Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩২

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩২

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩২
ফাহিমা ইসলাম

সূর্য এখন মধ্যগগনে জ্বলজ্বল করছে। তবে এই রোদের কোনো তেজ নেই, কেমন যেনো নেতিয়ে পরা সূর্যের রশ্মি। শীতের দুপুরের এমন নরম আলো গায়ে পরতেই মনটা ভালো হয়ে যায়। রোদেলাকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দিচ্ছে তূর্ণা। বাথটবের হালকা কুসুম গরম পানিতে, বসে খেলায় ব্যস্ত। পানিতে ভাসমান অনেক রকমের খেলনা। তূর্ণা নরম হাতে অতি যত্নসহকারে রোদেলার চুলগুলো শ্যাম্পু করে দিচ্ছে। তূর্ণা গুণগুণ করে গান গাইছে, সেটার তালে রোদেলাও আনন্দ নিয়ে নিজ জগতে বিভোর। হুট করেই রোদেলা তূর্ণার গায়ে পানি ছুঁড়ে দিয়ে হেসে উঠলো। হুট করে এমন হওয়ায় তূর্ণা কিছুটা হকচকিয়ে যায়। তারপর রোদেলার হাস্যজ্বল মুখশ্রীর দিকে তাকাতেই সেটা ঘায়েব হয়ে গেলো। রোদেলার সামনের দাঁতগুলো খরগোশদের মত, যার কারণে হাসলে অপরূপ লাগে বাচ্চাটাকে। রোদেলা ছোট্ট হাত দ্বারা একে পর এক পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে তূর্ণার দিকে।

“ ইসস! পুতুল আমাকে ভিজিয়ে দিলে তো। এটা ঠিক না কিন্তু, আমায় আবারও জামা পাল্টাতে হবে।”
“ আতো এত তঙ্গে গোতল করি। অনেত মজা হবে।”
বলেই আরও দিতে থাকে, সেটা দেখে তূর্ণাও পানি ছুঁড়তে থাকে রোদেলার দিকে। দু’জনই পানি ছোঁড়াছুড়িতে ব্যস্ত। তাদের হাসির কলকলধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে জায়গাটা। অনেকটা সময় নিয়ে তূর্ণা আর রোদেলা গোসল সেড়ে বের হয়ে এলো। তূর্ণার রোদেলাকে বড় টাওয়ালে মুড়িয়ে এনে বিছানার উপর দাঁড় করিয়ে রাখলো। রোদেলা টাওয়ালের মুড়নো থাকায় শুধু তার মাথাটা দেখা যাচ্ছে, তূর্ণা ড্রেসিংটেবিল থেকে বাচ্চাদের লশূন, বেবি ওয়েল নিয়ে এনে সুন্দর করে সারা শরীরে দিয়ে দিতে থাকে। রোদেলা তূর্ণার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে, একবার চুমু দিচ্ছে তো, আবার জড়িয়ে ধরছে। লশূন হাতে নিয়ে তূর্ণাকেও মাখিয়ে দিচ্ছে।

” আতো তুমায় তুন্দল করে সাতিয়ে দেই মা। পাপা দেকলে আদল কলে দিবে।”
রোদেলার কথা শুনে তূর্ণা কিছুটা লজ্জা পায়। আজ-কাল রোদেলা এমন এমন কথা বলে, যেটা শুনলে না চাইতেও লজ্জায় পরে যায় তূর্ণা। তূর্ণা৷ রোদেলার ভেজা চুলগুলো আর একবার মুছে দিতে দিতে বলে-
“ লাগবে না আমার আদর। তুমিই নাও তোমার পাপার আদর। তোমার পাপা আবার আদর করতে জানে নাকি। জানে তো খালি পড়া দিতে!”
তূর্ণার কথা শুনে রোদেলা হেসে দেয়। তার হাসি দেখে তূর্ণা মিছে অভিমান করলো, সেটা দেখে রোদেলা তার ছোট্ট হাত দ্বারা তূর্ণার দুই হাতে হাত রেখে৷ মাথা কাত করে বলে-
“ জানে তো, আনায় কত আদল করে দেয় তুন্দল করে সাতলে। পাপাকে বলে দিবো মা’কে এত্তগুলা আদল করে দিতে। দেখবে পাপা এত্ত এত্ত আদল দিত্তে তুমায়।”
তূর্ণা আরও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরলো। কপোল দু’টো গরম হয়ে উঠেছে লজ্জায়, সেটা দেখে রোদেলা তূর্ণার দুই গালে চুমু এঁকে দিয়ে বলে-
“ লত্তাবতী মা! খালি লত্তা পায়।”
বলেই খিলখিল করে হেসে দেয়। সেটা দেখে তূর্ণা আর কিছু বলতে পারলো না, তাড়াতাড়ি করে রোদেলাকে সুন্দর করে তৈরি করে দিলো।

“ হোটেলে গিয়ে পুচকু যখন ঘুমিয়ে যাবে তখন এটা পরবে ভাইয়ার সামনে।”
রিনির কথা শুনে তূর্ণা রিনির হাতে থাকা বডিকোণ ড্রেসটা দিকে তাকাতেই কেমন লজ্জা লাগলো৷ এইসব আবার কেউ পরে নাকি, তূর্ণা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলে-
“ না..না এইটা পরলে বর কি বলবে। ছিঃ কি জামা, এত টাইট কেনো এটা?”
রিনি তূর্ণার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে-
“ ছিঃ দেখেই তো ভাইয়ার সামনে পরবে। এত লজ্জা পেলে এই জন্মে আর দ্বিতীয় বার পিপি শুনতে পাবো না।”
রিনির কথার মানে তূর্ণা কিছুই বুঝলো না। তাই অবুঝের মতো প্রশ্ন করে বসে-
“ পিপি হতে কি এইসব জামা পরতে হয়?”
তূর্ণার কথা শুনে রিনি আর ইরা দুইজনই হেসে ফেলে। ইরা রিনির দিকে চোখ পাকিয়ে বলে-
“ রিনি বেচারিকে এইসব কেনো বলছো। মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে, আর রৌদ্রিক ভাইয়া তোমার বড় ভাই। একটু তো খেয়াল রাখ সেটা।”

“ ধুর রাখ তো বড় ভাই। বড় ভাই হয়ে যদি ভোদাইয়ে মতো ঘরে এত সুন্দরী বউ রেখে দিয়েছে। আমাকে তো আরও বাচ্চাদের পিপি হতে হবে তাই না।”
“ ইরাপু বেবি কি এই জামা পরলে হয়?”
ইরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিনি তূর্ণার হাতে জামাটা দিয়ে, নিজেই বলে ওঠে-
“ হ্যাঁ হয়, তুমি খালি এই জামা পরে ভাইয়ার আশেপাশে ঘুরঘুর করবে। বলবে তোমার বেবি চাই, দেখবে ভাইয়া বেবি এনে দিবে। না করলে জেদ ধরবে, পারলে কান্না করে দিবে।”
“ রিনি এবার চুপ যাও। আমারই তো লজ্জা লাগছে, অথচ বোন হয়ে তুমি কি নির্দ্বিধায় বলছো এইসব। বজ্জাৎ মেয়ে, লজ্জা কর। ভাবি লাগি তো।”
রিনির কথা শুনে ইরা নিজেও লজ্জা পরে গেছে। অথচ এই মেয়ে বলেই যাচ্ছে, ইরাকে লজ্জা পেতে দেখে। রিনি দুষ্টু হেসে ইরাকে বলে-

“ খালি তূর্ণা ভাবি না, তোমাকে বলছি আমার বাড়িতে আরও দু’টো বাচ্চা চাই। তূর্ণা ভাবিরটা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু তোমরা বেবি নিচ্ছো না কেনো?”
“ রিনি প্লিজ! আর না, তোমার ভাইয়ের মতোই নির্লজ্জ হয়েছো একদম। যেমন ভাই তেমন তার বোন!”
“ ফুপ্পি হতে হলে এতটুকু নির্লজ্জ হওয়াই যায় বুঝলে। তোমাদের তো কোনো হেলদোলই দেখছি না। তাই ননদ হিসেবে আমার দায়িত্ব এটা।”
বলেই চোখ টিপ দেয় দুই জনের উদ্দেশ্যে। তূর্ণার কিছু বলছে না, তার লজ্জা লাগছে। বিকেল গড়িয়ে রাত নামলেই তারা সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। এই প্রথম বাড়ির বাহিরে এতদূর যাওয়া পরবে তূর্ণার, তাই আলাদা এক আনন্দ তার মধ্যে বিদ্যমান। আরও আগেই নিয়ে যেতো, কিন্তু বাড়িতে বিয়ে তূর্ণার চিকিৎসার অনেক কিছুর জন্য আর যাওয়া হয়নি। এবার একদম ফ্রী হয়ে রৌদ্রিক তাকে নিয়ে যাবে সমুদ্র পারে। রৌদ্রিক তাকে কথা দিয়েছে, একে একে বাংলাদেশের সকল ভ্রমণকারী জায়গায় নিয়ে যাবে। দেশের গন্ডি ঘোরা শেষে বাহিরে নিবে, আগে নিজের দেশের থাকা জায়গায় ঘুরাবে। বাংলাদেশে ঘুরার জায়গার অভাব নেই, অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা আমাদের বাংলাদেশ। তাই নিজ দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করা উচিত তারপর বাহিরের।

রাত্রি এখন ধীরে ধীরে নিজের গাঢ়তম আবরণ মেলে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মেঘরাজির ফাঁক গলে চাঁদের অস্পষ্ট আভা সমুদ্রের গায়ে পড়ে সৃষ্টি করছিল রূপালী বিষণ্নতা। দূরবর্তী জনপদের আলোগুলোকে মনে হচ্ছে নিভু নিভু জোনাকির মিছিল। গভীর নীলাভ অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে কালো রঙের গাড়িটা। স্টিয়ারিংয়ে স্থির দৃষ্টিতে বসে রয়েছে রৌদ্রিক। তার ব্যক্তিত্বের মতোই শান্ত, স্থির। বাহ্যিক প্রশান্তির অন্তরালে যে মানুষটি কত সহস্র অস্থিরতা গোপন করে রেখেছে, তা তার চোখের গাঢ় ছায়া ব্যতীত আর কিছু প্রকাশ করতে পারেনা। ডানহাতে স্টিয়ারিং আঁকড়ে রেখেও বামহাতটি অদৃশ্য অভ্যাসে বারংবার এগিয়ে যাচ্ছিল পাশের সিটের দিকে। তূর্ণার ওড়নার প্রান্ত জানালার ফাঁকে আটকে যাচ্ছে কিনা, কিংবা তার কাঁধে জড়ানো শাল সরে যাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে। তূর্ণা আধখোলা জানালার পাশে মুখ বাড়িয়ে রেখেছে। সমুদ্রের পূর্বাভাসময় লবণাক্ত বাতাস এসে তার এলোমেলো কেশরাজি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাতের গহ্বরে। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় তার মুখখানি যেন কোনো ভগ্ন মানসপটের আঁকা শিল্পকর্ম। দৃষ্টিতে খেলছে শিশুসুলভ এক উচ্ছ্বাস।

“বর…!!” ‘মৃদুস্বরে ডেকে উঠলো সে।
“হুম?”
“সমুদ্র কি সত্যিই অনেক বড়? আমি নামলে কি ডুবে যাবো
রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নীরব রইলো। অতঃপর নিচু স্বরে বললো-
“ হুম অনেক বড়, সাঁতার জানলেও বেশি সময় সার্ভাইব করা সম্ভব নয়।”
“ তাহলে কি আমি নামতে পারবো না? যদি ডুবে যাই তখন কি হবে?
রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটলো।
“কি হবে,ভেসে চলে যাবে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে দূরে কোথাও।”
“ আপনি আমায় বাঁচাবেন না?”
“ তোমাকে বাঁচাবো কি না জানি না। তবে আমার আমার বউকে অবশ্যই বাঁচাবো।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা নাক ফুলালো।
“ আপনার বউ তো আমি। আমাকে বাঁচাবেন মানে তো বউকে বাঁচাবেন তাহলে মিথ্যে কেনো বলছেন?”
“ মিথ্যে কোথায় বললাম।”
“ আচ্ছা, সমুদ্রে খুব বড় বড় মাছ আছে? শার্ক কি খেয়ে ফেলে মানুষকে?”
“ হুম আছে, শিয়ালের সামনে মুরগী এগিয়ে দিলে যেমন সে খায়। শার্ক এত দয়ালু না যে খাবার পেয়ে ছেড়ে দিবে।”

হঠাৎই তূর্ণার কোলে ঘুমিয়ে থাকা রোদেলা নড়ে উঠলো। সেটা দেখে তূর্ণা তড়িঘড়ি করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো, কিছুসময় পর রোদেলা আবারও শান্ত হয়ে গভীর নিদ্রায় তলে যায়। রৌদ্রিক সবটা নীরবে দেখলো, রোদেলা আর তূর্ণার মাঝে কোনোদিনও কোনো কথা বলে না সে। তূর্ণার নিজ থেকে রোদেলার জন্য যা করে সেটা মন থেকে করে। তূর্ণা এখনো যতটুকু সুস্থ হয়েছে, এর থেকে বেশি হওয়া সম্ভব নয়। এমনিও তূর্ণা আর পাঁচটা মানসিক রোগীর থেকে আলাদাই বলা চলে। ছোট থেকে একধরনের ট্রমার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠার কারণে, তার মধ্যে থাকা চঞ্চলতা নিভে গেছে। কারণে-অকারণে বায়না ধরে না, যার কারণে রৌদ্রিকের এতটা সমস্যা হয় না তূর্ণাকে নিয়ে। এখন তো আরও কমে এসেছে এইসব, তারপর রৌদ্রিক নিজেই চায় না তূর্ণা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাক। আর পাঁচটা মানুষের মত বুঝদারের মত ব্যবহার করুক।

তূর্ণার বাচ্চাগুলোকে সে আপন করে নিয়েছে, তাই তার কাছে তূর্ণা যে রূপে তার ঘরে এসেছিল। তূর্ণার সেই রূপটাই তার মন আঁকড়ে ধরেছে। সে চায় তূর্ণা যেমন আছে তেমনই থাক তার নিকট। তার কাছে আবদার করবে সেটা পূর্ণ করবে। মেয়েটার চাওয়া খুবই সীমিত, অল্পতেই খুশি হয়ে যায়। তূর্ণার হাতের আঙ্গুল গুলো রোদেলার চুলের মাঝে বিলি কেটে দিচ্ছে, এতে করে রোদেলা আরও আরাম পেয়ে তূর্ণার বুকের সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছে। রৌদ্রিক তাকিয়ে নিঃশব্দে দেখলো সেই দৃশ্য। তার গম্ভীর দৃষ্টির অন্তরালে অদ্ভুত কোমলতা জমাট বাঁধলো। কিছু মুহূর্ত এমন হয়, যেগুলোকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল অনুভব করা যায়। রৌদ্রিক অনুভব করলো, তার দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গ, শীতল অস্তিত্বের মাঝে এই দুই নারী কেমন করে উষ্ণতার ক্ষুদ্র প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
তূর্ণা আবার জানালার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দিলো। দূরে কোথাও সমুদ্রের অন্ধকার গর্জন শোনা যাচ্ছে। তার চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠলো শিশুসুলভ আবেগে।

দিবাভাগ আজ সমুদ্রের বুকে এক অপার্থিব বিষণ্ন সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি বারংবার আছড়ে পড়ছে বালুকাবেলায়, সৃষ্টি করছে এক অন্তহীন গর্জনের মূর্ছনা। লবনাক্ত বাতাসের শীতল স্পর্শে চারপাশে এক অদ্ভুত মুক্তির আবেশ ছড়িয়ে পরেছে। তূর্ণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের সম্মুখভাগে। তার বিস্ফারিত চোখদ্বয়ে এমন এক শিশুসুলভ বিস্ময়, যেন সে কোনো বাস্তব দৃশ্য নয়, বরং বহুদিনের কল্পনায় লালিত কোনো রূপকথাকে প্রত্যক্ষ করছে। বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে তার খোলা চুল, গায়ে জড়ানো কালো রঙে লং ফ্রক, গলায় পেঁচানো ওড়নাটা বারংবার উড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরছে তাকে।
“ এত… এত বড় পানি…!!”
মুগ্ধ বিস্ময়ে উচ্চারিত বাক্যটুকু শুনে পাশে দাঁড়ানো ছোট্ট রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। সারা রাত জার্নি করে আসায় সারা সকাল জুড়ে তিন জনই রেস্ট নিয়েছে, দুপুরের পর বের হয়ে হেঁটে হেঁটে তিনজন সবটা ঘুরে দেখেছে। রৌদ্রিকের অনেকবার আসা হয়েছে এখানে তাই সবকিছুই চেনা তার।

“ এটা পানি না… সমুদু!”
তার অস্পষ্ট উচ্চারণে ‘সমুদ্র’ শব্দটাও যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। রোদেলার গায়েও কালো রঙের ফ্রক জড়ানো। চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে দেওয়া।
তূর্ণা ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো রোদেলার সামনে। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বললো-
“ সমুদু কি রাগ করে?”
“ জানি না মা।”
মুহূর্তেই হেসে উঠলো তূর্ণা। সেই হাসি ছিল সম্পূর্ণ নির্মল। হঠাৎই এক দুষ্টু ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো তাদের পা।
“ আহ্!”
চমকে উঠে রোদেলাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো তূর্ণা। আর রোদেলা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
“ আরেকটা আতবে! আরেকটা!”
“ না না! এটা আমাদের টেনে নিয়ে যাবে।”
“ না! আমি আচি তো!”
শিশুসুলভ আত্মবিশ্বাসে বলা কথাটুকু শুনে তূর্ণা আবারও হেসে উঠলো। তারপর রোদেলার হাত শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে জলের আরও কাছে এগিয়ে গেলো। ঢেউ এসে বারবার আছড়ে পড়ছে তাদের পায়ে, আর প্রতিবারই তূর্ণার মুখে ফুটে উঠছে নতুন বিস্ময়। যেন পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৌন্দর্যও তার কাছে এক অলৌকিক আবিষ্কার। এই প্রথম নীল রঙের পানি দেখছে, পানি অনেক সচ্ছ হওয়ায় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পানি এসে দুইজনের পা ভিজিয়ে দিচ্ছে, তূর্ণা আর রোদেলা এক মনেই খেলায় ব্যস্ত হয়ে পরেছে।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছে রৌদ্রিক। তার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। সমুদ্রের বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চুল। অথচ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধুমাত্র সেই দুই মানুষের উপর,একজন রক্তের সম্পর্ক, আরেকজন অদ্ভুত ভাগ্যের টানে জড়িয়ে পড়া। তূর্ণাকে এভাবে হাসতে সে খুব কমই দেখেছে। রোদেলা হঠাৎ দূর থেকে চিৎকার করে উঠলো-

“ পাপা! তুনিও আশো!”
রৌদ্রিক মৃদু হাসলো। সেই হাসি এতটাই ক্ষীণ যে অনভ্যস্ত চোখে ধরা পড়ার কথা নয়।নতূর্ণা এবার শিশুর মতো হাত নেড়ে বললো-
“ আসুন না… দেখুন, সমুদ্র রাগ করেনি।”
রৌদ্রিক ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলো। রৌদ্রিক আসতেই রোদেলা তার ছোট্ট হাতটা দিয়ে রৌদ্রিকের বিশাল হাতটা টেনে ধরলো, অন্যহাত দিয়ে তূর্ণার হাত ধরে রয়েছে। রোদেলা ছোট পা দিয়ে পানির মধ্যে লাফিয়ে উঠছে।
“ পাপা অনেত মজা!”
রৌদ্রিক হালকা হাসলো মেয়ের কথায়। রোদেলা এবার হাত ছেড়ে দিয়ে, ছোট হাতে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিতে থাকে তূর্ণা আর রৌদ্রিকের দিকে।

“ ওরে দুষ্টু দাঁড়াও তোমাকেও মজা দেখাই।”
বলেই তূর্ণা হালকা পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝেই আবারও সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এলো। রৌদ্রিক দক্ষ হাতে রোদেলাকে তুলে নিলো, যার অন্যহাত ধারা একই ভাবে তূর্ণার কোমড় আঁকড়ে ধরে উঁচু করে নিলো। রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। বড় ঢেউয়ের স্রোতটা রৌদ্রিকের হাঁটুর নিচ অব্দি ভিজিয়ে দিলো। পানি এখন অনেকটা ঠান্ডা,তাই ভিজতে দিলো না সে। কিছু সময় পর পানি আবারও নেমে যেতেই রৌদ্রিক নামিয়ে দেয় দুইজনকে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩১

অনেকটা সময় তিনজন সেখানে সময় কাটিয়ে, রৌদ্রিক আর তূর্ণার মাঝে রোদেলা দুই পাশে দুইজনের হাত আকড়ে সমুদ্রের ধারে হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছে। তিনজনই নানা কথায় মগ্ন, আর সেই সময়ের অস্তগামী সূর্যের ম্লান আভা এসে পড়লো তিনটি মানুষের উপর। যেন সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে নীরবে আশীর্বাদ জানাচ্ছে তাদের। দূর থেকে কিছু মানুষ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, কি অপরূপ লাগছে তিনজনকে! রোদেলা দুইজনের হাত ধরে হাঁটছে আর তোতাপাখির মত কথা বলে মজিয়ে রেখে। সচ্ছ নীল জলে তিনটি উম্মুক্ত পা হেঁটে চলেছে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৩