হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৮
সাবা খান
মাঝে গড়িয়ে যায় দুই সপ্তাহ, শুনতে সময়টা খুবই ক্ষুদ্র, ক্যালেন্ডারের পাতায় মাত্র কয়েকটি তারিখের ব্যবধান। অথচ শোকের কাছে এই দুই সপ্তাহ কখনো দুই শতাব্দীর মতো দীর্ঘ। সময় কি অদ্ভুত তাই না?
সে কারও জন্য থামে না। কারও কান্নার কাছে মাথা নত করে না, কারও মৃত্যুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে না। সে শুধু বয়ে যায়। প্রবাহমান নদীর মতো বয়ে যায় একটানা, নির্দয়, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।
কোনো একদিন যে আঙিনায় হাসির রোল উঠেছিল, পরদিন সেখানেই শোকের নীরবতা নেমে আসে। আবার সেই নীরবতার বুক চিরেও একদিন নতুন করে হাসিও ফিরে আসে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যি সম্ভবত এটাই, ‘মানুষ থেমে যেতে চাইলেও সময় থামে না’ সোফিয়ার মৃত্যুর পরের প্রথম কয়েকটা দিন যেন ব্ল্যাক ম্যানশনের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি দরজা শোকের কালো কাপড়ে ঢেকে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের চাকার ঘূর্ণায়মানের ফলে ধীরে ধীরে শোকের উপর ধুলো পড়তে শুরু করেছে। না, কেউ সোফিয়াকে ভুলে যায়নি। কিন্তু জীবন তার নিজের নিয়মে সবাইকে আবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনে। কিন্তু…সবাই স্বাভাবিকতায় ফিরলেও কিছু মানুষ যেন এখনও সেখানে আটকে আছে, সেই বিদায়ের মুহূর্তটায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটকে আছে ছোট্ট আরভি।
সে রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের খেলনার বাক্সটা হাতে নিয়ে সোজা চলে যায় সোফিয়ার কক্ষে। আরভি বিছানার উপর নিজের খেলনাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে দেয়ালে টানানো বিশাল ছবিটার দিকে তাকায়। ছবিতে সোফিয়া আগের মতোই হাসছে, সেই দাম্ভিকতা পূর্ণ হাসি যেন এখনও সবকিছু ঠিক আছে। আরভি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
—”গ্র্যান্ডমা…মম বলে তুমি নাকি অনেক দূরে চলে গেছো। সত্যি এত দূরে চলে গেছো আমাকে না বলে?”
ছোট্ট ছেলেটার অভিমানী কণ্ঠে অভিযোগের সুরে আওড়ায়,
—”কিন্তু তুমি তো আমাকে প্রমিস করেছিলে, তুমি বলেছিলে আরভিকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। তাহলে গেলে কেন?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অপেক্ষা করে যেন ছবির মানুষটা উত্তর দেবে। কিন্তু বিপরীতে কোন প্রতুত্ত্যর এলো না বরং আশাহত হয়ে ফের আওড়ায়,
—”ইউ নো গ্র্যান্ডমা, ড্যাডের আনা নতুন গেমটা আমি কারো সাথে শেয়ার করিনি এমন কি কিয়ানের সাথেও না। তুমি ফিরে এলে আমরা একসাথে খেলব ওটা, ঠিক আছে?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার ছোট্ট মুখটা নুয়ে আসে। তারপর হঠাৎ তার মাথায় কিছু একটা খেলে যায়। সে সোজা হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুধালো,
—”ডোন্ট ওয়ারি, গ্র্যান্ডমা। আমি যখন বড় হবো তখন তোমাকে দূর থেকেই খুঁজে নিয়ে আসব, প্রমিস। আমি কিন্তু তোমার মতো প্রমিস ভাঙব না, দেখে নিও”
এদিকে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সানার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। প্রতিদিনের মতো আজও আজও সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল বিনাশব্দে। কেননা রমণী জানে, এই ছোট্ট শিশুটাকে বোঝানোর মতো ভাষা পৃথিবীতে নেই। কীভাবে বোঝাবে?
কীভাবে বলবে, যাকে সে খুঁজে আনতে চায়, তিনি এমন এক যাত্রায় পা বাড়িয়েছেন যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। সেই দূরত্ব সময়ের নয়, পথের নয় বরং অস্তিত্বের। সানা চোখ বন্ধ করে অশ্রুগুলোকে জোর করে আটকে রেখে নিজের কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
আরজে গতকাল থেকেই ম্যানশনে নেই। সেই দিন কবরের পাশে বসে সে বলেছিল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা সানাকে জানাবে। সেই সত্যি, যা এতদিন শুধু সোফিয়া আর রিজভী জানত। কিন্তু এখনও বলেনি। শুধু বলেছে, বিজনেস ট্রিপ থেকে ফিরে এসে সব বলবে। সেই কথাটাই এখন সানার বুকের মধ্যে কাঁটার মতো আটকে আছে। অজানা সত্যি কখনও কখনও জানা দুঃখের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়। রমণী জানতে চায়, খুব করে জানতে চায়। কী এমন সত্যি লুকিয়ে রেখেছে আরজে?
কেন এতদিন বলেনি?
কেন এখনও বলছে না?
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। কক্ষের ভেতরে ঢুকে সে ধীরে ধীরে বুকশেলফের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্ত স্থির থেকে তারপর হাত বাড়িয়ে একটা কাঠের বক্স বের করে যার মধ্যে রয়েছে সোফিয়ার লেখা শেষ চিঠি বা শেষ কথাগুলোর ভার। সানা ধীরে ধীরে ভাঁজ খুলতেই প্রথমেই তার চোখে পড়ে,
❝যদি তোমরা এই চিঠিটা পড়ে থাকো, তাহলে বুঝে নিও আমি অবশেষে তোমাদের মাঝে আর নেই। সবার আগে আমি ক্ষমা চাইছি। এমন একটা ক্ষমা, যার কোনো মূল্য নেই। কারণ কিছু অপরাধ ক্ষমা চাইলেই মুছে যায় না।
রনো, মেরা ব্যাটা,
তোমার কাছে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধী। একজন মা হয়েও আমি কখনো তোমাকে মায়ের মতো ভালোবাসতে পারিনি। তোমার শৈশবের কান্না শুনেছি, কিন্তু জড়িয়ে ধরিনি। তোমার জ্বরের রাত দেখেছি, কিন্তু কপালে হাত রাখিনি। তুমি যখন আমার দিকে তাকিয়ে একটা ভালোবাসার শব্দ খুঁজেছিলে, আমি তখন তোমাকে শিখিয়েছি কীভাবে অনুভূতি লুকাতে হয়।
জানো, তোমার ড্যাডের আঘাত গুলো লরেন্সের থেকে শতগুণ বেশি ভয়ংকর ছিল। কিন্তু তবুও আমি সেই আঘাত গুলোর মায়ায় আটকে নিজেকেই ধ্বংস করতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি সেই একই ভালোবাসা নামক বিষে ধ্বংস না হও, সেজন্য আমি তোমাকে সেই অভিশাপ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। অথচ বাঁচাতে গিয়ে তোমাকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছি❞
চিঠির পরের অংশে কালি কিছুটা ছড়িয়ে গিয়েছে, হয়তো অশ্রুতে অথবা হয়তো দগ্ধ অনুশোচনায়,
❝আরভি…কখন, কীভাবে, কোন মুহূর্তে ছেলেটা আমার কলিজার আরেক টুকরো হয়ে গেল, আমি নিজেও জানি না। ওকে বলো দিও, আমি প্রতিশ্রুতি ভাঙতে চাইনি। শুধু আমার ভিতরের গ্লানিবোধটুকু আর টেনে নিয়ে যেতে পারিনি। যদি কোনোদিন ও আমাকে খুঁজে, তাহলে বলো, আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম। পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারের থেকেও বেশি।
সানা…আমি জানি, তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আমি তোমাকে ছোট করেছি, অপমান করেছি, তোমার অস্তিত্ব মুছে দিতে চেয়েছি। কেননা আমি ভয় পেতাম। সত্যিই হাস্যকর তাই না? সোফিয়া জাওয়ানও কী ভয় পায়?
হ্যাঁ, পায় তো। আমি ভয় পেতাম তুমি প্রমাণ করে দেবে যে আমি সারাজীবন ভুল ছিলাম। আর তুমি সেটাই করেছ। আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানেই ধ্বংস। আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানেই এমন একজন মানুষের পেছনে ছুটে চলা, যে কখনো ফিরে তাকাবে না। নিজের অস্তিত্ব পুড়িয়ে অন্য কারও জন্য ছাই হয়ে যাওয়াই ভালোবাসা। কারণ আমার মায়ের সাথেও সেটাই হয়েছিল আর আমার সাথেও। তাই আমি রনোকে সেই অভিশাপ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু তুমি আমাকে ভুল প্রমাণ করেছ, সানা। তুমি ঝুঝিয়েছো, আমি যে ভালোবাসার সংজ্ঞা জানতাম, সেটা ভালোবাসা নয়, সেটা ছিল উন্মাদনা, একটা অসুস্থ আসক্তি, নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। সেখানে ভালোবাসার একরত্তি অস্তিত্বও ছিল না। আর আমি সেই মরীচিকার পিছনে এতদূর ছুটেছি যে আর ফিরে আসার পথ খুঁজে পাইনি। মৃত্যুই হয়তো একমাত্র জিনিস, যা আমাকে সেই গোলকধাঁধা থেকে বের করতে পারবে। যদি সম্ভব হয়, আমাকে ক্ষমা করে দিও। না পারলেও দোষ দিও না, শুধু রনোকে আগলে রেখো। ও বাইরে থেকে পাহাড়ের মতো শক্ত কিন্তু ভিতরে ভিতরে এখনো সেই ছোট্ট ছেলেটাই আছে, যে একদিন মায়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল কিন্তু ওর মা ফিরে তাকায়নি। আরভিকে বড় করে তুলো এমনভাবে, যেন ও কখনো আমার মতো অন্ধকারকে ভালোবাসা ভেবে ভুল না করে।
‘তোমরা সুখে থেকো’ হয়তো এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে অসম্ভব অথচ সবচেয়ে আন্তরিক দোয়া।
— সোফিয়া জাওয়ান…..❞
চিঠির শেষ শব্দটুকু পড়তেই সানার চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল কাগজের উপর। ঠিক তখনই দরজায় ধীর, মৃদু টোকা পড়ে। সানা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে মাথা তুলতেই দেখতে পেল দরজার কাছে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। সে নিচু স্বরে বলল,
—”ম্যাম,বস আপনার জন্য গাড়ি পাঠিয়েছেন”
—”কোথায়?”
জ্যাক উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে দরজার দিকে ইশারা করল। অকারণে একটা অস্বস্তি ধীরে ধীরে সানার বক্ষ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিনিট পর পরপর পাঁচটি কালো গাড়ি ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল লোহার গেট অতিক্রম করে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। পুরো পথজুড়ে সানা অস্থির হয়ে বসে রইল। মনের ভিতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কী সেই সত্য?
কেন আরজে তাকে এতদিন বলেনি?
হঠাৎ একটি ঝাঁকুনিতে গাড়ি থেমে গেল। রমণীর বিভ্রম ছুটে যায় সামনের সিটে বসে থাকা জ্যাকের কণ্ঠস্বরে,
—”ম্যাম… উই আর দেয়ার”
সে নেমে দরজা খুলে দিল। সানা বের হয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত অবয়ব তার নজরে এলো, আরজে। অন্তত তার তাই মনে হলো। মুহূর্তের মধ্যে বুকের সমস্ত দুশ্চিন্তা যেন মিলিয়ে গেল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল,
—”রানভীর….”
ডাকতে ডাকতেই সে ছুটে গেল তার দিকে। কিন্তু ঠিক তখনই সামনের মানব দুই কদম পিছিয়ে গেল। সানা থমকে দাঁড়ায় বিস্মিত, হতবুদ্ধি হয়ে। সে আবার এগোতে যাবে, ঠিক তখনই অপরিচিত অথচ ভয়ংকরভাবে পরিচিত চেহারার মানুষটি নিচু স্বরে বলল,
—”প্লিজ, ম্যাম…আপনি ভুল করছেন। আমি আরজে স্যার নই”
বাক্যটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সানার মনে হচ্ছিল, তার চারপাশের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে কোনো অদৃশ্য হাত এসে উল্টে দিচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও সে নিশ্চিত ছিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আরজে, তার স্বামী, তার রানভীর। কিন্তু এখন?
এখন সেই একই মুখ, একই চোখ, একই উচ্চতা, একই ভঙ্গিমার মানুষটি বারবার মাথা নিচু করে বলছে,
—”ম্যাম, আমি আরজে স্যার নই”
সানা বিস্মিত চোখে আবারও লোকটার দিকে তাকাল। কপালের ডান পাশে ছোট্ট তিলটা পর্যন্ত একই জায়গায়, হাঁটার ভঙ্গি একই, কাঁধের গঠন একই। এমনকি চোখ নামানোর ধরনটাও। এতটাই একই যে পৃথিবীর কোনো মানুষ তাকে আলাদা করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবুও….তবুও সে বলছে, সে আরজে নয়। বিরক্তি, বিভ্রান্তি আর অস্থিরতা মিশিয়ে রমণী ফের বলে,
—”রানভীর… আপনি এসব কী বলছেন?”
সে হাত বাড়িয়ে সামনের মানবের বাহুতে আঘাত করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই লোকটা যেন ভয় পেয়ে আরও এক কদম পিছিয়ে গেল। তারপর দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
—”ম্যাম, প্লিজ। আপনি আমাকে স্পর্শ করবেন না। স্যার যদি জানতে পারেন, আমি নিশ্চিত উনি আমার সেই জায়গাটাই কেটে ফেলবেন। আমি সত্যিই আরজে স্যার নই। শুরুতে দেখেছেন বলে একটু বিভ্রান্তি হচ্ছে। আমার সাথে ভিতরে আসুন। সবটা নিজেই বুঝতে পারবেন”
একনাগাড়ে কথাগুলো উগড়ে দিয়ে সে সামনে তাকাতেই দেখে সানা একদম স্থির হয়ে আছে। রমণীর মুখের রঙ সরে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তার মাথার ভেতর যেন শব্দগুলো বারবার ধাক্কা খেতে লাগল। এই মানুষটা কে?
কেন তার মুখটা আরজের মতো?
আর সবচেয়ে বড় কথা…আরজে কোথায়?
অসংখ্য প্রশ্ন মাথার ভেতর ঝড় তুললেও সেগুলোর একটাও উত্তর খুঁজে পেল না সে। লোকটা এবার আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে সামনে হাঁটতে শুরু করল। সানাও ধীরে ধীরে তার পিছু নিল। তবে এবার ইচ্ছা করেই সে লোকটার খুব কাছে গিয়ে হাঁটল। তার নাক খুঁজে ফিরল সেই চেনা গন্ধটা, কফি আর ভ্যানিলার মিশ্রিত মাদকতাময় সুবাস। যেই গন্ধটা আরজের শরীরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, যেই গন্ধ চোখ বন্ধ করলেও সানা চিনে ফেলতে পারে। কিন্তু…?
নাহ, কিছুই নেই, একটুও না। সেই গন্ধের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, অপরিচিত সুগন্ধ। সানা অজান্তেই থেমে গেল। তাহলে…তাহলে সত্যিই এ আরজে নয়। তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। সে ধীরে ধীরে লোকটার থেকে দুই কদম দূরে সরে এল। এবার যেন প্রথমবারের মতো তাকে একজন অপরিচিত মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করল। জ্যাক তখন পুরো কনভয় নিয়ে আবার অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেল।
আর সানা…সে এগিয়ে চলল এক অজানা রহস্যের দিকে। বিশাল লোহার গেট পেরোতেই নজরে আসে বহু শতাব্দী পুরোনো কোনো প্রাসাদ। কিন্তু ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সানার নাক সিটকে গেল। সম্পূর্ণ জায়গা টা কেমন স্যাঁতসেঁতে, গাঁ ঘিনঘিন। মনে মনে ভাবে, আরজে এখানে কী করবে? কোথাও…না না সে খারাপ কিছু ভাবতে চায় না। কিন্তু প্রাসাদের গভীরে যেতে যেতে তার ধারণাটা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। করিডোরগুলো অস্বাভাবিক রকমের জটিল, তার মনে হচ্ছে, পুরো ভবনটা একটা গোলকধাঁধা। এমন এক গোলকধাঁধা যেখানে একবার পথ হারালে হয়তো আর বের হওয়া সম্ভব নয়। সানা কয়েকবার পিছনে তাকাল। কিন্তু বুঝতেই পারল না কোন পথ দিয়ে এসেছে চারপাশ যেন একই রকম।
অবশেষে লোকটা একটা অদ্ভুত ধাতব দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দেয়ালটাকে সাধারণ দেয়ালই মনে হচ্ছিল। কিন্তু লোকটা হাত বাড়িয়ে অদৃশ্য কোনো সেন্সরে স্পর্শ করতেই ধাতব দেয়ালটা মাঝখান থেকে সরে যেতে শুরু করল। আর সানার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
কেননা ভিতরে যা ছিল…তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ভিতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো সে যেন হঠাৎ কয়েক দশক ভবিষ্যতে চলে এসেছে। পুরো জায়গাটা একটা অত্যাধুনিক গবেষণাগার। বাইরের সাথে ভিতরের কোন মিল নেই। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা সাদা নীল আলোর রেখা পুরো পরিবেশটাকে অদ্ভুত ঠাণ্ডা আবহ দিয়েছে। চারদিকে সারি সারি কাঁচের চেম্বার, কোথাও তরল ভর্তি স্বচ্ছ সিলিন্ডার, কোথাও বিশাল মনিটরে জটিল গ্রাফ আর তথ্য ভেসে উঠছে, শত শত তার সাপের মতো মেঝে বেয়ে ছড়িয়ে গেছে, দেয়ালজুড়ে অসংখ্য স্ক্রিনে চলমান ডেটা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে এটি কোনো গবেষণাগার নয় বরং মানব সভ্যতার অদেখা কোনো গোপন কেন্দ্র। কিন্তু সেই সমস্ত বিস্ময়ের মাঝেও তার চোখ একটাই মুখ খুঁজছে, তার রানভীর…সে কোথায়?
কেন তাকে এখানে আনা হয়েছে?
আর এই রহস্যময় জায়গার সঙ্গে তার স্বামীর সম্পর্কই বা কী?
প্রশ্নগুলো একটার পর একটা জন্ম নিচ্ছে ঠিকই কিন্তু উত্তর অজানা। রমণী নিজের বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠার আগেই পিছন থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠস্বর,
—”ওহ, সানা। তুমি এসে গেছ?”
সানা চমকে ঘুরে দাঁড়ায়, নজরে এলো রিজভীকে। যে সাদা ডাক্তারি কোট পরা, হাতে কালো গ্লাভস, ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। সানার দৃষ্টি কিছুটা সংকুচিত হয়ে আসে। রিজভী তাকে দেখে মৃদু হেসে বলল,
—”আমার কি তোমাকে ভাবি বলা উচিত?”
সানা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল,
—”না না, আপনি যেটা ইচ্ছে সেটাই বলুন। কিন্তু এগুলো কী? আর রানভীর কোথায়? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না”
যদিও রমণীর একনাগাড়ে করা প্রশ্ন গুলোর জবাব রিজভীর কাছে ছিল তবুও এখন সবটা বলা ভালো কিছু ঠেকলো না তার কাছে। তাই সে শান্ত গলায় বলল,
—”রিল্যাক্স, সানা। তুমি এখানে নতুন। তাই সবকিছু তোমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। চলো, আজ তোমাকে এমন কিছু দেখাই, যা দেখার পর, তুমি জানবে পৃথিবী কতটা ভয়ংকর”
কিন্তু সানা এবার আর থামল না। সে সরাসরি জেদ ধরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—”নাহ, আমি আগে জানতে চাই রানভীর কোথায়? আর ওই লোকটা কে? আপনারা সবাই কী লুকাচ্ছেন আমার কাছ থেকে?”
রিজভী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে হলো এই প্রশ্নের জন্য সে আগেই প্রস্তুত ছিল। সে ফের শান্ত স্বরে বলে,
—”হ্যাঁ, ওটা আরজে নয়। এটুকু আমি এখন বলতে পারি। বাকি সবকিছু জানবে। কিন্তু একটু সময় দাও”
সানা স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল কিয়ৎকাল। তারপর অবশেষে নীরবে মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল। রিজভী ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে শুরু করল আর সানা তার পিছু পিছু। তারা যত গভীরে প্রবেশ করছে, ততই গবেষণাগারের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হচ্ছেে সাথে এগুলো দেখে সানার মনে হচ্ছে, মানবদেহের প্রতিটি রহস্য এখানে বিচ্ছিন্ন করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সানা নির্বাক হয়ে চারপাশ দেখছে। রিজভী একের পর এক সেকশন দেখাতে দেখাতে শুনায়,
—”মানুষ নিজেকে সভ্য বলে। কিন্তু তার ভিতরে কত অন্ধকার লুকিয়ে আছে, জানো? অনেক সময় সেই অন্ধকারকে জাগিয়ে তোলার জন্য মাত্র একটি ভুল সিদ্ধান্তই যথেষ্ট”
তারা আরেকটি বিশাল কাঁচের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভিতরে অসংখ্য চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে সাথে একটা মৃত শরীর যেটা এত বিচ্ছিরি যে সানা একবার দেখেই চোখ উল্টে ফেললো। রিজভী সানার অবস্থা বুঝে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—”ম্যানবিস্ট ড্রাগের নাম শুনেছ?”
সানা দুহাতে নাক চোপে ধরে রেখেছে যদিও কিঞ্চিৎ পরিমাণও কোন গন্ধ নেই তারপরও ঐ ডেডবডি দেখে তার বমি আসছে। সে নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”হ্যাঁ। যতটুকু জানি, এটা মানুষের ভেতরের হিংস্রতা বাড়িয়ে দেয়”
রিজভীর ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটে উঠে,
—”না, সানা। ওটা শুধু গল্পের অর্ধেক”
সে সামনে থাকা স্ক্রিনের কিছু ছবি বের করে সানাকে দেখিয়ে বলে,
—”কিছু জিনিস মানুষের শরীরকে ধ্বংস করে, আর কিছু জিনিস ধ্বংস করে তার বিবেককে, আর কিছু জিনিস আত্মাকে। এই ধরনের পদার্থ মানুষের বিচারবোধ, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ সবকিছুকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিতে পারে। একসময় মানুষ নিজের প্রতিচ্ছবিকেও চিনতে পারে না। সে তখন শুধু নিঃশ্বাস নেওয়ার তাগিদে বেঁচে থাকে কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে অধম হিংস্র পশুগুলোর মতো। কিছুক্ষণ আগে যার বডি দেখেছিল, সে নিজেকে পৃথিবীর সামনে শক্তিশালী জাহির করার জন্য নিজেই এই ড্রাগস নিয়েছে তাও অত্যাধিক পরিমাণে। যা তার শরীর নিতে পারেনি”
রিজভী একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মলিন কণ্ঠে শুধালো,
—”তীব্র রক্তের নেশায় সে নিজেই নিজেকে ছিঁড়ে ফেলেছে। বা এমনটা বলা যেতে পারে, শেষ নিঃশ্বাসের আগ পর্যন্ত সে নিজেই নিজেকে কা*মড়ে খে*য়ে ফেলেছে। বুঝতে পারছো তো, ড্রাগসটা কতটা ভয়ংকর”
সানা শিউরে উঠল। মনে হচ্ছে নাড়িভুড়ি সব বেড়িয়ে আসবে এখনি। কেউ কীভাবে নিজেই নিজেকে খেতে পারে। রিজভী সামনে আরেকটা বিশাল স্ক্রিনে বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণার ফলাফল দেখিয়ে বলে,
—”এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানো?
‘দানবের অস্তিত্ব নয়, বরং মানুষ ধীরে ধীরে দানবে পরিণত হতে পারে’ এই সত্যটা। কখনো লোভে, কখনো ক্ষমতায়, কখনো প্রতিশোধে, আর কখনো নিজের তৈরি অন্ধকারেই”
সানা অনুভব করল তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল সে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যার অস্তিত্ব সে কখনো কল্পনাও করেনি। তার জানা মতে এই পৃথিবীতে আলো আছে, ভালোবাসা আছে। হাসি আছে। কিন্তু সেই আলোর নিচেই কোথাও এমন সব অন্ধকার লুকিয়ে আছে, যা মানুষের আত্মাকেও গ্রাস করে নিতে পারে। সানা কিছুটা ইতস্তত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
—”কি…কিন্তু মানুষ কীভাবে নিজেই নিজেকে..মানে…?
রিজভী বুঝল, সানাকে সরাসরি দেখাতে হবে। তাই সে রিপোর্ট না দেখিয়ে তাকে অন্য দিকে নিয়ে যায়। রিজভী সানাকে নিয়ে একটি বিশাল কাচের বক্সের সামনে দাঁড়ায়। বক্সটির ভেতরে একটি ধূসর রঙের বড় আকারের ইঁদুর এবং একটি পূর্ণবয়স্ক বিড়াল। ইঁদুরটি সাধারণ ইঁদুরের মতো নয়, তার শরীরের গঠনই আলাদা। স্বাভাবিক নিয়মে বিড়ালটিই শিকারি হওয়ার কথা। আর সত্যিই তাই ছিল। ইঁদুরটি এক কোণে সন্ত্রস্ত হয়ে কুঁকড়ে বসে ছিল। তার ক্ষুদ্র চোখে ভয় স্পষ্ট। যেন সে জানে, মৃত্যুর সময় খুব কাছে।
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। রিজভী পাশের ট্রে থেকে একটি সিরিঞ্জ তুলে নিল। সিরিঞ্জের ভেতরে গাঢ় কালচে নীল তরল। রিজভী সানাকে বলে,
—”এটাই ম্যানবিস্ট”
তারপর সে দক্ষ হাতে ইঁদুরটিকে ধরে সিরিঞ্জের তরল তার শরীরে প্রবেশ করিয়ে ইঁদুরটিকে আবার বক্সের ভেতরে ছেড়ে দেওয়া হলো। মিনিট দুয়েক যেতেই হঠাৎ পরিবর্তন শুরু হলো। ইঁদুরটির সমগ্র শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে লাগল। অতঃপর, পরের দৃশ্যটা এত দ্রুত ঘটল যে সানা নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না।
যে প্রাণীটি কয়েক সেকেন্ড আগেও ভয়ে কুঁকড়ে ছিল, সেটি হঠাৎ ক্ষিপ্ত ঝড়ের মতো বিড়ালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিড়াল এত দ্রুতগামী প্রাণী হয়েও প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগও পেল না। ইঁদুরটা উন্মত্ত হিংস্রতায় তার উপর আক্রমণ চালায়।
সানা আতঙ্কে দু’পা পিছিয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে রিজভী কে বলে,
—”রিজভী, ওটাকে থামান”
কিন্তু রিজভী একদম স্থিরভাবে তাকিয়ে বললো,
—”এখন আর সম্ভব নয়। ওটাকে এখন বের করা মানে পুরো ল্যাবকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া। এই পর্যায়ে ও আর সাধারণ প্রাণী নেই। ড্রাগস ওর শিরায় শিরায় থাকা পর্যন্ত ও এইরকম হিংস্র হয়ে থাকবে”
সানার চোখ আবার কাচের ভেতরে গেল। বিড়ালটি ইতিমধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু সানা যতটা না চমকে ছিল এই দৃশ্যটা দেখে তারপরে দৃশ্যটা দেখে সে আরো বেশি থমকে যায়। কেননা শিকার শেষ হওয়ার পরও ইঁদুরটি থামল না। সে পাগলের মতো চারদিকে ছুটতে থাকে। মনে হচ্ছে তার ভেতরে এমন এক রক্তপিপাসা জন্ম নিয়েছে যার কোনো শেষ নেই। আর যখন সে নতুন কোনো লক্ষ্য খুঁজে পেল না তখন সে নিজের উপরই ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজের শরীরকে নিজেই কামড়াতে শুরু করল। যদিও সে নিজেকে আঘাত করতে পারছে না ঠিকমতো তবু যতটুকু পারছে সে নিজের মাংস নিজেই ছিঁড়তে লাগল।
সানা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। যেন সে কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং নরকের এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দেখছে। কয়েক মিনিট পরে বক্সের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এল। দুটো প্রাণীই নিথর হয়ে পড়ে আছে। রিজভী কিছুক্ষণ চুপ থেকে সানাকে সময় দিল বুঝার জন্য। কেননা সে জানত, এই দৃশ্য বোঝার জন্য মানুষের মস্তিষ্কের কয়েক মুহূর্ত লাগে। অবশেষে বলল,
—”এখন বুঝতে পারছ?”
সানা শুকনো গলায় শুধালো,
—”এটা… এটা মানুষের উপরও এমন কাজ করে?”
রিজভী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর তাকে নিয়ে গেল বিশাল এক হোলোগ্রাফিক স্ক্রিনের সামনে। সেখানে অসংখ্য মেডিকেল রিপোর্ট ভাসছে, মস্তিষ্কের স্ক্যান, স্নায়ুতন্ত্রের ডায়াগ্রাম, ডিএনএ ম্যাপ, অগণিত গবেষণার ফলাফল। রিজভী সেগুলো একটা একটা করে দেখিয়ে বলতে শুরু করে,
—”মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর। ম্যানবিস্ট সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশে আঘাত করে। ভয়, সহানুভূতি, অপরাধবোধ সবকিছু ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়। তারপর মানুষ নিজের অন্ধকার দিকটার কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে।”
সানা নির্বাক হয়ে সবটা দেখে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে,
—”এই ড্রাগস থেকে কি রেহাই পাওয়ার কোন রকমের উপায় নেই?”
—”হ্যাঁ, আছে সেজন্যই তো এই ল্যাব। সেই অভিশপ্ত ড্রাগস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। এখানে প্রতিটা স্নায়ু থেকে শুরু করে মানুষের প্রতিটা ক্লোন এবং সেই ড্রাগস এর উপর রিসার্স করার জন্য সম্পূর্ণ ল্যাবটাকে তৈরি করেছিল ইকবাল জাওয়ান আঠারো বছর আগে আরজে কে লরেন্সের অভিশপ্ত ড্রাগস থেকে বাঁচানোর জন্য। সোফিয়া মারহাবকে মেরে ড্রাগসের এন্টিডোরটা নিয়েছিল, ইকবাল সেটার খুঁজ পেয়ে আরজেকে বাঁচানোর তাগিদে সেটা তার থেকে নিয়ে এসেছিল। এবং ড্যাড সেটার উপরে রিসার্স শুরু করেছিল। তবে মারহাবের আবিষ্কিত ঐ প্রতিষেধকটা ছিল অসম্পূর্ণ। মানে ওটা নিলে তোমাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারতো কিন্তু আবারও মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেওয়া হতো”
স্ক্রিনে একের পর এক ফাইল খুলতে লাগল। সানা যত দেখছিল, ততই তার মাথা ভারী হয়ে উঠছিল। রিজভী এবার আরও নিচু স্বরে বলল,
—”আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা জানো কী?”
—”কি?”
—”এই ড্রাগ সবার ওপর একইভাবে কাজ করে না। কিছু মানুষের শরীর এটা প্রত্যাখ্যান করে। কিছু মানুষের শরীরে আংশিক কাজ করে। আর কিছু মানুষের মধ্যে…এটা দ্বিতীয় একটা সত্তার জন্ম দেয়”
সানা বুঝলো না তার কথা গুলোর মানে তাই বোঝার জন্য সে তার মুখের দিকে তাকাতেই রিজভী বলতে শুরু করে,
—”মানে এটার ফলে মানুষের পার্সোনালিটি চেঞ্জ হয়ে যায়, যেটাকে বলে, ডুয়েল পার্সোনালিটি”
সানা ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে,
—”মানে এক মানুষের মধ্যে দুই সত্তা”
রিজভীর মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”হ্যাঁ, দুজন মানুষ। একটা তার ভালো দিক যেটা সবাই দেখে, আরেকটা ভিতরে লুকানোর দানব যেটাকে আটকানো শুধুমাত্র রক্তের দ্বারা সম্ভব”
সানার বুক কেঁপে উঠল অজানা আশঙ্কার তোপে। রিজভী বলতেই থাকল,
—“প্রথমে মানুষ সেটা টের পায় না। তবে ধীরে ধীরে একসময় সে দ্বিতীয় সত্তার নিয়ন্ত্রণ চলে যায়”
রিজভী এবার সানাকে সেই সত্যটার সামনে নিয়ে যায় যেটা সানা কোনদিনও কল্পনাও করেনি। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি বিশাল কাচের কক্ষের সামনে। সানা স্বাভাবিকভাবেই ভেতরে তাকায় আর পরের মুহূর্তেই তার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত আটকে আসার উপক্রম হলো কাচের ওপারে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে। সে রিজভীকে জিজ্ঞেস করে,
—”এটা… এটা রানভীর তাই না?”
রিজভী ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”হ্যাঁ, ওটা আরজে… কিন্তু এই মুহূর্তে সে আরজে নেই”
সানা এবার সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বিরক্তিকর শব্দ করে বলে,
—”ওপপ, রিজভী। প্লিজ, আপনি কি আমাকে ক্লিয়ার করে বলবেন? এই পর্যন্ত আমি সম্পূর্ণ কনফিউজড”
রিজভী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—”এটা আরজে না… এটা রনো”
—”আরজে আর রনো তো একই”
রিজভী এবার তাকে শুধরে দিয়ে বলে,
—”না, রনো আরেকটা। সানা আমি তোমাকে এখন যেটা বলবো খুব স্পষ্টভাবে শুনবে, ঠিক আছে”
সানা মাথা নারিয়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়। রিজভী একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নিচু স্বরে বলতে শুরু করে,
—”আরজেও একজন স্প্লিট পার্সোনালিটি পার্সন। তার মধ্যেও দুইটা সত্তা আছে। সেও দ্বৈত পরিচয়ের মানুষ। একটা দানব যে রক্তের জন্য ক্ষুধার্ত আরেকটা হচ্ছে আরজে যে সারা পৃথিবীর সামনে একজন সেলিব্রেটি। এজন্যই আরজে সোফিয়াকে বহুবার বলেছে, সে তার রনো নয় তোমার রানভীর হতে চায়”
রিজভী এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সামনে তাকাতেই দেখে সানার চোখ বিস্ফোরিত। তার বলা বাক্যগুলো যেন বজ্রাঘাতের ন্যায় আঘাত হানল সানার বুকে। সে নিঃশব্দে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। মনে মনে হাজারো বার চাইল, এটা কোনো দুঃস্বপ্ন হোক আর সে চোখ খুলে দেখবে, সব মিলিয়ে গেছে। কিন্তু না, বাস্তবতা বড়ই ভয়ঙ্কর।
রমণীর কানে যেন রিজভীর কণ্ঠস্বরও আর পরিষ্কার পৌঁছাচ্ছিল না। শুধু বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ধাক্কা মারছিল, তাহলে সে এতদিন কাকে চিনেছে?
কার সাথে জীবন কাটিয়েছে?
তার স্বামী আসলে কে?
তার হাত ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল মেঝেটা পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। রিজভী তার অবস্থা বুঝতে পারছে স্পষ্ট। হয়তো এই কারণেই আরজে এতদিন সত্যিটা বলতে পারেনি। রিজভী নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম সবটার জন্য প্রস্তুত থাকতে। ভিতরে যেই আরজেকে দেখছো, সে ওদের মধ্যে একজন”
বহু কসরতের পর সানার কণ্ঠস্বর থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
—”আমি সবটা জানতে চাই”
—”সোফিয়া যখন ছোট্ট আরজেকে সেই অন্ধকার সেলগুলোতে মৃত বা অর্ধমৃত লাশের সাথে রেখে দিত, যখন তাকে ওই অভিশপ্ত ম্যানবিস্ট ড্রাগসের সংস্পর্শে আনা হতো, তখন শুরুতে সে ভয় পেত, প্রচণ্ড ভয় পেত। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরে আরেকটা সত্তা জন্ম নেয়, যে ভয়কে সহ্য করতে পারত। যন্ত্রণা সহ্য করতে পারত। সেই সত্তাটাই বড় হতে হতে রনো হয়ে ওঠে। রনো ছিল সোফিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র, একটা ব্লাডি মনস্টার, নরখাদক। যে রক্ত ছাড়া নিজের পিপাসা মেটাতে পারত না। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানো?
আরজে যখন আবার নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তখন রনো অবস্থায় কী করেছে, তার কিছুই মনে থাকে না। তার এই পরিবর্তনের কিছু ট্রিগার আছে। প্রথমত, ম্যানবিস্ট ড্রাগস। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত রাগ, মানসিক চাপ কিংবা গভীর দুশ্চিন্তা। তখন আরজের ভেতরের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে আর রনো জেগে ওঠে”
রিজভী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে,
—”রনো অবস্থায় সে কী করতে পারে, তার সীমা নেই”
রিজভী এবার পকেট থেকে ছোট্ট একটি ধাতব কেস বের করে যার ভেতরে কয়েকটি ওষুধের ক্যাপসুল,
—”আর এই রনো কে ঠেকাতে সে মাসের পর মাস ল্যাবে নিজের উপর রিসার্স করিয়েছিল। আর তা আটকানোর একটা সহজ পদ্ধতি ছিল আমার ড্যাডের বানানো কিছু মেডিসিন যেগুলো ড্যাডের মৃত্যুর পর আমি বানাই। কিন্তু এগুলো অনেক ক্ষতিকর। দিনে একটা কি দুটোর বেশি মেডিসিন নিলে তার নিজের মৃত্যুর ঝুঁকিও হয় পড়তো। আর মেডিসিন টা ভীষণ দূর্লভ। এটা মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উত্তেজিত অংশকে শান্ত করে। রনোকে ঠেকানোর জন্য আরজে বছরের পর বছর নিজের সাথেই যুদ্ধ করেছে। তার এই সত্যটা শুধু সোফিয়া, ইকবাল জাওয়ান, আমার ড্যাড, জ্যাক আর আমি জানতাম”
রিজভী কথা শেষ করে সে সানার দিকে তাকাল। আর তাকিয়েই থমকে গেল। সানার চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছিল সে কিছুই শুনছে না। আবার মনে হচ্ছিল সবকিছুই শুনেছে। রিজভী কিছু বলার আগেই সানা ফিসফিস করে বলল,
—”আমি রানভীরের কাছে যাব।”
রিজভী যেন চমকে উঠে,
—”অসম্ভব। সানা, এই মুহূর্তে আরজে নিজের মধ্যে নেই। সে তোমাকেও আঘাত করে ফেলতে পারে”
—”আমি যাব”
—”সে কাউকেই চিনবে না, জাস্ট কাউকেই না একমাত্র সোফিয়া ছাড়া। কেননা রনোর এই রূপের সাথে একমাত্র সোফিয়াই পরিচিত ছিল। আর মাত্র বিশ মিনিট। মেডিসিনের কাজ শুরু হলেই সে আবার আরজে হয়ে যাবে। তখন তুমি যেতে পারবে”
কিন্তু সানা যেন কিছুই শুনল না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে কাচের ওপারে বসে থাকা মানুষটার দিকে। তারপর জেদি সুরে বলে,
—”আমি এখনই যাব, আপনি খুলবেন কী না, বলুন?”
রিজভী শেষবারের মতো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো। অবশেষে বাধ্য হয়ে সে সেফটি লক খুলে দিল। সানা ধীরে ধীরে কাচের কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে হঠাৎ রিজভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাচের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। রিজভী আতঙ্কে ছুটে এল,
—”সানা, এই পাগল মেয়ে। ওপেন দ্য ডোর। মেয়েটা নিজেও মরবে, সাথে আমাকেও মারবে”
দুই হাত দিয়ে কাচে আঘাত করল বারংবার কিন্তু রমণী খুলল না।
সানা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল আরজের সামনে যে তখনও মাথা নিচু করে একটি ধাতব চেয়ারে বসে ছিল। তার দুই হাতের আঙুল বারবার একে অপরের সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। সানার দৃষ্টি সেদিকে যেতেই নজরে আসে আরজের হাতজোড়া ক্ষতবিক্ষত। নখের আঁচড়, রক্তাক্ত দাগ, ছড়িয়ে থাকা শুকিয়ে যাওয়া রক্ত দেখেই বোঝা যায় সে নিজের সঙ্গেই কোনো অদৃশ্য যুদ্ধ লড়েছে। সানা কাঁপা কণ্ঠে ডাকল,
—”রানভীর…”
শব্দটা যেন কক্ষের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়ে আরজের কাছে গিয়ে থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় আর পরের মুহূর্তেই তার রক্তাভ বাদামী চোখজোড়ার সঙ্গে চোখাচোখি হলো সানার কালো মনির। সেই দৃষ্টি, সানা জীবনে কখনো এমন দৃষ্টি দেখেনি। সেখানে কোনো পরিচিত উষ্ণতা নেই, কোনো কোমলতা নেই শুধু এক গভীর, আদিম, অস্বস্তিকর অন্ধকার। সানার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভয়ে অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ঠিক তখনই তার ভয়কে আরো একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে আরজের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা তির্যক হাসি ফুটে উঠে। সেই হাসি দেখে সানার এবার সত্যিই মনে হচ্ছো, সে আবেগের বশে ভয়ংকর ভুল করেছে। রিজভী ঠিকই বলেছিল। এই মুহূর্তে তার সামনে যে বসে আছে, সে রানভীর নয়, কমপক্ষে সম্পূর্ণ রানভীর নয়। সে সানাকে এই মুহূর্তে মেরেও ফেলতে পারে।
সানা বদ্ধ রুমের থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে ছুটে যাবে কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরজে পিছন থেকে তাকে ঝাপটে ধরে দেওয়ালের সাথে আটকে ফেলে। সাথে সাথে বাম হাতে তার গলা এতটা জোরে চেপে ধরে যে সানার মনে হচ্ছে তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে।
এদিকে কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রিজভীও মুহূর্তে জমে গেল। তার মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। আরজে তাকে হাজারবার সতর্ক করেছে, সানাকে তখনই নিয়ে আসতে, যখন সে সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে ফিরে আসবে। কিন্তু সে ভেবেছিল, সানাকে নিজ চোখে সবটা দেখালে হয়তো ভালো হবে। কিন্তু এখন, কাচের ওপাশের দৃশ্য দেখে তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। সানার কিছু হলে আরজে তাকে ঠিক মেরে ফেলবে। সে মরিয়া হয়ে কাঁচে জোরে জোরে আঘাত করে আরজে কে ডাকতে শুরু করে। হঠাৎ তার মনে পড়ল, ভেতরে কোনো শব্দ পৌঁছায় না।
রিজভী নিজের উপরেই বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠল,
—”অভি, অভি”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরজের মতো দেখতে সেই ব্যক্তি দৌড়ে এসে হাজির হলো,
—”স্যার, কী হয়েছে?”
রিজভীর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে আতঙ্কে। সে তড়িঘড়ি করে আদেশ ছুঁড়ে,
—”তাড়াতাড়ি দরজা খোলো, অভি”
অভি ভেতরে তাকিয়েই চমকে উঠে। সেও গ্লাস ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলে,
—”ওহ শিট, ম্যাম কিভাবে ভেতরে চলে গেলেন? স্যার, আপনি দরজা কেন খুলেছেন?”
রিজভীর এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে এই ছেলেটাকে এমন দুটো চড় লাগাতে। এত বড় বিপদ আর এই ছেলেটা এখন তাকে দোষারোপ করছে। রিজভী দাঁত চেপে বলে,
—”তোমাকে বলেছি শুধু দরজা খুলতে। এত কথা বলতে কে বলেছে”
অভি রিজভীকে ‘সরি’ বলে তাড়াতাড়ি দরজা ধাক্কাতে শুরু করে। রিজভী তার বোকামি দেখে সে আবারো নিজের কপাল চপড়ায়। যদি দরজা ঠেলে খুলতেই পারতো তাহলে তো রিজভীই করত। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—”ইডিয়েট এজন্যই আরজের কাছে তোমাকে এত কথা শুনতে হয়। এতগুলো বছর কেটে গেছে তুমি এখনো নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু করতে পারো না। তাড়াতাড়ি গিয়ে পাসওয়ার্ড রিসেট করে তারপর এটাকে খোলো”
অভির বোধগম্য হতেই ‘ওকে স্যার’ বলে দৌড়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে ভিতরের অবস্থা বেহাল। সানার চোখ মুখ উল্টে গেছে, তার নিঃশ্বাস একদম নাকের ডগায় আটকে আছে। মনে হচ্ছে গলার ভিতরে হাড় গুলো সব ভেঙ্গে গেছে এতটা জোরে আরজে তাকে চেপে ধরে আছে। তার চোখ দিয়ে গড়গড় করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সানা শক্তিও ফুড়িয়ে আসছে। চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। কাঁপা কাঁপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বের হয়,
—”রা…ন..ভীর…”
ঠিক এমন মুহূর্তে আরজের কিছুটা চেতনা ফিরে আসে। তার ড্রাগসের প্রভাব কেটে মেডিসিনের প্রভাবটা শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সানার গায়ে লেপ্টে থাকা কাঁচাগোলাপের সুবাসটা হঠাৎ তার নাকে এসে বারি খায়। সেই একমাত্র সুবাস, যেটা আরজে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনে নিতে পারে। সে ঐ অবস্থায় সানার গলায় মুখ গুঁজে দেয় এবং উন্মাদের মতো লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নিতে থাকে। আরজের হাত কিছুটা ঢিলা হয়ে আসাতে সানা মধ্যে একটু হুঁশ আসে। এতক্ষণ পর মনে হচ্ছে শ্বাস নিতে পেরেছে। সে একটা শ্বাস টেনে নিয়ে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দুই হাতে আরজেকে ধাক্কা দেয়। এমন আকষ্মিক ধাক্কায় আরজে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। রমণী কাশতে কাশতে নিচে বসে পড়ে। আর একটু হলেই সে উপরে চলে যেত।
এদিকে আরজেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, কপালের শিরাগুলো টানটান হয়ে উঠে, চোখদুটো বন্ধ করে মাথা চেপে ধরল। মনে হচ্ছে তার ভেতরে দুটো সত্তা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। একটা তাকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিচ্ছে। আরেকটি মরিয়া হয়ে আলোয় ফিরে আসতে চাইছে।
তারপর হঠাৎ এক ঝটকায় তার সেই দানবটা থেমে যায় আর সেই নিষ্ঠুর শীতলতা কোথাও মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গায় ফিরে এল পরিচিত মানুষটা। আর সামনে সানা কে বসে থাকতে দেখে সে আতঙ্কে তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে বিচলিত স্বরে বুলি আওড়ায়,
—”ওয়াইফি, হেই ওয়াইফি…লুক অ্যাট মি, আর ইউ ওকে?
সে চারদিকে তাকিয়ে অস্থির কণ্ঠে ফের শুধালো,
—”তুমি এখানে কখন এসেছ? তোমার তো আরো পরে আসার কথা ছিল, হেই, মাই লাভ, সে সামথিং”
সানা গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে তারপর কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”আপনি আর একটু হলেই আমাকে মে*রে ফেলতেন”
কথাটা শুনে আরজে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের রঙ বদলে গেল।
—”কি…?”
অবিশ্বাসের সুরে বেরিয়ে গেল শব্দটা তারপর সে তড়িঘড়ি করে সানার গলার দিকে তাকায় ,সেখানে স্পষ্ট লালচে হাতের চাপ। আরজের চোখে মুহূর্তে তীব্র আতঙ্ক নেমে এল। সে দাগগুলোকে ছুঁয়ে আওড়ায়,
—”ওহ গড…ড্যাম…আ’ম সরি… আম সো সরি ওয়াইফি…সরি মাই লাভ”
সানা তাকে দু’হাতে সরাতে চাইল। কিন্তু আরজে যেন নিজের অপরাধবোধে ভেঙে পড়েছে। বারবার বলতে লাগল,
—”আম সো সরি.. সরি জান, সরি সুইটহার্ট”
আরজে নিজের মুখটাকে রমণীর গলায় গুঁজে বারবার চুমু খেতে থাকে নিজের হাতের চাপ গুলোর উপর। সে কল্পনাও করতে পারছে না, সে নিজ হাতে তার একমাত্র প্রাণ ভোমরা কে আঘাত করেছে। আরজে রাগে সে নিজের বাম হাত দিয়ে দেওয়ালে আঘাত করতে শুরু করে। সানা চমকে তাকে আটকে ফেলে। এবার রমণীর নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে, সে কেন আরজেকে এতগুলো কথা শোনালো। আরজে তো ঐ মুহূর্তে নিজের মধ্যে ছিল না। সানা তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”রানভীর, স্টপ ইট, প্লিজ”
আরজে করুণ চোখে তাকায়,
—”না… আমি শাস্তির যোগ্য। আমি তোমাকে বারবার আঘাত করি। এজন্যই আমি দূরে ছিলাম। এই দানবটা বেরিয়ে এলে আমি নিজের মধ্যে থাকি না… তখন কী হয়, আই ডোন্ট নো…”
হঠাৎ আরজের এক নিঃশ্বাসে বলা কথাগুলো থেমে যায় সানা যখন তার দু গালে হাত রেখে তার চোখে চোখ রেখে বলে,
—”ইটস ওকে রানভীর, আমি ঠিক আছি। এতে আপনার কোন দোষ নেই। ওই সত্তাটার উপর আপনার কোন কন্ট্রোল নেই”
কিন্তু আরজে মানতে নারাজ। সে মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”নো ইটস অল মাই ফল্ট”
এই বলে সে সানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিজের একমাত্র আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। সানাও তাকে জড়িয়ে ধরল। এই প্রথম সে বুঝতে পারছে, এই মানুষটা কতটা একা ছিল। কত বছর ধরে নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করেছে। ঠিক তখনই কাচের দরজা খুলে হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকল রিজভী আর অভি। সামনে দুই কপোত কপোতীকে আলিঙ্গন করতে দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে তাদের আটেনশন নিতে চাইল। কিন্তু আটেনশনের বিপরীতে দুজনের কানে আসে আরজের চিবিয়ে চিবিয়ে বলা ঝাঁঝালো কণ্ঠ,
—”যদি এই মুহূর্তে পুরো কক্ষটা এক সেকেন্ডে খালি না হয় তাহলে সবগুলোকে গুলি করে মেরে ফেলবো ওকে এত তাড়াতাড়ি নিয়ে আসার জন্য”
রিজভী হতবিহ্বল হয়ে গেল, বেশ করে চাইল বলতে, “শালা, তোর বউ নিজের ইচ্ছায় এসেছে” কিন্তু বলল না। কেননা রিজভী জানে, আরজে পৃথিবী উল্টে গেলেও তা বিশ্বাস করবে না। সে তড়িঘড়ি করে বলে,
—”অভি, দৌড়”
—”আমি তো আগেই দৌড়াচ্ছি স্যার”
রিজভী পাশে তাকাতেই দেখে, অভি নেই। ব্যাটা তাকে ফেলেই পালিয়েছে। দুজন একসঙ্গে এমন গতিতে কক্ষের বাইরে ছুটল, যেন তাদের পেছনে সত্যিই মৃত্যু তাড়া করেছে।
ল্যাবরেটরির গভীরতম অংশে অবস্থিত বিলাসবহুল ব্যক্তিগত কক্ষটা বাইরের শীতল বৈজ্ঞানিক পরিবেশের সঙ্গে যেন সম্পূর্ণ বেমানান। কক্ষের মাঝখানে রাখা এক বিশাল লাক্সারি বেডে বসে আছে সানা। তার গলায় এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে পাঁচটি আঙুলের নীলচে দাগ। আরজে তার সামনে বসে অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিচ্ছে তাকে। সানা শতবার বলেছে সে ঠিক আছে। কিন্তু আরজে যেন শুনতেই পায়নি। অত্যন্ত সতর্ক হাতে সে সানার গলার ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগাচ্ছে। প্রতিবার আঙুলের স্পর্শে তার বুকের ভেতর অপরাধবোধের একেকটি ঢেউ আছড়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে ধীরে বলল,
—”তুমি অভির কথা ভাবছো, তাই না?”
সানা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। আরজে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
—”ও আমার ফটোকপি… কার্বন কপি… ডুপ্লিকেট যেটা বলতে চাও বলতে পারো। ওকে ড্যাড কোথা থেকে নিয়ে এসেছিল আমি জানি না। তবে মমের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই ওকে আনা হয়েছিল”
সে একটু থামে, মুখে ফুটে উঠল এক তিক্ত হাসি। একে একে সানাকে সবটা বলতে শুরু করে,
—”তুমি নিশ্চয়ই জানো ড্যাডের চরিত্র কেমন ছিল। জন্মের পর থেকে আমার কোনো পরোয়া তিনি করতেন না। আমি বেঁচে আছি না মরছি সেটাও যেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু রিয়ানা হওয়ার পর ড্যাড নিজের ভুলগুলো বুঝতে শুরু করেন। আমার দিকে তাকাতে শুরু করেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মম মানসিকভাবে সম্পূর্ণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মম নিজেও একটা ডাবল পার্সোনালিটির মানুষ ছিলেন, হয়তো তুমি বুঝতে পারো নি। ক্ষমতার নেশা তাকে অন্ধ করে ফেলেছিল। ড্যাডকে খুশি করার জন্য তিনি নিজেকে এমন এক অন্ধকারে ডুবিয়েছিলেন যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব ছিল না। আর আমি…আমি তখন ওই অন্ধকারের ভেতরে দ্বিতীয় একটা পরিচয় তৈরি করতে শুরু করেছি। ড্যাড বুঝতে পেরেছিলেন আমি হারিয়ে যাচ্ছি। তাই তিনি আমাকে নিয়ে চারদিকে ছুটতে শুরু করেন। সেই সময় তিনি তোমার বাবার কাছেও গিয়েছিলেন। তখন রিজভীর ড্যাড, মিস্টার আলভীর সঙ্গে ড্যাডের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। পরে আলভী আমার জন্য সব ভুলে গিয়ে সাহায্য করতে রাজি হন। আমার ট্রিটমেন্ট শুরু হয়। কিন্তু তখন অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দিনে দুই ঘণ্টার বেশি আমি আরজে থাকতে পারতাম না”
সানার বুক ধক করে উঠে,
—”বাকি সময়?”
—”রনো”
ব্যাস এই একটি মাত্র শব্দই যথেষ্ট অসংখ্য অন্ধকার রাতের ইতিহাস বুঝাতে। আরজে ফের আওড়ায়,
—”সবসময় রনো হয়ে থাকতাম, রক্তের নেশায়, উন্মত্ততায়। মিস্টার আলভী বলেছিলেন, কোনো অ্যান্টিডোট ছাড়া আমাকে বাঁচানো যাবে না। তখন ড্যাড মমের অগোচরে সেই অ্যান্টিডোট নিয়ে আসেন যেটা মারহাবের কাছে ছিল তাও অসম্পূর্ণ। সেই কারণেই আলভী নতুন করে গবেষণা শুরু করেন। আর আমাকে প্রায় সারাক্ষণ তার তত্ত্বাবধানে থাকতে হতো”
সে এবার মৃদু হেসে বলে,
—”এই মুহূর্তে মমের সন্দেহ হলে তিনি সবকিছু লোপাট করে দিতে পারতেন। ওই মুহূর্তে ড্যাড প্ল্যান করে অভিকে নিয়ে এসেছে। তখন থেকে ও আমার জায়গায় রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে থাকতে শুরু করে। ওর আসল চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, শুধু শারিরীক গঠন এক ছিল। যেটা তুমি দেখেছ, আমার মতো মুখ, সেটা সব প্লাস্টিক সার্জারির ফল। পরে আমি নিজেও ওকে ব্যবহার করতে শুরু করি তবে সীমিতভাবে। ওর বাইরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। ও তাই করত যেটা আমি বলতাম। আমার কথার বাইরে এক দাগও পা রাখত না”
তারপর সে সানার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
—”কিন্তু হঠাৎ একদিন এন্টিডটের খবরটা লিক করে দেয় এই ল্যাবের এক ডাক্তার। তারপর সবাই মিস্টার আলভীর পিছনে পড়ে যায়। সেই এন্টিডোট টা ছিল সোনার খনির মতো। পরে আলী মির্জার হাতে আলভীকে খু*ন হতে হয়। অবশ্য মমেরও এতে হাত ছিল। এর সাথে সাথে আমার সম্পূর্ণ ট্রিটমেন্ট এবং ওই এন্টিডটের রিসার্সও থেমে যায়। পরবর্তীতে রিজভী এটাকে আবারও স্টার্ট করে। তবে রিজভী তার ড্যাডের পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেকটা সময় দেরি হয়ে যায়। আমাদের বিয়ে হওয়ার পর সেই সত্তা টার উপর নিজের কন্ট্রোল নিজের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য দিনের পর দিন এখানে থাকতে শুরু করি, যাতে তোমাকে একটা সুস্থ জীবন দিতে পারি। আর অভি আমার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে বাইরে থাকত। এজন্যই মাঝে মাঝে তুমি ওকে ফ্ল্যাটে দেখতে। আর সে তোমার দিকে ফিরেও তাকাত না”
সানা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,
—”কেন?”
আরজে তার খসখসে পুরুষালী হাতটা সানার গালে ছুঁইয়ে গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
— “ওর নিষেধ ছিল, বেইবি। যদি ও তাকাত, তাহলে আমি ওর চোখ না ঘাড়টাই নিয়ে নিতাম”
সানা হতবাক। আরজে হঠাৎ ঝুঁকে এল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস সানার কানের পাশে ছুঁয়ে গেল। সে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে,
—”তবে আমি যতদিন ফ্ল্যাটে ছিলাম, আমি কিন্তু তোমার কক্ষে তোমার সাথেই শুয়ে ছিলাম”
সানা সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল,
—”অসভ্যলোক, এজন্যই তো আমি মাঝে মাঝে আপনার পারফিউমের স্মেল পেতাম”
আরজে এমনভাবে হাসল যেন কোনো বড় অপরাধে ধরা পড়ে গেছে। কিয়ৎকাল ভেবে সানা আবার প্রশ্ন করে,
—”তাহলে ওইদিন ঈশানীকে গার্লফ্রেন্ড হিসেবে কে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে?”
আরজে বিরক্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—”কে আর, ওই ইডিয়েট অভিটা। একে এত করে বলেছি এত বড় মন না করতে। তারপরও এর মন বড় বেশি”
—”তাহলে আপনি ওই সময় কোথায় ছিলেন, ল্যাবে?”
—”হ্যাঁ, আমি টানা ছয় দিন ল্যাবে ছিলাম। তারপর বের হয়ে জানতে পারলাম তোমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। সেই মুহূর্তে আমি ছুটে গিয়েছিলাম। তুমি যখন বাসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে, তখন আমিই তোমাকে হসপিটালে নিয়ে এসেছি”
সানার চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। আরজে তাকে আরো কাছে টেনে বলে,
—”আমি তোমার পাশেই ছিলাম সবসময়, কিন্তু তুমি দেখতে পাওনি। অথবা… তুমি কোনোদিন দেখার চেষ্টাও করোনি। ঐ দিন সন্ধ্যায় এটা নিয়েই আমার আর মমের মধ্যে তর্ক হয়েছিল। আমি তোমাকে সবার পরিচয় দিতে চেয়েছি কিন্তু মম সম্মত হয়নি। এই নিয়ে আমি ভীষণ রেগে ছিলাম। আর ফ্ল্যাটে আসতেই তুমি আমাকে উল্টো পাল্টা শুনাতে শুরু করলে ঈশানীকে নিয়ে আর তারপর…..”
কথাগুলো শুনতেই সানার চোখ টলমল করে উঠল। আরজে তাড়াতাড়ি দুই গালে হাত রেখে বলল,
—”হেই ওয়াইফি…লুক অ্যাট মি বেইবি”
সানা নাক টেনে বলল,
—”এগুলো কবে শেষ হবে? কবে ওই রনো একেবারে শেষ হবে?”
আরজে তার কপালের সঙ্গে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে খুব শান্ত গলায় বলল,
—”খুব শিগগিরই। আমি প্রায় সুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি যখন আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে…তখন দিনের বেশিরভাগ সময় ইচ্ছে করেই আমি ওই ড্রাগস নিয়ে রনোকে জাগিয়ে রাখতাম”
—”কেন?”
আরজে মৃদু হেসে তারপর মলিন স্বরে প্রতুত্তর করে,
—”আমার মনে হতো, ওই সত্তাটা জেগে থাকলে আমি তোমাকে ভুলে থাকতে পারব। বাট ট্রাস্ট মি, ওয়াইফি…আমি নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও তোমাকে একফোঁটা ভুলতে পারিনি। বরং তোমাতে আরও ডুবে গেছি”
রমণী আর নিজেকে সামলাতে পারল না।চোখের পানি ছেড়ে হেঁচকি তুলে বলে,
—”আম সো সরি রানভীর…আমি জানতাম না এসব…”
আরজে মৃদু হেসে তার চোখে চুমু খেয়ে তার নোনাজল টুকু শুষে নিয়ে বলে,
—”বোকা মেয়ে, এখন সব শেষ”
—” আচ্চা, ওই অভি যদি কখনো আপনাকে ধোঁকা দিতে চায়? তাহলে তো খুব সহজেই দিতে পারবে। সত্যি বলতে শুরুতে আমিও ওকে চিনতে পারিনি”
আরজে হেসে ফেলল,
—”অভি আমার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আছে গত সতেরো বছর ধরে”
সানার চোয়াল প্রায় ঝুলে পড়ল। বিস্মিত কণ্ঠে শুধালো,
—”সতেরো বছর?”
—”হ্যাঁ। প্রথম তিন বছর শুধু ট্রেনিং করানো হয়েছিল। যেন মম একফোঁটা ভুলও ধরতে না পারেন। মমের চোখ খুব তীক্ষ্ণ ছিল। তিনি অতিশয় কোন একটা ছোট ভুলই বুঝতে পারবেন যে ওটা আমি নই। তাই ড্যাড অভিকে নিখুঁত করে আমার মতো বানিয়েছিলেন। তবে আমার কথার বাইরে যাবে ওই কলিজা ওর মধ্যে আমি দিইনি”
—”আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলে ও কী করবে?”
—”ওকে তার নিজের চেহারা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তার নিজের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হবে”
—”ওহ, ও কিন্তু ঠিক আপনার মতো, আমি তো প্রথম ওকে দেখে আপনি ভেবে জড়িয়ে ধরতে…..”
রমণী জিহবা খসে বাকি বাক্যটা বের হওয়ার আগেই হঠাৎ আরজে তার চুলের গোড়ালি শক্ত করে চেপে ধরে তার মুখটাকে কাছে টেনে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”তুমি ওকে জড়িয়ে ধরেছো?”
আরজের হঠাৎ এমন আচরণে সানা চমকে উঠে। সে ব্যাথাতুর শব্দ করে তাকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
—”ওপ, রানভীর আমার লাগছে ছাড়ুন”
আরজে না ছেড়ে তার মুখটাকে আরো কাছে টেনে এনে দন্ত পাটি পিষে বলে,
—”হ্যাঁ বা না বলো, বেইবি”
—”না, আমি ওকে ধরার আগেই ও সরে গেছে”
—”ও তোমার দিকে তাকিয়েছিল?”
—”না, ছাড়ুন। ও আপনার ভয়ে এভাবেই তটস্থ হয়ে আছে”
আরজে তাকে ছেড়ে দিল। সানা ছাড়া পাওয়ার সাথে সাথে নিজেকে ঠিক করে একটু দূরে সরে গিয়ে অভিমানী গলায় বলে,
—”আপনি রাগ কেন ঝাড়ছেন? রাগতো আমার করা উচিত, এত বড় একটা সত্যি লুকানোর জন্য”
আরজে আবার তাকে কাছে টেনে আনল। যদিও সানা আসতে চায়নি। কিন্তু তার চুনোপুঁটির মতো বল নিয়ে কি আরজের সাথে পারবে। আরজে তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে,
—”আগে জানলে কী করতে, বেইবি?”
সানার মাথায় হঠাৎ কোথা থেকে একঝাঁক দুষ্টু বুদ্ধি এসে হানা দিল। তার চুল টেনে ধরার প্রতিশোধ টা সে এভাবেই নিবে। রমণী ঠোঁট কামড়ে বলল,
—”আগে জানলে আপনাকে ছেড়ে কোনো বুড়ো বড়লোক ভুঁড়িওয়ালা লোককে বিয়ে করে ফেলতাম। তারপর দুই টাকার বিষ খাইয়ে বুড়োটাকে মেরে বাকি জীবন ওর টাকায় আয়েশ করতাম।
বলুন, এতে কী আছে ক্ষতি?
দুই টাকার বদলে পুরো কারোরপতি…”
কথা শেষ হতে না হতেই আরজের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার মধ্যে আবারও একটু আগের হিংস্রতা ফিরে এলো। সে এক ঝটকায় সানার থুতনি চেপে ধরে রুক্ষ স্বরে বলে,
—”কি বললে? আবার বল, দেখি তোমার কলিজাটা কত বড়?”
সানা কষ্টে তার হাত সরিয়ে দিয়ে গাল ডলতে ডলতে বলে,
—”অসভ্য লোক, আমি তো দুষ্টুমি করেছি”
—”দুষ্টুমি? আচ্ছা তোমাকে এই সব কথা কে শিখায়? ঐ বারোভাতারিটা?”
সানা ভ্রু কুচকে খেঁকিয়ে উঠে,
—”আপনার সমস্যা কী? কথায় কথায় এসপিকে টানেন কেন?”
এই বলে সানা আবারও দূরে সরে যায়। আরজে আবারও তাকে টেনে কাছে আনতে গেল সানা তাকে দু’হাতে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু আরজে কে থামাবে কে?
পরের মুহূর্তেই সে সানাকে এক টানে নিজের বুকে এনে ফেলল। এত জোরে যে সানা প্রায় তার বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৭
—”রানভীর”
সে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু আরজে তার অধর যুগল আঁকড়ে ধরে থামিয়ে দিল। কিয়ৎকাল পর তাকে ছেড়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফিসফিস করে,
—”মাই লাভ, আ’ম সো টায়ার্ড। আমার একটা শান্তির ঘুম চাই”
