Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ১২

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১২

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১২
তেজরিন উম্মীদ

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আনমনে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বোলাচ্ছিল তিথি। ঘরে মাথার উপর সিলিং ফ্যানের একটানা গটগট শব্দ হচ্ছে।শব্দটা তার মেজাজ বিগড়ে দিতে সক্ষম। হঠাতই নোটিফিকেশনের মৃদু শব্দে স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। স্কিনে ভেসে উঠল একটি মেসেজ,
“হ্যাল্লো বেয়ান সাব!”
তিথি ভ্রু কুঁচকে মেসেজটি খুলল। মুহূর্তকাল দেরি না করে কি-বোর্ডে আঙুল চালাল সে,
“জি বলুন।”
ওপাশ থেকে তড়িৎ উত্তর এল, “কষ্ট পেলেন নাকি?”
তিথি খানিকটা ভাব নিয়ে লিখল, “কষ্ট পাব কেন?”

“আমি আজকে আসলাম না বলে। আপনি নিশ্চয়ই আমার পথ চেয়ে বসে ছিলেন!”
ওপাশের মানুষটির আত্মবিশ্বাস দেখে তিথির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে পাল্টা লিখল, “আমার কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই? আমি কেন আপনার জন্য অপেক্ষা করতে যাব?”
“জানি, এই কথা গুলো রেগে বলছেন। থাক, এত রাগ করা ভালো না। সামনের দিন পাক্কা আসব। আজকে তোমার ভাইয়া কলেজে গিয়েছিল, তাই আর সাহস হইনি।”
কথাটা পড়ে তিথির হাসি আটকে রাখা দায় হয়ে পড়ল। শব্দ করে হেসে ফেলে সে লিখল, “ওমা! এই আপনার পিরিতির দৌড়? ভাইয়া কলেজে গিয়েছে শুনেই আপনার সব সাহস উড়ে গেল? হাহ!”
শান রসিকতা করে জানাল, “আরে বাবা, ভাইয়া যদি দেখে আমি তার শালির সাথে টাংকি মারছি, তবে তো আমার সানডে-মানডে ক্লোজ করে দেবে!”

“দম ফুরিয়ে গেল বুঝি? আচ্ছা, কেমন হয় যদি ভাইয়াকে আমাদের এই চ্যাটের স্ক্রিনশটগুলো পাঠিয়ে দিই? ভাইয়া আপনাকে একটু আদর করুক, কী বলেন?”
শানের উত্তর এল তক্ষুনি, “পাঠাও, তবে সাত দিন পর।”
“সাত দিন আগে কেন নয়?” তিথির কৌতূহলী প্রশ্ন।
শান এর জবাব এল,
“ভাইয়াকে দিয়ে আমার একটা জরুরি কাজ করাতে হবে। কাজটা মিটে গেলেই আমার রাস্তা পরিষ্কার। তখন তুমি ভাইয়াকে যাই বলো না কেন, আমার কিচ্ছু হবে না। উল্টো দেখবে ভাইয়া নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে! তাই সব প্রমাণ জমিয়ে রাখো, পরে কাজে দেবে।”
তিথি অবাক হয়ে লিখল, “আপনি কি পাগল?”
ওপাশ থেকে শান নির্লজ্জের মত উত্তর দিল,

“পুরো পাগল নই, তবে মাথার কয়েকটা তার বোধহয় একটু ঢিলা।”
“তাহলে ভালো কোনো ডাক্তার দেখান।”
“ডাক্তার দেখিয়েছি তো! ডাক্তার সলিউশনও দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিস তিথিকে পেলেই আমার মাথার সব তার নাকি ঠিক হয়ে যাবে!তাই দ্রুত তাকে বিয়ে করে ফেলুন।”
তিথি বিড়বিড় করে বলল, “ফাউ কথা!” মুখে বিরক্তি দেখালেও তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের লজ্জা। ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে এল সে। এরপর ওপাশ থেকে শানের আরও অগুনতি মেসেজ আসতে লাগল, কিন্তু তিথি আর রিপ্লাই দিল না। বালিশে মুখ গুঁজে সে তখন অন্য এক জগতের ভাবনায় বিভোর।

সন্ধ্যা নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। খান বাড়ির লনে আড্ডায় মেতেছে রুশদী, শের আর শান।
অল্প কয়েকদিনেই রুশদীর সাথে শানের এক চমৎকার বন্ডিং গড়ে উঠেছে। শান মানুষটা ভীষণ চঞ্চল। সারাদিন তার দুষ্টুমিতে পুরো বাড়ি তটস্থ থাকে, আর এই দস্যিপনায় তার যোগ্য সঙ্গী হলো ছোট্ট শের। চাচা-ভাতিজা যখন এক হয়, তখন পুরো খানবাড়ি মাথায় তুলে নাচে তারা।তবে এরাও ঠান্ডা হয়ে যায় -শেহজাদ খানএর উপস্থিততে। বাড়িতে শেহজাদ খানের পায়ের আওয়াজ পাওয়ামাত্রই এই দুই নমুনা মাসুম বেড়ালছানা সেজে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে।তখন তাদের মতো নিষ্পাপ আর কেউ থাকে না।
আড্ডার এক ফাঁকে শান রুশদীকে জিজ্ঞেস করল, “ভাবি, তিথির ফ্যামিলি সম্পর্কে কিছু জানো?”
রুশদী তখন টি-টেবিলের প্লেট থেকে এক টুকরো আপেল তুলে নিয়েছিল। আপেলে ছোট করে একটা কামড় বসিয়ে সে শানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আপেল চিবুতে চিবুতেই দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল, “আপনি ওর সাথে লাইন মারছেন, তাই না ভাইয়া?”

শান যেন হাতে-নাতে ধরা খেয়ে গেল। খানিকটা ইতস্তত করে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। আমতা আমতা করে বলল, “ওই আর কি… মানে একটু-আধটু…”
রুশদী এবার কিছুটা সিরিয়াস হলো। শানের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলল, “আসলে আমি ওর ফ্যামিলি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়। শুধু বলেছে ওর মা-বাবা মারা গিয়েছেন, এখন মামা-মামির কাছেই থাকে। এর বেশি কিছুই আমার জানা নেই।”
শানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। নিচু স্বরে বলল, “হুম, আমিও খোঁজ নিয়েছিলাম, কিন্তু তেমন কিছু জানতে পারিনি।”

পরক্ষণেই চিন্তিত ভাবটা ঝেড়ে ফেলে সে আবারও সেই চিরচেনা ফুরফুরে মেজাজে ফিরে এল।
“আচ্ছা বাদ দাও ওসব! ভাবি, তুমি বরং আমার একটা কাজের কাজ করে দাও। তোমার ওই বান্ধবীটাকে একটু পটিয়ে দাও না আমার জন্য। আমাদের ঘটক হও তুমি। এভাবে একা একা আর দিন কাটছে না, বিয়েটা এবার করতেই হবে। এভাবে আর কতদিন এতিম হয়ে থাকা যায় বলো?”
রুশদী অবাক হয়ে হেসে ফেলল, “বউ না থাকলে মানুষ বুঝি এতিম হয়?”
শান খুব বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে উত্তর দিল, “অবভিয়াসলি! ওটাকে ফ্যামিলি ছাড়া এতিম বলে না, ওটা হলো ‘বউ ছাড়া এতিম’। আমার বাম পাজরের হাড় দিয়ে যাকে বানানো হয়েছে, সে কেন অন্যের ঘরে থাকবে? আমার হাড় আমার কাছেই থাকা উচিত। আমার জিনিস অন্যের ঘরে পড়ে আছে—এটা ভাবলেই আমার কলিজা শুকিয়ে যায়। হুম-হু, এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
শানের এমন অদ্ভুত দর্শনে রুশদী হেসেই শেষ। হাসি থামিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি সত্যিই ওকে সিরিয়াসলি লাইক করেন?”

“মারাত্মক সিরিয়াস আমি, ভাবি।”
“তা, প্রপোজ করেছেন?”
“ওসব প্রেম-টেম করার সময় নেই আমার হাতে। ডিরেক্ট বিয়ে করে ঘরে তুলব। এখন তুমি শুধু ভাইয়াকে বুঝিয়ে রাজি করাও।”
রুশদী চোখ বড় বড় করে বলল, “কী বলেন!আপনার ভাইয়া আমার কথাই শোনে না, আবার আমাকে পাঠাচ্ছেন ওনার কাছে আপনার সাফাই গাইতে?”

“শোনো ভাবী,আমাদের এই বংশের সবচেয়ে ত্যাড়া হলো ভাইয়া। তাকে ম্যানেজ করা আমার মতো বান্দার কম্ম নয়। কিন্তু তুমি পরবে!দুনিয়ার পুরুষ আর কারও কথা না শুনলেও ঘরের নারীর কথা ঠিকই শোনে। শুরুতে একটু ত্যাড়ামো করলেও দেখবে ঠিকই মেনে নিয়েছে। প্লিজ, এই কাজটা করে দাও! আমাকে একবার সিঙ্গেল থেকে মিঙ্গেল করে দিতে পারলে তোমার জন্য একটা গিফট আছে।”
রুশদী ঠোঁট উল্টে ভাব দেখাল, “এমনিতেই আমি এই ঝামেলার মাঝে যেতাম না। আপনার ভাইয়ার কাছে ওকালতি করতে গিয়ে শেষে ঝগড়া বাধবে। কিন্তু সমস্যা হলো, গিফট আমার বড্ড প্রিয়। যেহেতু গিফটের টোপ দিয়েই দিয়েছেন, তখন কাজটা না করলে আমার মনের ভেতর উসখুস থেকেই যাবে।”
তাদের দুই বড় মানুষের মাঝখানে বসে এতক্ষণ বেশ মন দিয়ে কথা শুনছিল ছোট্ট শের। এতক্ষণ চুপ থাকলেও, এখন সে বড়দের মতো করে বলল,

“কী মম! তুমি চাচুর কাছ থেকে ঘুষ নিচ্ছ? তুমি জানো না ঘুষ নেওয়া কত খারাপ কাজ?”
এই হচ্ছে পিচ্চি মানুষের কাজ,তারা যেটুকু বুঝে সেটুকুই। শাম চট করে বেপার টা সমাল দিতে বলল,
“শের এটাকে ঘুষ বলে না, এটাকে গিফট বলে।”
শের বড়দের মতো বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। “আই নো দ্যাট! ঘুষের ডিজিটাল ফর্ম হলো গিফট চাচু। আর ঘুষ নেওয়া একদম হারাম। আমি এখনই পাপাকে গিয়ে বলে দেব যে শান চাচু মমকে ঘুষ দিচ্ছে।”
রুশদী শেরের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “দুই নাম্বার কাজে ঘুষ নেওয়া হারাম শের, কিন্তু এসব এক নম্বর সৎ কাজে একটু ঘুষ নেওয়া যেতেই পারে। এক কাজ করো, তুমি যদি এই ব্যাপারটা একদম সিক্রেট রাখো, তবে তোমাকে এক বক্স দুবাই চকলেট কিনে দেবো!”
দুবাই চকলেটের নাম শুনতেই শেরের চোখের মণি চকচক করে উঠল।চকলেটের লোভে এসব ঘুষের কথা তার মাথা থেকে উড়ে গেল। খুশিতে গদগদ হয়ে সে বলল, “ওকে! ডান। তাহলে আমি এটা সিক্রেট রাখব।কাউকে কিচ্ছু বলব না।”

শান আড়চোখে শেরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল। বাচ্চাদের এটাই সমস্যা—নিজেদের স্বার্থের কাছে সব নীতিবাক্য নিমিষেই হাওয়া। সে শেরের গাল টেনে দিয়ে বলল, “এখন যে তুমি নিজে ঘুষ নিচ্ছ, সে ব্যাপারে কী মত তোমার, মিস্টার শের?”
শের দাঁত বের করে একগাল হেসে বলল, “এটা ঘুষ নয় চাচু, এটাকে ট্রিট বলে! তুমি এটাও জানো না?”
“ওরে আমার পাকনা বুড়োরে!”
শানের এই মন্তব্যের সাথে সাথেই তিন জনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।৩২ পাটি দাঁত বের করে হাসতে লাগল তারা।

শেহজাদ খানের বিশাল কক্ষটিতে,বিছানার ওপর বসে আছেন শেহজাদ খান। তার সামনে অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে শান। ফারাজ পাশের সোফায় বসে আছে। রুমে কেবল তারা তিনজনই উপস্থিত। শেহজাদ খানের চোয়াল শক্ত, কপালে চিন্তার ভাঁজ। আজ শানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।আর সেখানে সে শেহজাদ খানের মুখ উজ্জ্বল করতে সগৌরবে এক মস্ত বড় ‘ডাব্বা’ মেরে বসে আছে। অর্থাৎ, ফলাফল বিপর্যয়!
খবরটা পাওয়ামাত্রই শেহজাদ খান ছোট ছেলেদের মতো দুজনকে ডেকে পাঠিয়ে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছেন। শানের অপরাধের ভাগিদার হিসেবে বেচারা ফারাজকেও শুনতে হচ্ছে কড়া সব কথা।

শেহজাদ খান গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন, “তোমার সমস্যাটা ঠিক কোথায় শান? নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তুমি এতটুকু সিরিয়াস নও কেন? এভাবে চললে ভবিষ্যতে তুমি কী হবে? নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎটা ধ্বংস করছো তুমি। দেশে আজেবাজে কাজে জড়িয়ে পড়ছিলে দেখে তোমাকে বাইরে পাঠালাম পড়াশোনার জন্য, অথচ সেখানেও তুমি ডাব্বা মারলে! একজন মন্ত্রীর ছেলে পরীক্ষায় ফেল করে—এটা জানাজানি হলে আমি মানুষের সামনে মুখ দেখাবো কীভাবে?আসলে তুমি চাওটা কী? সারা জীবন আমার ঘাড়ের ওপর বসে খাওয়ার ইচ্ছা আছে তোমার? শোনো শান, আমি আমৃত্যু তোমাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো না। এই বেকার বোঝা আমি আর টানতে পারব না।”
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তর্জন-গর্জনের পরেও শানের চেহারায় অনুতাপের কোনো রেশ দেখা গেল না। বরং ড্যাড প্রতিটি কথা সে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অতি অবলীলায় অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছিল। শানের কাছে এসব যেন রোজকার পাণ্ডুলিপি। উল্টো অবুঝ শিশুদের মতো গাল ফুলিয়ে সে বেশ রসিয়ে উত্তর দিল,
“ভাই এনি চান্স… তুমি কি আমাকে খোঁটা দিচ্ছ ড্যাড? ঠিক আছে,খেলাম না তোমারটা।আজ থেকে আমি ভাইয়ার টাকায় খাব। হুহ!”

ছেলের এমন নির্লজ্জ উত্তরে শেহজাদ খান ক্ষণিকের জন্য মেজাজ হারালেন। মন্ত্রী মানুষ হিসেবে কথায় কথায় মেজাজ গরম হলেও নিজেকে কীভাবে সংবরণ করতে হয়, সেই শিল্প তার বেশ জানা। কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টিতে শানের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি উপহাসের সুরে বললেন, “তোমার ভাইয়া নিজেও তো আমার টাকাতেই খায়!”
এতক্ষণ ফারাজ চুপচাপ হজম করছিল সব, কিন্তু ড্যাত এর খোটা তার গায়ে লাগল।না ড্যাড তাকে এভাবে অপমান করতে পারেনা,তারও একটা প্রেস্টিজ বলতে কিছু আছে। অভিমানে চট করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। তেড়েফুঁড়ে বলল,

“তুমি কি আমাকেও খোঁটা দিচ্ছ ড্যাড? মাত্র তো তিন মাস হলো তোমার টাকায় খাচ্ছি। ঠিক আছে, আমিও খেলামনা তোমার টা। এখন থেকে আমি আম্মির হোটেলে খাব! শান, তুইও।”
শান যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেল। ফারাজের কথায় তাল মিলিয়ে সে বলল, “একদম ঠিক বলেছ ভাইয়া! ড্যাডের হোটেলে আর খাওয়া যাবে না। দেখেছ তো, খাইয়ে আবার কেমন খোঁটা দেয়? তার চেয়ে আম্মির হোটেলই সেরা। ভাইয়া, তুমি এগিয়ে চলো, আমি আছি তোমার পিছে।”

ছেলের মুখে এমন তড়বড়ানি শুনে শেহজাদ খান এবার সিংহের মতো গর্জে উঠলেন,
“চুপ! একদম চুপ! তোমাদের কি মনে হয় আমি এখানে তোমাদের সাথে তামাশা করতে বসেছি? আমার মূল্যবান সময় কি আমি তোমাদের সাথে জোকস করার জন্য অপচয় করছি? তোমরা দুই ভাই-ই একরকম, কোনো কান্ডজ্ঞান নেই, কাণ্ডহীন সব কাজকর্ম! একজন তিন মাস ধরে নিজের লাইসেন্স ক্যানসেল করে বসে আছে, আর অন্যজনের পড়াশোনার কোনো নামগন্ধ নেই। তোমরা আসলে জীবনে চাওটা কী?”
একটু দম নিয়ে তিনি আবার বললেন,পরিষ্কার বলে দিচ্ছি—হয় জীবনে বড় কিছু হয়ে দেখাও, নয়তো আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আমি সারা জীবন তোমাদের খাইয়ে-পড়িয়ে এমন লস প্রজেক্ট পুষতে পারব না। কিছু হতে না পারলে এই মুহূর্তেই পথ দেখতে পারো।”

বাবার এই কড়া হুঁশিয়ারিতেও শান এর ভাবের কোন পরিবর্তন নেই। সে উল্টো বলল,
“বাড়িটা কিন্তু তোমার একার নয় ড্যাড! এটা দাদুর বাড়ি ছিল। তুমি চাইলেই আমাদের বের করে দিতে পারো না। এ বাড়িতে আমাদেরও আইনি হক আছে।”
ছেলের মুখে মুখে তর্ক শুনে শেহজাদ খান চরম বিরক্তিতে ফেটে পড়লেন, “শান! তোমার সাথে ফালতু কথা বলার সময় আমার নেই।”
“আমরাও তোমার সাথে ফালতু কথা বলছি না।”
শেহজাদ খান এবার ধৈর্য হারিয়ে ফারাজকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ফারাজ, ওকে নিয়ে এখনই বিদেয় হও এখান থেকে! অযথা আমার মাথাটা গরম করে দিচ্ছে। তোমাদের সাথে এই বিষয়ে আমি পরে ঠান্ডা মাথায় কথা বলব, এখন যাও!”

ফারাজ শানের হাত ধরে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে রুম থেকে বের করে নিয়ে এল সে। রুম থেকে বের হওয়া মাত্রই ফারাজ রাগে গজগজ করতে করতে শানের মাথায় এক মস্ত বড় গাট্টা মারল।
ব্যথায় কঁুকিয়ে ওঠা শানের দিকে তাকিয়ে ফারাজ গর্জে উঠল, “সিরিয়াসলি বল তো, তোর সমস্যাটা কী? আমি খুব ভালো করে জানি তুই ইচ্ছা করে ফেল করেছিস। কিন্তু কেন? ড্যাডের কাছে এভাবে বকা খেয়ে খুব মজা পেলি? নিজে তো কথা শুনলিই, সাথে বিনে পয়সায় আমাকেও শোনালি। তোর জন্য আমি কেন রোজ রোজ এসব অপমান সহ্য করব রে?”

ফারাজ এবার নিজের আক্ষেপ উগরে দিল, “তোর অপকর্মের জন্য আমাকে শুনতে হয় আমি নাকি বড় ভাই হিসেবে দায়িত্ব পালন করি না! ড্যাড বলে—বড় ভাই নিজেই বেকার, তো ছোট ভাই ওকে দেখেই শিখছে। এই শোন, আমি কি তোকে বলেছি আমাকে দেখে শিখতে? খবরদার শান, তোর জন্য যদি আর একদিন আমাকে কথা শুনতে হয়, তবে মনে রাখিস—তোর কিন্তু সানডে-মানডে একদম ক্লোজ করে দেব!”
ফারাজকে রাগতে দেখেও শান স্বাভাবিক রইল।সে বরং অতিমাত্রায় আয়েশি ভঙ্গিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে দুষ্টুমি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখল। হাত বাড়িয়ে রক স্টাইলে ভাইয়ার ঘাড় জড়িয়ে ধরল সে। নেচে নেচে হাটতে লাগল সে ,
“আরে ভাইয়া, ছোট ভাইয়ের জন্য এই সামান্য বকাটুকুও খেতে পারবে না? আর দেখো,তোমার বিয়ে না হওয়ায় আমি কতটা দিন অপেক্ষা করে বসে আছি, কবে আমার সিরিয়াল আসবে। ”
ফারাজ দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “শান, আমি তোর ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস কথা বলছি, আর তুই!এসব বিয়ে টিয়ে কি রে? ”

“বিয়ে টিয়ে কী মানে? তুমি বিয়ে করে দিব্যি সংসার করবে আর আমি কি চিরকুমার সংঘের সদস্য হব? আমাকে একটা বিয়ে করিয়ে দাও না ভাইয়া!”
“তোর বয়স কত হয়েছে রে? বড় ভাইয়ের মুখের ওপর বিয়ের কথা বলুস? একটা থাপ্পড় মেরে ৩২ পাটি দাঁত যদি না ফেলে দিয়েছি তো আমার নাম ফারাজ নয়! আমি কি তোর ইয়ার-দোস্ত যে আমার সাথে এসব ফালতু রসিকতা করবি? এমন এক চড় মারব যে সারা জীবন মনে রাখবি বেয়াদব কোথাকার!”
“ভাইয়া, তুমি দিন দিন যা একটা খাড়ুস হচ্ছ না! ছোট ভাইয়ের এই নরম দিলটা এভাবে ভেঙে চুরমার করে দিলে? একটা বিয়েই করিয়ে দিতে বলেছি। ”

ফারাজ এবার তপ্ত চোখে শানের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাত সরা আমার ঘাড় থেকে।”
শান ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“সরাতে বলেছি, সরা!
ফারাজের কণ্ঠের কাঠিন্যে, শান চট করে হাত সরিয়ে নিল।পরমুহূর্তেই শান দেখল, ফারাজ করিডরের কোণে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে রাখা ভারী গলফ স্টিক টি হাতে তুলে নিচ্ছে। দেখেই শানের মগজে বিপদের সাইরেন বেজে উঠল। ভাইয়ার পরবর্তী পরিকল্পনা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। শরীরের সবটুকু স্নায়ু মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল তার। ফারাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শান সামনের দিকে এক মরণ-পণ দৌড় লাগাল।
দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে পেছনে থাকা ফারাজকে বলতে লাগল, “ও ভাইয়া! এবারের মতো মাফ করে দাও! আর কোনদিন তোমাকে বিয়ের কথা বলব না। ”

শানের পিছু পিছু ফারাজও ক্ষিপ্র গতিতে ছুটছে, হাতে শক্ত করে ধরা সেই গলফ স্টিক। কত বড় দুঃসাহস! বড় ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে নিজের বিয়ের কথা বলে? আজ ওকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিতে হবে বড় ভাই কী।কয়েকদিন ফারাজের হাতে মার না খেয়ে তার সাহস আকাশ ছুঁয়েছে। ফারাজ করিডোর দিয়ে ধাওয়া করতে করতে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বলল,
“দাঁড়া তুই আজ! তোর বিয়ের ভূত আমি এক নিমেষেই ছাড়িয়ে দিচ্ছি। এত সাহস তোর যে বড় ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে ইয়ার্কি মারিস? বড় ভাইকে সম্মান দিতে জানিস না, উল্টো নিজের বিয়ের কথা শোনাস! কয়েকদিন আমার হাতের মার পড়েনি তো, তাই ডানা গজিয়েছে তোর। একবার শুধু ধরতে পারি, মেরে তোর হাড়গোড় সব পাউডার বানিয়ে দেব। দাঁড়া বলছি!”

শান তখন প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে আর পেছন ফিরে করুণ স্বরে আর্তনাদ করছে, “সরি ভাইয়া! আর কক্ষনো হবে না, প্লিজ এবারের মতো ছেড়ে দাও! আর কোনোদিন তোমার সাথে এমন বেয়াদবি করব না, খোদার কসম!”
“আগে দাঁড়া তুই! তারপর তোর কথা শুনছি!”
করিডোরে তাদের এই হুলস্থুল আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে রুশদী নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল। ততক্ষণে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পালা ওপরতলা থেকে নিচে ড্রয়িং রুমে গড়িয়েছে। রুশদী রেলিং ধরে নিচে তাকিয়ে দেখল এক অভাবনীয় দৃশ্য। শান বাঁচার তাগিদে ড্রয়িং রুমের সোফাগুলোর ওপর দিয়ে হরিণের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, আর ফারাজ উদ্যত স্টিক হাতে তাকে ধরার চেষ্টা করছে।
ফারাজ গর্জে উঠল, “একবার তোকে বাগে পাই, তারপর দেখ তোর হাড়ের কী দশা করি!”

রাত এখন ঠিক কতটা গভীর, রুশদীর তার কোনো আন্দাজ নেই। অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে সে, কিন্তু চোখের পাতায় ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে আবারও ডান দিকে কাত হয়ে শুল।
ডিম লাইটের মৃদু নীলচে আলোয় ঘরের আসবাবগুলো অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পাশে ফারাজ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আর তার প্রশস্ত বুকের ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে তার প্রাণভ্রমরা—’শেহরান খান শের’। বাবার গায়ের ঘ্রাণ মেখে শিশুটি যেন এক প্রশান্তির দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছে। আধো-আলোয় শেরের মায়াভরা নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে রুশদীর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল।

“পাপা!”
হঠাৎ শেরের অস্ফুট ও ঘুম-জড়ানো কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো। ফারাজের ঘুম হয়তো তখনও খুব একটা গাঢ় হয়নি, তাই সে ছেলের ডাকে সাড়া দিল। ঘুমের ঘোরেই উত্তর দিল সে, “হুম পাপা, বলো।”
শের এবার কিছুটা অবুঝের মতো হালকা কান্নার সুর টেনে বলল, “ঘুম আসছে না কেন?”
গত এক মাস ধরে শেরের এক অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়েছে। দিনের বেলা অসময়ে ঘুমিয়ে রাত জেগে থাকা। যার ফলে রাত দুটো-তিনটের আগে তার দুচোখে ঘুমের দেখা মেলে না। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ওর ছোট্ট শরীরটা ইদানীং বেশ ক্লান্ত দেখায়। ফারাজ ঘুমের রেশটুকু কাটিয়ে ছেলের মাথায় সস্নেহে হাত রাখল। চুলের ভেতর আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “চোখ বন্ধ করে রাখো পাপা, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, দেখো ঠিক ঘুম চলে আসবে।”

“আসছে না তো!”
শেরের স্বরে একরাশ বিরক্তি।
“আসবে, তুমি চোখ বন্ধ করে রাখো।”
শের এবার বাবার বুক থেকে নেমে রুশদী আর ফারাজের ঠিক মাঝখানে উঠে বসল। চোখ দুটো কচলে নিয়ে খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। রুশদী চুপচাপ ছেলের কাণ্ড দেখছিল। ফারাজও বুঝে গেল, আজ আর সহজে ঘুম পাওয়া হবে না। হাই তুলে চোখ কচলাতে কচলাতে সে উঠে বসল। ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঘুমাবে না পাপা?”
“বললাম তো ঘুম আসছে না!”— শেরের ছোট মনে তখন রাজ্যের বিরক্তি।
“তাহলে কি সারারাত এভাবে জেগে থাকবে?”
“জানি না!”
বলেই হুট করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল শের।এই কান্না কোনো দুঃখের নয়, বরং ঘুম না আসার তীব্র অস্বস্তি আর ক্লান্তি থেকে আসা এক শিশুর অভিমান। রোজ রাতে ঘুমের জন্য তাকে এভাবে ছটফট করতে হয়, যা তার ছোট্ট প্রানেড সহ্যশক্তির বাইরে। কাঁদতে কাঁদতে শের আর্তনাদ করে উঠল, “আমার ঘুম আসছে না কেন? সবার ঘুম আসে, শুধু আমারই ঘুম আসে না কেন?”

ততক্ষণে ফারাজ আর রুশদী দুজনেই পুরোপুরি উঠে বসেছে। ফারাজ কিছু করার আগেই রুশদী শেরকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মম মাথায় হাত বুলিয়ে দিই? দেখবে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে। কান্না করে না সোনা আমার।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা? কান্নার শব্দ কিছুটা কম হলেও শেরের গাল বেয়ে টুপটুপ করে নোনা পানি ঝরছিলই।শের রুশদীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। রুশদী এবার শেরকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানা ছাড়ল। তাকে নামতে দেখে ফারাজ কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কোথায় যাচ্ছ?”

“কোথাও না!” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে রুশদী শেরের ছোট্ট মাথাটা নিজের কাঁধে সযত্নে রাখল। শিশুটি তখনও মৃদু ডুকরে কাঁদছে। রুশদী তার পিঠে, হাতে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে সারা ঘরে পায়চারি করতে লাগল, ঠিক মায়েদের চিরচেনা সেই আদলে। ফারাজ বিছানায় আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে এই অপূর্ব দৃশ্যটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল তার মনে। মনে মনে ভাবল, শের আজ সত্যিই তার মাকে খুঁজে পেয়েছে।
কান্নায় শরীর ছেড়ে দিয়ে ক্লান্ত শের রুশদীর কাঁধেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল দ্রুত। রুশদী ওকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কী এক স্বর্গীয় শান্তিতে ঘুমাচ্ছে বাচ্চাটা! ওকে শুইয়ে দিয়ে নিজের এলানো চুলগুলো হাতের কাছে থাকা ক্লিপ দিয়ে আলগোছে খোঁপা করে নিল রুশদী। এরপর নিঃশব্দে দরজার দিকে পা বাড়াল সে। দরজার লকএ হাত দিতেই ফারাজ বিচলিত হয়ে আবার প্রশ্ন করল, “কোথায় যাচ্ছ আবার?”

“একটু পানি খাব।”
“রুমে তো পানি আছেই।”
“আমি একটু ঠান্ডা পানি খাব।”
“রুমের ফ্রিজেই বোধহয় আছে,”
রুশদী বেমালুম ভুলে গিয়েছিল যে রুমের এক কোণে ছোট একটা মিনি রেফ্রিজারেটর আছে। সে ফ্রিজ খুলে পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটাল। তখন ফারাজ অনুরোধ করল, “আমাকে একটা স্পিড ক্যান দাও তো।”
রুশদী চুপচাপ ক্যানটি বের করে ফারাজের হাতে দিল। এরপর সে ফারাজের পায়ের কাছে বিছানার এক কোণে পা গুটিয়ে বসে পড়ল। ঘরের ভারি পর্দা একপাশে সরানো থাকায় ওখান থেকে রাতের আকাশ আর নির্জন বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফারাজ ক্যানের মুখটা খুলে চুমুক দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রুশদী এক ঝটকায় প্রশ্নটা করে বসল,
“আপনার এক্স-এর সাথে ডিভোর্স হয়েছিল কেন?”

হঠাৎ এই প্রশ্নে ফারাজ কিছুটা থমকে গেল। রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত রাতে হঠাৎ এই প্রশ্ন মাথায় এল কেন?”
রুশদী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শায়িত শেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “শেরকে দেখে। এই ফুলের মতো বাচ্চাটাকে ফেলে যাওয়ার মতো নির্দয় কোনো মা হতে পারে? জানিনা মা হয়ে সে কীভাবে দূরে থাকে!উনি কি কখনও শেরকে নিজের কাছে নেওয়ার চেষ্টা করেনি?”
“না,” ফারাজের গলায় পাথরচাপা গাম্ভীর্য।
“কেন?”

ফারাজ ক্যানে আর একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করল, “আমাদের ডিভোর্সের সাত মাস পর শেরের জন্ম হয়। ওর বয়স যখন মাত্র বারো দিন, তখন স্রেফ মাতৃত্বের দায়িত্ব থেকে বাঁচতে সে শেরকে আমার কাছে রেখে যায়। সত্যি বলতে, তার আগে আমি জানতামই না যে সে প্রেগন্যান্ট ছিল বা আমার একটা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেছে।”
রুশদী বিস্ময়ভরা চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল, “নিজের গর্ভে ধরা সন্তানকে এভাবে অবহেলায় ফেলে রেখে চলে গেল? মা হয়েও কি তার একটুও বুক কাঁপেনি?”
ফারাজ ক্যানের শেষ চুমুকটা দিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে শূন্য গলায় বলল, “একটুও না।”
“কী নাম ছিল তার?
রুশদীর কণ্ঠে এবার এক অদ্ভুত কৌতূহল।ফারাজ এবার সোজা তাকাল রুশদীর চোখের দিকে। সেই চাহনিটা অন্যরকম। রুশদীও তার চোখে চোখ রাখল। কেউ দৃষ্টি সরাল না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফারাজ পাল্টা প্রশ্ন করল, “কেন?”

“এমনিই।”
“জেসমিন জুনিয়া চৌধুরী।
ফারাজ নিস্পৃহ গলায় উচ্চারণ করল নামটা।
রুশদী একটু ম্লান হেসে বলল, “নামটা ভালোই মনে রেখেছেন দেখছি। তিনি কি দেখতে খুব সুন্দরী ছিলেন?”
ফারাজ এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “সুন্দর কি না জানি না, তবে হৃদয়ের দিক থেকে চরম কুৎসিত এক নারী ছিল সে। নিজের স্বার্থে আমাকে ভেতর থেকে একপ্রকার ধ্বংস করে দিয়েছিল।”
“এখনও মনে রেখেছেন তাকে?”

রুশদীর কণ্ঠে এবার চাপা অভিমানের সুর।ডিম লাইটের অস্পষ্ট আলোতেও ফারাজ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল রুশদীর চোখের সেই অব্যক্ত ঈর্ষা। এটিই তো স্বাভাবিক; নিজের স্বামীর মুখে অন্য এক নারীর কথা, হোক সে অতীত, কোনো স্ত্রীর পক্ষেই সহজভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। রুশদীর চোখে-মুখে এই জেলেসি বা অধিকারবোধটুকু দেখে ফারাজের মনে যেন এক পৈশাচিক তৃপ্তি জাগল। তাকে আরও কিছুটা বিচলিত করার জন্য ফারাজ একটি সাদা মিথ্যা বলল,
“প্রথম ভালোবাসা তো, চাইলেই কি আর ভোলা যায়?”
অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ফারাজ সেই নারীর নামটাও ঠিকঠাক মনে রাখেনি। তার নাম আসলে ছিল জেসিয়া জুনিয়া চৌধুরী, কিন্তু ফারাজ ভুলবশত বলল ‘জেসমিন’। কত বছর পর আজ যে তার নামটা নিজের ঠোঁটে আনল, তারও কোনো হিসেব নেই ফারাজের কাছে।

রুশদী কয়েক সেকেন্ড পাথর হয়ে বসে রইল। তারপর কোনো কথা না বলে গুমোট মন নিয়ে উঠে গিয়ে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল। ফারাজ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থেকে দেখল—বাইরের ঝিরঝিরে বাতাসে রুশদী উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অকারণে নিজের সাজানো সংসারে ঝামেলার রেশ রাখতে চাইল না সে। সেও উঠে গিয়ে রুশদীর পাশে দাঁড়াল। রেলিংয়ে হাত রেখে একটু ঝুঁকে লনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার জীবনে দেখা সবচেয়ে জঘন্য মানুষ কে?”
রুশদী নিচু স্বরে জবাব দিল, “তেমন কেউ নেই।”
ফারাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার লাইফে দেখা সবচেয়ে কুৎসিত আর জঘন্য নারী ছিল জুনিয়া। একটি নারী ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা আমি ওকে না দেখলে জানতে পারতাম না। আমার সবচেয়ে বড় আফসোস—এমন একটি পঙ্কিল মানুষ কেন আমার জীবনে এসেছিল! আমার কোন পাপের শাস্তি ছিল ও, তা আজও আমি জানি না।”

রুশদী এবার ফারাজের দিকে ফিরে চাইল। অভিমানী গলায় বলল, “এতই যদি খারাপ মানুষ হয়, তবে মনে রেখেছেন কেন?”
ফারাজ এবার মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো তিক্ততা নেই। সে আলতো করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “কে বলল মনে রেখেছি?”
“আপনিই তো মাত্র বললেন।”
“মিথ্যা বলেছি।”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে বলল, “এখনও মিথ্যা বলছেন?”
“না, এখন সত্যি বলছি।”
“তখন তবে মিথ্যা বলার কারণ কী ছিল?”
ফারাজ এক মুহূর্ত রুশদীর স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আলগোছে বলল, “কোনো বিশেষ কারণ নেই। তোমাকে একটু খেপিয়ে দেওয়ার জন্য এমনিই বলেছি।”
“আমাকে খেপিয়ে লাভ কি আপনার? ”
“তুমি ছোটো মানুষ তুমি বুঝবে না।”
“আপনার কথা বুঝতে কতটুকু বড়ো হতে হবে? ”
“অন্তত আমার কাধ অবধি।”

গত কয়েকদিন ধরে শান বারবার কলেজের চত্বরে চক্কর কেটেছে তিথির একটা ঝলক দেখার আশায়, কিন্তু মেয়েটা যেন মরীচিকা—ছুঁই ছুঁই করেও ধরা দেয়নি। আজ তাই শান কোমর বেঁধে নেমেছে। সকালে রুশদীকে বলে দিয়েছে, ছুটি হলে তিথিকে যেন আটকে রাখে।
তপ্ত দুপুরে কলেজের মূল ফটকের ঠিক উল্টোদিকে, রাস্তার একপাশে পার্কিং জোনে নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শান আর সিফাত। শানের চোখ জোড়া চাতক পাখির মতো গেটের দিকে নিবদ্ধ—কখন ছুটি হবে, আর কখন সেই কাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখা যাবে! অন্যদিকে, সিফাতের অবস্থা তথৈবচ। মাথার ক্যাপ আর মুখের মাস্কের আড়ালে তার বিরক্তি চরমে পৌঁছেছে। এই কুত্তা মরা রোদে কালো শার্ট আর প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকা মানে জ্যান্ত রোস্ট হওয়া। আগুনের হল্কার মতো রোদটা যেন কালো কাপড়ে চুষে নিয়ে তার শরীর পুড়িয়ে দিচ্ছে। শানও গরমে ঘামছে, কিন্তু প্রেমিক হওয়ার দায় মেটাতে সে সব সইছে। তবে সিফাত তো আর প্রেমে পড়েনি, তার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল।

সে গজগজ করে বলল, “ভাই আমি চললাম! আমার পক্ষে এই মরুভূমির রোদে দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব না।”
বলেই সিফাত গাড়িতে উঠতে গেলে শান খপ করে তার হাত চেপে ধরল। কাকুতি-মিনতির সুরে বলল, “আরে ভাই, আমার খাতিরে আর একটুখানি সহ্য কর না!”
“পারব না ভাই, জীবনটা কয়লা হয়ে যাচ্ছে!”
সিফাতের সপাটে জবাব।
“আরে দাঁড়া, ছুটি হয়ে গেছে! এই ভাবি কল দিয়েছে, ওরা গেটের কাছে চলে এসেছে। শোন ভাই, তোর তো কন্যারাশি, তোর জন্য মেয়ের অভাব হবে না। কিন্তু আমার ওই একটাই পছন্দ। প্লিজ, কাজটা পটে গেলে তোকে গ্র্যান্ড ট্রিট দেব!”

শান এমন সিরিয়াস দশা দেখে সিফাত কিছুটা নরম হলো। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তুই কার সাথে লাইন মারছিস রে? তোকে তো আগে কোনোদিন মেয়ে নিয়ে এত সিরিয়াস হতে দেখিনি!”
শান এক গাল হেসে উত্তর দিল, “নাম তিথি…”
সিফাত ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল।
“ফারাজ ভাইয়ার বউয়ের বোন নাকি কী যেন লাগে ও—সেই মেয়েটা?”
“হ্যাঁ!” শানের চোখে তখন খুশির ঝিলিক।
সিফাতের চোখ এবার মাস্কের আড়ালেও জ্বলে উঠল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আব্বে! ওর সাথে তো আমার একটা বোঝাপড়া বাকি আছে!”
শান থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিসের বোঝাপড়া?”
“তোকে বলেছিলাম না, একটা মেয়ে আমার ফোনটা ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল? এটাই সেই মেয়ে! ওর কাছ থেকে আমার জরিমানা উশুল করতে হবে।”

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শান চট করে সিফাতের কাঁধে হাত রাখল। অন্য হাতে বন্ধুর গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “থাক ভাইয়া, রাগ করে না! হবু ভাবি হিসেবে এবারের মতো মাফ করে দে না লক্ষ্মীটি!”
সিফাত আর কথা বাড়াল না, কেবল তপ্ত দুপুরে একজোড়া অগ্নিদৃষ্টি ছুড়ে দিল। রাস্তার ওপারে কলেজ গেটে তখন রুশদী, তিথি আর ছোট্ট শের দাঁড়িয়ে। শান সিফাতের হাত ছেড়ে একরকম দৌড়েই রাস্তা পার হলো। সামনে গিয়েই তিথির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে সালাম ঠুকল সে। কিন্তু তিথি, সে কোনো পাত্তাই দিল না, স্রেফ অবহেলায় মুখ ফিরিয়ে নিল।
শানের অদ্ভুত সাজগোজ দেখে রুশদী ভুরু কুঁচকে বলল, “ভাইয়া, রোদের মধ্যে এমন প্যাকেট হয়ে আছেন কেন? মাস্ক আর ক্যাপে তো আপনাকে চেনাই যাচ্ছে না!”

ততক্ষণের শান শেরকে কলে তুলে নিয়েছে
শান উত্তর দেওয়ার আগেই কোলে থাকা শের হঠাৎ দুষ্টুমি করে টান দিয়ে শানের মাস্কটা খুলে ফেলল। আর ওমনি যেন মস্ত বড় এক বিস্ফোরণ ঘটল! আশেপাশে থাকা কয়েকটা ছেলে-মেয়ে মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াল। পরক্ষণেই তাদের চোখমুখ উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একজন চিৎকার করে বলে উঠল, “আরে! আপনি শানান ভাইয়া না?”
শান তখন রীতিমতো মাইনকার চিপায়। কোনোমতে কাঁচুমাচু করে ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই শুরু হলো লঙ্কাকাণ্ড। “ভাইয়া একটা সেলফি প্লিজ!”, “ভাইয়া একটা অটোগ্রাফ!” চারপাশ থেকে আবদারের ঝুড়ি খুলে বসল সবাই। শান আর না করতে পারল না, হাসিমুখে পোজ দিতে শুরু করল।
ভিড় বাড়তে দেখে ওপাশ থেকে সিফাতও এগিয়ে এল। কিন্তু নিয়তি বোধহয় আজ তাদের বিপক্ষেই ছিল। মাস্ক আর ক্যাপ থাকা সত্ত্বেও মানুষ তাকে চিনে ফেলল চোখের পলকে। পিলপিল করে মানুষ বাড়তে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কলেজের গেটের সামনে উপচে পড়া ভিড় জমে গেল। কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী—সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

“দেখো দেখো, সিফাত ভাইয়াও আছে!”—এই চিৎকারে যেন দাবানল ছড়িয়ে পড়ল। গেটের সামনে মুহূর্তেই এক এলাহি কাণ্ড; যে যেদিক থেকে পারছে ধাক্কাধাক্কি করে সেলফি তুলছে, অটোগ্রাফ নিচ্ছে। প্রিয় সেলিব্রিটিদের চোখের সামনে দেখে সবাই তখন আত্মহারা। রাস্তার মোড়ে রীতিমতো জ্যাম লেগে গেল।
এক কোণায় দাঁড়িয়ে রুশদী আর তিথি হাবার মতো তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। হচ্ছেটা কী? ওরা কি কোনো টপ সেলিব্রিটি নাকি যে এক পলক দেখার জন্য মানুষ এভাবে জীবন দিতে বসেছে? তাদের জনপ্রিয়তার বহর দেখে তিথি ও রুশদীরর মাথায় কিছুতেই কিছুই আসছিল না।

অবস্থা বেগতিক দেখে রুশদীদের সাথে থাকা বডিগার্ড আর কলেজের সিকিউরিটি গার্ডরা তড়িঘড়ি করে প্রটোকল দিতে শুরু করল। রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের মতো ধাক্কাধাক্কি সামলে তারা চারজনকে গাড়ির কাছে পৌঁছে দিল। শান আর সিফাত তড়িৎ গতিতে সামনের সিটে উঠে বসল, আর পেছনে তিথি, রুশদী আর শের। শান যখন স্টার্ট দিয়ে গাড়িটা একটু সামনে বাড়াল, তখনও জানলার কাঁচের ওপর বাইরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সিকিউরিটি গার্ডরা হিমশিম খাচ্ছিল ভিড় সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে। অনেকটা সময় পর যখন গাড়িটা জ্যাম কাটিয়ে নরমাল রাস্তায় উঠল, তখন সবার যেন হাফ ছেড়ে বাঁচার দশা।
রুশদী আর তিথি তখনও বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে। একটু আগে ঘটে যাওয়া উন্মাদনা তাদের মাথার ওপর দিয়ে যেন অত্যাধুনিক সুপারসনিক এরোপ্লেনের গতিতে চলে গেছে। রুশদী আর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে হাবার মতো প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, ওই মানুষগুলো আপনাদের সাথে এভাবে মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরে ছবি তুলছিল কেন?”

রুশদী আর তিথি যতটা অবাক ছিল, তার চেয়ে শতগুণ বেশি অবাক হয়ে, আকাশ থেকে পড়ল শান আর সিফাত। বিস্ময়ের চরম ধাপে পৌঁছে শান চলন্ত গাড়িতে সজোরে এক কড়া ব্রেক কষল। দুজনে ঘাড় ঘুরিয়ে ফোরজি স্পিডে পেছনের সিটে বসা রুশদীদের দিকে তাকাল। তাদের চোখমুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী দেখছে। দুজনে একযোগে বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“তোমরা আমাদের চেনো না?”
তাদের এমন কথা শোনে রুশদী আর তিথি একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ঢোক গিলে করুণ স্বরে বলল, “নাহ!”

আড়াইশ ভোল্টের শক খেলে মানুষের যে দশা হয়, শান আর সিফাতের তখন সেই দশা। নিজেদের ঘরেই এমন অবমাননা! দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবলার হিসেবে যাদের নাম এ সালের খবরের কাগজে রোজ ছাপা হয়, তাদের নাকি ঘরের মানুষই চেনে না! শান চরম হতাশায় মুখ কালো করে সিফাতের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের সুরে বলল, “সিফুরে! জীবনে কী করলাম রে? দুনিয়ার মানুষ চেনে, আর ঘরের মানুষই চেনে না!”
রুশদী এবার একটু থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আপনারা আসলে কীসের জন্য এত ফেমাস?”
নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে শান আর সিফাতের
এখন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। শান কোনোমতে ধরা গলায় বলল, “ফুটবলার।”
কিন্তু তিথি এবার মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আরও এক বলদ মার্কা প্রশ্ন করে বসল, “তা আপনারা কোন ক্লাবে খেলেন ”

সিফাত আর শানের মনে হচ্ছিল নিজেদের মাথায় নিজেরা বাড়ি মেরে মরে যায়। মান-সম্মানের একদম বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে এই দুই মেয়ে। সিফাত এবার দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, “আমরা বাংলাদেশের ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার!”
“কীহ! ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার?”— রুশদী আর তিথি দুজনের একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।তাদের বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এরা আসলে দেশের ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১১

তাদের এমন অতি-বিস্ময় দেখে শান কিছুটা চটে গিয়ে বলল, “তোমরা এভাবে ওভার-রিঅ্যাক্ট করছ কেন? আমাদের কি ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার হওয়ার যোগ্যতা নেই? কী মনে করো আমাদের?”
অবস্থা বেগতিক দেখে রুশদী তড়িঘড়ি করে সামাল দিয়ে বলল, “না না, তা নয়! অবশ্যই পারেন। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে তো আপনারা সবসময়ই থাকেন, তাই কখনো ওভাবে ভাবা হয়নি।”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৩