Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩০

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩০

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩০
রুপান্জলি

৩ মাস পর,,,,
,,, কাউন্সিল রুম থেকে বের হয়ে প্রতিবারের মতো হসপিটালের করিডরে দাড়ালো দুজন। ঢাকা শহরে রাত দিনের তফাৎ না থাকলেও আকাশের চাদ তারা গুলো রাতের জানান দেয়, সাথে তৈরি করে অতি মনোরোম দৃশ্য। করিডরের রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে অর্পনা, আর ওকে পিছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে দ্বীপ। হাইট অনুযায়ি অর্পনা দ্বীপের বুক সমান, এই বিষয়টা নিয়ে বড্ড নার্বাস অর্পনা। এইযে দ্বীপ তার কাধে থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে তার জন্য কতোটা ঝুকতে হচ্ছে লোকটাকে। সেই সাথে সে দ্বীপের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাড়িয়ে আছে। লোকটা নিশ্চয়ই ব্যাথা পাচ্ছে? যদিও তার উজন মাত্র ৪০ কেজি, তার হাইট অনুযায়ী এটা আহামরি কোনো উজন না হলেও,,, এতোগুলো উজন দু পায়ে বহন করা কি চারটে খানি কথা?

ওহুম, একদমি না। সল্প উজনের হয়ে বেশি উজন বহন করা কতটা কষ্ট দায়ক সেটা তার থেকে ভালো করে আর কে জানে? তার মতো একটা ছোট মোটো ৪০ কেজি উজনের মেয়ের উপর যখন ৮২ কেজির এই দানব ভার ছেড়ে শুয়ে থাকে, তখন তো তার আত্মা বেড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যায়,, তবু ও সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা। কিছু বললেই এই লোক একদম গাল ফুলিয়ে, অন্যদিক ফিরে অনর হয়ে শুয়ে থাকবে, নয়তো পৃথিবীর যত রকম ইগনর আছে সব তার দিকে ছুড়ে দিয়ে দূরে সরে থাকবে। অর্পনা সেসব ইগনর সহ্য করতে পারেনা বলেই তো এই দানবীয় উজনটা সহ্য করে নেয়। দ্বীপের পা টা ও তো তার উজন অনুযায়ী বড্ড ছোট, দ্বীপের পা টাও নিশ্চয়ই ওর উজন সহ্য করতে না পেরে জীবন হাড়ানোর পন করছে? সেসব ভেবেই অর্পনা পা থেকে নেমে পরতে চাইলো কিন্তু পারলোনা, দ্বীপ ওর পেট শক্ত করে চেপে ধরে শাসিয়ে বললো — কি হয়েছে? এতো নড়াচড়া করো কেনো? মার খাবা?

,,, শক্ত পোক্ত হাত দিয়ে পেট চেপে ধরায় ব্যাথা পাচ্ছে অর্পনা তাই পেট থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো — ওফ্ফ, আল্লাহ!! ব্যথা পাচ্ছি তো, হাত ঢিলে করুন।
,,, দ্বীপ শুনলোনা, আগের থেকেও বেশি শক্তি প্রয়োগ করে অর্পনাকে উপরে তুলে নিলো যার ফলে ওর পা বর্তমানে মাটি থেকে অনেকটা উপরে অবস্থান করেছে,, পিঠ ঠেকেছে দ্বীপের বক্ষদেশে। হঠাৎ এমন হওয়ায় ভয় পেলো অর্পনা, ভয়ে দ্বীপের শার্টের হাতা খামচে ধরে চোখ মুখ খিচে অস্ফুট স্বরে ডাকলো — দ্বীপ!!
,,, দ্বীপ গম্ভীর কন্ঠে সারা দিলো — হুম বেবি, বলো।
,,,, অর্পনা ছটফট করে বললো — নামান আমাকে, পেটে ব্যাথা পাচ্ছি।
,,, কাথাটা কানেই তুললো না দ্বীপ, বরং অনর ভঙ্গিতে চেপে রেখেই দাতে দাত চেপে বললো — ওহুম, নামাবোনা। তখন এতো নড়াচড়া করছিলি কেনো? পা থেকে নামতে চেয়েছিস কেনো? আমার থেকে দূরে যেতে চাস? সবসময় এতো পালাই পালাি করলে হাত পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।
,,, দ্বীপের ধমকে চুপসে গেলো অর্পনা,, কইফিয়ত দেওয়ার মতো করে বললো — আসলে, আমার ওজন তো অনেক বেশি আপনি যদি পায়ে ব্যাথা পান। তাই নামতে চেয়েছিলাম। দিনকে দিন আপনার ব্যাবহার রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে দ্বীপ,, কিছু হলেই ধমকা ধমকি।

,,,, কত উজন তোমার? (কাধে থুতনি ঠেকিয়ে)
,, ৪০!!
,,, দ্বীপ ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো — এটুকু উজনে আমি হাপিয়ে যাবো? আর ইউ সিরিয়াস? ( অন্য হাতে অর্পনার পেট ছুয়ে) এটুকু পেট, আমি এক হাতে চেপে ধরলেই চুপসে যায়। লম্বায় তো আমার বুক সমান ও না। ওজন ও আমার থেকে হাফ। এই, তুমি খাওনা? এতো চিকন কেনো তুমি? লিলি পুট একটা।
,,,লিলি পুট বলায় ফুসে উঠলো অর্পনা, লম্বা লম্বা নখ দিয়ে দ্বীপের হাত চেপে ধরার প্রয়াস করেও ধরলোনা। নাক মুখ কুচকে বললো — আমি লিলিপুট, তাইনা? ছাড়ুন আমায়, নিজের মতো দানবী দেখে একটা বিয়ে করে নিন। তারপর তাকে এভাবে চেপে ধরে রাখুন।
,,, দ্বীপ অর্পনার চুলে নাক ঠেকিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে নাকোচ করে বললো– ওহুম, ছাড়বোনা। তোমাকেই ধরবো, কজ আই লাইক লিলিপুট।
,,, ভাই থাম, এটা হসপিটাল। একটু সুস্থ হতেই যা শুরু করে দিয়েছিস, একেবারে সুস্থ হয়ে গেলে না জানি কতো কিছু দেখতে হয়।
,,, পিছন থেকে বিহানের কন্ঠ শুনে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো দ্বীপ, ভ্রু কুচকে বললো — হোয়াটস প্রবলেম? দেখতে না চাইলে বাড়ি যা।

,,, বিহান আর মেধাকে আসতে দেখে অর্পনা দ্বীপের থেকে ছাড়া পেতে চাইলে দ্বীপ ছেড়ে দিলো। পরপর বিহানের পিছনে গুটিশুটি মেরে দাড়িয়ে থাকা মেধার দিকে তাকিয়ে কাছে আসতে ইশারা করলো। মেধা একবার বিহানের দিকে তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে বড়ো ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেলো। দ্বীপ এখনো জানেনা মেধার মুখের এই অবস্থা কেনো হয়েছে। তার এখনো সবকিছু মনে পরেনি,, প্রথম দিকে নিজের অবস্থা আর মেধার মুখের ক্ষত নিয়ে প্রশ্ন করলে অর্পনা বলেছে,, দ্বীপকে শত্রু পক্ষের লোকেরা মেরে এমন অবস্থা করেছে আর মেধার ভার্সিটি থেকে শিক্ষা সফরে যাওয়ার পথে এক্সিডেন্ট হয়েছে,, সেই এক্সিডেন্টেই মুখের একপাশ থেতলে গিয়েছে। দ্বীপ যেহেতু তার ভেলোরাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে তাই কখনোই এর বিপরীতে প্রশ্ন করেনি। মেধা কাছে আসতেই দ্বীপ মেধার সদ্য সার্জারী হওয়া গালটায় হাত ভুলিয়ে নরম স্বরে বললো — ব্যাথা করে এখনো? ডক্টর কি বললো?

,,, মেধা মাথা ঝাকিয়ে বললো — না ভাইয়া!! ডক্টর বলেছে ঠিকঠাক ঔষধ খেলে আর ব্যাথা হবেনা।
,,, দ্বীপ বোনের মাথায় আদুরে হাত ভুলিয়ে বললো — ভয় পাসনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।
,,, ভাইয়ার থেকে সাহারা পেয়ে একটু আদুরে হয়ে উঠলো মেধা,, সে ঠোট ফুলিয়ে ছল ছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — ডক্টর তো বললো, এটা পুরোপুরি ঠিক হওয়ার নয়। আমার বয়স আর এক্সিডেন্টের মধ্যকার সময়ের কারনে ক্ষত গুলো ভরাট হলেও সেলাইয়ের ক্ষত গুলো থেকেই যাবে।
,,, দ্বীপ ব্যাথিত হাসলো, সে ভাই হয়ে বোনের খেয়াল রাখতে পারেনি। শত্রু পক্ষ থেকে মার খেয়ে এতোদিন পাগল হয়েছিলো। আল্লাহ এর অসেস রহমত আর পারু পাশে না থাকলে হয়তো এখনো পাগল হয়েই থাকতো। বোনের ছল ছল করা দৃষ্টি তাকে খুব আঘাত করছে তাই আশ্বাস দেয়ার মতো করে বললো — কে বলে এসব বাজে কথা? ওসব বিশ্বাস করিসনা। আমার বোন আবার আগের মতো হয়ে যাবে,, প্রয়োজনে হাজার বার সার্জারী করাবো। যতদিন না তর মুখ আগের মতো ঠিক হবে ততোদিন পর্যন্ত আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাবো, কেমন?
,,, মেধা মাথা ঝাকালো,, ভাইয়া আগে খুব রাগি আর বদমেজাজি থাকলেও বর্তমানে খুব একটা রাগ করেনা। এই জিনিসটা মেধার কাছে খুব সস্তি দায়ক, আগের ভাইয়াকে যতটা ভয় লাগতো এখন আর তা লাগেনা।

,,,, হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে বাড়ির পথে না গিয়ে উল্টো পথে গাড়ি ছুটতেই ভ্রু কুচকালো অর্পনা,, হালকা সন্দেহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — ভাইয়া!! আমরা কোথাও যাচ্ছি?
,,,, বিহান শায় জানিয়ে বললো — Dhali food court restaurant.
,,, অর্পনা হাত ঘড়ি চেক করে দেখলো রাত ৮ টা ৫৫ মিনিট। মেধার ডক্টর দেখাতে দেখাতে দ্বীপের ঔষধের টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে। এখন বাড়ি ফিরতে ফিরতে আরও দের ঘন্টা বা তারো বেশি সময় লেগে যাবে।তার চেয়ে ব্যাটার এখান থেকে খাবার খেয়ে ঔষধ খাইয়ে বাড়িতে বেক করা। কিন্তু ওখানে তো অনেক মানুষের আনাগোনা থাকে, দ্বীপের অস্বস্তি হতে পারে ভেবেই অর্পনা বললো — ওখানে না যাই ভাইয়া? আপনার ভাই যদি অস্বস্তি ফিল করেন?
,,, বিহান স্টেয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দিলো– আপাতত দু ঘন্টার জন্য পারশোনাল্লি বুক করা হয়েছে,, এই সময়টাতে ওখানে কেউ যাচ্ছেনা। এতো চিন্তার কোনো করন নেই রিলেক্স থাকো।

,,,, অর্পনা চিন্তিত কন্ঠে বললো — কিন্তু উনাকে বাহিরে দেখে যদি মিডিয়ার লোকজন ভির করে? তখন কি করবেন?
,,,, গার্ড আছে তো, সামলে নিবে।
,,, ওকে, বাট লাস্টবার হসপিটালের সামনে যা হলো, আর বলার নয়।
,,,অর্পনাকে বিহানের সাথে বার বার কথা বলতে দেখে মনে মনে ঈর্ষান্বিত হলো দ্বীপ,, খপ করে চেপে ধরলো অর্পনার হাত,, নিজের দিকে অনেকটা টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললো — এতো দূরে বসেছো কেনো? আর বিহানের সাথে এতো কথার কি হলো? সম্পর্কে তোমার বড়ো দেবর, চুপচাপ বসে থাকো। কথা বলার হলে আমার সাথে বলো, যা জিজ্ঞেস করার আমাকে করো, আমি সব উত্তর দিচ্ছি।
,,,হাতে ব্যাথা পেলেও ঠোঁটে হাসি ফুটলো, দ্বীপের এই জেলাসি টুকু অর্পনার খুব ভালো লাগে। সে একটু প্রশ্রয় দিলো দ্বীপকে,, মুখটা দ্বীপের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বললো — তাই? বলুন তো আমরা কোথায় যাচ্ছি?Dhali food court restaurant কোথায়? এটা দেখতে কেমন? কি কি আছে ওখানে?
,,দ্বীপ কিছুটা থতমত খেলো, তার তো সবকিছু মনে পরেনি। শুধু পরিবার, বন্ধু বান্ধব, দলের কিছু ছেলেপুলে আর রমনা শহরের কিছু কিছু জায়গার কথা মনে আছে। এবার সে তার বউয়ের প্রশ্নের উত্তর দিবে কিভাবে? কিন্তু হাড়ার মতো পুরুষ তো দ্বীপ মির্জা নয়। তাই মনে মনে কৌশল খাটালো,, হুট করেই অর্পনার হাত টেনে কোলের উপর বসিয়ে দিলো ,, হঠাৎ কান্ডে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো অর্পনা। দ্বীপ সেসবকে পাত্তা না দিয়ে বিহানের উদ্দেশ্যে বললো — বিহান!! তুই আপাতত তর নজরটা বউ আর রোডের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখ, মিরর কিংবা পিছনে তাকালে পিঠের ছাল না থাকার আশংকা প্রবল।
,,,বিহান ঠোঁট টিপে হেসে মাথা ঝাকালো,, সে তো তার বউকে ছেড়ে রাস্তা দেখারি সময় পায়না আবার পিছনে তাকাবে কি করে? দ্বীপ এক হাতে অর্পনার কোমর চেপে ওর দিকে ঝুকে চোখে চোখ রাখলো ভরকে গেলো অর্পনা। সে একটা প্রশ্ন করলো আর লোকটা কিনা কথা ঘুরাতে এখন ছলাকলা করছে? কিন্তু সে তো এসবে ভুলবেনা তাই ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো —

,,, ছলনা করে লাভ নেই, বলুন কি আছে?
,,,দ্বীপ ঠোঁট কামরে হেসে অর্পনার মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে চুলের ভাজে হাত গলিয়ে দিলো। এতোক্ষণে তার গুগল সার্চ দেওয়া ডান। উঁকি দিয়ে লেখাটা পড়ে নিয়ে বললো — এইতো সামনেই রেস্টুরেন্ট টা। আর মিনিট খানিকের মাঝেই পৌছে যাবো। সেখানে একই জায়গায় ২০-২৫ টা ভিন্ন ভিন্ন খাবারের দোকান পাওয়া যায় ,, সেই দোকান গুলো আলাদা আলাদা মালিকাধিন হলেও ডাইনার রা সব একসাথেই খাবার খায়। এম আই রাইট বউ?
,,, দ্বীপের থেকে সঠিক জবাব পেয়ে অর্পনার মুখটা চুপসে গেলো। সে ভেবেছিলো দ্বীপের বোধয় মনে পরবেনা, তাও ভালো, এভাবে মনে পরতে পরতে একদিন সব মনে পরে যাবে। ভাবনার মাঝেই মেইল পারফিউমের তিব্র ঘ্রান নাকে ঠেকলো সাথে সাথে সেই ঘ্রাণ আটকে গেলো অর্পনা। দ্বীপের শার্টের খোলা বোতামের ফাকে নাক ঠেকিয়ে গভীর শ্বাস টানতেই দ্বীপ দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অর্পনাকে। দুজনেরি চোখ বন্ধ, হয়তো একে অপরকে অনুভব করতে ব্যাস্ত।

১৫ দিন পর,,, সময়টা সকাল ৯ টা ২১।
,,, গোসল সেরে ওয়াসরুম থেকে বের হলো অর্পনা। খাওয়া দাওয়া শেষ করে দ্বীপকে ঔষধ খাইয়ে তাকে ভার্সিটি যেতে হবে। তাই তারাহুরো করে চুল মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়ালো। মাথায় চিরুনি চালাতে নিতেই পিছন থেকে ধেয়ে এলো গম্ভীর স্বর,,
,,, ভিজে চুল আচড়াবেনা, চুলের গোড়ায় ব্যাথা করবে। আসো এদিকে, হেয়ার ড্রায়ার থাকতেও তোমার এই খামখেয়ালি ভালো লাগেনা ভেলোরা। কাম ফাস্ট।
,,, দ্বীপের ধমকে রাগ হলো অর্পনার। নিজে দোষ করে এখন আবার তাকে বকাঝকা করা হচ্ছে,, প্রতিটা দিন সকাল ৮ টা পযন্ত পরে পরে ঘুমাবে আবার অর্পনাকেও উঠতে দিবেনা। ভার্সিটিতে দেরি হওয়ার কথা বললে জেদ দেখিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে রেখে ঘুমু কন্ঠে শাসিয়ে বলবে,, হাসবেন্ড আগে নাকি ভার্সিটি আগে? এর বিপরীতে অর্পনা কিছুই বলতে পারেনা, অগত্যাই পরে থাকতে হয় দ্বীপের বুকে। এভাবেই যাচ্ছে দিনকাল, প্রতিটা দিন ভার্সিটি যেতে দেরি হয় আর বন্ধু বান্ধবের থেকে পচানি খেতে হয়। নিজে যে এতো এতো খামখেয়ালি করে বেড়ায় তাতে কোনো দোষ নেই, এখন অর্পনা ভিজা চুলে ভার্সিটিতে গেলেই সব খামখেয়ালি হয়ে যায়। বদমাশ লোক একটা,, যা করার করে নিক, আজ এই লোকের কথা কানেই তুলবেনা অর্পনা,, আর না চুল শুকাবে। এই ভিজা চুল নিয়েই আজ সারাদিন ভার্সিটিতে ঘুরাঘুরি করবে সে।

,,,অর্পনার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মেজাজ খারাপ হলো দ্বীপের। এটুকু হাফ ফুটের এতো দেমাগ সহ্য করার নয়। নাহয় সকালে একটু দেরিতেই ছেড়েছে তার জন্য এমন করতে হবে কেনো? এগিয়ে এসে অর্পনার কোমর পেচিয়ে কোলে তুলে নিলো দ্বীপ , অর্পনা গাল ফুলিয়ে দ্বীপের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু শক্ত পোক্ত বাধন থেকে এক চুল পরিমান ও ছাড়া পেলোনা। অগত্যা দ্বীপের কলার চেপে ধরে জেদি কন্ঠে বললো — ছাড়ুন,, আমি চুল শুকাবোনা। প্রতিটা দিন আপনার জন্য লেইট হয়ে যায়,,, ছাড়ুন বলছি,, ছাড়ুন।
,, ওর লাফালাফিকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না দ্বীপ,, সে নিজের মতো এগিয়ে গিয়ে বেডের কর্নারে বসলো, সেখানে আগে থেকেই হেয়ার ড্রায়ার সেইট করা ছিলো। অর্পনাকে কোলের উপর বসিয়ে শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে চুলের ভাজে ভাজে হেয়ার ড্রায়ার চালাতে চালাতে বললো — কিছু হলেই ছাড়ুন আর ছাড়ুন। একদিন এমন ভাবে চেপে ধরবো, এই ছাড়ুন ছাড়ুন একেবারে মিটে যাবে।
,,, কিছু বললো না অর্পনা, সে গাল ফুলিয়ে দ্বীপের গলা জড়িয়ে বসে রইলো। এই মুহুর্তে ছটফট করলে আবারও ধমক খেতে হবে। অর্পনা ইদানীং নিজের স্বভাবের পরিবর্তন দেখতে পায়,, যেই মেয়েটা পাপ্পা ব্যাতিত অন্য কারোর সামনে আদুরে হয়ে উঠেনি,, সেই মেয়েটা এখন এই দ্বীপ মির্জার সাথে টুটাল্লি নেকামি করে। এগুলো কি হচ্ছে তার সাথে? স্বভাবের এতোটা পরিবর্তন আনা কি আদেও ঠিক হচ্ছে? কোনো একদিন এসব ভেঙে যাবেনাতো? অর্পনা গভীর ভাবনার মাঝেই খেয়াল করলো দ্বীপের চুল ভিজা। এই লোক গোসল করেছে আধা ঘন্টা পেরিয়ে যাচ্ছে এখনো চুল ভিজা। নিজে হেয়ার ড্রায়ার ইউজ না করে তাকে জ্ঞান দিচ্ছে। অর্পনা দ্বীপের চুল এলোমেলো করে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো —

,,, নিজের চুল এখোনো ভিজা কেনো? সেই কখন গোসল করেছে,, এখনো চুল শুকানোর সময় পায়নি?
,,, দ্বীপ মুখটা গুমরা করে অর্পনার চুল গুলো দুহাতে ঝেড়ে দিয়ে বললো– তুমি শুকিয়ে দিবে বলে এখনো ভিজিয়ে রেখেছি। কিন্তু তোমার তো সময় ই নেই, আর না আমাট কোনো মুল্য আছে তোমার কাছে
,,, মুখ বাকালো অর্পনা,, এই লোকের জন্য পড়া লেখার গুষ্টির তুষ্টি করে প্রতিদিন দুটো ক্লাস করেই বাড়ি ফিরে আসে। আর এখন কিনা তাকে এসব বলা হচ্ছে? এই লোক কি জানে, তার জীবনে দ্বীপ মির্জার মুল্য ঠিক কতখানি? ওহুম জানেনা। আর জানেনা বলেই এরকম কথা বলতে পারলো। এই লোক যদি জানতো, উনার জন্য অর্পনা তার পাপ্পা, নিজের বাড়ি ঘর, শখের গিটার, সব ছেড়ে এখানে পরে আছে তাহলে এরকম কথা বলতে পারতোনা। অর্পনা দ্বীপের হাত থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা নিয়ে দ্বীপের চুল শুকানোর কাজে লেগে পরলো। তাদের বন্ডিং দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে তারা একে অপরের সাথে ঠিক কতোখানি কমফোর্টেবল। কতোটা সুখে আছে দুজন,, আর এই সুখ টুকুই অর্পনার মনে ভয়ের সৃষ্টি করে। তার কপালে তো সুখ সয়না,, কোনো না কোনো ঝড় এসে সবটা এলোমেলো করে দেয়।

,,,মাঝে কেটেছে আরও ১৫ দিন, সময়টা রাত ৭ টা বেজে ২৫ মিনিট।
,,, মুখ হাত ধুয়ে মিররের সামনে দাড়ালো অর্পনা। আগে ঘরে ড্রেসিং টেবিল না থাকলেও অর্পনার জন্য আনা হয়েছিলো, তাতে সাজানো আছে অর্পনার সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস। হাটু সমান চুল গুলো চিরুনি দিয়ে আচড়ে খোপা করে নিলো,, পরনে ট্রাউজার আর লং টিশার্ট। বাহিরে গাউন, কুর্তি, চুরিদার পরে গেলেও বাড়িতে সে এমন পোশাকেই থাকে। সারাজীবন যেভাবে চলাফেরা করেছে, হুট করেইতো সেসব চেন্জ করা যায়না। আবার বাড়িতে এসব পরা নিয়ে দ্বীপ ও কোনো রকম দ্বীমত করেনি। তাই এভাবেই থাকা হয়। চুল খোপা করা শেষ হলে ড্রেসিঙের ড্রয়ার থেকে চিকন ফ্রেমের চসমাটা বের করে নিলো,, পড়তে বসার ক্ষেত্রে এটা ইউজ করতে হয়। নয়তো একাধারে পড়তে পড়তে চোখে ব্যাথা হয়ে যায়। চসমাটা চোখে এটে পিছন ঘুরতে নিবে তখনি একটা শক্ত পোক্ত হাত ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো,, চমকে উঠলো অর্পনা,, ওর চমকানোর মাঝেই হাত বাড়িয়ে খোপা করা চুলগুলো ছেড়ে দিলো দ্বীপ। পরপর সেগুলো কাধ থেকে সরিয়ে গলায় মুখ ডুবালো। অযাচিত স্পর্শে কেপে উঠলো অর্পনা, আজকে দ্বীপের স্পর্শটা অন্যরকম,, বড্ড অচেনা ঠেকছে। কাধে দ্বীপের গভীর স্পর্শ টের পেতেই হাসফাস করে উঠলো অর্পনা, শ্বাস ভারি হয়ে আসছে সাথে হৃদপিণ্ডটা তিব্র গতিতে লাফাচ্ছে। তিব্র লজ্জা সংকোচে দ্বীপের থেকে ছাড়া পেতে চাইলো অর্পনা, ওকে দূরে সরতে দেখে কোলে তুলে নিয়ে ধপ করে বিছানায় ফেলে ওর উপরে আদশোয়া হয়ে শুয়ে পরলো দ্বীপ। অর্পনা কাপা কাপা নজরে দ্বীপের দিকে তাকালো,, দ্বীপের চোখের ভাষা অন্যরকম, কেমন নেশাক্ত নেশাক্ত ঠেকছে। আজকের আগে দ্বীপের চোখে এমন ভাষা সে কখনো দেখেনি,, তাহলে, আজ কি এমন হলো যে লোকটা এভাবে তাকিয়ে আছে। দ্বিধান্বিত অর্পনা কাপা কাপা কন্ঠে বললো —

,,, কি করছেন? আপনি অসুস্থ।
,,, দ্বীপ মাদকিয় কন্ঠে সুধালো — নো বেইব, আ’ম ফিট এন্ড ফাইন।
,,,দ্বীপের এরকম ডিপ বয়েজ কর্নকূহর হতেই অর্পনার সর্বত্র কেপে উঠলো,, লোকটার কন্ঠ স্বর এমনি গম্ভীর, এই মুহুর্তে যেনো একদম ভারি শুনালো। অর্পনা ঢোক গিলে বললো — বাট,আ’ম নট ফাইন। প্লিজ লিভ!!
,,, দ্বীপ কিছুই বললো না, একটু সরলো ও না। সেভাবেই পরে থেকে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইলো, এই দৃষ্টিতে দিক হাড়াচ্ছে অর্পনা। আজ বোধয় একটা সর্বনাশ হয়েই যাবে। বিছানায় ধপ করে ফেলার দরুন অর্পনার সামনের ছোট ছোট চুলগুলো কপালে, চোখে উপচে পরেছে,, দ্বীপ ফু দিয়ে সেসব সরিয়ে দিলো। আবেশে চোখ বন্ধ করে দ্বীপের পরনের শার্ট খামচে ধরলো অর্পনা। চোখ বুঝার সাথে সাথে মাথায় একটা কথা খেলে গেলো।

দ্বীপ জানে সে পারু, এবং মনে মনে মানেও। তারমানে দ্বীপ তার পারুকে কাছে চাইছে,, গভীর ভাবে ভালোবাসতে চাইছে। কিন্তু সে তো পারু নয়, সে তো অর্পনা। এই মুহুর্তে দ্বীপের আবদার শায় দেওয়া মানে দ্বীপকে ঠকানো সাথে নিজের আত্মসম্মানকে বিলিয়ে দেওয়া। নাহ!! এটা সম্ভব না। অর্পনার আর কিছু থাকুক আর না থাকুক আত্মসম্মান আছে। নিজের স্ট্রং পারসোনালিটিকে এভাবে আবেগের বসে মাটি চাপা দেওয়ার মতো মেয়ে তো অর্পনা নয়। বরং সে নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করতে রাজা, রাজত্ব এমনকি পুরো দুনিয়া ছেড়ে দিতেও রাজি। দ্বীপ তো এখন প্রায় ৭৫% সুস্থ। এই মুহুর্তে সত্যিটা বললে নিশ্চয়ই কোনো ক্ষতি হবেনা? হলেও বা কি? এতো বড়ো কাজটা সে করতে পারবেনা। হঠাৎই ঠোঁটের কোনে শক্ত পোক্ত আঙুলের স্পর্শ পেলো, শিউরে উঠে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। দ্বীপের এই মোহিত নজর বার বার তাকে ভুল করার পরামর্শ দিচ্ছে কিন্তু অর্পনা নিজের মনে স্ট্রিক্ট। দ্বীপ অর্পনার ঠোটে আঙুল ভুলিয়ে মাথা নিচু করতেই হাত দিয়ে আটকে দিলো অর্পনা। তারাহুরো করে বললো — আ’ম নট পারু। আমি অর্পনা, পৃথা জামান অর্পনা। পারু মারা গিয়েছিলো, ছয় বছর আগে। মনে করে দেখুন দ্বীপ, আপনি তো আগের অনেক কিছু মনে করতে পেরেছেন, নিজের ফ্যামিলিকে চিনতে পেরেছেন। এবার একটু চেষ্টা করে দেখুন চাইলেই সব মনে করতে পারবেন।

,,,থমকে গেলো দ্বীপ, ভ্রু কুচকে অর্পনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ নজর গেলো অর্পনার ঠোটে,, পারুর ঠোঁটের নিচে তিল ছিলো আর অর্পনার ঠোটের মাঝখানে। ঠোটের সেইপটাও আলাদা,, দ্বীপ ব্রেইনে চাপ প্রয়োগ করলো, মনে করতে চাইলো। অর্পনা ওকে হেল্প করতে বললো — মনে করার ট্রাই করুন, পারুর ক্যান্সার হলো, আপনারা হসপিটাল থেকে লাইব্রারি গেলেন। ওখানে ডাইরি লিখতে গিয়ে পারু অসুস্থ হয়ে পরলো। তারপর আপনারা আবার হসপিটালের উদ্দেশ্যে রউনা হলেন, হঠাৎ একটা ট্রাক এলো আর তিব্র এক্সিডে,,

,,,আর বলতে পারলোনা অর্পনা, তার আগেই মাথা চেপে ধরলো দ্বীপ। মান্সপটে ভেসে উঠলো কিছু আবছা দৃশ্য। ধীরে ধীরে সব স্পট হলো, পারুর ক্যান্সার থেকে শুরু করে লাস্টবার পারুর কবরের মাটি সরানোর চেষ্টা করা পর্যন্ত, সবটা। ঢোক গিলে উঠে দাড়ালো দ্বীপ, এতোদিন পারুকে কাছে পেয়ে পারুর সম্পর্কে কিছু মনে করার ট্রাই করেনি সে। আজ ট্রাই করতেই সবটা মনে পরে গেলো। সে আগ পিছ না ভেবেই তারাহুরো করে উঠ বসলো,, কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে ছুটে রুমের বাহিরে চলে গেলো। দ্বীপ চলে যেতেই ব্যাথিত হাসলো অর্পনা, চোখের কোনা বেয়ে এক ফোটা তপ্ত জল গড়ালো। এটা তো হওয়ারি ছিলো, তাহলে কষ্ট হচ্ছে কেনো? অর্পনার মন কি চেয়েছিলো, দ্বীপ ওর পরিচয় জেনেও ওকে ভালোবাসার সাগরে ডুবিয়ে দিক। তাচ্ছিল্য হাসলো অর্পনা, মনকে অভিযোগ করার সুযোগ না দিয়ে উঠে বসলো। পরপর উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে বিহানের ফোনে কল দিলো। ওপাশ থেকে কল ধরতেই অর্পনা বললো —

,,,ভাইয়া কি ঘরে আছেন? আপনার ভাই বোধহয় জয়পুরহাট যাচ্ছেন। মাত্রই নিচের দিকে গেলো, আপনিও একটু উনার সাথে যাবেন? আসলে পুরোপুরি সুস্থ হয়নিতো? রাস্তা ঘাট চিনবেন না, আবার অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পারুর কবরে গেলে পাগলামি ও করতে পারে।
,, ওপাশ থেকে উত্তর আসার অপেক্ষা না করেই কল কেটে দিলো অর্পনা। সে জানে বিহান যাবে, দ্বীপের সাথে যাবেই। অর্পনা ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে নিজেও বিছানায় শুয়ে পরলো। পাশ থেকে এসির রিমোট টা নিয়ে এসির পাওয়ার ৫° তাপমাত্রায় নামিয়ে দিলো। এটুকু তার শাস্তি, অতিরিক্ত আশা করার শাস্তি। সে কেনো ভুলে গেলো? ওর মতো অভদ্র অর্পনাকে ভালোবাসা যায়না, সবাই তো পারুর মতো ভদ্র, স্নিগ্ধ, শান্ত মেয়েকে বউ হিসেবে চায়।

,,,,রাত তখন ১টা ৪৫
,,, একজন গার্ড এসে লোহার গেইট খুলে দিতেই কবরস্থানের মাঝামাঝি কবরটায় নজর আটকালো দ্বীপের। শত শত কবরের মাঝে একটি কবরে গটা করে লাইট জ্বলছে, কবরটির মাথায় নানান রকমের ফুল ফুটে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে কোনো নামি দামি লোকের প্রান প্রিয় কেউ শায়িত আছে এখানে। দ্বীপ ভঙ্গুর পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে,, প্রতিটি কদমে তার বক্ষ পাজর ভেঙে আসছে। কবরটির শান বাধানো, পায়ের নিকট শুনিপুন ভাবে লিখা,,, নাম: পারমিতা মির্জা,, স্বামি : দ্বীপ জোহান মির্জা,,, বাবা : হামিদ হোসেন,, মৃত্যুর তারিখ : ২-০৮-২০১৯।
বিদ্ধস্ত দ্বীপ পায়ের কাছে বসে নামটুকুতে হাত ভুলালো,, পরপর স্বামী : দ্বীপ জোহান মির্জা লেখাটিতে হাত ছোয়ালো। নিজেকে পারুর স্বামী পরিচয় দিতেই নিজের উপর আক্রোশ হয় দ্বীপের,, স্বামী হয়েও স্বামির কোন দায়িত্ব টা পালন করতে পেরেছে সে? নাহ!! পারেনি, কোনো কিছুই করতে পারেনি, এমনকি শেষ কার্য টুকু ও নিজ হাতে করতে পারেনি,, প্রান প্রিয় স্ত্রীর কবরে এক মুঠো মাটি দিতে পারেনি। দ্বীপ সন্তর্পণে পারুর কবের পাশে বসলো, মাথা নুইয়ে কবরের মাথার দিকটায় চুমু খেলো। আদরে আদরে ভরিয়ে দিলো কবরখানা, যেনো সে তার ওয়েলি লেডিকে আদর করছে। চুমু দিতে গিয়ে যখন কবরের মাটিতে নাক ঠেকালো তখন একটা মিষ্টি ঘ্রাণ এসে নাকে ঠেকলো। দ্বীপের খুব করে মনে পরলো, পারুর বলা একটি কথা,, তুমি আমার কবরে নাক ঠেকালেই আমাকে পাবে। আজ পেলো, সত্যি ই পেলো। দ্বীপ জানেনা এটা পারুর শরীরের ঘ্রাণ নাকি সোদা মাটি কিংবা নানান জাতের ফুলের ঘ্রান। মুলত, সে জানতেও চায়না,, তার পারু যখন বলেছে সে কবরে নাক ঠেকালেই পারুকে পাবে তারমানে এটা পারুর ঘ্রান, শুধুই পারুর। দ্বীপ কবরে মুখ ঠেকিয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললো —

,,, কেমন আছো মাই ওয়েলি লেডি, আমার অবাধ্য প্রেমিকা। তোমার খারাপ পুরুষকে মনে পরে জান? আমায় অনুভব করো নাকি ওপারে গিয়ে আমায় ভুলে গিয়েছো? তোমার পিছু পিছু যাবো প্রতিশ্রুতি দিয়েও যাইনি বলে অভিমান করেছো? কি করবো বলো? আল্লাহ যে আমায় নিলেন না,, তোমার সাথে যেতে পারলামনা। আর না পারলাম তোমায় নিজ হাতে কবরে সায়িত করতে।
,,,, বলতে বলতে কন্ঠ ভেঙে এলো, চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো। পরোক্ষনেই কিছু একটা মনে আসতেই মাথায় রাগ তিরবিরিয়ে উঠলো, হাত মুষ্টি বদ্ধ করে জেদি কন্ঠে বললো —
,,,,সেদিন যদি আমার এক্সিডেন্ট না হতো তাহলে তোমার কবরে আমি মাটি দিতে পারতাম জান,, তোমায় নিজ হাতে গোসল দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে আল্লাহর এর ভরসায় কবরে সায়িত করতে পারতাম। কিন্তু হলোনা,, কয়েকটা জা*নোয়ারের জন্য হলোনা। আই নো, তুই কিছুই দেখবিনা, হয়তো তুই আল্লাহ এর নিকট খুব সুখে আছিস কিন্তু আমার সুখ নেই। আমি তর সাথে বাচতে পারিনি, মরতেও পারিনি। ঐ কু*ত্তার বাচ্চাদের জন্য তর কবরে এক মুষ্টি মাটিও দিতে পারিনি,, তর নামে এক ওয়াক্ত নামাজ পরতে পারনি, দুহাত তুলে দোয়া করতে পারিনি। আমার খুব আফসোস হচ্ছে সোনা, খুব আফসোস হচ্ছে। মন চাচ্ছে এই মুহুর্তে ঐ কুত্তার বাচ্চাদের ধর থেকে মুন্ডু টা আলাদা করে দেই। ইউ নো না সোনা? তর খারাপ পুরুষ কতটা খারাপ? ছিড়ে কেটে ছিন্ন ভিন্ন করে দিবো ঐ জানোয়ারদের , যেমন করে ওদের কারনে আমার বোনের মুখটা ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে। মেধাটা ভালো নেই জানো? শত চেষ্টা করেও ওর মুখটা আগের মতো করার উপায় নেই। বোনটাকে দেখলেই আমার বুক ফাটে।

,,,, দ্বীপের কান্নারত কথাগুলো শুনে বিহানের খুব মন খারাপ হলো। পারুকে সেও খুব মিস করে, সাথে তাদের একসাথে কাটানো মুহুর্তগুলো। বিহান এগিয়ে এসে দ্বীপের কাধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো —
,,,এখন কি করবি জোহান? কি করতে চাস?
,,, দ্বীপ পারুর কমরের মাটিতে হাত ভুলিয়ে বললো — দুটোদিন থাকবো এখানে, বাড়িতে জানিয়ে দিস। আর কবরস্থানকে চারদিকে যেসব জমিজমা আছে, সেসব জমির মালিকদের ইনফর্ম কর। এখানকার সবকয়টা জমি আমার চাই। হিসেব মতো প্রতি বিঘার দাম যত আসে, তার চেয়ে কয়েক গুন বেশি টাকা অফার কর। এর পরেও রাজি না হলে ঢাকায় একটা একটা ফ্লাট কিনে দেওয়ার অফার কর। এট এনি কস্ট, আমার এই জমি গুলো চাই মানে চাই এবং সেটা কাল সকালের মধ্যেই।
,,,বিহান অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো,, এটা সেই জোহান!! জেদি, একরোখা, হিংস্র, যে কিনা কাউকে পরোয়া করতোনা এমনকি মৃত্যুকেও না। সেই দ্বীপ জোহান মির্জাকে দেখতে পাচ্ছে সে। মনপুটে আনন্দ আর চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো। এবার বোধয় সবটা ঠিক হতে যাচ্ছে। বিহানকে এরকম থম মেরে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ ধমকের স্বরে বললো–

,,, হেই!! আমি তর বউ না। এভাবে দেখার হলে মির্জা বাড়ি যা।
,,, দ্বীপের ধমকেও হেসে দিলো বিহান,, পরপর কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — এতো জমি দিয়ে কি করবি ভাই? বুঝিয়ে বল।
,,, ডানপাশে একটা অনাথ আশ্রম, বামপাশে বৃদ্ধাশ্রম,,পিছন দিকে মাদ্রাসা আর মসজিদ। আর এই কবরস্থান পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে দে,, সবকয়টার নাম হবে আমার পারুর নামে। আগে থেকে যেসব কবর আছে সেগুলোর সান বাধাই করে দেওয়ার ব্যবস্থা কর। এই কবরস্থানের বেক আপ হিসেবে রোড সাইডের আরেকটা জমি কিনে সেটা নতুন কবরস্থান হিসেবে ঘোষণা করে, এখানকার চেয়ারম্যানের হাতে বুঝিয়ে দিবি। আপাতত এটুকুই, এরপর যদি কিছু লাগে আমি জানাবো। এবার যাহ, বের হো এখান থেকে।

,,, বিহান মাথা ঝাকালো,, তখনি পিছন থেকে আরও একটা গাড়ি আসার শব্দ শুনা গেলো, নিশ্চয়ই আহাদরা চলে এসেছে। আসার পথেই দ্বীপ ওকে বলেছিলো যেনো সবাইকে এখানে ডেকে পাঠায়,, অনেক কাজ আছে। বিহান এতোক্ষণে বুঝলো দ্বীপ কোন কাজের কথা বলেছে। মনে মনে বেশ খুশি হলো বিহান,, কবরের পাশে মসজিদ মাদ্রাসা থাকলে নাকি কবরের সায়িত ব্যাক্তির আজাব লাঘব হয়। মাদ্রাসার ছাত্র কিংবা হুজুর গন যখন কোরআান তেলোয়াত করে তখন কবরে শায়িত ব্যাক্তির মনে শান্তি বিরাজ করে। দ্বীপের দ্বারাই বোধয় এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। পারুর প্রতি দ্বীপের ভালোবাসা দেখে বরাবরি মুগ্ধ হয় বিহান। শাহজাহান মমতাজকে ভালোবেসে তাজ-মহল বানিয়েছিলো আর দ্বীপ তার পারুকে ভালোবেসে মসজিদ, মদ্রাসা, আশ্রম বানাবে। বিহান ঠোঁটে সন্তুষ্টর হাসি ফুটিয়ে আবদার ভরা কন্ঠে বললো — আমি তর সাথে থাকি?

,,, দ্বীপ বিহানের হাতখানা শক্ত করে ধরে বললো — চলে যা, আজ রাতটা পারুর সাথে একা থাকতে চাই। খুব কথা বলবো দুজন,, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিবো আমার পারুর কবর খানা। তরা যাহ!! কাজে লেগে পর, কাজ শেষ করে আমাকে শিগ্রই ঢাকা ফিরতে হবে। তারপর ওরা জানবে, সিংহ ঘুমিয়ে থাকুক কিংবা জেগে,, সে বরাবরি রাজা।
,,, বিহান আর কথা বাড়ালো না, উল্টো ঘুরে গেইটের দিকে চলে গেলো। তাদের এখন অনেক কাজ আছে,, সবাইকে নিয়ে কাজে লেগে পরতে হবে। যেহেতু মসজিদ মাদ্রাসা বানানো হবে, সেহেতু ইন্জিনিয়ার, কন্স্টাকশনের লোকজনকেও খবর দিতে হবে। দ্বীপ নিশ্চয়ই সবকিছু ফাইনাল করে তারপর ঢাকা ফিরবে। বিহান কবরস্থান থেকে বেড়িয়ে যেতেই দ্বীপ নিজের কথা না ভেবে কবরটা জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরলো। তার বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে,, আজ পারু আর দ্বীপের মাঝে কতটা দূরত্ব, এই দূরত্ব কাটয়ে কেউ কাউকে দেখতে পাবেনা,, ছুতে পারবেনা। দ্বীপ ফুপিয়ে উঠলো, নাক টানতে টানতে ভাঙা কন্ঠে বললো,,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৯

,,,তোমার নরম কাতর হাত,,
আমার দিনের মতো রাত,
,,তুমি ঝিনুক কুড়াও যদি,,
আমি হবো শান্ত নদী,,
,,আমার আসার সময় হলে,,
তুমি হাত ফসকে গেলে,,
,,তোমার যাওয়ার পায়তারায়
আমি হইযে দিশে হারা,,
,,,তুমি অন্য গ্রহের চাদ,,
আমার একলা থাকার ছাদ,,
,,তোমার ফেরার সম্ভাবনা,,
অমাবস্যায় জোছনা,,
তোমার গোপন সবি রয়,
আমার আপন মনে হয়,,
আমি ভোরের ঝড়া পাতা,,
আমার মরার কিসের ভয়?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩০ (২)