অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫ (২)
তোনিমা খান
বিদীর্ণ বিদঘুটে চেহারাটা ক্রমেই লুকিয়ে গেল ভারী পোশাকের আড়ালে। ঠিক এমনি করে নারীটির দুঃখগুলোকেও কেউ এক ফালি সুখ হয়ে অগোচরেই লুকিয়ে নিচ্ছে একটু একটু করে। তবে তা টের পেল না নারীটি। একটুও বুঝতে পারলো না—সবটা মানবতা হয় না, সবটা প্রায়শ্চিত্ত হয় না, সবটা অনুশোচনা হয় না। কারোর জন্য সে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন!
যান্ত্রিক শহরে কারোর সময় নেই অন্যের সৌন্দর্য নিয়ে চর্চা করার। কিন্তু নিজের সন্তান? সে ভয় পাবে না তো মায়ের এই ভয়ানক চেহারা দেখে?
ওভার কোর্ট পরিয়ে দিয়ে লিরা মৌনতার মাথায় একটা টুপি পরিয়ে দিল। মৃদু হেসে গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
–“দেখো, কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
আর একবার আরশিতে নিজের বিদঘুটে অবয়ব দেখার সাহস হলো না মৌনতার। সে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই চোখের সামনে একটি হাত ভেসে উঠল।
মৌনতা চোখ তুলে তাকায় ধূসর নেত্রপানে।
বাড়িয়ে দেয়া হাতটি নেড়ে এরোজ বলল,
–“সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে অলরেডি। চলুন!”
মৌনতা নির্বিকার দূর্বল দেহ টেনে বেড থেকে নেমে গেল। দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“আমি যেতে পারব। সাহায্যের প্রয়োজন নেই।”
বলেই সে লিরার থেকে বিদায় নিয়ে ধীর কদমে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। এরোজ বাড়িয়ে দেয়া হাতটা গুটিয়ে নিয়ে লিরাকে আলতো আলিঙ্গন করে বেরিয়ে আসে।
কেবিন থেকে বের হতেই দেখলো মৌনতা কড়িডরের বেঞ্চিতে বসে আছে। সে ম্লান হাসল। শুধায়,
–“শক্তি শেষ?”
নারীটির চোখেমুখে না বলতে পারা অসহায়ত্ব! চোখদুটো টলটল করছে নিজের অসহায়ত্বে। সদ্য চিকিৎসার কারণে দেহ তখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। এরোজ শুনতেও চাইল না অসহায়ত্বগুলো। লম্বা লম্বা কদম ফেলে এগিয়ে গিয়ে রুগ্ন দেহটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো। কণ্ঠে সুপ্ত ক্ষোভ নিয়ে বলল,
–“নিজের ভালো কবে বুঝতে শিখবেন?”
মৌনতার দেহ না চাইতেও ভর ছেড়ে দেয় বলিষ্ঠ বাহুডোরে। চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়ায়। নিজেকে বহন করার শক্তিটুকুও আজ নেই তার মাঝে। একদা যাকে জীবন মেনে নিয়েছিল তার প্রতি ঘৃণা, অভিযোগ আকাশ সমান বেড়ে গেল! তার ভুলটা ছিল কোথায়? ছয় বছর অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসার বিনিময়ে এত কঠিন শাস্তি কীভাবে দিতে পারলো?
দূর্বল হাতে চোখের পানি মুছে নেয় মৌনতা। অস্বস্তি ভরা কণ্ঠে বলল,
–“হুইলচেয়ার নেই?”
–“যতক্ষণে হুইলচেয়ার আসবে ততক্ষণে বারোটা বেজে যাবে।”, এরোজ লিফটে ঢুকতে ঢুকতে বলল। আদেশের সুরে বলল,
–“গ্রাউন্ড ফ্লোরের বাটন প্রেস করুন।”
মৌনতা হাত বাড়িয়ে বাটন প্রেস করলো। অস্বস্তিতে কাঠ হয়ে থাকা দেহ গুটিয়ে যায়। অতি নিকটে থাকা মুখটি আড়চোখে দেখে মৌনতা গলায় থাকা স্কার্ফটা মুখে চাপলো।
সরব এরোজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার দিকে। গনগনে স্বরে শুধায়,
–“মুখে কাপড় দিলেন কেন?”
মৌনতা আড়চোখে চেয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“আপনার মুখ থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে। আমার বমি পাচ্ছে।”
এরোজ তাচ্ছিল্য হাসলো। বিদ্রুপ করে বলল,
–“অথচ আজ দেড় মাস আমি সিগারেট মুখে দেইনি। যত্তসব মনের দোষ! এগুলো হসপিটালের কেমিক্যালের গন্ধ!”
মৌনতা কপাল কুঁচকে মুখ থেকে কাপড় সরায়। ইঁদুরের মতো নাক টেনে টেনে কেমিক্যালের গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করলো। ফের উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“না, এটা সিগারেটের ই গন্ধ!”
এরোজ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দেখে তার কর্মকান্ড! খানিক রুক্ষ স্বরে বলল,
–“একটু পর আপনাকে একটা সিগারেট কিনে দেবো। খেয়ে বলবেন এটা সিগারেটের গন্ধ কি-না !”
–“ছিঃ!”, মৌনতা সরব নাক মুখ কুঁচকে ঘৃণীত কণ্ঠে বলে উঠল।
ততক্ষণে লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে আসল। এরোজ গটগট করে বেরিয়ে আসে হসপিটাল থেকে। হসপিটালের ঠিক সামনে খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দিতেই মৌনতা বদ্ধ নেত্রে বুকভরা শ্বাস নিলো। কৃত্রিম বায়ুর মধ্যে থেকে থেকে জীবন বড়ই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
প্রথমবারের মতো বিভূইয়ের আকাশ দেখে অন্তঃস্থলের অস্থিরতা বিলীন হয়।
সম্মুখে একটি কালো মার্সিডিজ থামলো। এরোজ দরজা খুলে দিতেই মৌনতা স্থবিরতা ভেঙে এগিয়ে যায়। সিটে বসতেই এরোজ একটা জুসের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“এটা খেয়ে শেষ করুন তাড়াতাড়ি।”
মৌনতা দ্বিরুক্তি করে না। নীরবে খেতে লাগল। কিন্তু পুনরায় সেই কৃত্রিম উষ্ণতায় সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় একমনে ড্রাইভ করতে থাকা মানুষটার দিকে। ক্ষীণ অসন্তোষের সাথে বলল,
–“হিটার বন্ধ করা যায় না? জানালাটা খুলে দিন। অনেকদিন হয়েছে একটু সতেজ নিঃশ্বাস ফেলতে পারিনা।”
–“ঠান্ডা সহ্য করতে পারবেন?”
মৌনতা মাথা নেড়ে বলল,
–“পারব, খুলুন।”
হিটার বন্ধ হয়ে গেল, জানালাটা খুলে গেল। শীতল সতেজ সমীরণের ঝাপটায় মৌনতা বদ্ধ নেত্রে বুকভরা শ্বাস নেয়।
কিন্তু মস্তিষ্কে সরব হানা দেয় সে মেয়ের জন্য কিছুই নেয়নি। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আমি তো নায়েলের জন্য কিছু নেইনি। জন্মদিনে ওকে কিছু না দিলে ওর মন খারাপ হবে।”
এরোজ ঘাড় কাত করে তাকায় উৎকণ্ঠা ভরা মুখপানে। শান্ত স্বরে বলল,
–“বিগত এক মাসে হাজারবার সে মায়ের কাছে যেতে চেয়েছে, মায়ের বুকে ঘুমাতে চেয়েছে, মায়ের হাতে খেতে চেয়েছে… কিন্তু পারেনি। আপনি কী বুঝতে পারছেন ওর অসহায়ত্ব? চাইলেও যখন মাকে কাছে না পাওয়া যায় তখন সেই কষ্ট কতটা বিভৎস হয় তা আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না। ওর কোনো মন ভুলানো খেলনা চাই না, ওর মাকে চাই। দয়াকরে নায়েলকে তার সুস্থ্যসবল মাকে ফিরিয়ে দিন। নিজের যত্ন নিন, সাহসিকতার সাথে লড়ুন। দ্যাট উড বি দ্যা বেস্ট গিফট ফর হার।”
এরোজের স্বরে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক হিমশীতল বাস্তবতা। ছোট্ট এরোজ ও মায়ের জন্য এমনি তরপেছে কিন্তু কখনোই কাছে পায়নি। মৌনতা নিস্তেজ কণ্ঠে বলল,
–“মৃত্যুকে আটকানোর ক্ষমতা কার রয়েছে?
–“বাঁচার ইচ্ছা আর চেষ্টা থাকলে মৃত্যুকেও হার মানানো যায়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ইচ্ছাটুকুই আপনার মাঝে নেই।”
পুরুষটির চোখে না বলতে পারা শত শত অভিমান, অভিযোগ। মৃত্যু? এরোজের চোখে মন্থর গতিতে লালচে আভা ছড়িয়ে যেতে লাগল। আরো একবার হারিয়ে ফেলার শক্তি তার মাঝে নেই। অথচ যাকে ঘিরে তার পৃথিবী, সেই মানুষটির মাঝেই বেঁচে থাকার নূন্যতম স্পৃহা নেই।
মৌনতার চোখ ছলছল করে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল
–“কখনো আমার জায়গায় দাঁড়াবেন, পিছু ঘুরে তাকাবেন দেখবেন বাঁচার নূন্যতম স্পৃহা তো দূর, শ্বাস নিতেই কষ্ট হবে। যার হাত ধরেছিলাম সারাজীবন একসাথে সুখে বাঁচার জন্য, সে খুব যত্ন করে মৃত্যুর ঠিক সামনে এনে হাত ছেঁড়ে দিয়েছে।”
এরোজের ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
–“এখনো পিছু ফিরে তাকিয়ে আছেন অথচ সামনে কেউ জীবন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
মৌনতা ঘাড় কাত করে তাকায়,
–“কিছু বললেন বুঝি?”
–“উঁহু।”
এরোজ ক্ষীণ স্বরে নাকচ করল। মৌনতা ভার হয়ে থাকা মাথা এলিয়ে দেয় জানালায়। পথিমধ্যেই চলন্ত গাড়িটার গতি শ্লথ হয়। মৌনতা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“গাড়ি থামালেন কেন? খালামনির বাসা আর কতদূর?”
এরোজ খালি জুসের বোতলটা নিয়ে বের হতে হতে বলল,
–“একটু বসুন, আমি আসছি।”
এরোজ লম্বা লম্বা কদমে রাস্তার পাশের জুসের পোর্টাবেল দোকানটির দিকে এগিয়ে গেল। মৌনতা জানালা থেকে মাথা বের করে দেখল, বেশ জনসমাগমস্থল খোলা একটা জায়গা। চারিদিকে সুসজ্জিত স্টল!
তার চোখ আঁটকায় অনতিদূরে থাকা ফেইরি লাইটে সুসজ্জিত স্টলটির পানে। ঠোঁটের কোনে আলতো হাসির রেখা ফুটে উঠল। নায়েল আর তার ফেইরি লাইট খুব পছন্দের। নায়েল থাকলে নিশ্চিত আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতো।
দীর্ঘ বন্দি জীবনের তীক্ততা ভুলতে সে ধীর কদমে গাড়ি থেকে নেমে আসে। সহসা হীম করা শীতলতায় দেহের লোম দাঁড়িয়ে গেল। ওভারকোট এর উপর স্কার্ফটা আরো ভালোকরে জড়িয়ে নিয়ে সে এগিয়ে যায় স্টলটির দিকে। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সেলসম্যান সৌজন্য হেসে নিজ ভাষায় বলল,
–“হ্যালো ম্যাম! আপনার কী লাগবে?”
মৌনতা স্মিত হেসে না বোধক মাথা নাড়লো। বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“আপনার দোকানটা খুব সুন্দর করে সাজানো। আমার মেয়ের ফেইরি লাইট খুব পছন্দ। তাই দেখছিলাম।”
প্রেক্ষিতে লোকটা হাসিমুখে বলল,
–“থ্যাংক ইউ, ম্যাম।”
তন্মধ্যেই এরোজ ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
–“বারণ করেছিলাম বের হতে। এখনো পুরোপুরি একদম সুস্থ্য হয়ে যাননি যে যেখানে সেখানে চলে যাবেন। জীবাণু থাকতে পারে এখানে।”
মৌনতা তাকায় বাড়িয়ে দেয়া জুসটির দিকে, পরপরই তাকায় চিন্তিত মুখপানে। প্রথমবারের মতো মনে হলো মানুষটা ভীষণ যত্ন করতে জানে।
–“আপনি জুস আনতে গিয়েছিলেন?”
–“হুঁ, বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে এটা শেষ করবেন। চলুন।”
মৌনতা জুসটা নিয়ে নির্ভীক কণ্ঠে বলল,
–“আপনি মানুষের জন্য এত চিন্তা করেন তা প্রথম দেখছি।”
এরোজ কপাল কুঁচকে নিলো। থমথমে মুখে শুধাল,
–“কেন আমি আগে কী করতাম?”
মৌনতা বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“মহিষের মতো ঘেউ ঘেউ করতেন কথায় কথায় আর সুযোগ পেলে শিং ও মেরে দিতেন?”
বলেই সে গাড়িতে উঠে বসে। এরোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে তার পাশের দরজা লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“মহিষ ঘেউ ঘেউ করে প্রথম শুনলাম। ঠিকমতো বদনাম করতে না পারলে করবেন না, কিন্তু এইসব অদ্ভুত উদাহরণ দেবেন না মৌন!”
মৌন? অদ্ভুত সম্বোধনে মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকায় এরোজের দিকে। এরোজ নিরুদ্বেগ গিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। অস্বস্তি জাগলেও মৌনতা কিছু বলল না।
বাকি পথটুকু নীরবে কেটে গেল। এরোজের কথামতো মৌনতা বাঁচার স্পৃহা জোগায়। কষ্ট হলেও পুরো জুসটা খেয়ে শেষ করে। এরপর লহমা গোনে দীর্ঘ এক মাস পর নিজের এক টুকরো জীবন্ত অংশকে বুকে জড়িয়ে নেয়ার।
ঠিক দশ মিনিটের মাথায় গাড়িটির গতিশ্লথ হলো একটা বিলাসবহুল বাড়ির সামনে। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই ঝিমুতে থাকা মৌনতা জানালা থেকে আনমনা দৃষ্টিতে বাইরে তাকালে দৃষ্টি খানিক ঝলসে গেল আচমকা আলোর ঝলকানিতে।
মৌনতা বিস্ময় নিয়ে তাকায় রাস্তার ঠিক পাশে একটা রাজপ্রাসাদের ন্যায় বিলাসবহুল বাড়ি আপাদমস্তক ফেইরি লাইটে জ্বলজ্বল করছে। সে মুগ্ধ চোখে দেখে বাড়িটাকে। আফসোসের সুরে বলে ওঠে,
–“নায়েল এটা দেখলে ভীষণ খুশি হতো! খালামনির বাসা এখান থেকে কতদূরে? আপনি কী নায়েলকে এখানে একটু নিয়ে আসবেন? ও ফেইরি লাইটস খুব পছন্দ করে।”
এরোজ এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে সিটবেল্ট খুলে বেরিয়ে আসে। মৌনতার সিটের দরজা খুলে দিয়ে বলল,
–“নেমে আসুন।”
–“এখানে?”
–“হুঁ।”
–“খালামনির বাসা কী এখানেই?”,মৌনতা এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেমে আসে।
রাস্তার পাশে সাড়িবদ্ধ ভাবে অনেক বাড়ি রয়েছে।
এরোজ গাড়ি লক করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আপনি খালামনির বাসায় না আমার বাড়িতে এসেছেন।”
বলেই সে সুসজ্জিত বিলাসবহুল বাড়িটির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মৌনতা তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। এরোজ ফিরে তাকায়। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হলো হাঁটতে পারছেন না? কষ্ট হচ্ছে?”
মৌনতা পিটপিট করে চেয়ে বলল,
–“এটা আপনার বাড়ি?”
এরোজ নিরুদ্বেগ মাথা নাড়লো। মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বাড়িটির দিকে। না না বাড়িটির দিকে নয় বরং বাড়িটিতে ঢোকার রাস্তার দুই পাশের ইয়ার্ডে সেজে থাকা অজস্র ল্যাভেন্ডার ফুলের দিকে।
অনতিবিলম্বে চোখমুখ ঠিকরে স্নিগ্ধ এক হাসি ফুটে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আপনার বাড়িটা খুব সুন্দর! নায়েল খুব খুশি হবে এত ফেইরি লাইট দেখে।”
ওই একফালি স্নিগ্ধ হাসির উজ্জ্বলতায় নারীটির দৈহিক সকল অসুস্থতা নিমিষেই হারিয়ে গেল।
বুকে হাত গুঁজে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
–“নায়েল ভেতরেই আছে, আসুন।”
মৌনতা এরোজের পিছু পিছু এগিয়ে যায়। বেল বাজিয়ে এরোজ এক কদম পেছনে সরে আসে মৌনতার থেকে।
মৌনতা প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে ফিরে তাকালে এরোজ ইশারা করে বলল,
–“ভেতরে যান।”
দরজাটি খুলে গেল মিনিটের মাঝেই, ভেসে আসলো সমস্বরে কিছু চিৎকার।
–“ওয়েলকাম হোম…ভাবিইইই!”
স্বশব্দে একটি ‘পার্টি পপার’ ফোটার শব্দ আসল। চারিদিকে রঙিন কাগজ উড়ছে। মৌনতা প্রগাঢ় হাসল নিশান্ত, নিভা, নিশাত আর তার পরিবারের চিৎকারে। সে হাসিমুখে ঘরে পা দিলেই ঝরঝরিয়ে কিছু গোলাপের পাপড়ি পড়ল তার মাথার উপর। মৌনতা ছলছল নেত্রে তাকায় সকলের দিকে। অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“ধন্যবাদ খালামনি।”
নিশাত স্নেহভরা নয়নে চেয়ে তাকে বুকে আগলে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার আম্মা এসে গিয়েছে আমাদের কাছে।”
নিভা চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“ভাবি, তুমি খুশি হয়েছো? বললে না তো তোমার কেমন লাগল?”
মৌনতার তার গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
–“ভীষণ খুশি হয়েছি নিভা। এগুলো কে করেছে?”
নিভা চঞ্চল কণ্ঠে কিছু বলবে তার আগেই এরোজ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“নিশান্ত।”
এরোজের কথায় মৌনতা স্নেহভরা নয়নে তাকায় নিশান্তের দিকে।
–“এসব তুমি করেছো নিশান্ত?”
হতবাক নিশান্ত পাল্টা স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
–“আমি?”
মৌনতা কপাল কুঁচকে নিলো। তার কুঁচকানো মুখ দেখে নিশান্ত তৎক্ষণাৎ বোকাসোকা হেসে বলল,
–“ওহ্ হ্যাঁ, আমি। হ্যাঁ ভাবি, আমিই করেছি এসব।”
মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“তোমায় দেখে মনে হচ্ছে, তোমায় জোর করে কেউ করিয়েছে।”
–“আমায়? আমায় দিয়ে জোর করে কিছু করাবে এমন সাধ্য কারোর নেই ভাবি। তুমি ভেতরে এসো।”
এরোজ থমথমে মুখে এসে দাঁড়ায় নিশান্তের সামনে। নিশান্ত দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
–“এমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে মুখের ওপর মিথ্যা কথা কী করে বলো, ব্রো? আমার তো একটা কথা লুকাতে যাওয়ার আগে আমার ফেইস বলে দেয় যে আমি কিছু লুকাচ্ছি।”
–“কারণ তুই একটা গর্ধব!”, এরোজ দাঁত খিচে বলেই গটগট করে ভেতরে ঢুকে গেল।
মৌনতা অলস পায়ে এগিয়ে যায় মায়ের কাছে। মেয়ের বিধ্বস্ত রুগ্ন দশায় মাসুমা বেগম ছলছল নেত্র লুকাতে চায় কিন্তু পারে না। মৌনতা মাকে জড়িয়ে ধরতেই মাসুমা বেগম ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। অন্তঃস্থল আর্তনাদ করে বলে ওঠে,
–“মেয়েকে বিয়ে দেয়ার মতো পাপ কী করে করলো তারা? সন্তানকে প্রাণের চেয়ে ভালোবাসার এই নমুনা?”
মাসুমা বেগম মেয়েকে আদরে আদরে ভরিয়ে তোলেন। আদুরে গলায় বলে,
–“দ্রুত সুস্থ্য হয়ে যাবে আম্মা। আর কিছুদিন।”
মায়ের মন ভুলানো কথায় মৌনতা ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“আর মন মন ভুলানো কথা বলো না আম্মা। আশা রাখতে রাখতে ভেতরটা আজ বাজেভাবে গুঁড়িয়ে গিয়েছে। অন্তত মৃত্যুটা অপ্রত্যাশিতভাবে না হোক।”
মাসুমা বেগম আর্তনাদের সুরে বলে ওঠেন,
–“মায়ের সামনে এত কঠিন কথা কেন বলছিস মৌন? কিছু হবে না তোর। কত উন্নত চিকিৎসা রয়েছে জানিস? এসব রোগ কিছুই না।”
মৌনতা আর কিছু বলে না। চোখ খুঁজে বেড়ায় ছোট্ট একটা আদলকে। মিহি স্বরে শুধায়,
–“আমার জান’টা কোথায়?”
–“সে ঘুমাচ্ছে।”
এরোজ ঘুমন্ত দেহটিকে আলতো হাতে তুলে নেয় বুকে। পরিচিত উষ্ণ বুকের ছোঁয়ায় নায়েল ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“পাপা!”
এরোজের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। হোক না ঘুমের ঘোরে, তবুও এটা তার বুকটাকে প্রশান্তি দেয়। সে ললাট বরাবর চুমু দিয়ে বলল,
–“হ্যাপি বার্থডে, মা।”
নায়েলের কাছে বার্থডে মানে বিশাল বড় সেলিব্রেশন। ছোটবেলা থেকে এটা দেখেই বড় হয়েছে সে। তার ঘুম হালকা হয়ে গেল বার্থডের কথা শুনে। সে নড়েচড়ে উঠে চোখ মেলে তাকায়। সম্বিৎ ফিরতেই আদুরে গলায় সুর টেনে বলল,
–“আজকে আমাল বাথডেএএ?”
–“হুঁ, হ্যাপি বার্থডে মা। তুমি কেক কাটবে না?”
একটা হাফ হাতার টিশার্ট আর একটা হাফ প্যান্ট পরিহিত নায়েল উঠে বসে। বিছানায় পা গুটিয়ে বসে উৎসুক কণ্ঠে বলে,
–“আজকে আমাল বাথডে? কেউ বলেনি কেন? পাপা দাদুভাই, দাদুমনি, বলো পাপা ফুফি তানশান ভাইজান আছেনি কেন? আমলা কেক কাটব না?”
বাড়িতে বাচ্চাদের জন্মদিন মানেই বিশাল আয়োজন। সেখানে আজ এতবড় দিন হওয়ায় চারিপাশ এত নীরব দেখে নায়েল অবাক। এরোজ মৃদু হেসে বলল,
–“হুম, আমরা কেক কাটব প্রিন্সেস ড্রেস পরে, অনেক মজা করব। উঠে পড়ো।”
নায়েলের মন খারাপ হয়ে গেল। এমন বার্থডে তো কখনো হয়নি। মাম্মা পাপা কেউ নেই!
সে বলল,
–“মাম্মা আসবে?”
–“আসবে তো, নায়েলের জন্মদিন আর মাম্মা আসবে না এটা হতে পারে? ওই যে দেখো তো ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছে?”
এরোজের কথায় নায়েল ঘুম জড়ানো চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই চোখেমুখে বিস্ময় খেলে গেল। সে সরব চেঁচিয়ে উঠল,
–“মাম্মাআআআ!”
দরজার কপাট আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা ছলছল নেত্রে তাকায় ছোট্ট মেয়েটির দিকে। একমাসের দূরত্বে মনে হচ্ছে মেয়েটার আপাদমস্তক বদলে গিয়েছে।
নায়েল ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়লো মায়ের বুকে। মৌনতা ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিতেই। তবে তার দূর্বল দেহ সন্তানের ভারটুকুও সামলাতে ব্যর্থ হলো। আঁছড়ে পড়া দেহটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মৌনতা মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে।
কাঁদতে কাঁদতে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তোলে ছোট্ট মুখটি। আদুরে গলায় শুধায়,
–“আমার মা কেমন আছে?”
অদ্ভুত ব্যপার হলো ছোট্ট নায়েল ও কাঁদছে। সে ঠোঁট উল্টাতে উল্টাতে বলল,
–“ভানো নেই। তুমি কেন এত অসুত্ত থাকো? কেন সবসময় হাসপাতালে থাকো? আমাল একা একা ভানো নাগে না এখানে। পাপা, দাদুমনি, বলো পাপা ফুফি কেউ আছে না জানো?”
মৌনতা এলোমেলো হাতে উন্মাদের মতো ছুঁয়ে দেখছে মেয়েকে। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলল,
–“মা আর হাসপাতালে থাকব না, আমার জান। মা সবসময় তোমার সাথে থাকব এখন।”
–“আল যাবে না?”
নায়েলের প্রশ্নে মৌনতা উদাসীন হলো। মিথ্যা কথা বলতে ইচ্ছে হলো না আর। সে মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে কথা ঘুরিয়ে বলল,
–“তুমি কি জানো ছোট পাপা তোমার বার্থডের জন্য ফেইরি লাইট দিয়ে কত সুন্দর করে ঘর সাজিয়েছে? তুমি দেখেছো?”
নায়েল বড় বড় নেত্রে চেয়ে বলল,
–“ফেইরি লাইটস? অনেকগুলো?”
–“হুঁ, অনেকগুলো। চলো দেখবে তারপর কেক কাটব আমরা অনেক মজা করব।”
সামান্য একটু ফেইরি লাইট! নায়েল ভুলে গেল নিজের গোটা দুঃখী জীবনবৃত্তান্ত! সে হৈ হৈ করে বলল,
–“চলো চলো।”
সে মায়ের কোল থেকে নেমে ছুট লাগায়। এরোজ ধীর পায়ে এগিয়ে আসে মেঝেতে বসা দূর্বল দেহটির দিকে। ওঠার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে মৌনতা চোখ তুলে তাকায়। সহসা টুপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“থ্যাংক ইউ!”
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
–“ডোন্ট সে থ্যাংকস। আ’ম ডুইং ইট ফর মাই ওউন হ্যাপিনেস। কাম অন গেট আপ, মেঝেতে ময়লা আছে।”
মৌনতা হাত ধরে উঠে আসে। তারা রুম থেকে বের হতে যাবে তন্মধ্যেই আচমকা কেউ এরোজের বুকে আঁছড়ে পড়ল।
এরোজ ভড়কে গেল। কিন্তু মানবী কে বুঝতে পেরে মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
–“তুমি এখানে কী করছো আনি?”
মৌনতা দেয়াল আঁকড়ে ধরে দাঁড়ায়। পিটপিট করে চেয়ে দেখে ব্রাউন কালারের চুল ওয়ালা ফর্সা সুন্দর এক মেয়েকে। বাঙালি গড়ন হলেও চেহারায় বিদেশী ভাবটাই বেশি ফুটছে। বয়স আনুমানিক তেইশ চব্বিশ হবে।
আনি নামক মোহগ্রস্ত রমনী শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো এরোজের পৃষ্ঠদেশ। অভিযোগ মিশ্রিত কণ্ঠে ইংলিশেই বলল,
–“নায়েলের বার্থডে পার্টি রেখেছো আজ। আমায় বলোনি কেন? ছোট মাম্মা বলল আমায়। আমার খুব খারাপ লেগেছে এরোজ।”
মৌনতা এতক্ষণে বুঝলো মেয়েটা নিশাতের ভাসুরের একমাত্র মেয়ে। যারা জন্মগত ভাবে কানাডাতেই রয়েছে।
এরোজ জোরপূর্বক আনিকে দূরে সরিয়ে দিল। গনগনে স্বরে বাংলাতে বলল,
–“এসেছো চুপ করে বসো। বাঁদরের মতো লাফালাফি আর হুটহাট গলা ধরে ঝুঁলে পড়বে না। বিরক্তিকর!”
আনি বাংলা একটু কম বোঝে। সে অবুঝপানে চেয়ে বলল,
–“ভাদর? ইউ মিন মাঙ্কি এরোজ?”
এরোজ জবাব দেয় না গটগট করে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। আনি মৌনতার দিকে চেয়ে নিজ ভাষাতেই বলল,
–“তুমি মৌনতা? ক্যান্সার পেশেন্ট? আমি তোমার কথা শুনেছি আমার খুব খারাপ লেগেছিল তোমার কথা শুনে। তুমি দ্রুত সুস্থ্য হয়ে যাবে চিন্তা করো না।”
মৌনতা সৌজন্য হেসে সামনে তাকায়। এরোজ পুনরায় ফিরে এসে বলল,
–“দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
মৌনতা আনির দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলল,
–“আসছি হ্যাঁ?”
–“আমিও আসব তো।”, আনি তড়িঘড়ি করে বলেই চলতে শুরু করলো। মৌনতা ধীর কদমে এগিয়ে যায়। এরোজ ও তার সাথে পা মেলাতেই সে ঘাড় কাত করে তাকায় পুরুষালী মুখপানে। যেথায় স্পষ্ট চাপা রাগ।
রাতটুকু অস্বাভাবিক প্রাশান্তিময় হয়ে উঠল বিভুইয়ে থাকা পরিবারের সকলের জন্য। রাত বারোটা বাজার আগেই নায়েলকে প্রিন্সেসের মতো সাজিয়ে কেক কাটা হলো, নিশাতের রান্না করা শাহী ভোজ দিয়ে নৈশভোজ শেষ হলো।
বহুদিন বাদ একটু মুখরোচক খাবার খেয়ে মৌনতা তৃপ্তি পেলেও শরীর তাকে তৃপ্ত হতে দেয় না। ক্রমেই শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে। অথচ নায়েল চাচ্ছে তার মা আগের মতো তার সাথে হৈ হুল্লোড়, আনন্দ করবে।
মৌনতার বিশ্রামের প্রয়োজন নিশাত দ্রুত ঘর খালি করার ব্যবস্থা করলো। ভাসুরের এক মেয়ে আর এক ছেলে সহ এসেছিল আনন্দটুকুকে আরেকটু দ্বিগুণ করতে। সে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বিদায় নিতে এএস আহাজারি জুড়ে দিল মৌনতার সাথে,
–“আম্মা, এরোজকে কত করে বললাম আমার বাড়িতে নিতে তোমায়। কিন্তু তাতে তার সাফ নারাজি। তোমার মায়ের এখানে রান্নাবান্না করে খেতে হবে। এটা ঝামেলা না? আমি রান্না বান্না করতাম তোরা আমার বাড়িতে আরামে থাকতি। তা না! রগত্যাড়া ছেলেকে কিছু বোঝাতে পারি না আমি।”
একটু থেমে পুনরায় বলেন,
–“ওই দশ মিনিট দূরে আমার বাসা। সে আমার সাথে থাকতে পারতো না? খালার বাসায় থাকতে কী সমস্যা? তা না, সে একা এই বিশাল বাড়ি কিনেছে। বাপের টাকা আছে নষ্ট করেছে ইচ্ছেমত। নিজের যত্ন নেই, এখানে পড়ে থাকে। মাসেও আমার বাড়িতে একবার পা দেবে না। কত বোঝালাম, এখন আর বুঝাইনা। ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। আমি সকালে আবার আসব আম্মা, তুমি এখন রেস্ট নাও। কী খেতে ইচ্ছে হবে তা শুধু খালামনিকে বলবে। খালামনি বানিয়ে খাওয়াবো।”
–“আচ্ছা খালামনি।”
মৌনতা মৃদু হেসে উষ্ণ আলিঙ্গন করে নিশাতের সাথে। বিদায় কালে আনি ফের এরোজকে জড়িয়ে ধরতেই এরোজ তেতে উঠল খালার উপর। বাংলাতেই বলল,
–“বিরক্তির একটা সীমা আছে খালামনি। ওকে কেন এনেছো এখানে?”
নিশাত ছোট মুখে বলল,
–“পরে যদি শুনত আমরা ওকে ছাড়া পার্টি করেছি আমার মাথা খেয়ে নিতো। একটু সহ্য করে নে না!”
এরোজ দাঁত খিচে বলল,
–“কোন দিন একটা দিয়ে বসব তখন আমায় কিছু বলতে পারবে না।”
–“খবরদার! এমনটা কখনো করবি না এরোজ।”
–“সবসময় এমন গায়ে পড়া আমার ভালো লাগে না খালামনি।”
নিশাত ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“তোকে ভালোবাসে দেখেই তো অমন একটু করে।”
–“সবটা জেনেও যে তুমি এমন অবুঝের মতো কথা বলো, এতে আরো মেজাজ খারাপ হয় খালামনি।”
বলেই সে গটগট করে লিভিং রুমে চলে গেল। সোফায় আধশোয়া হয়ে বসা মৌনতার ঠিক অপরপাশে বসে ওয়েট টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে লাগল। মৌনতা বাঁকা চোখে তাকালো ব্যস্ত নত শিরপানে। মিনমিনে স্বরে বলে উঠল,
–“আপনার অনেক পাপ হবে।”
আচমকা এমন অদ্ভুত কথায় এরোজ হাত থেমে গেল। সে ঝুঁকে থাকা বদনেই ঘাড় কাত করে তাকায় থমথমে মুখপানে। ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
–“কেন?”
মৌনতা সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“আপনি কথায় কথায় সবাইকে জড়িয়ে ধরেন।”
–“কথায় কথায় কাকে জড়িয়ে ধরেছি?”,এরোজের ললাটে অজস্র ভাঁজ!
–“লিরাকে, আনিকে।”
–“এটা কালচার।”
–“তাতে কী? এখন কালচার বলে কথায় কথায় আমি পরপুরুষকে গিয়ে জড়িয়ে ধরব?”, মৌনতার কণ্ঠে ঘোর বিরোধ। এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল। বলল,
–“আপনাকে জড়িয়ে ধরতে দেয়া হলে তো আপনি ধরবেন।”
–“মানে? কে দেবে না?”, মৌনতা সরব কপাল কুঁচকে তাকায়। এরোজ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“ডঃ কী বলেছে? আপনাকে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে। সেখানে জড়িয়ে ধরা তো আরো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ!”
–“ওহ্।”
–“এটা আপনার বাড়ি? এত বড় বাড়ি কিনেছেন কেন একা মানুষ?”
এরোজ টিস্যু দিয়ে হাতের কেক মুছতে মুছতে জবাব দিল,
–“বউ বাচ্চা নিয়ে থাকব বলে।”
–“বউ বাচ্চা আছে আপনার?”
–“নাহ।”
–“তবে?”
–“আল্লাহর কাছে চাইলে সব পাওয়া যায়। রেডিমেড বউ বাচ্চাও পাওয়া যায়।”
মৌনতা মুখ বিকৃত করে শুধায়,
–“হ্যাঁ? রেডিমেড বউ বাচ্চা মানে?”
এরোজ মুখ তুলে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,
–“আপনাকে বলেছিলাম কী? ঘরে গিয়ে ঘুমাতে বলিনি? শরীর খারাপ লাগছে না? একটু পর একটা সেলাইন দিতে হবে।”
মৌনতা ছোট মুখ করে বলল,
–“আমি ঘর চিনি না। তাই যেতে পারছি না। আর নায়েলকে আম্মা ফ্রেশ করাতে নিয়ে গিয়েছে। ও এলে ঘুমাব।”
–“আপনার ঘর উপরে, আসুন আমার সাথে।”
মৌনতা দূর্বল দেহে তার পিছু পিছু চললো। দোতালার একটা বিলাসবহুল মাস্টার বেডরুমে ঢুকলো এরোজ। পাছে পাছে মৌনতাও ঢুকলো। কিন্তু ঢুকতেই তার পা থমকে যায়, অন্তঃস্থল কেমন অস্থির হয়ে পড়লো। এরোজ পুরো ঘরময় দেখিয়ে দিল কোথায় কী রাখা আছে। একজন অসুস্থ মানুষ, একজন পরিপাটি নারীর প্রয়োজনীয় যত যা কিছু প্রয়োজন সব আছে সেখানে। এমনকি ক্যাজুয়াল পোশাক থেকে শুরু করে আড়ং এর থ্রিপিস ও সেখানে রয়েছে। পুরো ঘরটা একদম তার পছন্দের জিনিস, রঙে তৈরি। এটা কী কাকতালীয়?
মৌনতা ধীর কদমে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। বিছানার পাশে রাখা দু’টো কৌটা হাতে তুলতেই অন্তঃস্থল আরো তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কৌটা ভরতি পছন্দের বুবু লুবু চকলেট আর আমসত্ত্ব। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এরোজের পানে। শুধায়,
–“এই ঘর আমার?”
–“হু।”
–“কে সাজিয়েছে?”
–“কেন?”
–“বলুন কে সাজিয়েছে? আপনি?”
পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ শান্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করে প্রশ্নে জর্জরিত মুখটি। মৃদু হেসে তার সব প্রশ্ন আর উদ্বিগ্নতাকে মিলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আপনার মা সাজিয়েছে।”
সহসা অন্তঃস্থলের সকল প্রশ্ন মিলিয়ে গেল। মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
–“আমি আরো ভাবছিলাম, এই ঘর একদম আমার মনের মতো করে সাজানো কীভাবে?”
–“সামর্থ্য থাকলে গোটা পৃথিবীটা আপনার মনের মতো করে সাজিয়ে দিতাম।”
অস্পষ্ট কণ্ঠে মৌনতা ফিরে তাকায়।
–“কিছু বললেন? আপনি একা একা সবসময় কথা বলেন কেন?”
–“কথা বলার মানুষ নেই বলে।”
–“হ্যাঁ?”
এরোজ এড়িয়ে যায় মৌনতার কৌতুহল। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“ আমি আন্টিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ফ্রেশ হয়ে নিন। কোনো প্রয়োজন হলে আমায় ডাকবেন, এক ঘর পরেই আমার ঘর।”
–“আচ্ছা।”
এরোজ বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। কিন্তু বের হতেই দেখলো মাসুমা বেগম দাঁড়িয়ে আছে সেখানে কাঁধে শুয়ে আছে নায়েল। এরোজ সৌজন্য হেসে বলল,
–“নায়েলকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, আপনি তাকে সাহায্য করুন।”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫
মাসুমা নির্বাক নায়েলকে দিয়ে দিল। এরোজ চলে যায়। মাসুমা বেগমের কানে তখনো বাজছে এরোজের বলা জবাবটি। সে ধীর পায়ে মেয়ের ঘরে ঢোকে। ঢুকতেই মেয়ের পছন্দের ল্যাভেন্ডার এর সুবাস নাসারন্ধ্রে ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করে। পুরো ঘরময় চোখ বুলাতেই তার ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। কেননা এই প্রথম সে এই ঘরে এসেছে। অথচ ছেলেটা কত অবলীলায় মিথ্যা বলে দিল! কিন্তু কেন?
