Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭
ফাহিমা ইসলাম

সারাদিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছে গোটা ধরণী৷ রাতির কোলে ঢলে পরেছে সকল কান্তি, গ্লানি। দূর থেকে ভেসে আসা হাসনাহেনার সুগন্ধে মাতোয়ারা চারিপাশ। শুভ্র চন্দ্রাটা জ্বলজ্বল করছে। বয়ে চলা দমকা হওয়ায় তালে নিজের নেত্রদ্বয় বুঝে হাসনাহেনার গন্ধ দিতে ব্যস্ত তূর্ণা। দূর আকাশের অর্ধচন্দ্র নিস্তব্ধতার গায়ে রূপালি বিষাদ মেখে দিয়েছে। মৃদুমন্দ বাতাস তার দীর্ঘ কেশরাশিকে অবিন্যস্ত করে বারবার মুখের ওপর ছড়িয়ে দিচ্ছে। সারাদিনের এতো এতো ব্যস্ততার পর একটু নিরিবিলি ভাবে শ্বাস নেওয়ার সময় হয়েছে। শুধু সেই না বাড়ির সবাই একই ভাবে কান্ত আজকে, বাড়িতে আসা মানুষদের মেহমানদারি করায়। রোদেলা, রোদ্দুর, রোদেশী তিনজনই আজ গভীর নিদ্রামগ্ন। একটু আগে মেয়েকে খাইয়ে এসেছে, রোদেশী সবচেয়ে শান্ত৷ তার পেট ভরা মানেই সে শুধুই ঘুমাবে। ঘুম ছাড়া তার দুনিয়ার আর কোনো চিন্তা নেই। পে’টের সে’লাই আস্তে আস্তে ঠিক হচ্ছে, একমাস হচ্ছে তবুও আগের থেকে অনেকটা ভালো হয়েছে। নাহলে আগে ঠিক মতো হাঁটা-চলা করাটও তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিলো। এখন বাচ্চাদের ব্রেস্ট ফিডিং করাতে এতো একটা সমস্যা হয় না। ঠিক সেই মুহূর্তেই নীরব পদচারণায় তার পেছনে এসে দাঁড়ায় রৌদ্রিক।

“ এই সময়টা তোমার আর আমার তূর্ণা।”
বলেই পরম মমতায় পিছন থেকে নিজের দৃঢ় বাহুদ্বয় বিস্তার করে তূর্ণাকে আগলে নিলো। যেন পৃথিবীর সমস্ত অশান্তি, সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত দুঃখ তার এই আলিঙ্গনের প্রাচীর ভেদ করে কখনোই তূর্ণার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। তূর্ণার পিঠ এসে মিশে যায় রৌদ্রিকের প্রশস্ত বক্ষের উষ্ণতায়। দুই দেহের মাঝখানে আর কোনো দূরত্ব নেই। থাকে এক মুহূর্তের জন্য তূর্ণা চোখ বুজে ফেলে,এই আশ্রয়টুকু তার চিরচেনা। এই হৃদস্পন্দন, এই নিঃশ্বাসের উষ্ণতা, এই নিশ্চিন্ত নিরাপত্তা সবই যেন তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। রৌদ্রিক ধীরে ধীরে নিজের থুতনি তূর্ণার কাঁধে ঠেকিয়ে চোখ মুদে নেয়। বাতাসে ভেসে আসে তূর্ণার চুলের পরিচিত সৌরভ। দমকা হওয়ায় দোল দিচ্ছে তূর্ণার কেশরাশিরা।
“ বহুদিন আমার পিচ্চি বউটা যত্ন নেওয়া হয়না ঠিক মতো।”
তূর্ণা খানিকটা লজ্জাবোধ করলো, লজ্জাবতী ফুলের ন্যায় নুইয়ে পরলো সেও। হালকা লজ্জা মাখা হেসে উত্তর দিলো-
“ ইসস আমি আর পিচ্চি আছি বুঝি? তিন বাচ্চার মা আমি বুঝলেন বুড়ি বর মশাই?”
রৌদ্রিক খানিকটা হাসলো, অতঃপর আরও গাঢ় ভাবে জড়িয়ে নিলো তূর্ণাকে। তূর্ণার কোমল গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে হালকা ফিসফিয়ে বলে-
” বুড়ো হয়েই তিন বাচ্চার মা বানিয়ে দিয়েছি, তাহলে ভাবো জুয়ান হলে কয়টা বাচ্চার মা হতে।”
তূর্ণার লজ্জায় স্তব্ধ হয়ে গেলো হয়তো। মাঝে মাঝে রৌদ্রিকে এমন আলাদা রূপের সঙ্গে সে খুবই কমই পরিচিত।

” ছিঃ কিসব বলছেন!”
“ কিসব বলছি?”
“ এই যে এইসব!”
“ এইসব কি?”
“এ..এইসব..ইসস ধূর!”
তোতলালো তূর্ণা লজ্জায়। রৌদ্রিক হাসলো নৈঃশব্দে, হঠাৎ করেই তার কিছু অবাধ্য ইচ্ছে জাগলো। নিজের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের থেকে বেরিয়ে এলো, তূর্ণার নরম গ্রীবাদেশে ছোট ছোট চু’মুর বর্ষন বইলো। তূর্ণা যেনো বরফের ন্যায় জমে গেলো। নড়ার মতো শক্তি তার মধ্যে অবশিষ্ট রইলো না। লজ্জায় মাথাটা নত হয়ে এলো, রৌদ্রিকের হাতটা অবাধ্য ভাবে তার সারা উদর জুড়ে বিচরণ করছে। না চাইতেও তূর্ণা ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠলো। নাকের ডগায় না চাইতেও স্বেদবিন্দু জমা হয়েছে, নিজেকে কেমন ছন্নছাড়া পাগল মনে হলো। দূরে সরতে চাইলো সেটা দেখে রৌদ্রিক ধীর স্বরে বলে-
“ আদর চেতে চেতে কেঁদে ভাসায় এখন আবার দূরে যাও কেনো পিচ্চি?”
তূর্ণার নিকট প্রতুত্তরে কোনো জবাব রইলো না৷ অতীতে করা নিজের বোকামিগুলো হারে হারে আজকে নিয়ে টের পাচ্ছে, আসলে কতটা নির্লজ্জের মতো কাজ করেছিলো৷ রৌদ্রিক বলেই হয়তো তাকে বেহায়া উপাধি দেয়নি। এইসব ভাবতেই আরে দফা তূর্ণার কান গরম হয়ে এলো। হঠাৎ ই হালকা আর্তনাদ করে উঠলো তূর্ণা, তার কানের লতিতে রৌদ্রিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কা’মড় বসিয়েছে। তূর্ণা সরে আসতে চাইলেও পুরুষালী শক্তির কাছে তার শক্তি নিতান্তই তুচ্ছ!

“ বা..বাচ্চারা ভিতরে কিন্তু!”
“ এখানে তো নেই।”
“ আপনি এমন না।”
“ আমি সব রকমই হতে পারি।”
“ আমার কেমন কেমন লাগছে!”
“ স্বামীর সোহাগে সব স্ত্রী’রা লজ্জাবতী ফুল হয়ে ওঠে।”
তূর্ণার আর কিছু বলতে পারলো না তার আগেই পুরুষালী
অতঃপর রৌদ্রিক ধীরে মুখ এগিয়ে আনলো। তূর্ণা খিঁচিয়ে চোখ বুজে তার সমস্ত অনুভূতি সমর্পণ করে সেই ক্ষণস্থায়ী অথচ অনন্ত হয়ে থাকা সান্নিধ্যে। তাদের অধর পরস্পরকে ছুঁয়ে যায় এক নিবিড়, স্নিগ্ধ চুম্বনে যেখানে কোনো অস্থিরতা নেই; আছে কেবল পুনর্মিলনের প্রশান্তি, গভীর মমতা, আর বহুদিনের না-বলা ভালোবাসার নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।

সময়ের অদৃশ্য রথচক্র কখন যে ঋতুর পর ঋতু পেরিয়ে যায়, তার হিসাব রাখে না কেউ। কেবল একদিন আচমকাই উপলব্ধি হয় দেয়ালের ক্যালেন্ডার বদলেছে বহুবার, উঠোনের কদমগাছ নতুন পল্লবে সেজেছে, আর জীবনের গল্পে নিঃশব্দে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি অধ্যায়।
সংসার নামক বিস্তীর্ণ মহাকাব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর রৌদ্রিক কিংবা তূর্ণা একা নয়; তাদের ভালোবাসারই রক্তমাংসের তিনটি অলৌকিক প্রতিরূপ ঘিরে রেখেছে সমগ্র গৃহকে। রোদেলা এবার চার বছরের হয়ে গেছে, চোখের সমানেই দিন পেরিয়েছে আর ছোট্ট রোদেলা একটু একটু করে বড় হয়েছে। সে কয়েকদিন পর স্কুল যাবে, নতুন বছর শুরু হলেই। তার দিন কাটে সারা বাড়িতে চড়ুই পাখির মতো কিচিরমিচির করে। ভাই-বোন কে নিয়ে তার আহ্লাদের শেষ নেই৷ কাউকে ধরতেও দিবে না সে, ধরলেই বলবে।

“ওরা আমার বেবি।”
তার সেই সরল উচ্চারণে এমন এক নির্মল অধিকারবোধ মিশে থাকে, যা ভাষার অভিধানে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব।
অপরদিকে তিন মাস বয়সী রোদ্দুর ও রোদেশী যেন এখনো পৃথিবীকে শব্দ দিয়ে নয়, অনুভূতির আলোয় চিনতে শিখছে৷ রোদ্দুরের দুটি কৌতূহলী নয়ন সর্বদা বিস্ময়ে দীপ্ত। সবচেয়ে বেশি সেই জ্বালায়, একটু দেরি হলেই কেঁদে ভাসায়। মায়ের কণ্ঠস্বর কিংবা পিতা বা বড় বোনের পদধ্বনি কানে এলেই তার ক্ষুদ্র দুটি হাত অকারণেই বাতাসে ছটফটিয়ে ওঠে। গোলাপি আঙুলগুলো বারবার মুঠো হয়, আবার খুলে যায়। আনন্দের আতিশয্যে কখনো দুটি পা একসঙ্গে ছুড়ে দেয় শূন্যে, কখনো অস্ফুট কূজন তোলে-
“আহ্… ইই… গুঁ…”

তারপর নিজের সেই অস্পষ্ট ধ্বনিতেই যেন নিজেই বিস্মিত হয়ে ওঠে। মুহূর্ত পরেই ফুটে ওঠে এক অপার্থিব, দাঁতহীন হাসি; সেই হাসির নির্মলতায় যেন সমগ্র সংসারের ক্লান্তি এক নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। রোদেলাও বেশ আহ্লাদী হয়ে পরে ভাইয়ে উপর। তারা দুইজন কেঁদে ভাসালে রোদেলার আজহারির শেষ নেই৷ তারা কেনো কাঁদে? কেনো কাঁদবে? তাদের কে কি বলেছে সবকিছু জারি করে বেরাবে । রোদেশী আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সে ঘুম প্রিয় মানুষ তাকে দিন বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঘুমিয়ে কাটাতে দেখা যাবে। মন যখন বেশি ভালো থাকে বড় বোন বা বাবার সঙ্গে খেলবে। আনন্দের সঙ্গে অদ্ভুত,উল্লাসে ভরা শব্দ করবে-
“আহ্…. গুঁইই…!!”

রোদ্দুর আর রোদেশীকে পাশাপাশি শুইয়ে রাখলে তাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টি একসময় একে অপরের মুখে গিয়ে স্থির হয়। তারপর কোনো অদৃশ্য যোগাযোগের সূত্রে হঠাৎই দু’জন একসঙ্গে হাত-পা ছুড়তে শুরু করে। একে অপরের আঙুল স্পর্শ করেই আবার অকারণেই হাসির মতো শব্দ তোলে। মনে হয়, মাতৃগর্ভের নীরব সখ্য আজও তাদের আত্মার গভীরে অমলিন রয়ে গেছে। আবার কখন নিজেরাই নিজেদের চুল ধরে ঘর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠবে৷ তূর্ণা এদের সামলাতে সামলতে হিমশিম খায়, তাকে অবশ্য শুধু তাদের খাওয়ার সময়ই দরকার হয়৷ এছাড়া বাড়ির সবার কাছে থাকবে, সায়রা একবছর হয়েছে। বাড়িতে চার চারটা বাচ্চা হওয়ায় কারো আহ্লাদের শেষ নেই। ভরা সংবাদ এখন সিকদার বাড়ির। রিনির বিয়ের আয়োজন চলছে, সামনের সপ্তাহ থেকে বিয়ের যাবতীয় অনুষ্ঠানে শুরু হবে৷ কালকে রোহান ফিরবে লন্ডন থেকে। রিনির পরের বিয়ের আসনটা হবে রোহানের৷ রিনির বিয়ে নিয়েয়ি তোরজোর চলছে সবার, বিয়ের শপিং সেই আরও একমাস আগে শুরু করা হয়েছে এখনো শেষ হয়নি। বাড়ির একমাত্র মেয়ের বিয়ে তাই সিকদার পরিবার বেশ জমজমাট করেই মেয়ের বিয়ে দিবেন।

বিকেলের শেষ প্রহর এখন আপন মহিমা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়ে সন্ধ্যাতরীর হাতে পৃথিবীর ভার সমর্পণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। বিছানার মাঝবরাবর পাশাপাশি শুয়ে রোদ্দুর আর রোদেশী। দুধসাদা নরম তুলতুলে গালদুটো নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামায় কাঁপছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঙুলগুলো আধো মুঠোয় আবদ্ধ। নিদ্রা যেন তাদের চোখের পাতায় আশীর্বাদের চুম্বন এঁকে দিয়ে গেছেন। যুগল সন্তানের সেই নিষ্পাপ মুখাবয়ব দেখলে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই অর্থহীন বলে প্রতীয়মান। ঠিক তাদের সামনেই একপাশে পিঠ সোজা করে বসে আছে রোদেলা। দীর্ঘ কৃষ্ণকেশ অবিন্যস্ত হয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে পিঠ অবধি। বিকেলের সোনালি আলো জানালার ফাঁক গলে সেই কেশরাশির উপর এসে পড়তেই মনে হচ্ছে, কৃষ্ণঘন মেঘের বুক জুড়ে সূর্য নিজের শেষ সোনালি অক্ষরগুলো লিখে রেখে গেছে। রৌদ্রিক নীরব পদক্ষেপে এসে তার পেছনে বসে। এক হাতে আলতো করে রোদেলার সমস্ত চুল একত্র করে নিলো, অন্য হাতে ধীরে ধীরে জট ছাড়াতে থাকে। তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল অসীম মমতা; যেন চুল নয়, সে ছুঁয়ে দেখছে নিজের সমগ্র পৃথিবীটাকে। রোদেলা মৃদু হাসল।

” পাপা পাকে ঘুরতে যাবো।”
” আচ্ছা নিয়ে যাবো ”
” পাপা এত্তোগুলা টয় কিনবো।”
” আচ্ছা কিনে দিবো ”
” পাপা একটু আইসকিলিম খাবো।”
” ওটা হবে না, কালই খেয়েছো।”
রোদেলা মুখ ফুলালো, সে তো ইচ্ছে করে এতোকিছু বলছি যাতে রৌদ্রিক হ্যাঁ বলতে বলতে এটাতেও হ্যাঁ বলে ফেলে৷ রৌদ্রিক মেয়ের চালাকি জানে তাই ক্ষুন্ন হাসলো।
” পাপার সঙ্গে চালাকি করতে হলে আরও বড় হতে হবে রোদকে।”
বাক্যটি শেষ করেই সে আবার মনোযোগ দিল কেশবিন্যাসে। অনভ্যস্ত পুরুষালি আঙুলে নিখুঁত বেণী গাঁথায় দক্ষ হয়ে উঠেছে, প্রতিটি পাকের ভাঁজে ভাঁজে নিবিড় স্নেহের পরশ মিশে আছে। রোদেলা স্থির হয়ে বসে রইল। চোখ দুটো আধবোজা। বাবার আঙুলের কোমল ছোঁয়ায় তার ঘুম এসে পরছে। বেণী গাঁথা শেষ করে রৌদ্রিক আলতো করে গোলাপি ফিতেটা বেঁধে দিল। তারপর দু’হাত দিয়ে মেয়ের মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে নিজের দিকে আনল। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।

” আমার বড় রাজকন্যাকে একদম বার্বিডল লাগছে।”
রোদেলার দুটি নয়ন মুহূর্তেই চিকচিক করে উঠল। সে খুশিতে নিঃশব্দে বাবার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরল তাকে। রৌদ্রিকও দুই বাহু বিস্তার করে মেয়েকে নিজের বক্ষের গভীরে আগলে নিল। এইদিকে রোদ্দুর ঘুমের মাঝেই মুখটা নাড়িয়ে তুলছে, মনে হচ্ছে সে দুধ পান করছে। খাওয়াড সময় যেমন করে রাখে মুখটা এখন ওমনই করছে। সেটা দেখে রোদেলা রৌদ্রিকের বুক থেকে উঠে তাদের সামনে গিয়ে শুয়েই পরলো, তারপর হাতের উপর ভর দিয়ে থুতনিটা রাখলো। দুইজনকে দেখতে দেখতে রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ওরা একদত আমাল বার্বিডলের মতো। এত্তো এত্তো তুন্দল! কি তুন্দল করে খালি ঘুমায়। ওরা বড়ো কবে
হবে পাপ?”
মেয়ের কথায় হালকা হাসলো রৌদ্রিক।

“ হয়ে যাবে আস্তে আস্তে তুমি যেভাবে বড় হচ্ছো।”
” ওরা বড় হলে আমরা অন্নেক ঘুরবো, খেলবো।”
“ আচ্ছা খেলিও।”
“ পাপা একটা তলটেল দাও পিলিজ!”
“ হবে না কালকে কয়টা খেয়েছো ভুলে গেছো?”
রোদেলা নাক ফুলালো, নাক ফুলিয়ে অভিমানী স্বরে বলে-
“ এমন করো কেনু? আমায় ভালুইবাসো না তুমি পাপা!”
” দাঁতে পোকা লাগলে পরে সবাই বলবে রোদেলার দাঁত নেই। তখন কি হবে? লজ্জায় বের হবে কিভাবে?”
“ তাই তো এত্তু খাবো, বেশি না ইত্তু দেখো..”
বলেই নিজের হাত দ্বারা দেখাতে লাগলো। সেটা দেখে রৌদ্রিক হেসে ফেললো, এরমধ্যেই রোদ্দুরের কান্নার শুরু হয়ে গেলো। চোখ-মুখ কুঁচকিয়ে কেঁদে উঠলো সে হাত-পা ছুড়িয়ে।
“হুঁ… হুঁ… উঁ… উঁ…!”
রৌদ্রিক দ্রুত এসে ছেলেকে তুলে নিলো। রোদেলাও ব্যস্ত হয়ে পরলো ভাইয়ের কান্না দেখলে। রৌদ্রিক ছেলেকে কোলে নিয়ে দুলাতে লাগলো।

“ কি হয়েছে আমার ছোট রোদের? কাঁদে কেনো? খিদে পেয়েছে ছুট্টু পেটে বুঝি?”
রোদেলা দৌড়ে বাহিরে চলল গেল তূর্ণাকে ডাকতে। সে রিনির সঙ্গে তার বিয়ের নিয়ে ব্যস্ত। রোদেলা কিছুখনের মধ্যেই তূর্ণাকে টেনে আনলো। এনেই রাগি স্বরে বলে-
“ আমার ভাই কাতে খিদে পেয়েছে, ওকে খাওয়া৷ একতম বাহিরে যাবে না হুম!”
রোদেলা একদম তার বাবার মত কথাটা বললো।তূর্ণা এগিয়ে এসে রৌদ্রিকের কাছ থেকে রোদ্দুরকে কোলে নিলো। এখন যদি না থামায় বাপ-বেটির মুখের দিকে তাকানো দায় হয়ে দাঁড়াবে।
“ কি হয়েছে বাবা? এতো কাঁদো কেনো? পেট এতো তাড়াতাড়ি খালি হয়ে গেলো আমার বাবার?”
“ খালি তো হবেই, সারাদিন রুমের বাহিরে কি?ঘরে বর-বাচ্চা নেই তোমার?”
রৌদ্রিক গম্ভীর স্বরে কথাটা বললো।
“ সবই আছে তাই বলে এখন কি বাহিরেও যাবো না আমি।”
“ না যাবে না, ওরা যখন ঘুমাবে তখন আশেপাশে থাকবে। জানো না রোদ্দুরের খিদে পায়।”
তূর্ণা মুখ ফুলালো, ছেলেকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলে-
“ আমার মেয়ে দু’টো ভালো, ও কার মতো হয়ে?”
” কার আবার তোমার মতো, ছিঁচকাঁদুনে।”
তূর্ণার আর বললো না কিন্তু মুখ ফুলালো, রোদেলা ভাইকে শান্ত হতে দেখে সে সায়রার কাছে চলে গেলো।

“ মলম লাগিয়েছো?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণার চোখটা বড় বড় হয়ে এলো। জিহ্বায় কামড় বসালো। তার একদমই মনে নেই, চোরা দৃষ্টিতে রৌদ্রিকের পানে চেতেই রৌদ্রিকের মুখখানি আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। ড্রয়ার থেকে মলমটা এনে সামনে বসলো, কোনো দিক বিবেচনা ছাড়াই রৌদ্রিক তূর্ণা উদর থেকে শাড়ি সড়িয়ে ফেললো। রোদ্দুর খাওয়ার মাঝেই বাবাকে দেখে হাসলো, তার চোখ দু’টো হেসে উঠলো। হাত নাড়িয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করলো। রৌদ্রিক ছেলের আনন্দ দেখল হাসলো। তূর্ণা ঢাকতে চাইলো নিজেকে।
“ আমি দিয়ে নিবো।”
” হাত সরাও, দ্বিতীয়বার বলবো না আর।”
রৌদ্রিকের এমন হালকা রাগী রাগী কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে তূর্ণা সাহস করলো না কথা বরানোর। হাতটা সরাতেই রৌদ্রিক কা’টা শুঁকিয়ে যাওয়া জায়গাটাতে মলম লাগাতে শুরু করলো। হালকা জ্বালা-পোড়া করছে! তূর্ণা চোখ বন্ধ করে রাখলো। সিজারের জায়গায় আঘাত পাওয়ায় আবার জায়গাটা কেমন হয়ে গেছে, এইদিকে রোদ্দুর খেতে খেতে পা দোলাচ্ছে৷ তার আনন্দ যেনো সইছে না, সে পা ছটপটানি বাড়িয়ে চলেছে। এরকম করতে করতে হঠাৎ রোদ্দুরের দ্রুত গতিতে নড়তে থাকা পা’টা তূর্ণার পে’টে আঘাত প্রাপ্ত জায়গায় লাগতেই নিবে তার আগেই রৌদ্রিক চট করে ছেলেটার নরম ক্ষুদ্র পা’টা আলতো করে ধরে ফেলে।

“ এমন করে না আব্বাজান, তোমার মা এমনি একটা ফাঁকিবাজ তারউপর আবার যদি আঘাত দাও পরে পাপাকেই ভোগান্তিতে পরতে হবে।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রোদ্দুর খাওয়া ছেলে ফোকলা হেসে উঠলো বাবার পানে চেয়ে।
“আগু… আগু.গু… গু…!!”
এরমাঝেই রোদেশীর সারা মুখশ্রী কুঁচকে এলো৷ তারও ওঠার সময় হয়ে এসেছে সেটা দেখে রৌদ্রিক আস্তে করে মেয়েকে তুলে নিলো। রোদেশী বাবার কোল পাওয়া মাত্রই জড়িয়ে গেলো তার বুকে। আস্তে আস্তে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো সে।

” ছোট আম্মাজানের দেখাই যায়। এতো ঘুম আম্মাজানের বুঝি? একটু উঠতে হয় না বুঝি?”
“ আমার ছোট্ট আম্মাজানটা এতো শান্ত কেন? একটু তো দুষ্টুমি করতে হবে নাকি?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রোদেশীর মুখে এক হাসি ফুটে উঠলো। হাসিটা একদম রৌদ্রিকের মতো, রৌদ্রিক মেয়েকে হাসতে দেখে ছোট ছোট চুমুতে ভড়িয়ে দিলো। সেটাতে রোদেশী বড্ড খুশি হলো। সে হাত-পা নাড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। এইদিকে রোদ্দুর ঠোঁট উল্টালো৷ মানে তাকেও নিতে হবে নাহলে সে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে, সেটা দেখে তূর্ণা বলে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৬

” সবগুলো বাপের দুলাল আর দুলালি হয়েছে। এইযে ওনাকে নিন কেঁদে দিলো বলে।”
বলেই ছেলে আলতো করে এগিয়ে দিলো সে৷ রৌদ্রিক দুই বাহুতে রোদেশী আর রোদ্দুরকে আগলে নিলো। রোদ্দুরের কান্না থেমে গেলো মুহুর্তেই৷ তূর্ণা মাঝে মাঝে মনে হয় সে কোনো দায়িত্বই পালন করে না খালি খাওয়ানে ছাড়া। তিনজনকেই রৌদ্রিক একাই আগলায়৷ বাচ্চাগুলোও বাবার কাছে গেলে সবচেয়ে খুশি আর শান্ত বাচ্চা৷ হসপিটালের গেলে তখন সবার কাছেই থাকে, বাবা থাকলে তাদের আর কাউকে লাগবে না। পেটে টান পরলে মায়ের কথা মনে আসবে তাদের।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here