অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৩
তেজরিন উম্মীদ
কোনো এক অলস বিকেলে। টিভির বড় পর্দায় তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে দুটি গাড়ি। রুশদী আর শের—দু’জনেই ডুবে আছে কার রেসিংয়ের খেলায়। একটি বিন ব্যাগের ওপর পাশাপাশি বসে, হাতে কন্ট্রোলার, চোখ স্ক্রিনে স্থির। মধ্যে পার হয়ে গিয়ে কয়েকটি দিন, কিছু মুহুর্ত, বহু ঘন্টা বহু মিনিট।আর গল্পের বুনন তাদের সম্পর্কটাকে এক সহজ জায়গায় নিয়ে এসেছে। কখনো রুশদী আর ফারাজের খুনসুটি,ঝগড়াঝাটি , কখনো বা এক ছোট্ট আত্মার সাথে তার মায়ের নিবিড় মমতার আখ্যান—সব মিলিয়ে সময়গুলো যেন এক একটি পালক হয়ে জমছে স্মৃতির পাতায়।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে আরেকটি বিন ব্যাগে শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে আছে ফারাজ। তার হাতে একটি ফোন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফোনটা বেজেই চলেছে, একটানা রিংটোনের শব্দে রুশদীর মাথা ধরে যাচ্ছে । কিন্তু ফারাজ নির্লিপ্ত, সে ফোন রিসিভ করার কোনো তাগিদই দেখাচ্ছে না।কয়েকবার কল এসেছে, না সে ফোন কেটে দিচ্ছেন, না ফোন রিসিভ করছে।
গেমের মাঝেও রিংটোনের শব্দটা রুশদীর কানে গিয়ে বিঁধল। বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ও স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলে উঠল,”কল রিসিভ করছেন না কেন? একটানা বেজেই যাচ্ছে!”
ফারাজ ফোনটার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিল, “তোমার ফোনে কল এসেছে, তুমি রিসিভ না করলে আমার কী করার আছে?”
“আমার ফোন মানে?” রুশদী অবাক হয়ে হাতের কন্ট্রোলারটা আলগা করে পাশ ফিরে তাকাল। দেখল, ফারাজের হাতে থাকা ফোনটা আসলে তারই। নিজের ফোন ফারাজের হাতে দেখে সে কিছুটা হকচকিয়ে গেল।
“আমার ফোন আপনার কাছে কেন? আর লক খুললেন কীভাবে?”
ফারাজ বেশ ভাব নিয়ে মুখে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “টেকনোলজি!”
রুশদী চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল, “আপনি আমার ফোনে করছেনটা কী ?”
“গেম খেলছি।” ফারাজের উত্তর সংক্ষিপ্ত।
“আপনার ফোন কোথায়? নিজের ফোনে খেলুন, আমার ফোনে কেন?”
“আমার ফোনে চার্জ নেই, ওটা চার্জে দেওয়া।” ফারাজ খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, যেন অন্যের ফোন নিয়ে গেম খেলাটা পৃথিবীর সবচাইতে সাধারণ কাজ।রুশদীকে যে তাকে “ম্যানারলেস’ বলে এমনি এমনি বলে না।এর প্রমাণ ফারাজ দিল।
রুশদী আর কথা বাড়াল না, আবার স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ” কে ফোন করছে?”
“এমপি (MP) নামের কেউ একজন।”
নামটা শুনেই রুশদীর চোখেমুখে একটা অবহেলার ছাপ ফুটে উঠল। নিরুত্তাপ গলায় বলল, “কেটে দিন।”
ফারাজ কাটতে যাবে, তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেটে দিয়েছি, কিন্তু এখন মেসেজ দিচ্ছে।”
“সীন করে রিপ্লাই দিন।”
রুশদী তখন গেমের লাস্ট ল্যাপে, তাই তার হাত আর চোখ দুটোই ব্যস্ত।
“তোমার মেসেজ এসেছে, তুমিই দেখে নাও। পার্সোনাল কিছু হতে পারে তো…”
ফারাজের গলায় সামান্য দ্বিধা।কিন্তু রুশদী নির্বিকার। সে গেমের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বলল,
“সমস্যা নেই, ও পার্সোনাল কোনো মেসেজ দিবে না। আপনিই পড়ুন না কী লিখেছে।”
রুশদীর কথামতো ফারাজ মেসেজটি ওপেন করল। স্ক্রিনে ফুটে ওঠা শব্দগুলো পড়তে গিয়ে তার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল। সে পড়তে লাগল—”প্লিজ ফোন রিসিভ করো, তোার সাথে কথা আছে। প্লিজ একবার রিসিভ করো। জান, প্লিজ একবার!”
শেষের ‘জান’ শব্দটা পড়ে ফারাজের হাতের আঙুলগুলো স্থির হয়ে গেল। মনের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য খটকা লাগল। কে এই ব্যক্তি যে রুশদীকে এমন নামে ডাকছে? সে গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকাল। কিন্তু রুশদী? তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই, কোনো অপরাধবোধ বা অস্থিরতা নেই। সে আগের মতোই নিবিষ্ট মনে টিভিতে রেসিং দেখছে।
ফারাজের চোখের স্থিরতা লক্ষ্য করে রুশদী না তাকিয়েই বুঝতে পারল সে কিছু একটা ভাবছে। সে খুব সহজ গলায় আদেশের সুরে বলল, “আপনি রিপ্লাই দিয়ে দিন— আমি তোর দুলাভাইয়ের সাথে হানিমুনে এসেছি, তোর সাথে পরে কথা হবে।”
কথাটা শুনে ফারাজ সচকিত হয়ে উঠল। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সে একদিকে অবাক হলো রুশদীর এই অকপট মিথ্যা শুনে, আর অন্যদিকে মনে মনে ভাবল,এই ‘এমপি’ আসলে কে? যার সাথে এমন রসিকতা করা যায়! তবে ফারাজ আর গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করল না। রুশদীর কথামতো ঠিক ওই বাক্যটিই টাইপ করে পাঠিয়ে দিল সে।
কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই ফোনটা আবার টুং!শব্দে কেঁপে উঠল। ওপাশ থেকে একের পর এক মেসেজ আসছে। ফারাজ ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আবার মেসেজ দিচ্ছে।”
রুশদী এবার বিরক্তির চরম সীমায়। একটা ভাব নিয়ে হাই তুলে সহজভাবে বলল, “ইগনোর করেন।”
সিকদার বাড়ির সেই ঘরটা, যাকে শান ভালোবেসে ‘খানদানি ডাস্টবিন’ বলে ডাকে, সেখানে এখন সে বসে আছে। সিফাতের অগোছালো রুমটায় শান বিছানায় বসে ফোনে মগ্ন ছিল। সিফাতকে দেখাচ্ছিল খুব অস্থির; ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছিল সে। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি খুঁজে পেয়ে সে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
মিনিট পাঁচেক পর সিফাত যখন বের হলো, তার পুরো অবয়ব বদলে গেছে। সে টলমল পায়ে এসে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে রিমোটটা নিয়ে এসির পাওয়ার একদম বাড়িয়ে দিল সে। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, কপাল আর ঘাড় বেয়ে নামছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অস্থিরতা যেন তার শরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়েছে।
সিফাতের চালচলন বরাবরই একটু ভিন্ন,আমেরিকান ধাঁচের। গায়ে ঢিলেঢালা শার্ট, মাথায় ওলফ-কার্ট চুল। সেই প্রিয় ঢিলেঢালা শার্টের বোতামগুলো সে একে একে খুলে ফেলল, তারপর হাত দিয়ে বাতাস করতে লাগল শরীরে। তার চোখদুটো ঝাপসা, মাথার চুলগুলো এলোমেলো। শান ফোনটা পাশে রেখে তীক্ষ্ণ নজরে সিফাতকে পর্যবেক্ষণ করছিল। বন্ধুর এবং ভাইয়পর এই অবস্থা দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
দাঁতে দাঁত চেপে শান জিজ্ঞেস করল, “ড্রাগ নিয়েছিস?”
সিফাত কোনো উত্তর দিল না। এসির ফুল পাওয়ারেও তার শরীরের ভেতরের আগুন শান্ত হচ্ছে না। ড্রাগটা রক্তে মিশতেই তার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক বুনো ঘোড়ার মতো অবাধ্য দৌড় শুরু করেছে। এসির ঠান্ডা বাতাস এখন তার চামড়ায় কাঁটার মতো বিঁধছে। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে যেন গরম ভাপ বের হচ্ছে। শার্টটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, আর মাথার ভেতর একটা তীব্র ভোঁ-ভোঁ শব্দ তার চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচাইতে ভালো কথাটাও তার কাছে বিষের মতো মনে হবে।
সিফাত বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। তার এই বিধ্বস্ত দশা দেখে শানের বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই কষ্টের সমান তালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাগ। সে মনে মনে চিৎকার করে বলতে চাইল,’এভাবে একটা ছেলে নিজেকে শেষ করে দিতে পারে না!’
শানের মনে পড়ে গেল সিফাতের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। ফুটবল ছাড়া যে ছেলেটা একদিনও ভাবতে পারত না, যার পায়ের জাদুতে মাঠ কেঁপে উঠত, আজ সে কি না নেশার ঘোরে অন্ধকার ঘরে পড়ে আছে! যে ফুটবলকে ঘিরে সে ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন বুনেছে, সেই স্বপ্ন থেকে তাকে নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শান কি জানে না সেই যন্ত্রণার কথা? তার কি খারাপ লাগে না ? অবশ্যই লাগে। কিন্তু সিফাত যেভাবে আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছে, তা শানের কাছে অসহ্য।
শান রাগে-দুঃখে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সিফাতের দিকে।
শান নিজের ভেতরের রাগ টাকে কোনোমতে চেপে রাখল। সে আর সিফাত একই নৌকার যাত্রী ছিল, কিন্তু শান নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখতে পেরেছে, আর সিফাত খেই হারিয়ে ফেলেছে। সিফাত বরাবরই একটু জেদি আর বেপরোয়া ছিল; তার ওপর যখন তার বুকের পাঁজর থেকে তার লালিত স্বপ্নটাকে ছিঁড়ে আলাদা করে দেওয়া হলো, ছেলেটা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিজেকে সঁপে দিল নেশার এক অন্ধকার গহ্বরে। প্রতিদিন নতুন নতুন বিষে নিজের শরীরটাকে ধ্বংস করছে সে, যেন তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার এক জঘন্য খেলায় মেতেছে।
শান নিজের ঠোঁটে কামড় দিয়ে রাগ কমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সিফাতের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তার মুখ দিয়ে ঘৃণা আর আর্তনাদ মেশানো শব্দ বেরিয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,”তুই মরবি দেখিস, তুই এভাবেই অকালে মরবি!”
নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন সিফাতের চোখে তখনো ঘোর। সে একটা অদ্ভুত, প্রাণহীন হাসি হাসল। আধবোজা চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল,”মরার জন্যই তো খাচ্ছি রে শান। আমি মরলে অন্তত একটা চল্লিশার দাওয়াত পাবি তুই। দোয়া কর যেন তাড়াতাড়ি মরি, এই নরক থেকে মুক্তি পাই।”
সিফাতের এই প্রতিটি কথা শানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। নিজের স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হলে একটা মানুষ কতটা নিঃস্ব হতে পারে, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ এই সিফাত। অথচ এই ছেলেটার পায়েই তো ছিল জাদুর ছোঁয়া। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের জার্সিতে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে দাপিয়ে বেড়ানো, এশিয়ান কাপের ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা। যে ছেলেটা একসময় ‘সাউথ এশিয়ান বেস্ট প্লেয়ার’ র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে ছিল, তার জীবন থেকে কেন ফুটবলকে এভাবে মুছে দেওয়া হলো? এই হাহাকার সিফাতকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
সিফাতের মরণকামনা শুনে শান আর চুপ থাকতে পারল না। তার গলার স্বর এবার চড়ে গেল,”ফালতু কথা বলবি না সিফাত! তুই কি ভাবিস শুধু তোর একার খারাপ লাগে? আমার লাগে না? আজ দীর্ঘ নয়টা মাস আমি আমার গায়ের জার্সিটা চড়াই না। আলমারির কোণে পড়ে থাকা ওই ১১ নম্বর জার্সিটার দিকে তাকালে এখনো আমার কলিজা ছিঁড়ে কান্না আসে। বুক ফেটে যায় যখন মনে হয় কীভাবে আমাদের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।”
শান এক মুহূর্ত থামল। সিফাতের কলার চেপে ধরার মতো ভঙ্গিতে কাছে গিয়ে বলল,”কিন্তু আমি তোর মতো হার মানিনি। আমি আমার স্বপ্নকে ছাড়ছি না। আমি আবার মাঠে নামব, আবার খেলব বাংলাদেশের হয়ে। বার্সেলোনাতে চান্স পেয়ে আমি ড্যাডকে দেখিয়ে দেব—আমিও জীবনে কিছু হতে পেরেছি। তারা আমার হাত থেকে সুযোগ কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু আমার রক্তে মিশে থাকা ফুটবলকে কেড়ে নিতে পারেনি। আমি ফিরবই!”
এতক্ষণ ঝিমিয়ে থাকা সিফাত হঠাৎ এক পৈশাচিক ক্রোধ নিয়ে শানের দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো লাল হয়ে উঠেছে, যেন ভেতর থেকে কোনো আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে আসবে। শানের কলার চেপে ধরার মতো তীক্ষ্ণ স্বরে সে চিৎকার করে উঠল,
“তোর বাপের জন্য আজ আমার স্বপ্নটা ছাই হয়ে গেল শান! তোর বাপ তোকে ফুটবলার বানাবে না, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার; সে তোকে শাসন করুক, তোরটা দেখুক—তাতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমার বাপের কানে বিষ ঢেলে গিংরিং লাগানোর কী দরকার ছিল? তোর বাপের জন্যই আজ আমার এই দশা!”
সিফাত দম নেওয়ার জন্য একটু থামল, তার বুকটা রাগে হাপর কাটছে। সে অবজ্ঞার সুরে আবার বলে চলল, “তোর বাপ বড় মন্ত্রী, বিশাল ক্ষমতা তার! ছেলে ফুটবলার হলে নাকি তার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। ছেলেকে অনেক বড় কিছু হতে হবে, বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে—আরে ভাই, কর না তুই! কিন্তু তোর বাপের আমাকে নিয়ে কী সমস্যা? কেন আমার সাজানো জীবনটাকে এভাবে নরক বানিয়ে দিল? এশিয়ান কাপের বাছাই পর্ব শুরু হতে আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। অথচ আমি মাঠে নেই, আমি বন্দি এই নেশার ঘরে। এটা ভাবলে আমার আত্মাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে রে শান, আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে!”
শানের চোখেমুখে তখন সংকল্পের ছাপ। বন্ধুর এই হাহাকার তাকে দুর্বল করল না, বরং আরও জেদি করে তুলল। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলতে এশিয়না কাপের জন্যই দেশে এসেছি। যা হওয়ার হয়ে গেছে, কিন্তু আমি আর হাল ছাড়ছি না।ড্যাড এী বিরুদ্ধে যেতে হলে আমি যাব, নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা আমি আর হতে দেব না। আমি জানি ভাইয়াকে বললে ও সব ম্যানেজ করে নেবেন। এশিয়ান কাপ আমি খেলবই।”
সিফাত এবার সোজা হয়ে বসল। তার নেশাগ্রস্ত চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা নেমে এল, যা আগের ক্রোধের চেয়েও ভয়ংকর। সে সরাসরি শানের চোখের দিকে তাকিয়ে বরফশীতল গলায় বলল,
“শোন শান, সরাসরি একটা কথা বলে রাখছি—যদি কোনো কারণে আমি এই এশিয়ান কাপে খেলতে না পারি, তবে তোরা আমার লাশ দাফন করবি। আমার ফুটবল নেই মানে আমার নিঃশ্বাস নেই। আমি শেষবারের মতো বলছি, আমি না খেলতে পারলে তোদের আমার জানাজায় দাঁড়াতে হবে।”
তিন মাসের সাসপেনশন ফারাজকে যেন এক অন্তহীন অবসরে ঠেলে দিয়েছে। কর্মব্যস্ত মানুষটা এখন পুরোপুরি বেকার।সারাদিনে করার মত কিছু নেই। বোরিংনেস কাটাতে মাঝে মধ্যে বাহির থেকে ঘুরে আসে। সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠলে কখনো কখনো লনে এসে বসে। আজ বিকেলেও তার ব্যতিক্রম হলো না। লনের সোফার উপর বসে সে মশার কামড় খাচ্ছে আর হাতে ধরা টমেটোর টুকরোটা তার প্রিয় ম্যাকাও পাখিটার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই ম্যাকাও পাখিটি ফারাজের শুধু পোষা প্রাণী নয়, বরং তার বন্ধু। ফারাজ আদর করে ওর নাম রেখেছে ‘ট্যাটো’। ট্যাটো ভীষণ বুদ্ধিমান, আবার সমান পাল্লায় দুষ্টু। ফারাজের ছোটখাটো কথা ও বুঝতে পারে, এমনকি ভাঙা ভাঙা বেচ কিছু বাক্যও বলতে পারে। তবে ওর একটা বড় সমস্যা হলো,কথা পছন্দ না হলে ও মেয়েদের মতো গাল ফুলিয়ে রাগ করে বসে থাকে। তখন ওকে দেখে মনে হয় যেন একটা ফোলা ‘দুদুম পেঁচা’।
ফারাজ টমেটোর টুকরোটা ট্যাটোর চঞ্চুর কাছে নিয়ে নরম গলায় বলল, “তোর সমস্যা কী? খাচ্ছিস না কেন?”
ট্যাটো টি-টেবিলের ওপর বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকবার টমেটোর টুকরা তার মুখের সামনে নিতেই সে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।ফারাজ এর হাতের টমেটো সে খাবে না। ফারাজ এবার ট্যাটোর ঘাড়ের নরম পালকগুলো আলতো করে ধরে নিজের দিকে মুখ করাল। কিছুটা রাগ মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ… সমস্যা কী তোর? খাবি না কেন?”
ট্যাটো এবার মাথাটা দুপাশে সজোরে দুলিয়ে তার স্বরে প্রতিবাদ জানাল, “খাবো না! খাবো না!”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন?”
“বকেছ! বকেছ!”—ট্যাটোর ভাঙা ভাঙা উত্তরে অভিমান ঝরে পড়ল।ঘটনা হলো, কিছুক্ষণ আগে লনের একটা বিড়ালের সাথে ট্যাটো তুমুল ঝগড়ায় মেতেছিল। বিড়ালটাকে খামচি দেওয়ার জন্য ও ডানা ঝাপটিয়ে তেড়ে যাচ্ছিল।বিড়ালটা যদি পাল্টা একটা কামড় বসিয়ে দেয়, তবে ট্যাটোর জান বাঁচানো দায় হবে। তাই ও কড়া গলায় ধমক দিয়েছিল ট্যাটোকে। আর সেই ধমক খেয়েই এখন তার মুখ ফুলে রাজকীয় অভিমান।ফারাজ এবার একটু কড়া হওয়ার ভান করল।
“বিড়ালের সাথে যে ঝগড়া করছিলি, ও যদি একটা খামচি দিত তবে তোকে আর খুঁজে পাওয়া যেত? উল্টো এখন আমার ওপর রাগ করে বসে আছিস! চুপচাপ খেয়ে নে, নাহলে মেরে তোর ঠ্যাং ভেঙে দেবো কিন্তু!”
ট্যাটো ফারাজের এই হুমকির পর আরও বেশি করে গাল ফোলাল। ট্যাটোর রাগ এবার যেন সপ্তমে চড়ল। ফারাজের হাতের বাঁধন থেকে ডানা ঝাপটিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল, “চলে যাব! চলে যাব!”
ফারাজ জানে এই জেদ বেশিক্ষণ টিকবে না। সে আলতো হেসে তুরুপের তাসটা চালল,
“মিষ্টি আম খাবি?”
মুহূর্তেই ট্যাটোর পাখা ঝাপটানো থেমে গেল। ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে সাথে সাথে উত্তর দিল, “খাব! খাব!”
ব্যস, এই হলো ট্যাটো মশাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত রাগ! আমের নাম শুনলেই তার সাত খুন মাফ। ফারাজ শব্দ করে হেসে উঠল। ওর ঘাড় ছেড়ে দিয়ে আবার সেই টমেটোর টুকরোটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখন আপাতত এটা খেয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে থাক। রাতে তোর জন্য আম এনে দেব।”
ট্যাটো এবার আর দ্বিমত করল না, বাধ্য ছেলের মতো টমেটোতে ঠোকর দিতে শুরু করল। ফারাজ আয়েশ করে বসে সামনে তাকাতেই দেখল রুশদী ধীরপায়ে লনের দিকে আসছে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফারাজের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। গত কয়েক দিনে সে রুশদীকে খুব কাছ থেকে চিনেছে। মেয়েটা অদ্ভুত! এই রাগ, এই অভিমান, আবার হুট করেই একাই সব ভুলে হাসিমুখে কথা বলা। রুশদীর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ফারাজের ওপর অঘোষিত অধিকার খাটানোর। ফারাজ বুঝতে পারে, রুশদী জীবনের ভাঙাগড়া মেনে নিয়ে নিজেকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। এই যে মেয়েটা কারণে-অকারণে তার সাথে ঝগড়া করতে ছুটে আসে, এটা ফারাজের এখন আর খারাপ লাগে না, বরং বেশ লাগে।
রুশদীকে কাছে আসতে দেখে ফারাজ নিচু স্বরে ট্যাটোকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ওই দেখ, খাটো পটল আসছে!”
ট্যাটোর একটা বিশেষ গুণ হলো, কাউকে একবার কোনো নামে চিনিয়ে দিলে সে ওটা মুখস্থ করে ফেলে। ফারাজের মুখে নামটা শোনামাত্রই ট্যাটো মাথা দুলিয়ে সুর করে আওড়াতে লাগল, “খাটো পটল! খাটো পটল!”
ফারাজ ঘাবড়ে গিয়ে নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। ফিসফিস করে ট্যাটোকে থামানোর চেষ্টা করে বলল, “শশশ! একদম চুপ। আস্তে বল, শুনলে কিন্তু হুলুস্থুল ঝগড়া শুরু করে দেবে। এই মহিলার ঝগড়াতে পিএইচডি করা আছে বুঝলি?”
ততক্ষণে রুশদী বেশ কাছে চলে এসেছে।
রুশদী তখন ফারাজের ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, দুই হাত বগলদাবা করে। তার চোখেমুখে বিস্ময়। হলদে-নীল-লাল-সবুজ রঙের মিশেলে ম্যাকাও পাখিটার রূপ দেখে সে অপলক চেয়ে থেকে সে ফারাজকে প্রশ্ন করল,
“এটা কি আপনার? ওর নাম কী?”
ফারাজ ট্যাটোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উত্তর দিল, “ট্যাটো।”
“কথা বলতে পারে?” রুশদীর কণ্ঠে কৌতূহল।
“হুম, বেশ ভালোই পারে,”
“কী কিউট!” বলেই রুশদী যেই না ট্যাটোকে একটু আদর করতে হাত বাড়াল, অমনি ট্যাটো বিদ্যুৎগতিতে তার আঙুলে একা ঠোকর বসিয়ে দিল। “আউচ!” বলে মৃদু চিৎকার করে উঠল রুশদী। ব্যথায় লাল হয়ে যাওয়া আঙুলটা ডলতে ডলতে বিরক্তি নিয়ে বলল, “কামড় দেয় কেন আপনার এই পাখি?”
ফারাজ বেশ আয়েশ করে বলল, “ও আসলে আমি ছাড়া অন্য কারোর স্পর্শ একদম পছন্দ করে না।”
রুশদী জেদের সুরে বলল, “ওহ!কিন্তু ও আমাকে ঠিকই পছন্দ করবে।”
এরপর সে ট্যাটোর দিকে আবার হাত বাড়িয়ে খুব মোলায়েম গলায় বলল, “হ্যালো ট্যাটো, আমি রুশদী।”
কিন্তু ট্যাটো যেন তৈরিই ছিল। সে এবার আরও জোরে রুশদীর হাতে ঠোকর দিয়ে মাথা দুলিয়ে চিৎকার করে উঠল, “খাটো পটল! খাটো পটল!”
নিজের কানে শব্দ দুটো শোনামাত্র ফারাজ আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে ফেটে পড়ল অট্টহাসিতে। রুশদী ততক্ষণে পাথর হয়ে গেছে। সে কটমট দৃষ্টিতে ফারাজের দিকে তাকাল। বুঝতে বাকি নেই যে, এই বিটকেল নামটা ফারাজই ওকে মগজধোলাই করে শিখিয়েছে।
রুশদী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “ছিঃ! আপনি একটা নিষ্পাপ প্রাণীকে এসব উল্টোপাল্টা ভাষা শিখিয়েছেন কেন?”
ফারাজ হাসতে হাসতেই অস্বীকার করল, “আরে, আমি আবার কখন শেখালাম!”
“তবে কে শেখাল? এই ফালতু নামে আপনি ছাড়া তো আর কেউ আমাকে ডাকে না! আপনার সাথে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছিলাম…আর আপনি দিলেন সব ঘেটে।”
এর মধ্যেই ট্যাটো যেন রুশদীকে আরও রাগিয়ে দেওয়ার মজা পেয়ে বসল। সে ডানা ঝাপটে নাচতে নাচতে আবার শুরু করল, “খাটো পটল! খাটো পটল!”
মালিকের ওপর রাগটা এবার পাখির ওপর গিয়ে পড়ল। রুশদী টি টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাটোর ঝুঁকে গিয়ে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, “এই দু-ইঞ্চির টিয়া! আমাকে আরেকবার ‘খাটো পটল’ বললে তোর খবর আছে বলে দিলাম!”
ট্যাটো আবারও একই সুরে গেয়ে উঠল, “খাটো পটল!”
ফারাজ এবার হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়ে পড়ার দশা। ওদিকে রুশদীর মাথা তখন ৪২০ ভোল্টে জ্বলছে। কথা বলতে এসেছিল খুব দরকারী, কিন্তু এখন অপমানে তার কান দিয়ে গরম ভাপ বের হচ্ছে। “ধ্যাত!” বলে একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে যে পথে এসেছিল, সে পথেই গটগট করে হাঁটতে শুরু করল।
রুশদীকে চলে যেতে দেখে ফারাজ কোনোমতে হাসি থামাল। পেছন থেকে ডাক দিল, “আরে শোনো! তুমি না কী যেন দরকারী কথা বলতে এসেছিলে? না বলেই চলে যাচ্ছ কেন?”
রুশদী একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাল না। রাগে গটগট পা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই। জাস্ট শাট আপ!”
ফারাজ বুঝল, এবার ম্যাডাম সত্যিই রেগে বোম হয়ে গেছেন। ফারাজ ট্যাটোর মাথায় একটা হালকা গাট্টা মেরে শাসন করে বলল, “দিল তো সংসারে ঝামেলা পাকিয়ে! যা, আজ রাতে তোর আম ক্যানসেল।”
ফারাজ দ্রুত পায়ে রুশদীর পিছু নিল। দূরত্ব কমিয়ে আনতেই সে দুষ্টুমি করে রুশদীর চুলের গুচ্ছ ধরে এক টান দিল। চুলে টান লাগতেই রুশদী থমকে দাঁড়িয়ে গেল।রেগে মেগে ফায়ার হয়ে পেছন ফিরে তাকাল সে, চোখে যেন আগুনের ফুলকি
“চুল টানছেন কেন?!”
ফারাজ অবিচল ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কী বলতে এসেছিলে বলো তো?”
“আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই!”
রুশদী তেজ দেখিয়ে আবার হাঁটা শুরু করতে চাইল।
কিন্তু ফারাজ, সে ছোঁ মেরে রুশদীর এক হাত ধরে টান দিয়ে নিজের ঠিক সামনে দাঁড় করাল। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চির দীর্ঘদেহী ফারাজের সামনে পাঁচ ফুটের রুশদী যেন বড্ড বেমানান। ফারাজকে নিচু হয়ে কথা বলতে হচ্ছে, আর রুশদীকে ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ দেখার মতো করে তাকাতে হচ্ছে। ফারাজ এক হাত দিয়ে রুশদীর কবজি শক্ত করে ধরে রাখল, আর অন্য হাত কোমরে রেখে কড়া গলায় বলল,
“সাইজ ৫ ফুট তেজ দেখায় ১০ ফুটের।ফু দিলেও উড়ে গিয়ে পড়বে এমন শরীর নিয়ে এত তেজ দেখাও কিভাবে?হ্যা? অন্য হাজবেন্ডের মত কড়া গলায় কথা বলি না দেখে এত দাপট দেখাও?কানে নিচে একটা মারলে সব জেদ, তেজ বের হয়ে যাবে।আমি কিছু বলি না দেখে তোমার সাহস বেশি বেড়ে গিয়েছে! শুনো মেয়ে আমাকে দেখতে যতটা ভদ্র মনে করো অতটা ভদ্র কিন্তু আমি না”
রুশদী ছটফট করে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। তার গলার স্বরে অভিমান আর রাগ মাখামাখি, “আশ্চর্য! আপনি এমন ব্যবহার করছেন কেন? হাত ছাড়ুন আমার।”
“সকালে যা করেছ, তার জন্য এমনিতেই আমার মেজাজ বিগড়ে আছে। এখন যদি আবার উল্টোপাল্টা করো, তবে খবর আছে তোমার!কি বলতে এসেছিলে বলো। ”
ফারাজের গলার স্বর এবার আরও গম্ভীর।রুশদী অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“আমি আবার কী করলাম? আপনিই তো অযথা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করছেন!”
“তুমি জানো না তুমি কী করেছ?”
“না!”
ফারাজ এবার রুশদীর খুব কাছে এসে, রুশদীর চোখে নিজের চোখ রাখল।তার চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে।সে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আজ হিজাব ছাড়া কলেজে গিয়েছিল কে?”
“সো হোয়াট? গিয়েছি তো কী হয়েছে?”
“কানের নিচে মারব একটা! সো হোয়াট বলতে এসেছে ম্যাডাম। এমন এক থাপ্পড় দেব যে সারা জীবন মনে থাকবে।”
ফারাজ এর সাঘল তর্ক করতে রুশদীর নিজেও বিবেকে বাঁধল।ফারাজ এর দিক থেকে সে সঠিক। তবুও সে বলল,
“আশ্চর্য আপনি এমন উগ্র ব্যবহার করছেন কেন?
“তোমার সাথে এর চেয়ে খারাপ ব্যবহার করা উচিত! তুমি কোন সাহসে হিজাব ছাড়া কলেজে গিয়েছ?নেক্সট টাইম যদি হিজাব ছাড়া কলেজে যেতে দেখেছি…… মনে রেখ।”
রুশদী জেদের বশে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “গেলে কী হবে?”
“কী হবে সেটা গেলেই বুঝতে পারবে। কাল থেকে তুমি কালো বোরখা পরে কলেজে যাবে। শুধু চোখ দেখা যাবে, এমন বোরখা। না, চোখও দেখা যাবে না! চোখ ঢাকা থাকে এমন বোরখা পড়ে বের হবে। নাহলে তোমার একদিন আর আমার কয়দিন লাগে।”
রুশদী কিছুক্ষণ চেয়ে রইল ফারাজ এর মুখ পানে, তারপর চিৎকার করে বলে উঠল, “আপনার কি মাথার তার ছিঁড়ে গেছে? কী সব উল্টোপাল্টা আবোল-তাবোল বকছেন!”
ফারাজ কোনো তর্কের অবকাশ না রেখে পাথরের মতো কঠিন গলায় বলল, “কাল থেকে তুমি বোরখা পরেই বের হবে, এটাই শেষ কথা।”
“আর আমি যদি না যাই?”
“তুমি যাবে।” ফারাজের কণ্ঠে অটল নিশ্চয়তা।”
“না।”
মুহূর্তেই ফারাজের চোখের চাউনি বদলে গেল। রাগের জায়গা নিল এক গভীর, নেশাতুর অধিকারবোধ। সে এক ঝটকায় রুশদীর দু-হাত তার কমড়ের পেছনে নিয়ে ওকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরল। ফারাজের এই আকস্মিক সান্নিধ্য রুশদীর শরীরে এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বইয়ে দিল। তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল, প্রতিটি লোমকূপ যেন এক অজানা শিহরণে জেগে উঠল।চার পাঁচটার সবকিছু যেন থেমে গেল, শুধু শোনা যাচ্ছিল দু’জনের হৃৎপিণ্ডের দ্রুত ওঠানামা। ফারাজ যখন আরও খানিকটা ঝুঁকে রুশদীর মুখের খুব কাছে নিজের তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল, তখন রুশদীর পৃথিবীটা যেন বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছে। ভয়ে আর আবেশে সে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল ফারাজের দিকে। লোকটার গায়ের পুরুষালি ঘ্রাণ আর চোখের ওই সম্মোহনী দৃষ্টি রুশদীকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলল যে, সে নিজেকে ছাড়ানোর ন্যূনতম চেষ্টাটুকুও করতে ভুলে গেল।
ফারাজ রুশদীর কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত ধীর লয়ে, ফিসফিস করে বলল,”বুঝলে মেয়ে? তুমি পুরোটাই আমার! একদম নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। আমি ছাড়া এই রুপ দেখার অধিকার আর দ্বিতীয় কারো নেই। তুমি আমার একান্ত ব্যক্তিগত আমার!তুমি পুরোটাই আমার হক।”
ফারাজের কণ্ঠের সেই স্বর রুশদীকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল। সে চাইলেও যেন এই বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারছিল না; বরং এক অজানা ভালোলাগা আর আবেশে তার চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে এল।
ফারাজ রুশদীর ওপর থেকে মুখটা কিছুটা সরিয়ে নিলেও বাহুর বাঁধন আগলা না করে,বরং আরও খানিকটা শক্ত করে চেপে ধরল। হাতের চাপে রুশদী মৃদু ব্যথা অনুভব করতেই ফারাজ ওর চোখের মণিকোঠায় নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গেঁথে দিয়ে কড়া গলায় বলল,
“নাকি ইদানীং নিজেকে অন্য ছেলেদের কাছে মেলে ধরতে খুব ভালো লাগছে তোমার?”
রুশদী অপমানে আর লজ্জায় শিউরে উঠল। ছটফট করে বলে উঠল, “ছি! ছি! তা কেন হবে? আপনি এমন জঘন্য কথা ভাবছেন কীভাবে?”
“তবে হিজাব ছাড়া বাইরে যাওয়ার মানে কী?”
ফারাজের কণ্ঠস্বর তখনো থমথমে।ফারাজের এই অসহনীয় নৈকট্য রুশদীকে এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তার বুকের ভেতরটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সে মরিয়া হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মোচড়া-মুচড়ি শুরু করল। মিনতিমাখা স্বরে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, কাল থেকে বোরখাই পরে যাব! এবার দয়া করে আমায় ছাড়ুন।”
“বুঝলে মেয়ে?তুমি পুরোটাই আমার! আমি ছাড়া তোমাকে দেখায় অধিকার কারো নেই! ”
“ছাড়ুন” আকুতির স্বরে বলল রুশদী।
ফারাজের ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে রুশদীকে ছাড়ার বদলে আরও কাছে টেনে নিয়ে আবদারের সুরে বলল, “এত সহজে না। আগে তিনটে চুমু দাও, তারপর মুক্তি পাবে।”
রুশদী চক্ষু চড়কগাছ করে চেঁচিয়ে উঠল, “ইশ! ছি! ছি! ছি! কী বলছেন এসব?”
“ও আল্লাহ! এখানে ‘ছি ছি’ করার কী হলো শুনি? নিজের বরকে চুমু খাবে, এতে লজ্জা কিসের? জলদি তিনটে দাও, তবেই ছাড়ব।”
ফারাজ রীতিমতো নাছোড়বান্দা।ঠিক সেই মুহূর্তে রুশদীর নজর গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাজের লোকগুলোর দিকে। তারা আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখে মুখ টিপে হাসছে। লজ্জায় রুশদীর মনে হলো মাটি দু-ভাগ হয়ে গেলে সে তার ভেতরে ঢুকে যেত। সে ফিসফিস করে ফারাজকে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল, “আরে ছাড়ুন না! ওরা সবাই দেখছে তো!”
ফারাজ ভ নির্লিপ্তভাবে বলল, “দেখুক, তাতে আমার কী? আমার বউ, আমার অধিকার। যতক্ষণ চুমু না দিচ্ছ, ততক্ষণ তোমাকে আমি ছাড়ছি না।”
বলেই সে গাল বাড়িয়ে দিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে অপেক্ষা করতে লাগল।এই লোকটাকে এখন ঠেকানো অসম্ভব। সে হঠাৎ মস্তিস্কে বুদ্ধি খেলে নিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, “ওই দেখুন! আপনার ড্যাড এদিকেই আসছেন!”
‘ড্যাড’ শব্দটা শোনামাত্রই ফারাজ বিদ্যুদ্বেগে রুশদীকে এক ঝটকায় নিজের থেকে আলাদা করে দিল। হন্তদন্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “কই? কোথায়?”
ফারাজ ডানে-বামে তাকিয়ে যখন বুঝতে পারল এটা স্রেফ একটা চাল ছিল, ততক্ষণে কাজ যা হওয়ার হয়ে গেছে! রুশদী তখন পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড় দিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গিয়েছে। ফারাজ একা দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মৃদু হাসল। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে উঠল।ফারাজ বিড়বিড় করে আওড়াল, ‘পাখি পালাচ্ছে অথচ পাখি জানে না পাখির নীড় এ বুকে ‘
সেদিনের সেই লজ্জাজনক ঘটনার পর থেকে রুশদী ফারাজের ছায়া মাড়ানোও বন্ধ করে দিয়েছে। দিনের বেলাটা সে কোনোমতে ফারাজের চোখের আড়াল হয়ে কাটায়, কিন্তু রাত নামলেই তো সেই নিজের নীড়ে, অর্থাৎ ফারাজের ঘরেই ফিরতে হয়। তবে শের থাকায় সে কিছুটা স্বস্তি পায়। আজ অনেক দিন পর বাধ্য হয়েই ফারাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে রুশদী, একটা বিশেষ প্রয়োজনে।
ফারাজ বিন ব্যাগে আয়েশ করে বসে আছে, আর তার কোলের ওপর বসে ছোট্ট শের গভীর মনোযোগে ভিডিও গেম খেলছে। রুশদী সামনে গিয়ে দাঁড়ালেও বেশ কিছুক্ষণ কোনো শব্দ করল না। অস্বস্তিতে নিজের নখ দিয়ে আঙুল খুঁটছে সে। ফারাজ মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকাল,শান্ত সুরে বলল,
“কিছু লাগবে?”
রুশদী অবুঝ শিশুদের মতো ঘাড় নেড়ে সায় দিল, “হুম!”
“কী?” ফারাজের প্রশ্ন সংক্ষিপ্ত।
“দুই হাজার টাকা।”
“কী করবে টাকা দিয়ে?”
“লাগবে একটু।”
ফারাজ বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা নিজের ওয়ালেটটার দিকে ইশারা করে বলল, “ওখান থেকে নিয়ে নাও।”
কিন্তু রুশদীর কাছে সেটা বাধল। সে আলতো করে বলল, “আপনিই বের করে দিন না।”
ফারাজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তুমি নাও। ”
রুশদী আর কথা বাড়াল না। ওয়ালেটটি হাতে তুলে নিতেই দেখল সেটা ক্রেডিট আর ডেবিট কার্ডে ঠাসা, সাথে প্রায় দশ হাজার টাকার মতো ক্যাশ। সে সেখান থেকে গুনে গুনে দুটি এক হাজার টাকার নোট নিল এবং বাকিটা আগের জায়গায় গুছিয়ে রাখল। ফারাজকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
পা বাড়িয়ে চলে যাচ্ছিল রুশদী, কিন্তু হুট করে কী মনে করে আবার ফিরে এল। কৌতূহলী চোখে ফারাজকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনি আসলে করেনটা কী?কোনো কাজ কাজ করেন আদৌও?”
“হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?”
“না, মানে বিয়ের পর থেকে তো আপনাকে সবসময় বাসাতেই দেখি। কোনো কাজ করতে দেখি না। তাই মাথায় এল,আপনি কি কিছু করেন নাকি বেকার?”
ফারাজ একটু মুচকি হেসে বলল, “জবের কথা বলছো?
“হ্যাঁ, কী করেন আপনি?আপনার পেশা কি ”
ফারাজ খুব ভাবলেশহীন মুখে উত্তর দিল, “আমি? আমি তো ড্রাইভার!”
রুশদীর ভ্রু কুঁচকে গেল। মন্ত্রীর ছেলে, সে কি না ড্রাইভার! কথাটা তার কাছে স্রেফ রসিকতা মনে হলো।এ কথা শুনলে যে কেউ হাসবে। সেও হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “মজা করছেন আমার সাথে?”
“না, সিরিয়াসলি আমি ড্রাইভার। বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?”
ফারাজ এবার বেশ সিরিয়াস হওয়ার ভান করল। “বিশ্বাস না হলে আম্মি বা শানকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো। এমনকি শেরকেও জিজ্ঞেস করো, ও নিশ্চয়ই তোমাকে মিথ্যা বলবে না।”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১২
ফারাজের এমন আত্মবিশ্বাসী কথা শুনে রুশদী এবার সত্যিই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। সে সাহায্যের আশায় শেরে’র দিকে তাকাল। শের গেম থেকে মাথা না তুলেই ফারাজের সুর মিলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সত্যি! পাপি তো ড্রাইভারই।”
রুশদী থতমত খেয়ে গেল। সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না সব।তাকে এমন হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফারাজ বলে,
“এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না? লাইসেন্স দেখবে নাকি?”
