে ফিরিয়ে দিক। যে ভালোবাসার জন্য তুমি এত লড়েছ, সেটাকে আঁকড়ে রেখো সারাজীবন। তোমার বাবার মতো ছেড়ে দিও না”
এটুকু বলেই তিনি থামেন। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা নিষ্প্রাণ হাসি ফুটে ওঠে। নিজের কান্না আটকে রাখা গলায় ফের ফিসফিস করে,
—”আমি তোমাকে কখনো স্বাভাবিক একটা জীবন দিতে পারিনি, তোমার শৈশবের প্রতিটা হাসির বিনিময়ে আমি তোমাকে ভয় দিয়েছি, প্রতিটা স্বপ্নের বিনিময়ে দিয়েছি রক্ত, তুমি যখন মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে চেয়েছিলে তখন আমি তোমাকে অস্ত্রের শব্দ শুনিয়েছি, তুমি যখন আলো চেয়েছিলে আমি তোমাকে অন্ধকারের মধ্যে বাঁচতে শিখিয়েছি, তোমার মাথায় হাত রেখে বলতে পারিনি’সব ঠিক হয়ে যাবে’,, তোমার কান্নার সময় তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারিনি, কিন্তু ভাগ্য তোমাকে তোমার প্রাপ্য টা বুঝিয়ে দিয়েছে”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের কোণের জলটুকু হাতের উল্টো পিঠে মুছে সানার দিকে তাকিয়ে আওড়ান,
—”ওই মেয়েটা তোমাকে বদলে দিয়েছে, তাই না? তোমার চোখের ভাষা বদলে দিয়েছে। তোমার অন্ধকার জীবনের মধ্যেও একটুকরো আলো এনে দিয়েছে। তুমি জানো রনো, মা হওয়ার সবচেয়ে বড় সুখ কী? নিজের সন্তানকে হাসতে দেখা। আর আজ… আজ বহু বছর পর আমি সেই সুখটা অনুভব করছি ওই মেয়েটার জন্য”
সে চোখ বন্ধ করে ফেলে এক মুহূর্তের জন্য,

—”শুধু একটা আফসোস রয়ে গেল, রনো। আমি হয়তো কখনো ভালো মা হতে পারিনি আর হতেও পারব না”
সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় হাসি প্রসারিত হলো। চারপাশে তখন উৎসবের উচ্ছ্বাস, আলো, মানুষের কোলাহল আর শুভকামনার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেও তার চোখে যেন অন্য এক জগতের প্রতিফলন। এমন এক জগত, যেখানে আনন্দের কোনো স্থান নেই শুধু স্মৃতি, অপরাধ, ক্ষমতা আর অসমাপ্ত হিসাবের ভার। সে ধীরে ধীরে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে আনল। ওভারকোটের ভাঁজের নিচে লুকিয়ে থাকা ধাতব কালো বন্দুকটার দিকে এক পলক তাকাল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর সে মুখ তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাইলিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে শুধালো,

—”আমি ভিতরে যেতে চাই। এখানে আর ভালো লাগছে না”
কাইলিন সঙ্গে সঙ্গে উদ্বিগ্ন চোখে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—”লেডি, আপনার কি হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন তো?”
সোফিয়া মৃদু মাথা নাড়িয়ে প্রতুত্তর করে,
—”আমি ঠিক আছি, শুধু একটু ভিতরে যেতে চাই। এই ভিড়, এই শব্দ… আজ আর সহ্য হচ্ছে না”
কাইলিন আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে কানে থাকা ইয়ারপিসে যোগাযোগ করে,
—”বস, লেডি ভিতরে যেতে চান”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর আরজের অনুমতি ভেসে এলো। অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই কাইলিন চারজন সশস্ত্র গার্ডকে ইশারা করে। তারা দ্রুত সোফিয়ার চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে তাকে নিয়ে মূল অনুষ্ঠানস্থল থেকে ভিতরের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। কিন্তু সেই মুহূর্তে সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই অদ্ভুত হাসিটা ফুটে উঠে। এমন এক হাসি, যা কেউ খেয়াল করলে হয়তো অস্বস্তি বোধ করত। মনে মনে সে ভাবল, তার ছেলে এখনো জানে না… এই কয়েকটা গার্ডের চোখ ফাঁকি দেওয়া তার জন্য কতটা সহজ। তার দীর্ঘ জীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষকে ব্যবহার করে, আর মানুষকে ভুল পথে চালিত করে। এই চারজন গার্ড?
তারা তার কাছে নতুন কিছু নয়। সোফিয়া শেষবারের মতো পিছনে তাকায় আরজের হাসিখুশি আদলের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। কান্নায় রোধ হয়ে আসা গলায় আওড়ায়,

—”সুখে থেকো, আমার রাজপুত্র… এত সুখে থেকো, যেন পৃথিবীর কোনো কষ্ট আর কখনো তোমার দরজায় কড়া নাড়তে না পারে। আর যদি কোনোদিন আমার কথা মনে পড়ে… তাহলে কান্না কোরো না। শুধু একবার হেসে বলো ‘আমার মা অবশেষে শান্তি পেয়েছে’। আমি জানি না সামনে কতটা পথ বাকি আছে। কিন্তু আমার আর কোনো ভয় নেই। কারণ আজ আমি নিজের চোখে দেখে নিয়েছি, তুমি আমার মতো একা নও। তোমার পাশে তোমার ভালোবাসার মানুষটা আছে”
সে চোখ ফিরিয়ে নিল। বেশিক্ষণ তাকালে আবার দুর্বল হয়ে পড়বে। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সে গার্ডদের এমনভাবে দিক পরিবর্তন করাতে লাগল, যেন বিষয়টা একেবারেই স্বাভাবিক। এরপর সুযোগ বুঝে সে মানুষের বিশাল ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল। চারপাশে শত শত মানুষের কোলাহল। আর সেই কোলাহলের মধ্যেই মুহূর্তের মধ্যে সোফিয়া যেন মিলিয়ে গেল। এক সেকেন্ড আগেও যাকে ঘিরে চারজন গার্ড হাঁটছিল, পরের সেকেন্ডেই সে নেই। গার্ডরা প্রথমে বিষয়টা বুঝতেই পারেনি। তারপর হঠাৎ খেয়াল হতেই চারদিকে তাকাতে শুরু করে,

—”লেডি?”
—”লেডি কোথায়?”
—”ওইদিকে দেখো, ফাস্ট”
তারা হন্তদন্ত হয়ে খুঁজতে শুরু করে চারদিকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সোফিয়া ইতোমধ্যে মানুষের ভিড় ঠেলে আরও দূরে চলে গেছে। সাধারণ অতিথিদের মাঝখানে মিশে গিয়ে সে নিজের উপস্থিতিকেই যেন অদৃশ্য করে ফেলেছে। ধীরে ধীরে সে বিশাল জনসমুদ্র পেরিয়ে ব্ল্যাক ম্যানশনের প্রসারিত প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। আজকের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এত মানুষের আনাগোনা ছিল যে নিরাপত্তারক্ষীদের অধিকাংশ মনোযোগ ছিল বাইরের সম্ভাব্য হুমকির দিকে। আর সোফিয়াকে এখানে আনা হয়েছিল অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। খুব অল্প কয়েকজন জানত তার উপস্থিতির কথা। ফলে যারা গেটে অবস্থান করছিল, তারা ভেবেছিল হয়তো তিনি কোনো সাধারণ অতিথি কিংবা অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ। যার কারণে কেউ তাকে আটকাল না, কেউ প্রশ্ন করল না। কেউ দ্বিতীয়বার তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করল না। সে ফটক পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। ধরণীতে তখন রাত নেমে এসেছে। দূরের আলো ছাড়া চারদিক ক্রমশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। সোফিয়া কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বন্দুকটা বের করল। সে একবার আকাশের দিকে তাকায়, তার চোখে তখন এমন এক অনুভূতি, যার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। কি ছিল সেখানে?

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৪

অনুশোচনা, ভালোবাসা, অভিমান, নাকি বহু বছরের ক্লান্তি? হয়তো সবকিছুর মিশ্রণ। ধীরে ধীরে সে অন্ধকার রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করে। তার ছায়াটা ক্রমশ রাতের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। আর মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
—”ইকবাল…আমি আসছি”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৬