Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮
রুপান্জলি

রং-তুলি হাতে নিয়ে ক্যানভাসে একের পর এক আঁচড় কেটে যাচ্ছে ইরাদ, অথচ ক্যানভাসে তার মন নেই। কী আঁকছে, কেন আঁকছে কিছু জানে না। সে শুধু জানে, সিদ্ধার্থ তাকে ঠকিয়েছে। বারবার, একটার পর একটা কাজের মাধ্যমে ঠকিয়ে গিয়েছে। সে যদি অনন্যাকেই ভালোবাসবে, তাহলে দুদিন আগে ওর এতটা কাছে কেন এসেছিল? কেন বলেছিল, “” আই লাভ ইউ, মাই লাভ?”” আর ওই ছোঁয়াটা? কেন ছুঁয়েছিল ওকে? সিদ্ধার্থ ওকে পাওয়ার জন্য হাজারটা অন্যায় করুক, সেটা গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য কাউকে স্পর্শ করবে— এটা কি আদৌ মেনে নেওয়া সম্ভব? সিদ্ধার্থকে চরিত্রহীনের তকমা দিতে বড্ড ইচ্ছা করছে তার। মন চাইছে, এই ক্যানভাসটার মতো করেই একটার পর একটা আঁচড়ে সিদ্ধার্থকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে।
,,, ইরাদের আঁকিবুঁকির মাঝেই হুট করে মেইন দরজা খোলার শব্দ হলো। মুহূর্তেই ভাবনার ডোর কাটল রমনির। সে একবার বাইরে তাকিয়ে ক্যানভাসে চোখ রাখতেই কেমন থমকে গেল। হাত দুটো অসাড় হয়ে এলো। দু-একবার কেঁপে উঠল দেহখানি। চোখ ছলছল করে আবারও পানিতে টইটম্বুর হলো। হাতে থাকা ছোট ছোট তুলিগুলো ফ্লোরে পড়ে যেতেই ইরাদের চোখ থেকে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। তখনই পিছনে এসে দাঁড়াল কেউ। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আওড়াল — এত সুনিপুণভাবে আমার চোখ! স্বেচ্ছায় এঁকেছেন, নাকি আনমনে?

,,, আকস্মিক অতিপরিচিত কণ্ঠস্বর কর্ণকুহর ভেদ করতেই ছিটকে দূরে সরে গেল ইরাদ। সিদ্ধার্থকে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কী মনে করে যেন পাশে রাখা রঙের ঝাঁড়টা তুলে ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিতে চাইল, যেন সদ্য আঁকা সিদ্ধার্থের চোখটা রঙের মাঝে ধামাচাপা পড়ে যায়। অথচ সফল হলো না মেয়েটা। সিদ্ধার্থ আটকে দিয়ে রঙের ঝাঁড়টি টেনে নিতেই সব রং ছিটকে দুজনের চোখ-মুখে, গলায়, কাঁধে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই সিদ্ধার্থের কাণ্ডে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল ইরাদ, অথচ সিদ্ধার্থ তা আমলে নিল না। রঙের ঝাঁড়টা শব্দ করে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে ইরাদের কনুই চেপে নিজের একদম কাছে নিয়ে এলো। এরূপ কাণ্ডে ফুঁসে উঠল রমনি। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল— এখানে কী করছেন আপনি? এখানে আসার অনুমতি কে দিয়েছে আপনাকে? চাবি কোথায় পেয়েছেন?
,,, সিদ্ধার্থ বোধহয় কথা সাজিয়েই রেখেছিল। সে অকপটেই বলে ফেলল — এটা আমার ফুপার বাড়ি। যখন-তখন আসার অধিকার রয়েছে আমার।

,,, ইরাদের ক্ষিপ্ত চোখজোড়া এবার নত হয়ে এলো। সত্যিই তো, এটা সিদ্ধার্থের ফুপার বাড়ি। তার এখানে আসার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এই মুহূর্তে চাইলেই ইরাদ ওকে চলে যেতে বলতে পারবে না, তবে নিজে তো চলে যেতে পারবে, তাই না? ভেবেই সিদ্ধার্থের কাছ থেকে ছাড়া পেতে চাইল। মুহূর্তেই আরও শক্ত করে চেপে ধরল সিদ্ধার্থ। দৃঢ় কণ্ঠে শুধাল — আপনি আমাকে ভালোবাসেন, ইরাদ!
,,, ইরাদ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে হিসহিসানো কণ্ঠে আওড়াল — মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার? আপনাকে কোন ভিত্তিতে ভালোবাসব আমি? আপনার প্রতি নাফরাত ব্যতীত কিছুই নেই আমার অন্তরে।

,,, সিদ্ধার্থ কেমন করে যেন হাসল, যেন ইরাদের কথা বিশ্বাসই করেনি। সে ইরাদের চোখে চোখ রেখে ফের দৃঢ় কণ্ঠে শুধাল — সিরিয়াসলি, ইরাদ! তাহলে এই ক্যানভাসে আমার ছবি কেন? আমাকে আর অনন্যাকে একসাথে দেখে ভুল বুঝে এখানে চলে এলেন কেন? আর আপনার চোখের পানি! এগুলো কেন ঝরছে?
,,, ইরাদ হুট করেই কেমন স্থির হয়ে গেল। চোখ ভরে উঠল অভিমানের বর্ষণে। নাক টেনে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কণ্ঠে তীব্র অভিমান মিশ্রিত করে আওড়াল — ভুল বুঝব কেন? যা বুঝেছি, ঠিকই বুঝেছি। আর এতে ভুলেরই বা কী আছে? ফিয়ন্সির সাথে একান্তে সময় কাটানোটা কি খারাপ? করতেই পারেন।
,,, সিদ্ধার্থ ইরাদের কনুই ছেড়ে এবার গাল আঁকড়ে ধরল। জোরপূর্বক মুখখানি সোজা করে ফের চোখে চোখ রেখে শুধাল — সত্যিই করতে পারি? আপনার কিছু আসবে-যাবে না? একটু-ও কষ্ট হবে না? অন্তর পুড়বে না?
,,,, এই পর্যায়ে ইরাদের চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়াল। মেয়েটা নিজের অনুভূতি লুকাতে আবারও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গাল থেকে সিদ্ধার্থের শক্তপোক্ত হাত দুটো সরিয়ে বলল — জানি না! আপনার সাথে কথা বাড়ানোর মিনিমাম ইচ্ছাটুকুও আমার নেই। এটা যখন আপনার ফুপার বাড়ি, আপনি থাকুন। আমি চলে যাচ্ছি।

,,,, বলেই দুপা বাড়াতেই সিদ্ধার্থ ইরাদের কোমর পেঁচিয়ে ধরে এক ঝটকায় ক্যানভাস টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। ছিমছাম গড়নের ইরাদ আকস্মিক কাণ্ডে কোমরের ব্যথায় ” মাহ ” বলে ককিয়ে উঠল। পাত্তা দিল না সিদ্ধার্থ। ইরাদের দুপাশে দুহাত রেখে পুরোপুরি নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। ইরাদ ভয় আর ব্যথায় সমানে হাঁপাচ্ছে। সিদ্ধার্থের নিঃশ্বাসের গতিও প্রখর হয়েছে কিছুটা। এসির মাঝেও দরদর করে ঘামছে দুজন। সিদ্ধার্থ ঝুঁকে এসে ইরাদের গালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে ঝরে পড়া পানিটুকু শুষে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— আমার আছে… অনেক কথা বলার আছে, ইরাদ! আমাকে একটু বিশ্বাস করুন। একটা সুযোগ দিন, প্লিজ।
,,, সিদ্ধার্থের স্পর্শে অনুভূতির তাপদাহে কেঁপে উঠল ইরাদ। কিন্তু সিডকে বুঝতে দিল না। উল্টো মানবের বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলল — সরুন! আমি কিছু শুনতে চাই না।
,,, ইরাদের ধাক্কায় দুপা পিছিয়ে গেল মানব। ফের তেড়ে এসে এক হাতে টেবিলে সজোরে চাপড় মেরে, অন্য হাতে ইরাদের চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল — কেন শুনতে চান না? কেন অন্যের করা ভুলের শাস্তি পাব আমি? বলুন! ওই কাজটা তো আমি করিনি। তাহলে আমাকে দোষারোপ করছেন কেন? কী হলো? আনসার দিন।

,,, চোয়ালে শক্তপোক্ত হাতের চাপ পড়তেই ব্যথায় ইরাদের চোখ-মুখ লাল হয়ে এলো। সমানে ফুঁপাচ্ছে সিদ্বার্থ। ইরাদ দুহাতে শক্তি প্রয়োগ করে চোয়াল থেকে সিদ্বার্থের হাত সরাতে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— কিসের ভিত্তিতে বলছেন, আপনি কাজটা করেননি? কোনো প্রমাণ আছে? নিজেকে প্রুভ করতে পারবেন? করতে পারলে করুন, আমি নিজে ক্ষমা চাইব আপনার কাছে।
,,, এই পর্যায়ে সিদ্বার্থও কেমন স্থির হয়ে গেল। ইরাদের চোয়ালে থাকা হাতটা অসাড় হয়ে এলো। হাতখানা সরিয়ে নিতেই ইরাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসল। সিদ্বার্থ হাত দিয়ে ঘাড় ডলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী করবে, কী বলবে ভেবে না পেয়ে রুম ত্যাগ করার জন্য সামনে পা বাড়াতেই ইরাদ টেবিল থেকে নেমে সিদ্ধার্থের শার্টের হাতা টেনে তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে সুধালো — কোথায় যাচ্ছেন? উত্তর দিন। দম শেষ? কথা ফুরিয়ে গিয়েছে?
,,, সিদ্বার্থ কেমন অপরাধী দৃষ্টিতে ইরাদের দিকে ফিরে তাকাল। তৎক্ষণাৎ সিদ্বার্থের শার্টের কলার টেনে ধরল ইরাদ। মুখশ্রীতে প্রশ্নের ছাপ থাকলেও চোখে এক পশলা সুখের আশা চিকচিক করছে, যেন সিদ্বার্থ নিজেকে প্রুভ করতে পারলেই সিদ্বার্থের বুকে লুটিয়ে পড়বে সে। সিদ্বার্থ সেই চোখের ভাষা বুঝতে পেরে অপারগ কণ্ঠে আওড়াল—

— নিজেকে প্রুভ করার মতো কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই, ইরাদ। এই মুহূর্তে ভালোবাসা আর বিশ্বাস ব্যতীত কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু আফসোস! আপনি আমাকে ভালোবাসা কিংবা বিশ্বাস কোনোটাই করেন না। আমি আপনার জীবনে একটা অবাঞ্ছিত পারসন। আমার ভালোবাসাটাও মূল্যহীন। আপনি তো বলেই খালাস, কেন আপনাকে ভালোবাসলাম? কী করব বলুন, ভালোবাসা তো অত হিসেব-নিকেশ করে হয় না। নয়তো বড় ভাইকে ভালোবাসা নারীকেই কেন মন দিয়ে বসলাম? পৃথিবীতে তো সত্যিই আরও নারী ছিল, তাদের কেন মনে ধরল না?
,,, ইরাদের চোখে ফোটা আশাগুলো পানি হয়ে ঝরে গেল। অকারণেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মেঝেতে। পরনের সাদা শাড়িটা খামচে ধরে ভাঙা কণ্ঠে আওড়াল
— এসব মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমাকে ভুলাতে চাচ্ছেন? আমাকে বোকা মনে হয়, তাই না? ইমোশনালি আঘাত করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাচ্ছেন?

,,, ইরাদের পাশাপাশি সিদ্বার্থও বসে পড়ল মেঝেতে। কাঁপা কাঁপা হাতে ইরাদের গাল দুটো আঁকড়ে ধরে কপালে গাঢ় চুম্বন করতেই সিদ্বার্থের শার্টের কলার চেপে ধরল ইরাদ। সেদিকে মন দিল না সিদ্বার্থ। ঝুঁকে এসে ইরাদের গালে লেপ্টে থাকা বাদামি রংটুকু নিজের গালে মিশিয়ে নিল। মুহূর্তেই চোখ বুজে সিদ্বার্থের কলার আরও শক্ত করে চেপে ধরল রমনি। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল অনবরত। ফের কাঁপা কণ্ঠে শুধাল— আমাকে দুর্বল করতে চাচ্ছেন?
,,, সিদ্বার্থ গাল থেকে গাল সরিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল — আপনি কি দুর্বল হচ্ছেন, ইরাদ?
,,, উত্তর করল না রমনি। চোখ বুজে সেভাবেই ঠায় বসে রইল। শরীরটা মৃদু গতিতে কাঁপছে, তবুও সিদ্বার্থের থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে না। কপালদ্বয়ের স্থানও আগের ন্যায় একে অপরকে আলিঙ্গন করে রেখেছে। সিদ্বার্থ আবারও ফিসফিস করে আওড়াল— আমার দিকে তাকান, ইরাদ! একবার চোখে চোখ রাখুন।

,,, মুহূর্তেই চোখ মেলে তাকাল রমনি। দুজনের চোখাচোখি হতেই সিদ্বার্থের বাদামি আইরিশযুক্ত মনির চারপাশে পানি জমল। ইরাদ কেমন থমকে গেল। এই চোখে কোনো পাপ নেই, অপরাধ নেই, ভুল-ভ্রান্তি কিছুই নেই। আছে শুধু একরাশ ভালোবাসা আর কাতরতা। ইরাদ ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুদর্শন মানবের কাতর চোখজোড়ার দিকে। সিদ্বার্থ ফিসফিসানো স্বরে শুধাল— আপনার সত্যিই মনে হয়, আমি এই কাজটা করতে পারি? ভালোবাসা নাকি নিঃস্বার্থ হয়? তাতে নাকি পাপ থাকে না? ভালোবাসলে কি সত্যিই ভালোবাসার অনিষ্ট কামনা করা যায়? আপনাকে কষ্ট দিয়ে সত্যিই কি আমি সুখের আশা করতে পারব? বিশ্বাস হয় আপনার?
,,, ইরাদের চোখ থেকে আবারও পানি গড়াল। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না মেয়েটা। তার খুব ইচ্ছা করছে সিদ্বার্থকে বিশ্বাস করতে। সে কেমন দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধাল — তাহলে কে করেছে? কার স্বার্থ থাকবে এতে? বলুন।

,,, এই পর্যায়ে সিদ্বার্থের চোখের কার্নিশ ঘেঁষেও এক ফোঁটা পানি গড়াল। — আমি জানি না, ইরাদ। কে করেছে, কেন করেছে, কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। আমি শুধু জানি, আমি আপনাকে ভালোবাসি। ভালোবাসা ব্যতীত আমার কাছে কোনো শব্দ, ভাষা, অজুহাত নেই। আমি আপনাকে ভালোবাসার অপরাধে শতবার অপরাধী হতে রাজি, তবে আপনার অনিষ্ট কামনার মতো পাপের কালিমা আমার চরিত্রে লাগাবেন না। আমার ভালোবাসা এত ঠুনকো নয়।
,,, ইরাদের কী হলো, কে জানে! বিশ্বাস করেছে, নাকি করেনি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটা ঠোঁট ফুলিয়ে ফুঁপাতে ফুঁপাতে আকস্মিক ঝাঁপিয়ে পড়ল সিদ্বার্থের বুকে। হুটহাট ঘটনায় তাল সামলাতে না পেরে পিছনের দিকে অনেকটা হেলে গেল সিদ্বার্থ। শব্দ করে কেঁদে দিল ইরাদ। সিদ্বার্থের কলার আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অভিযোগের স্বরে আওড়াল — আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কেন আসেননি? কেন বারবার ভালোবাসি বলে বলে আমার মান ভাঙাননি? আপনি জানেন, আমার কতটা কষ্ট হয়েছে? এই শহরে আমার আপন বলতে অর্পণ, সুহাসিনী আন্টি আর আরশাদ আঙ্কেল ব্যতীত কেউ ছিল না। আমি কার বুকে মাথা রেখে নিজের কষ্ট লাঘব করতাম? ভেবেছেন একবার? বাবা, মা, পরিবার ছাড়া কেমন আছি? কীভাবে একা একা বেঁচে আছি? খোঁজ নিয়েছেন? আপনি আসলে আমাকে ভালোই বাসেন না। অকারণে সুখে থাকার লোভ দেখাচ্ছেন।

,,, সিদ্বার্থ ইরাদকে বুকে নিয়েই তীব্র ক্লান্তিতে মেঝেতে গা হেলিয়ে দিল। ইরাদ আরও নিবিড়ভাবে মিশে গেল মানবের বুকে। উগরে দিতে লাগল এত বছর তিলে তিলে জমিয়ে রাখা কান্নার ফোয়ারা। সিদ্বার্থ বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকা রমনির চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে শান্ত করতে বলল — সরি! সরি, মাই লাভ। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো কোনো প্রমাণ ছিল না আমার কাছে। কোন মুখে আপনার সামনে এসে দাঁড়াতাম বলুন? আপনি তো আমাকে সহ্যই করতে পারতেন না। কাছে এলে হয়তো দুজনের দূরত্ব আরও বাড়ত।
,,, ইরাদের যেন কথাটা পছন্দ হলো না। সে অসন্তোষ জানিয়ে আওড়াল— আজও তো কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্বাস করিনি?
,,, সিদ্বার্থ বোধহয় অবাক বনে গেল। দুহাতে ইরাদের মুখটা টেনে বুক থেকে তুলে কেমন বোকা বোকা কণ্ঠে শুধাল — বিশ্বাস করেছেন? মানে, আমি নির্দোষ সেটা আপনি মেনে নিয়েছেন? আমাকে ভালোবাসবেন, ইরাদ?

,,, ইরাদ নাক টেনে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল— বিশ্বাস করেছি, কিন্তু ভালোবাসি না।
,,, সিদ্বার্থের ঠোঁটে অমলিন হাসির রেখা ফুটল। দুহাতে ইরাদের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে আওড়াল — বাসতে হবে না। শুধু আমার সাথে থাকুন, বুকে থাকুন আর আমার ভালোবাসা গ্রহণ করুন।
— তাহলে আপনার ফিয়ন্সির কী হবে?
— কার? অনন্যার?
,,, ইরাদ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাতেই সিদ্বার্থ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল — কী আর হবে? আমেরিকায় ফিরে গিয়ে এক্সাম দেবে। সামনের সপ্তাহেই ওর এক্সাম।
,,, মুহূর্তেই ইরাদের ভ্রু কুঁচকে এলো— মজা করছেন?
,— নারে বোকা! মজা করবো কেনো? অনন্যা আমার ফিয়ন্সি ঠিক আছে, তবে আমরা কেউ কাউকে বিয়ে করতে রাজি নই। ও আমাকে বড় ভাই হিসেবে মানে, আর আমি ওকে বোন। আমাদের মাঝে এসব কখনোই সম্ভব না।

— মানে?
,,,, সিদ্বার্থ ধীরে ধীরে ইরাদকে সব খুলে বলল। পরিবার থেকে তাদের বিয়ে ঠিক করা, এনগেজমেন্ট করা, অর্পনার প্ল্যান অনুসারে এখানে আসা। ইচ্ছে করে অনন্যাকে ইরাদের আশেপাশে রাখা, যেন ইরাদ এক মুহূর্তের জন্যও সিদ্বার্থকে ভুলতে না পারে। উল্টো অনন্যাকে দেখে দেখে যেন সিদ্বার্থের প্রতি থাকা উইকনেসটা আরও বেড়ে যায়। সবশেষে অনন্যা আর সিদ্বার্থকে একসাথে সহ্য করতে না পেরে সিদ্বার্থের প্রতি ভালোবাসাটা যেনো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। সবটাই অর্পনার প্ল্যানের অংশ ছিল। সবটা শুনে তেতে উঠল ইরাদ। সিদ্বার্থের বুকে ধুপধাপ কিল বসিয়ে বলল— আপনি খুব খারাপ, সিদ্বার্থ!
— জানি তো।
— আপনি কিছুই জানেন না। আপনি একটু বেশিই খারাপ।
— আপনি কি চান, আমি ভালো হয়ে যাই? ভালোবাসা কমিয়ে দিই?

,,, ইরাদ সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে না করল। পরপর আবারও সিদ্বার্থের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল। এভাবে কতক্ষণ কাটল কে জানে? অনেকটা সময় নিয়ে কান্নাকাটির পর ইরাদ যখন শান্ত হলো, তখনই পকেট থেকে টেনে-টুনে একটা খাম বের করল সিদ্বার্থ। ইরাদের সামনে এগিয়ে দিতেই ইরাদ ভ্রু কুঁচকে খামটা হাতে নিল। উঠতে চাইলে ছাড়ল না সিদ্বার্থ। অগত্যা সেভাবেই থেকেই খামটা খুলল ইরাদ। রেজিস্ট্রি পেপার, এখনো উপরে ঝলঝল করছে ২০২৬ সালের ট্যাগ। খ্রিস্টান আর মুসলিম ধর্মের বিয়ের কাবিন নামা হওয়ার দরুন অনেক নিয়মাবলি, শর্ত লেখা রয়েছে। ইরাদ সেসব পড়ল না। তার চোখে ভাসছে এক কোণায় ঝলঝল করা সিদ্বার্থের সাইনটা। অপর পাশটা এখনো খালি, কনের সাক্ষর পড়েনি তাতে। ইরাদের মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। সিদ্বার্থ কত কাতরভাবে বলেছিল এই জায়গাটায় সাইন করে দিতে। তখন তো সিদ্বার্থের প্রতি অভিমান আর ঘৃণা ব্যতীত কিছুই ছিল না ইরাদের অন্তরে। তবে এই চার বছরে কী হলো কে জানে? ইরাদ জানে না, সিদ্বার্থকে সে ভালোবাসে কিনা। শুধু এটুকু জানে, আরশাদ জামান যতবার সুহাসিনীর কাছে ইরাদের বিয়ে নিয়ে কথা বলেছে, সুহাসিনী আন্টি এসে ইরাদকে পাত্রের ছবি দেখিয়েছে, ততবার শুধু তার চোখে সিদ্বার্থের মুখটাই ভেসে উঠেছে। সিদ্বার্থের ওপর অভিমান, অভিযোগ গাড়ো হয়েছে। এতগুলো বছরে শুধু সিদ্বার্থের জন্যই জীবনে কাউকে অ্যালাও করতে পারেনি ইরাদ। লোকটা মন না দখল করেও মস্তিষ্কটা ভালো মতোই আয়ত্ত করে নিয়েছিলো। ইরাদের ভাবনার মাঝে সিদ্বার্থ ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল — সাইনটা করবেন আজ?

,,,, ইরাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সুদর্শন মানবের পানে। মনে মনে অনেক হিসাব-নিকাশ করে দুদিকে মাথা নেড়ে না বোঝাল। সিদ্বার্থের চোখে-মুখের ব্যাকুলতা পরিবর্তিত হয়ে এবার ঘন আঁধারের রূপ নিল। গাঢ় নিশ্বাস ফেলে ইরাদের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই চোখ থেকে আবারও নিঃশব্দে এক ফোঁটা পানি গড়াল। সিদ্বার্থের বড্ড ক্লান্ত লাগছে। আর লড়াই করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এভাবে কতক্ষণ একজনের ওপর জোর খাটানো যায়? জোর খাটিয়ে সত্যিই কি ভালোবাসা পাওয়া যায়? গেলেও ইরাদের মতো মেয়েদের থেকে পাওয়া যায় না। ইরাদরা নিজে না চাইলে তাদের মেরে-কেটে রক্তাক্ত করে দিলেও একটুখানি আগ্রহ পাওয়া যাবে না। সিদ্বার্থ যখন ভালোবাসার নিদারুণ খেলায় ক্লান্ত হয়ে হার মেনে নিতে প্রস্তুত, তখনই ইরাদের কথায় থমকে গেল ছেলেটা — আমি যদি মুসলিম হতে চাই আপনাদের ইসলাম আমাকে গ্রহণ করবে? আমি এই কাগজে নয়, বরং মুসলিম হয়ে ধর্ম মেনে আপনাকে বিয়ে করতে চাই।
,,,, অতিরিক্ত উত্তেজনায় কি রেখে কি করবে ভেবে পেলো না মানব,, সে ইরাদের গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে কপালে শক্ত পোক্ত একখানা চুম্বন করে আওড়ালো– “ইসলাম কখনোই কাউকে ফিরিয়ে দেয় না, মাই লাভ। ইসলাম হচ্ছে শান্তির প্রতীক, যেখানে শুধু ন্যায় নয়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা হয়।”
(আমি এখানে কোনো ধর্মকেই ছোট করতে চাইনি। তারপরও যদি আমার ভুল হয়, ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন।)

,,, আব্রাহাম আর পরশীর পাশাপাশি স্টেজে আরও এক জোড়া নবদম্পতির জায়গা হলো। একপাশের সোফায় আব্রাহাম ও সিদ্বার্থকে বসানো হয়েছে। অপর পাশের সোফায় ইরাদ ও পরশীকে বসানো হয়েছে। মধ্যিখানে লম্বা করে পর্দা ঝুলানো। পর্দার রং গোলাপি। পাতলা কাপড় হওয়ায় দুপাশে অবস্থান করা দম্পতি চাইলেই একে অপরকে দেখতে পাচ্ছে। বর্তমানে ইরাদকে ধর্মীয় রীতিতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করানো হবে। সে নিয়েই চারজন মাওলানা সাহেব আলোচনা করছেন। সিদ্বার্থ ও আব্রাহামের পাশাপাশি বসে রয়েছে আব্রাহামের বাবা, চাচা, মির্জা বাড়ির তিন কর্তা, দ্বীপ, বিহান আর অরুণ। আরণ্যক বাবু হয়ে বসে আছে বড় আব্বু আর পাপ্পার মাঝখানে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে পুরো বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছে।

প্রকৃতি বসে আছে তার পাপ্পার কোলে। আজ সে পাপ্পার মতো ড্রেস পরেনি, বরং মায়ের মতো লাল শাড়ি পরেছে। সঙ্গে গলায় হার, কানে ঝুমকা, মাথায় টিকলি, হাতে কাশ্মীরি চুড়ি, পায়ে আলতা, নূপুর। একদম যেনো আরও একটা পরশীয়া মির্জা । সে একবার বাবাদের দিকে তাকাচ্ছে, আবার পর্দার ওপাশে থাকা মায়েদের দিকে তাকাচ্ছে।পর্দার এদিকটা যেমন পুরুষরা দখল করে রেখেছে, তেমনি ওপাশে পরশী আর ইরাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অর্পনা, মেধা, বৃষ্টি, দ্বীপ-বিহান-পরশীর মামাতো বোনেরা। প্রকৃতি অনুভব করল, সবাই আলোচনায় ব্যস্ত থাকলেও তার পাপ্পা আর বিহান পাপ্পা পর্দা ভেদ করে মাম্মা আর মেধা মাম্মার দিকে তাকিয়ে আছে। এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখল, সিড মামুও ইরা মাম্মার দিকে তাকিয়ে, আবার নিউ আঙ্কেলটাও পরশি মাম্মার দিকে তাকিয়ে।
সে উসখুস করতে করতে পাপ্পার পাঞ্জাবির কলারে হাত রাখল। মুহূর্তেই চমকে উঠল দ্বীপ। মানসপটে ভেসে উঠল অর্পনার কলার ছোঁয়ার দৃশ্যটি। অর্পনা যখন দ্বীপের কোলে বসে কথা বলে, তখন সর্বদা কলার ধরে নাড়াচাড়া করে। মেয়ের মাঝে মায়ের গুণ দেখে তৃপ্ত হাসল দ্বীপ। মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধাল

— কিছু বলবে, সুইটহার্ট?
,,, প্রকৃতি পলক ঝাপ্টে দুবার মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বোঝাল। পরপর মিনি সাইজের ডান হাতের তর্জনী আঙুল তুলে পর্দার এপাশে-ওপাশে আঙুল দেখিয়ে দেখিয়ে বলল — তুমি মাম্মাদ দিকে, বিয়ান পাপ্পা মেদা মাম্মাল দিকে, সিদ মামু ইলা মাম্মাল দিকে আল নিউ আনতেল পশি মাম্মাল দিকে চেয়ে তাকো কেনো? গ্রাপ্পা গুলো যে কাছ কচ্চে দেকচো না? তোমলা কাছ কচ্চো না কেনো? তোমলা কি পকিতিল মতো পাকিবাচ হয়েছো? মাম্মাকে নালিশ কব্বো?

,,, মেয়ের কথা শুনে ক্ষীণ হাসল দ্বীপ। ফুলো ফুলো গাল দুটোতে আলতো করে চুমু খেয়ে অর্পনার নাকের মতো সেইম দেখতে বুচা নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল — নো, মাম্মা! পাপ্পারা একদমই ফাঁকিবাজ নয়। পাপ্পারা শুধু তাদের প্রিয় মানুষদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমরা যখন আমাদের খুব কাছের এবং আপন কারোর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকি, তখন আমাদের এইখানে (বুকের বাম পাশ দেখিয়ে) তীব্র শীতলতা অনুভব হয়। ঠিক এ কারণেই পাপ্পা তোমার মাম্মার দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকে।
,,, প্রকৃতি আঙুল দিয়ে গালে আলতো করে চাপড় মারতে মারতে ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করল — এই চিত, চিত, আবাল কি?

,,, মেয়ের কথায় হেসে ফেলল দ্বীপ — এটা চিত চিত না মা, এটাকে শী,ত,ল,তা বলে। এর মানে হচ্ছে শান্তি।
,,, এবার যেন বিষয়টা বুঝল সে। কিছু একটা মনে হতেই আবারও ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করল — তাহলে আমাল পচদ্দ তো তুমি আল মাম্মা, আমি কাল দিকে তাকাবো?
,,, দ্বীপ প্রকৃতিকে সোজা করে বসিয়ে মেয়ের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে অর্পনার দিকে আঙুল তাক করে বলল— আপাতত মাম্মার দিকে তাকিয়ে থাকো, পরে নাহয় আমাকে দেখো।
,,, প্রকৃতি মাথা ঝাঁকিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। নিজের দিকে আঙুল তাক করতে দেখে ভ্রু নাচাল অর্পনা, মানে জিজ্ঞেস করছে— কী হয়েছে? দ্বীপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দুদিকে মাথা নাড়াল, মানে কিছুই হয়নি। অর্পনা ভ্রু গুটিয়ে মাথার কাছে তর্জনী আঙুল তুলে ঘুরিয়ে বোঝাল— পাগল হয়ে গিয়েছেন? দ্বীপ উত্তর করল না, তবে পাজামার পকেট থেকে ফোন বের করে টেক্সট পাঠাল। নোটিফিকেশনের শব্দ হতেই হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিন অন করল অর্পনা। সাটার নামাতেই দেখল তাতে লেখা— পাগল জেনেই তো এসেছিলে। পাগলের অন্তরে বসবাস করবে আর পাগলের পাগলামি সহ্য করবে না, এটা কেমন অযৌক্তিক ভাবনা হয়ে গেল না?

,,, অর্পনা নাক কুঁচকে মুখ ফিরাল। বয়স বাড়ছে, তবুও লোকের রং কমছে না। অর্পনা মুখ ফিরিয়ে নিলেও দ্বীপ মেয়ের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে ঠায় তাকিয়ে রইল অর্ধাঙ্গিনীর পানে। অর্পনার পরনে লালরঙা কাঞ্জিভরম শাড়ি। কানে, গলায়, হাতে স্বর্ণের অলঙ্কার। নাকে ঝলঝল করছে হীরার ফুল। চুলগুলো সোজা সিঁথি করে খোঁপা করে বাঁধা, তাতে বেলি ফুলের গাজরা লাগানো। যদিও এই সব সাজ দ্বীপ নিজের হাতেই করে দিয়েছে, তবুও দ্বীপের মনে হচ্ছে কোনো অলৌকিক সৌন্দর্য বোধহয় গ্রাস করেছে তার কমলিনীকে। এই সৌন্দর্যের আলোকছটা থেকে চোখ সরানো বড্ড দায় হয়ে পড়েছে তার জন্য। এই দায় কি আদৌ কাটানো সম্ভব?
,,, মাওলানা সাহেবদের গভীর আলোচনা শেষ হতেই চারজন মিলে একের পর এক বাক্যের মাধ্যমে পর্দার ওপাশে থাকা ইরাদকে ইসলামের গুরুত্ব, আল্লাহর একত্ব, মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিলেন। টুকটাক হাদিসও আওড়ালেন মধ্যিখানে। সবশেষে ইরাদকে জিজ্ঞেস করা হলো, এতক্ষণ উনারা যা যা বলেছেন তা ইরাদ মনে, প্রাণে, অন্তর থেকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করেছে কিনা। ইরাদ সম্মতি জানাতেই তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। ইরাদ বোধহয় আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল, একদিন সে ইসলাম গ্রহণ করবে। যার ফলস্বরূপ আগে থেকেই পাঁচ কালেমা স্মরণে ছিল তার। মাওলানা সাহেবের আদেশে নিজ উদ্যোগেই কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মন থেকে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করল রমনি। যার সাক্ষী হলো উপস্থিত সকলে।নমাওলানা সাহেব এবার পর্দার এপাশ হতে কোরআন শরিফ এগিয়ে দিলেন। ইরাদ কাঁপা কাঁপা হাতে গ্রহণ করল তা। অজু অবস্থায় থাকার দরুন কোরআন শরিফে কয়েকটি চুমু খেয়ে পাশে রেখে দিল। সব নিয়মনীতি শেষ হতেই চারজনের মধ্যে থাকা সবচেয়ে বিজ্ঞ মাওলানা সাহেব সিদ্বার্থের উদ্দেশ্যে বললেন — আজকের পর আপনার স্ত্রীকে নামাজ থেকে শুরু করে ইসলামিক সকল নিয়মনীতি দায়িত্বের সহিত রপ্ত করানোর দায়িত্ব আপনার। সেটা আপনি করুন কিংবা অন্য কারোর মাধ্যমে করান, দায়িত্বটা আপনাকেই নিতে হবে।
,,,, সিদ্বার্থ বুকে হাত রেখে আন্তরিকতার সহিত আওড়াল — ইনশাআল্লাহ! আমি নিজেই রপ্ত করাতে পারব।
,,, সবাই একযোগে আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করল।

ইসলাম গ্রহণের পর্ব শেষ হতেই বিয়ের পর্ব শুরু হলো। প্রথমেই সিদ্বার্থ ও ইরাদের বিয়ে পড়ানো হবে। এই বিয়েতে সিদ্বার্থ কিংবা ইরাদের পক্ষ থেকে কেউ হাজির হয়নি। ঝামেলা হবে বিধায় সিদ্বার্থ কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি, আর ইরাদ নিরুপায় হয়ে কাউকে জানাতে পারেনি। যদিও মাকে একবার কল করা হয়েছিল। মা ইরাদের সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছেন নাকি কষ্ট পেয়েছেন জানা নেই। শুধু বলেছেন, “”;ঈশ্বর তোর মঙ্গল করুন।”” কাজি সাহেব সব নিয়মনীতি মেনে সিদ্বার্থকে কবুল করতে বললে সে নির্ভিগ্নে ইরাদকে কবুল করে নিল। ইরাদের পালা আসতেই কিছুটা সময় নিল মেয়েটা। পরপরই তিন কবুলের মাধ্যমে আজীবনের জন্য নিজেকে লিখে দিল সিদ্বার্থের নামে।

,,,, ইরাদ আর সিদ্বার্থের বিয়ে পড়ানোর পর এবার আব্রাহামকে কবুল করানোর জন্য এগিয়ে গেলেন মাওলানা সাহেব। এমতাবস্থায় পরশী এদিক-ওদিক তাকিয়ে শুধু একটা কাঙ্ক্ষিত মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। লোকটা তো বলেছিল তার বিয়েতে আসবে। তার নতুন জীবনের সূচনায় প্রথম দোয়াটা তিনিই করবেন। তাহলে আসছেন না যে? লোকটা কি কথা রাখবে না? তবে যে উনি বললেন, উনি এক কথার মানুষ। উনার মরণ হবে, তবুও কথার নড়চড় হবে না? পরশীর মন যখন একেক কথা আওড়াতে ব্যস্ত, তখনই পরশী আর আব্রাহামের বিয়ের নিয়ম বাঁধা হলো। নিয়ম শেষে আব্রাহামকে কবুল বলতে বললে সে নিমিষেই কবুল বলে ফেলল। সেই কবুলের শব্দ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই পরশীর অন্তরটা ভাঙা কাচের ন্যায় টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ল যেন। এই তো আর কিছুক্ষণ। এরপর পরশী সত্যি সত্যিই নিজেকে আব্রাহামের নামে লিখে দেবে। তখন নিশ্চয়ই ভবঘুরে লোকটাকে নিয়ে ভাবার অধিকার থাকবে না। তার মন-মস্তিষ্ক সব জায়গায় অধিকার খাটাবে আব্রাহাম নামক মানুষটা। ভাবতেই চোখের পানিতে পরশীর গাল ভিজে উঠল।
,,, আব্রাহাম পরশীকে কবুল করার পর মাওলানা সাহেব পরশীর নিকট হাজির হলেন। সকল নিয়মনীতি সম্পূর্ণ করার পর যখন পরশীকে কবুল বলতে বলা হলো, তখনও সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত মুখটা খোঁজার প্রয়াস চালাচ্ছে। পরশীকে বারবার এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্পনা। হালকা ঝুঁকে অত্যন্ত ফিসফিসানো স্বরে বলল—

— কেউ আসবে না, পরশ। মানতে শিখো। তুমি আব্রাহামের।
,,,, এই পর্যায়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। মুহূর্তেই পর্দার আড়াল থেকে একটা পুরুষালি হাত এগিয়ে এসে পরশীর হাতখানা আঁকড়ে ধরল। শিউরে উঠল মেয়েটা। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, আব্রাহাম পর্দার বাইরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। পাতলা পর্দা হওয়ার দরুন আব্রাহামের ব্যাকুল চাহনি রমনির চক্ষুগোচর হলো না। নিজের মনে অন্য কারোর প্রতি আবেগ থাকা সত্ত্বেও আব্রাহামের চোখের এই ব্যাকুলতা বড্ড ব্যথিত করল তাকে। পরশীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আব্রাহাম হালকা ঝুঁকে পরশীর নরম হস্তে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে ধীর কণ্ঠে আওড়াল — সর্বদা তোমার খেয়াল রাখব। চোখ থেকে পানি গড়ানোর আগে সেই কারণটাকেই মুছে দেব। তোমার কষ্টগুলো থেকে তোমায় প্রোটেক্ট করব। কখনো তুমি কষ্ট পাবে, এমন কোনো বাক্য আমার ঠোঁট ফুঁড়ে বেরোবে না। গত বারো বছর আগে থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার নজর শুধু তোমাতেই আবদ্ধ থাকবে। খুব প্রয়োজন না পড়লে মিথ্যা বলব না। প্রয়োজনীয় মিথ্যাগুলোও আহামরি হবে না। হয়তো কখনো তোমার ভালোবাসা না পেয়ে একটা সিগারেট খাওয়ার পর বলব, আমি সিগারেট ছুঁয়েও দেখি না। মন খারাপ থাকলেও বলব, আমি ঠিক আছি। এর বাইরে এমন কোনো মিথ্যা বলব না, যাতে আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস মরে যায়। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, পরশ। উইল ইউ ম্যারি মি?
আব্রাহামের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না পরশী। শুধু নিজেকে সামলে রুমাল দিয়ে চোখ মুছে অস্ফুট স্বরে আওড়াল — কবুল, কবুল, কবুল!!

,,,, পরশীর কবুল শেষে মাওলানা সাহেব আলহামদুলিল্লাহ বলে জায়গা থেকে প্রস্থান নিতেই পর্দাটা সরিয়ে নেওয়া হলো। এই পর্যায়ে ইরাদ আর সিদ্বার্থকে একসাথে বসানো হলো। সবাই সরে গিয়ে আব্রাহামকেও জায়গা করে দিল পরশীর পাশে। পরশী তখনও কাঁদছে দেখে আব্রাহাম পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে সর্বসমক্ষে অর্ধাঙ্গিনীর চোখ মুছে দিল। মেয়ের প্রতি জামাইয়ের এত টান, ভালোবাসা দেখে মির্জা বাড়ির প্রতিটি সদস্যের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। জোহান-বিহান কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অগত্যা চারদিকে মিষ্টি বিলানোর পর্ব শুরু হলো।
,,চারদিকে যখন মিষ্টি বিলানোর আয়োজন চলছে, তখনই আত্মীয়-স্বজনের ভিড়ভাট্টার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো পরশীর কাঙ্ক্ষিত পুরুষ। পরশীর চোখজোড়া মুহূর্তেই চিকচিক করে উঠল। মানবের পরনে হাঁটুর কিছুটা নিচ পর্যন্ত ময়লা প্যান্ট, গায়ে একটা বাদামি রঙের পুরোনো শাল জড়ানো। এর নিচে কিছু আছে কিনা দেখার ফুরসত নেই। সিল্কি চুলগুলো জট পাকিয়েছে বহু আগে। কতদিন গোসল করে না কে জানে? দাড়ি-গোঁফেও জট, যার ফলে কালচে ঠোঁটজোড়া এখন আর দেখা যায় না। ফর্সা মুখখানি ময়লার আস্তরণে ফ্যাকাশে রং ধারণ করেছে। পরশীর সাথে সাথে আরও একজনের নজর ঠেকল দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা মানবের পানে। মানুষটা আর কেউ নয়, পরশীর বর্তমান গার্ডিয়ান আব্রাহাম জাহাঙ্গীর। পরশী আড়চোখে একবার আব্রাহামের দিকে তাকাল। ধর্মমতে এই লোকটা এখন তার স্বামী, অভিভাবক। এক্ষেত্রে তার কাছে অনুমতি নেওয়াটা বড্ড প্রয়োজন। আব্রাহাম চোখের ইশারায় সায় জানাতেই সবকিছুর মায়া ছেড়ে-ছুড়ে কাঙ্ক্ষিত মানবের কাছে ছুটে গেল পরশী।

,,, পরশীকে এভাবে ছুটতে দেখে সবাই বিচলিত দৃষ্টিতে পরশীর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল। অর্পনা, ইরাদ, অরুণের দৃষ্টিও সেদিকেই তাক করা। পরশী ছুটতে ছুটতে এসে কাঙ্ক্ষিত মানবের সামনে দাঁড়াল। এতগুলো মাস পর ভবঘুরে লোকটাকে সামনাসামনি দেখে নাক টানতে টানতে ফের ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিল রমনি। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর প্রয়াস চালিয়ে ভাঙা কণ্ঠে শুধাল — আপনি এসেছেন? কেমন আছেন আপনি?
,,,, পল্লব কেমন করে যেন হাসল। এই হাসি দেখে আরও শব্দ করে কেঁদে দিল পরশী। লোকটা এভাবে হাসে কেন? কেন কাঁদে না? কী হতো যদি এই মানুষটা তার হতো? কী হতো সামনের লোকটা এমন ভবঘুরে না হলে? যে চলে গিয়েছে, তাকে নিয়ে কেন এত আক্ষেপ উনার? নেশাদ্রব্য আর শরীরের বিদঘুটে গন্ধে পরশীর কান্নার তোপ আরও বাড়ল। পল্লব ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে হাত উঁচিয়ে বধূসাজে সজ্জিত পরশীর মাথায় হাত রাখল — কেঁদো না, মেয়ে। আব্রাহাম খুব ভালো ছেলে। সুখী হবে তুমি।
,,, পরশী চোখ তুলে তাকিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে আওড়াল— আমার তো সুখের প্রয়োজন ছিল না, পল্লব। আমি আপনাকে চেয়েছিলাম।
,,, পল্লবদের চাইতে নেই, পরশ। তারা মরীচিকাতেই মানানসই। মরীচিকার পেছনে কতকাল ছোটা যায়, বলো?

,,,, একটা জীবন না হয় ছুটে যেতাম। খুব ক্ষতি হতো কি?
,,, এই পর্যায়ে খুক খুক শব্দ করে কেশে উঠল মানব। শরীরটা কাঁপছে। কেন কাঁপছে জানা নেই, শীতে, নাকি অসুস্থতায়? কিছুটা সময় পেরুতেই ভবঘুরে মানবটি পরশীর মাথা থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে উত্তর করল—— হতো। মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে যখন হুট করে হোঁচট খেয়ে সম্বিত ফিরে পেতে, তখন চারদিকে তাকিয়ে দেখতে তুমি একা। কেউ নেই তোমার পাশে। নিঃসঙ্গ তুমিটা তখন ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে অকালেই। তাই তোমার মতো স্নিগ্ধ পরশদের মরীচিকার পেছনে ছোটা বারণ।
,,,, কথাটা তোয়াক্কা করল না রমনি। ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল — তাহলে আপনি ছুটছেন যে? আপনি গুঁড়িয়ে যাবেন না? কিসের আশায় ভবঘুরে হয়েছেন আপনি?
,,, এই পর্যায়ে আবারও কাশে উঠল মানব। পরনের শালটা দিয়ে মুখ চেপে ধরে কয়েক পল কেশে নিজেকে সামলে হাঁপানো স্বরে উত্তর করল— মুক্তির আশায়, বিলীন হতে পারার আকাঙ্ক্ষায়, শেষ আলিঙ্গনের তৃষ্ণায়। আমি বিশ্বাস করি, একদিন মরীচিকা আমায় ধরা দেবে, দেবেই। আলিঙ্গনও হবে আমাদের। সেদিনটা হয়তো আমার মুক্তির দিন হবে, অমর সুখের মুহূর্ত।

,,,, এরপর আর কিছুই বলার ভাষা পেল না পরশী। ততক্ষণে আব্রাহাম এসে পরশীর পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। পরিচিত-অপরিচিত সকলেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। পল্লব আব্রাহামকে আগাগোড়া পরখ করে নিল। হাত ছুঁতে চেয়েও ছুঁল না। হাত ময়লা বিধায় সরিয়ে নিতে চাইলে আব্রাহাম নিজেই হাত টেনে ধরল। ছেলেটার ব্যবহারে মুগ্ধ হলো পল্লব। ক্ষীণ হেসে আব্রাহামের হাত শক্ত করে চেপে ধরে আওড়াল — আব্রাহাম! বয়সে আমার থেকেও বছর কয়েক বড় হবেন। আপনার বউ পরশ, এই আমি আর আপনি আমরা একই পথের পথিক, বুঝলেন? আমরা ঘুরে ফিরে এমন একজনকে ভালোবাসলাম, যার অন্তরে অন্য কারোর বাস। আমার ভালোবাসার নারীকে তো আমি শেষ পর্যন্ত আগলে রাখতে পারিনি। আমাকে ভালোবাসা নারীকে আপনি আগলে রাখবেন। আমাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো অশান্তি করবেন না। বুঝেনই তো! ভালোবাসা বলে-কয়ে আসে না, হুটহাট হয়ে যায়। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই তার প্রথম ভালোবাসাকে পায়। তার মধ্যে আপনি একজন সৌভাগ্যবান। এটুকু মাথায় রেখে প্রথম ভালোবাসাকে যত্নে রাখবেন।
,,, আব্রাহাম ঠোঁটে অমলিন হাসি ফুটিয়ে সায় জানিয়ে পরশীর হাত খানা আকরে ধরে বলল — আমাদের জন্য দোয়া রাখবেন।

,,, পল্লব মুচকি হেসে কিছু বলতে নেবে, তখনই ছুটে এসে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল কেউ — আমার ভাই, পল্লব তুই! তোর এমন অবস্থা কেন? কী হয়েছে তোর?
,,,, খুব পরিচিত স্পর্শ আর কণ্ঠ শুনে ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরে মানুষটাকে দেখতে চাইল পল্লব। পিছন ঘুরতেই ২৮ বছরের তরতাজা যুবক অরুণ আজওয়াদকে দেখে কেমন থমকে গেল। পল্লবের কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না, অরুণ তার কাছে এসেছে, কথা বলছে। অরুণ কি তবে এখনো কিছু জানে না? পল্লবের মনের প্রশ্নের উত্তরস্বরূপ অরুণ পল্লবের ময়লার আস্তরণ-পরা মুখটাতে হাত বুলিয়ে কাঁপা কণ্ঠে সুধালো — এ… এটা কী অবস্থা করেছিস নিজের? গোসল করিস না কতদিন? (নাকে উদ্ভট গন্ধ ঠেকতেই) এই, তুই কি নেশা করিস? এমন গন্ধ আসছে কেন? (অর্পণ, ইরাদের দিকে তাকিয়ে) আমি কিছু জানি না কেন? এতোদিনেও আমাকে কিছু বলা হয়নি কেনো? ওর অবস্থা এমন হলো কি করে? পল্লব!!

,,, বলতে বলতে মুখে হাত বুলিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল পল্লব। মুহূর্তেই ভ্রু গুটিয়ে নিল অরুণ। আবারও কাঁধে হাত রাখতেই ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে নিল পল্লব। অরুণের দৃষ্টি আরও গাঢ় হলো। পল্লবের ব্যথা পাওয়ার উৎস খোঁজার প্রয়াস চালিয়ে পল্লবের গায়ে থাকা শালটা টেনে ধরতেই আটকে দিল পল্লব। অরুণ অনুভব করল, পল্লবের শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে, ক্ষনে ক্ষনে কাসছে ছেলেটা। বাদামি চাদরটায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। এই পর্যায়ে জোরপূর্বক শাল ধরে টান দিয়ে সরিয়ে নিতেই দেখল, পল্লবের শরীরে অসংখ্য মারের দাগ। হাতের অনেকাংশ কেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। কিছু কিছু জায়গা কালচে রং ধারণ করেছে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭ (২)

অরুণের রাগ যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। পল্লবের পরনের পাতলা ফিনফিনে, পুরোনো, ময়লা টি-শার্ট খামচে ধরে শুধাল — কে মেরেছে তোকে? কার এত বড় সাহস? নাম বল। এভাবে মেরেছে কেন, কু*ত্তার বাচ্চা! উত্তর দে। কথা বলিস না কেন? বোবা হয়ে গিয়েছিস? পল্লব! এই, আমার সাথে কথা বলবি না? শুধু একটা কারন বসত আমাকে পর করে দিয়েছিস? ভাই!!
,,, পল্লব এখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সব জানার পরও তার প্রতি অরুণের এই অসম্ভব দুর্বলতাটুকু মানতে পারছে না সে। অরুণ কেন তার সাথে ঝামেলা করছে না? রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না কেন? তার কারনেই তো অরুনের জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেলো, ভালোবাসার রাতকে হাড়ালো। অরুনের তো উচিৎ তাকে মেরে প্রতিরোধ নেওয়া।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here