অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৬৮ 

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৬৮ 
লেখিকা: অনিমা কোতয়াল 

বিছানাজুড়ে ছড়িয়ে আছে কয়েকরকম ড্রয়িং পেপার। তাতে এলোমেলো দৃশ্য আঁকা। কোনটারই কোন তালমিল নেই। বড্ড এলোমেলো তারা। ঠিক কুহুর মনেরই মতো। হাঁটু গুটিয়ে বসে সেই এলোমেলো অঙ্কনের দিকে তাকিয়ে আছে কুহু। নরম, ফর্সা হাতদুটো হাঁটুর ওপরে রাখা। মাথাটা এলিয়ে রেখে দিয়েছে হাতের ওপর। কালো মোলায়েম চুলগুলো একপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে। সন্ধ্যা থেকে আঁকার চেষ্টা করেও পারছেনা। মন স্থির না থাকলে শিল্পকর্মগুলো ফুটিয়ে তোলা যায়না। কুহুও পারছেনা ফুটিয়ে তুলতে।

নষ্ট হয়ে যাওয়া ড্রয়িংবোড আর তুলিগুলো রেখে, এক গ্লাস দুধ নিয়ে কুহুর ঘরে এলো নীরব। কুহুর অমন উদাস, অসহায় দৃষ্টি দেখে দীর্ঘশ্বাস চাপল। ধীরপায়ে এসে দাঁড়াল কুহুর সামনে। থমথমে গলায় বলল, ‘দুধটা খেয়ে নাও।’ তারপর এলোমেলো কাগজ আর রঙের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ আর কিছু আঁকতে হবেনা। দুধটা শেষ করে শুয়ে পরো।’

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কুহু মাথা তুলে তাকাল নীরবের দিকে। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে নিল গ্লাসটা। নীরব নিজের হাতে পেপার, টিউব, তুলি সব গুছিয়ে রাখল। তারপর কুহুর কাছে এসে দেখল গ্লাস ফাঁকা। মুখ মুছছে সে। একটু পানি খাইয়ে, শুইয়ে দিল কুহুকে। গায়ে কম্বল দিয়ে দিল। কুহু তাকিয়ে রইল নির্লিপ্ত নীরবের দিকে। কিন্তু নীরব টু শব্দ করল না। লাইট অফ করে, দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে গেল।

কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুতেই যখন নীরবকে বোঝাতে পারছিল না। রাজি করাতে পারছিল না ওর বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে। তখন ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে কুহু। সেদিন রাতে নীরবকে খুব আজেবাজে কথা লিখেছিল। নীরবের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সব ছেড়ে এ বাড়িতে পরে থাকাটাকে অন্য এক ইঙ্গিতে ছোট করেছিল। আবেশের বশে আরও কী কী লিখেছিল নিজেরও মনে নেই। তারপর থেকেই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে নীরব। কুহুর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কোন কথা বলেনা। অপ্রয়োজনে কাছে ঘেষেনা। তাই বলে কুহুর যত্নে কোনরকম ত্রুটি রাখছে না সে। নিজের হাতে সেই সবই করছে যা আগে করতো। তবে নীরব সত্যিই নীরব হয়ে।

ব্যপারটা ভালো লাগছেনা কুহুর। হাসফাঁস লাগছে খুব। নীরবের নীরবতায় অভ্যস্ত নয় ও। ঐ ছেলেটাকে ছটফটে, চঞ্চল, বাচাল ভাবেই বেশি মানায়। ওর জন্যে ছেলেটা এমন শান্ত হয়ে যাবে সেটা মানা যায়না। প্রিয়তার কথা মনে পড়ল কুহুর। সে থাকলে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো কুহু। খুব কাঁদতো। একমাত্র সেই ওর মনের সব সংশয় দূর করতে পারতো। তা কুহুর জানা। হঠাৎ কুহুর মনে পড়ল প্রিয়তার বলে যাওয়া সেই কথাটা, ‘ছেলেটাকে কষ্ট দিওনা কুহু। ও সবকিছু ছেড়ে তোমার কাছে পড়ে আছে। শুধু তোমার জন্যে।’

কফি খেয়েও মাথা ব্যথাটা কমেনি রুদ্রর। বরং বেড়েছে। সেই স্টোররুম থেকে বেরিয়ে আসার পর এক ন্যানোসেকেন্ডের জন্যেও বিশ্রাম নিচ্ছেনা মস্তিষ্ক। কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। না মেলা হিসেবগুলো মেলানোর জন্যে একপ্রকার যুদ্ধ করছে। কিন্তু ফলাফল শূণ্য। উচ্ছ্বাসকে সন্দেহ করতে মন চাইছেনা ওর। ব্যপারটা অনেকটা নিজেই নিজেকে অবিশ্বাস করার মতো। কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায়ও দেখতে পাচ্ছেনা রুদ্র। এটাতো সত্যি যে আমের ভিলারই কেউ করছে এই কাজটা। তিক্ত হলেও একথা সত্য যে প্রতারিত হয়েছে ও। খুব কাছের কেউ ওর বিশ্বাস ভেঙেছে। সে যেই হোক।

দিশেহারা বোধ করল রুদ্র। রুমজুড়ে অস্থিরভাবে পদচারণ করতে করতে কপালের চুলগুলো উল্টে ধরল। কামড়ে ধরল নিচের ঠোঁট। মনে হচ্ছে কোন এক বিষাদ সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেতো যাচ্ছেই। উঠে আসার কোন উপায় বা পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। যে রুদ্র আমের চোখ দেখেই শত্রু চিনতে পারতো, তার খুব কাছের কেউ তার পিঠে ছু/রি মে/রেছে। মে/রে চলেছে। ব্যপারটা সাধারণ কিছু না। আর অসাধারণ এই বিষয়টা যখন রুদ্রর সামনে পরিষ্কার হবে তখন খুব বড় রকমের এক ধাক্কা খেতে হবে ওকে। সে বিষয়ে ও নিশ্চিত।

রুদ্র দাঁড়িয়ে গেল। লম্বা শ্বাস ফেলল। এটা ভাবুক হওয়ার সময় নয়। রুদ্র আমেরতো এতো ভাবুক ছিলোনা! রাশেদ আমের ছাড়া অন্যকাউকে নিয়ে কোনদিনই তেমন আবেগ কাজ করেনি ওর। কিংবা আবেগ থাকলেও শক্ত প্রস্তরের প্রলেপে তা ঢাকা পরে যেতো। কবে থেকে জাগল এই ভাবুক সত্তা? প্রিয়তা! ঐ মেয়েটা যেদিন রুদ্রর পাষাণতৃল্য হৃদয়কে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হল। সেদিন থেকেই হৃদয়ে লুকানো অন্যান্য আবেগগুলোও একটু একটু করে অনুধাবন করতে পারছিল রুদ্র। আর এই ভাবুক মন তারই পরিণাম। কিন্তু এখন ভাবুক হওয়ার মতো সময় নেই। শক্ত করতে হবে নিজেকে। ঠিক আগের মতো। এখনতো প্রিয়তাও নেই ওর কাছে। সুতরাং কোন বাঁধাও নেই। যেকোন পরিস্থিতি, যেকোন সত্যির জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। সঙ্গে পাল্টা আঘাত করার জন্যেও প্রস্তুত হতে হবে। প্রতিপক্ষ যেই থাক।

বিছানায় বসে দুহাতে মুখ চেপে ধরল রুদ্র। শুরু থেকেই ব্যপারগুলো ভাবার চেষ্টা করল। সবুজ, খোকন, স্বপনকে পাঠানো হয়েছিল সোলার সিস্টেমের ইনফরমেশন লিক করতে। যেটা ওরা করতে পারেনি। একে একে মা/রা পড়ে। কিন্তু সেই ফার্স্ট পেনড্রাইভটা যে ভারতের সীমান্ত দিয়ে আসছে সেটাও ব্লাকহোল কোনভাবে জেনে গিয়েছিল। এরপর? এরপর রুদ্র চট্টগ্রাম গেল। কিন্তু সেই খবরটাও ছিল ব্লাক হোলের কাছে। তাইতো ওকে কিডন্যাপ করতে পেরেছিল। তারপর পারভেজ! পারভেজ কী করতে এসেছিল কেনই বা সেই মেইডকে মারল?

সেকথা বলার আগেই পারভেজকে মেরে ফেলা হল। মারল সেই কালো জ্যাকেট পড়া ব্যক্তি। যেই জ্যাকেটটা পাওয়া গেল উচ্ছ্বাসের পাশের রুমে। ইকবাল নিখোঁজ হল। সমস্ত প্রমাণ বলল যে ইকবালই তথ্য পাচার করতো অন্যদলে। অথচ রঞ্জু বলল, ইকবাল নির্দোষ। ওর হানিমুনের নাম করে মাল ডেলিভারিতে হওয়া গন্ডগোলটা ধরতে যাওয়া। ঠিক সেই সময়টাতেই কুহুর কিডন্যাপিং। কুহু সেদিন নীরবের সঙ্গে দেখা করবে সেটা জানতো কেবল জ্যোতি আর নীরব। নীরবকে আটকে দেওয়া হয়েছিল। জ্যোতি!

রাশেদ আমেরকে দেওয়া সেই বি/ষাক্ত চাটাও নার্গিস আর জ্যোতি ছাড়া কেউ ছোঁয়নি। মিলছেনা। কোন ঘটনার সঙ্গেই কোন ঘটনার সুত্র মিলছেনা। এমন কোন ক্লু নেই যেটা দিয়ে সবগুলো ঘটনাকে একটা সুতোয় বাঁধা যায়। তাই আপাতত মেলানোর কাজ বন্ধ করল রুদ্র। এখন শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হবে ওকে। রঞ্জু বলেছে ইকবাল নির্দোষ। প্রিয়তার বিপদ। প্রিয়তার বিপদ শোনার পর থেকেই মানসিক অশান্তি বেড়েছে রুদ্রর। এখন বিষয়টা মনে পড়াতে আরও অস্থির লাগল। প্রিয়তা যাই বলুক। প্রিয়তার খোঁজ এবার নিতে হবে রুদ্রকে। কালকেই জ্যোতির কাছ থেকে প্রিয়তার নতুন নাম্বার নিতে হবে। লোকেশন ট্রাক করে গোপনে নিরাপত্তা দিতে হবে মেয়েটাকে। যাতে কোনভাবেই প্রিয়তা টের না পায়। তবে গোটা রাতের অস্থিরতা কীভাবে কাটাবে সেটা এক প্রশ্ন।

হঠাৎ পাশে রাখা পলিথিনটার দিকে চোখ গেল। হাত বাড়িয়ে তুলে নিল সেটা। জ্যাকেটটা বের করে আরও একবার মেলে ধরল চোখের সামনে। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখল কিছুক্ষণ। হঠাৎ কিছু একটা খেয়াল করে রুদ্র চমকে উঠল। জ্যাকেটের সাইজটা খেয়াল করেনি ও। এখন করল। এই সাইজ উচ্ছ্বাসের না। লম্বায়, চওড়ায় উচ্ছ্বাস প্রায় রুদ্রর মতোই। এই জ্যাকেট কোনভাবেই উচ্ছ্বাসের গায়ে ফিট হবেনা। ব্যপারটা বুঝতে পেরে অজান্তেই হেসে উঠল রুদ্র। ছলছল করে উঠল চোখজোড়া। বুকের ওপর থেকে যেন বিশাল প্রস্তর খণ্ড নেমে গেল। উচ্ছ্বাস নির্দোষ! ভাবতে গিয়ে আনন্দ হল ওর।
কিন্তু আরেকটা চিন্তা মাথায় খেলতেই হাসি মিলিয়ে গেল রুদ্রর। যদি উচ্ছ্বাস না হয় তাহলে কে? আমের ভিলায় এই জ্যাকেট কেন? জাফর? নাকি অন্যকেউ? নাকি এমন কিছু আছে যা রুদ্রর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন এড়িয়ে গেছে ইকবালের ব্যপারটা।

ইকবাল নির্দোষ ছিল! ব্যপারটা মনে পড়তেই কেমন একটা অনুভব হল রুদ্রর। লোকটাকে নিজের হাতে খু/ন করার বাসনাও ছিল ওর। অথচ কত স্নেহ করতো ওকে।
কিন্তু সে নিখোঁজ হল কীকরে? আদোও জীবিত আছে? থাকলেই বা কোথায়? কী এমন ঘটেছিল যে তাকে নিখোঁজ করা হল? তার বিরুদ্ধে সব মিথ্যা প্রমাণ রাখা হল? কী এমন জানতে পেরেছিল ইকবাল।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও একবার ইকবালের বাড়ি যেতে হবে রুদ্রকে। খুঁজতে হবে ইকবালের ঘর। ইকবাল প্রফেশনাল ছিল। রুদ্রকেও এবার প্রফেশনাল ভঙ্গিতেই খুঁজতে হবে। যা ও আগেরবার করেনি। করার দরকার পরেনি।
দ্রুত উঠে দাঁড়াল রুদ্র। কাবার্ড খুলে একটা শার্ট বের করে জড়িয়ে নিল গায়ে। বোতাম লাগাতে গিয়ে মনে পড়ল প্রিয়তার কথা। এই কাজটা প্রিয়তার ছিল। রুদ্রকে শার্ট পরিয়ে বোতাম লাগানোর কাজটা ওই করতো। ওরও অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। প্রিয়তার অভ্যেস। সেই অভ্যেসই এখন তিলে তিলে শেষ করছে ওকে। বাইরে দিয়ে কঠোর থাকলেও, প্রিয়র বিরহে ভেতর থেকে গুড়িয়ে গেছে রুদ্র আমের। দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে ইকবালের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল রুদ্র।

মাথা তুলে রাখার শক্তি পাচ্ছেনা ইকবাল। সেই সকালে একটা শুকনো রুটি, এক চামচ ডাল আর এক গ্লাস পানি দেওয়া হয়েছিল। এরপর একটা দানাও জোটেনি কপালে। জোটেনি একফোঁটা পানিও। আ-ঘাতের কোন উপচারও করা হয়নি আজ। পুরোনো ঘায়ের ওপর তৈরি হওয়া নতুন ঘাগুলো থেকে থেকে ভয়ানকভাবে জ্বলে উঠছে। তুলে ফেলা নখের জায়গায় যেন মরিচ লাগিয়ে রেখেছে কেউ। অসহ্যকর সেই ন/গ্ন বাল্ব এখনো দুলছে। কী অসহ্য যন্ত্রণা! পানি চায়। ওর শুষ্ক গলা একটু পানি চায় এখন।

কিছুক্ষণ আগেও বাঁচার সব ইচ্ছা ত্যাগ করেছিল ইকবাল। সোলার সিস্টেম প্রায় শেষ, রাশেদ আমের মৃত। শওকত এখনকার পরিস্থিতি যেভাবে ব্যখ্যা করেছে তাতে সোলার সিস্টেমের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। ইকবালকেও জীবিত ছাড়বেনা ওরা। বরং ও যতবেশি জীবিত থাকবে পেনড্রাইভের কথা প্রকাশ করে ফেলার ভয় ততই বেশি থাকবে। তাই অন্নজল ত্যাগ করে সেচ্ছায় মৃত্যুবরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল ইকবাল।

কিন্তু হঠাৎ একটা ব্যপার মাথায় খেলতেই চমকে ওঠে। পেনড্রাইভটার মধ্যে কী আছে জানেনা ও নিজেও। শুরুর দিকে যখন পরপর সোলার সিস্টেমের খবরগুলো লিক হচ্ছিলো। গ্রুপের সবাই চিন্তিত হয়ে পরেছিল। চিন্তিত হয়ে পরেছিল ইকবাল নিজেও। সবার মতো করে ও নিজেও খোঁজখবর শুরু করেছিল। সেটা করতে গিয়ে পারভেজের ব্যপারটা সবার আগে জানতে পারে ইকবালই। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে কাউকে কিছু বলেনি। সেকারণেই ঐ সময়টাতে একটু বেশি অন্যমনস্ক আর ব্যস্ত দেখা যেতো ওকে।

খুব গোপনে লুকিয়ে নজর রাখতে শুরু করে ও পারভেজের ওপর। নতুন নতুন সুত্র পায়। সেগুলো অনুযায়ী এগুতে থাকে। টুকরো টুকরো তথ্য একত্রিত করে মেলাতে থাকে সমীকরণ। একপর্যায়ে জানতে পারে এই সবকিছুর মধ্যমণি আমের পরিবারের মধ্যেই কেউ একজন। ব্যপারটা যেমন ধাক্কা দেয়, আরও বেশি চিন্তিত করে তোলে ইকবালকে। বুঝতে পারে খুব শীঘ্রই সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সব শেষ হয়ে যাবে। রুদ্রর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করার কথাও ভেবে রেখেছিল।

কিন্তু সেই রাতে আবার পারভেজকে বের হতে দেখে ইকবাল। ব্যপারটা বুঝতে পিছু নেয় তার। কোন এক নির্জন জায়গায় একটা লোকের সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায় পারভেজকে। লোকটা একটা পেনড্রাইভ দেয় পারভেজের হাতে। খুব গোপনীয়তার সঙ্গে সেটা নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে যায় পারভেজ। পুরোটা সময় ওকে আড়াল থেকে ফলো করে ইকবাল। বুঝতে পারে এই পেনড্রাইভটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। এটা হাতে আসলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কঠোর ট্রেনিং পাওয়া লোক সে। কৌশলে পারভেজের বাসা পেনড্রাইভটা চুরি করতে বেগ পেতে হয়না।

তবে ইকবাল বুঝতে পারেনা যে পারভেজ তাকে দেখে ফেলেছে। পরেরদিন রাতেই ভারী লোকবল নিয়ে আসে ব্লাক হোল। ইকবালকে আহত করে মাঝরাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু অনেক খুঁজেও পেনড্রাইভটা কোথাও পায়না ওরা। শওকত, শান, সম্রাট, করিম, পলাশ সবাই এলো। খুঁজলো, জিজ্ঞাসা করল, নির্মম অ/ত্যা/চার করল। কিন্তু সেই পেনড্রাইভ পেলনা। পাবে কীকরে? তার আগেই ইকবাল সরিয়ে ফেলেছে সেটা। তবে নিজে দেখার সুযোগ পায়না। ইকবাল বুঝতে পারছিল এই পেনড্রাইভটায় এমন কিছু আছে যা প্রকাশ পেলে সবকিছু নাড়িয়ে দেবে। তাই প্রতিনিয়ত অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও কিছুতেই বলেনি পেনড্রাইভটা ও কোথায় রেখেছে। আর বলবেও না। অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আর হতে দেওয়া যাবেনা। তাই ওকে বাঁচতে হবে। সমস্ত কষ্ট সহ্য করে হলেও ওকে বাঁচতে হবে। ওকেও জানতে হবে কী এমন আছে ঐ পেনড্রাইভে? সাহায্য করতে হবে রুদ্রকে।

কিন্তু আরেকটা প্রশ্ন ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ইকবালকে। কে সেই গুপ্ত বিষ? আপন লোক হয়েও যে ভেতরে থেকে বিষে বিষে নীল করে দিচ্ছে গোটা সোলার সিস্টেমকে, আমের পরিবারকে? কেন করছে সে এসব? কীসের এতো রাগ আমের পরিবারের ওপর তার? কীসের প্রতিশোধ এটা?

জুতোর ঠকঠক আওয়াজে ভাবনার ছেদ ঘটে ইকবালের। কষ্ট করে তুলল মাথাটা। ক্লান্ত চোখে তাকাল। সম্রাট এসেছে। পরনে কালো টিশার্ট, নীল জিন্স। সম্রাট এমনিতে সুদর্শন। আজকে যেন বেশিই সুন্দর লাগছে। হঠাৎ চেহারায় এতো জৌলুসের কারণ খুঁজে পেলোনা ইকবাল। শুকনো ঢোক গিলল কেবল। সম্রাট মৃদু হেসে বলল, ‘কী ঠিক করলে ইকবাল? কিছু বলবে নাকি আজ আরেক হাতের নখ দিয়ে শুরু করব।’

ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল ইকবাল। অশ্রাব্য এক গালি দিয়ে থুথু ছুড়লো মেঝেতে। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবার সম্রাট রাগ করল না। বরং হেসে দিয়ে বলল, ‘ন্যাহ! ভাষাটা আর ঠিক হলোনা তোমার ইকবাল। তবে আজ আমি রাগ করিনি। তোমার মুখে গালিটাও আজ বেশ মধুর লাগছে।’ কথাটা বলে জিভ কা/টল। মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘ইশ, কথাটা কেমন প্রেমিক প্রেমিক টাইপ হয়ে গেল না? বুঝতে পারছি।’

ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল ইকবালের। শালা আজ এতো মৌজে আছে কেন? কী চলছে ওর মাথায়? সম্রাট যেন ইকবালের মনের কথা পড়ে ফেলল। দেঁতো হেসে একটা চেয়ার টেনে মুখোমুখি ইকবালের বসল। বলল, ‘তুমি আমাকে বরাবরই ভুল বুঝে এলে ইকবাল ভাই। সম্পর্কে গুরুজন হও। তোমাকে মারতে ভালো লাগেনা আমার। এখনো সুন্দরভাবে বলছি। বলে দাও পেনড্রাইভটা কোথায়। ব্লাক হোল জয়েন করো। কথা দিচ্ছি তোমাকে প্রাণ ভিক্ষা দেব আমরা।’
‘তোর দেওয়া প্রাণ নিয়ে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়াটাই আমি বেশি পছন্দ করব জানো/য়ার।’

‘আমার দেওয়া প্রাণ নিয়েইতো বেঁচে আছো ইকবাল ভাই। নিজের ওপরেই থুথু ছেটাবে নাকি এবার?’
আরও একটা বিশ্রী গালি দিল ইকবাল। সম্রাট যেন খুব মজা পেল। থুতনিতে হাত রেখে হাসল। কৌতুকপূর্ণভাবে বলল, ‘যতপারো গালি দিয়ে নাও। কারণ একটু পর যে আসবে, তার সামনে এতো সুন্দর সুন্দর ভাষা প্রয়োগ করতে চাইবেনা তুমি। আমি জানি। সেও তোমাকে একই প্রশ্ন করবে। আর তার প্রশ্নের উত্তর দিতে তুমি বাধ্য থাকবে।’
তিক্ত চাহনী দিল ইকবাল। লম্বা দুটো শ্বাস ফেলে ক্লান্তি সামলে নিল। ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে কন্ঠে বলল, ‘তোর রক্ষিতা আসবে নাকি?’

সম্রাটের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তবে রাগ করল না। এক হাত ইকবালের তুলে ফেলা নখের হাতটার ওপর চেপে রাখল। ব্যথায় চোখমুখ কুচকে এলো ইকবালের। সামান্য ঝুঁকলো সম্রাট। গলার স্বর নামিয়ে এনে বলল, ‘এভাবে বলেনা ইকবাল ভাই। যখন দেখবে তখন খারাপ লাগবে। তাকে খুব শ্রদ্ধা করো তুমি। ভালোও বাসো।’
হৃদপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে ইকবালের। তবে আজ সে আসতে চলেছে? এই সবকিছুর কলকাঠি যার হাতে। যে আমের পরিবারের কাছের একজন হয়েও শেষ করে দিয়েছে সোলার সিস্টেমকে। যে বিষে নীল হয়ে গেছে গোটা আমের পরিবার। কে হবে সে? ধাক্কাটা নিতে পারবেতো ও?’

ধুলোভর্তি ঘর। মাকড়সার জাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদিক সেদিক। হাত দিয়ে কোনমতে সেসব সরিয়ে প্রথমে ঘরটাকে হাঁটাচলার উপযুক্ত করল রুদ্র। সবার আগে চোখ গেল ছোট্ট বুক শেলফটায়। যেটা আগের সার্চ করেছিল ও। কিন্তু এবার সার্চ করল অন্য পদ্ধতিতে। সবগুলো বই নামালো শেলফ থেকে। প্রচণ্ড ধুলোয় রুদ্র কেশে উঠল। উপায় না পেয়ে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে বেঁধে নিল নাকে।

সেলফের প্রতিটা কাঠ, প্রতিটা তাক হাতে ঠুকে, চোখে নিখুঁত দৃষ্টি দিয়ে কয়েকবার ভালোভাবে পরীক্ষা করল রুদ্র। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কিছু পেলোনা। এরপর প্রতিটা বইয়ের কভার ছিড়ে ফেলল। একটা পৃষ্ঠাও বাদ রাখল না। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এবারের পেলোনা। হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়াল।

দেয়াল, জানালাও পরীক্ষা করল সময় নিয়ে। বিছানায় চোখ যেতেই একটু দাঁড়িয়ে যায় রুদ্র। ধুলো ভর্তি চাদরটা টেনে নিচে ফেলে দেয়। খুব ভালো করে চেক করে তোষকটা। কোথাও কোন অস্বাভাবিক সেলাই বা ছিদ্র আছে কি-না। কিন্তু তেমন কিছুই পায়না। বিছানায় তিনটে বালিশ রাখা ছিল। রুদ্র এক এক করে সবগুলো বালিশের কভার খোলে। একইভাবে খোঁজে অস্বাভাবিক কোন সেলাই বা ছিদ্র।

তবে কাঙ্ক্ষিত জিনিসের দেখা পায় রুদ্র। বালিশের গায়ে দেখতে পায় একটা এক্সটা সেলাই। সময় নষ্ট না করে দ্রুত পকেট থেকে ছোট ছু/রিটা বের করে। অযথা সেলাইয়ের জায়গাটা কেটে ফেলে দক্ষ হাতে। বালিশটা ফাঁক হতেই কিছু তুলো টেনে বার করে রুদ্র। দেখতে পায় সাদা রঙের ছোট্ট করে ভাজ করা একটা কাগজ।

একপ্রকার পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে চারপাশে। ক্লান্তিতে ঝিমুচ্ছে ইকবাল। শরীরের ব্যথাও বেড়েছে। অসহ্য লাগছে সবকিছু। বিষাক্ত অপেক্ষায় ছটফট করছে। ওর ঠিক সামনেই বসে আছে সম্রাট। ডান হাতে ফোন স্ক্রোল করছে। বা হাতে দু আঙ্গুলের মাঝে জ/লন্ত সিগারেট। মাঝেমাঝে ইকবালের দিকে তাকিয়ে গা জ্বালানো এক হাসি দিচ্ছে। তা দেখে গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে ইকবালের। অন্যদিকে সম্রাটের প্রতিক্রিয়া তার মনের ভয়কে তীব্র করছে। অধৈর্য্য হয়ে উঠছে। কে আসতে চলেছে? কী নতুন ধাক্কা অপেক্ষা করছে তার জন্য? এতোসব চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেলেও মাথা তুলতে পারছেনা ইকবাল। প্রচন্ড ক্লান্ত ও।

আবারও জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেল। তবে আগেরবারের চেয়ে এবারের আওয়াজটা কিছুটা ক্ষীণ। বুকের মধ্যে অদ্ভুত কম্পন অনুভব করল ইকবাল। মাথা তুলল না। ক্লান্তির সঙ্গে এবার বোধ হয় ভয়েও। সে এসে গেছে!
এদিকে জুতোর আওয়াজ পেতেই বাঁকা হাসল সম্রাট। আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখে ঠোঁটের হাসি প্রসারিত হল ওর। আরেকবার ইকবালের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল। বলল, ‘আপনার এবারের ইন্ট্রোগেশনটা গ্লামারে পরিপূর্ণ হবে ইকবাল ভাই। নিশ্চিত থাকুন।’

জুতোর আওয়াজ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ইকবালের ভেতরকার কম্পনও বাড়ছে সমান তালে। ঝিম ধরা মাথাটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল ইকবাল। তাকে দেখতে হবে। পৌঁছতে হবে সব রহস্যের কিনারায়। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে লম্বা শ্বাস ফেলল। আস্তে আস্তে চোখ তুলে তাকাল সামনে।

প্রথমে ঝাপসা লাগল সবকিছু। কালো এক অবয়ব দেখল কেবল। চোখ ঝাপটা দিতেই অবয়বটা কোন নারীর রূপ নিল। এগিয়ে আসছে সে, সশব্দে। আস্তে আস্তে কেটে গেল ঝাপসা ভাব। নারী দেহের সেই অবয়ব স্পষ্ট হল। যা দেখে নিঃশ্বাস আটকে এলো ইকবালের। হৃদয়ের কয়েকটা স্পন্দন ছন্দ হারালো। নিজের চোখদুটোর ওপর চরম অবিশ্বাস জন্মালো ইকবালের।

জুতোর ঠকঠক শব্দ থামিয়ে ইকবালের সামনে এসে থামল সে রমনীর পা। বিস্ময়ে স্তব্ধ ইকবাল। কালো গেঞ্জি, ওপরে টাইট কালো লেদার জ্যাকেট পরনে। সাথে কালো জিন্স। পোশাকটা যেন এই ছিপছিপে কিন্তু সুগঠিত শরীরের জন্যেই তৈরী। হলদে ফর্সা শরীরে সম্পূর্ণ কালো পোশাকটা জ্বলজ্বল করছে। প্রায় কোমর ছোঁয়া চুলগুলো খোলা, কার্ল করা। ডান হাতে ধরে রেখেছে বেরেটা। সম্রাটের ছেড়ে দেওয়া চেয়ারটা টেনে বসল মেয়েটা।

সামান্য উগ্র বসার ভঙ্গি। নিঃসংকোচে চাইল ইকবালের চোখে। ইকবাল হতবাক হয়ে চোখ রাখল সেই চোখে। ঘনপল্লবে ঘেরা ঐ অপূর্ব চোখজোড়ায় কত মায়া, আর্কষণ। কঠিন পাথরকেও গলিয়ে ফেলতে সক্ষম এই দৃষ্টি। কিছুতেই বোঝার উপায় নেই, এ চোখে এতো বিষ, এতো হিংস্রতা। হাঁটুর ওপর দুটো কুনুই রেখে মৃদু ঝুঁকল রমনী। ঠোঁটে খুব সামান্য হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘ভালো আছেন, ইকবাল ভাই?’

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৬৭ (২)

ক্লান্তি, ব্যথা সব তুচ্ছ মনে হল ইকবালের। চোখের সামনে যা দেখছে তা দুঃস্বপ্ন মনে হল। ভয়ানক দুঃস্বপ্ন। বিস্মিত, হতভম্ব ইকবাল কন্ঠে রাজ্যের অবিশ্বাস ঢেলে বলল, ‘তুমি!’

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৬৯