অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২২
তোনিমা খান
রূপকথা আর তানশানের আজ মর্নিং ক্লাস ছিল। তারা ভোর সাতটায় বেরিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে।
বারোটায় ছুটি হবে, তার পরীক্ষা সবার শেষ ক্লাসে।
তখন ১০:০০ বাজে। বিশ মিনিটের একটা ব্রেক টাইম শেষ হয়ে আসছে। তানশান খালি টিফিন বক্স হাতে ক্যান্টিন থেকে নিজের ক্লাসের দিকে যাচ্ছিল। করিডর থেকে হাঁটতে হাঁটতেই চোখ যায় অদূরে মাঠের কিনারায় বকুলতলায়। অক্ষীপটে ভাসে পরিচিত একটি মুখ, উদাসীন চিত্তে বসে থাকতে দেখে তার গতিশ্লথ হয়। সে করিডর থেকে ভালো করে উঁকি দিতেই শঙ্কা মিলিয়ে যায়। কপাল কুঁচকে তাকায় ঘড়ির দিকে। ঘন্টা পড়তে বেশি সময় নেই। আজ সকালেরই এইসময় একটা ব্রেক দেয়া হয়েছে যেহেতু সবার ক্লাস শুরু হয়েছে সাতটায়। সে টিফিন বক্সটা ব্যাগে রেখে ত্রস্ত পায়ে ক্লাস থেকে বের হয়।
ক্ষুধায় চুপসে পড়েছে রূপকথার রুগ্ন বদন। তপোবন প্রতিদিন টাকা দিলেও সে কখনো সেই টাকায় আনে না। ঘরেই থাকে। কারণ তার কোনো খরচই হয় না। তাই আজও আনেনি, যেটা তার ভুল ছিল।
–“আপনি এখানে কি করছেন?”
ক্ষণপরিচিত গম্ভীর কণ্ঠে রূপকথা উজ্জ্বল দৃষ্টি তুলে তাকায় সদ্য দাঁড়ানো তানশানের দিকে। বলল,
–“এমনিই, এখানে বসে ছিলাম। তোমার খাওয়া শেষ?”
–“হ্যাঁ, আপনার ও টিফিন খাওয়া শেষ?”, তানশান কৌতুহলী গলায় শুধায়। রূপকথা ঠোঁট উল্টে ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“আমি তো টিফিন আনিনি।”
তানশানের মাঝে মৃদু উদ্বেগ দেখা গেল।
–“আপনাকে কি জবা ফুপি টিফিন দেয়নি?”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো। তানশানের মুখশ্রীতে বিরক্তির প্রলেপ পড়ল। সে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল,
–“সকাল থেকে এতক্ষণ ক্লাস করবেন টিফিন না নিয়ে এসেছেন কেন? জবা ফুপিকে বলবেন না? খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? আপনি টাকা আনেনি? কিছু কিনে খেতেন?”
–“আমার কাছে টাকা নেই। আর আমি ক্লাস আর ওয়াশরুম ব্যতীত এখানকার কিছু চিনি না।”, রূপকথার কণ্ঠে অসহায়ত্ব! তানশান কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“টাকা নেই মানে? পাপা দেয়নি? পাপা তো সবসময় স্কুলে আসার সময় আমায় টাকা দেয়। ”
–“দিয়েছিল কিন্তু আমি আনিনি।”, রূপকথা ছোট মুখ করে বলে। তানশান ফোঁস করে বিরক্তিকর এক নিঃশ্বাস ফেললো। জিজ্ঞাসা করে,
–“কি করবেন এখন? খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই?”
রূপকথা উপর নিচে মাথা নাড়ে। তানশান থমথমে মুখে বলল,
–“আসুন আমার সাথে।”
রূপকথা নিরুত্তর তাকে অনুসরণ করে। ক্যান্টিনের দরজা খুলতেই মৃদু শোরগোল শোনা যায়। বিশাল ক্যান্টিন। ছোট ছোট গোল টেবিলে সকলে গোলাকার হয়ে বসে আছে। খাচ্ছে আর গল্প করছে। তানশান ঢুকে সোজা রিসিপশন থেকে মেনু কার্ডটা নিয়ে এসে রূপকথার দিকে বাড়িয়ে দিলো,
–“কি খাবেন? এখান থেকে পছন্দ করুন কিছু।”
রূপকথা মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে পুরোটাতে একবার চোখ বুলায়। এগুলোর মধ্যে কোন খাবার কেমন সে তো জানে না আর না চেনে। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তানশানের দিকে। তানশান সেই দৃষ্টি দেখে, কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“কি হয়েছে?”
–“আমি এখানের কোনো খাবার চিনি না। জানি না কোনটা ভালো।”
তানশান মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
–“এখানকার বার্গার সবথেকে টেস্টি। এছাড়াও আরো অনেক খাবার আছে। টুইস্টার, নাচোস, মমো..। আপনি কোনটা খাবেন?”
রূপকথা অবুঝপানে তাকিয়ে বলে,
–“তোমার যেটা ইচ্ছা সেটা দাও।”
বাবার মতো সবসময় সবার জন্য বেস্ট’টাই করার অভ্যাস তানশানের। সে বার্গার অর্ডার করে। ততক্ষণে টিফিনের “ঘন্টা পড়ে গিয়েছে। বার্গার আসতেই তানশান বলে,
–আমি বিল পে করে দিয়েছি। আপনি খেয়ে ক্লাসে চলে যান। আমি ক্লাসে যাই। ঘন্টা দিয়ে দিয়েছে।”
বলেই তানশান পা বাড়াতে নেয়। কিন্তু রূপকথা তার হাত টেনে ধরল। অনুনয় করে বলে,
–“এখানে অনেক ছেলেমানুষ। আমি একা একা এখানে..কিভাবে না মানে…তুমি একটু বসো। আমার দুই মিনিট লাগবে খেতে।
তানশান নম্র দৃষ্টিতে তাকায়। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
–“সময় নিয়ে খান। আমি বসছি।”
তানশান সম্মুখের চেয়ারে বসে পড়ল। রূপকথা হাসিমুখে খেতে শুরু করল। সেখানেও বিপত্তি। এত বড়ো একটা বার্গার সে মুখে ঢুকাতেই পারছে না। তানশান ডানে বামে মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
–“থামুন।”
তানশান বার্গারের মাঝের কাঠিটা উঠিয়ে দিয়ে, এক পার্ট আলাদা করে দিয়ে বলল,
–“এবার পার্ট পার্ট আলাদা করে ধীরে ধীরে খান।”
তানশান যেভাবে দেখিয়ে দেয় রূপকথা সেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে শুরু করে। খাওয়া শেষে তানশান জিজ্ঞাসা করে,
–“ভালো লেগেছে? আরো কিছু খাবেন?”
রূপকথা মৃদু হেসে বলে,
–“অনেক মজা। আমি এর আগে কখনো এমন খাবার খাইনি। ধন্যবাদ তোমায়, আর কিছু খাবো না। চলো, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তারা বেরিয়ে যায়। অদূরের চেয়ারে গা এলিয়ে থাকা অলস দুটো দৃষ্টি নড়েচড়ে উঠল রূপকথা আর তানশান বেরিয়ে যেতেই। রুম্মান আলগোছে একবার সেদিকে তাকিয়ে তৃশানের দিকে তাকায়। বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“ভাই তোকে আমার ততক্ষণ ভালোলাগবে, যতক্ষণ তোর দৃষ্টি কোন ন্যাকা মেয়েদের ওপর না পড়বে। আর আমি যদি ভুল না হই, তবে তুই সেই পনেরো মিনিট যাবৎ একটা মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলি। তোর সাথে আজকে থেকে আমার ব্রেক আপ। আমি সব দেখতে পারি, কিন্তু প্রেমে পিছলে মেয়েদের পেছনে ঘুরঘুর করা নেওটাদের সহ্য করতে পারি না।”
সহসা টেবিলের নিচ থেকে সজোরে এক আঘাত লাগে রুম্মানের পায়ে। তৃশান দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“ঐ শা/লা! আমি আর নেওটা? এই অদ্ভুত চিন্তাভাবনার জন্য তুই আগামী দুইদিন আমায় মুখ দেখাবি না। তোর আমাকে ভালোলাগতে হবে কেন? তুই কি আমার গার্লফ্রেন্ড যে ব্রেক আপ করছিস? যা ভাগ এখান থেকে।”
–“এমনভাবে কথা বলছিস যেন তোর মুখ না দেখলে আমার বাসর রাত হবে না।”, রুম্মানের কথায় মৃদুল চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে,
–“আবার সেই বাসর রাত! তোর সব কথা বাসর রাতে গিয়ে কেন আটকায়? আবার বলছিস তুই মেয়েদের পেছনে ঘোরা পছন্দ করিস না।”
রুম্মান সিরিয়াস ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বলে,
–“আমি ঠিক কথাই বলছি। আমি যে এই পড়াশুনা করছি তা দিনশেষে একটা সুস্থ, সুন্দর, দ্রুত বাসর রাত পাওয়ার জন্য। আমি পড়ালেখা না করলে চাকরি পাব না, চাকরি না পেলে বউ পাব না, বউ না পেলে আমার বাসর হবে না। ওহ্ মাই গড! আমি গেলাম তৃশান! আমার অনেক পড়া আছে। সামনে পরীক্ষা! তুই এখানে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেকে ছ্যাঁচড়া প্রমাণ কর। তোর তো আর বই ছোঁয়া লাগে না, তার আগেই তোর বই মুখস্থ হয়ে যায়।”
বলেই রুম্মান চেয়ার ছেড়ে ছুটলো। চোখে মুখে তার অদ্ভুত গাম্ভীর্যতা। যেনো একটু দেরি হলেই তার বাসর রাত একমাস পিছিয়ে যাবে। তৃশান দাঁতে দাঁত চেপে মৃদু আর মৃদুলার দিকে তাকায়। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–“ওর বাপকে ফোন লাগা। আর ফোন দিয়ে বল, তার হুজুর ছেলে বাসর রাত করার জন্য পড়াশুনা করছে। তাকে যেনো বিয়ে দিয়ে দেয়। অসহ্য! ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমানো পর্যন্ত বাসর রাত!”
মৃদুল আর মৃদুলা খিক খিক করে হেসে উঠলো। তারা দুই জমজ ভাই বোন। তারা চার জন ছোট বেলা থেকে একসাথে রয়েছে। প্রত্যেকেই ভালো ফলাফল করলেও কেউ একটা ভালো ভার্সিটিতে পড়ার জন্য দূরে কোথাও যায় নি। এখানেই পড়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল তৃশানের বাবা এবং প্রতিষ্ঠাতা তৃশানের দাদা। এই প্রতিষ্ঠান তাদের সবার খুব কাছের।
তারা প্রত্যেকেই মেধাবী স্টুডেন্ট। বড়তাদের চিন্তা মাস্টার্স শেষ করে তারা বিদেশে চলে যাবে। সেখানে গিয়ে তাদের গুন্ডামি আধুনিকতার সাথে প্রকাশ করবে। এটাই তাদের মেইন টার্গেট। জীবন উপভোগ করো নির্ভিকতার সাথে। সামনে যতো বাঁধা আসবে তারা হকিস্টিক দিয়ে পেটাতে পেটাতে দূর করবে।
রূপকথা ক্লাসে ঢুকতেই নূর আর নৈমি উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“তুমি কোথায় গিয়েছিলে, আমরা তোমায় খুঁজেছিলাম। দেখো তোমার জন্য খাবার এনেছি।”
রূপকথা বেঞ্চে বসে বলল,
–“আমি বারণ করেছিলাম তোমাদের।”
–“তোমার বারণ শুনব কেন আমরা? আমাদের বন্ধু না খেয়ে থাকবে আর আমরা তা দেখব?”
রূপকথা গম্ভীর মুখে বলল,
–“আমরা বন্ধু কবে হলাম?”
–“ঢং করো না। আমরা প্রথম দিন থেকেই সাত জনমের বন্ধু হয়ে গিয়েছি।”
নৈমির কথায় রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। আজ ও তারা তার পিছু ছাড়েনি বরং তার দুই পাশে ঘাপটি মেরে বসেছে।
ক্লাস করতে করতে শেষ ক্লাসের মুহুর্তটা আসতেই রূপকথা বুকভরা সাহস আর আত্মবিশ্বাস জুগিয়ে নিলো। টিচারের সরু দৃষ্টি উপেক্ষা করে ভীষণ আগ্রহের সাথে বেঞ্চের দুই পাশে দু’জন করে বসে যায়। ক্ষুদ্র একটা ক্লাস টেস্ট! অথচ এটা রূপকথার কাছে একটা বিশাল সুযোগ টিচারের ঐ সরু কটুক্তি মাখা দৃষ্টিতে নিজের জন্য সম্মান তৈরি করার।
দু’টো সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে। রূপকথা কোয়েশ্চেন হাতে পেতেই চোখেমুখে সফলতার অপ্রকাশিত উল্লাস ভেসে উঠল। চোখে ভাসছে তপোবনের মুখটি আর কানে ভাসছে তার এক একটা কথা।
সে মৃদু হেসে লেখা শুরু করে। সকলে যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে শেষ করল। শেষ উত্তরটা লিখে সমাপ্তি টেনে রূপকথা তার পেপারটা নিজের পাশের ফিলোর কাছে দিলো। এবং ক্লাস ফিলোর পেপারটা নিজে নিয়ে নিলো।
টিচার গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,
–“আমি উত্তর বলছি আর উত্তরের একটা কাগজ তোমাদের কাছে দিচ্ছি। প্রত্যেকে খাতা খুবই সতর্কতার সাথে দেখবে।”
স্টুডেন্টরা মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে স্যারের সাথে সাথে দেখতে দেখতে শুরু করল একে অপরের খাতা।
দশ মিনিটের মধ্যে খাতা দেখা শেষ হতেই টিচার বললেন,
–“এবার সব খাতাগুলো আমার কাছে জমা দাও। আর কয়জন ফুল মার্কস পেয়েছে আর ক’জন ফেইল করেছে তাদের খাতাগুলো আলাদা করে রাখো। এরপর বলো ক’জন ফুল মার্কস পেয়েছে আর ক’জন ফেইল করেছে।
সব খাতা পর্যবেক্ষণ করে ক্লাস ক্যাপ্টেন বলল,
–“স্যার, বারো জন ফুল মার্কস পেয়েছে আর সাত জন ফেইল করেছে।”
–“ফেইল করেছে কে কে আগে তাদের নাম বলো। তাদের মুখগুলো একটু দেখি। আমি শিওর ঐ শেষ বেঞ্চের তিনজন ও এর মধ্যে রয়েছে।”
স্যারের কথায় সকলে রূপকথা, নৈমি আর নূরের দিকে তাকালো। নৈমি নূর কপাল কুঁচকে নিলেও রূপকথা একদম প্রতিক্রিয়াহীন তাকিয়ে রইল।
ক্লাস ক্যাপ্টেন ফেইল করা ছাত্র-ছাত্রীর নাম উল্লেখ করলে তারা নত শির দাঁড়িয়ে যায়। টিচারের ভ্রু টানটান হয়ে গেল এর মাঝে রূপকথা নৈমি আর নূরকে না দেখে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“তোমরা পেপারে তোমাদের প্যারেন্টসদের সাইন আনবে। না আনলে ক্লাসে ঢুকতে পারবে না আর এই সপ্তাহে ক্লাস পরিষ্কার ও তোমরা ক’জন করবে।”
–“এরপর বলো ফুল মার্কস ক’জন পেয়েছে।”
ক্লাস ক্যাপ্টেন তাদের নাম উল্লেখ করলে তারা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে যায়। এবং টিচারকে অবাক করে দিয়ে রূপকথাও দাঁড়িয়ে গেল। নূর আর নৈমি খুশিতে আটখানা তারা দুজন পাশ করেছে কিন্তু তারা রূপকথার জন্য অনেক খুশি!
টিচার নিজের অভিব্যক্তি লুকাতে না পেরে গম্ভীর গলায় বললেন,
–“তুমি তো গতকাল বলেছিলে তুমি এই অধ্যায়ের কিছু পারো না। তবে আজ ফুল মার্কস পেলে কি করে? দেখাদেখি করেছো নাকি চিটিং করেছো? এই ওর পাশে কে ছিল?”
রূপকথার পাশে এতক্ষণ ক্লাসের অন্য একটা মেয়ে বসা ছিল। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে নাকোচ করে বলল,
–“ও কোনো দেখাদেখি করেনি, স্যার। আমি ওর পাশে ছিলাম, ও নিজের চেষ্টায় ম্যাথগুলো সলভ করেছে।”
টিচারের মুখ থমথমে ধারণ করল। শুধায়,
–“এক রাতের মধ্যে তুমি এত ভালো করলে কিভাবে? আমার কাছে তো তুমি প্রাইভেট ও পড়োনা, তবে?”
রূপকথা বিনম্র কন্ঠে বলল,
–“বাসায় টিচার আছে, স্যার।”
–“কোনো কলেজের টিচার?”
–“না স্যার।”
–“তবে কোনো ভার্সিটির স্টুডেন্ট?”
রূপকথার কণ্ঠ জড়তায় আচ্ছন্ন হতে গিয়েও হলো না। বরং জড়তা কাটিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আমার হাজব্যান্ড-ই আমার টিচার, স্যার।”
–“ওহ্!”, টিচার ছোট্ট করে জবাব দিলো। পরপরই গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“সে পেশায় কি?”
–“আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার।”, রূপকথা বলতেই টিচার মাথা নেড়ে তাকে বসতে বললেন। বদলে যাওয়া জীবনে রূপকথা কবে এত সুখ আর আনন্দ অনুভব করেছিল জানা নেই। সে উপচেপড়া আনন্দ নিয়ে ব্যাগ আঁকড়ে ধরে বসে পড়ে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, কখন তানশান আর তপোবনকে জানাবে তারা জিতে গিয়েছে।
ছুটির ঘন্টা বাজতেই রূপকথা গেটের কাছে এসে দাঁড়ায় তানশানের জন্য। ভীড় কমে আসছে অনেকটা। তন্মধ্যেই কারোর ব্যাঙ্গাত্মক কণ্ঠ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
–”সভ্য গ্রামের, সভ্য মেয়ে নাকি?”
রূপকথার মনে হলো বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠটি তার জন্যই ভেসে এসেছে। সে কৌতুহলী দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেদিনকার অসভ্য ছেলেটা। সাথে ছেলেপুলের অভাব নেই। ললাটে কয়েকটা ভাঁজ নিয়ে রূপকথা তাকে উপেক্ষা করে থমথমে মুখে পুনরায় সামনে তাকায়।
–”সভ্য গ্রামের মানুষ দেখি চরম অ’স’ভ্য। সিনিয়রদের অপমান করে। অবশ্য এটা অসোভ্য নয় নির্বোধ হবে। নয়তো যেচে তৃশান জোবায়েদের খপ্পরে কে পড়তে চাইবে!”
পুনশ্চঃ তৃশানের কণ্ঠে রূপকথা স্মিত হাসল। কেমন হাস্যকর লাগলো লোকটার কথা। পিচ্চি একটা মেয়ের থেকে লাগাতার উপেক্ষায় তৃশান দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করে। মৃদুলাকে বলে,
–”ঐ মেয়েটাকে এখানে নিয়ে আয় তো!”
মৃদুলা তৃশানের দিকে তাকায়। এটা একটা প্রাইভেট কলেজ। এখানে ব়্যাগিং নেই। কিন্তু কলেজে তৈরি হওয়া দুটি দলের সংঘর্ষে বাকি স্টুডেন্টদের ওপর একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে। যেই দু’টো দলের লিডার হলো তৃশান আর জুম্মা। জুম্মা হলো এখানকার একজন স্বনামধন্য রাজনীতিবিদের ভাগ্নে।
সে তার পাওয়ার দেখিয়ে কলেজে নেতৃত্ব দিয়ে বেড়ায়। আর তৃশান হলো বাবা দাদার পাওয়ার দেখিয়ে কলেজে নেতৃত্ব দিয়ে বেড়ায়। তবে এদের বিরূপ প্রভাব অনার্স লেভেল থেকে শুরু হয়। ইন্টারের উপর কোন প্রভাব পড়ে না।
কিন্তু আজ তাদের বন্ধু ইন্টারের মেয়েদের উপর চার্জ করছে কেন? সে বিভ্রান্ত হয়েই রূপকথাকে জোরপূর্বক টেনেটুনে নিয়ে আসল তৃশানের সামনে। এতক্ষণ ভয় না লাগলেও এখন একটু অস্বস্তি লাগতে শুরু করল রূপকথার। কত ছেলেমেয়েরা উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তৃশান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষণপরিচিত মুখটিকে। খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তা দেখতেই সে ফিচলে হাসল। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–”কি অবস্থা সভ্য গ্রামের অসভ্য নারী? নাম কি?”
রূপকথা জবাব দেয় না। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকে তৃশানের পানে। তৃশান চোখে চোখ রেখে হুঙ্কার ছাড়ল এবার,
–”নাম জানতে চাইছি।”
ঘন পল্লবদ্বয় কেঁপে উঠল তৃশানের সেই চিৎকারে। রূপকথা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–”রূপকথা।”
–”কি কথা?”, তৃশান কান এগিয়ে দিয়ে নুইয়ে আসে তার দিকে।
–”রূপকথা।”
রূপকথা পুনরায় বলে। সম্মুখের পুরুষালী ওষ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জিহ্বায় কয়েকবার উচ্চারিত হয় নামটি। ঠোঁটের কোনা বেঁকে যায় খানিকটা। অন্তঃস্থল আন্দোলিত হয়। তেরছা চোখে চেয়ে আওড়ায়,
–”যেমন চেহারা তেমন নাম।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায় তার পানে। তৃশান পুনরায় গম্ভীর গলায় শুধায়,
–”নির্বোধ ফেইরিটেইল! সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি করতে হাত পা কাঁপল না?”
–”কাঁপলে তো দেখতেন।”
মেয়েটির বিলম্বহীন দৃঢ় কণ্ঠে তৃশান সহ তার বন্ধুদের চোখে মুখে বিস্ময় দেখা গেল। তৃশান বিস্ময় নিয়ে বলল,
–”আরে আরে আমাদের অতি সভ্য গ্রাম্য ফেইরিটেইল তো চটর পটর কথাও বলতে পারে। তো শুরু করো! আজ আমরা সকলে তোমার থেকে শিখব কিভাবে সভ্য হতে হয়। কাম অন, স্টার্ট।”
আশপাশে ভরতি মানুষ হাসছে আর মজা নিচ্ছে। রূপকথা সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,
–”আপনাদের মতো অ’স’ভ্য, বেয়ারা, বখে যাওয়া ছেলেমেয়েরা কখনো সভ্য হতে পারবে না।”
–”কি বললে?”
সহসা তৃশানের ক্ষিপ্ত মুখশ্রী ঝুঁকে আসে রূপকথার মুখের ওপর। কেঁপে ওঠা পল্লব ঝাপটে তৎক্ষণাৎ রূপকথার দেহ পেছনে হেলে যায়।
পিটপিট করতে থাকা নেত্রদ্বয়, ঘেমে জবুথবু ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখে তৃশানের মেকি রাগ আলগোছে মিলিয়ে গিয়ে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। সে দুষ্টু হেসে মেয়েটির মুখের ওপর ফুঁ দিয়ে সরে আসে।
রূপকথা হতবিহ্বল চোখে তাকায়। তৃশান গা দুলিয়ে হেসে ওঠে সেই দৃষ্টি দেখে। আমোদিত কণ্ঠে বলে,
–”আই লাইক ইট। এমনি ভয় পাবে সবসময়। এতো চটর পটর করবে না।”
–”ওনাকে ছেড়ে দাও, চাচ্চু।”, কৈশোরের প্রভাবে ভাঙা কণ্ঠে ভেসে আসা অনুরোধে, তৃশান উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায় তানশানের পানে। বিলম্বহীন প্রগাঢ় হাসল। তার দেখা সবচেয়ে শান্ত, সুন্দর এবং মেধাবী ছেলে তানশান। আদরের সাথে শুধায়,
–”শান, কেমন আছো?”
ব্যাগ কাঁধে তুলে তানশান এগিয়ে আসে। থমথমে মুখে বলল,
–”আ’ম ফাইন, চাচ্চু। ওনাকে এখানে আঁটকে রেখেছ কেন? ছেঁড়ে দাও, সে এখানকার কিছু চেনে না।”
তৃশান এক পলক রূপকথার রাগান্বিত মুখটা দেখে নেয়। স্মিত হেসে বলে,
–”তোমার কি হয় সে?”
তানশান বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে কি জবাব দেবে এই ভেবে। সামনের এত গুলো মানুষ কেমনভাবে নেবে? ছোট্ট অপরিপক্ক একটি মস্তিষ্ক, তবুও সামান্য একটা প্রশ্নের পরিণতি কেমন হবে এতদূর পর্যন্ত ভেবে নিলো। সে মিহি স্বরে বলে,
–”রিলেটিভস, চাচ্চু।”
–”ওহ্, চিন্তা করো না। আমরা একটু সভ্য হওয়া শিখছিলাম তার কাছ থেকে। তবে সভ্যতা শেখাতে না পারলেও ঘাড় ত্যাড়মো ঠিকই শিখিয়েছে। দেখো কেমন করে তাকাচ্ছে। এই তোরা সবাই শিখছিস না কিভাবে তাকাতে হয়। ভালো করে দেখে রাখ। কালকে থেকে এভাবে তাকাবি সবাই।”
বলতেই সবাই সমস্বরে খিক খিক করে হেসে উঠল। তৃশান ছেঁড়ে দেয় তাদের। রূপকথা রাগে গজগজ করতে করতে তানশানের পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। গেটের বাইরে এসে দাঁড়াতেই, একটি দ্রুতগামী গাড়ি গতিশ্লথ করে তাদের সামনে। গাড়ির কাঁচ খুলে তপোবন হাসিমুখে তাকায় স্ত্রী সন্তানের পানে।
বরাবরের মতো তানশান গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিলে রূপকথা নীরবে বসে পড়ে। গাড়ির ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলতেই নায়েলের হাস্যোজ্জ্বল অবয়ব ভেসে ওঠে। হলুদ একটা ফ্রক পড়ে সেজেগুজে পটের বিবি সেজে বসে আছে বাবার কোলে। গালের ভেতর একটা ললিপপ। তানশান বাবার পাশে বসে বলল,
–”এই পাকাবুড়িকে কেন এনেছো, পাপা?”
–”আমি বেলু কলতে এসেছি বলো পাপাল সাথে।”
নায়েল থমথমে মুখে বলল। ভাইয়ের প্রশ্নটি যে তার ভালো লাগেনি। অসন্তোষের রেশ তার চোখেমুখে। ভেবেছিল ভাইজান আরো খুশি হয়ে যাবে তাকে দেখে।
–”স্কুলে কে বেড়াতে আসে? নায়েল তুমি বোকা!”,
তানশানের কথায় নায়েল রাগে গজগজ করে ওঠে। সে রাগান্বিত চোখে বড়ো পাপার দিকে তাকায়। থমথমে মুখে বলে,
–”কিছু বলো তোমাল ছেলেকে। সে পঁচা হয়ে গিয়েছে। নায়েলকে বোকা বলে। কেন বলে? নায়েল তো বাবু, ভালো বাবু!”
তপোবন স্মিত হেসে নায়েলের রাগান্বিত মুখটি দু হাতের আজলায় নিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। আদুরে গলায় বলে,
–”ভাইজানের পক্ষ থেকে বড়ো পাপা স্যরি, মা! ভাইজানকে এখুনি আমি বকে দিচ্ছি।”
পরপরই সে গম্ভীর গলায় তানশানের উদ্দেশ্যে বলে,
–”তানশান, ওর সামনে আর এই ধরণের কথা বলবে না। ও তো তোমার থেকেই এগুলো শিখে যাবে। আর যেন আমি না শুনি।”
তপোবনের কথা শেষ হতেই, নায়েল ও মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আঙুল তাক করে তপোবনের মতো করে বলল,
–”আল যেন না শুনি। গুড বয় হয়ে যাও ভাইজান।”
তপোবন গা দুলিয়ে হেসে উঠলো নায়েলের কথায়। তাদের বুড়ি মা। তানশান বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“পাপা, আজ বায়োলজির একটা এক্সাম নিয়েছিল কিন্তু আমি ফুল মার্কস পাইনি। কি বিরক্তিকর সাবজেক্ট! আমি সব ঠিকঠাকই লিখেছি।”
তপোবন ছেলের দিকে জুসের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“তুমি ঠিকঠাক লিখলে স্যাররা মার্কস কাটবে কেন? তুমি এখনো বায়োলজিতে ঠিকঠাক মনোযোগ দিচ্ছো না তানশান। শেষ পর্যন্ত দেখব তুমি এই বায়োলজির কারণে সবকিছু থেকে পিছিয়ে গিয়েছ।”
তানশান হতাশা নিয়ে বলল,
–“আমি অনেক চেষ্টা অরি পাপা কিন্তু আমার মাথায় থাকেই না।”
তপোবন নিজের হতাশা অনুভব করল। ছেলেটা এই একটা সাবজেক্টেই খারাপ করে না যায়! সে বলল,
–“আমি তোমায় কোচিং এর ভরসায় ফেলে রাখতে পারছি না। আজ থেকে আমিও তোমায় বায়োলজি পড়াব। দরকার পড়লে ইউটিউব ঘেঁটে পড়াব!”
তানশানের মুখশ্রী চকচক করে উঠল এহেন কথায়।
–“ওকে পাপা। এটা খুব ভালো হবে।”
তপোবন ছেলের হাসিমুখ দেখে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“আমি কোনো জিনিস না পড়ালে তুমি তাতে খারাপ রেজাল্ট করো কেন, তানশান?”
–“আমি তোমার পড়া ভালো বুঝি। আর কারোর পড়া তেমন বুজি না। টু বি অনেস্ট, আমি কোচিং এ শুধু যাই আর আসি।”
ছেলের মিনমিনে কণ্ঠে তপোবন কঠোর চোখে তাকায়। এই তবে আসল ঘটনা! সে কঠোর গলায় বলল,
–“এরপরে কোচিং থেকে যা পড়া দেবে তা আমি পড়াব।”
–“ওকে।”
কথোপকথনের মাঝেই তপোবন জুস হাতে পিছু ফিরে তাকালে গতকালকের মতো একটা মলিন মুখ নজরে আসে। জানালা দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে রাজ্যের উদাসীনতা। সে নায়েলের এলোমেলো চুলগুলো আলতো হাতে গুছিয়ে দিতে দিতে বলে,
–”তুমি না বড়ো মাম্মার কাছে ঘুরতে এসেছ? যাও তার কাছে যাও।”
নায়েল পিটপিট করে তাকিয়ে চঞ্চল বদনে উঁকি দিয়ে তাকায় রূপকথার দিকে। অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলে,
–”হাই, বলো মাম্মা!”
মা নামক এই সম্বোধন নিয়ে রূপকথার কোনো সমস্যা নেই, তবে দুনিয়ার মানুষের কেন কোনো সমস্যা থাকবে? তার জীবনের এই দশা তো দুনিয়ার কিছু নিকৃষ্ট মানুষের জন্যই।
নিস্তরঙ্গ, নির্মেঘ মুখশ্রীর আড়ালের লুকিয়ে থাকা অসন্তোষ প্রকাশের অধিকার নেই কিংবা এখনো অধিকার করে নিতে পারেনি। মুখ ফুটে বলার সাধ্য নেই, রিলেটিভ কেন? মা বলতে পারলে না?
প্রশ্নের জবাবে ফিরে আসবে হয়ত ‘সৎ মা’ নামক একটা ঘৃণ্য সম্বোধন। সৎ মায়েরা কি কখনো মা ডাক শুনতে পারে না? তাদের মা ডাকা কেন যায় না? তারা কি এতোটাই ঘৃণ্য? সেও কি ঘৃণ্য? এতোসব ভেবেই নির্জীব হয়ে পড়েছে রুগ্ন দেহটি।
নায়েলের চঞ্চল কণ্ঠ ঠিকরে আসতেই রূপকথা নড়েচড়ে উঠল।
এই অবুঝ নায়েল কি সুন্দর জোরগলায় তাকে বড়ো মা বলে ডাকে, মনে হয় মৌনতার পরে নায়েল একমাত্র তার দায়িত্ব। সম্বোধনে সম্পর্কের অর্ধেক গাঁট জোরদার হয়। বাকিটা হয় দায়িত্ব আর ভালোবাসায়।
সে মৃদু হেসে নায়েলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই নায়েল লাফ দিয়ে তার কোলে চলে যায়। তপোবন নির্বাক জুসের বোতলটা তার পাশে রাখে। ততক্ষণে গাড়ি চলতে শুরু করেছে।
শাশুড়ির চোখে না পড়তে হয় তাই রূপকথা দ্রুত হাঁটছিল। তন্মধ্যেই মাথার বাম পাশে কারোর টোকা দেয়ায়, সে তৎক্ষণাৎ বাম দিকে ফিরে তাকায়। কিন্তু কেউ নেই। সে ডান দিকে ফিরতেই তপোবন ভ্রু নাচায়। চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
–”কি হয়েছে, মন খারাপ কেন?”
রূপকথা ঘনঘন না বোধক মাথা নাড়ে। নিজেদের ঘরের দরজা খুলতে খুলতে তপোবন বলে,
–”পরে বলতে চাইলেও কিন্তু শুনব না। তাই কিছু বলার হলে তাড়াতাড়ি বলো।”
রূপকথা তপোবনের পিছু পিছু ঢুকতে ঢুকতে নিভন্ত স্বরে বলল,
–”শহরের ছেলেরা ভালো না।”
তপোবন পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–”তারমানে আমি, তানশান… আমরা কেউ ভালো না?”
হিজাবের পিন খুলতে খুলতে রূপকথা বলে,
–”আমি কখন বললাম এমনটা?”
–”মাত্রই না বললে শহরের ছেলেরা খারাপ। আমরাও তো শহরের।”
নিজের কথার ভুল বুঝতে পেরে রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
–”আপনি আর তানশান ব্যতীত।”
–”আমি আর তানশান ব্যতীত? তারমানে এরোজ, ইমরোজ, আব্বু সবাই খারাপ?”, পুনরায় তপোবনের এমন কথায় রূপকথা ক্ষিপ্ত চোখে তাকায়। তপোবন গা দুলিয়ে হেসে উঠল। দুই পা এগিয়ে আসে মেয়েটির কাছে।
বদ অভ্যাস অনুযায়ি শাহাদাত আঙুলের আলতো স্পর্শে মেয়েটির নাকের ডগা ছুঁয়ে দিয়ে বলে,
–”পিচ্চি মেয়ে! রাগ সবসময় নাকের ডগায় থাকে। মজা করছিলাম। এবার বলো কি হয়েছে? শহরের ছেলেরা কি করেছে?”
রূপকথা রাগ ঝেড়ে তৃশানের সব কর্মকাণ্ড খুলে বলে। তপোবনকে বলতে পেরে রূপকথা নিশ্চিন্ত হয়। এই বিকৃত জীবনযাত্রায় সে আর কোনো ঝামেলা চায় না।
পড়াশুনা করার সুযোগ পেয়েছে মনেপ্রানে সেটুকুই করতে চায়। তার কেন জানি মনে হয়েছিল ছেলেটার চোখ অন্যকিছু বলে। তাই সে তপোবনকে জানিয়েছে। নয়তো এত ছোট ব্যপারে তাকে বিরক্ত করতো না।
রূপকথার কথার প্রেক্ষিতে তপোবনের চোখেমুখে একটুও চিন্তার রেশ দেখা গেলো না। সে নিরুদ্বেগ পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ছবি বের করে। সেটা রূপকথার সামনে ধরতেই ইবলিশ সয়তানের বৈশিষ্ট্য লালন করা এক সুদর্শন যুবকের ছবি ভেসে উঠল। তপোবন জিজ্ঞাসা করে,
–”এই ছেলেটা?”
রূপকথা ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে,
–”হ্যাঁ হ্যাঁ, এই বেয়ারা লোকটা।”
–”ওর নাম হচ্ছে তৃশান জোবায়েদ। তোমার কলেজের যে প্রিন্সিপাল, তার একমাত্র ছেলে। বয়স কম, রক্ত গরম। একটু আধটু দুষ্টুমি করে। কিন্তু কখনো বেয়াদবি কিংবা কাউকে অসম্মান করে না। আর আমার পরিবারের কারোর সাথে তো নাই। রাগ করো না, একটু দুষ্টুমি করেছে তোমার সাথে। নতুন নতুন কাউকে দেখলে এমন করে।”
–”তাই বলে মুখের ওপর ফুঁ দেবে?”
রূপকথার তেজি কণ্ঠ। তপোবনের কপাল কুঁচকে যায় রূপকথার কথায়। মুখশ্রী থেকে রসিকতা, নিরুদ্বেগের প্রলেপ সরে গিয়ে আচ্ছন্ন হয় গাম্ভীর্যতা। ঘড়ি খুলতে খুলতে এগিয়ে আসে রূপকথার দিকে। থমথমে মুখে শুধায়,,
–”মুখের ওপর ফুঁ দিয়েছে?”
–” হুঁ।”
তপোবন আরেকটু ঝুঁকে আসে রূপথার দিকে। গাম্ভীর্যতার সাথেই মৃদু হেসে বলল,
–”ফুঁ দিয়েছে তো কি হয়েছে? এই যে আমিও দিলাম ফুঁ। আমাকেও রাগ দেখাবে?”
বলেই তপোবন তার মুখের ওপর ফুঁ দিয়ে সরে আসে। রূপথার বেজার রাগ হয় তপোবনের উপর। তার কথাটিকে একটুও গুরুত্ব দিল না? তবুও সেটা নিরবে হজম করে না বোধক মাথা নাড়লো।
তপোবন অবাকের সুরে শুধায়,
–আমায় রাগ দেখাবে না?
–নাহ।
–কেন?
–এমনিই।
–আমি বকা দিলেও রাগ দেখাবে না?
–নাহ।
– আমি ছুঁয়ে দিলেও রাগ দেখাবে না, আর অন্য কেউ ফুঁ দিলেও তাকে রাগ দেখাবে?
রূপকথা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। তপোবনকে এবার বেশ কৌতুহলী দেখালো। নিদারুণ সেই কৌতুহলী আভাসে সংকুচিত হয়ে আসা দূরত্ব অদেখাই রয়ে গেল। ললাটে অজশ্র কৌতুহলের ভাঁজ নিয়ে তপোবন ধিমি স্বরে শুধায়,
–চুমু দিলেও রাগ করবে না?
সরব চমকে উঠল মেয়েটির রুগ্ন কায়া। প্রথমবারের মতো সৃষ্ট এই অস্বস্তিকর পরিবেশ, সামলে ওঠার তীব্র প্রয়াসে দিগ্বিদিক হারিয়ে ঘন ঘন না বোধক মাথা নাড়ে। তপোবনের চোখেমুখে এবার বিস্ময়। তবুও সেই বিস্ময় লুকিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
– তবে চুমু দিয়ে দেখব?
রূপকথা নিশ্চুপ। আধখোলা হিজাব হাতের মুঠোয় মুচড়ে ধরে। নিভে আসা বদনে ‘হ্যাঁ’ বোধক মাথা নাড়ে। তপোবনের চোখমুখ থেকে গাম্ভীর্যতা সরে যায়। ওষ্ঠকোনে ভর করে মিটিমিটি হাসি। নবযৌবনের কর্নধার স্ত্রীর এই নাজেহাল অবস্থা তাকে আনন্দ দিচ্ছে। ভাবতেই সেই আনন্দ দ্বিগুন করার ইচ্ছা জাগে অন্তরালে। বয়স, পরিস্থিতি, ভাগ্যের টানাপোড়েনে লুকিয়ে পড়া অন্য এক সত্ত্বা বহুবছর পর ধীরে ধীরে যে বেরিয়ে আসছে তা টের পেল না তপোবন।
নৈকট্য তখন সীমা ছাড়িয়ে যায়। নিঃশ্বাস মিলে যায়। দূর্ঘটনাবশত নাকের ডগায় ছুঁয়ে যায় ক্ষণস্থায়ী এক স্পর্শ। নাকে নাক ছুঁয়ে যেতেই উভয় সচকিত হয়। ঠাঁটিয়ে বন্ধ করে রাখা নেত্রদ্বয় দেখে তপোবনের মস্তিষ্ক ধরতে পারে অতিক্রান্ত সীমা। নিজের হতচকিত অনুভব লুকিয়ে মুখের উপর পুনশ্চঃ একটা ফুঁ দিয়ে দূরে সরে আসে।
ব্যস্ত গতিতে হাতের কাজে হাত দেয়। মুহুর্তটা স্বাভাবিক করতে মৃদু হেসে শুধায়,
–”ভয় পেলে?”
এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে থাকা মেয়েটি দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস সামলে না বোধক মাথা নেড়ে ধিমি কণ্ঠে বলে,
–”নাহ।”
এহেন জবাব আশা করেনি তপোবন। আশাতিত জবাবে পুনরায় কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–”কেন?”
–”কারণ আপনি আমার স্বামী।”
স্পষ্ট জবাবে তপোবন কিয়ৎকাল স্থবির রইল। অনুভব করে স্বামী এই শব্দটির গভীরতা আর পবিত্রতা। ওষ্ঠকোনে মৃদু হাসি নিয়ে বাকি কাজগুলো শেষ করে সে।
মেয়েটি তো কখন ওয়াশ রুম ঢুকে গিয়েছে। সে ওয়াশরুমের বদ্ধ দরজার দিকে একপলক তাকিয়ে ফোন হাতে বারান্দায় চলে যায়। কাঙ্খিত নাম্বারটিতে ফোন দিতেই সাথে সাথে রিসিভ হয়। তপোবন সালাম জানায় তামজিদ জোবায়েদকে।
তামজিদ জোবায়েদের দিন শুরু হয় ছেলের নামে নালিশ শুনতে শুনতে। তবে আজ সকাল থেকে তেমন কিছুই শোনেনি সে। এর জন্য বেশ কয়েকবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও সেটা আর বেশিক্ষণ স্থায়িত্ব হয় না। তপোবন সব জানিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
–”স্যার, আমরা আজ থেকে আপনার সাথে যুক্ত নেই। আমরা চার ভাই বোন সহ আমার ছেলে এখান থেকেই পড়াশুনা করছে। বিগত এত গুলো বছরে কখনো আমায় কিংবা আমার পরিবারকে এমন কোনো অক ওয়ার্ড সিচুয়েশনে পড়তে হয়নি। বিশেষ করে তৃশানের জন্য। কিন্তু আজ আমার স্ত্রীকে অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তৃশানের জন্য। আমি আশা করব এমনটা দ্বিতীয়বার আর হবে না।”
তামজিদ জোবায়েদের বাবার সাথে সিকদার পরিবারের বহুবছরের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের জোরেই তারা আজ এত বছর একে অপরের সংস্পর্শে রয়েছে। তবে এই সম্পর্কে খানিক উদাসীনতা সৃষ্টি হয় তার বাবা মারা যাওয়ার পরে। কিন্তু সে এবং তপোবন সর্বদা চেষ্টা করে একটা সুসম্পর্ক বজায় রাখার।
কিন্তু আজ প্রথমবার তপোবনের থেকে অভিযোগ পেয়ে তামজিদ জোবায়েদের মাথা হেঁট হয়ে গেলো। সেটাও আবার নিজের ছেলের থেকে! সে তপোবনের আশ্বস্ত করে বলল ,
–”আমি দুঃখিত তপোবন! তুমি তো জানোই কিভাবে উচ্ছ্বন্নে গিয়েছে ঐ বেয়াদব ছেলে। চিন্তা করো না। এমনটা আর দ্বিতীয়বার হবে না। আমি নিশ্চিত করছি তোমায়।”
তপোবন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোন কাটে। ছোট বিষয়টা তার কাছে অত্যাধিক পরিমাণে গুরুত্ব পেলেও, সেটা প্রকাশ করেনি রূপকথার সামনে। সে চায়নি এই বিষয়টা মেয়েটির মস্তিষ্কে অধিক গুরুত্ব পাক। তাই তো ছলে সেটি ভুলিয়ে দেয়ার প্রয়াস করেছে। যেটা সহজে সে সমাধান করতে পারবে, সেটা নিয়ে মেয়েটির মস্তিষ্কে বিভ্রাট তৈরি করার কি প্রয়োজন!
রূপকথা ওয়াশরুমে ঢুকলেও আবার ছুটে বেরিয়ে আসে। শূন্য ঘরপানে চেয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে ডেকে ওঠে,
–“শুনছেন, আপনি কি বেরিয়ে গিয়েছেন?”
পাখির ন্যায় কিচিরমিচির কণ্ঠে অদ্ভূত সুন্দর ডাকে তপোবন বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে তাকায় ঘরে। চোখে হেসে বলে,
–“এই যে মুরুব্বি, আমি এখানে।”
রূপকথা চঞ্চল কদমে ছুটে আসে। চোখেমুখে উপচেপড়া প্রসন্নতা দেখে তপোবন মৃদু হেসে শুধায়,
–“পরীক্ষায় কি সব পেরেছেন, মুরুব্বি?”
রূপকথার হাসিমুখ নিভে গেল সহসা। থমথমে মুখে রেগে বলল,
–“আপনি সবসময় মন পড়ে ফেলবেন না।”
ভীষণ বোকাসোকা কণ্ঠে তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“আচ্ছা, দুঃখিত! এবার বলুন।”
অনুভূতিতে ভাটা পড়তেই রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
–“আমি পরীক্ষায় সব ম্যাথ নিজে পেরেছি আর ফুল মার্কস ও পেয়েছি। ক্লাসে মাত্র বারোজন ফুল মার্কস পেয়েছে আর তার মধ্যে আমিও ছিলাম। স্যারের মুখটা ছোট হয়ে গিয়েছিল!”
বলেই মেয়েটি গাল ভরে হাসল। তপোবন মুগ্ধ হয়ে দেখল তার চঞ্চলতা। অন্তঃস্থল অনুতাপে ভোগে, এত ছোট্ট প্রাণবন্ত একটা পাখি কিনা তার মতো মানুষের সাথে এমন বাজেভাবে জুড়ে গিয়ে ডানা কাটা পাখির মতো আঁটকে গেল? সে ম্লান হেসে বলল,
–“এই তো এভাবেই সব কটুক্তি পিছুটানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দেখবে একদিন জিতে যাবে।”
রূপকথা প্রসন্নতার সাথে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“আপনি সাথে থাকলে আমি অবশ্যই জিতে যাব।”
তপোবন নির্নিমেষ চেয়ে বলল,
–“বিজয়ের পথে আমিই তো সবচেয়ে বড় পিছুটান।”
উচ্চতায় মেঘ ছোঁয়া সৌন্দর্যের ন্যায় অদ্ভুত লোকটির ধূসর নেত্রে নেত্র আঁটকে যায়।
কিয়ৎকালের সেই স্থবিরতা ভেঙে রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২১
–“অথচ আমি আজ পুরো ক্লাসের সামনে বলে এসেছি আমার ক্ষুদ্র থেকে সকল সফলতার কারণ আমার স্বামী। আমি কিন্তু মিথ্যা কথা বলিনা।”
বলেই মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। গমনের পানে চেয়ে থাকা তপোবনের স্থবির দৃষ্টি, ম্লান মুখশ্রী ঠিকরে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
