অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৯+৩০
সাজিয়া জাহান সুবহা
সকাল ৮টা বেজে ৪০মিনিট। ড্রয়িং রুমে বসে নানি শাশুড়ী এবং মামি শাশুড়ির সাথে গল্পে মগ্ন নাজরাত। ফাঁকে একবার রূপসা এসেছিলো। কিন্তু উপস্থিত তিনজনের দিকে তাকিয়ে পুণরায় রুমে ফিরে গিয়েছে। নাজরাত ভাবলো, মেয়েটা হয়তো অপরিচিত কারো সাথে সহজে মিশতে পারে না। তাই সে নিজেও আগ বাড়িয়ে বললো না কিছু। মিনিট খানিক পর একে একে সকলে একত্রিত হলো ডাইনিং টেবিলে। সিড়ির মাথার সাদিফের অবয়ব দেখে নাজরাত দ্রুত পায়ে ঢুকে গেলো রান্নাঘরে। মামি শাশুড়ির হাতে হাতে টুকটাক কাজ এগিয়ে দিলো। তিনি বেশ কয়েকবার বললেন টেবিলে গিয়ে বসে পড়তে৷ কিন্তু নাজরাত এটা সেটা অযুহাত দিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। সাদিফের সামনে যেতে তার লজ্জা লাগছে ভীষণ।
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর যখন নিজেকে সাদিফের বাহুডোরে আবদ্ধ দেখলো, হৃদস্পন্দন যেনো থমকে গিয়েছিলো তার। সাদিফ নিজের পুরুষালী দুই হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ছিলো তাকে। নিজের এলোমেলো শাড়ির বেহাল অবস্থা দেখে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো নাজরাতের। ভাগ্যিস সাদিফ গভীর ঘুমে ছিলো। নয়তো সেই অবস্থায় কি করে সাদিফের সম্মুখীন হতো সে? ভাবনার মাঝে ডাক পড়লো তার। সকলে বসে পড়েছে ব্রেকফাস্ট করার জন্য। বাধ্য হয়ে নাজরাত এগিয়ে গেলো ডাইনিং টেবিলের দিকে। চুপচাপ গিয়ে বসলো জাহুরা খান’র পাশের চেয়ারে। মুখোমুখি চেয়ারে সাদিফ বসা। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে সে পরখ করছে নাজরাতকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রুমে নাজরাতকে না পেয়ে খানিকটা অবাক হয়েছিলো সে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মেসেজ দিয়েছিলো, কিন্তু সিন করেও কোনো রিপ্লাই পেলো না নাজরাতের পক্ষ থেকে। এতোক্ষণ পর নিচে নামলো সে। অথচ তাকে দেখেই মেয়েটা পালিয়ে গেলো! এখন সামনে বসেও তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। হঠাৎ নাজরাতের এমন ব্যাবহারের মানে খুঁজে পেলো না সে। বাকির টুকটাক কথা বলে নাস্তা সেরে নিলো । খাওয়ার ফাঁকে সাদিফ হাজার বার তাকিয়েছে নাজরাতের দিকে। কিন্তু মেয়েটা সেই সে মাথা নিচু করে খাবারে মনযোগ দিয়েছে, তারপর আর মাথা উঁচু করেনি। যেনো সে এবং খাবারের প্লেট-টা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো প্রানী নেই আশেপাশে। ক্ষুন্ন মনে নাস্তা সেরে উঠে পড়লো সাদিফ। তার মামা এবং রূপমের সাথে কথা বলতে বলতে বেড়িয়ে গেলো বাড়ির বাহিরে৷ জাহুরা খান কারো সাথে ফোনালাপে ব্যস্ত। মামী রান্নাঘরে। একা একা বিরক্ত লাগছিলো বলে নাজরাত ভাবলো রূপসার সাথে গিয়ে একটু গল্প করবে৷
রুমের কাছাকাছি গিয়ে দেখলো দরজাটা একটুখানি ফাঁক করা। নাজরাত নক করার হাত তুললো এমন সময় চোখে পড়লো বিছানার উপর বসা রূপসার দিকে। দরজার দিকে পিঠ করে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে সে। নাজরাত অবচেতন মনে সেদিকে চোখ দিতেই চমকে উঠলো বেশ। ল্যাপটপ স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সাদিফের হাস্যজ্বল একখানা ছবি। রূপসা একনজরে সেদিকে তাকিয়ে। এই দৃশ্য দেখে মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো নাজরাতের। হঠাৎ মনে পড়লো জাহুরা খান’র বলা কথাটা। নাজরাত যেদিন প্রথম সাদিফের বাড়ি গিয়েছিলো, সেদিন জাহুরা খান বলেছিলেন, উনার মেঝো ছেলের মেয়ের সাথে সাদিফের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ রূপসার সাথে সাদিফ!! হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে রইলো নাজরাত। রূপসা এখনো লক্ষ্য করেনি তাকে। সে অনিমেষ চেয়ে আছে সাদিফের ছবিটার দিকে। নাজরাত স্পষ্ট বুঝতে পারলো রূপসা পছন্দ করে সাদিফকে৷ কিংবা বলা যায় পছন্দের চেয়েও বেশি কিছু।
এজন্যই কি তবে রূপসা তার সাথে কথা বলতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে না? এটাকি হিংসা? না নিজের ব্যর্থতা সে দেখাতে চাই না কাউকে?
এলোমেলো মস্তিষ্ক হুট করে আবারো প্রশ্ন তুললো, রূপসার ব্যাপারে কি সাদিফ অবগত? সে কি জানে সে রূপসা তাকে পছন্দ করে? আবার হঠাৎ মনে পড়লো, সাদিফ সেদিন স্পষ্ট বলেছিলো, রূপসা’কে তার পছন্দ নয়। তাছাড়া নাজরাতকে সে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। সে দিক থেকে বলতে গেলে সাদিফ সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রূপসার ব্যাপারে। হতে পারে শুধু মাত্র রূপসা পছন্দ করে সাদিফকে। হতে পারে! যা কিছু হতে পারে!
এলোমেলো পায়ে নাজরাত নিজের রুমে ফিরে গেলো। থম মেরে বসে রইলো কিছু সময়৷ সাদিফ তার স্বামী। মানুষটাকে সে ভালোবাসে বলে স্বীকার করতে পারবে না এখনি। তবে মানুষটা তার অনেক পছন্দের, অত্যাধিক সম্মানের৷ আজ রূপসার চোখে সাদিফের প্রতি এতো মুগ্ধতা দেখে তার কেনো জানি সহ্য হচ্ছে না। সাদিফের সাথে তার স্বামী স্ত্রীর আসল সম্পর্ক গড়ে উঠেনি ঠিক। তাই বলে অন্য কোনো মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে স্বপ্ন বুনবে। এটা মেনে নেওয়া কোনো কালেই সম্ভব নয় তার পক্ষে। ব্যাস্ত হাতে মোবাইল নিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। সাফ্রিনের সাথে এই বিষয়ে কথা বলা দরকার। সে নিশ্চয়ই জানবে কিছু না কিছু। মাত্রই কল করতে নিচ্ছিলো এমন সময় রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো সাদিফ। সরাসরি নাজরাতের সাথে দৃষ্টি মিলন হলো তার। এতোক্ষণ যাবত হাজারো চিন্তায় মগ্ন থাকা নাজরাত আচমকা সাদিফকে চোখের সামনে দেখে ভড়কে গেলো। এলোমেলো সব চিন্তা পালিয়ে মস্তিষ্কে হানা দিলো সকালের দৃশ্যটুকু। তীব্র লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলো সে। মাথা নিচু করে অস্বস্তিতে হাত কচলাতে লাগলো বারে বারে। তার কার্যক্রম দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সাদিফ। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো নাজরাতের কাছাকাছি। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ তুমি এমন অদ্ভুত বিহেভ করছো কেনো? এনি প্রব্লেম? ‘
না তাকিয়েই ডানে বামে নাড়লো নাজরাত। অর্থাৎ কোনো সমস্যা নেই। তার রক্তিম মুখশ্রী দেখে এই পর্যায়ে এসে সাদিফ চট করে যেনো বুঝে ফেললো সবটা। সকাল থেকেই পালাই পালাই করছে নাজরাত। ঘুম ভাঙ্গার পর নিজেকে সাদিফের বাহুডোরে আবদ্ধ দেখেই কি তবে লজ্জা পাচ্ছে নাজরাত! ব্যাপারটা মাথায় খেলতেই নিঃশব্দের হেসে উঠলো সাদিফ। নাজরাত পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু ব্যার্থ হয়ে বাধা পড়লো সাদিফের শক্তপোক্ত দুই হাতের মাঝে। শক্ত বন্ধনে নাজরাতকে নিজের সাথে জড়িয়ে ফেলেছে সাদিফ। নাজরাতের অবাক মুখখানার কাছাকাছি নিজের মুখ নামিয়ে সে বলে উঠলো,
‘ তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো? ‘
লজ্জায় নাস্তানাবুদ হয়ে থাকা নাজরাতের এবার ইচ্ছে করলো মাটি ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে যেতে। এতো লজ্জা কোথায় রাখবে সে! উপায়ান্তর না পেয়ে আচমকা সাদিফের বুকে মুখ গুজে দিলো। তার প্রতিক্রিয়া দেখে এবার শব্দ করে হেসে উঠলো সাদিফ। নাজরাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ হ্যাসবেন্ড হই তোমার। একটু কাছে আসবে, জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। এতে এমন লাজ্জা পাওয়ার কি আছে? ‘
নাজরাত জবাব দিলো না কোনো। চুপটি করে পড়ে রইলো সাদিফের বাহুডোরে। সাদিফ আর লজ্জা বাড়ালো না তার। স্বাভাবিক করতে বললো,
‘ রেডি হয়ে নাও। সবাই মিলে এখন ঘুরতে বের হবো। ‘
নিঃশব্দে কাপড়চোপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো নাজরাত। দীর্ঘ সময় নিয়ে রেডি হয়ে রূপম,রাহাত এবং রূপসা’কে নিয়ে বের হলো বাসা থেকে। আজ সারাদিন ঘুরার পরিকল্পনা তাদের৷
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো সাফওয়ান। আচমকা তার শরীরের উপর ধরাম করে পড়লো কেউ৷ সাফওয়ানের ঘুমন্ত মস্তিষ্ক জেগে উঠলো হঠাৎ। যতোটা জোরে তার উপর কেউ হামলা করলো তার চেয়ে দ্বিগুণ শক্তি দিয়ে লাথি মেরে বেড থেকে ফেলে দিলো মানুষটাকে। ধরাম করে শব্দ হলো একটা। সেই সাথে শুনা গেলো মিহাদের চিৎকার। বাপ বাপ করে চিল্লিয়ে উঠলো সে। ঘুমু ঘুমু চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
‘ সাত সকালে কই থেকে টপকালি তুই? ‘
কোমড়ে ব্যাথা পাওয়া জায়গা মালিশ করতে করতে মিহাদ বললো,
‘ শালা খচ্চর! মেরে এখন হালচাল জানতে চাইছিস? ওই তুই নেশা টেশা করে ঘুমাচ্ছিলি নাকি? ঘুমের মধ্যে এতো শক্তি! আহ!! কোমড়-টা বুজি গেলো আমার!
‘ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবি না মিহাদ। যেটা জানতে চাইছি সেটা বল। কোথায় ছিলি এই এক সপ্তাহ? ‘
‘ সে নাহয় ছিলাম কোথাও। কিন্তু তুই ফার্মহাউসে কেনো? তোর বাসায় গিয়েছিলাম। আন্টি বললো দুদিন যাবত তুই বাসায় যাসনি। সিরিয়াস কিছু নিয়ে চিন্তা করলেই তুই এখানে এসে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকিস। এবার বলে ফেল তো, হয়েছে কি? আন্টিও বলছিলো আজকাল তোর হাবভাব ঠিক লাগছে না। দ্রুত বল কি হয়েছে? আমার অধৈর্য মন ধৈর্য ধরতে পারছে না। ‘
সাফওয়ান জবাব দিলো না। আগের মতোই চোখ বুজে পড়ে রইলো বিছানায়। তার কাছে জবাব না পেয়ে মিহাদ বিশাল থাই গ্লাসের সাদা পর্দা সরিয়ে দিলো। হুড়মুড়িয়ে রোদ ঢুকে আলোকিত করে তুললো চারপাশ। মিহাদের চোখ পড়লো রুমের একপাশে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা ক্যানভাস পেপার-টার দিকে। ফ্লোরে এলোমেলো ভাবে রঙের টিউব, তুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। ফোটা ফোটা রঙ ছড়িয়ে আছে ফ্লোর জুড়ে। রুমের এই হাল দেখে মিহাদ এবার একশো পার্সেন্ট সিউর হয়ে গেলো যে সাফওয়ানের কিছু না কিছু হয়েছে। এমন অগোছালো ছেলে তো নয় সে। তার জিনিস সামান্যতম এদিক সেদিক হলেই তুলকালাম বাঁধিয়ে তুলে। আর আজ কিনা সেই ছেলে রুমের এমন বেহাল দশা করে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছে! কৌতুহল বশত ঢেকে রাখা ক্যানভাসটার দিকে এগিয়ে গেলো মিহাদ। সবে মাত্র সাদা আবরণটুকু সরাতে নিচ্ছিলো, এমন সময় হুট করে সাফওয়ান এসে হাত ধরে ফেললো তার। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ আমি বলেছি দেখতে? সর এখান থেকে।
মিহাদ চমকালো। ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ কি এমন একেঁছিস যে আমি দেখতে পারবো না?
এরপর এক সেকেন্ড মতো থেমে নিচু কন্ঠে বললো,
‘ বন্ধু!!! তুমিও আজকাল ওসব নিয়ে ছবি টবি আঁকছো নাকি হুহ! আঁকলে কিন্তু দেখাতে পারিস। আমি মোটেও ব্যাকডেটেট না। মাইন্ড করবো না যাহ! দেখা, দেখি।
মিহাদের উল্টো পালটা কথা শুনে চোখ গরম করে তাকালো সাফওয়ান। চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ আর একটা উল্টো পালটা কথা শুনলে পিঠের আস্ত থাকবে না বলে দিলাম। চুপচাপ নিচে যাবি। করিম চাচাকে বলবি বাইরে থেকে নাস্তা কিনে আনতে। যা,বের হ রুম থেকে। কুইক! ‘
ছোট বাচ্চার মতো মুখ ফোলাল মিহাদ। যেতে যেতে হা হুতাশ করে বললো,
‘ বন্ধুও আমাকে পর করে দিলো! এই দিন দেখার আগে কমছে কম একটা সান গ্লাসের ব্যাবস্থা করে দিতে আল্লাহ! ছ্যাঃ ছ্যাঃ এই বন্ধু পাললাম এতো বছর যাবত? ‘
মিহাদ বেরিয়ে যেতেই ক্যানভাস থেকে সাদা আবরণ সরিয়ে ফেললো সাফওয়ান। সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো রঙ তুলি দিয়ে আঁকা একজোড়া চোখের পেইন্টিং। হলদে কপালে দীর্ঘ পল্লব যুক্ত, ডাগরডাগর একজোড়া চোখ। কুচকুচে কালো মণি। লম্বা পাপড়ি মেলে তাকিয়ে আছে। টলমল জলে জ্বলজ্বল করছে আকর্ষণীয় চোখজোড়া। কপাল বেয়ে এলোমেলো দুই একখানা চুল চোখের সামনে অবস্থান করছে। চোখের দুই ইঞ্চি নিচে ছোট্ট কালো তিলটাও যুক্ত করতে ভুললো না সাফওয়ান। এই পেইন্টিং-টা কেনো একেঁছে জানা নেই তার। গত তিনদিন ধরে অনেক ধৈর্য নিয়ে একটু একটু করে রঙ তুলি দিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছে চোখজোড়ার ছবি। তপ্ত শ্বাস ফেলে পুণরায় পেইন্টিং-টা ঢেকে দিলো সে। আজকাল নিজের উপর আয়ত্ত রাখা সম্ভব হচ্ছেনা।
হুট করেই নিজেকে ভীষণ এলোমেলো মনে হচ্ছে তার। কি করছে, কি হচ্ছে কিচ্ছুটি বুঝে উঠতে পারছে না। সেদিনের পর সায়েরীর সাথে আর দেখা হয়নি তার। কে জানে, মেয়েটা হয়তো হুমকি শুনেই আর সামনে আসেনি। তাছাড়া সাফওয়ান নিজেও বিগত তিনদিন ধরে যায়নি ক্যাম্পাসে। গত পাঁচদিন যাবত অদ্ভুত এক অস্থিরতায় দিন কাটছে তার। বুক জুড়ে অদ্ভুত এক হাহাকার, অজানা এক শূন্যতা। কেনো এসব হচ্ছে, তা বুঝে উঠতে পারছে না সাফওয়ান। শুধু বুঝতে পারছে, কিছু একটার শূন্যতায় ভিতরটা তোলপাড় করে তুলছে তার।
মোবাইল নোটিফিকেশনের শব্দে ঘোর ভাঙ্গলো সাফওয়ানের। পুনরায় পেইন্টিং-টা ঢেকে মোবাইল হাতে নিতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো জিমনের আইডি থেকে আসা তিনটা ছবি, সাথে একটা মেসেজ। যাতে লিখা, ‘ ভেরি নাইচ ক্যাপচার দোস্ত। ‘
কৌতুহল বশত আইডিতে ঢুকলো সে। এবং হঠাৎ করেই দৃষ্টি আটকে গেলো মোবাইল স্ক্রিনে। বান্দরবানের নীলাচলে তোলা সায়েরীর ছবি তিনটা পাঠিয়েছে জিমন। তার ক্যামেরাতেই তুলেছিলো ছবিগুলো। শুভ্র মেঘের রাজ্যে বিভোর সেই শ্যামকণ্যা’কে দেখে সাফওয়ানের অবাধ্য নজর আরো একবার স্থির হতে বাধ্য হলো। অনিমেষ তাকিয়েই রইলো সে ছবিটার দিকে। টলমল জলে জ্বলজ্বল করছে সায়েরীর বড় বড় আঁখি পল্লব। দুহাতে মুখ চেপে সে অবিশ্বাস্য নজরে প্রকৃতি দেখছে। ওই ভেজা চোখজোড়া দেখে একটুখানি বুক কাঁপলো বোধহয় সাফওয়ানের। বুকের বাম পাশটাই পুনরায় অনুভব হলো সেই তীক্ষ্ণ ব্যাথা। সহসা চোখ বুজে ধপ করে বালিশে মুখ গুজে দিলো সে। চেপে ধরলো বুকের বাম পাশটা। বিড়বিড় করে আওড়ালো, ‘ পাগল করে দিবে আমাকে! ‘
বেলা দশটা থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। থামা থামির নাম নেই কোনো। বাতাসে বাতাসে তান্ডব চলছে যেনো। এমন বৃষ্টির মাঝে সাফওয়ানের জোড়াজুড়ি তে কলেজে এসে হাজির হতে হয়েছে মিহাদকে। বেলা প্রায় ১টা তখন। সাফওয়ান ঘুম থেকে উঠতে উঠতেই সাড়ে এগারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলো। এরপর আচমকা জেদ ধরলো কলেজে যাবে বলে। অথচ আজ তাদের ইম্পর্ট্যান্ট কোনো ক্লাস নেই৷ তাছাড়া বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছিলো অবিরাম। এমন ঘন বর্ষনে বাসা থেকে বের হওয়ার কোনো মানেই হয়না। মিহাদের ইচ্ছে হলো না বের হতে। কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া সাফওয়ানের কাছে এসব যুক্তি প্রশ্রয় পেলে তো।
একপ্রকার ধরে বেঁধে মিহাদকে নিয়ে হাজির হয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসে। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি জমে গিয়েছে। জ্যামে বসে থাকতে হয়েছে অনেক্ষন। অবশেষে একটার পর কলেজে এসে হাজির হলো দুজন। মিহাদকে গাড়ি পার্ক করতে দিয়ে সাফওয়ান দ্রুত পায়ে ঢুকলো ভিতরে। মাঠ পেরিয়ে ভবনের দিকে ঢুকতে ঢুকতেই কিঞ্চিৎ ভিজে গেলো সে। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। ব্রেক টাইম চলছে। সচরাচর এই সময়ে সাফ্রিন বাসায় ফিরে বলে জানে সাফওয়ান। আজও কি ফিরে গিয়েছে? না এখনো ক্যাম্পাসে আছে? ভাবনার মাঝেই হঠাৎ কানে আসলো অতি পরিচিত কন্ঠস্বর। খিলখিল শব্দের হাসি। সাফওয়ান থমকালো।
‘ সাফা আয় না! একটু ভিজলে কিচ্ছু হবে না। আয় তো! ‘
ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দের সাথে রিনরিনে কন্ঠটা কানে বাজতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সাফওয়ান। উত্তর দিকে মাঠের খোলা অংশে ঝুম বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে সায়েরী। আশেপাশে দুই একজন মেয়ে রয়েছে। সাফ্রিন বারান্দায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে বৃষ্টি বিলাসের নূন্যতম ইচ্ছে নেই তার। তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বৃষ্টির দিকে ফিরে চোখ বুজে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ালো সায়েরী। বৃষ্টির এক একটা ফোটা তার হলদেটে গাল, থুতনি, গলা বেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অতল গহ্বরে। কাঁধের একপাশে ঝুলছে লম্বা বিনুনি। চোখ বুজে উপভোগ করছে বৃষ্টির প্রতিটা ফোটা। অধর কোণে লেপ্টে আছে স্বভাবসূলভ মিষ্টি হাসি৷ ফলস্বরূপ বাম গালের টোল দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে৷ সাফওয়ানের স্থির দৃষ্টি। এলোমেলো সায়েরী’কে দেখে তার মতো গুছানো ছেলেটাও এলোমেলো হয়ে উঠতে বাধ্য হলো যেনো।
দীর্ঘ পাঁচ দিনের অস্থির হৃদয়টাতে এবার একটু শীতলতা অনুভব করছে সে। মিলিয়ে যাচ্ছে বুকের শূন্যতা। শান্তি লাগছে ভীষণ। মেয়েটা যেনো চোখের শান্তি, মনের প্রশান্তির হয়ে সামনে এসেছে। শুধুই প্রশান্তি অনুভব করছে? উঁহু! এইতো, আবারো বুকের বাম পাশে সেই চিনচিনে ব্যাথাটা উদয় হয়েছে। থেমে থেমে তীক্ষ্ণ হচ্ছে সেটা। সেই সাথে দ্রুত বেগে লাফাচ্ছে হৃদপিন্ড নামক অসভ্য যন্ত্রটা। এমন ছটফট করছে কেনো সেটা? সকলে মিলে এ কেমন ষড়যন্ত্র করছে সাফওয়ানের বিরুদ্ধে! কেনো আজকাল এতো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে সে? কি আছে এই বোকা মেয়েটার মাঝে? যা প্রতি নিয়ত চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে চলছে তাকে! কম্পিত হাত দিয়ে বুকের বাম পাশটা চেপে ধরলো সে। ব্যাথাটুকু রোধ করার বৃথা চেষ্টা যাকে বলে। কিন্তু এই ব্যাথা যে কমবার নয়। চোখ খিচে বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো সে। বেহায়া চোখ জোড়াকে শাসাল যেনো আর না থাকায়। কিন্তু তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বেহায়া চোখ জোড়া আবারো স্থির হলো সায়েরীর সিক্ত মুখশ্রীতে। তখনি সাফ্রিন সায়েরীর হাত টেনে বারান্দায় নিয়ে আসলো। জোর গলায় শাসিয়ে উঠলো,
‘ অনেক পাগলামো হয়েছে সায়ু। এবার চুপচাপ বাসায় ফিরবি। আমি ড্রাইভার আঙ্কেল কে দিয়ে গাড়ি পাঠাতে বলছি। আমার সাথেই যাবি তুই। ‘
ঠান্ডায় মৃদু মৃদু কাঁপতে থাকা সায়েরী ফট করে জবাব দিলো,
‘ ঠিকাছে। তোর গাড়ি আসতে আসতে আমি নাহয় আরেকটু ভি….
বলতে বলতে পুনরায় মাঠে নামতে যাচ্ছিলো সে। তখনি চট হাত টেনে ধরলো সাফ্রিন। বিরক্ত মুখে বললো,
‘ আরেকবার যদি ভিজি ভিজি করিস তো এক চড় দিবো। চুপচাপ দাড়া। তোর জন্য এবার আয়ান এসে আমাকে ধরবে। তোহা ও আসেইনি। আর এই তিন উল্লুক কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে। যতো জ্বালা হয়েছে আমার। ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এক আয়ান, দুই সাফ্রিন। সুপার ডুপার দুজন ম্যাচিউর বন্ধু বানিয়ে রীতিমতো বিরক্ত সে। কিছু হলেই সিনিয়রের মতো জ্ঞান ঝাড়তে থাকবে দুজন মিলে। উফফ!! অসহ্যকর।
মোবাইল বের করে কল দিতেই নিচ্ছিলো সাফ্রিন। এমন সময় তার চোখ পড়লো সাফওয়ানের উপর। স্বস্তির শ্বাস ফেলে মোবাইল ব্যাগে ঢুকালো সে। সায়েরীর হাত টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো,
‘ চল! ভাই এসেছে। ওর গাড়িতে করেই ফিরতে পারবো। ‘
সাফওয়ানের চোখে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলো সায়েরী। মনে পড়ে গেলো সেদিনের দেওয়া হুমকি। কেমন গুন্ডাদের মতো করে বলেছে, একমাস যেনো তাকে আশেপাশে না দেখে। এ কথায় কি বুঝাতে চেয়েছে সে! সায়েরী ইচ্ছে করে আশেপাশে ঘুরঘুর করে তার? হুহ! সায়েরীর ঠ্যাকা পড়েছে নাকি? তাকে এমন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে সাফ্রিন তাড়া লাগালো। সায়েরী রয়েসয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ তুই চলে যা। আমি আয়ানকে ডাকছি। ও আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। ‘
‘ উফফ! মাথা গরম করবি না সায়ু। এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে রিকশা করে যাওয়ার কোনো মানেই হয়না। তোহা কিংবা নাজরাত সাথে থাকলে নাহয় মানা যেতো। কিন্তু তোকে একা ছাড়ার প্রশ্ন-ই উঠে না। চুপচাপ চল। ‘
‘ একা কোথায়? আয়ান… ‘
বাকিটা শুনার প্রয়োজনবোধ করলো না সাফ্রিন। দ্রুত পায়ে হেঁটে মুখোমুখি হলো সাফওয়ানের। তাদের আসতে দেখেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে তা স্ক্রল করতে লাগলো সাফওয়ান। ভাবখানা এমন যেনো সাফ্রিন এবং সায়েরীকে এতোক্ষণ যাবত দেখেইনি সে। কাছাকাছি এসে সাফ্রিন বললো,
‘ ভাই! বাড়ি যাবে তুমি? গাড়ি এনেছো? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ গ্রেট! চলো আমরাও বাড়ি ফিরবো। ‘
আড়চোখে সায়েরীর মিইয়ে যাওয়া মুখখানার দিকে একপলক তাকিয়ে পার্কিং এরিয়ার দিকে পা বাড়ালো সাফওয়ান। সেখানটায় দুই তিনজন ছেলের সাথে কথা বলছিলো মিহাদ। সাফওয়ান গিয়ে যখন বললো বাড়ি ফিরার কথা, চট করে মেজাজ গরম হয়ে গেলো তার। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ এই বৃষ্টিতে তোর উপর কি হিন্দি নায়িকাদের জ্বীন ভর করেছে নাকি হ্যাঁ? একবার এখানে তো একবার ওখানে। এমন তিড়িংবিড়িং করছিস কেনো হঠাৎ? জ্যামেও আটকে থাকতে হয়েছে এক ঘন্টা। এখন আবারো একই হাল হবে। এতো এনার্জি কোথা থেকে আসলো শরীরে? ‘
সাফওয়ান জবাব না দিয়ে বিরক্ত মুখে বললো,
‘ বেশি বকবক না করে চাবি দে। ‘
মিহাদ নাছোড়বান্দা গলায় বললো,
‘ নাহ! আজ তুই বলেই দে হয়েছে কি তোর? এমন অধৈর্য ছেলে তো তুই ছিলিস না। সত্যি করে বল, বিয়ারের বাইরেও কোনো নেশা টেশা শুরু করেছিস নাকি? ‘
সাফওয়ান রাগ দমিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ তুই কি চাবিটা দিবি? ‘
এই পর্যায়ে এসে সাফওয়ানের গম্ভীর মুখখানা দেখে আর কথা বাড়ালো না মিহাদ। চুপচাপ চাবি এগিয়ে দিলো। চারজনেই গিয়ে বসলো গাড়িতে। মিহাদ ফ্রন্ট সিটে বসেছে, এবং মেয়ে দুজন ব্যাক সিটে। বৃষ্টির ছটা ভিতরে ঢুকছে বলে জানালার কাঁচ সব উঠিয়ে দিয়েছে। নিম্ন গতিতে এসি চলছে৷ সায়েরীর ভেজা চুল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখে ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে অতিরিক্ত পানি শুষে ফেললো সাফ্রিন। সাথে আবার বকাঝকা করতেও ভুললো না তাকে। চাপা স্বরে বললো,
‘ বাসায় গিয়ে আন্টির বকুনি শুনলেই শিক্ষা হবে তোর। এবার যদি তোর জন্য আয়ানের কাছে আমাকে বকা শুনতে হয় তো দেখিস তোর কি অবস্থা করি আমি। ‘
কপালে ভাঁজ ফেলে সাফ্রিনের দিকে তাকালো সায়েরী। নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ আমি কি ছোট বাচ্ছা? দুনিয়াদারি কি বুঝি না আমি? আজব বিহেভ করিস তোরা! এক আমার ভাই, তারপর হলি তোরা। মনে হয় দুনিয়াতে আর কারো বোন নেই। আর কারো বান্ধবী নেই। আমি একটু বোকাসোকা মানলাম। তাই বলে সব সময় কেনো আমার আগেপিছে লেগে থাকতে হবে তোদের? ‘
সাফ্রিন শব্দ করে হাসলো। সায়েরীর ফোলা ফোলা গাল টেনে দিয়ে বললো,
‘ ভুল বললি। তুই একটু না পুরোপুরি বোকা। আর তোকে ছোট থেকে অনেকবার পরীক্ষা করে দেখেছি সবাই। তোকে একা ছাড়া মানেই বিপদ। আসলে তুই মেয়েটাই আস্ত একটা বিপদ। আগে আমরাও ভাবতাম, ছাড় দিলে নিশ্চয়ই শিক্ষা হবে তোর। কিন্তু উলটো আমাদেরই শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। এই ভুল আর আমরা রিপিট করবো না বাবা। জন্মের শিক্ষা পেয়ে গিয়েছি একদম! ‘
প্রতিউত্তর করতে না পেরে চুপটি করে সাফ্রিনের কাঁধে মাথা রাখলো সায়েরী। লুকিং গ্লাসে তার দিকে বারে বারে নজর বুলাচ্ছিলো সাফওয়ান। ঠান্ডার কারণে শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে সায়েরীর। তিরতির করে কাঁপছে গোলাপি ঠোঁটজোড়া। বারে বারে হাতে হাত ঘষে নিজেকে একটুখানি উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছে সে। তার অবস্থা দেখে চট করে এসি বন্ধ করে দিলো সাফওয়ান। তা দেখেই হুট করে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকালো সায়েরী। চোখাচোখি হলো সাফওয়ানের সাথে। সেকেন্ড দুয়েক পর দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় ড্রাইভিংয়ে মনযোগ দিলো সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরী তখনো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
কথা ছিলো প্রথমে সায়েরী এবং মিহাদকে নামিয়ে দিয়ে দুই ভাই বোন বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু সেই রোডে পানি জমে উঠার কারণে অন্য রোড দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেলো সাফওয়ান। প্রথমে নামিয়ে দিলো মিহাদকে। এরপর সাফ্রিন নেমে গেলো। তাকে নেমে যেতে দেখে সায়েরী বললো সে এখান থেকেই বাকি পথ চলে যেতে পারবে। কিন্তু সাফ্রিন ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে তাকে। সাফ্রিন চলে যেতেই সায়েরী গাল ফুলিয়ে বসে রইলো সিটে। ড্রাইভিং সিটে সাফওয়ান ঠাঁই বসা। দুইহাত দিয়ে স্টিয়ারিং চেপে ধরে আছে সে। গাড়ি চলছে না দেখে সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো লুকিং গ্লাসে। সাফওয়ান আগে থেকেই তাকিয়ে ছিলো। চোখে চোখ পড়তেই সে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ সামনে আসো। ‘
শান্ত কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই চমকালো সায়েরী। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ আমি এভাবেই ঠিক আছি। ‘
আড়াআড়ি ভাবে ভ্রুঁ বাঁকিয়ে তাকালো সাফওয়ান। আগের মতোই শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ তোমার পারমিশন চেয়েছি আমি? চুপচাপ সামনে এসে বসো। ‘
সায়েরী জানে কোনো প্রতিউত্তর করেও লাভ নেই। তাই নিঃশব্দে ব্যাক ডোর খুলে ফ্রন্ট সিটে এসে বসলো। সিটবেল্ট লাগাতে গিয়ে পড়লো বিপাকে। কোনো ভাবে টেনে আনতে পারছে না সেটা। সে যখন ঘাড় ঘুরিয়ে পুরোদমে সিল্ট বেল্ট টেনে আনতে ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ তার শীতল হাতের উপর উঠে আসলো পুরুষালি, উষ্ণ একটা হাত। সায়েরী চমকালো। নাসারন্ধ্রে তীব্র ভাবে ধাক্কা লাগলো সাফওয়ানের শরীরের জেন্টস পারফিউমের ঘ্রাণ। সায়েরী চেয়েও অস্বীকার করতে পারবে না যে, এই সুঘ্রাণ তার বিরাট দুর্বলতা। চেয়েও কখনো এই ঘ্রাণে মাতোয়ারা হওয়া থেকে নিজেকে আটকাতে পারে না সে। আজও পারলো না। স্থান, কাল ভুলে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজের ভিতরে আটকে ফেলতে চাইলো এই সুঘ্রাণ। সে যখন গভীর আবেশে চোখ বুজে আছে, তখনই গাড়ি স্টার্ট করার শব্দ কানে আসলো। চমকে উঠে চোখ খুললো সায়েরী। দেখলো তার শরীরের উপর দিয়ে সিট বেল্ট আটকানো। সাফওয়ান অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ড্রাইভ করছে। যেনো কিছুই হয়নি। গাড়ি চলতে লাগলো আপন গতিতে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার হাঁচি দেওয়া শেষ সায়েরীর। সাফওয়ান একে একে টিস্যু বের করে দিচ্ছে তাকে। নাক মুছতে মুছতে চোখ মুখের অবস্থা বেহাল তার।
সায়েরীর বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে। দ্রুত হাতে সিল্ট বেল্ট খোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু অসভ্য বেল্ট-টা আজ যেনো দ্বিগুণ শক্তি পেয়েছে। কোনো ভাবেই খুলতে চাইছে না। সায়েরীর তাড়াহুড়ো দেখে সাফওয়ান নিজে হাত বাড়ালো। তা দেখে হাত সরিয়ে নিলো সায়েরী। ছাড় পেয়ে যেই না ডোর খুলে বের হবে, এমন সময় আচমকা তার লম্বা বিনুনি টেনে ধরলো সাফওয়ান। ব্যাথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো সে। সাফওয়ান পাত্তা দিলো না সেদিকে। বেণি-টা আরো একটু টেনে ঝুঁকে আসলো সায়েরীর উপর। নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ কাকে দেখানোর জন্য এভাবে চুল বেঁধেছো? খুব শখ জেগেছে ছেলেদের সামনে নিজের চুল দেখিয়ে ঘুরার? ‘
চুলে টান পড়ায় ব্যাথা পাচ্ছিলো সায়েরী। তার উপর সাফওয়ানের এমন ধারালো কথা শুনে চোখে জল জমলো তার। ওই টলমল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে থমকালো সাফওয়ান। এতোটা আকর্ষণ কেনো এই চোখে? হিংসাত্মক এক অনুভূতি আচমকা গ্রাস করে ফেললো সাফওয়ানকে। সহসা চুল ছেড়ে চেপে ধরলো সায়েরীর ফোলা ফোলা গালজোড়া। নিজের ভিতরের হিংসাত্মক অনুভূতিটুকু দমাতে না পেরে রাগ্বত স্বরে বললো,
‘ এতোটা মূল্যহীন তোমার চোখের জল? সব কিছুতেই কেঁদে ভাসাতে হবে কেনো হ্যাঁ? আমাকে তো বশ করেই ফেলেছো। অন্যদেরও বশ করার ধান্দা করছো এখন? যার তার সামনে হুটহাট কেঁদে, হেসে নিজের রূপের বহিঃপ্রকাশ করার রাইট কে দিয়েছে তোমাকে? স্পিক আপ ড্যাম ইট? ‘
শেষের কথাটুকু বেশ ধমকের সাথে বললো সাফওয়ান। সেই সাথে অনেকটা জোর প্রকাশ করেই চেপে ধরলো সায়েরীর নরম গাল। তীব্র ব্যাথায় জজর্জরিত হয়ে আচমকা ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো সায়েরী। তা দেখে হঠাৎ-ই যেনো হুশ ফিরলো সাফওয়ানের। হাতের বাঁধন ঢিল হলো। সাথে সাথে তার হাত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো সায়েরী। কান্নারত অবস্থায় সাফওয়ানকে নিজের কাছ থেকে সরানোর চেষ্টা করে জোর গলায় বলে উঠলো,
‘ আমার সব কিছুতে এতো হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে? আমাকে নিয়ে যদি এতোই সমস্যা থেকে থাকলে দূরে থাকুন না!! আমি তো নিজ থেকে আসিনি কখনো আপনার কাছে। তবুও কেনো বারে বারে আমাকে এতো অপমান করেন আপনি? আমি যদি এতোটাই অসহ্যকর হয়ে থাকি তাহলে বলে দিন। আর কখনো আপনার ছায়া মাড়াতেও যাবো না। আমার আপন মানুষরা জানে আমি কেমন। আমার চরিত্র নিয়ে বাজে বলার অধিকার আমি কাউকে দেইনি। আপনাকেও না। ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ছুটে বেরিয়ে গেলো সায়েরী। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো সাফওয়ান। কানে বাজছে সায়েরীর কান্নারত কন্ঠের এক একটা বাক্য। রাগে রক্তকণিকা টগবগিয়ে উঠছে তার। বুঝতে পারছে না, এই রাগ ঠিক কার উপর। নিজের উপর? না সায়েরীর উপর? দাঁতে দাঁত চেপে দুই হাতে চুল খামচে ধরলো সে। স্টিয়ারিং-য়ে শক্ত হাতের ঘুষি বসালো লাগাতার কয়েকটা। মুহুর্তেই ব্যাথায় নীলচে হয়ে উঠলো জায়গাটা। চামড়া ছিড়ে ছোপ ছোপ রক্ত জমলো। নিজেকে দমিয়ে গাড়ি স্টার্ট করলো সে। তখনই পুনরায় কানে বেজে উঠলো সায়েরীর বলা ‘ দূরে থাকুন, আপনার ছায়াও মাড়াতে যাবো না।’ কথাগুলো। মুহূর্তেই আবারো তীব্র রাগে ব্যাথা পাওয়া হাত দিয়ে পুণরায় স্টিয়ারিং-য়ে আঘাত করলো। সাথে সাথে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়লো হাত থেকে। সেই অবস্থাতেই তীব্র বেগে গাড়ি ছোটাল সাফওয়ান। বৃষ্টির বেগের কারনের সামনের দৃশ্যটুকু ঝাপসা দেখছে। কিন্তু সাফওয়ান থামলো না। বরং নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায় আরো স্পিড করলো গতি। যখনই মাথা চারা দিয়ে উঠছে একটু আগে অবচেতন মনে সায়েরীকে বলা কথাগুলো, ইচ্ছে করছে নিজেকেই শেষ করে ফেলতে। কেনো উদয় হল এই হিংসাত্মক অনুভূতি? কার প্রতি-ই বা জাগলো হিংসা! কেনো রাগ উঠলো সায়েরীর টোল পড়া হাসিটা অন্য ছেলে মুগ্ধ হয়ে দেখবে বলে? কেনো রাগ উঠলো ওই আকর্ষণীয় চোখজোড়া টলমল আশ্রুতে ভরে উঠার দৃশ্যটুকু অন্য কারো হৃদয় নিংড়ে দিবে বলে? কেনো? কেনো? কেনো?
স্বল্পভাষী, ইন্ট্রোভার্ট মানুষগুলো বোধহয় এমনই হয়। নিজেকে এবং নিজের অনুভূতিকে যথাযথ বহিঃপ্রকাশ করতে না পারায় এই ইহজগৎ-এ তারা সবচেয়ে বেশি অসহায়। আপন মানুষগুলোকে ঘিরে বেড়ে উঠা অনুভূতি প্রকাশে এরা অত্যন্ত আনাড়ি। যার ফলস্বরূপ বক্ষস্থলে যত্ন করে পুষে রাখা নিগূঢ়তম অনুভূতি-টুকু থেকে যায় আড়ালে আবডালে।
দুদিন আগেই রিসোর্ট বুকিং করে রেখেছিলো রূপম। রিসোর্ট থেকে সিলেটের সৌন্দর্য দেখার অনুভূতি অন্যরকম। জাহুরা খান প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। নিজেদের বাড়ি থাকতে ছেলে,মেয়ে কেনো রিসোর্টে গিয়ে থাকবে! কিন্তু পরবর্তীতে সাদিফের কথায় রাজি হয়ে গেলেন তিনি। সারাদিনের ঘুরাঘুরি’র পর সন্ধ্যা নাগাদ সকলে এসে পৌঁছালো রিসোর্টে। ” শুকতারা ন্যাচার রিট্রিট। ” সিলেট শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শুকতারা নেচার রিট্রিট রিসোর্ট। এটি সিলেটের খাদিমনগর এলাকায় অবস্থিত। সিলেট ওসমানী এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা এবং সিলেট রেলস্টেশন থেকে প্রায় ২০ মিনিটের রাস্তা। পাহাড়ের ওপর বানানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন রিসোর্টটি।
মোট তিনটে রুম বুকিং করা হয়েছিলো। সকলে যখন রিসোর্টে পৌঁছাল তখন প্রায় সাড়ে ছয়টা বাজে। রুমে ঢুকে বেশ খুশি হয়ে গেলো নাজরাত। অদ্ভুত সুন্দরভাবে ডিজাইন করা প্রতিটা জিনিস৷ ডেকোরেশনও অসম্ভব সুন্দর। থাই গ্লাস যুক্ত বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সৌন্দর্য। সারাদিনের ক্লান্তির কারণে বেশিক্ষণ জাগতে পারলো না নাজরাত। ফ্রেশ না হয়েই শুয়ে পড়লো বিছানায়। সাদিফ অবশ্য বেশ কয়েকবার বলেছিলো ফ্রেশ হয়ে ঘুমানোর কথা। কিন্তু ক্লান্তির কারণে ইচ্ছে করলো না নাজরাতের৷ সন্ধ্যার নাশতা করেই এসেছিলো তারা। তাই সাদিফ আর জোড়াজুড়ি করলো না। ভাবলো ডিনারের আগে ডেকে দিবে৷ এর আগ অবধি ঘুমিয়ে একটু ফুরফুরা হোক।
ঘন্টা দুয়েক পর আপনা আপনি ঘুম ছুটে গেলো নাজরাতের।
রুম তখন আবছা অন্ধকারে ঘেরা। হালকা সবুজ রঙের ড্রিম লাইট জ্বলছে শুধু। তার গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়ানো৷ নিশ্চয় এটা সাদিফ জড়িয়ে দিয়ে গেছে! নাজরাত ভালোভাবে চোখ মেলে তাকালো। কোথাও সাদিফের আনাগোনা নেই। হয়তো বাহিরে সে। সাদিফকে না দেখে বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করে বাসায় কল করে মায়ের কথা বলে নিলো নাজরাত। পরপর আবার শাশুড়ী মায়ের সাথেও কথা বললো। আলসেমি লাগছে ভীষণ। সারাদিনের হাঁটাহাঁটির কারণে পা জোড়া এখনো অল্প ব্যাথা করছে। খানিক্ষন এপাশ ওপাশ করেও যখন উঠতে ইচ্ছে হলো না, তখন সে ভিডিও কল লাগালো সায়েরীর কাছে। চার বারের মতো রিং হওয়ার পর রিসিভ করলো সায়েরী। বারান্দার ঝুলন্ত গোল দোলনায় বসে আছে সে। মোবাইল স্ক্রিনে সায়েরীর লালছে ফোলা ফোলা চোখ,মুখ ভেসে উঠতেই কপালে ভাঁজ পড়লো নাজরাতের। কল রিভিভ করেও মুখ ফুটে কিছু বললো না সায়েরী। চুপচাপ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো খোলা বারান্দার উপর কালো আকাশের দিকে। তার এমন গম্ভীরতা দেখে নাজরাত বললো,
‘ কি হয়েছে তোর? চোখ,মুখের এই দশা কেনো! কাঁদছিলি? ‘
জবাব দিলো না সায়েরী। দুপুরে বাসায় এসে অনেক্ষন যাবত কেঁদেছিল সে। শরীর খারাপের বাহানা দিয়ে রুম থেকেই বের হয়নি সন্ধ্যা অবধি। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘুমিয়েই পার করে দিয়েছিলো। প্রথমত কান্না, তারপর ঘুমের কারণে চোখ,মুখের ফোলা ভাব এখনো কমেনি। মা’কে মাথাব্যথার মিথ্যে অযুহাত দিয়ে পার পেয়ে গিয়েছিলো সে। কিন্তু নাজরাতকে বলতে পারলো না এই মিথ্যেটকু। তার চুপসে যাওয়া মুখ দেখে নাজরাত ছোট্ট করে ডাকলো, সায়ু!
সায়েরী চোখ তুলে তাকালো। সেই সাথে চোখ বেয়ে গাড়িয়ে পড়লো একফোঁটা নোনাজল। কান্না থামানোর চেষ্টায় কেঁপে উঠলো অধর যোগল। এই দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে নাজরাত দ্রুত উঠে বসলো শোয়া থেকে। সে জানে সায়েরী ছিঁচকাদুঁনে স্বভাবের। তবে এমন কিছু হলে মেয়েটা এতোক্ষণে কান্না মুখেই বকাঝকা করে হাজার খানের অভিযোগ জানিয়ে দিতো। কিন্তু তাকে আজ এমন চুপচাপ দেখে নাজরাত উদ্ধিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সায়ু! কাঁদছিস কেনো! কি হয়েছে? মামীমা বকেছে কিছু নিয়ে? ‘
সায়েরী নিশ্চুপ। থেমে থেমে নাক টানার শব্দ শুনা গেলো শুধু। নাজরাত আবারো প্রশ্ন করলো। এবার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে গাল মুছে সায়েরী একে একে সব কথা খুলে বললো। তিনদিন আগে সায়েরীর বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সাফওয়ানের দেওয়া হুমকি থেকে শুরু করে আজ দুপুরের সব ঘটনা একে একে বলে দিলো সে। সবটা শুনে হতভম্ব মুখে বসে রইলো নাজরাত। প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলো না কোনো। তার ঘোর কাটলো সায়েরীর কন্ঠে। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে ঠোঁট উলটে সে বললো,
‘ আমি কি করেছি? সবসময় আমার সাথেই কেনো এমন করে? ‘
নাজরাত তাকে অনেক বুঝি শুনিয়ে কান্না থামালো। দীর্ঘক্ষন কথা বলে কল কাটলো সায়েরী। নাজরাত তখনো ভাবুক চিত্তে থম মেরে বসে আছে। সাফওয়ানকে বিগত পাঁচ বছর ধরে চিনে সে। ছেলেটা রাগী,গম্ভীর, অনেকটা ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবের। একমাত্র বন্ধুদের সাথেই প্রাণোচ্ছল হয়ে থাকে সে। হাজারো মেয়ের স্বপ্ন পুরুষ হওয়া স্বত্তেও নীতি এবং ইরা ব্যাতিত অন্য কোনো পর-নারী তার পাশ ঘেঁষারও সাহস পায়নি। সেখানে সাফওয়ান নিজে কিনা সায়েরীর হাত,গাল চেপে ধরে হুমকি ধামকি দিয়েছে! মানা যায় একথা? সাফওয়ানের মতো দৃঢ় ব্যাক্তিত্বের ছেলে কিনা স্বেচ্ছায় কোনো মেয়ের এতোটা কাছাকাছি এসেছে! অযথা এতোগুলা কথাও শুনিয়েছে! মানে কি এসবের? সাফওয়ানের মনে আসলে চলছে টা কি!!
অনেক ভাবার পরেও কোনো কূল কিনারা পেলো না নাজরাত। অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠে লম্বা সময় নিয়ে স্নান করে বের হলো সে। রুমে তখনো সাদিফের আগমন না দেখে এবার কপালে ভাঁজ পড়লো তার। বউ রেখে কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে এই লোক! মোবাইল হাতে নিয়ে সাদিফের নাম্বারে ফোন লাগালো সে। রিং হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই রিসিভ করলো সাদিফ৷ বললো,
‘ অবশেষে ঘুম ভেঙেছে মহারাণী’র? ‘
‘ সে তো অনেক আগেই ভেঙেছে। কিন্তু আপনি কোথায়! রুমে ফিরছেন না কেনো? ‘
‘ রিসোর্টেই আছি। তুমি দেখো, কাবার্ডে লেফট সাইডে একটা পার্সেল রাখা আছে। রেডি হয়ে আমাকে জানিয়ে দিবে। ডিনারের জন্য বের হবো। ‘
নাজরাতকে প্রতিউত্তর করার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিলো সাদিফ। বাধ্য হয়ে মোবাইল রেখে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেলো নাজরাত। সাদিফের কথামতো কাবার্ডের বাম দিকের অংশ খুলতেই চোখে পড়লো মাঝারি আকৃতির একটা পার্সেলের দিকে। ধীরে সুস্থে খুললো সেটা। ভিতরে লাইট পিংক কালারের একখানা জরজেট শাড়ি। সাথে একটা জুয়েলারি বক্স। যাতে হোয়াইট স্টোনের একজোড়া চুড়ি,ম্যাচিং একজোড়া ইয়ারিং এবং ছোট্ট লকেটযুক্ত চেইন। জিনিসগুলো দেখে মনটা ফুরফুরা হয়ে গেলো নাজরাতের। খুশি মনে শাড়ি পরে একে একে সব জুয়েলারি পড়ে নিলো সে। মুখে হালকা প্রসাধনী মেখে ঠোঁটে একটুখানি গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়ে নিলো। খোলা চুল ছড়িয়ে দিলো পিঠময়। সাজগোছ শেষে আবারো সাদিফকে কল লাগালো সে। কিন্তু এবারে রিসিভ হলোনা কল।পরপর আরো দুইবার কল করলো সে। তবুও কোনো রেসপন্স পেলো না উপাশ থেকে৷ মিনিট খানিক পর দরজায় নক করলো কেউ। নাজরাত গিয়ে খুলে দিলো দরজা। সম্মুখে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে। গায়ের ইউনিফর্ম দেখে নাজরাত বুঝতে পারলো মেয়েটা রিসোর্টের একজন কর্মচারী। নাজরাতের দিকে মেয়েটা মুচকি হেসে বললো,
‘ আপনি মিসেস শাহরিয়ার? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ আমাকে আপনার হাসবেন্ড এখানে পাঠিয়েছে ম্যাডাম৷ আপনি আসুন আমার সাথে। ‘
কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না নাজরাত। অগত্যা মেয়েটার পিছু পিছু চলতে লাগলো সে। সিড়ি বেয়ে দুজন উঠে গেলো ছাদে। দরজর কাছাকাছি এসে মেয়েটা নাজরাত’কে রেখেই চলে গেলো পুণরায়। অবুঝ মুখে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলো নাজরাত। এরপর ধীর পায়ে প্রবেশ করলো ছাদে। নিস্তব্ধ, নিরিবিলি পরিবেশ। কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই এখানে। জায়গায় জায়গায় কৃত্রিম কিছু গাছ বসানো। তারউপর ছোট ছোট ফেইরি লাইট জ্বলজ্বল করছে। ছাদের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ ডান দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলো নাজরাত। সেখানটাই খুব সুন্দর ডেকুরেশন করে ছোট্ট একটা টেবিল এবং দুইপাশে দুটো চেয়ার বসানো হয়েছে। জায়গাটাতে খুটি গেড়ে খুবই পাতলা সাদা, সাদা কয়েকটা পর্দা দিয়ে ঘেরোয়া করা হয়েছে। বাতাসের তালে তালে পর্দাগুলো এলোমেলো উড়ছে। খুটির সাথে কৃত্রিম ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে কালারফুল লাইট। টেবিলে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। নিচেও ফুলের ছড়াছড়ি। নাজরাত স্তব্ধ, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে৷ হঠাৎ কেউ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে। চমকে উঠলো নাজরাত। পরমুহূর্তে বুঝতে পারলো মানুষটা সাদিফ। নাজরাতের কাঁধে থুতনি রেখে সাদিফ মৃদু কন্ঠে বললো,
‘ কেমন লাগলো সারপ্রাইজ? ‘
মুগ্ধতায় ডুবে থাকা নাজরাত জবাব দিতে পারলো না কোনো। সাদিফ আবারো বললো,
‘ পছন্দ হয়েছে? ‘
নাজরাত ছোট্ট করে জবাব দিলো, খুব!
সাদিফ হাসলো। হাত টেনে নাজরাতকে নিয়ে গেলো টেবিল বসানো জায়গাটা’তে। নাজরাত তখন সাদিফকে দেখতে ব্যস্ত। স্কাই ব্লু শার্ট এবং ব্ল্যাক প্যান্ট পড়েছে সাদিফ। কনুই অবধি গুটানো হাতা এবং এক হাতে সুভা পাচ্ছে সিলভার কালারের ঘড়ি। বরাবরের মতোই খুব সুন্দর করে সেট করা চুল। হলদেটে মুখে খোচাখোচা দাড়ি।নাজরাত ছোট খাটো ক্রাশ খেলো যেনো সাদিফকে এই রূপে দেখে। নাজরাতের জন্য চেয়ার টেনে দাঁড়িয়ে ছিলো সাদিফ। কিন্তু নাজরাতকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে খানিকটা উঁচু কন্ঠে বললো,
‘ দাঁড়িয়ে কেনো! বসো। ‘
চমকে উঠে নজর নামিয়ে নিলো নাজরাত। এরপর গিয়ে বসলো চেয়ারে। পরপর সাদিফ গিয়ে বসলো মুখোমুখি চেয়ারটাতে। টেবিলে আগে থেকেই খাবার রাখা ছিলো। একে একে সব খাবার থেকে ঢাকনা সরিয়ে সাদিফ নিজেই সার্ভ করে দিলো। নাজরাত শুধু দেখেই গেলো সব। প্রতিনিয়ত তার বুকে সাদিফের প্রতি ভালোবাসাটা নিগূঢ় রূপ নিচ্ছে, তা ঠের পাচ্ছে সে। হবে না-ই বা কেনো! এই ছেলেকে ভালো না বেসে থাকা যাবে বুঝি?
‘ হঠাৎ হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যাও তুমি? খেয়ে নাও। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ‘
সাদিফের কন্ঠে ঘোর কাটলো নাজরাতের। মাথা নিচু করে খাবারে মনযোগ দিলো সে। চোরা চোখে আবারো সাদিফের দিকে তাকাতেই দেখলো সাদিফ আগে থেকেই তাকিয়ে। থমথম খেয়ে দ্রুত নজর সরিয়ে নিলো সে। সাদিফ তাকিয়েই রইলো পুরোটা সময়। লজ্জা,ভয়,অস্বস্তিতে নাজরাত ঠিকঠাক খেতে পারলো না কিছু। কিন্তু সাদিফ বেশ আয়েশ করেই খেলো। খাওয়ার পর আবার ডেজার্ট এগিয়ে দিলো নাজরাতের দিকে। এবারে কিছুটা খেতে পারলো নাজরাত। ডিনার শেষে নাজরাতকে নিয়ে ছাদের বাম দিকের খোলা অংশে গিয়ে দাঁড়ালো সাদিফ। জায়গাটা অনেকটা অন্ধকারে ঘেরা। দুজনেই গ্লাস ভর্তি সফট ড্রিংকস নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে রাতের পাহাড় দেখতে লাগলো। উঁচু বিল্ডিং হতে পাহাড়ি নিচু এলাকাগুলো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। মিটিমিটি লাইট জ্বলছে সারি সারি ঘরগুলোতে। নাজরাতের পিঠ ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ।
একহাত নাজরাতের কোমড়ের পাশ দিয়ে রেলিংয়ে রাখা। অন্যহাতে গ্লাস। সাদিফের এতো কাছাকাছি থাকতে অন্যরকম এক অনুভূতি গা কাঁটা দিয়ে উঠছে নাজরাতের। পাহাড়ি এলাকাগুলো দেখিয়ে অনেক কথা বললো সাদিফ। কিন্তু কিচ্ছুটি কানে ঢুকলো না নাজরাতের। কথার তালে তালে ঘাড়ের কাছে সাদিফের উষ্ণ নিশ্বাস অনুভব করেই নাজরাতের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মিনিট খানিক পর সাদিফ নাজরাতের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে কোথায় যেনো গেলো। সম্ভবত সেগুলো রেখে আসতে গিয়েছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো নাজরাত। শ্বাস নিলো লম্বা করে। কিন্তু তার সেই স্বস্তি টিকলো না বেশিক্ষণ। হঠাৎ করেই নিভে গেলো ছাদে জ্বলতে থাকা বড় লাইটগুলো। শুধুমাত্র ছোট ছোট ফেইরি লাইটগুলোর আলো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। তবুও বলতে গেলে ছাদটা বর্তমানে অন্ধকার প্রায়। নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎ গানের আওয়াজ ভেসে আসলো কানে। দ্বিতীয় দফা চমকে উঠলো নাজরাত। তখনই তার সম্মুখে এসে হাজির হলো সাদিফ। নাজরাতের অবাক দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সে হাত বাড়িয়ে নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ ক্যান আই হ্যাভ মাই ডান্স পার্টনার প্লিজ? ‘
স্তব্ধ নাজরাত লজ্জা,ভয় সাথে নিয়ে কম্পিত হাত তুলে দিলো সাদিফের পুরুষালি হাতের ভাঁজে। মুচকি হেসে ছাদের মাঝামাঝি স্থানে নাজরাতকে নিয়ে হাজির হলো সাদিফ। একহাতে নাজরাতের হাত উঁচু করে ধরে অন্যহাতে সে নাজরাতের কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন “Ed Sheeran” – এর “Perfect” গানটা বেজে চলছে। গানের তালে তালে মৃদু মৃদু শরীর দুলছে দুজনের। নাজরাতের নত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে হুট করে কানের কাছে ঝুঁকে আসলো সাদিফ। শান্ত কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
‘ এই শাড়িতে তোমাকে আমার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে। ‘
লজ্জায় আরো নত হয়ে গেলো নাজরাত। সাদিফ ঝুঁকে থাকতে থাকতেই আচমকা গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়ালো নাজরাতের কানে। বরাবরের ন্যায় কম্পিত হলো নাজরাতের দেহ। পরপর সাদিফের উষ্ণ স্পর্শ নেমে আসলো নাজরাতের ঘাড়ে। দুই হাতে শক্ত করে নাজরাতের কোমড় জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিলো সে। ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে তুললো নাজরাতের ঘাড়। তীব্র অনুভূতিতে টালমাটাল নাজরাত থরথর করে কাঁপছে। শরীরের ভার ধরে রাখতে না পেরে সে খামচে ধরেছে সাদিফের বাহু। শ্বাস চলছে দ্রুত। সাদিফ নিজেও নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে সে ঘাড়ে মুখ গুজে রেখেই নিম্ন কন্ঠে ডাকলো, নাজরাত!
একপ্রকার ঘোরের মাঝেই নাজরাত জবাব দিলো, হু?
সাদিফ মুখ তুলে তাকালো। চোখ বুজে থাকা নাজরাতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে শ্বাস ফেললো বড় করে। অস্থির কন্ঠে বললো,
‘ ক্যান আই…ক্যান আই কিস ইউ? ‘
ইশশ! গা কাঁটা দিয়ে উঠলো নাজরাতের। সাদিফের অস্থিরতায় ভরা কন্ঠটা কানে যেতেই চোখজোড়া আরো খিচে বন্ধ করে ফেললো সে। শ্বাস প্রশ্বাস হলো আরো দ্রুত। মুখ দিয়ে কোনো জবাব বেরুতে চাইলো না। কিন্তু ধরে রাখা হাতের বন্ধন আরেকটু দৃঢ় করলো সে। কদম এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হলো আরো একটু৷ সাদিফ যেনো নিজের জবাব পেয়ে গেলো। নাজরাতের কোমড় থেকে একহাত ছাড়িয়ে সেই হাত দিয়েই নাজরাতের মুখ তুলে ধরলো সে নিজের মুখোমুখি। এবং মুহুর্তেই বেসামাল হয়ে নিজের পুরুষালি ঠোঁটজোড়া ডুবিয়ে দিলো সে নাজরাতের গোলাপি ঠোঁটের ভাঁজে।
মুহুর্তেই ঝংকার দিয়ে কেঁপে উঠলো নাজরাতের দেহ। দ্বিগুণ শক্ত করে খামচে ধরেছে সে সাদিফের বাহু। তার দেহের কম্পন অনুভব করে সাদিফ তার কোমড় এবং মাথার পেছনে হাত রেখে আরো ঘনিষ্ঠ হলো। থেমে থেমে ডুবে যেতে লাগলো প্রিয়তমার গোলাপি অধরের গভীরতায়। নিস্তব্ধ প্রহর,ঝিরিঝিরি বাতাস। উন্মাদনায় মত্ত দুই নর-নারী। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখনো বেজে চলছে আগের গানটি…
Darling, just kiss me slow
Your heart is all I own
And in your eyes, you’re holding mine
Baby, I’m dancing in the dark
With you between my arms
Barefoot on the grass
Listening to our favourite song
When you said you looked a mess
I whispered underneath my breath
But you heard it
Darling, you look perfect tonight….!!
রাত সাড়ে ন’টা। এই অসময়ে হঠাৎ মিসেস তাহুরা খান’র ফোনকল পেয়ে চিন্তায় পড়ে গেলো মিহাদ। দ্রুত কল রিসিভ করে সালাম জানালো সে। সালাম ফিরিয়ে দিয়ে তাহুরা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,
‘ বাবা, সাফওয়ানের সাথে কথা হয়েছে তোমার? ‘
‘ দুপুরে একসাথেই তো বাড়ি ফিরেছিলাম, আন্টি। এরপর কথা হয়নি আর। কোনো সমস্যা হয়েছে কি? ‘
তাহুরা খান চিন্তিত কন্ঠে জবাব দিলেন,
‘ ছেলেটা দুদিন যাবত এমনিতেই বাড়ি ফিরেনি। আজ দুপুরে ফিরলো তাও আবার বৃষ্টিতে ভিজে। তোমরা তো জানো ওর বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর এসে যায়। আজ না জানি কি হয়েছে, বাসায় এসে আরো দুই ঘন্টা শাওয়ারে ভিজেছে। হাতেও দেখলাম ব্যাথা পেয়েছে। এই অবস্থাতেই সন্ধ্যা নাগাদ কোথায় যেনো বেরিয়ে গিয়েছিলো, এখনো অবধি বাড়ি ফিরেনি। রাত দশটা বাজতে চললো। আবার কার সাথে রাগারাগি করে এসব করছে কি জানি। এই ছেলেকে নিয়ে আমি করি বলতো! কোথায় খুঁজবো এখন ওকে?
কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো মিহাদের। প্রথমে সন্দেহ লাগলেও এবার সে সিউর হয়ে গেলো, কিছু তো একটা হয়েছে সাফওয়ানের। তাহুরা খান’কে আশ্বস্ত করে সে বললো,
‘ আপনি টেনশন করবেন না আন্টি। সাফওয়ান নিশ্চয়ই গ্রীন ভ্যালি-তে আছে। আজ সকালেও গ্রীন ভ্যালি তে গিয়েই দেখা করেছি ওর সাথে। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। ওর সাথে দেখা করে আপনাকে জানাবে। ‘
তাহুরা খান ভরসা পেলেন। কল কেটে মিহাদ বেরিয়ে পড়লো সাফওয়ানদের ফার্ম হাউস গ্রীন ভ্যালি’র উদ্দেশ্যে।
তীব্র মাথা ব্যাথায় চোখ বুজে শুয়ে আছে সাফওয়ান। অনেকটা ঘুম ঘুম ভাব চোখে। হঠাৎ বাইকের আওয়াজ কানে আসলো। মিনিট খানিকের মধ্যে রুমের দরজায় ধুপধাপ শব্দ। এবং দরজা খুলে ভেতরে ঢুকুলো একের অধিক ব্যাক্তি। তাদের পদচারণের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলো সাফওয়ান। তবুও চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করলো না তার। রুমের লাইট জ্বালালো একজন৷ এরপর সব নিরব। ত্রিশ সেকেন্ড মতো কেটে যাওয়ার পরেও কারো কোনো সাড়া না পেয়ে এবার লালছে চোখজোড়া মেলে তাকালো সাফওয়ান। এবং সঙ্গে সঙ্গে আৎকে উঠে চট করে উঠে বসলো শোয়া থেকে। তার মুখের অতি নিকটে তিনটা মুখ গোলগোল চোখ করে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। সাফওয়ান হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো। তাকে এভাবে লাফিয়ে উঠতে দেখে বাকি তিন আগন্তুকও চমকে উঠলো। মিহাদ বুকে থু থু দিয়ে বললো,
‘ আস্তে উঠতে পারলি না? আরেকটু হলেই আমার প্রাণপাখি উড়াল দিতো। ‘
সাফওয়ান চোখ কচলে তাকালো৷ তার সামনে উপস্থিত নীতি,রায়ান এবং মিহাদ। এই অসময়ে তিনজন’কে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ তোরা এসময় এখানে কি করছিস? আর ভূতের মতো আমার মুখের সামনে কি করছিলি? ‘
ছোট ছোট চোখ করে সাফওয়ান’কে পরখ করছিলো নীতি। সাফওয়ানের কথা শুনে সে বিছানার বসে সাফওয়ানের কপালে হাত ছোঁয়াল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেটা স্থায়ী করতে পারলো না। উত্তাপে তার হাত ঝলসে উঠলো যেনো। অবাক কন্ঠে সে বললো,
‘ এই জ্বর নিয়ে তুই বাইরে বাইরে ঘুরছিস? এমনিতে দুই তিন দিনের আগে কখনো তোর জ্বর সেরে উঠে না। তার মধ্যে আজ কিনা দুই ঘন্টা শাওয়ারের পানিতে ভিজেছিস। পাগল টাগল হয়ে গেলি নাকি? এমন অদ্ভুত বিহেভ করছিস কেনো হঠাৎ! ”
সাফওয়ান নিশ্চুপ। নিজের এলোমেলো চুলে ব্যাকব্রাশ করে সে বেশ আয়েশ করে হেড বোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসলো। ভাব ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই সে শরীরে ১০৪ ° জ্বর বসে আছে সে। তার নির্লিপ্ততা দেখে বড্ড বিরক্ত হলো মিহাদ। বিরক্ত কন্ঠে নীতিকে বললো,
‘ ওর কাছে কি জিজ্ঞেস করছিস? তোর মনে হয় এই ছেলে জবাব দিবে কোনো? ‘
একটু থেমে আবার বললো,
‘ বান্দরবান গিয়ে নিশ্চয়ই কোনো ভূতুড়ে বাতাস লেগেছে এই ছেলের গায়ে। নাহলে ও তো এমন অধৈর্য, এলোমেলো স্বভাবের ছিলো না! একরাত যে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে কাটিয়ে দিয়েছিলো, নির্ঘাত কোনো পেত্নীর অশুভ ছায়া লেগেছে তখন। সুন্দর ছেলেদের উপর নাকি এদের আকর্ষণ তীব্র হয়৷ এমন কিছুই হবে হয়তো, মিলিয়ে নে তোরা। ‘
মিহাদের অযৌক্তিক কথায় মহা বিরক্ত হলো উপস্থিত তিনজন। সাফওয়ান কপালে আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে বললো,
‘ এই স্টুপিড’কে বের কর আমার রুম থেকে। আর তোরাও যা প্লিজ৷ আমার কিছুই হয়নি। আ’ম পারফেক্টলি ফিট অ্যান্ড ফাইন। শুধু শুধু এতো রাতে এখানে বসে মাথা খারাপ করবি না। বের হ সবাই, গো। ‘
সাফওয়ানের কথায় কারো কোনো হেলদোল হলো না। নিরবতা ভেঙ্গে রায়ান হুট করে বলে উঠলো,
‘ ওটা কি জিনিস? কোনো মেয়ে মনে হচ্ছে! ‘
সাফওয়ান, নীতি, মিহাদ তিনজনই ফিরে তাকালো। রায়ান নিজের নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটা তর্জনী দ্বারা ঠেলে দিয়ে আঙুলের ইশারায় দেখালো রুমের কর্নারে থাকা ক্যানভাস -টার দিকে। সাদা ক্যানভাসের উপর জ্বলজ্বল করছে আকর্ষণীয় একজোড়া চোখের চিত্র। সাফওয়ান চমকে উঠলো। বেড থেকে নেমে যে ক্যানভাস-টা ঢেকে দিবে সেই সময়টুকু পেলো না সে। তার আগেই নীতি এবং মিহাদ চুম্বক আকর্ষণের মতো ছুটে গেলো ক্যানভাসটার কাছে। মিহাদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললো,
‘ ওরে শালা! আজকাল মেয়েদের ছবি আঁকাও শুরু করেছিস দেখছি! প্রেমে ট্রেমে পড়ে যাসনি তো আবার? ‘
কেশে উঠলো সাফওয়ান। ছোট খাটো বিষম খেলো যেনো সে। নীতি ছবিটা দেখতে দেখতে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো,
‘ আরে! এটা তো সায়েরী!! ‘
সাফওয়ান সহ বাকি দুজন চমকে উঠলো। রায়ান বললো,
‘ এটা সায়েরী হতে যাবে কেনো? এমনি একজোড়া চোখ এঁকেছে….
‘ তুমি চুপ করো। আমি এই চোখ চিনবো না! আরে সায়েরীর সেই বাচ্চাকাল থেকেই ওর চোখের উপর ফিদা আমি। এই মেয়ের চোখগুলো এত্তো সুন্দর! ওর গোলগাল মুখের সাথে কি মায়াবী লাগে দেখতে। আর এই যে চোখের একটু নিচে তিলটা? এটাও তো….. ‘
কথা বলতে বলতে আচমকা থেমে গেলো সে। কিছু একটা মাথায় খেলে যেতেই হুট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। চোখে মুখে একরাশ বিষ্ময় তার৷ নীতি’র চোখে চোখ পড়তেই নজর লুকাল সাফওয়ান। কপালে আঙ্গুল ঘষে চোখ খিচে ফেললো। হতভম্ব নীতি সাফওয়ানের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক কন্ঠে বললো,
‘ ও মাই গড! ও.. মাই গড!! সাফওয়ান? তুই…মানে তুই? কি হচ্ছেটা কি? মানে..কিভাবে কি!! ‘
অতি উত্তেজনায় কথা আটকে আসলো নীতি’র। সাফওয়ান দু’হাতে মুখ ঘষলো বার কয়েক। মিহাদ এবং রায়ান অবুঝ মুখে তাকিয়ে। নীতি দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসলো সাফওয়ানের দিকে। অনেকটা পাশ ঘেঁষে বসলো। তার এমন বিষ্ময় ভরা মুখ দেখে সাফওয়ান আমতাআমতা করে বললো,
‘ দেখ, তুই যেমন ভাবছিস এমন কিছুই না। আমি…মানে আমি এটা এমনি এঁকে…. ‘
তার কথাটুকু শেষ করতে না দিয়ে ফট করে প্রশ্ন করলো,
‘ তুই সায়েরী’কে পছন্দ করিস? ‘
সাফওয়ান চমকালো। সামান্য প্রশ্নটুকু বুকে গিয়ে লাগলো যেনো। তার উচিত এখন ফটাফট নীতি’র মুখের উপর ‘না’ বলে দেওয়া। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সে কিছুই বলতে পারলো না। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি হুট করেই তীব্র রূপ নিলো। এই ছোট্ট প্রশ্নটুকু নাড়িয়ে তুললো তার সর্বত্র। তার এমন নিরবতা দেখে নীতি সোজাসাপ্টা কন্ঠে বললো,
‘ কবে থেকে পছন্দ করিস? ‘
স্তম্ভিত সাফওয়ান নড়েচড়ে বসলো। জবাব দিতে পারলো না কোনো। নীতি’র জহুরি নজর তখনো তার পানে। সেই তীক্ষ্ণ নজর থেকে সাফওয়ান চট করে নেমে পড়লো বেড থেকে। কাঁচের দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বুক টান টান করে। তার জবাব না পেয়ে নীতি বললো,
‘ এড়িয়ে গেলেই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে না দোস্ত। তোর মতো স্পষ্টভাষী ছেলে যদি এমন নিশ্চুপ হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাপারটা আমি হ্যাঁ ধরে নিতে বাধ্য হবো। ‘
চোখ বুজে তপ্ত শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। নীতির দিকে ফিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো সে। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। এরপর লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,
‘ আমি জানি না কি হচ্ছে আমার সাথে। মানে.. এমন অদ্ভুত অনুভূতি কখনো অনুভব করিনি আমি। আর ওই মেয়েটা! সি ইজ সাচ অ্যা স্টুপিড ইয়ার। মানে একটা মানুষ এতোটা মাথামোটা, এতোটা অপরিপক্ক কিভাবে হতে পারে! আই গেস্, কোনো দশ বছরের বাচ্চার বুদ্ধিটুকু-ও নেই ওর মাথায়। অ্যান্ড.. ক্যান ইউ ইমাজিন, ওই মাথামোটা মেয়েটাকে নিয়ে আমি উলটা পালটা স্বপ্ন দেখছি! আই ডোন্ট নো হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং উইথ মি। কিন্তু ওর প্রত্যেকটা প্রতিক্রিয়া আমাকে প্রভাবিত করছে। আমি এই আমিটাকে চিনতেই পারছি না। সেদিন রাগের মাথায় ওকে বলেছিলাম যাতে আমার সামনে না আসে। কিন্তু তিনদিন পার করতেও পারলাম না, নিজেই ছুটে গিয়েছি। ওর দেখা না পেয়ে এতোটা অস্থির অস্থির লাগছিলো বুকে! আর আজ.. আজকে না জানি কি হয়েছিলো আমার! কলেজে এমন ওপেনলি ওকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে ভীষণ রাগ লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো এই দৃশ্য দেখার অধিকার কারো নেই। ওর এই সুন্দর চোখজোড়া কান্নায় ঝলমলিয়ে উঠার দৃশ্যটুকু দেখার অধিকারও নেই কারো। এসব ভেবেই রাগ রাগছিলো ভীষণ। কেনো এমটা হচ্ছে? আমি তো এমন হিংসুটে ছিলাম না! আ’ম গোয়িং ক্রেজি ইয়ার!! ‘
নিজের এলোমেলো কথাগুলো বলে লম্বা দম নিলো সাফওয়ান। কি বলেছে না বলেছে কিচ্ছুটির জ্ঞান নেই তার। জ্বরের ঘোরে মনের কোণে জমে থাকা সব কথা ব্যক্ত করে দিলো সে। অন্যদিকে তার কথাগুলো শুনে উপস্থিত তিন মানব-মানবী যেনো প্রতিক্রিয়া করতেই ভুলে গেলো। হতভম্ব মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। সেকেন্ড কয়েক কেটে যাওয়ার পর নীতি হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ঝাপটে ধরলো সাফওয়ান’কে৷ উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
‘ ও মাই গড! ও মাই গড!! সাফওয়ান খান প্রেমে পড়েছে! প্রেম কি.. রীতিমতো ভালোবাসার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে! আল্লাহ! আমার বিশ্বাস-ই হচ্ছে না! এই গোমড়ামুখো টা প্রেমে পড়েছে! ‘
নিজের বাহু থেকে নীতি’কে সরিয়ে দিয়ে সাফওয়ান বিরক্ত মুখে বললো,
‘ সর! ঘেঁষাঘেঁষি করবি না একদম। আমার পছন্দ না। ‘
‘ সরি সরি দোস্ত। এক্সাইটমেন্টে মাথাতেই ছিলো না। আচ্ছা এসব ছাড়। আগে বল, সায়েরী’কে প্রপোজ করছিস কবে? ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ উলটা পালটা বকবি না। না আমি প্রেমে পড়েছি, না ওই স্টুপিড মেয়েকে আমি এসব বলতে যাবো। তোরা প্লিজ বের হ এখান থেকে। ‘
নীতি সাফওয়ানের এলোমেলো চুল ঘেটে দিয়ে বললো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৭+২৮
‘ প্রেমে তো তুমি গভীর ভাবে পড়েছো বন্ধু৷ এবার শুধু উপলব্ধি করার পালা। তবে যায় বল, তোর প্রেম ভাগ্য ভীষণ খারাপ। এই পুচকি মেয়েকে প্রেমিকা হিসেবে পেতে হলে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে তোকে। ভেরি সেড! ‘
সাফওয়ান থমকালো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সায়েরীর মায়াবী চেহারার অবয়ব। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেলো যেনো। মস্তিষ্ক মানতে চাইলো না যে সে প্রেমে পড়েছে। তাও কিনা এমন এক ইম্যাচিউর মেয়ের প্রেমে! কিন্তু বুকের এই ধুকপুকানি কথাটুকু মেনে নিতে বাধ্য করছে তাকে। ভাবনার মাঝে ধপাস করে শব্দ হলো কিছুর। চমকে উঠলো সাফওয়ান সহ নীতি এবং রায়ান। পাশ ফিরতেই দেখলো হাত পা ছড়িয়ে ফ্লোরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে মিহাদ। উপস্থিত তিনজন হতবাক এই দৃশ্য দেখে। ইতিহাসের পাতায় এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটলো বোধহয়, এক বন্ধুর প্রেমে পড়ার খবর শুনে অপর বন্ধু হলো বেহুশ!!
