Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৪

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৪

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৪
তোনিমা খান

যেই সম্পর্ক টিকেই আছে জৈবিক সুখের টানে, সেই সম্পর্কের ভিত্তি ধরে রাখতে মৌনতাকে প্রতি রাত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করতে হয়। প্রতিদিনকার মতো আজও তার ব্যতিক্রম নয়। লাগাতার জ্বর, ঠান্ডার সংক্রমণ, পায়ে ব্যথাকে রোজকার ন্যায় উপেক্ষা করে স্ত্রী আর মায়ের দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়ে ওঠে।
কাক ডাকা ভোরে হাঁটু সমান ঘন কালো ভেজা চুলগুলোতে কোনোমতে তোয়ালে পেঁচিয়ে মাথায় কাপড় টেনে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।
ননদের ঘরের চাপিয়ে রাখা দরজা খুলতেই দৃষ্টি ছলছল করে ওঠে রোজকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা মেয়েকে দেখে।
সে রোজকার ন্যায় গিয়ে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে। অজশ্র আদরে লুকাতে চায় ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে মেয়ের সঙ্গী হতে না পারার ব্যর্থতা। মায়ের আদরে নায়েলের ঘুম ভেঙে গেল আজ। সে চোখ খুলেই শুস্ক ওষ্ঠে প্রগাঢ় হাসল। সেই হাসিতে মৌনতার ছলছল নেত্র নোনাজলে সিক্ত হয়। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে,

–“আমার মায়ের ঘুম ভেঙে গেল?”
–“ঘুম ছেশ মাম্মা।”
–“খিদে পেয়েছে আমার মায়ের?”, মৌনতার মেয়ের গালে চুমু দিয়ে বলল। নায়েল মাথা নেড়ে বলল,
–“পেয়েছে, স্যান্ডু খাবো।”
মৌনতা ছলছল নেত্রে হাসল। এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলল,
–“চলো, মা তোমায় স্যান্ডউইচ বানিয়ে দেবো।”
মেয়েকে গরম পানি দিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে মোজা আর জুতা পড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে নায়েলের অলসতা কেটে গেল। সে মায়ের কোল থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে লাগলো। কড়িডর পেরিয়ে নিচে নামতে গেলে মৌনতার চোখ পড়ে দোতালার পোর্চে। টি টেবিলে পা ছড়িয়ে সোফায় বসে বসে ঝিমাচ্ছে এরোজ। জানুয়ারির কনকনে শীতের সকালে অমন হাট্টাগাট্টা এক বিশালদেহী লোক একটা শর্টস আর হাফ হাতার টি শার্ট পড়ে ঘুমাচ্ছে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো তার আপাদমস্তক দেখে। এই লোককে তার ভিন্ন গ্রহের প্রাণী মনে হয়।
ভিন গ্রহের প্রাণীটিকে উপেক্ষা করে সে ধীর কদমে হাঁটতে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

–“মা, তাড়াতাড়ি এসো। আগে হরলিক্স খাবে তারপর স্যান্ডউইচ।”
–“আসছি।”
নায়েল ঢুলতে ঢুলতে বলল। কুঁচকানো দৃষ্টি তার পোর্চের সোফার দিকে।
পবনে তখন কেবল কুয়াশা মাখা আবছা আলোর আধিপত্য। স্মার্টফোনটি ক্ষিপ্র শব্দে বেজে উঠতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন এরোজ নড়েচড়ে উঠল। অলস হাতে ফোনটা হাতে নিতেই বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে নিলো কানাডায় কর্মরত অফিসের বসের ফোন দেখে। বরাবরের ন্যায় বিক্ষিপ্ত মেজাজে ফোন কানে ঠেকায় সে।
ভেসে আসে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠ। ভদ্রলোক নিজ ভাষায় অসন্তোষের সাথে বললেন,
–“সপ্তাহে একদিন কাজ করো তাও আবার ছয় ঘন্টা। এরপরে আবার তুমি তিন মাসের ছুটি নিয়েছো, এটা আমার কতটুকু লস করবে তুমি বুঝতে পারছো না এরোজ।”
কাঁধে ফোন চেপে এরোজ বদ্ধ নেত্রে বলে,
–“If you want, I can send you my resignation letter, sir.”
(আপনি চাইলে আমি আপনাকে রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দেই, স্যার।)
গনগনে নির্লিপ্ত কণ্ঠে অপরপ্রান্ত একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। কিয়ৎকাল সময় নিয়ে ভেসে আসল আফসোসে ভরপুর কণ্ঠ।

–“I wouldn’t tolerate you for a moment, Aroz. I f you weren’t necessary for my most important work.”
(আমি তোমাকে এক মুহূর্তও সহ্য করতাম না, এরোজ। যদি তুমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় না হতে।)
আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে এরোজের ওষ্ঠকোনেও আফসোসে ভরা স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
নিজেও অতৃপ্ত অনুভূতি নিয়ে ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“If suicide was not forbidden, I would be a corpse today.”
(আত্মহত্যা যদি নিষিদ্ধ না হতো তবে আমিও আজ লাশ হতাম।)
–“What?”
অপরপ্রান্তের প্রশ্নের জবাব দেয়া আর হলো না ফোনটা আবারও অদূরে পড়ে রইল। মানুষ তার স্মৃতির কাছে অসহায়। সদ্য জাগ্রত মস্তিষ্ক ফের ডুবে গেল নিজের অসহায়ত্বের কাছে। ভীষণ অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–“মানুষ কারোর সাথে কাটিয়ে আসা গোটা এক জীবন ভুলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করে দিয়েছে—অথচ আমি? নিজেকে ভুলে গেলাম তবুও আপনার দেয়া সামান্য স্মৃতিগুলো ভুলতে পারলাম না। এ জীবনে আপনাকে ভুলতে পারা বোধহয় আমার দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে!”
–“হেই, হাই!”

ক্ষণপরিচিত বাচ্চা কণ্ঠে ঘোরগ্রস্থ এরোজ নিভু নিভু চোখে ঘাড় কাত করে তাকায়। লালচে দৃষ্টিতে এঁটে যায় অদূরে অজশ্র বরফের মাঝে ফুটে থাকা স্নো হোয়াইটের ন্যায় একটা পুতুলের দিকে। কানটুপি আর ঘন কালো চুলের মাঝে ফর্সা মুখশ্রী আর লালচে ঠোঁট দুটো দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই দৃষ্টিতে সরব মুগ্ধতা ছুঁয়ে যায়।
বাড়ির সকলের থেকে ভাঙা, ভয়ঙ্কর পুরুষালী কণ্ঠ বোধহয় এই উদাসীন পুরুষটির। যেই কণ্ঠে ছোট্ট নায়েল ঘাবড়ে যায় আজ ও মৃদু ঘাবড়ালো।
এরোজ ভীষণ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধায়,,
–“তুমি এত সকালে এখানে কেন?”
নায়েল দুরুদুরু বুক সামলে থমথমে মুখে বলল,
–“আমি আলি লাইজার।”
–“ইট’স আর্লি রাইজার।”
–“হ্যা, সেটাই।”
মেজাজ খারাপ করার মতো উল্টাপাল্টা ইংলিশে এরোজ শান্ত স্বরে বলল,
–“বাইরে অনেক ঠান্ডা, ঘরে যাও।”
নায়েল উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,

–“তুমি তো ছোট প্যান্ট পলে আছো। তোমাল ঠান্ডা লাগে না?”
–“নাহ।”
ছোট্ট জবাবে নায়েল পিটপিট করে চেয়ে কথা গোছাতে লাগলো। যেই কথাগুলো এতক্ষণ ধরে ভেবে রেখেছে। সে সতর্ক কণ্ঠে মিনমিন করে বলল,
–“তুমি কেমন আছো?”
কেমন আছে? ভীষণ কঠিন প্রশ্নে এরোজ শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় তিন ফুটের ছোট্ট মেয়েটির দিকে। কোনো প্রত্যুত্তর করে না। তার যে বলতে মানা, সে ভালো নেই।
নায়েল ফের শুধায়,
–“তুমি কি এখনো লেগে আছো?”
থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে পাথরের ন্যায় বসে থাকা ছেলেটির ঠোঁট আলতো বেঁকে গেল। শুধায়,
–“কি চাই?”
–“কিছু না।”
–“সত্যি কথা বললে একটা চকলেট দেবো।”, এরোজ সরু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল।
সহসা নায়েলের চোখ চকচক করে উঠল। সে গাল ভরে হেসে বলল,
–“আচ্ছা, আমি একটা চকলেট চাইতে এসেছি। অনেকদিন খেতে পারছি না তোমাল লাগের কারণে। তুমি ছবছবময় লেগে থাকো।”

–“আমি সত্যি কথা বলেছি,‌ এখন আমায় দু’টো চকলেট দেবে?”
এরোজের জবাব আসে না। নায়েল হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়,
–“দেবে না? তুমি এখনো লেগে আছো?”
নিজের ধারণা সঠিক হতেই এরোজ স্থবিরতা ভেঙে নড়েচড়ে উঠল। ভারী দেহটি নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে সোজা পা বাড়ায় কড়িডরের দিকে।
নায়েল হতবাক এহেন উপেক্ষায়। সে রাগে গজগজ করে বলল,
–“দেবে না বললেই পালো।”
–“আমার পিছু পিছু আসবে পিচ্চি মেয়ে! নয়তো এরপর হাজার চাইলেও পারবে না।”
এরোজ চলতে চলতেই গম্ভীর গলায় বললে নায়েল হতচকিত এক ছুট লাগায় তার পিছু পিছু। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে,

–“ওহ্ গড! যাক তোমাল লাগ কমেছে। বেশি কলে চকলেট দিও যেন এরপলে তুমি লেগে থাকলেও আমি চকলেট খেতে পালি।”
এরোজ নির্বাক ঘরে ঢুকলো এবং ভীষণ ঘাড়ত্যাড়ার পরিচয় দিয়ে মাত্র দুইটা চকলেট-ই বের করে দেয়। নায়েল হতাশ হয়ে ছোট মুখ করে নেয়। হতাশার সুরে বলে,
–“আল লাগ কলিও না, ঠিক আছে? তুমি লাগ করলে আমাল ভয় লাগে তোমাকে। আর আমি চকলেট চাইতে পালি না তোমার কাছে।”
অদ্ভুত সুন্দর ভয়ার্ত কন্ঠের আবদারে এরোজের মুখশ্রীতে ছুঁয়ে যায় অপ্রকাশিত হাসি! তবুও জবাব দেয় না। নায়েল হতাশ হলেও দু’টো চকলেট পেয়ে খুশি হয়ে গেল। আর একাকী এরোজের অলস ভঙ্গুর দেহ দেবে গেল মেমোরি ফোমের নরম গদিতে।

রূপকথার কঠিন জীবনের দিনগুলো বড্ডো সহজরূপে ধরা দিতে থাকে তার কাছে। যদিও এটা তার, তানশান আর তপোবনের শতভাগ প্রচেষ্টার ফল।
সন্ধ্যা নাগাদ লিভিং রুমে বসা রমনীদের আড্ডায় নিদারুণ প্রাণবন্ততা এনে দিলো জবার চাঞ্চল্যকর তথ্যে।
দীর্ঘ বর্ণনা শেষে জবা লাজুক হেসে বলল,
–“শোনেন রোজ আফা, বড় ভাইজান ঠিক নায়িকাদের মতোন ভাবিজানরে এইভাবে কোলে নিয়া ঘরে ঢুকছে। আমি তো জানালা দিয়া এইডা দেইখা লজ্জায় খাতার নিচে মুখ লুকাইয়া ছিলাম।”
রূপকথার লালচে মুখশ্রী আরেকটু লালচে করে দিলো জবার এহেন কথা। তাতে ঘি ঢালার মতো কাজ করল মৌনতার হো হো করে হেসে ওঠা। রূপকথা কাঁচুমাচু করে উঠল।
মৌনতা হাসি দমিয়ে বলল,

–“আমাদের ছোট্ট রূপকথার দেখি লাল হয়ে গিয়েছে লজ্জায়। জবার কথা তবে ঠিক তাই না রূপকথা? প্রেমে পড়ে গিয়েছ? কিছুমিছু হয়েছে?”
রূপকথা আর সইতে পারলো না এহেন লাগাম ছাড়া কথাবার্তা। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“ভাবি, সে এক্সারসাইজ করছিল।”
এহেন কথাতেও মৌনতা রোজ সহ সকলে হৈ হৈ করে উঠল,
–“ওওওওও এক্সারসাইজ বুঝি? এভাবেও এক্সারসাইজ করা যায় জানতাম না তো!”
রোজের কথায় মৌনতা আর জবা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। জবা ভীষণ কৌতুহল নিয়ে ফিসফিসিয়ে শুধায়,
–“এই ভাবিজান, একটু হাছা কতা কন দেখি! আফনাগো মধ্যে সব ঠিকঠাক হইয়া গেছে?”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো। জবার মুখটা ছোট হয়ে গেল। মৌনতা আর রোজ বিমর্ষ মুখে বলল,
–“তোমরা তো একে অপরকে ছাড়ছো না এই জীবনে তবে কেন এত আঁতিপাঁতি করছো?”
জবা‌ ফোড়ন কেটে বলল,
–“আরে ভাবিজান, এতে বড় ভাবিজানের কোনো দোষ নাই। সব দোষ বড় ভাইজানের। বয়স হইছে তো সখ আহ্লাদ সব বয়সের সাথে শেষ হইয়া গেছে। এর জন্যই তো অমন উদাসীন বেশভূষায় চলাফেরা করে। বেরসিক মানুষ! বোঝে না মাইয়া মানুষের মনে কত কিছু চায়!”

–“ভাইজান…
মৌনতা কিছু বলার জন্য উদ্বত হলেও থেমে যায় লিভিং রুমে সদ্য ঢোকা তপোবনকে দেখে। জবা তড়িঘড়ি মুখে লাগাম টেনে ভদ্র হয়ে বসল। তপোবন তাদের দেখে মৃদু হেসে বলল,
–“আড্ডা হচ্ছে? খাওয়া দাওয়া শেষ সবার?”
–“শেষ ভাইজান।”, রোজ চঞ্চল কণ্ঠে বলল। তপোবন উপরে যেতে যেতে বলল,
–“তোমার পরীক্ষার ডেট পড়েছে রোজ, এখানে কি করছ? পড়তে বসো।”
–“পড়েই এসেছি ভাইজান।‌”
–“সেটা তো রেজাল্ট বলবে।”, তপোবন বলেই চলে যায় উপরে।
রূপকথা অভ্যাস অনুযায়ী এক কাপ কফি নিয়ে ছুটলো উপরে।
আরশির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন কপাল কুঁচকে নিজের আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করছে। এক প্রকার নিখুঁতভাবে খুঁটে খুঁটে দেখা যাকে বলে। দেখতে দেখতেই বাম হাতে মুখে হাত বুলায়। তুলনামূলক লম্বা ফ্লাফি চুলগুলোর মাঝেমধ্যে একটা দু’টো পাকা চুল দেখা মিলে। দাঁড়িতে একটু আধটু চোখে পড়ার মতো পাক ধরেছে। সে কপাল কুঁচকে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে,

–”অনেক বয়স্ক লাগছে কি? বেরসিক কোথায় হলাম? সেদিন ই তো নিব্বা নিব্বির মতো ঘুরলাম, ফুল কিনলাম, বেলুন কিনলাম, গতকাল মাঝরাতে ঘুরতে বের হলাম তবুও বেরসিক? আর কি করতে হবে?”
তপোবন একা একাই বিড়বিড় করতে থাকে। তন্মধ্যেই দরজা খুলে কেউ ঢুকলে, সে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক দেখে নেয় রূপকথাকে। রূপকথা কফি দিয়ে টেবিল গুছিয়ে পড়তে বসার প্রস্তুতি নেয়। কফিতে চুমুক দিতে দিতে তপোবন আরশিতে নিজেকে এক পলক দেখে শুধায়,
–”আমাকে দেখতে কেমন লাগে?”
নিজ কর্মে মগ্ন রূপকথার ভ্রু কুঁচকে গেল তপোবনের অদ্ভুত প্রশ্নে। সে পাশ ফিরে তাকায় লোকটির দিকে। আরশিতে একে অপরের দৃষ্টি মিলতেই রূপকথা ইতস্ততার সুরে বলল,

–”জি?”
–”আমায় দেখতে কেমন লাগে?”,তপোবন ফের শুধায়।
–”আপনি যেমন তেমনি লাগে।”, রূপকথা চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই বলল।
তপোবন হতাশ হলো এত সোজাসাপ্টা নির্বিকার জবাবে। সে পুনরায় শুধায়,
–”সেটাই তো কেমন লাগে আমায়। খুব বুড়ো লাগে?”
রূপকথা কিয়ৎকাল তাকিয়ে থাকে লোকটির দিকে। অতঃপর নীরবে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।
সহসা তপোবনের চেহারায় অসন্তোষ দেখাগেল। জবাবটি যে তার খুব গায়ে লেগেছে। সে জবার কথা শুনেছে। তবুও জোরপূর্বক মেকি হেসে নিজকে স্বান্তনা দিয়ে বলল,
–”আমি তো বুড়োই।”
রূপকথার ঠোঁটের কোনে মিটিমিটি হাসি ফুটে উঠল তপোবনের চোখেমুখে বাচ্চাদের মতো উপচেপড়া অসন্তোষ দেখে। সে মিটিমিটি হেসে বলল,
–”আপনার যত না বয়স তার থেকেও বেশি আপনার বেশভূষা বয়স্কদের মতো। নিজের যত্ন নিলে হয়ত এতটা বয়স লাগতো না।”

এই পর্যায়ে তপোবনের চোখমুখে চাপা উজ্জ্বলতা দেখাগেল। এটা সত্যি সে নিজের কোন যত্ন নেয় না। আর পাঁচটা মানুষের মতো জিমে যাওয়া, স্যালনে যাওয়া, পোশাক পরিচ্ছদের ব্যপারে তার আগ্রহ খুব কম। নেই বললে ভুল হবে। আগে ছিল, যখন তার দিকে কেউ সর্বদা তাকিয়ে থাকতো। আর আক্ষেপ জানিয়ে বলত, তাকে কিভাবে চললে খুব ভালো লাগবে। আর সে সেভাবেই নিজেকে সাজাতো।
অসন্তোষের ভার একটু কমতেই, সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–”অফিসের কাজ, তানশানের দেখাশোনা, বাসার সব দিকে খেয়াল রাখতে রাখতে কখনো সুযোগ হয় না নিজেকে সময় দেয়ার। আর তেমন একটা ইচ্ছাও করে না।”
রূপকথা অনুভব করলো কথার মাঝেই রাজ্যের উদাসীনতা। পুনশ্চঃ কাজে মনোযোগী হয়ে বলল,
–”আপনি নাহয় ঘরের সকলের খেয়াল রাখবেন আর আমি নাহয় আপনার খেয়াল রাখব। তাহলেই তো হলো!”

তপোবন তড়াক রূপকথার দিকে তাকায়। হতচকিত মুখশ্রীতে স্মিত হাসি নিয়ে বলে,
–”তুমি নিজেই তো পিচ্চি! তুমি কি খেয়াল রাখবে আমার?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায় তপোবনের দিকে। কুঁচকানো কপাল নিয়েই বোকাসোকা কণ্ঠে বলে,
–”আপনি অসুস্থ হলে সেবা করতে পারব, আপনার এলোমেলো চুলগুলোকে সুন্দর করে গুছিয়ে দিতে পারব‌। পাকা চুলগুলোতে মেহেদি দিয়ে দিতে পারবো,তাহলে আর আপনাকে বয়স্ক লাগবে না। আপনার দাঁড়িগুলো ছেঁটে দিতে পারব। আর একটু সুন্দর রঙ বেরঙের পোশাক, যেমন মেজো ভাইজান ছোট ভাইজান পড়ে তেমন পোশাক পড়লে, একদম আপনাকে একজন সুদর্শন পুরুষের মতো লাগবে। কেউ বুঝতেই পারবে না আপনার বয়স।”

তপোবন মুচকি মুচকি হাসছে আর রূপকথার উৎসাহী কণ্ঠ শুনে। অন্তঃস্থলে একটু ভালোলাগাও দেখা মিলছে তাকে নিয়ে মেয়েটির মনে কোনো সঙ্কোচ, লজ্জা, জড়তা না থাকায়।
বলাবাহুল্য সে রূপকথাকে কলেজে ড্রপ করেনি কেননা সে তার কোনো ক্লাস ফিলোর সামনে পড়তে চায় না। আর না রূপকথাকে কোনো বিদঘুটে পরিস্থিতিতে পড়তে দিতে চায়। টিনেজ ছেলেমেয়েরা হয়তো রূপকথাকে নানাভাবে কষ্ট দেবে, যার কারণে দেখাযাবে রূপকথা পড়াশুনা থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
কিন্তু মেয়েটির মনে তাকে নিয়ে কোন লজ্জা না দেখে প্রফুল্ল হয় দেহ মন। সে এগিয়ে যায় রূপকথার কাছে। পাঞ্জাবির পকেটে হাত গুঁজে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের মাথাটা রূপকথার মুখের সামনে ঝুঁকিয়ে দিয়ে বলল,

–”নিন মুরব্বি, তবে আজকে থেকেই যত্ন নেয়া শুরু করুন। আমি বাইরে যাবো, চুলগুলো একটু সুন্দর করে গুছিয়ে দিন।”
রূপকথা হেসে ওঠে তপোবনের কথার ধরণে। সে নির্দ্বিধায় এলোমেলো চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিতে লাগলো। গুছিয়ে দিতে দিতে বলে,
–”আপনার চুল এতো লম্বা কেন?”
তপোবন নুইয়ে থাকা অবস্থাতেই বলল,
–”এমনি থাকে সবসময়। সেই কলেজের সময় থেকে। ভালো মানায় না-কি!”
–”কে বললো?”
জবাবটি অকপটে দিতে গিয়েও দিতে পারল না তপোবন। এটা যে সেই চঞ্চল মেয়েটির পছন্দ! সে একটু থেমে বলল,
–”সবাই বলে!”
–”ওহ্!”
–”কেন, তোমার ভালো লাগে না?”
তপোবনের প্রশ্নে রূপকথা পাল্টা প্রশ্ন করে,
–”না লাগলে কি করবেন? কেটে ফেলবেন?”

–”ফেইরি যদি বলে, তবে করতে তো হবে।”, তপোবন রসিকতার কণ্ঠে বলে। রূপকথা নাকোচ করে বলল,
–”নাহ, এভাবেই সুন্দর লাগে। আপনাদের বাবা ছেলের মধ্যে পার্থক্য বলতে, এই চুলের স্টাইল আর উচ্চতাই রয়েছে। নয়তো পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে যেত!”
–”হুঁ, তানশান দেখতে একদম আমার মতো। কিন্তু মনটা একদম..”, চঞ্চল কণ্ঠে বলতে বলতেই হঠাৎ থেমে গেল তপোবন। সে চোখ বুজে নিজেকে শাসাতে ভুললো না। নারীটির চর্চা তার মুখে সর্বদা লেগে থাকে, এর জন্যই জিহ্বায় যে বারবার জেঁকে বসে তার নাম। যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তাকে কি করে লুকাবে?
রূপকথা চুলগুলোর মাঝে সদ্য থেমে যাওয়া হাতটি পুনরায় গলিয়ে দিলো। মৃদু হেসে তপোবনের অসমাপ্ত বাক্যটি সম্পূর্ণ করে বলল,

–”মন একদম মায়ের মতো, তাই না?”
–”হুঁ।”, বদ্ধ নেত্রে তপোবন অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়। রূপকথা পুনরায় হাসিমুখে বলে,
–”বোঝাই যায় সে কোনো অনন্য মাতৃগর্ভের অংশ! যে কি-না আর পাঁচটা বাচ্চাদের থেকে ভিন্ন। সকল কঠিন পরিস্থিতিতে বাস্তবতা, দয়া-মায়া, ভালোবাসা নিয়ে সামনা করে। যার কাছে ঘৃণা, নেতিবাচক মনোভাব জায়গা পায় না। তানশান খুব ভালো।”
–”আর তানশানের বাবা?”, তপোবনের প্রশ্নে রূপকথা মিইয়ে গেল। মিনমিনে স্বরে বলে,
–”সেও ভালো।”
–”শুধু ভালো? ছেলের‌ ব্যপারে কতকিছু বললে কিন্তু ছেলের বাবার বেলায় শুধু ভালো? এটা তো অন্যায় তাই না?”, তপোবন মৃদু অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে। রূপকথা নিঃশব্দে হাসল। অবিন্যস্ত, এলোমেলো চুলগুলোতে হাত গলাতে গলাতে বলে,
–”এটা এমন ভালো— যেই ভালোর উপরে কোনকিছু হতে পারে না।”
–”তো কি বলতে চাইছো? কত ভালো?”, তপোবনের একই কথা নিয়ে ঘুরানো প্যাঁচানোতে রূপকথা নাক মুখ কুঁচকে বলল,

–”বললাম না এর থেকে ভালো আর হতে পারে না।”
–”সেটাই তো এক কথায় বলো, বেস্ট!”, তপোবন ও একই ভাবে নাকমুখ কুঁচকে বলল। রূপকথা হাল ছেড়ে বলল,
“হ্যাঁ ওইটাই, বেস্ট।”
তপোবন গা দুলিয়ে হেসে উঠল। বদ অভ্যাসের ধরুন রাগান্বিত মেয়েটির নাক চেপে দিয়ে বলল,
–”মজা করছিলাম। আই নো দ্যাট, আ’ম নট বেস্ট ওয়ান ফর ইউ।”
রূপকথার মুখশ্রীতে মলিনতা ভীড় জমায়। কথাটির মর্মার্থ বুঝতে পারলেও জবাব দেয় না। বই গোছানোটা তখন দুনিয়ার সবচেয়ে মনোযোগী কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তপোবন ও এড়িয়ে যায়।
চাদর হাতে নিয়ে রূপকথাকে তাড়া দিয়ে বলল,
–”পড়তে বসো। সূত্র গুলো মুখস্থ করবে। আমি এসে সেগুলো ধরবো। এই সপ্তাহ প্রতিটা বিষয়ের বেসিক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবো, আগামী সপ্তাহ থেকে সেগুলো ম্যাথে প্রয়োগ করা শেখাবো।”
রূপকথা নীরবে মাথা নাড়ালো। তপোবন বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। রূপকথা সেদিকে উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিড়বিড় করে বলে,
–”আমার জন্য আপনি ব্যতীত অন্য কেউ বেস্ট হলে আল্লাহ তায়ালা তাকেই নির্ধারন করত আমার জন্য। সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালোর জন্য করেন, এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। আর সেই ভালোটা আপনার সাথে। এটা সেদিন ই মেনে নিয়েছি যেদিন স্বেচ্ছায় কবুল বলেছিলাম। দিনশেষে আপনি আমার একমাত্র গন্তব্যস্থল! বেস্ট-বেটার বলে কিছু নেই আমার জন্য।”

জেন্টল পার্ক শপের মধ্যে বিভ্রম নিয়ে ঘোরাফেরা করছে তপোবন।
আজ ঠিক দশ বছর পর নিজের জন্য পাঞ্জাবি ব্যতীত অন্যকিছু কেনাকাটা করার জন্য এসেছে সে। এর পেছনে কারণ কি তা সে জানে না। তবে তার জীবনটা আর আগের মতো ছন্নছাড়া নেই। কিংবা এই ছন্নছাড়া জীবনযাপনে কারোর জীবনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। জড়িয়ে যাওয়া এই জীবনের সাথে মেয়েটির পূর্ন অধিকার আছে তার উপর। সে সাজিয়ে তুলবে নিজেকে তার পছন্দসই।
এক ঘন্টা যাবৎ সে এখানে ঘোরাফেরা করছে কিন্তু যুৎসই তেমন কিছুই নিতে পারেনি এখনো। তানশানের জন্য পোশাক আশাক সব নিজের পছন্দেই কেনে সে। আর পাঁচটা ছেলের মতো তানশানের মাঝে নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে অতিরঞ্জিত কোনো আগ্রহ নেই। বাবা যা এনে দেয় তাই সে পড়ে। তবে তপোবন আজকালকার ছেলেদের মতো ট্রেন্ড ফলো করেই, বুঝে বুঝে ছেলের পোশাক কেনে।
সে টিশার্টের সাইডে গিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠলো পুরোনো স্মৃতি উজ্জ্বীবিত হতেই। যুবক বয়সে তার‌ চলাফেরাও তেমন অতিরঞ্জিত, স্টাইলিশ ছিল না। খুব সাদামাটা পোশাকের ধরণ ছিল। পূর্বা তার জীবনে আসার পর‌ থেকে, সে নিজে পছন্দ করে করে তার জন্য পোশাক কিনতো। তার একটাই কথা ছিল, তাকে হিরোদের মতো চলাফেরা করতে হবে। তখন তপোবন নাক মুখ কুঁচকে বলতো,
–”তুই কি আমায় পাড়ার মিচকে ছেলেদের মতো পোশাক পরিচ্ছদ পড়ানোর চিন্তা করছিস?”
পূর্বা তখন মুখ ফুলিয়ে বলত,

–”তুই যদি আমার কথামতো না চলিস, তবে কাল থেকে আমি তোকে ভাইয়া বলে ডাকবো।”
ভাইয়া ডাক শোনার সেই ভয়ে হলেও তাকে একদম টিপটপ হয়ে চলতে হতো।
বহু চিন্তা-ভাবনার পর তপোবন ডার্ক কম্বিনেশন টিশার্টের সাইড থেকে দেখে দেখে কতো গুলো টিশার্ট, ট্রাউজার আর কিছু ফর্মাল শার্ট নিলো। আজ আর বউ, বাচ্চাকে পড়ানোর সুযোগ হয়নি। জানা নেই দু’জনে কি করছে। নতুন প্রজেক্ট এক্সিকিউট হবে যশোরে। সেই বিষয় নিয়েই ব্যস্ত রাত কেটেছে তার। ইমরোজের মাঝে ইদানিং কাজের প্রতি উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। যেহেতু কোম্পানির মূল পরিচালক সে নিজে, বিশাল দায়িত্ব গুলো তার উপর ন্যস্ত।
শাশুড়ি বাড়িতে ফিরতেই রূপকথা’র পড়াশুনায় ভাটা পড়ে। জা, ননদ, জবা আর মাজেদা চাচির সাথে আড্ডা দিতে দিতে সংসারে তার‌ দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে ঘরে ফিরে এগারোটার দিকে। তপোবন বাড়িতে ফিরে বাবা, ভাইয়ের সাথে আলোচনায় বসেছিল। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে এরোজের ঘরের দিকে তাকায়। বদ্ধ দরজা দেখে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললো।

অভ্যাস অনুযায়ী তপোবন সোজা ছেলের ঘরে ঢোকে। ঢুকতেই চোর ধরতে পারার আনন্দে নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। সে দরজা চাপিয়ে ছেলের নিকটবর্তী যেতে যেতে চেহারায় লেপ্টে যায় গাম্ভীর্যতা।
সে নীরবে সদ্য কম্ফোটারের নিচে মুখ ডুবানো ছেলের পাশে গিয়ে বসে। কম্ফোর্টারের সরিয়ে ছেলের বুকের উপর চেপে রাখা ডায়রিটা নিজের হাতে নিয়ে তাকায় ছেলের দিকে। যে কি-না গভীর ঘুমে থাকার অভিনয়ে মগ্ন। চোখের পাপড়ি পিটপিট করছে তখনো। সে স্মিত হেসে শাহাদাত এবং মধ্যমা আঙুল ভাঁজ করে দুই আঙুলের নাকল’সের মাঝে ছেলের নাকটা চেপে ধরে। ফলস্বরূপ মুহুর্তেই লাল হয়ে গেলো নাকটা।
তানশান চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিকর শব্দ করে নড়চড়ে উঠলো। বাবা সবসময় এই বিরক্তিকর কাজটাই করে তার সাথে। তপোবন গম্ভীর গলায় বলে,

–”বাজে কয়টা তানশান? সাড়ে বারোটা বাজে। তুমি এখনো রাত জাগছো! সকালে নামাজ পড়তে উঠতে হবে, স্কুলে যেতে হবে। সারাদিন কত দৌড় ঝাঁপ আছে। আর তুমি বিশ্রাম না করে, রাত জেগে এখন‌ এটা পড়ছো?”
তানশান ঘুমের মধ্যে আড়মোড়া ভাঙার অভিনয় করে বাবার থেকে মুখ লুকাচ্ছে। তপোবন ডায়রিটা বেড সাইড মিনি কাবার্ডের ভেতর ঢুকিয়ে রাখে। ল্যাম্প নিভিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
–”ঘুমাও। আমি আবার আসবো দেখতে। তখনো যদি দেখি এমন লুকোচুরি? তবে‌ আজ সারারাত ছাদে বসে ডায়রি পড়বে। আমি কিচ্ছু বলব না বরং না পড়লে তোমায় দেখে নেবো!
বাবার হুমকিতে তানশান মিইয়ে গিয়ে কম্ফোর্টারের ভেতরে পুরোটা ঢুকে গেল। বাবা তার গায়ে আজ পর্যন্ত কখনো হাত তুলেনি। কিন্তু অন্য পন্থায় মারের থেকে কঠিন শাস্তি দিয়েছে।
তপোবন বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। বাবা বের হতেই তানশান কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মুখ বের করে। যেই পৃষ্ঠা পড়ছিল তার পুরোটা পড়তে পারেনি। পুরোটা না পড়তে পারলে আজ রাতে আর ঘুম আসবে না। কিয়ৎকাল চেষ্টা করলো ঘুমানোর কিন্তু পারল না। তাই সে অন্ধকারেই ধীরে ধীরে মিনি কাবার্ডের ড্রয়ার খুলতে নেয়।

ওমনি ভেসে আসে তপোবনের রাগান্বিত কণ্ঠ। তানশান হকচকায় দরজার কাছে দাঁড়ানো বাবাকে দেখে। চোখেমুখে তার মৃদু রাগের আভাস।
ছেলেকে তার থেকে ভালো কে জানে! সে জানতো ছেলেটা তার কথা শুনবে না। ছেলের মাঝে কিছু কিছু বিষয়ে অদম্য জেদ কাজ করে। ছেলেকে সঠিক পথে আনতে যা করতে হয়েছে সে করেছে। মাঝেমধ্যে নির্ঘুম রাত ও কাটিয়েছে উচিৎ-অনুচিত, খারাপ-ভালো শিক্ষা দিতে। সে চায় না তার কোন গাফলতির কারনে চঞ্চল মেয়েটিকে কখনো কটু কথা শুনতে হয়। ছোটবেলা থেকে ছেলের মধ্যে বাড়ন্ত এক একটা উগ্রতাকে দৃঢ় হাতে সামাল দিয়েছে শুধু এই কারণে। তানশান বিরক্ত হয়ে বলে,

–”আশ্চর্য, পাপা! তুমি ঘুমাচ্ছো না কেন? এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
–”বের হও তানশান! কম্ফোর্টার থেকে বের হও। তোমার যখন এত ইচ্ছা, তবে আজ সারারাত ডায়রি পড়বে; এসো।”, তপোবন রাগান্বিত স্বরে বলল। তানশান মুখ ছোট করে মিনমিনে স্বরে বলল,
–”একটা পৃষ্ঠা ছিল, আর একটু পড়লেই শেষ হয়ে যেতো। পুরোটা শেষ না করলে মন উশখুশ করবে।”
–”একই জিনিস কতবার পড়েছো?”
বাবার রাগান্বিত কণ্ঠে তানশান নত দৃষ্টিতে ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“আমি তবুও মাম্মাকে অনুভব করতে পারি না পুরোপুরি ভাবে। আমি বারবার পড়ি, কিন্তু কল্পনা করতে পারি না ঐ মুহুর্তগুলো!”
তানশানের কণ্ঠে ভরপুর অসহায়ত্ব। তপোবন থমকায়। গলার কাছে শক্ত কিছু দলা পাকালো। তবুও শানিত দৃষ্টি অনড় রইলো। ক্ষণকাল বাদ গম্ভীর গলায় বলে,

–”পড়ো, তোমার পড়া শেষ হলে আমি ঘুমাতে যাব।”
–”তুমি যাও, আমি এটা পড়েই ঘুমিয়ে পড়ব। একটুও রাত জাগব না।”, তানশান উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল।
“তোমায় যেটা বলছি, তুমি সেটা করো।”,ফের বাবার রাগন্বিত স্বরে তানশান আর কথা বাড়ায় না। দ্রুত ডায়রিটা বের করে। কিছুটা অনুভূতিহীন ভাবেই পৃষ্ঠাটা পড়ে শেষ করে। মায়ের সান্নিধ্যে থাকলে তার এক পৃষ্ঠা পড়তে অনেকটা সময় লাগে। মনে হয় এই যেন মা তার সামনে, সে দেখছে মায়ের চঞ্চলতা। পড়া শেষ হতেই তানশান হাসিমুখে শুয়ে পড়ে।

আর তপোবন সে উদাসীন চোখে তাকিয়ে থাকে ছেলের পানে। মা থাকা কত সুখের, আনন্দের তা যদি ছেলেকে কখনো বোঝাতে পারত? নিজেকে বড্ডো অসহায় লাগে তার! ইচ্ছে করলেও ছেলের কোলে সব খুশি সে হাজির করতে পারে না। খুব ইচ্ছে হয় তার ছেলেটিকে তার মায়ের সাথে হাসতে খেলতে দেখতে। তবে এটা যে এই জীবনে অসম্ভব!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৩

সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ঘুমন্ত ছেলের সামনে। ছলছল নেত্রে ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে একটু অসহায়ত্ব কমানোর প্রয়াস করে। ফিসফিসিয়ে বলে,
–“পৃথিবীর সব সুখ তোমার হোক। পাপার থেকে কোনো কষ্ট পাওয়ার আগে পাপা শেষ হয়ে যাক তবুও তুমি সবসময় সুখী থাকো। পাপা স্যরি, তানশান।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৫