Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫১+৫২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫১+৫২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫১+৫২
সাজিয়া জাহান সুবহা

বিগত কিছুদিন যাবত তোহা বেশ চুপচাপ থাকে। প্রয়োজন ব্যাতিত খুব একটা কথাও বলে না। আয়ানের দিকে তো ভুলেও ফিরে তাকায়না। ব্যাপারগুলো অন্যদের আগে আয়ান-ই লক্ষ্য করে৷ করার-ই কথা। অঘটন যেহেতু সে ঘটিয়েছে, তাই তোহার এরূপ পরিবর্তন টাও শুরুতেই লক্ষ্য করেছে সে। লক্ষ্য করার পর যে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছে এমন নয়। বহুবার চেষ্টা করেছে কথা বলার। মান অভিমান মিটিয়ে নেওয়ার। কিন্তু মেয়েটা পাত্তা দিলে তো। এমন ব্যবহার করে যেন চোখের সামনে আয়ান নামক কোনো প্রাণী নেই। বাকিদের সাথে স্বাভাবিক থাকলেও আয়ানকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলছে। এই নিয়ে ছেলেটার নাজেহাল অবস্থা।

এমনিতেই শান্তিপ্রিয় ছেলে সে। কিন্তু তার কারণে অন্য একজন অশান্তিতে আছে, ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না তার৷ যতবারই তোহার উদাসীন মুখখানা দেখে, বুকের ভিতর টা হু হু করে উঠে তার। তোহাকে নিয়ে তার অনুভূতি বদলেছে। আগের মতো কেবল বন্ধুর নজরে দেখতে পারে না এখন। না চাইতেই মনে পড়ে যায় তোহার সেই স্বীকারোক্তি। সেই অনুভূতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে তাকে। তন্মধ্যে শোয়েব নামক ছেলেটা ইদানীং বেশ ঘুরঘুর করে তোহার আশেপাশে। অদ্ভুত ভাবে, এই ছেলেকে দেখলেই আয়ানের ভিতরটা অশান্ত হয়ে উঠে। কেমন যেন অস্থির লাগে খুব। মেনে নিতে পারে না ছেলেটাকে তোহার আশেপাশে। কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাধ্য নেই। বলবেই বা কেনো? কোন অধিকারে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ আয়ান!!!! ‘
কানের কাছে আকস্মিক বিকট চিৎকার শুনে আয়ান হকচকিয়ে উঠে। তড়িঘড়ি করে কানে হাত চেপে ধরে বলে উঠে,
‘ কি! কি! কার কি হয়েছে? ‘
পাশের চেয়ারে অবস্থানরত সায়েরী চোখ পাকিয়ে তাকায়,
‘ কানের মাথা খেয়েছিস নাকি? কবে থেকে ডাকছি! ‘
‘ খেয়াল করিনি। বল, কি বলছিলি। ‘
‘ খেয়াল থাকে কোথায়? তুই আর তোহা, দুজনের হয়েছে কি বলত? কয়েক দিন যাবত কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছিস।

আচমকা এমন কথায় আয়ান চমকিত নজরে তাকালো সম্মুখে। তোহাও একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই তোহা নজর নামিয়ে নিলো। আয়ান মৃদু কেশে স্বাভাবিক রাখে নিজেকে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বলে,
‘ ওর কি হয়েছে আমি কি করে বলবো? তাছাড়া আমি তো একদম ঠিক আছি। ‘
একথার রেশ টেনে তোহা ফোড়ন কেটে বলে,
‘ সেটাই। আমার কি হয়েছে সেটা ও জানবে কীভাবে? জানার প্রয়োজন নেই তো। আর,আমি আমার মতো ঠিক আছি৷ কিছুই হয়নি। হলেও নিজের মতো ঠিক করে নেব। কারো দয়ার প্রয়োজন নেই। ‘
আকস্মিক তোহার এধরণের কথাটার অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না কেউ। মেয়েটা স্বভাবে খানিকটা রগচটা। কিন্তু এমন নয় যে অকারণে ঝগড়া করবে৷ আজ তবে হলো কি!
আয়ান নিজেও মেনে নিতে পারলো না তোহার কথাটা। তার দোষটা কোথায়? অকারণে কেনো এত শুনতে হচ্ছে?
দুজনের মাঝে বাম হাত ঢুকিয়ে দিয়ে নুহাশ হুট করেই বলে উঠলো,

‘ এই আনা কানা নিশ্চয়ই গন্ডগোল পাকায়ছে। বেদ্দপ শয়তানের নানী, তোর তো মানুষের ভালা সহ্য-ই হয়না। সেদিনও দেখলাম কথা শুনালি। আর আজকেও। আমার এই ভুলা ভালা বন্ধুটার ঘাড়ে দোষ চাপাবি না কইলাম। সব গন্ডগোলের মূল তুই। ‘
কথাটা শুনে তোহা যেন ধপ করে জ্বলে উঠলো। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো হুট করে৷ চাপা কন্ঠে চেঁচিয়ে বললো,

‘ হ্যাঁ। আমি-ই তো সব সমস্যার মূল। থাক তোরা। আমি না থাকলেই বরং ভালো। ‘
কথাটা বলে এক সেকেন্ডও বিলম্ব করল না সে। প্রস্থান করলো দ্রুত পায়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই কান্ডে সকলে হতবাক। নুহাশ আহাম্মকের মতো হা করিয়ে তাকিয়ে রইলো তোহার গমন পথের দিকে। সবসময় যেমন বলে, আজও তেমন বলেছে। কিন্তু তোহা এমন উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা কে জানত! নিজের হতবাক দৃষ্টি সরাতেই সে লক্ষ্য করলো বাকিরা তার তার দিকে ‘খেয়ে ফেলব’ নজরে তাকিয়ে। আমতাআমতা করে সে বলে উঠলো,
‘ আজব! আমি কি এমন বলেছি? এত রাগ করার কি আছে? ‘
কথাটা বলার সাথে সাথে আয়ান শক্ত হাতে এক চাপড় মারল নুহাশের মাথার পেছনে। সে যেন পারছে না এক্ষুনি গিলে ফেলতে নুহাশকে। এমনিতেই তোহার চিন্তায় চিন্তায় রাতে ঘুম হয়না তার। এখন পরিস্থিতি আরও বিগড়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে ধমকে উঠলো,

‘ আমাদের কথার মাঝে বাম হাত ঢুকাতে কে বলেছে তোকে? না জেনে উল্টো পালটা বললি কেনো? ‘
‘ আরে আমি তো তোর জন্যই… ‘
‘ ধুর শালা! চুপ থাক। ‘
রাগ্বত স্বরে কথাটা বলেই চলে গেল আয়ান। নুহাশ সবে নিজেকে সামলে বসেছে এমন সময় পুণরায় টাশ করে থাপ্পড় পড়লো মাথায়। পরপরই শুনা গেল নাজরাতের কন্ঠ,
‘ গাধা! হুদাই ঝামেলা পাকালি। ‘
একই সাথে সাফ্রিনও মারলো। বিড়বিড় করে নুহাশকে বকতে বকতে তারাও প্রস্থান করলো। নুহাশ এবার নাদান বাচ্চার মতো মুখ করে পাশ ফিরে তাকালো। সায়েরী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি চেপে বসে আছে। নুহাশ নিজের মাথা টা তার দিকে ঝুঁকিয়ে থমথমে গলায় বলে,

‘ নে, তুই ও মার। মেরে ষোলো কলা পূর্ণ কর। ‘
সায়েরী সত্যিই হাত বাড়ালো। ঝাকড়া চুলগুলো তে হাত বুলিয়ে দিয়ে হাসি চেপে বললো,
‘ থাক, কাঁদিস না। আমি জানি তোর মাথায় গন্ডগোল আছে। তাই মাফ করে দিলাম৷ ‘
নুহাশ থমথমে মুখে তাকিয়ে। মুখখানা এইটুকুন করে সে বলে,
‘ আমার কি দোষ! আমি কি জানতাম নাকি এই আনা কানা তেল পাকিয়ে বসে আছে। আমি পানি দিতেই ছ্যাঁত করে উঠলো। ‘
‘ না জেনে বললি কেনো তবে? কোথায় ভাবলাম আজ হাফ ডে ছিল বলে একটু আড্ডা দিব, খাবো। সব ভেস্তে দিলি তুই। ‘
নুহাশ পুণরায় মুখ গোমড়া করে। কন্ঠে বাচ্চাদের মতো অভিমান ঢেলে বলে,
‘ হুহ, যত দোষ নুহাশ ঘোষ! ‘

কলেজ রোডে ধুলো উড়িয়ে চলছে ইভানের বাইক। তা চালাচ্ছে সাহিল। এবং পেছনের সিটে ইভান বসা। কলেজের গেইট হতে খানিকটা দূরে পরিচিত একখানা মুখশ্রী নজরে আসতেই আচমকা গাড়ির গতি কমে আসলো সাহিলের। সে তাকিয়ে দেখল শ্যামবতী মুখখানা। হাতে চিপস,কাঁধে ব্যাগ। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকারও সুযোগ হলো না তার। তার আগেই রিকশায় চড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো মেয়েটি। সাহিল নজর ফিরিয়ে পুণরায় রাস্তায় মনযোগ দিলো। কিন্তু মস্তিষ্কে বিচরণ করছে কিছু পুরনো স্মৃতি। এই তো মাস তিনেক আগের কথা। অনাকাঙ্ক্ষিত এক সাক্ষাৎ- এ, সায়েরী নামক কিশোরী মেয়েটার সাথে কিছুটা সময় কাটানোর পর সাহিলের মনে ভালো লাগার সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বোধ সে ভেবেছিল সায়েরী’র প্রেমে পড়েছে।

খানিকটা পাগলামি করে মেয়েটার খোঁজও নিয়েছিলো অবশ্য। তাতেই ঘটলো বিপত্তি। খোঁজ নেওয়ার জন্য তার কাছে একমাত্র সাফ্রিন-কেই উত্তম বলে মনে হয়েছিলো। কিন্তু এই চতুর মেয়েটা সব বুঝে ফেলবে, সে কথা কে জানত! তাই তো, শুরুতেই সে সাবধান করে দিল জোর গলায়। জানাল, অন্য সব মেয়ের মতো দুই একটা দুষ্টু মিষ্টি কথায় গলে যাওয়ার মেয়ে নয় সায়েরী। তাছাড়া স্বভাবে খানিকটা অবুঝও বটে। উল্টো পালটা বুঝে নিজের ভাইয়ের কাছে নালিশ করলে ব্যাপারটা বেশ খারাপ দেখাবে তখন। কারণ দুই পরিবারের মধ্যে সুন্দর একটা সম্পর্ক আছে। এমন বিশ্রী জনক ঘটনায় সম্পর্কে তিক্ততা নিয়ে আসার কোনো মানে হয়!

সাহিল প্রথমে মানতে চাইলো না কথাগুলো। এই যুগে এসে এত ভাবনা চিন্তা করে প্রেম হয় নাকি! কিন্তু সাফ্রিনের কথাতেই কিছুদিন সময় নিলো সে ভাবার জন্য। এবং এই সময়ের কাটার সাথে সাথে তার ভালোলাগাটুকু ফিকে পড়ে গেল। বলা বাহুল্য, সাহিল বেমালুম ভুলেই বসেছিলো সায়েরী নামক কিশোরীটির কথা। আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দর্শনে পুণরায় মনে পড়ে গেল। কিন্তু এই মনে পড়ায় কোনো অনুভূতি নেই। আছে কেবল সুন্দর কিছু স্মৃতি।

সকাল থেকে কড়া রোদ থাকলেও এখন আকাশে বেশ গুমোট ভাব৷ থেকে থেকে মেঘেদের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। ব্যাস্ত রাস্তায় ছুটে চলছে রিকশা। তাতে বসে আছে তোহা এবং আয়ান৷ মাত্রই একপ্রকার জোর জবরদস্তি করে নিজের সাথে তোহাকে রিকশায় বসিয়েছে আয়ান। ছেলেটার মুখভঙ্গি অতিমাত্রায় গম্ভীর এখন। তোহার রাগ যেন কই উবে গেল এই মুখ দেখে৷ উল্টো বুক ঢিপঢিপ করছে তার। কোথায় তার রাগ দেখানোর কথা তা না। এই ছেলে নিজেই রেগে বোম হয়ে আছে। কিন্তু কারণটা কি!

‘ হ..হাত ছাড়, আয়ান। ‘ কন্ঠ আটকে আসলো তোহার।
তোহার কন্ঠে রাস্তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকালো আয়ান। এমন রাগি দৃষ্টি দেখে তোহা ভড়কে গেলো। আয়ান তার হাত তো ছাড়লো না। বরং আচমকা কাছে এসে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ শোয়েব ছেলেটার সাথে কিসের কথা বলছিলি? ‘
তোহা ভেতর থেকে দমে গেলেও প্রকাশ করলো না তা। শক্ত কন্ঠে বললো,
‘ যা ইচ্ছে বলছিলাম। তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে কেনো? ‘
আয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে। উপচে পড়া রাগটুকু নিয়ন্ত্রণ করে সে পুণরায় বলে উঠলো,

‘ গত কয়েকদিনে কতগুলো ফোন করেছি, মেসেজ দিয়েছি। সামনাসামনি এতবার কথা বলা চেষ্টা করেছি। অথচ তুই আমাকে ইগনোর করছিস। কেনো? ‘
‘ কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি না তাই। ‘
‘ শোয়েব ছেলেটার সাথে তাহলে কিসের এত প্রয়োজন? ‘
‘ আশ্চর্য! উনাকে টেনে আনছিস কেন বারবার? ‘
‘ তুই বাধ্য করছিস। ছেলেটা তোকে পছন্দ করে। তুই রিজেক্ট করেছিস। তারপরও কিসের এতো আলাপ? ‘
তোহা এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আয়ানের দিকে। কাট কাট গলায় জবাব দিলো,
‘ সেটাই তো। আমি তোকে ভালোবাসি। তোকে জানিয়েছিলাম, তুই রিজেক্ট করেছিস। এখন তাহলে কিসের এত আলাপ? ‘
আয়ান নিভে গেল একথা শুনে। ধীর গলায় বললো,

‘ আমি তোর বন্ধু হই তোহা। অন্য কোনো সম্পর্ক না থাকুক, বন্ধুত্ব টা থাকতে পারে তো নাকি? ‘
তোহা মুখ ফিরিয়ে জবাব দিলো,
‘ চেষ্টা করেছি। আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তোর সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব রাখার চেয়ে কোনো সম্পর্ক না রাখাটাই বেশি সহজ আমার কাছে। ‘
এহেন জবাবে আয়ানের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো যেন৷ কি হচ্ছে টা কি তার সাথে? না পারছে তোহাকে ছেড়ে দিতে, না পারছে আকড়ে ধরতে। এ কেমন দুটানা! বরাবরই বেশ বুঝদার ছেলে সে৷ কিন্তু এইবার কেনো বুঝতে পারছে না মনের কথাটুকু! কেনো বুঝে উঠতে পারছে না মন কি চাইছে সেটা!
তোহা ফিরে তাকালো। আয়ানকে এমন চিন্তিত দেখে এবার সে ধীর গলায় বললো,

‘ আমার জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার অনুভূতি, আমার সমস্যা। সমাধানও আমি নিজেই খুঁজে নেব। তোরও সম্পূর্ণ অধিকার আছে নিজের মন মতো পার্টনার চুজ করার। তাই আমি তোকে জোর করছি না। আগে যা বলেছি, করেছি সব কিছুর জন্য, সরি৷ ‘
আয়ান না তাকিয়েও মন দিয়ে শুনলো সবটা। প্রতিউত্তর করলো না কোনো। এর মাঝে প্রকৃতির রূপ বদলেছে। যেকোনো মুহুর্তে বৃষ্টি নামবে। তোহা দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাসীন গলায় বলে উঠলো,
‘ ভাবছি শোয়াব ভাইয়া কে হ্যাঁ বলেই দিই। ছেলেটা খারাপ না। মিশতে মিশতে হয়তো ভালো ল… আহ!!! ‘
রিকশার ঝাঁকুনিতে একপাশে হেলে গেল তোহা। ন্যানো সেকেন্ডের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু আকস্মিক এই ঘটনায় যতটা না চমকেছে, তার চেয়েও দিগুণ চমকে উঠেছে নিজ কোমরে আয়ানের শক্তপোক্ত হাতের স্পর্শ পেয়ে। সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো তার। বিষ্ময় চোখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো আয়ানের দিকে। ছেলেটা কেমন ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তোহা কিছু বলার জন্য উদ্যত হয়েছে, তার আগেই হাতের জোর বাড়িয়ে হুট তাকে কাছে টেনে আনলো আয়ান। শান্ত শিষ্ট ছেলেটা আজ বেজায় রেগে গিয়ে একপ্রকার গর্জে উঠা কন্ঠে বললো,

‘ আমাকে কি ফেলনা মনে হচ্ছে তোর? এই মনে ধরলো, প্রেমনিবেদন করলি। এখন বেটার অপশন পেয়েছিস বলে ছুড়ে ফেলছিস। এতটা তুচ্ছ আমি? ‘
এহেন কথায় তোহা হতবিহ্বল। বলে কি! সে কেনো আয়ানকে ফেলনা ভাবতে যাবে!
‘ অ..আয়ান তুই ভুল ভাবছিস। এমনি কিছুই না…. ‘
‘ তাহলে কেমন কিছু তোহা? তোর এসব বিহেভিয়ার আমাকে কতটা কষ্ট দিচ্ছে জানিস তুই? তোর অবহেলা সহ্য করতে করতে ভেতর থেকেই শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। নিজেই কাছে টানতে চাইলি, এখন নিজেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস। আসলে তুই চাচ্ছিস টা কি? বল আমাকে। ‘
তোহা চুপসে গেল। কন্ঠে ভর করলো কান্না৷ না তাকিয়েই সে জবাব দিলো,
‘ তুই নিজেই তো চাচ্ছিলি না আমাকে। শুধু শুধু তোর আশায় থেকে নিজেকে আর কতো কষ্ট দিব? এর চেয়ে ভালো যে আমার আশা করে আছে তাকে সুযোগ দিই…. ‘
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে কোমরে থাকা আয়ানের শক্তপোক্ত হাতটা নড়ে উঠলো। সম্পূর্ণ দুরত্ব ঘুচিয়ে, মুখোমুখি হয়ে গমগমে গলায় বললো,

‘ খবরদার যদি আরেকবার এই কথা শুনেছি তো। কাউকে সুযোগ দিতে হবে না। তুই আমার ছিলি, আমার-ই থাকবি।
অপ্রত্যাশিত এই কথায়,কান্ডে তোহা কিংকর্তব্যবিমুঢ় । হৃদপিণ্ড থামকে গেল বোধহয়। ফ্যালফ্যাল নজরে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো আয়ানের নির্লিপ্ত মুখটার দিকে। নিজেকে বিষ্ময় ভাব কাটাতে না পেরে সে আটকে আসা কন্ঠে বললো,
‘ প..পাগল হয়ে গিয়েছিস নাকি? ‘
বিপরীতে আয়ানকে দেখাল অসহায়। তোহার চোখে চোখ রেখে সে ক্ষীণ স্বরে বললো, ‘ তুই ভালো থাকতে দিচ্ছিস কোথায়? ‘
পরপর আবারো বলে,

‘ তোকে এখন আর বন্ধু ভাবতে পারিনা। ভাবনা, চিন্তা, অনুভূতি সব পালটে দিয়েছিস। প্রেমে পড়েছি, ভালোবাসি এসব বলবো না। কারণ এসব এখনো উপলব্ধি করতেই পারিনি। কিন্তু এটুকু বুঝেছি, তোকে ছাড়া আমার চলবে না। চলছেই না। বিগত কয়েকটা দিন কেমন ছটফট করে দিন কাটিয়েছি আমি-ই জানি। তুই আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিস তোহা। তোকে অন্য কারো সাথে আমি মানতে পারছি না। আমাকে নাহয় আরেকটু সময় দে। তোকে তোর মতো করেই ভালোবাসতে চাই আমি। আমাকে নিয়ে তোর অনুভূতির উর্ধ্বে গিয়ে অনুভূতি জমাতে চাই। ‘
আয়ানের এত এত কথার বিপরীতে তোহা বিমূঢ়, বিবশ, নিশ্চুপ। বলবেই বা কি! সে তো বিশ্বাস-ই করতে পারছে না যে, আয়ান এসব বলছে! এমন মুহুর্ত, এই কথাগুলো একটা সময় স্বপ্ন ছিলো তার। আর আজ সত্যি হয়েছে দেখে তার মেনে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। ঢিপঢিপ করছে বুক। মস্তিষ্ক এলোমেলো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ছোঁয়ায় ভিজে যাচ্ছে দুজনের দেহ। কিন্তু সেদিকে ধ্যান নেই কারো। তোহাকে এমন নিশ্চুপ দেখে আয়ান ক্ষীণ স্বরে ডাকে, ‘ তোহা!! ‘
তোহার ঘোর কাটে। ঢোক গিলে অনবরত। থেমে থেমে বলে,

‘ হ.হাত! হাত সরা। ‘
আয়ান প্রথমে বুঝে উঠতে পারে না কথাটার অর্থ। পরক্ষণেই খেয়াল হয় তার এক হাত তোহার কোমরে লেপ্টে। সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিলো সে৷ দ্রুত গলায় বললো, ‘ সরি, সরি। ‘
দুজনেই নিশ্চুপ থাকে কয়েক সেকেন্ড। এরপর হঠাৎ আয়ানের সামনে নিজের এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে তোহা বলে,
‘ একটা চিমটি কাট তো। ‘
তার অবস্থা বুঝতে পেরে আয়ান হেসে ফেললো। এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না মেয়েটা! ইচ্ছে করেই অনেকটা জোর প্রকাশ করে চিমটি কাটলো সে। এহেন কান্ডে তোহা আর্তনাদ করে উঠলো। চেঁচিয়ে উঠে বললো,
‘ এই মাত্র প্রেম নিবেদন করে এখন আবার কষ্ট দিচ্ছিস। এটাই তোর ভালোবাসা? ‘
আয়ান হাসে। খানিকটা ঝুঁকে নিম্ন কন্ঠে বলে,

‘ ভালোবাসি বলিনি তো। বাসলে তখন সব কষ্ট ভুলিয়ে দিব। ‘
তোহা’ র চোখ ভিজে। অনুভূতি সামলাতে টালমাটাল অবস্থা তার। বহুদিনের প্রত্যাশিত স্বপ্নটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে দেখে আবেগে ভেসে সে হুট করেই দুইহাতে জড়িয়ে ধরলো আয়ানকে। তার এমন প্রতিক্রিয়ায় আয়ান হকচকিয়ে উঠলো। পরপরই হেসে একহাত রাখলো তোহার চুলের ভাঁজে। সময় কত দ্রুত পাল্টায়। মাত্র মাস তিনেক আগে এমনি এক রিকশায়, ব্যাস্ত সড়কে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি করেছিলো তোহা। কিন্তু মাঝপথে নিষ্ঠুর পুরুষের মতো তাকে একা ছেড়ে চলে গিয়েছিলো আয়ান। কিন্তু মাস কয়েকের ব্যবধানে আজ তারা প্রেমে যুগলবন্দী।
তোহা’র হুশ হতেই সে দ্রুত আয়ানকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে। বুকের ভিতরটা উথাল-পাতাল করছে তার। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠছে। তার দিকে একপলক তাকিয়ে হুট করেই রিকশার হুড নামিয়ে দিলো আয়ান। মুহুর্তেই বৃষ্টির তেজে ভিজে জুবুথুবু হয়ে গেলো দুজন। তোহা এহেন কান্ডে হতবাক। আশ্চর্য চিত্তে সে সুধাল,

‘ কি করছিস কি? হুড নামিয়েছিস কেনো? ‘
‘ প্রেম বিলাস করব তাই। ‘
‘ প্রেম বিলাস! সেটা আবার কি? ‘ কন্ঠে বিষ্ময় তোহার।
আয়ান চুল ঝেরে, মৃদু হেসে জবাব দিলো,
‘ প্রেমিক-প্রেমিকা’র’র একান্ত বৃষ্টি বিলাস মুহুর্ত কে প্রেম বিলাস বলে। বাণীতে তোর নব প্রেমিক আয়ান। ‘
একথা শুনে তোহা খিলখিল করে হাসে। বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দের সাথে তোহার হাসির শব্দ মিলে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর শুনাল। আয়ান চেয়ে চেয়ে দেখল ভেজা, স্নিগ্ধ মুখশ্রী টা। বিগত কয়েক দিনের অস্থিরতা সব কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। শান্তি লাগছে, ভালো লাগছে। সেই সাথে অদ্ভুত ধরনের সুখ সুখ অনুভূতি বিরাজ করছে মন পিঞ্জিরায়। তার সুখ পাখি তবে এতদিন কাছাকাছি-ই ছিল। কেবল সে অন্ধ ছিল বলেই ঠের পায়নি। কিন্তু এবার থেকে কোনো অবহেলা, কোনো হেলাফেলা নয়। তোহাকে কথা যখন দিয়েছে, এবার সে মন থেকে ভালোবাসবে। তোহার কল্পনার চেয়েও দিগুণ ভালো রাখবে তাকে।

‘ নওশাদ খান ‘ শহরের বেশ পরিচিত একটা মুখ। প্রথমত তিনি নিজেদের ব্যবসায়িক সূত্রে খ্যাতি লাভ করেছিলেন অধিক। সেই সাথে পুরোপুরি ঢাকা শিফট হওয়ার পর, বিগত পাঁচ বছর ধরে তিনি একজন সমাজ সেবক হিসেবেও পরিচিত। এবারের ইলেকশনে তৌসিফ চৌধুরীর বিপক্ষে নওশাদ খান দাঁড়িয়েছেন দেখে সাধারণ জনগণকে বেশ উচ্ছ্বসিত বলে মনে হলো। এতগুলো বছর যাবত তৌসিফ চৌধুরী শাসকের নাম করে কেবল শোষক হয়ে ছিলেন। তাই তো, এবারে ব্যাপক ভোটের মাধ্যমে ইলেকশন জিতে গিয়েছেন নওশাদ খান। শহরজুড়ে রমরমা অবস্থা। একটু আগেই সাফ্রিন ফ্রেন্ড গ্রুপে ভিডিও কল দিয়ে সুখবর টা দিয়ে গেল। খুশিতে তাকে যেন জ্যান্ত গোলাপ লাগছিলো। সুযোগ পেয়ে নুহাশ বড়সড় ট্রিট চাইতেও ভুলল না৷ সাফ্রিন প্রতিবাদ করলো না এবারে। হাসিমুখে মেনে নিল সব৷

বর্তমানে লিভিংরুমে টিভির সম্মুখে বসে আছে সায়েরী। টিভিতে দেখাচ্ছে নওশাদ খান’র বক্তব্য। শুভ্র রাঙা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে স্পিকারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতার সাথে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। সায়েরীর মনযোগ অবশ্য সেদিকে নয়। স্টেজের মাঝামাঝি আসনে বাবার মতোই শুভ্র রাঙা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, গম্ভীর মুখের বসে থাকা সাফওয়ানের দিকে তার দৃষ্টি। সায়েরীর পাশে বসা তার মা এবং বড় মা সেই কবে থেকে বকবক করেই যাচ্ছে। এই বাবা, ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তারা। বিশেষ করে তাদের আদরের দুলাল সাফওয়ানের প্রসংশা। যা করতে তাদের মুখ ব্যাথা হয়না কখনো। সায়েরী’র হিংসা লাগে। তবুও সে কান খাড়া করে শুনে সবটা। ভালোও লাগছে। কিন্তু সেই সাথে কেমন এক অস্থিরতা বুক জুড়ে। সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই অস্থিরতা বাড়লো তার। এমন লাগছে কেনো! মনে হচ্ছে খারাপ কিছু হবে। কিন্তু কি! এমন খুশির একটা মুহুর্তে মনে কু ডাকছে কেনো তার!

ইরা’র সম্মতি পাওয়ার পরপরই জাদিদের পরিবার হতে তোরজোর শুরু হয়েছে বিয়ের। ছোট ছেলের বিয়েতে কোনো প্রকার কমতি রাখতে চাচ্ছেন তা জাদিদের মা। ইরা’র বাবা-র ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনি। টাকা পয়সার কমতি নেই উনারও। সেই সাথে ইরা হচ্ছেন উনার প্রথম সন্তান। তাই তিনিও চান সব রকমের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মেয়ে তুলে দিতে। ইরা কিছুতেই দ্বিমত করেনি। যেখানে জীবন সঙ্গি তার মন মতো নয়, সেখানে আর অন্য কিছুতে কেনই বা মাথা দিবে সে! দিয়ে লাভটা কি!

আজ জাদিদের সঙ্গে সে এসেছে বিয়ের কেনাকাটা করতে। জাদিদের বাবা,ভাই,ভাবি সকলেই ব্যাস্ত মানুষ। সে নিজেও ব্যস্ত ছিল। তবও সময় বের করেছে শুধুমাত্র ইরা’র খাতিরে। হসপিটাল থেকে সোজা শপিংমলে এসেছে সে। বাসা হতে এসেছে তার মা। অন্যদিকে ইরা এবং ইরিনা। জাদিদের মা ঘুরেঘুরে প্রায় সবই নিজের পছন্দে কিনেছেন। এমন নয় যে ইরাকে সুযোগ দেন নি পছন্দ করার। ইরা নিজেই জানিয়েছিল উনার পছন্দ মত নেওয়ার জন্য। ব্যাপারটা তে ভদ্রমহিলা বেশ খুশিই হলেন। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পর গিয়ে মুটামুটি কেনাকাটা শেষ হওয়ার পর এবার ফেরার পালা। কিছু খাওয়ার কথা থাকলেও ইরা দ্বিমত করায় অন্যরাও আর খেল না কিছু।

জাদিদ পুণরায় হাসপাতালে ফিরে যাবে। তার মা আগেই বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছেন। ইরা এবং ইরিনা গাড়ি নিয়ে আসেনি। জাদিদ অবশ্য বলেছিল পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু ইরা সেখানেও বাধ সাধল। তার থমথমে মুখ দেখে জাদিদের সাহস হলো না জোর করার। তবে সে নিজেও ইরা’র সাথে রাস্তায় দাঁড়ালো গাড়ির অপেক্ষায়। ফাঁকে ফাঁকে নজর বুলালো ইরা’র ফ্যাকাসে মুখটাতে। এই কয়েক দিনে মেয়েটা আরও বেশি শুকিয়ে গিয়েছে কি! চোখ গুলো আরো ভিতরে ঢুকে গিয়েছে। চেহারার লাবণ্য একেবারে কমে গিয়েছে। ছয় মাস আগে দেখা সেই রূপবতী ইরা’র সাথে আজকের এই মেয়ের কোনো মিল খোঁজে পেলো না জাদিদ৷ সম্পূর্ণ রূপে বদলে গিয়েছে মেয়েটা।

কড়া রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভেতরটা হাঁসফাঁস লাগছে ইরা’র। সকাল থেকে এই অবধি কিছুই পেটে পড়েনি। ক্ষুধায় পেটে শব্দ হচ্ছে। কিন্তু খাওয়ার মত মানসিকতা নেই তার। বিগত কয়েক মাস যাবত এমন-ই তো চলছে। ইচ্ছে করে নিজেকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মারছে সে। কিন্তু মরছে কই! দিব্যি শ্বাস চলছে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়মে, অযত্নে শরীর টা বড্ড দুর্বল তার। আজ আবার খালি পেটে এত ঘন্টা যাবত হাঁটাহাঁটি করায় বেশ শরীর খারাপ লাগছে। পেটে ব্যাথা লাগছে ভীষণ। এতক্ষণ যাবত সহ্য করে থাকলেও এবার আর সহ্য করতে পারলো না সে। মাথা ঘুরছে, ঝাপসা লাগছে দৃষ্টি। পাশ থেকে জাদিদ বিষয়টি লক্ষ্য করে চিন্তিত মুখে পাশ ঘেঁষল। ইরা’র বাহু স্পর্শ করে ধীর কন্ঠে সুধাল,

‘ ইরা! ঠিক আছেন আপনি? এমন করছেন কেনো? শরীর খারাপ লাগছে? ‘
অসম্ভব পেট ব্যাথায় দাঁত খিচে ফেললো ইরা। গলা শুকিয়ে কাটকাট। অস্পষ্ট স্বরে সে বলতে চাইলো কিছু। কিন্তু শরীর সায় দিলো না। জাদিদকে অবাক করে দিয়ে আচমকা দেহের ভার ছেড়ে দিলো সে। দ্রুত তাকে বুকে টেনে নিলো জাদিদ। আকস্মিক এমন ঘটনায় মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো তার। ইরিনাও চমকে উঠেছে। ইরা’র গালে আলতো চাপড় মেরে বারকয়েক ডাকল জাদিদ। সাড়াশব্দ না পেয়ে এবার সে পাজাকোলে তুলে নিলো তাকে। দ্রুত ছুটল নিজের গাড়ির দিকে। ব্যাক সিটে ইরাকে শুইয়ে দিতেই ইরিনা এসে মাথাটা কোলে তুলে নিলো। জাদিদ গাড়ি স্টার্ট করলো। নিকটবর্তী কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাবে এমনই মনোভাব তার। পেছনে ইরিনা দ্রুত ফোন করে তার মা’কে জানিয়ে দিলো ব্যাপারটা। জাদিদ মিররে দৃষ্টি ফেলে ইরা’র দিকে তাকালো। বুকে কম্পন হচ্ছে তার। খারাপ কিছু একটা আভাস পাচ্ছে মন। এমন লাগছে কেনো! কি হতে চলেছে!
.
.
পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো ইরা। নাকে লাগলো ফিনাইলের তীব্র ঘ্রাণ। পেটের ব্যাথা এখনো উপলব্ধি হচ্ছে। তবে ক্ষীণ। শরীরটা দুর্বল লাগছে ভীষণ। হাত নাড়াতে গিয়ে অনুভব করলো ক্যানোলা লাগানো তাতে। ব্যাথায় অস্পষ্ট শব্দ তুললো সে। তা শুনে ইরার দিকে নজর পড়লো মাঝ বয়সী ডক্টরের। ফিমেল ডক্টর। ইরা’র সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,
‘ শরীর কেমন এখন? ‘
‘ ভালো। ‘ ধীর কন্ঠে জবাব দিলো ইরা।
‘ পেটে ব্যাথা লাগছে? ‘
‘ হুম, একটু। ‘
‘ সকালে কি খেয়েছিলে? ‘
‘ খ..খায়নি। ‘
‘ সকাল থেকে এই অবধি কিছু খাওনি? ‘ কপালে ভাঁজ পড়লো মহিলার।

ইরা নিশ্চুপ। তার নিরবতা কে সম্মতি ধরে ডাক্তার এবার বেশ অসন্তোষ্ট হলেন। রাশভারী কন্ঠে বললেন,
‘ এতোটা ইরেসপন্সিবল হলে বেবি নিতে কে বলেছিলো? টিনেজার তো নও যে এসব ব্যাপারে অজানা থাকবে। এমন হলে তো বেবি তিন মাসও সারভাইব করতে পারবে না। বি কনসিয়াস। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই বাক্যে ইরা’র দুনিয়া দুলে উঠলো যেন। বেবি! কার বেবি! এসব কি বলছে এই মহিলা! অবিশ্বাস্য চোখে সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে। উঠে বসার চেষ্টা করতেই রুমে উপস্থিত নার্স এগিয়ে এসে সাহায্য করলো তাকে। বালিশে হেলান দিয়ে বসলো সে। সেই মুহুর্তে কেবিনের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো ইরা’র মা এবং ইরিনা। মায়ের দিকে তাকিয়ে ইরা আরেদফা চমকালো। ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। ইরা নজর ফিরাল। আটকে আসা কন্ঠে বললো,

‘ অ..আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে ডক্টর। আমি..মানে আমি কীভাবে….. ‘
কথাটুকু সম্পূর্ণ করতে পারলো না সে। মনে পড়ে গেল বান্দরবান এর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রাতের স্মৃতি। মুহুর্তেই শরীর জমে গেল তার। বিশ্বাস করতে চাইলো না এই সত্যিটুকু। অন্যদিকে তার হাবভাব দেখে ডাক্তারের কপালে ভাঁজ পড়ে। ভ্রুঁ কুঁচকে তিনি জানতে চাইলেন,
‘ তুমি কি জানতে না তুমি প্রেগন্যান্ট সেটা? ‘
কথাগুলো কেমন কানে বাজছে ইরার। শ্বাস আটকে সে মাথা নেড়ে বুঝালো সে জানত না। তা দেখে ডাক্তারের চোখে মুখে বিষ্ময় খেলে গেল যেন। কটাক্ষ কন্ঠে তিনি বললেন,

‘ তেইশ – চব্বিশ বছর বয়সী হয়েও তুমি বুঝতে পারলে না নিজের প্রেগ্ন্যাসি! মজা করছ আমার সাথে? এই যুগে ১৪-১৫ বছরের বাচ্চারাও ভালো জানে এসব ব্যাপারে। আর তুমি বলছ তুমি জানতে না! দুই মাসের বাচ্চা পেটে নিয়েও কীভাবে ঠের পেলেনা কিছু? ‘

কন্ঠে স্পষ্ট বিদ্রুপ তার। ইরা’র সেদিকে ধ্যান নেই। তার কানে বাজছে ডাক্তারের বলা ‘ দুই মাস ‘ শব্দ দুটো। আসলেই তো, কীভাবে কিছু ঠের পেলো না সে! অনাকাঙ্ক্ষিত সেই রাতের পরদিন ভোরে মিহাদের ব্যবহার দেখে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল তার। সারাটাদিন কেটেছিলো নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে। পরদিনই ফিরে এসেছিলো নিজ বাড়িতে। সেদিন তো দুর্বলতার জন্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ৭২ ঘন্টাগুলো এমন মর্মান্তিক ছিল বলেই তো বার্থ কন্ট্রোল পিল নেওয়ার কথা ঘূর্ণাক্ষরেও মনে ছিলো না তার। মন, মস্তিষ্কের উপর এত বেশি চাপ ছিলো সেই মুহুর্ত গুলোতে। নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়টুকু ও পায়নি সে। ফলস্বরূপ আজকে এই দিন দেখতে হচ্ছে তাকে। বিগত দুই মাস কীভাবে পার করেছে তা একমাত্র সে জানে। নাওয়া,খাওয়া ভুলেই বসেছিলো। শরীর বরাবরই দুর্বল থাকত। অতিমাত্রায় ক্ষিধে পাওয়া স্বত্তেও কিচ্ছুটি খেয়ে তৃপ্তি পেত না। হয় শুরুতে বমি আসতো, নয়ত খাওয়ার পর বমি করে ভাসিয়ে দিত সব৷ এমনটা গত ছয় মাসে বহুবার হয়েছে।

সারাদিন খালি পেটে থাকার পর কিছু খেতে গেলে বমি আসাটাই স্বাভাবিক। তাইতো বিগত দুই মাসে এই ব্যাপার গুলো আগ্রাহ্য করে গিয়েছে সে। প্রতিনিয়ত গুমরে গুমরে মরেছে। মানসিক ভাবে কতটা ভেঙ্গে পড়েছে তা সে জানে একমাত্র। এর মাঝে কখন পিরিয়ড মিস গিয়েছে, কি কারণে শরীর দুর্বল লাগছে, বমি হচ্ছে এসব কিছু নিয়ে চিন্তা করার বিন্দুমাত্র মানসিকতা ছিল না তার। তাহলে সে কি করে ঠের পাবে, যে তার মাঝেও বেড়ে উঠছে অন্য একটি প্রাণ!

‘ আগে না জানলেও এখন তো জেনে গিয়েছ। এবার থেকে নিজের হেলথ্ নিয়ে অনেক বেশি কনসিয়াস হতে হবে তোমাকে। তোমার অবহেলার কারণে বেবির হেলথ্ ভীষণ নাজুক। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে নিজের প্রতি একদমই যত্নশীল নও তুমি। এই অবস্থাতেও বেবি সারভাইব করে যাচ্ছে তা নিয়ে শুকরিয়া করো। তবে, এমন চলতে থাকলে তিন মাসের মধ্যেই মিসক্যারেজ হওয়ার চান্স ৯০%। তাই এখন থেকেই সতর্ক হও। ডেলিভারির কথা আসছে পরে। আগে বেবির গ্রুথ নিয়ে ভাবো। প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিয়েছি। মান্থলি চেক আপ মিস দিবে না। অবজারভেশনে থাকাটা বেশ জরুরি তোমার জন্য। ‘

এটুকু বলে থামলেন তিনি। স্যালাইন চেক করতে করতে পুণরায় বলে উঠলেন,
‘ তোমার হাসবেন্ড আসেনি? কথাগুলো তাকে জানালেই ভালো হতো। ‘
এহেন বাক্যে ইরা’র বুক কাঁপে। চোখে ভাসে মিহাদের মুখ। এতক্ষণ যাবত ঘোরে থাকলেও এবার যেন বাস্তবে ফিরেছে সে। এই বাস্তবতা বড্ড নিষ্ঠুর। ক্ষণে ক্ষণে শ্বাসরুদ্ধ করে মারার মতো নিষ্ঠুর। তাকে নিশ্চুপ দেখে ডাক্তার পুণরায় একই প্রশ্ন করলেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এবার ইরা’র মা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন,
‘ সে ব্যস্ত বলে আসতে পারেনি। জানিয়ে দিয়েছি। চলে আসবে। ‘

ডাক্তার মাথা নেড়ে সায় দিলেন। আরও কিছু ইন্সট্রাকশন দিয়ে কেবিন ত্যাগ করলেন তিনি। ইরা এবার ভয় মিশ্রিত চোখে চাইল তার মায়ের দিকে। যে ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরা’র দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই দ্রুত পা ফেলে কাছে আসলেন তিনি। কোনোরূপ বাক্য ব্যয় না করে আচমকা স্ব-শব্দে চড় বসালেন ইরা’র ডান গালে। আকস্মিক এই আক্রমণে ইরা হেলে পড়লো একপাশে। কান ভূঁ ভূঁ করে উঠলো। গালে যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। নিজেকে সামলানোর বিন্দুমাত্র সময় পেলো না সে। তার আগেই চুলে টান পড়লো। অস্পষ্ট স্বর তুললো সে। কিন্তু তার কন্ঠ চাপা পড়লো মায়ের গর্জে উঠা কন্ঠের নিচে,

‘ কার বাচ্চা এটা? ওই ছোট লোক, ছ্যাঁচড়া ছেলেটার তাইনা? ‘
‘ মা!!!! ‘ মিহাদকে নিয়ে এরূপ বাক্য সহ্য হলো না ইরা’র।
‘ চুপ! মা বলে ডাকবি না আমাকে। নষ্টামি করে, বাচ্চা পেটে নিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করতে লজ্জা করছে না তোর! ওহ, এজন্যই প্রথমে রাজি হচ্ছিলি না। এখন নিজের বাসনা পূরণ করার পর ছেলেটা তোকে ছুড়ে ফেলেছে দেখে জাদিদকে মেনে নিয়েছিস তাইতো? ‘
‘ এইদিন দেখার জন্য জন্ম দিয়েছিলাম তোকে আমি? নিজেকে তোর মা বলতেও ঘেন্না লাগছে আমার। তোর বাবা জানতে পারলে জ্যান্ত পুতে ফেলবে আমাকে। তুই এত নিচে নামবি তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ইরা! ছিঃ!! ‘
ইরার চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। নিজেই নিজেকে ধিক্কার জানায়। মাথা পেতে নেয় মায়ের সকল অভিযোগ। তার মা কেবিন জুড়ে পায়চারি করছে। প্রায় পাকাপোক্ত হয়ে গেছে জাদিদের সাথে ইরা’র বিয়ে। এই মুহূর্তে ইরা’র সত্যিটা জানলে বিয়েটা কোনোভাবেই হবে না। এখন কি করবেন তিনি? কিভাবে লুকাবেন সত্যটুকু!
‘ এই বাচ্চা অ্যাবোর্শন করবি তুই। এবং সেটা কালকেই। ‘

কেবিন জুড়ে প্রতিধ্বনি হলো বোধহয় এই কথার। ইরা ঝাপসা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে। সত্যি বলতে তার কোনো অনুভূতি কাজ করছে না এই বাচ্চার প্রতি। বিন্দুমাত্র মাতৃত্বের অনুভূতি জাগছে না মনে। তাইতো মায়ের কথাটা শুনেও তাকে দেখাল একেবারে নির্লিপ্ত। তার মা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ইরিনা তখনো উপস্থিত। মিনিট খানিক পর ইরা’র মনে পড়লো জাদিদের কথা। সে ধীর কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ জাদিদ! উনি কোথায়? ‘
ইরিনা বোধহয় এইটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিল। ইরা প্রশ্ন করার সাথে সাথেই সে তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
‘ প্রেগন্যান্সির নিউজ শুনেই কারো সাথে কথা না বলে চলে গিয়েছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো আর ফিরে আসবে না। বিয়ে তো অনেক দূরের কথা। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৯+৫০

ইরা ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো। খুব বেশি অবাক হলো না সে। যেখানে এত বছরের ভালোবাসার মানুষটা হাত ছেড়ে দিতে পারলো, সেখানে জাদিদ তো নগন্য কেউ। হাজার অনুভূতি থাকুক না কেন, প্রাক্তনের বাচ্চা সহ কোনো মেয়েকে নিজের বউ রূপে গ্রহণ করতে চাইবে না কেউ-ই। বরং ভালোই হলো। তার মতো একজনকে বিয়ে করলে কেবল অবহেলা ছাড়া কিছুই পেত না জাদিদ। এবার অন্য কাউকে নিয়েই নাহয় সুখে থাকুক। এসব ভাবতে ভাবতে বালিশের সাথে হেলান দিলো ইরা। ইরিনা বেরিয়ে গেল। একাকী কেবিনে মিনিট খানিক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর একপর্যায়ে পেটে হাত রেখে চোখ বুজল ইরা। অনুভব করার চেষ্টা করলো নিস্পাপ প্রাণ-টিকে। কিন্তু কিচ্ছুটি অনুভব করতে পারলো না সে। তবে বন্ধ চোখের পাতা ছুঁয়ে নামলো একফোঁটা অশ্রু। অস্পষ্ট কন্ঠে সে বলে উঠলো,
‘ তোকে ভালোবেসে আমি কি পেয়েছি মিহাদ? ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৩+৫৪