অস্তরাগের রঙ পর্ব ১০
তেজরিন উম্মীদ
এইচএসসি পরীক্ষার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে।পরীক্ষা এসে রুশদীর দরজায় কড়া নাড়ছে।মাঝখানে বেশ কয়েকটা দিন পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল সে। বইয়ের পাতা উল্টে দেখাও হয়নি এতদিন। কিন্তু এখন আর ফাঁকিবাজি করলে চলবে না। সম্পূর্ণ দমে পড়াশুনা শুরু করতে হবে। গোল্ডেন প্লাস তো বটেই, ভালো গ্রেড না এলে রুশদীর জীবন যেন এক লহমায় তছনছ হয়ে যাবে। এতদিনের খাটুনি আর স্বপ্নগুলো সে অংকুরেই নষ্ট হতে দিতে চায় না।
দীর্ঘ বিশ দিন পর আজ কলেজে পা রেখেছে রুশদী। মনের গহীনে এক নতুন জেদ,এখন থেকে প্রতিটি সেকেন্ড হবে হিসেবি। এর জন্য, আজ তার চিরশত্রু লুৎফর স্যারের অখাদ্য গণিত ক্লাসটাও সে আজ গিলছে প্রচণ্ড মনোযোগ দিয়ে। লাস্ট কবে সে লুৎফর স্যারের ক্লাসে এতটা মনোযোগী ছিল, আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।
রুশদীর পাশে বসা তিথি। তবে তার মনোযোগ যেন সাত আসমানের ওপারে ডানা মেলেছে।রুশদীর সাথে সে একায় অবিরাম পকপক করে যাচ্ছে। রুশদী পুরোপুরি ক্লাসে মগ্ন থাকলেও বান্ধবীর মন রক্ষার্থে মাঝেমধ্যে যন্ত্রের মতো ‘হু-হা’ করে মাথা নাড়াচ্ছে। তিথি বোকা নয়, রুশদীর এই মেকি মনোযোগ ধরে ফেলে সে বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করে একটা মৃদু ধাক্কা দিল রুশদীকে।
“আরে শোন না! দারুণ ইয়াম্মি একটা খবর আছে,”
ফিসফিস করে বলল তিথি।
রুশদীর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় তিথির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে বলবি তো?”
তিথি একরাশ উত্তেজনা চেপে রেখে বলল,
“তুই তো এখন এই ‘এস.কে’ (SK) ইনস্টিটিউশনের কুইন হয়ে গিয়েছিস রে! জানিস সেটা? ওই যে হিংকু কুটনিগুলো তোকে নিয়ে হিংসা করত,ওরা এখন দেখবে আর জ্বলবে লুচির মত ফুলবে। ”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে বলল, “ধোঁয়াশা রেখে কথা বলিস না তো, সরাসরি বল কী বলতে চাচ্ছিস?”
“তুই জানিস এই স্কুলটা আসলে কার?” তিথির প্রশ্ন।
“হ্যাঁ জানি তো, যার নামে স্কুল—ঐ এস.কে সাহেবের,” রুশদীর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“আরে গাধী, তুই কি জানিস এই ‘এস.কে’ কারা?”
রুশদী কোনরকম আগ্রহ ছাড়াই বলল, “কে?”
তিথি এবার সেই রকম হাসি হেসে বলল,
“এরা হলো খান ফ্যামিলি। খান পরিবারের সবার নামের আদ্যক্ষর ‘S’ আর পদবী ‘Khan’। সংক্ষেপে ‘SK’। এক কথায় বলতে গেলে,তোর শ্বশুরমশাই —মাননীয় মন্ত্রী শেহজাদ খানের স্কুল এটা! এবার বুঝলি তো তোর পাওয়ার কতখানি?”
রুশদী কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। অবিশ্বাসের সুরে বলল, “আসলেই?”
“একদম পাক্কা খবর। এবার দেখবি ওই চুন্নিগুলো তোকে দেখলে কেমন মুখ লুকিয়ে থাকে।”
রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে একটু উদাসীন গলায় বলল, “ধুর! বাদ দে ওদের কথা। ওরা ওদের মতো থাক, আমরা আমাদের মতো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা হুট করে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। রুশদী আর তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই যান্ত্রিকভাবে সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। সামনে তাকিয়ে দেখল স্বয়ং প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাসে ঢুকেছেন। স্যারের উপস্থিতিতে সবাই বসার পর রুশদীও বসার উপক্রম করছিল, ঠিক তখনই গমগমে কণ্ঠে শোনা গেল,
“রুশদী!”
নিজের নাম শুনে বিদ্যুতের খাম্বার মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। থতমত খেয়ে বলল,
“ইয়েস স্যার!”
প্রিন্সিপাল স্যার পুরো ক্লাসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বেশ ঘোষণা দেওয়ার ঢঙে বললেন,
“রুশদী তোমাদের ক্লাসমেট ঠিকই, কিন্তু ওর আরও দুটো বড় পরিচয় আছে। ও আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের পুত্রবধূ।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই পুরো ক্লাসরুমে যেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। মুহূর্তের মধ্যে পিনপতন নীরবতা ভেঙে শুরু হলো শোরগোল আর কানাঘুষা। সহপাঠীদের চোখেমুখে তখন বিস্ময় আর অবিশ্বাসের সংমিশ্রণ। সবাই ড্যাবড্যাব করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন তারা কোনো রূপকথার রাজকন্যাকে দেখছে। যে মেয়েটি একটু আগেও সাধারণ ছিল, এক নিমেষে সে পুরো কলেজের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো।
প্রিন্সিপাল স্যারের গমগমে কণ্ঠস্বর পুরো ক্লাসরুমের গুঞ্জনকে এক নিমেষে বন্ধ করে দিল। তিনি বেশ কড়া গলায় বলতে শুরু করলেন,
“ক্লাস কুয়াইট! সবাই শান্ত হও। আজ থেকে একটা কথা মাথায় রাখবে, রুশদীর সাথে তোমরা সবাই অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ করবে। ওর কোনো অসুবিধা যেন আমি না শুনি।”
এরপর তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট প্রানটির দিকে তাকিয়ে স্নেহের স্বরে বললেন,
“শের, যাও তুমি তোমার মম এর কাছে গিয়ে বসো।” লুৎফর স্যারের দিকে ফিরে তিনি যোগ করলেন, “স্যার, শের আমাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের নাতি। ও এখন একটু ক্লাসে ওর মম এর সাথেই থাকবে। ও কোন বিরক্ত করবে না তাই না। ওকে স্যার,ও তাহলে থাকছে!”
লুৎফর স্যার বিনয়ের সাথে মাথা নুইয়ে সম্মতি জানালেন, “জি স্যার, অবশ্যই।”
পুরো ক্লাসের সবকটি চোখ তখন বিস্ময়ে চড়কগাছ। সবার কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে দিয়ে ছোট্ট শের টুপটুপ করে হেঁটে লাস্ট বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। তিথি একগাল হেসে আদরে শেরকে কোলে তুলে নিয়ে রুশদী আর নিজের মাঝখানের জায়গাটিতে বসিয়ে দিল।
যাওয়ার আগে প্রিন্সিপাল স্যার পুনরায় তাগিদ দিয়ে গেলেন, “ওকে ক্লাস, বাই! সবাই এবার পড়াশোনায় মন দাও। এবার কিন্তু আমাদের কলেজ থেকে হানড্রেড পার্সেন্ট জিপিএ-৫ চাই।”
এই বলে তিনি গটগট করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
স্যার বেরিয়ে যেতেই রুশদী ব্রেঞ্চে বসে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে শেরের চোখের দিকে তাকাল। সে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি? তুমি এই অসময়ে আমার ক্লাসে কী করছো শুনি?”
শের তার কচি কচি মুক্তোর মতো দাঁতগুলো বের করে মায়াবী এক চিলতে হাসি দিল। বড়দের অনুকরণে মাথা দুলিয়ে বলল,
“তোমাকে খুব মিস করছিলাম মম, তাই চলে আসলাম। আফটার অল, এটা তো আমার দাদুর স্কুল। আমি যা বলি, এখানে সব নিয়ম তেমন করেই হয়! হি হি!”
রুশদী চোখ-মুখ কুঁচকে শাসনের সুরে বলল, “তা তো বুঝলাম। কিন্তু এখন তো তোমার নিজেরও ক্লাস চলার কথা। তুমি নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমার ক্লাসে কেন?”
শের বেশ স্মার্টলি কাঁধ নাচিয়ে বলল, “নো প্রবলেম মম!”
“প্রবলেম তো আছেই সোনা। তুমি ক্লাস মিস করলে কেন, হুম? পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি আমার একদম পছন্দ না শের, তুমি তো সেটা ভালো করেই জানো।”
রুশদীর কণ্ঠস্বর এবার বেশ কঠিন শোনাল।মম এর এমন বকদ খেয়ে মুহূর্তেই শেরের উজ্জ্বল মুখটা শরতের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। সে অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে নখের ডগা খুঁটতে খুঁটতে খুব নিচু স্বরে বলল, “সরি মম!”
পাশে বসে থাকা তিথি এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে শেরের নরম চিবুক নেড়ে রুশদীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“এই রুশ! তুই পিচ্চিটাকে ওভাবে বকছিস কেন রে একদম কড়া হেডমিস্ট্রেসদের মতো? আহা রে, শের তুমি শোনো,তুমি প্রতিদিন আমাদের ক্লাসে আসবে আর আমাদের মাঝখানে এভাবেই রাজপুত্রের মতো বসে থাকবে, কেমন?”
শের বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু রেখেই বিড়বিড় করে বলল, “নো! মম বলেছে পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি একদম পছন্দ না।”
তিথি এবার রুশদীকে টিপ্পনী কেটে বলল, “তোর মম নিজেই তো একটা আস্ত ফাঁকিবাজ! ওর কথা বাদ দাও তো সোনা, তুমি এই খালামণির কথা শোনো।”
রুশদী মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, “ওরে বাবা! দেখছি মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!”
তিথিও হাসতে হাসতে পালটা জবাব দিল, “মা যখন অকারণে বকবে, তখন মাসির দরদ তো একটু বেশি হবেই।”
রুশদী খেয়াল করল শের সত্যিই খুব মন খারাপ করেছে। ওর ছোট্ট হাত দুটো কোলের ওপর স্থির হয়ে আছে। নিজের ওপরই রাগ হলো রুশদীর।কেন শুধু শুধু ওকে বলতে গেল?এখন তো ওর মন খারাপ দেখে তারও খারাপ লাগছে! সে আলতো করে শেরকে নিজের বাহুবন্ধনে টেনে নিল। একদম নরম সুরে কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“মম এর কথায় খুব মন খারাপ করেছো?”
শের অস্ফুট স্বরে ছোট করে জবাব দিল, “নাহ।”
“তাহলে মাথা নিচু করে এমন করে বসে আছো কেন? দেখি, আমার প্রিন্স এর মুখটা একটু দেখি, তাকাও তো আমার দিকে।”
রুশদী নিজের কোমল দুই হাত দিয়ে শেরের তুলতুলে গাল দুটো ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। তারপর আদুরে কন্ঠে বলল,
“আচ্ছা শোনো, আমরা একটা রুলস করি। তোমার ক্লাস ছুটি হয় সাড়ে এগারোটায়, আর আমারটা সাড়ে বারোটায়। তুমি প্রতিদিন তোমার ক্লাস শেষ করে, আমার ক্লাসে এসে বসবে। কিন্তু নিজের ক্লাস শেষ হওয়ার আগে আসা চলবে না, প্রমিজ? এখন খুশি তো?”
বলেই রুশদী শেরের কপালে পরম ভালোবাসায় একটি ছোট্ট চুমু এঁকে দিল। আদুরে গলায় আবদার করল,
“নাও, এখন একটু হেসো তো দেখি। তোমাকে হাসলে কত কিউট লাগে জানো?”
মম এর এই মিষ্টি অনুমতি আর কপালে সেই উষ্ণ পরশ পেয়ে শেরের মেঘলা মনে যেন এক নিমিষেই হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল। অভিমানের সব কালো ছায়া ধুয়ে মুছে গিয়ে তার সেই পরিচিত মায়াবী হাসিটা আবার ফিরে এল। সে তার সেই চিরচেনা স্টাইলে মুক্তোর মতো সাদা দাঁতগুলো বের হাসল।
স্কুলের ছুটির পর দুপুরের কড়া রোদে আমগাছের ছায়াটা বেশ আরামদায়ক। রুশদী, তিথি আর পুঁচকে শের মাঠের সবুজ ঘাসে জাঁকিয়ে বসেছে। তাদের হাতে ক্যান্টিনের স্পেশাল বার্গার। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছিল, তাই তিনজনেই বেশ আয়েশ করে খাওয়ায় মন দিয়েছে। মাঠ প্রায় জনশূন্য, শুধু দূরে কয়েকটা ফ্রেন্ড সার্কেলের জটলা দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ এক জোড়া জুতো এসে থামল তাদের ঠিক সামনে। রুশদী আর তিথি বার্গারে কামড় দিতে গিয়েও থেমে গেল। মুখ তুলে তাকাতেই বিরক্তির এক চরম শিখরে পৌঁছাল তারা। আর শের? তার ছোট্ট কপালটা কুঁচকে গেল রাগে।
আগন্তুকের নাম ফাহাদ। রুশদী ও তিথির ব্যাচমেট এবং এক সময়ের ত্যক্ত-বিরক্ত করা সেই নাছোড়বান্দা ছেলে, যে রুশদীকে পছন্দ করার নামে রাস্তায় আর কলেজে কম জ্বালানি দেয়নি। রুশদী প তিথি ওকে পাত্তাই দিল না।যেন ওর সামনে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, স্রেফ একটা অকেজো খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। তারা নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বার্গারে মন দিল।
ফাহাদ একটু ঝুঁকে মিনতি করার সুরে বলল, “রুশদী, তোমার সাথে আমার খুব জরুরি কথা আছে। প্লিজ একটু শোনো।”
রুশদী কানে তুলো দিয়ে বসে থাকার ভান করল। সে এতটাই অবজ্ঞা করছে যে ফাহাদ যেন অস্তিত্বহীন। কিন্তু পাশে থাকা তিথির মটকা তো এমনিতেই সবসময় গরম থাকে। বান্ধবীর ওপর এই উটকো উপদ্রব দেখে তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাতের বার্গারটা একপাশে রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ফাহাদ, তুমি আসলেও একটা জাত-ছেঁচড়া! একটা বিবাহিত মেয়েকে এভাবে ডিস্টার্ব করতে তোমার লজ্জা লাগে না? কোন আক্কেলে তুমি এখানে এসেছ? এর আগেও তো তোমাকে ঝাড়ু-পেটা করা বাকি রাখা হয়েছিল, তারপরও শিক্ষা হয়নি? তোমার মতো নির্লজ্জ আর বেহায়া ছেলে আমি দুনিয়াতে দুটো দেখিনি!”
তিথির এই সরাসরি কথার আক্রমণে ফাহাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ওদিকে শের তার ছোট্ট হাতের মুঠো শক্ত করে ফাহাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন সুযোগ পেলেই সে ফাহাদকে উত্তম-মাধ্যম দিবে।
ফাহাদ বিরক্ত হয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তিথি, তুমি প্লিজ আমাদের মাঝে কথা বোলো না তো!”
‘আমাদের মাঝে’ শব্দটা রুশদীর কানে সীসার মতো বিঁধল। সে বার্গারটা সরিয়ে রেখে কঠোর গলায় বলে উঠল,
“আমাদের মাঝে মানে? কথা বলার সময় নিজের সীমা বজায় রেখে কথা বলো ফাহাদ। তোমার সাথে আমার কোনো লেনদেন নেই, দয়া করে এখান থেকে যাও। আমাকে বাধ্য কোরো না তোমার নামে কমপ্লেন করতে। তোমাকে তো বহুবার বলেছি আমি বিবাহিত, তারপরও কেন কুকুরের মতো পিছে পড়ে আছো?”
ফাহাদ নাছোড়বান্দার মতো আবারও অনুনয় করল,
“রুশদী, প্লিজ আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো। আই রিয়েলি লাইক ইউ। তুমি যখন বলেছিলে তোমার ছেলে আছে, আমি বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম আমাকে এড়ানোর জন্য মজা করছো। কিন্তু আজ ক্লাসে যা দেখলাম, আমি সত্যিই শকড! তুমি কীভাবে…”
ফাহাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই শের যেন অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। এই পচা ভাইয়া টাকে সে আগে থেকেই দু-চক্ষে দেখতে পারে না, তার ওপর সে আজ তার মমকে এভাবে বিরক্ত করছে! শের রুশদীর কোলের কাছ থেকে সরে এসে ফাহাদের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। নিজের ছোট্ট তর্জনী উঁচিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,
“এই পচা! তুমি আমার মমকে ডিস্টার্ব করছো কেন? তুমি জানো আমি কে?”
ফাহাদ অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমি জানি তুমি কে। তুমি পিচ্চি মানুষ, একটু সামনে থেকে সরো তো! আমার ওর সাথে জরুরি কথা আছে।”
বলেই ফাহাদ যখন শেরের কাঁধে হাত দিয়ে ওকে একপাশে সরাতে চাইল, শের মুহূর্তেই এক ঝটকায় ফাহাদের হাত সরিয়ে দিল। রাগে বাচ্চার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।শের রেগে একদম লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার মম এর সাথে আরেকবার কথা বলতে চাইলে তোমাকে মেরে ভর্তা বানিয়ে দেব! একদম টাচ করবে না আমাকে!”
শেরকে এভাবে কথা বলতে দেখে রুশদী কিছুটা বিস্মিত হলো।ফাহাদ ছেলেটা সুবিধের নয়, রাগের মাথায় বাচ্চার গায়ে হাত তুলে বসতে পারে। সে শেরকে টেনে আনতে চাইল,
“শের সোনা, এদিকে এসো তো! পচাদের সাথে কথা বললে তুমিও পচা হয়ে যাবে। ওর দিকে তাকাতে হবে না।”
কিন্তু শের একচুলও নড়ল না। সে কোমরে দু-হাত দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে ফাহাদকে ক্রুদ্ধ নয়নে মেপে দেখতে লাগল। ওর দৃষ্টিতে এমন এক তেজ, যেন ওই একরত্তি শরীরেই সে একটা আস্ত বডিগার্ড! রুশদী অপলক চেয়ে দেখল ওর ছোট্ট বডিগার্ডকে। শের এমন নিজের জন্য প্রটেকটিভ হয়ে দাঁড়াতে দেখে সে আবারো বুঝলো — পৃথিবীর সব রক্তের সম্পর্ক এই আত্মার টানের কাছে হার মেনে যায়।
ফাহাদ এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
“তুমি প্লিজ সামনে থেকে সরো তো! ডিস্টার্ব করো না।”
ফাহাদ পুনরায় রুশদীর দিকে এগোতে চাইলে শেরের রাগ এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। রাগে ওর গোলগাল মুখটা একদম লাল টমেটো হয়ে উঠেছে। অ্যাংরি বার্ড এর মতো ফুঁসে উঠে সে হুমকি দিল,
“বেশি কথা বললে আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে বলে তোমাকে কলেজ থেকে বের করে দেব!”
ফাহাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আরে পিচ্চি, আমি নিজেই প্রিন্সিপালের ছেলে! এবার বলো, কী করবে?”
শের দমবার পাত্র নয়। সে বুক ফুলিয়ে পালটা জবাব দিল,
“তাহলে প্রিন্সিপাল স্যারকেও বের করে দেব! তুমি জানো না আমার পাপাকে? আমার পাপাকে বললে তোমাকে এই সিটি থেকেই বের করে দেবে।”
এতটুকু একটা ছেলের মুখে এমন ভয়ংকর সব হুমকি শুনে রুশদী আর তিথির হাসি পেয়ে গেল। বাচ্চার কী সাহস! কিন্তু ফাহাদ ততক্ষণে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। সে এক প্রকার বিরক্তির চোটে শেরকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। শের ঘাসের ওপর ছিটকে পড়ল। ফাহাদ ওসব পাত্তা না দিয়ে রুশদীর দিকে ঝুঁকে বলল,
“রুশদী, শো…”
কথাটা শেষ করতে পারল না ফাহাদ। শেরকে ধাক্কা দিতে দেখে রুশদীর মাথার রগ দপদপ করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ফাহাদের গালে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কোত্থেকে কালো পোশাক আর সানগ্লাস পরা বিশালদেহী দুজন বডিগার্ড ঝড়ের বেগে ছুটে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ফাহাদের মাথায় রাইফেলের নল ঠেকিয়ে দিল।
আকস্মিক এই ঘটনায় ফাহাদ যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। থাপ্পড়ের জ্বালা ভুলে সে তখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছে। রুশদী দ্রুত শেরকে টেনে তুলল। ওর গায়ের ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
“তুমি ব্যথা পাওনি তোা?”
শের শান্ত গলায় উত্তর দিল, “না মম, পাইনি।” এরপর সে বডিগার্ড দুটোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল, “একে এক্ষুনি গুলি মেরে দাও তো আঙ্কেল!”
এরা মূলত শারফারাজ খানের নিয়োগ করা সিকিউরিটি, যারা ছায়ার মতো শেরের আশেপাশের অবস্থান করে। একটু দূরে থাকে যাতে শেরের বন্দি বন্দি না লাগে।বডিগার্ডদের একজন রুশদীর দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে অনুমতি চাইল, “ম্যাম, ক্যান উই শ্যুট?”
বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখে রুশদী এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল। ফাহাদের মাথায় বন্দুকের নল দেখে সে চিৎকার করে বলে উঠল, “না না না! শ্যুট করবেন না! ওকে ছেড়ে দিন, জাস্ট যেতে দিন।”
“ওকে ম্যাম,”
বডিগার্ড দুজন যান্ত্রিকভাবে বন্দুক নামিয়ে সরে দাঁড়াল।ফাহাদ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে, সে আর টু শব্দটি না করে ওখান থেকে উল্টো দিকে দৌড় দিল। রুশদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেরকে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরল।
ফারাজ তার চকচকে কালো গাড়িটা নিয়ে কলেজের গেটে এসে থামল।গাড়ি থেকে নেমে সে রুশদীকে ফোন করল।প্রতিদিন ড্রাইভার শেরকে নিতে আসলেও আজ ফারাজ এসেছে।তবে পৌঁছাতে তার বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছে, যা রুশদীর মেজাজ বিগড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তিথিকেও ফারাজ পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের গন্তব্য ছিল উল্টো দিকে। তাছাড়া তিথির বাসা কাছেই হওয়ায় সে আর বাড়তি ঝামেলা করতে চাইল না। ফারাজ নিজ দায়িত্বে তাকে একটি রিক্সা ঠিক করে দিয়ে বিদায় জানাল। এরপর রুশদী আর শেরকে নিয়ে সে গাড়িতে এসে বসল।
গাড়িতে ওঠার আগে শেরকে আড়ালে রুশদী ফিসফিস করে বলে দিয়েছিল, ফারাজকে যেন একটু আগে হওয়া ঘটনা গুলো না বলে। ছোট বিষয় নিয়ে অহেতুক তিক্ততা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। মায়ের বাধ্য ছেলে শের সেও কিছু বলল না।
গাড়ি চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর ফারাজ যখন লুকিং গ্লাসে চোখ রাখল, দেখল পেছনের সিটে বসা রুশদী আর শের—দুজনেই অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চার জোড়া চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি ফারাজের অস্বস্তিতে ফেল দিল। সে মনে মনে ভাবল, ‘এরা কি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে? ফারাজকে ভয় দেখানো এত সহজ নয়!’
গাড়ি চালানোয় মন দিয়ে সে কিছুটা গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করল,
“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? সমস্যা কী?”
রুশদী তড়িৎ উত্তর দিল, “দেখছি আপনার এত বড় মাথায় কোনো জ্ঞান আছে কি না। পুরো এক ঘণ্টা আপনি আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তার কোনো খেয়াল আছে?”
ফারাজ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, “তো?”
রুশদীর পাশে বসে থাকা ছোট্ট শের এবার যোগ করল, “তো মানে? আমি আর মম তোমার ওপর ভীষণ রেগে আছি!”
ফারাজ মৃদু হেসে পালটা প্রশ্ন করল,
“তো এখন আমি কী করব?”
ফারাজের এমন দায়সারা উত্তরে শের বেশ বিরক্ত হলো। সে ভাবল, পাপার বুদ্ধিটা কি দিন দিন লোপ পাচ্ছে? সে অভিমানী সুরে বলল,
“তো তুমি এখন আমাদের রাগ ভাঙাবে! এটাই নিয়ম।”
ফারাজের মনে হাসির রেখা ফুটে উঠল। অদ্ভুত তো! রাগও করেছে নিজেরা, আবার নিয়ম করে রাগ ভাঙানোর আবদারও করছে তারা। সে কৌতুক করে বলল,
“তা কী করলে তোমাদের এই মাউন্ট এভারেস্ট সাইজ রাগ ভাঙবে শুনি?”
রুশদী মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“সেটাও কি আমাদেরই বলে দিতে হবে?”
ফারাজ এবার একচোট হেসেই ফেলল। তারপর কিছুটা অবজ্ঞার সুরে বলল, “থাক, বলতে হবে না। তোমরা বরং রাগ করেই বসে থাকো। দেখি কতক্ষণ পারো।”
ফারাজের এই তাচ্ছিল্যভরা কথা রুশদী আর শেরের ইগোতে গিয়ে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। তারা নিজেদের ভীষণ অপমানিত বোধ করল। মনে মনে স্থির করল, ফারাজ তাদের যতটা সহজ ভাবছে, তারা আসলে অতটা সহজ নয়। এই অপমানের বদলা না নিয়ে তারা আজ ছাড়বে না।ঠিক আছে, তারাও তাদের রাগ ভাঙ্গাবে না।
সময়টা বিকেল। বিকেলের সোনাঝরা রোদ তখন চারদিকে মায়ার জাল বুনেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আভা আবির ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছে, আর নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত।চারিপাশে মৃদু হাওয়া বইছে। খান বাড়ির প্রশস্ত সবুজ লনটা এখন এক ঝাঁক কবুতরের মেলায় পরিণত হয়েছে। বিচিত্র সব জাতের কবুতর,সবই ফারাজের শখের। ফারাজ এগুলো পালে। যদিও পরিচর্যার দায়িত্ব কর্মচারীদের ওপরই থাকে, ফারাজের কাজ শুধু দেশ-বিদেশ থেকে দামী আর সুন্দর কবুতরগুলো খুঁজে আনা।
লনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রুশদী আর শের। তারা মনের আনন্দে কবুতরগুলোকে খাবার দিচ্ছে। শ’খানেক কবুতরের সেই ডানা ঝাপটানো আর বাকবাকুম শব্দ,বেশ লাগছে তাদের কাছে। কোনোটা রুশদীর কাঁধে বসছে, কোনোটা শেরে’র হাতের তালু থেকে খুঁটে খুঁটে দানা খাচ্ছে।দু’জনেই খিলখিল হাসসে।
নিজের ঘরের বারান্দায় পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল ফারাজ। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। কলেজ থেকে ফেরার পর থেকেই এই দুই মূর্তিমান আপদ তাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জে নেমেছে। ফারাজ যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা জানলেও তারা একবারের জন্য ওপরের দিকে তাকাচ্ছে না। ফারাজ মৃদু হাসল। রুশদী মেয়েটা যেমন পাগল, তেমনি তার ছেলেটাকেও পাগল বানিয়ে ছাড়ছে। শের এখন রুশদীর ছায়াসঙ্গী,রুশদী যা বলে শের তা-ই শোনে, রুশদী যা করে শের তা-ই অনুকরণ করে।
তবে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ফারাজ একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার অনুভব করল—রুশদীর পাশে থাকলে শের যতটা খুশি থাকে, অতটা খুশি বোধহয় সে আর কারো কাছে থাকে না। রুশদীর ভালোবাসা আর স্নেহের পরশে মা-হারা ছেলেটা যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ খুঁজে পেয়েছে। মাঝে মাঝে ফারাজ নিজেই অবাক হয়। রুশদীকে দেখলে কে বলবে সে শেরে’র জন্মদাত্রী মা নয়? একজন সৎ মা হয়েও অন্য কারো সন্তানকে নিজের কলিজার টুকরো করে নেওয়াটা বর্তমান সময়ে বিরল এক গুণ।তাও এতটা অল্প সময়ে। রুশদী সত্যিই অনন্যা।
হঠাৎ করেই ফারাজের দৃষ্টি থমকে গেল কবুতরদের খাবার দিতে ব্যস্ত রুশদীর ওপর। পরনে তার ধবধবে সাদা সুতি কাপড়ের পাকিস্তানি থ্রি-পিস। এক ঝাঁক সাদা কবুতরের মাঝখানে সাদা পোশাকে রুশদীকে মনে হচ্ছে এক শ্বেত পায়রা। বিকেলের হিমেল হাওয়ায় যখন তার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে মুখের ওপর এসে পড়ল, রুশদী আলতো করে তা সরিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে তার স্নিগ্ধ চেহারায় এক জাদুকরী হাসি ফুটে উঠল।যে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক স্নিগ্ধতা।
ফারাজ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মনে মনে আওড়াল ‘মাশাআল্লাহ!’ সেই এক চিলতে হাসি যেন মুহূর্তেই ফারাজের হৃদয়ের গহীনে এক দোলা দিয়ে গেল। অদ্ভুত এক মুগ্ধতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
ফারাজ হাতের কফি না শেষ করেই লনে নেমে এল। তাকে দেখেও না দেখার ভাগ করলো, শের ও রুশদী। ফারাজ গম্ভীর গলায় ডাকল, “তোমার সাথে কথা আছে রুশদী।”
রুশদী যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ফারাজের দিকে না তাকিয়েই শেরকে উদ্দেশ্য করে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “শের, আমাকে বোধহয় কেউ কিছু বলছে। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমি তো আশেপাশে কাউকে দেখছি না!”
শেরও মায়ের শিষ্য। সে চারদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকিয়ে বলল, “না মম, আমি তো কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না।”
রুশদী যেন গভীর চিন্তায় পড়ে গেল, “তাহলে কে ডাকছে আমাকে? অদৃশ্য কোনো আত্মা নাকি?”
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সে একটা সিরিয়াস বিষয়ে কথা বলতে এসেছে, আর এখানে মা-ছেলের নাটুকেপনা চলছে। সে একপ্রকার গর্জে উঠে শেরকে ধমক দিয়ে বলল,
“শের, এখান থেকে যাও!”
চলো মম!” শের রুচদীর হাত ধরে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ফারাজের কন্ঠস্বর এবার আরও কঠোর হলো, “রুশদী তুমি নয়, শুধু শের যাবে। শের, তুমি একা যাও!”
বাবার এমন রুদ্রমূর্তি দেখে শের দমে গেল। সে রুশদীর কানে ফিসফিস করে বলল, “মম, পাপার সাথে এখন তর্ক করো না।” রুশদী তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও শের আর সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। মাথা নিচু করে ছোট ছোট পায়ে সে লন থেকে প্রস্থান করল।
শের আড়াল হতেই রুশদী ফারাজের ওপর চড়াও হলো।
“আপনি ওইটুকু বাচ্চার ওপর এভাবে চেঁচিয়ে উঠলেন কেন? কী দোষ করেছে ও?”
ফারাজ নিজের রাগটাকে দমিয়ে রাখল। সে শান্ত ও শীতল গলায় প্রশ্ন করল, “কলেজে প্রিন্সিপালের ছেলের সাথে আজ কী হয়েছিল তোমাদের? সবটা বলো।”
রুশদী উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ল, “আগে আমার উত্তর দিন, আপনি ওর সাথে এভাবে কেন কথা বললেন?”
ফারাজ চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে দমিয়ে রাখল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন আমার পছন্দ নয়, রুশদী।”
“আমারও পছন্দ নয়!”
রুশদীর গলাতেও তখন সমান জেদ।ফারাজ আর ধৈর্য রাখতে পারল না,
“আমি জানতে চেয়েছি আজ কলেজে ওই ছেলের সাথে তোমাদের ঝামেলার কারণ কী? আমার মেজাজ এমনিতেই খারাপ, আর খারাপ করো না।”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “আপনাকে এসব কথা কে বলেছে?”
“বডিগার্ড বলেছে।”
“তাহলে তো সব শুনেই নিয়েছেন, আমাকে আবার প্রশ্ন করার কী মানে?”
ফারাজ একপা এগিয়ে এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তবুও পুরো ঘটনাটা আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি। বলো আসলে কী হয়েছিল।”
রুশদী জেদি বালিকার মতো মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
ফারাজের চোখ তখন রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে শেষবারের মতো সতর্কবাণী দেওয়ার স্বরে বলল, “লাস্ট বার বলছি রুশদী, মুখ খোলো। কী হয়েছিল বলো!”
“সরি, বলতে পারব না।”
রুশদীর এই এক কথা ফারাজের রাগটাকে যেন সীমানার বাইরে নিয়ে গেল।ফারাজ ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুঁজে রুশদীর দিকে আগুনের মতো চোখ গরম করে তাকালো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, রাগে রগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে প্রচণ্ড শান্ত কিন্তু ভীতি জাগানিয়া স্বরে বলল,
“ঠিক আছে রুশদী।কাল সকালে প্রিন্সিপাল অফিসে তোমার আর আমার দেখা হচ্ছে।”
ফারাজের গলার স্বর শুনে রুশদীর বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল। সে বুঝতে পারল, ফারাজ কি করতে চাচ্ছে। আগামীকাল প্রিন্সিপাল অফিসে যাওয়া মানেই পুরো কলেজে জানাজানি হওয়া। রুশদী কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ফারাজের চলে যাওয়া আটকাতে তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।
ফারাজ থামল ঠিকই, কিন্তু শীতল দৃষ্টিতে রুশদীর ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাত ছাড়ো। আমাদের কথা বলা শেষ। এখন তুমি যাই বলো না কেন, আমি কিছুই শুনছি না।”
রুশদী হাত না ছেড়ে আকুতিমাখা স্বরে বলল, “আপনি প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে যাচ্ছেন না, ব্যস!”
“অবশ্যই আমি যাচ্ছি,” ফারাজের কণ্ঠে পাহাড়সম দৃঢ়তা।
রুশদী এবার প্রায় ভেঙে পড়ার মতো করে বলল, “দেখুন, এমনিতেই আমার প্রেস্টিজের বারোটা বেজে আছে, দয়া করে সেটাকে তেরোটা বাজাবেন না। চারিদিকে সবাই আমাকে নিয়ে গসিপ করছে। আপনি আগামীকাল গেলে তারা আরও একটা সুযোগ পেয়ে যাবে। দয়া করে পুরো কলেজের সামনে আমাকে হাসির পাত্র বানাবেন না।”
ফারাজ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “তুমি আসলেই বোকা!”
“আমি বোকা নই! শুধু চাচ্ছি না আপনি কাল যান।”
“আমি যাচ্ছি, এটাই আমার শেষ কথা,” ফারাজ একচুলও নড়ল না তার সিদ্ধান্ত থেকে।
রুশদী এবার বিরক্তি আর অসহায়ত্ব নিয়ে বলল, “তেড়ামো করবেন না তো! ঝামেলাটা আর বড় করার দরকার নেই। কলেজের সবাই আমাকে দেখে ফিসফিস করবে, এসব আমার একদম পছন্দ না। আমি আর গসিপের পাত্র হতে চাই না।”
ফারাজ এবার রুশদীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “ভাবো, তুমি কতটা ভীতু! নিজের কলেজে গসিপের শিকার হচ্ছো অথচ অ্যাকশন নিতে ভয় পাচ্ছো। শোনো রুশদী, কাউকে দেখে যদি মনে হয় তোমাকে নিয়ে গসিপ করছে, সোজা তার হাতে টিসি লেটার ধরিয়ে দেবে। যারা তোমাকে নিয়ে কথা বলছে তাদের নামের লিস্ট করো, আগামীকাল আমি সবগুলোকে টিসি দিয়ে বের করে দেব।”
কথাটা বলেই ফারাজ এক ঝটকায় রুশদীর হাত ছাড়িয়ে গটগট করে ভেতরে চলে গেল। রুশদী কপালে হাত দিয়ে লনের ঘাসের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে।কাল থেকে কলেজে আবার নতুন ড্রামা শুরু হবে। ধ্যাত! কিছুই আর ভালো লাগছে না।
ফারাজ চলে যেতেই আড়াল থেকে শের দৌড়ে এসে রুশদীর কোলে বসে পড়ল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, “তোমাকে না বলেছিলাম মম, এখন পাপার সাথে বেশি তর্ক করো না? পাপা কত রেগে ছিল দেখেছো?”
রুশদী গাল ফুলিয়ে বলল, “সো হোয়াট?”
শের বেশ বিজ্ঞের মতো বলল, “পাপা যখন রেগে থাকে তখন তার সাথে বেশি তর্ক করবে না । তাহলে পাপা আরও বেশি রেগে যায়।”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ৯
“তোমার পাপাকে আমি বুঝি ভয় পাই নাকি?” রুশদী ভাব দেখাল।
“উহুঁ, তুমি পাপাকে চেনো না। পাপা অনেক রাগি!” শের সিরিয়াস মুখে বলল।
“তোমার পাপা রাগি?” বলেই শব্দ করে হেসে উঠল রুশদী। তার কাছে ভীষণ ফানি লাগল শের এর কথা । নিজের হাসি সামলে নিয়ে সে বলল, “শের, তুমি অনেক ফানি!”
শের বলল, “ইটস নট ফানি মম, ইটস টু মাচ ডেঞ্জারাস। জাস্ট ওয়েট আ ফিউ ডেইজ, দ্যান ইউ উইল রিয়েলাইজ ইট”
