অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৭৯

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৭৯
লেখিকা: অনিমা কোতয়াল 

একসময় ডার্ক নাইটের নিজস্ব মিল গোডাউন হলেও; এখন এটাকে ডার্ক নাইট আর ব্লাক হোলের জয়েন্ট গোডাউন বলা যায়। এখানেই গোপন এক ঘরে বন্দি আছে ইকবাল। দু-দলের মিলিত সব কর্মকাণ্ডের সিদ্ধান্ত, মিটিং, আলোচনা সব এখানেই হয়।

দেয়ালের দু প্রান্তে; অনেকটা দুদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট আর শান। দুজনের হাতেই জ্বলছে সিগারেট। সম্পর্কটা কোনকালেই খুব একটা মধুর ছিলোনা ওদের। এখনো নেই। প্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরেই এখন এক ঘাটে জল খেতে বাধ্য হয় ওরা। একই অবস্থা শওকত মীর্জা এবং করিম তাজওয়ারেরও। দুটো চেয়ারে বসে একমনে সিগারেট টেনে চলেছেন তারা। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তরভাবে ভেবে চলেছেন। কিছুক্ষণ আগেই প্রিয়তা দেখা করে গেছে তাদের সাথে। নিজের পরিকল্পনা এবং কীভাবে কী করছে সব জানিয়ে গেছে। আর ওকে না জানিয়ে আর কোনরকম কোন পদক্ষেপ না নেওয়ার ব্যপারের শাসিয়ে গেছে। সেসব নিয়েই চিন্তিত তারা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নীরবতায় ছেদ ঘটিয়ে করিম বলল, ‘ইকবালকে নিয়ে কী ভাবছো?’
ভ্রু কুঁচকে ফেলল শওকত। সিগারেটে টান দিতে গিয়েও থেমে গিয়ে বলল, ‘ওকে নিয়ে এখন ভাবতে যাব কেন?’
তৎক্ষণাৎ শান বলে উঠল, ‘না ভাবারও যে কিছু নেই বাবা। এতো দিন ধরে কবজায় রেখেছি। কিন্তু এক শব্দও বার করতে পারিনি ওর মুখ দিয়ে। শুধুশুধুই বসিয়ে বসিয়ে গেলাচ্ছি। অথচ পেনড্রাইভটা কোথায় আছে সেটা এখনো জানিনা।’
পলাশ বলল, ‘চেষ্টাতো করা হচ্ছে। এখন ঐ ব্যাটা যদি মুখ না খোলে; আমরা কী করতে পারি?’

‘মুখ খোলার মতো কিছু করা হচ্ছে বলেতো আমার চোখে পড়ছেনা। তিনবেলা গরম গরম গান্ডেপিণ্ডে গেলানো হচ্ছে। গায়ে আবার ফুলের টোকাও দেওয়া যাবেনা। তাহলে আবার আরেকজনের গায়ে ফোসকা পড়ে যাবে। মেরে যে ফেলব সেটাও সম্ভব না। সারাজীবন ওটাকে শোপিসের মতো সাজিয়ে রাখার সখ হয়েছে আপনার মেয়ের।’ তীব্র আক্রোশ নিয়ে দ্রুত কদমে এগিয়ে এলো সম্রাট।

শান বলল, ‘এখনো অবধি যা হয়েছে যেটুকুই হয়েছে তা রানির জন্যেই হয়েছে। সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। আর ও যা করে তার পেছনে যথেষ্ট লজিক্যাল কারণ থাকে।’
‘থাকতো! কিন্তু এখন আমার সেসব কিছু মনে হচ্ছেনা। আমের পরিবারের সঙ্গে জড়ানোর পর তোমার ঐ বোনের ভাবভঙ্গি কোনকিছুই ঠিকভাবে ঠাওর করা যাচ্ছেনা। ওযে কী চাইছে, আর কী চাইছেনা সেটাই এখনো জানিনা।’ বলল করিম।

তেড়ে এসে চেয়ারে একটা লাথি মারল সম্রাট। বলল, ‘অনেক হয়েছে। এসব নাটক এখন এখানেই শেষ করুনতো। ব্যবস্থা করুন ওটার একটা।’
সম্রাটের তেজকে পাত্তা দেওয়ার তেমন কোন লক্ষণ দেখা গেলোনা শওকত মীর্জার মধ্যে। নির্বিকার চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, ‘ওকে নিয়ে ভাবার সময় বা প্রয়োজন কোনটাই এখন নেই। ভুলে যেওনা পেনড্রাইভটা আমাদের যতটানা প্রয়োজন, তারচেয়েও বেশি প্রয়োজন রানির। ওটা যাতে কিছুতেই রুদ্রর হাতে না পৌঁছয়। সেটা আমাদের চেয়ে বেশি রানি চায়।’

করিম তাজওয়ার গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বলল, ‘তোমার কী এখনো মনে হয় শওকত; তোমার মেয়ে আমাদের হাতে আছে?’
‘ও আমাদের হাতে ছিল এরকম ভ্রান্ত ধারণা তোমার কবে হল করিম? ও আমাদের সাথে ছিল ঠিকই হাতে কোনকালেই ছিলোনা। এখনো অবধি ও যা যা করছে তাতে আমাদেরই লাভ। তাই ওকে ঘাটিয়ো না। হিতে বিপরীত হবে।’
সম্রাট আক্রোশ চেপে বলল, ‘আর যদি ওর কাজে আমাদের লস হতে শুরু করে?’
শওকত বললেন, ‘এমনটা হবেনা। কিন্তু যদি হয়। ওকে আমাদের ইশারায় নাচানোর মতো তুরুপের তাস আমার হাতে আছে।’

শান আর পলাশ সহজেই বুঝে ফেলল শওকত কোন তাসের কথা বলছে। কিন্তু করিম বা সম্রাট বুঝল না। করিম কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘সেটা কী?’
শওকত ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটল। বলল, ‘সেটা জেনে কাজ নেই তোমাদের। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, রানি চাইলেও আমাদের বা দলের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করতে পারবেনা। কোনভাবেই না।’

‘সেটা হলেই ভালো। কিন্তু সাবধান! আমাদের সঙ্গে ডাবল ক্রসিং করার চেষ্টা করবেন না মীর্জা। পরিণতি ভালো হবেনা।’ চোখেমুখে অস্বাভাবিক আক্রোশ আর ঘৃণা নিয়ে বলল সম্রাট।
সম্রাটের হুমকি কোনরকম প্রভাব ফেললনা শওকতের মধ্যে। ব্লাক হোল আর কী, সেতো নিজের মেয়ের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে চলেছেন!

বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। রুদ্র এখনো বের হয়নি। কাউচে বসে আছে। কোলের ওপর ল্যাপটপ ; দৃষ্টি মনিটরে আবদ্ধ। দেখছে পরবর্তীতে টার্গেট করা ব্যবসায়ীদের লিস্টগুলো। কপালে চিন্তার ভাঁজ। সিদ্দিকের হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই ওর। সিদ্দিকের পরিবর্তে নতুন কাউকে খুঁজতে হবে এখন। হাতে সময় খুব কম। চারটাদিন! চারটাদিন সময় আছে ওর হাতে। এখনো এগারো কোটি টাকা জোগাড় করতে হবে। চারদিনে এগারো কোটি! ব্যাপারটা সহজ নয়। সিদ্দিক তার দশ কোটি দিলে চাপটা নিমেষেই কমে যেতো। কিন্তু সে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। নাকি কেউ করে দিয়েছে!

উচ্ছ্বাস নির্ধারিত পার্টির কাছ থেকে টাকা আনতে বেরিয়েছে। কয়েকজনের টাকা দেওয়ার ডেডলাইন আজ। বেশ ঝামেলা করছিল। কিন্তু পরপর দুজন ব্যবসায়ীকে রুদ্র যেভাবে খু/ন করেছে, তাতে ভয় পেয়ে গেছে তারা। প্রাণের ভয়ে বাধ্য হচ্ছে টাকা নিতে। ওখানেও ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কোনভাবেই প্রত্যাশিত ক্যাশ পাবেনা। আমের ফাউন্ডেশন সামলানোর কাজটা আপাতত জাফর করছে।

অপরদিকে প্রিয়তা। না, আমের ভিলা ছাড়েনি ও। বিনা তর্কে রয়ে গেছে চুপচাপ। সবটাই স্বাভাবিক। তবে স্কুলের চাকরিটাও ছাড়েনি। কারণ হিসেবে বলেছে, বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। স্কুলে বাচ্চাদের মাঝে থাকলে নাকি তার ভালো লাগে। অদ্ভুতভাবে রুদ্রও বাঁধা দেয়নি। করুক যা ইচ্ছে। তবে জয়কে বলে রেখেছে, সবসময় চোখে চোখে রাখতে। তবে ইদানিং মাঝেমধ্যেই অদ্ভুত ব্যবহার করে ওঠে প্রিয়তা। সরাসরি না বললেও, ওর ভাবভঙ্গি দেখেই রুদ্র বুঝতে পারে প্রিয়তা আবার মা হতে চায়। কিন্তু রুদ্রতো এখন তা চায়না!

টি-টেবিলে ল্যাপটপটা রেখে একটা সিগারেট বের করল রুদ্র। ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে লাইটার কাছে আনতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। রুদ্র চোখ তুলল। ঠোঁটে সিগারেট চেপে রাখা অবস্থাতেই অস্ফুট স্বরে বলল, ‘এসো।’
ঘরে প্রবেশ করল নীরব। এগিয়ে এলো ধীরপায়ে। ইতস্তত করে বলল, ‘ডেকেছিলেন ভাই?’
‘ হ্যাঁ, বসো। বলছি।’ বলে সিগারেটেরটা জ্বালিয়ে নিল।

খানিকটা সংকোচ নিয়ে বসল নীরব। রুদ্র সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘চলবে?’
হকচকিয়ে গেল নীরব। লজ্জিত কন্ঠে বলল, ‘আমি খাইনা ভাই।’
‘গুড।’ বলতে বলতে ধোঁয়া ছাড়ল রুদ্র। ‘তোমার বাবা-মার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে আর?’
নীরব নরম স্বরে বলল, ‘না।’ হঠাৎই মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর।
ব্যপারটা বুঝতে পারল রুদ্র। তাই প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘বিয়ের ঝামেলা মিটে গেছে। আমি কী বলেছিলাম মনে আছে?’
শ্রাগ করল নীরব, ‘আছে?’

‘তবে?’
‘আমি কয়েকটা সার্কুলার দেখেছি রুদ্র ভাই। কাল থেকেই ইন্টারভিউ দেওয়া শুরু করব।’
‘বেশ। যোগ্যতা আছে তোমার। বিদেশী ডিগ্রিও আছে। চাকরি পেতে সময় লাগবেনা। তবে, টাকা লাগলে অবশ্যই চাইবে।’
নীরব কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওকে বলার সুযোগ না দিয়েই রুদ্র বলল, ‘কুহুর ভাই হিসেবে নয়, নিজের ভাই হিসেবে চাইবে।’

এরপর আর কিছু বলার মতো পেলোনা নীরব। নতদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘জি ভাইয়া।’
‘এটা বলতেই ডেকেছিলাম। আসতে পারো।’
নীরব ধীরগতিতে উঠে দাঁড়াল। যেতে নিয়েও থেমে গেল কিছু একটা চিন্তা করে। পেছন ঘুরে বলল, ‘ভাইয়া?’
‘বলো।’

‘সবটা কী ঠিক যাচ্ছে? আপনাকে ইদানিং প্রচন্ড চিন্তিত মনে হয়।’
রুদ্র অ‍্যাশট্রেতে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘সে নিয়ে তোমার চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। আমি আছি। সামলে নেব।’

আর কিছু বলে ওঠার সাহস করে উঠতে পারল না নীরব। যেতে নিলে এবার ডাকল রুদ্র। নীরব দাঁড়িয়ে গেল। রুদ্র বলল, ‘জ্যোতিকে দেখলে এক কাপ কফি পাঠিয়ে দিতে বলো।’
নীরব সংকোচ মেশানো কন্ঠে বলল, ‘জ্যোতি আপুতো বাড়িতে নেই। বেরিয়েছেন।’
‘কোথায় গেছে? অফিস থেকে মেডিকেল গ্রাউন্ড দেখিয়ে ছুটি নিতে বলেছিলামতো ওকে।’ রুদ্রর কন্ঠে স্পষ্ট রাগ।

‘নিয়েছে।’
‘তবে?’
‘বলল যে ব্যাংকে কাজ আছে।’
‘সাথে কেউ গেছে?’
‘বোধ হয় গেছে। আমি শিওর না।’
‘আচ্ছা।’

চুপচাপ বেরিয়ে গেল। রুদ্র হঠাৎ ওকে চাকরি করার জন্যে এতো তাড়া কেন দিচ্ছে? নীরবকে সেটেল করার এতো কীসের তাড়া তার? অনেক ভেবেও এর উত্তর খুঁজে পাচ্ছেনা ও।
নীরব যাওয়ার পর গম্ভীরভাবে কাউচে বসে রইল রুদ্র। জীবনটা কোনকালেই সহজ ছিলোনা ওর। কিন্তু সেসব নিয়ে কখনই মাথাব্যথা ছিলোনা রুদ্রর। নিজের ভয়ানক জটিল জীবনটাকে নিয়েই দিব্বি ছিল। কিন্তু বিগত দুইমাস যেন প্রলয়ঙ্করী ঝড় বইয়ে দিলো ওর জীবনে। জটিল জীবনের জটিলতায় যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ল অজান্তেই। প্রথমবার বোধ হল, হয়তো মুক্তি চায়। ওর অবচেতন মন মুক্তি চায়!
তখনই বেজে উঠল ফোনের রিংটোন। ভাবান্তর হলোনা রুদ্রর মধ্যে। নির্বিকারছন্দে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে কানে নিয়ে বলল, ‘বল!’

‘কীরে শালা! এখনো ঘুমাস?’
‘ওদিকের কী খবর?’
‘খবর শুনলে তোমার চোখে আর ঘুম থাকবে বলে মনে হয়না গুরু।’
‘বুঝেছি। পুরো ক্যাশটা জোগাড় করা যায়নি। তাইতো?’
‘ভালো বুঝেছিস। কিন্তু পুরোটা বুঝিস নি।’
‘ঝেড়ে কাশ।’ ভ্রুকুটি করল রুদ্র।

‘তারিকুল রহমান যে, ঐযে পাঁচ কোটির ক্লাইন্ট। টাকা দেওয়ার জন্যে তাকে এখন আরেকবার জন্মাতে হবে।’
আরও গম্ভীর হল রুদ্রর চোখমুখ। উচ্ছ্বাসের পরবর্তী লাইনটা অনুমান করতে পারছে ও। এবং ওর ধারণাকে সত্যি প্রমাণিত করে উচ্ছ্বাস বলল, ‘ঐ ব্যাটাকে কেউ বা কারা বাড়ি এসে খুন করে রেখে গেছে।’

দীর্ঘক্ষণ ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ঘেমে গেছে জ্যোতি। যদিও শীতকাল, তবুও এতো ভীড়ের মাঝে ভ্যাঁপসা গরম অনুভব হচ্ছে। আমের পরিবারের সদস্য হয়েও সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতো ও। চাকরি কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সবসময় সাধারণ মানুষের মতোই করতো। আর এখন চাইলেও সেরকম বিলাসী জীবনযাপন সম্ভব না। রুদ্র, উচ্ছ্বাস কিংবা জাফর ওদের বুঝতে দেয়না ঠিকই; কিন্তু ওরাযে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে সেটা বুঝতে পারে জ্যোতি।

ইদানিং মাইগ্রেনের ব্যথাটা বড্ড জ্বালায়। সবচেয়ে বেশি জ্বালায় রুদ্রর বর্তমান অবস্থা। ছেলেটাকে এরকম কখনও দেখেনি ও। এতোটা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত! আজও মনে পড়ে সেই বিষাক্ত দিনটা। কুহুর বিধ্বস্ত শরীর, নীরবের সেই আর্তনাদ। এরপর সবটাই বিষময়। রাশেদ আমেরের মৃত্যু, প্রিয়তার এক্সিডেন্ট আর মিসক্যারেজ। আচমকা এক বজ্রের আঘাতে বৃক্ষের মতোই ঝলসে গেল আমের পরিবার। কথাগুলো ভাবলেও শরীর কেঁপে ওঠে ওর। মাথার যন্ত্রণাটা বেড়ে যায়। টাকা তুলে আস্তে আস্তে সাইডে রাখা সোফায় বসল জ্যোতি। হাত দিয়ে নাকের নিচটা মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টাকাগুলো গুনতে হবে এখন।

ব্যাংকে জ্যোতির কলিগ আজাদও এসেছে। হঠাৎ জ্যোতিকে এখানে দেখে এগিয়ে এলো সে। পাশে গিয়ে বসল। দু সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে নিয়ে নিল টাকার বান্ডিলটা। মৃদু চমকে উঠল জ্যোতি। তাকিয়ে দেখল আজাদ অলরেডি গোণা শুরু করে দিয়েছে। বলল, ‘আমিতো পারতাম আজাদ ভাই।’
গোণা থামিয়ে দিয়ে আজাদ বলল, ‘পারতেন। কিন্তু কষ্ট হতো। মাথা ধরেছে নিশ্চয়ই? মাইগ্রেনের সমস্যা আছেতো আপনার।’

জ্যোতি গহীন চাহনীতে একবার তাকাল আজাদের দিকে। মুখ দেখে এভাবেও বুঝি সবটা বুঝে নেওয়া যায়? কীকরে পারে এই লোকটা! প্রসঙ্গ পাল্টে জ্যোতি বলল, ‘টাকা তুলতে এসেছেন?’
‘না, জমা দিতে।’
‘অফিস যাননি আজ?’
‘গিয়েছিলাম। অফিসিয়াল কাজেই বেরিয়েছিলাম।’
‘ওহ্।’

‘হুম, এবার চুপ করুনতো! আপনার জন্যে দু’বার গুলিয়ে ফেললাম। গুনতে দিন।’
গোণায় পুরোপুরি মনোযোগ দিল আজাদ। জ্যোতিও আর বাঁধ সাধল না। লোকটা ওর থেকে বয়সে কিছুটা বড়। তবুও “আপনি” বলেই সম্বোধন করে। জ্যোতি “তুমি” বলার অনুমতি দিয়েছিল। অনেকবার বলেছেও। কিন্তু আজাদের মনে হয়েছে “আপনি” ডাকটাই বেশি সুন্দর। সুতরাং সে তার সম্বোধন বদলাবে না। টাকাগুলো গোণা হলে আজাদ বলল, ‘কত তুলেছিলেন?’

‘ষাট হাজার।’
‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’
আজাদ সন্তুষ্ট চিত্তে টাকাগুলো বান্ডিল বাঁধল। এগিয়ে দিল জ্যোতির দিকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘মেডিকেল গ্রাউন্ডে ছুটি নিয়েছিলেন নাকি? কিন্তু আপনাকেতো তেমন অসুস্থ বলেও মনে হচ্ছেনা। কী হয়েছে?’
‘পারিবারিক কিছু সমস্যা আছে আজাদ ভাই।’
‘ওহ আচ্ছা। তা সঙ্গে কেউ এসেছে?’
‘না, আমি একাই।’

আজাদ কিছু বলার আগেই ফোন বেজে উঠল জ্যোতির। নীরবের কল। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নীরব বলল, ‘আপু, তুমি কাউকে নিয়ে যাওনি সঙ্গে?’
‘না, কেন? কী হয়েছে?
‘রুদ্র ভাই কিন্তু রেগে গেছে।’
‘কিছু বলেছে?’ মৃদু কিন্তু উৎসাহি কন্ঠে প্রশ্ন করল জ্যোতি।
‘জিজ্ঞেস করছিল। মনে হল তুমি বেরিয়েছো বলে রাগ করেছে।’
‘চিন্তা করোনা। আমার কাজ শেষ। ফিরছি বাড়িতে।’

কল কেটে দিল নীরব। জ্যোতির ভালো লাগল। সত্যিই ভালো লাগল। ভালোবাসার মানুষটার ভালোবাসার ভাগ না পাক; চিন্তা আর দায়িত্ববোধের ভাগতো পেয়েছে। এইবা কম কী?
জ্যোতির মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল আজাদ। বলল, ‘কীভাবে এতো অল্পে সন্তুষ্ট হয়ে যান বলবেন? যেখানে কেউ একজন আপনাকে সর্বস্ব দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে?’

অদ্ভুত এক হাসি ফুটল জ্যোতির ঠোঁটেও। আজাদের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘চাতক পাখিকে এক সমুদ্র জল উপহার দিলেও, সেতো কেবল বর্ষণেরই অপেক্ষা করে আজাদ ভাই। রুদ্র নামক পুরুষের একঝলক দর্শনে আমি যে তৃপ্তি পাই, কারো সর্বস্ব উজার করা ভালোবাসায়ও সে তৃপ্তি পাবোনা আমি।
উত্তরটা আজাদকে যতটা আঘাত করার কথা ছিল; ততটা করল না। বরং জ্যোতির প্রতি জমানো ভালোবাসাটা যেন তরতর করে বেড়ে গেল কয়েকগুন।

জ্যোতি ব্যাগে টাকাগুলো রাখতে রাখতে উঠে দাঁড়াল। আজাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন যেতে হবে আমাকে। দেখা হবে আবার।’
‘ একাই যখন এসেছেন তখন চলুন, আমি এগিয়ে দিচ্ছি।’
‘ তার প্রয়োজন নেই আজাদ ভাই। চলে যেতে পারব আমি।’
‘ আপনি সবকিছু একাই পারেন। আমি জানি সেটা। কিন্তু ঐযে বললেন, চাতক পাখি কেবল বর্ষণের আশাই করে। আমার কাছ থেকে আমার বর্ষণ কেড়ে নেওয়ার অধিকার কিন্তু নেই আপনার।’

জ্যোতির উত্তরের অপেক্ষা করল না আজাদ। চমৎকার হেসে হাত বাড়িয়ে পথের দিকে ইশারা করে বলল, ‘চলুন।’
জ্যোতি মলিন হাসল। আজাদের হাসির আড়ালে লুকানো অন্তর্দহন টের পায় জ্যোতি। সেই একই দহনে যে ও নিজেও দগ্ধ। ও নিজেও ভালোবাসে একজনকে। মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে।

ভীষণ অদ্ভুত এই ভালোবাসা। একজন যাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসে, সে হয়তো অন্যকাউকে তার সর্বস্ব দিয়ে বসে আছে। আবার যখন দুপক্ষই সর্বস্ব উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে দেয়, তখন নিয়তিই নিষ্ঠুর ছলনা করে বসে তাদের সাথে। সর্বস্ব কেড়ে নেয়। দিনশেষে তারা সবাই নিঃস্ব। জ্যোতি, আজাদ, নীরব-কুহু, উচ্ছ্বাস-নাজিফ তারই প্রমাণ।
খুব কম সৌভাগ্যবান মানুষই আছে, যারা নিজের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার পরিবর্তে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পায়, সাথে নিয়তিও তাদের অনুকূলে থাকে। সে ক্ষেত্রে রুদ্র পরম সৌভাগ্যবান। নিজের প্রিয়র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং সঙ্গ দুটোই তার সঙ্গে আছে।

গুলশান লেকপার্কের কাছেই এক নির্জন জায়গা। আশেপাশে কেউ নেই বললেই চলে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গাছে হেলান দিয়ে, গোধূলি লগ্নের লালচে আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রিয়তা। গভীর চোখদুটো যেন গ্রাস করছে আকাশের বিশালতাকে। শুষে নিচ্ছে সব রক্তিম আভা। গায়ের হলদেটে রঙে এসে পড়া লালচে আলোয় কমলাটে আভা ছড়াচ্ছে ওর শরীর থেকে।

পরনে ছাইরঙা একটা গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট। সব মিলিয়ে জ্বলন্ত রূপসী মনে হচ্ছে ওকে।
জয়ের সঙ্গে আমের ভিলা থেকে বেরিয়েছে একটু আগেই। রুদ্রর অনুমতি নিয়েই বেরিয়েছে। একান্ত ব্যক্তিগত জিনিস কিনতে হবে তার। এমনটাই বলেছে রুদ্রকে। রুদ্রও বারণ করেনি। শুধু জয়কে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাত্র।
রুদ্র, উচ্ছ্বাস, জাফর কেউ বাড়িতে নেই।

জ্যোতি ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। মাইগ্রেনের সমস্যা আছে মেয়েটার। ব্যথা উঠেছে নিশ্চয়ই। নীরবও কুহুকে নিয়ে একটু বেরিয়েছে। প্রিয়তাই বলেছে, কুহুকে নিয়ে একটু ঘুরে আসতে। মেয়েটা এখনো কেমন গুটিয়ে থাকে। স্পষ্ট বোঝা যায়, এখনো সবটা মেনে নিয়ে স্বাভাবিক হতে পারেনি ও। কিন্তু নীরবও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে তার সবটা দিয়ে চেষ্টা করছে।

দীর্ঘশ্বাস চাপল প্রিয়তা। স্কুলের থাকার আধঘন্টা পড়েই পেছনের গেইট দিয়ে বেরিয়েছে ও। গোডাউনে বাকিদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হয়েছে।
প্রিয়তার এই অসময়ে এখানে আসার কারণটা অন্যরকম। সেদিন প্রিয়তার নীরব হুমকিতেও থেমে থাকেনি নার্গিস। আরও বেশি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নজর রাখতো প্রিয়তার ওপর। গতকাল বিকেলের কথা। ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল প্রিয়তা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখছিল বিস্তৃত আকাশকে। তখনই বিরক্তিকর শব্দে বেজে ওঠে প্রিয়তার সেলফোন। বিরক্তির চ বর্গীয় ধ্বনি উচ্চারিত হয় মুখ দিয়ে। স্ক্রিনে সম্রাট নামটা দেখে সে বিরক্তি বৃদ্ধি পায়। আগেও কয়েকবার কল করেছে সম্রাট। কিন্তু কেউ না কেউ সামনে থাকায় কলটা ধরতে পারেনি। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সম্রাট বলে, ‘যাক! আমার কলটা ধরার সময় হলো তোমার?’

প্রিয়তা চাপা গলায় উত্তর দেয়, ‘তুমি ভালো করেই জানো আমি আমের ভিলায় আছি। চাইলেই সবসময় কল ধরতে পারিনা। আর তোমারও হুটহাট এভাবে কল করা উচিৎ নয়।’
‘তোমার কথাতেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তুমি আমাকে বাজেভাবে ইগনোর করছো। শুধু জিজ্ঞেস করলে স্বীকার করছোনা। অথচ আমি জানতাম রানি মীর্জা নির্ভীক স্পষ্ট কথা বলে। আমের পরিবার সিংহিনীকেও ভেজা বেড়াল বানিয়ে দিল অবশেষে!’

প্রিয়তা ক্রোধ সংবরণে ব্যর্থ হলো। ‘করছি স্বীকার। করছি ইগনোর। আর কিছু জানার কাছে? আর যখন জানোই বর্তমানে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নই তাহলে বারবার ফোন করছো কেন?’
চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে সম্রাটের। এতোদিনে বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেছে হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে প্রিয়তা। সম্রাটের প্রতি এখন আর ওর কোন আকর্ষণ নেই। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘প্রয়োজন আছে বলেই ফোন করছি।’
‘বলে ফেলো।’

‘তুমি এখনো কেন ঐ বাড়িতে পড়ে আছো আমি সেটাই বুঝতে পারছিনা। ওখানে তোমাকে যে কাজে পাঠানো হয়েছিল তা শেষ হয়েছে। এখন ফিরে এসো।’
‘আমি আগেও বলেছি সম্রাট, আমি কারো আদেশের ধার ধারিনা। আমি কোথায় ; কোন কাজে যাই। আর সে কাজ কখন শেষ বা শুরু হয় সেটা আমি ছাড়া কেউ জানতে পারেনা। জানার চেষ্টাও করোনা। আর হ্যাঁ, আমাকে এখানে কেউ পাঠায়নি। আমি নিজের ইচ্ছায় এসেছি। বের হলে নিজের ইচ্ছাতেই হবো।’

‘কী চাইছো তুমি রানি?’ ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়লেও অস্বাভাবিক শীতল কন্ঠে প্রশ্নটা করে সম্রাট।
উত্তরে অদ্ভুত রহস্যময় হাসি হাসে প্রিয়তা। প্রশ্নটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে জবাব দেয়, ‘তোমার জরুরি কথা শেষ?’
ভ্রুদ্বয় কুঁচকে যায় সম্রাটের। মেয়েটা ওর ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। এতোটা ধৈর্য্যশীল সম্রাট কখনই ছিলোনা। এই রানি নামক বিষাক্ত রমনীর প্রেমে পড়ে নিজের ধৈর্যের চরম সীমা অবধি পরীক্ষা নিয়ে ফেলেছে ও। সেই পরীক্ষার ধারা বজায় রাখল সম্রাট। মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রেখেই বলল, ‘কালকে গোডাউনে আসতে পারবে?’

‘সকালে পারব।’
‘চলে এসো। সবাই থাকবে, কথা আছে।’
‘আসবো।’
সম্রাটকে আর কিছু বলতে না দিয়েই কলটা কেটে দেয় প্রিয়তা। দাঁতে দাঁত পিষে লম্বা দুটো শ্বাস ফেলে। অদ্ভুতভাবে সঙ্গেসঙ্গেই স্বাভাবিক করে ফেলে মুখমণ্ডল। আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, ‘সবটা শুনে কী বুঝলেন নার্গিস খালা?’

চমকে ওঠে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা নার্গিস বেগম। সেতো প্রিয়তাকে কথায় মগ্ন দেখেছিল। ধারণাও করেনি প্রিয়তা টের পেয়ে গেছে! কীভাবে পেল! মেয়েটা কোন অন্তর্যামী মায়াবিনী নাকি!
‘মায়াবিনী না, পিশাচিনী!’
গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে প্রিয়তা। ঘুরে তাকায় নার্গিসের দিকে।চোখদুটো পাথুরে স্থির। ঠোঁটের কোণে ভয়ানক সেই হাসি ঝুলিয়ে রেখেই পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে যায় প্রিয়তা। শিরশির করে ওঠে নার্গিসের সমগ্র শরীর। কেঁপে ওঠে পা জোড়া। গলা শুকিয়ে ভীষণ তেষ্টা পায়। অন্তর থেকে কেউ বলে যেন ওঠে, পালাও!

কিন্তু নিজের দুর্ভাগ্য থেকে কেউ পালাতে পারেনা। লোভের চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য বোধ হয় হয়না। তাই নার্গিসও পালাতে পারেনি নিজের সেই দুর্ভাগ্য থেকে। অর্থলোভ নিমেষেই ভেতরকার ভয়কে গ্রাস করে ফেলে।
এরপর যতবারই প্রিয়তার সঙ্গে দেখা হয়েছে ততবারই ব্লাকমেইল করে নার্গিস। তার ধারণা বাইরে কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে প্রিয়তার। টাকার জন্যে রুদ্রর বাড়িতে আছে। নিজের সেই প্রেমিকের সঙ্গেই কথা বলছিল ও। এখন যদি প্রিয়তা নার্গিসের চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দেয় তাহলে রুদ্রকে সব বলে দেবে সে। প্রমাণ হিসেবে সেই ছবিগুলোতো আছেই।
প্রিয়তাই তাই নার্গিসকে ডেকেছে এখানে। আমের ভিলায় এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সম্ভব হচ্ছিলো না।

‘এইযে বউ! আসছি আমি।’
চোখের পাতা মৃদু কেঁপে উঠল প্রিয়তার। তবে মুহূর্তেই চোখে খেলে গেল ধূর্ত হাসি। ঠোঁটে বক্র হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আসারইতো কথা ছিল।’
প্রিয়তার বেশ দেখে অবাক হল নার্গিস। এমন পোষাক, এমন ব্যক্তিত্ব! কিছুতেই দু-বছর যাবত দেখে আসা সেই শান্ত-শিষ্ঠ বউটার সঙ্গে মেলাতে পারল না। অবাক চোখে তাকিয়ে থেকেই বলল, ‘তুমিতো দেখতেছি ধুরন্ধর জিনিস! কেউ কিচ্ছু বুঝলোনা! ছোট বাবাও না!’

ভনিতা না করে কাজের কথা পাড়ল প্রিয়তা। বলল, ‘আপনি যা বুঝেছেন সেটা ভুলতে কত নেবেন?’
চকচক করে উঠল নার্গিসের লোভী চোখজোড়া। সে অনুমান করেইছিল প্রিয়তা এটাই জিজ্ঞেস করবে। উত্তরটাও মনে মনে ভেবে রেখেছে। তাই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বলল, ‘বিশ হাজার! বিশ হাজার দিলেই হইব।’
খানিকটা তাচ্ছিল্য করে হাসল প্রিয়তা। অনেক কৌতুক করে বলল, ‘তাহলেই চুপ থাকবেন আপনি?’
প্রিয়তার বলার ভঙ্গিতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হল নার্গিস। কম চেয়ে বসল নাতো! তাই হবে। সঙ্গসঙ্গে টাকার অঙ্গ বদলে ফেলে বলল, ‘না, না পঞ্চাশ! পঞ্চাশ হাজার লাগবে আমার।’

প্রিয়তা দেঁতো হাসল। তাতে নার্গিসের দ্বিধা আরও বাড়ল। এবারও কম হয়ে গেছে বোধ হয়। কিন্তু দাম আর বাড়ালোনা। পরে না হয় চাপে ফেলে আরও দাম চেয়ে নেওয়া যাবে।
প্রিয়তা নিজের হাত পেছনে নিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ‘বেশ, দিচ্ছি।’
নার্গিস অতি উৎসাহে হাত বাড়িয়ে দিল। অতি উত্তেজনায় বলল, ‘কিন্তু ছোট বাবা যা মানুষ, একদিন না একদিনতো ঠিকই জানবে। তখন তোমার কী হবে বলো দেখি? আর এই বাড়িতে আসছোইবা কেন? মানে চাওটা কী_’

কথার মাঝেই আর্তনাদ করে উঠল নার্গিস। বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে। যেটাতে একটা ইঞ্জেকশান গেঁথে দিয়েছে প্রিয়তা। হতভম্ব নার্গিসের গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হলোনা। কিন্তু অন্তত প্রিয়তা স্বাভাবিক। যেন কিছুই ঘটৈনি। বলল, ‘জগতের সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হল আমি কী চাই? প্রিয়তা ওরফে রানি মীর্জা কী চায়? আর জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি পছন্দ করিনা।’

একটানে সিরিঞ্জটা বের করল প্রিয়তা। শরীর ছেড়ে দিল নার্গিসের। চুপসে যাওয়া বেলুনের মতোই নেতিয়ে বসে পড়ল নিচে। কথা বলার চেষ্টা করেও বলতে পারল না। সবকিছুই ঝাপসা লাগছে। গা গুলিয়ে উঠছে ভয়ানকভাবে।
হাঁটু গেড়ে নার্গিসের সামনে বসল প্রিয়তা। সিরিঞ্জটা দুই আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘ব্যপারটা শুধু পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যপার হলে তোমাকে আমি ছেড়ে দিতাম খালা।

কিন্তু আপনি খুব বেশি জানেন। এ ব্যপারে জিরো পয়েন্ট ওয়ান পার্সেন্ট রিস্কও নিতে পারব না আমি। শুধু এইটুকু জেনে রাখো। বি-ষ আমি! ভয়ংকর বি-ষ!’
একদম জড়বস্তুর মতোই নেতিয়ে পড়ল নার্গিস। কিন্তু জ্ঞান আছে। তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হল তনুজা সঙ্গে আরেকটা ছেলে। ওদের দেখে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়তা। খুব অবহেলিত ভঙ্গিতে নার্গিসের দিকে ইশারা করে বলল, ‘ইঞ্জেকশনটা ছয় ঘন্টা পরপর আরও দুবার পুশ করবে। এরপর আর একে নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। ব্রিটেনের সিক্রেট ল্যাব থেকে তৈরী করা মোস্ট সিক্রেট লিকুইড। শতভাগ কাজের। সুস্থ মানুষের কথা বিশ্বাস করা হয়, বদ্ধ উন্মাদের না। ও সত্যিটা বললেও কেউ কিচ্ছু বিশ্বাস করবেনা।’

একবার নার্গিসকে দেখে নিল প্রিয়তা। তারপর বলল, ‘জয় কোথায়?’
‘শপিং মলে আছে ম্যাম। ওনার কাছে মাইক্রোফোন আছে তাই_’
‘কেউ দেখার আগে নিয়ে যাও একে।’

মাথা নাড়ল তনুজা। সঙ্গে থাকা লোকটার সাহায্যে নার্গিসকে তুলে নিয়ে গেল। সেদিকে আর তাকাল না প্রিয়তা। জয়কে একটা মেসেজ পাঠাল। অতঃপর পকেটে হাত দিয়ে আবার তাকিয়ে রইল লালচে আকাশের দিকে। কে বলবে, একটু আগেই একজন জলজ্যান্ত মানুষকে চিরকালের মতো পাগল করে দিয়েছে ও!

আমের ফাউন্ডেশনে রাশেদ আমেরের ঘরটাতে বসে আছে রুদ্র এবং জাফর। রুদ্র মাথার পেছনে দুহাত একত্রিত করে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখজোড়া বন্ধ। জাফর ক্যালকুলেটর চেপে হিসেবে ব্যস্ত। কপালে চিন্তার রেখা স্পষ্ট।
রাশেদের চেয়ারটা ফাঁকাই পড়ে আছে আজও। রুদ্র কল্পনা করল রাশেদ আমের বসে আছে এই চেয়ারে। গম্ভীর ভঙ্গিতে সিগারেটে টান দিতে দিতে শুনছে তাদের সমস্যা। কোন এক জাদুকরের মতোই যেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে নিমেষেই। সেই বজ্র কন্ঠে বেরিয়ে আসা একেকটা আদেশ! যা পালনে দুনিয়া এপাড়-ওপাড় করে ফেলতে পারতো ও। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুদ্র। রাশেদ আমের নামক মানুষটা ওদের জীবনে ঠিক কী ছিল সেই অনুভব যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে।

ক্যালকুলেটর থেকে চোখ সরাল জাফর। লম্বা শ্বাস ফেলে কলমের নিপ লাগাতে লাগাতে বলল, ‘ফ্যাক্টরি চালানোর মতো কাঁচামাল আমাদের হাতে নেই রুদ্র। আর মালগুলো কিনতে টাকার প্রয়োজন। দুটো মিল ফ্যাক্টরি ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কর্মচারীরাও টাকার প্রয়োজন। তারওপর আফ্রিকানগুলো যেকোন সময় বাংলাদেশে এসে হাজির হবে। আমি চারদিকে শুধু অন্ধকারই দেখছি।’

কথাটা বলতে বলতে ঘাম বেরিয়ে গেল জাফরের। ঠোঁট দিয়ে শুকনো জিভ ভিজিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল। রুদ্র চোখ মেলে সোজা হয়ে বলল, ‘আমাদের জগতটাইতো অন্ধকারে ঘেরা কাকা। এখানে আলোর আশা করাটা বোকামি।’
‘কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?’

‘আরও কজন ব্যবসায়ীকে মার্ক করেছি। আজ রাতেই লোক পাঠানো হবে।’
কথাটা বলে একটা সিগারেট ধরাল রুদ্র। জাফর আবার হিসেবে মনোযোগ দিয়েছে। সবে সিগারেটে একটা টান দিয়েছে রুদ্র। তখনই দরজার কাছ থেকে নক করল ইন্সপেক্টর আজিজ।
‘আসতে পারি?’

জাফর তাকাল দরজার দিকে। করা রুদ্র দরজার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘আসুন।’
আজিজ ভেতরে আসল। অনুমতি না নিয়েই বসল একটা চেয়ারে। জাফর সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আবার মনোযোগ দিল নিজের কাজে।
‘চা নাকি কফি?’

রুদ্রর মুখে কথাটা শুনে মৃদু চমকে উঠল আজিজ। ঠিক একই গলায়, একই ভঙ্গিতে রাশেদও বলতো একথা। নিজের সামলে সৌজন্যতার হাসি দিল আজিজ।
‘হাতে সময় খুব কম। না হলে খেতাম। জরুরি কিছু কথা বলতে এসেছিলাম।’
‘বলুন?’

‘ হঠাৎ করেই শহরের কিছু নামিদামি ধনী ব্যবসায়ী গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এবং সেটাও বিগত কয়েকদিনের মধ্যে। ধারণা করা যাচ্ছে তারা কেউই বেঁচে নেই।’
উত্তর দিলোনা রুদ্র। আঙুলে ধরে রাখা জ্বলন্ত সিগারেটটা এদিক ওদিক নাড়চ্ছে কেবল। জাফর বলল, ‘এ বিষয়ে আমরা কী সাহায্য করতে পারি।’

‘এবং জানা গেছে তাদের প্রত্যেকের সাথেই আপনাদের ফাউন্ডেশন যোগাযোগ করেছে। বিগত দিনগুলোতে।’
রুদ্র বলল, ‘স্বাভাবিক। তারা প্রত্যেকেই আমের ফাউন্ডেশনের ডোনার। সুতরাং প্রতি মাসে যোগাযোগ হবে সেটাইতো ন্যাচারাল।’
আজিজ মৃদু হেসে নিজের গোফে হাত বুলালো। ‘একদম! কিন্তু হঠাৎ তোমাদের ডোনারগুলোই উধাও হচ্ছে রুদ্র। এটা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক না?’

একই ভঙ্গিতে হাসল রুদ্রও। সিগারেটে লম্বা এক টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘আমার জানামতে তারা অন্যান্য অনেক কিছুতেই একসঙ্গে জড়িত। শুধু আমের ফাউন্ডেশনের সঙ্গে না। এখন আসল ঘটনা খুঁজে বের করা আপনাদের কাজ।’
মাথা ঝাঁকাল আজিজ। বলল, ‘তোমাদের ফাউন্ডেশনের সকল ডোনারদের লিস্ট চাই আমার। তদন্তের স্বার্থে।’
সঙ্গেসঙ্গেই একজনকে ডাকল রুদ্র। ডোনারদের লিস্টের একটা হার্ডকপি এনে দিতে বলল।

আজিজ গম্ভীর শ্বাস ফেলে বলল, ‘তোমার স্বভাব বদলাবে না রুদ্র। আমি যত চাইছি তোমাকে আলোর দিকে টানতে তুমি ততই অন্ধকারে ডুব দিচ্ছো। ইচ্ছাকৃতভাবে। এমন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছো যেখান থেকে মৃ/ত্যু ছাড়া তোমাকে বের করে আনা সম্ভব হবেনা।’

জবাব দিলোনা রুদ্র। মৃদু হাসল কেবল। ততক্ষণে লিস্ট নিয়ে চলে এসেছে ছেলেটা। সেটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল ইন্সপেক্টর আজিজ। চলে যেতে নিয়েও থেমে গিয়ে বলল, ‘প্রমাণ না থাকলেও তোমাদের ভেতরকার অনেক খবরই আমার জানা রুদ্র। আগের রুদ্র আমেরকে খুঁজে পাচ্ছিনা আমি। এতোটা অসহায়ত্ব, নিষ্ক্রিয়তা তোমাকে মানায়না।’

কথাটা বলে ঘরের দরজা অবধি যেতেই ডেকে উঠল রুদ্র। আজিজ থামল। রুদ্র অ‍্যাশট্রেতে সিগারেটটা গুঁজে দিয়ে বলল, ‘কুমির নিজের মুখ খোলা রেখে তার মধ্যে দিয়ে ছোট মাছগুলোকে আসা-যাওয়া করতে দেয়। তারমানে এই নাযে সে বোকা। তারমানে এটাই ঐ ছোট্ট মাছে তার পেট ভরবেনা। কুমির নিজের মুখ ততক্ষণ খোলা রাখে যতক্ষণ উপযুক্ত স্বীকার পুরোপুরি মুখে ঢুকে না যায়। আর একবার ঢুকে গেলে…’

মুচকি হেসে চেয়ারে হেলান দিল রুদ্র। আজিজ মনোযোগ দিয়ে তাকাল রুদ্রর তীক্ষ্ম চোখদুটোতে। যেন মুহূর্তের সেই পুরোনো সেই ধূর্ততা খেলা করে গেল রুদ্রর চোখে।

প্রিয়তার মেসেজ অনুযায়ী মেইন রোডের কাছে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে জয়। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা ওকে। পাঁচমিনিটের মধ্যেই প্রিয়তা চলে এলো। কোনরকম কথা না বলে উঠে বসল গাড়িতে। জয় পেছনে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‘সব ঠিক আছে ম্যাম?’
‘আছে।’

‘এখন তাহলে বাড়ির দিকে যাব?’
‘না, চেঞ্জ করতে হবে আমাকে। কোন একটা শপিং মলের দিকে চলো। আর একটা সিগারেটের প্যাকেট দাও।’
প্রিয়তাকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল জয়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। মনে পড়ল সকালে ইকবালের সঙ্গে বলা কথোপকথন।

সকালে গোডাউনে গিয়ে ইকবালের সঙ্গেও কথা হয়েছে প্রিয়তার। প্রিয়তা যখন জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন ইকবাল ভাই?’
তখন নগ্ন বাল্বের নিচে, আবছা অন্ধকার ঘরটাতে, চেয়ারে দড়ি দিয়ে আবদ্ধ থাকা ইকবাল বলে, ‘তোমার দয়ায় এই শরীরটা টিকে আছে চিন্তা করলেও নিজের ওপর ঘেন্না হয়।’

অপমানটা গায়ে মাখেনা প্রিয়তা। মৃদু হেসে বলে, ‘বেশিদিন আপনাকে আমার দয়ায় বেঁচে থাকতে হবেনা ইকবাল ভাই। খেলাটা খুব শীঘ্রই নিজের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে যাবে। এরপর আপনিও মুক্ত, আর আমিও_’
ইকবাল দাঁতে দাঁত পিষে বলে, ‘যে পরিমাণ পাপ তুমি করেছো। তোমার মুক্তি তোমার মৃত্যুতেই সম্ভব।’
‘মৃত্যুতো সকলেরই অন্তিম পরিণতি। তবে যতদিন বেঁচে থাকব রুদ্র আমেরের প্রিয় হয়েই থাকব।’ মুখে আর কন্ঠে অদ্ভুত তৃপ্তিভাব নিয়ে বলে প্রিয়তা।

প্রিয়তার উক্তিকে তাচ্ছিল্য করে হাসে ইকবাল। ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে বলে, ‘ ওপরওয়ালা তোমাকে ক্ষমা করবে কি-না জানিনা। কিন্তু রুদ্র আমের কোনকিছুর বিনিময়েই তোমাকে ক্ষমা করবেনা সেটা তুমিও জানো। রুদ্রর ঘৃণাই তোমাকে মৃত্যু দেবে। আর এটা হবে। হবেই। রাশেদ বাবার মৃ/ত দেহের ভাড়, কুহুর চিৎকার-যন্ত্রণার ধ্বনি, আমের পরিবারের প্রতিটা সদস্যের দীর্ঘশ্বাস থেকে তুমি বাঁঁচতে পারবেনা রানি মীর্জা। এগুলো তোমাকে শান্তিতে মরতেও দেবেনা, বাঁচতেও দেবেনা।’
অদ্ভুতভাবে এবার প্রিয়তা রেগে যায়নি। শূণ্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল ইকবালের দিকে। একদম শূণ্য!

ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগতেই ধ্যান ভাঙল প্রিয়তার। কিছু একটা ভেবে বলল, ‘আচ্ছা রাজু? ভালোবাসাকে নিজের করে রাখাটা বেশি জরুরি নাকি শুদ্ধ রাখাটা?’
হকচকিয়ে গেল জয়। প্রিয়তার মুখ থেকে হঠাৎ এমন প্রশ্ন কল্পনাও করেনি ও। ইতস্তত করে বলল, ‘আমি মানে..’
‘ছাড়ো! গাড়ি চালাও।’
‘ম্যাম..’
‘গাড়ি চালাও।’

বাধ্য হয়েই চুপ হয়ে গেল জয় ওরফে রাজু। সিটের ওপর গা ছেড়ে দিলো প্রিয়তা। যেন সব শক্তি শরীর থেকে শুষে নিয়েছে কেউ। অলস ভঙ্গিতে একটা সিগারেট বের করল। ধীরেসুস্থে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিলো সেটা। কিন্তু এবারও দু-তিনটানের বেশি দিতে ব্যর্থ হল। জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল সেটা। প্রচন্ড ক্লান্তিতে বন্ধ করে ফেলল চোখজোড়া।

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৭৮

ইকবালের বলা কথাগুলো প্রতিনিয়ত কানে বেজে চলেছে। রাশেদ আমেরের মৃতদেহ, কুহুর সেই ক্ষতবিক্ষত শরীর, নীরবের আহাজারি, আমের পরিবারের নেমে আসা সেই ভয়ানক বিষাদ। ভেতর থেকে কেমন ছটফট করে উঠল প্রিয়তা। কেঁপে উঠল ঠোঁটজোড়া। মনে হল ভেতর থেকে কেউ একজন কাঁদতে চাইছে। চিৎকার করে কাঁদতে চাইছে।

অন্তর্হিত কালকূট পর্ব ৮০